Saturday, October 23, 2010

স্কুল, রোবট এবং মানুষের গল্প

আমাদের ইশকুল [১], এই স্কুলগুলোর একটা বিষয়ে আমার তীব্র কষ্ট ছিল! বাচ্চাগুলো ডাক্তার দেখাতে পারছিলাম না! এই বিষয়ে একজন ডাক্তার অনেকখানি সহায়তা করেন কিন্তু তিনি সপ্তাহে একদিনের জন্য ঢাকা থেকে আসেন।
সব মিলিয়ে এখন ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা প্রায় ১২৫ জন। এদের সবাইকে তো আর নিয়ে এসে দেখানো সম্ভব না। কেবল খুব বেশি অসুস্থ হলে তাঁর কাছে এনে দেখানো হতো।

আমার ইচ্ছা ছিল কোন একজন ডাক্তারকে স্কুলগুলোয় নিয়ে বাচ্চাগুলোকে দেখানো কিন্তু কোন ডাক্তারকে রাজি করানো সম্ভব হয়নি! একজন ডাক্তারকে, কিভাবে স্কুলগুলো চলছে বিতং করে বলা, অনেক তৈলমর্দন, অনেক ধরাধরি করার পরও তিনি একটা স্কুলের জন্য এক হাজার টাকা চাইলেন!
অন্য একজন ডাক্তার। ইনি আবার হুজুর টাইপের মানুষ, গাট্টি-বোঁচকা নিয়ে প্রায়ই ধর্মউদ্ধার করার জন্য বেরিয়ে পড়েন। এই ভদ্রলোককেও স্কুলগুলো সম্বন্ধে বিস্তারিত বলার পর আমি বললাম, আপনি আমাকে কেবল আধ ঘন্টা সময় দেন। আমি আপনাকে নিয়ে যাব, পৌঁছেও দিয়ে যাব। আপনি বাইরে গেলে যে ফি নেন তাও দেব। 
তিনি ঝিম মেরে থেকে বললেন, হুঁ, আপনার কাজ তো ভাল।
আমি মনে মনে বললাম, যাক, আল্লাহ মুখ তুলে চেয়েছেন। এরপর তিনি বললেন, আচ্ছা, আপনি এক সপ্তাহ পরে আসেন।

আমি এইবার চিন্তায় পড়ে গেলাম। ওয়াল্লা, ঘটনা কি? ইনি কি সন্দেহ করছেন আমি সিআইএ-র-মোসাদের এজেন্ট? নাকি এরিমধ্যে খোঁজ-খবর নেবেন, আমি কোন জামা গায়ে দেই; আ মীন, কোন দল করি? কসম, আমি বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে গেলাম।
গেলাম এক সপ্তাহ পরে। তিনি এবার আমাকে বললেন, সামনে আমার এফসিপিএস পরীক্ষা, এখন তো সময় বের করা মুশকিল।
আমি আবারও কাতর হয়ে বলি, আমাকে কেবল আধ ঘন্টা সময় দেন...। উত্তর নেতিবাচক। আমার ভেতরের তীব্র ক্রোধ পাক খেয়ে উঠে। আমার ভেতরের পশুটার গায়ের তীব্র গন্ধ আমি টের পাই। একে আমি বড়ো ভয় পাই, এ আমার হাতের তালুর মতই চেনা। পূর্বেও আমি এর অনর্থের নমুনা দেখেছি। নিজেকে সামলানো বড়ো কঠিন হয়ে পড়ে। অবশেষে পশুটা লেজ গুটায়, আমি উঠে চলে আসি।
আমি কখন জনান্তিকে এটা বলেছি নিজেও জানি না, তোর এফসিএস পরীক্ষা খারাপ হোক, 'লাড্ডা' মার।

এরা কিন্তু সবাই সরকারী হাসপাতালের ডাক্তার। আমাদের দেশের এই সব ডাক্তার সাহেবদের পেছনটা কী অপ্রয়োজনীয় ভারী? এরা যে সরকারী মেডিকেল কলেজগুলোতে বছরের-পর-বছর ধরে পাশ দিয়ে ডাক্তার হয়েছেন। যে সরকারী মেডিকেল কলেজগুলোতে বাপের টাকা খরচ করেছেন তারচেয়ে অনেক অনেক বেশি টাকা খরচ হয়েছে সরকারের। সরকারের এই টাকার যে উৎস তাঁর একটা বড়ো অংশ আসে এই সব হতদরিদ্রদের পরোক্ষ ট্যাক্সের টাকায়।

