Wednesday, May 12, 2010

বৈদেশ পর্ব: তিন

একজন আমাকে জার্মান দূতাবাসে ভিসার জন্য যোগাযোগ করতে বলেছিলেন। এই মানুষটার আমাকে নিয়ে উদ্বেগের শেষ নাই। তিনি আমাকে যেটা বললেন, ভিসার জন্য এপ্লাই করার পূর্বে এদের সঙ্গে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট করার জন্য। এই টিপসটা যথেষ্ঠ কাজে দিয়েছে নইলে আমাকে খামাখা ঢাকা থেকে ঘুরে আসতে হতো। সহৃদয় এই মানুষটার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি।

ওয়েব সাইট থেকে জার্মান দুতাবাসের ফোন নাম্বার খুঁজে ফোন করলে, একজন বাংলাদেশি ভদ্রলোক ফোন ধরলেন। যথারীতি তিনি সম্ভাষণ জানানোর মত ভদ্রতায় গেলেন না। আমি এইসবে অভ্যস্ত বলেই এই নিয়ে গা করার কোন কারণ দেখিনি, দেশটা বাংলাদেশ, মানুষটাও বাঙালী। এমনিতে এই দেশের অফিস-আদালত নিয়ে আমার অভিজ্ঞতা সুখকর না কিন্তু জার্মান এমব্যাসিতে এমনটা আশা করেছিলামই, এটা বলে মিথ্যাচার করি না।

কেন আমি জার্মানি যেতে চাচ্ছি এটা বোঝাতে আমার কালঘাম বেরিয়ে গেল। পাসপোর্ট নাম্বার এবং নাম-ধাম বলে, তিনি আমাকে এ মাসের ২০ তারিখ সকাল ১০টায় সময় দিলেন আসার জন্য। এ পর্যন্ত কোন সমস্যা নাই কিন্তু সমস্যা দেখা দিল আমি যখন ওনাকে মোলায়েম গলায় বললাম, 'আপনার ভাল নামটা, প্লিজ'?
তিনি আমাকে বললেন, 'নাম বলা যাবে না'।
আমি গলায় মধু ঢেলে বললাম, 'নাম বলতে কি কোন সমস্যা আছে'?
তিনি বললেন, 'আমাদের নাম বলার অনুমতি নাই'।
আমি হাল ছাড়ি না, 'বলেন কী! বেশ কিন্তু আপনি নাম না বললে পরে যদি আমাকে জিজ্ঞেস করা হয় আমরা তো আপনার ২০ তারিখ আসার ব্যাপারে কিছুই জানি না। আপনি কার সঙ্গে কথা বলেছিলেন? তখন আমার উত্তরটা কি হবে'?
তিনি তার সিদ্ধান্তে অনড়, 'আপনার নাম এন্ট্রি করা হয়েছে'।

বেশ। এইবার আমিও ধরে নিলাম লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। ধরে নিলাম, আমার কোনো সমস্যাই হবে না কিন্তু আমার মোটা মাথায় ঢুকছে না কেন নাম বলা যাবে না! প্রত্যেকটা মানুষই যে কোনো একটা নাম দিয়ে পরিচিত হয়, কেবল হয় না পশু-পাখি। 
অবশ্য পশু-পাখির সঙ্গে এই বিষয়ে আমার কখনও কথা হয়নি ভাষাগত সমস্যার কারণে। বাংলা ভাষাটাই ভাল জানি না, এদের ভাষা জানতে হবে এহেন মাথার দিব্যি কে দিয়েছে! অবশ্য পশু-পাখি ইংরাজিতে [১] কথা বললে অনেকে আমাকে চেপে ধরতে পারতেন। 
আফসোস, জানা হয়নি পশু-পাখি নিজেরা নিজেরা কোনো নাম রাখে কি না? যেমন ধরুন, আমরা একটা গরুর রব কেবল শুনতে পেলাম, হা-ম-বা, হাম্বা, খাম্বা। এদিকে এটা হয়তো আমাদের জানা নেই, ওই গরুটা তার বাছুরের নাম রেখেছে, কাকেটসোকেন। তাই সে সুর করে ডাকছে, ওরে-অ আমার কাকেটসোকেন। এই কাকেটসোকেনকে আমরা শুনতে পাচ্ছি, হা-ম-বা, হাম্বা। হতে পারে না এমন, বেশ পারে।

আমার ধারণা, মোসাদ-এফবিআই এদেরও কোনো-না-কোনো একটা নাম থাকে। হয়তো নিরাপত্তার খাতিরে এরা কোনো একটা ছদ্মনাম নেন কিন্তু কোনো-একটা নাম না থেকে পারেই না। ধরা যাক, নামগুলো হতে পারে এমন মি. এক্স, মিস ওয়াই বা মিসেস জেড।

মানুষটার নাম না বলার কারণ কি? আমি খানিকটা চিন্তাগ্রস্ত। ওখানকার ভয়েস-রেকর্ডারে পূর্ব থেকে রেকর্ড করে রাখা লাদেনের গলার স্বরের সঙ্গে কি আমারটাও মিলে গেছে? কী সবর্নাশ-কী সর্বনাশ! কিন্তু এরা কী বেকুব! এরা কেমন করে এটা ভাবল, লাদেন বাংলায় কথা বলছে! নাকি লাদেন আজকাল বাংলায় কথা বলা শুরু করে দিয়েছে?
তবে এটা সত্য, লাদেন মানুষটাকে ভয় না পাওয়ার কোন কারণ নাই, আমি কোন ছার! স্বয়ং বুশও [৭] এই গ্রহে কেবল লাদেন এবং লরাকে ভয় পেতেন! এমনিতে বুশকে [৮] আমি খুব বড়ো মাপের মানুষ (!) মনে করি, যেদিন থেকে তিনি পত্রিকা পড়া শুরু করলেন সেদিন থেকে। মানুষটা সাহসীও, জুতাবোমা [৯] খেয়েও দিব্যি হাসতে থাকেন! কী অমায়িক হাসি!

এখন ২০ তারিখ যাওয়ার পর আমাকে যদি বলা হয়, আপনার নামে কোন এপয়েন্টমেন্ট নেই, তবে উপায়? দেখা গেল এরা চোখ লাল মুখ কালো করে গাঁকগাঁক করে উঠলেন, ভাগেন এখান থেকে, জলদি। এবাউট টার্ন, নো লেফট রাই, নাক বরাবর হাঁটেন, কুইক, ঘাড় ফেরানো বন্ধ। তখন আমার উপায় কী?
আমি হয়তো চিঁচিঁ করে বলার চেষ্টা করলাম: আমার ফোনের কসম, আমি এই ফোন থেকেই মে মাসের ১২ তারিখে (পোন দিয়েছি) ফোন করেছি। দিবাগত রাত, না-না, রাতগত দিবা বুধবার বেলা ১১:৩৮ ঘটিকা। এ এম, শার্প।
এরা হয়তো বা অসদয় হয়ে বললেন: এই সব খাজুরা আলাপ করে লাভ নাই। এবাউট টার্ন...। ভাগেন।
তবুও আমি ঝুলাঝুলি করতেই থাকলাম: বিশ্বাস না হলে আপনাদের এখানে নিশ্চয়ই কল রেকর্ডার আছে, চেক করে দেখলেই বুঝতে পারবেন। আমার নাম্বারটা হচ্ছে, ০১১৯১...।
এবার হয়তো এদের খানিকটা বিকার দেখা দেবে, ওহ-হ, সিটিসেল, পুও(র)! এটা তো রিকশাওয়ালা ব্যবহার করে, আমাদের মেশিন আবার এটা কাউন্ট করে না। (সত্যি সত্যি একজন পুলিশ অফিসার [২] সিটিসেল নিয়ে আমাকে প্রায় হুবহু এই কথাটাই বলেছিলেন)। আপনি এক কাজ করেন, সিটিসেল, এই ফোন অপারেটর থেকে ফোনালাপের অডিও ক্লিপিংস নিয়ে আসেন। যান।

সিটিসেল, ফোন অপারেটরের কাছে গেলে এরা হয়তো প্রথমেই বলে বসবেন: একটা পিটিশন দেন।
আমি হয়তো খুব গুছিয়ে লিখলাম, স্যার...হাম্বল রিকোয়েস্ট...আমার ফোনালাপের...। ওটা পড়ে হয়তো এরা চোখ সরু করে বলবেন, ফোনালাপ? দেশের গুপ্ত তথ্য চাচ্ছেন, আপনি কি গোয়েন্দা? ভাগেন এখান থেকে। তা গোয়েন্দা কাউকে দিয়ে বলালে আমরা ভেবে দেখতে পারি।