যাই হোক, আমি বিশ্বাস করি, কোথাও-না-কোথাও প্রাণ বাঁচাবার জন্য একটা গাছ থাকবে, থাকবেই, থাকতেই হবে। এই সেদিন লেখালেখির নামে কী-বোর্ডের উপর অত্যাচার করছি। একটা ফোন আসে, আমি ডাক্তার গুলজার, আপনি কি ওমুক? আমি বলি, হ্যাঁ। ওপাশের মানুষটা এবার বলেন, আমি আপনার সম্বন্ধে... ইত্যাদি ইত্যাদি। দেখা করতে চাচ্ছিলাম।
মানুষটার সঙ্গে দেখা হয়, কথা হয়। নজরুল ইসলামের অসুখের বিষয়টি আমি তাঁর কাছ থেকেই জানতে পারি [২]চোখ-কান খোলা একজন মানুষের সঙ্গে কথা বলেও আরাম। আমার মুগ্ধতা ছাড়িয়ে যায় যখন এই মানুষটাকে স্কুলের বাচ্চাদের দেখে দেয়ার বিষয়ে বলার পর এই মানুষটা একবাক্যে রাজী হয়ে যান। আমি বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলায় দুলতে থাকি। সময়টা এমন আজকাল নিজেকেও বিশ্বাস করাটা কঠিন হয়ে পড়ে।

কিন্তু আজকের দিনটা আমার জন্য চমৎকার একটা দিন। এই ডাক্তার নামের মানুষটাকে নিয়ে সারাটা দিন পায়ে চাকা লাগিয়ে ঘুরতে থাকি, স্কুল থেকে স্কুলে। সমস্ত বাচ্চাদের প্রথমিক চিকিৎসাটা হয়। অন্তত সবগুলো বাচ্চাকে ক্রিমির ওষুধটা খাওয়ানো গেছে। সরকারের লোকজনরা শুনলে লজ্জা পাবেন, এখানকার অধিকাংশ বাচ্চাই এর পূর্বে আর কখনও ক্রিমির ওষুধ খায়নি, নামই শোনেনি! অবশ্য এটা আমার কথা, স্যারদের কথা না। স্যাররা যখন বলেন তখন তাঁদের কথা বিশ্বাস না করে উপায় কী! এই যেমন, স্বাস্থ্যসচিব হাইকোর্টে হলফনামা দিয়েছেন, এই দেশের সব দম্পতি পরিবার পরিকল্পনা সম্পর্কে অবহিত
ভাল-ভাল। যেদিন (২৭.০৯.১০) এটা পত্রিকায় পড়েছি সেদিন কেবল হাসিই চাপিনি, হাতে-নাতে পরীক্ষাও করেছি। এই নিয়ে হরিজনপল্লীর কয়েকজনের সঙ্গে আলাপও করেছি। আলাপের বিশদে যাই না, কেবল বলি, আমাদের স্বাস্থ্যসচিব সাহেবের মুখের হাসি যে মিলিয়ে যাবে এতে অন্তত আমার কোন সন্দেহ নাই।

স্বাস্থ্যসচিব থাকুন আমাদের স্বাস্থ্য নিয়ে, জটিলসব বিষয়ে মাথা ঘামিয়ে আমাদের লাভ নাই। তো, এই ডাক্তার নামের মানুষটি যে কেবল বিনে পয়সায় তিনটা স্কুলের বাচ্চাদের দেখে দিয়েছেন এটুকুই না, প্রয়োজনীয় ওষুধগুলোও জোগাড় করেছেন!
মানুষটার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা না-করায় কী আসে যায়, এই বাচ্চাদের ব্লেসিং তাঁকে তাড়া করুক, অবিরাম।
অন্ধপল্লীতে: ডা. গুলজার হোসেন
স্টেশনের স্কুলে: ডা. গুলজার হোসেন
হরিজন পল্লীতে: ডা. গুলজান হোসেন
সহায়ক লিংক:
১. আমাদের ইশকুল: http://tinyurl.com/39egrtn
কবি নজরুল: http://www.ali-mahmed.com/2010/10/blog-post_21.html

2 comments:

যুক্ত করো হে সবার সঙ্গে, মুক্ত করো হে বন্ধ said...

ali vai ,kajti kore ananda o shukh peyechhi .akhane amar shartho achhe boi ki.......

।আলী মাহমেদ। said...

আপনি কোথায় কোথায় পালিয়ে বেড়াবেন! বাচ্চাদের ব্লেসিং আপনাকে তাড়া করবেই...। @যুক্ত করো হে সবার সঙ্গে, মুক্ত করো হে বন্ধ