গোয়েন্দাদের কাছে গেলে এরা আমাকে ঠিক হাঁকিয়ে দেবেন: মিয়া, জঙ্গিদের [৩] নিয়ে কাজ করে সময় পাই না আর আপনে! জঙ্গিদের নিয়াই বড়ো যন্ত্রণায় আছি, এদের পেশাবেও সালফারের গন্ধ, ছি! দম বন্ধ হয়া আসে, ওয়াক! এর উপর আবার সৃষ্টিছাড়াসব অস্ত্র [৪] লইয়া ঘুইরা বেড়ায়! আর আপনি আইছেন বাতচিতের ইয়ে লইয়া, বা...। যান, এইখান থিকা।
যান-যান ভাগেন, কোনো উৎসাহ পাইতাছি না, জঙ্গি কানেকশন থাকলে নাহয় একটা চেষ্টা করতাম। জার্মান না হইয়া আফগানিস্তানের বিষয় হইলে আপনারে আর আসতে হইত না, আমরাই আপনারে খুঁইজা বাইর করতাম। যান এহন, আর শোনেন, সিটিসেল বেবহার না কইরা গ্রামীন ফোন [৫] ব্যবহার করলেই তো আর ভেজাল থাকে না, জিপি কোম্পানিটাও দেশপ্রেমিক। দেখেন না, মতিউর রহমানরে নিয়া এরা কানতে কানতে প্যান্ট ভিজায়া ফেলে।
ওরে, গ্রামীন ফোন যে মেথরের হাতেও থাকে- এই নিয়ে কে যাবে এদের সঙ্গে কথা বাড়াতে।

এই দেশে পদে পদে মানুষকে অপদস্ত করার সুব্যবস্থা [৬] দেখে দেখে বৈদেশিরাও শিখে ফেলেছে।

*বৈদেশ পর্ব, চার: http://www.ali-mahmed.com/2010/05/this-is-my-land.html   

সহায়ক লিংক:
১. ইংরাজি: http://www.ali-mahmed.com/2010/04/blog-post_9242.html
২. সিটিসেল নাম্বার...: http://www.ali-mahmed.com/2007/06/blog-post_9310.html
৩. জঙ্গি: http://www.ali-mahmed.com/2009/04/blog-post_23.html 
৪. উইপেন অলওয়েজ উইপেন...: http://www.ali-mahmed.com/2009/06/blog-post_26.html
৫. গ্রামীন ফোন: http://www.ali-mahmed.com/2009/12/blog-post_06.html
৬. বৈদেশ পর্ব, এক: http://www.ali-mahmed.com/2010/05/blog-post_10.html
৭. বুশ: http://www.ali-mahmed.com/2009/12/blog-post_25.html 
৮. সাদা বাড়িতে কালো অতিথি: http://www.ali-mahmed.com/2008/11/blog-post_06.html
৯. জুতাবোমা: http://www.ali-mahmed.com/2008/12/blog-post_16.html

4 comments:

Ashik said...

আপনি জার্মান এমব্যাসিতে ফোন করে ছিলেন তো? আমার মনে হয় হিটলার এর বংশধর বললে হয়তো সে তার নাম বলত

Mahbub said...

ঐ ব্যাটা একটা ইতর প্রকৃতির বস্তু। ঐ বস্তুকে হাফপ্যান্ট পড়াইয়া জার্মান এমবেসীর সামনে দাঁড়ায় রাখার কাম। কাস্টমার কেয়ার চার্টার অনুসারে যে ব্যক্তি ফোন ধরে সে সাদর সম্ভাষন জানিয়ে তার নাম বলতে বাধ্য। আপনি যে সময়ে ফোন করেছিলেন সেই সময় টুকু কাগজে টুকে রাখুন। এটা কাজে লাগে, আর ওই দূতাবাস সম্ভবত যে সব কল করা (আউটগোয়িং/ইককামিং) হয় সেগুলো রেকর্ড করে রাখে।
আর বেশী অসুবিধা হলে অফিসিয়াল কমপ্লেইন করে দিবেন। আমি গতবার দেশে গিয়ে অজি হাইকমিশনের এক দেশী অফিসারের আচরনে মুগ্ধ হয়ে তার নামে সোজা অজি ইমিগ্রেশনের হেডকোয়ার্টের অভিযোগ ঠুকে দিয়েছিলাম। সপ্তাহখানের পর বিস্তারিত জানতে চেয়ে মেইল করে ওরা, আরো ২ সপ্তাহ পর কি ‌এ্যাকশন নেয়া হয়েছিলো তা জানিয়ে আমাকে মেইল করে ওরা। ঐ হালার পোকে পত্রপাঠে বিদায় দেয়া হয়েছিলো। ওর বিরুদ্ধে নাকি আরো অভিযোগ ছিলো সে রকম।

।আলী মাহমেদ। said...

:) @Ashik

।আলী মাহমেদ। said...

'ঐ বস্তুকে হাফপ্যান্ট পড়াইয়া জার্মান এমবেসীর সামনে দাঁড়ায় রাখার কাম।"
সুমন, এই বিষয়ে আমার খানিকটা আপত্তি আছে। আমরা বঙ্গালদের ঠ্যাং এমনিতেই চিকন চিকন। হাফপ্যান্ট পরালে চিকন-চিকন ঠ্যাং বের হয়ে থাকবে...! :)