Wednesday, December 28, 2011

হাসপাতাল পর্ব, এগারো: ' পেপার-বিছানা '

­আমি মানুষটা ছোট কিন্তু আমার স্বপ্নগুলো বড়ো বড়ো। স্বপ্ন আকাশসম হবেই না কেন? এই বিষয়ে আমার বক্তব্য হচ্ছে, স্বপ্নেই যখন খাব তখন ডাল-ভাত খাব কেন, তিমি মাছের ঝোলই খাই!
সাধ্য থাকলে, সম্ভব হলে কমলাপুর স্টেশনের ধারে-কাছে কোথাও একটা ডর্ম টাইপের খুলতাম। যেখানে বিনামূল্যে লোকজনেরা নিশিযাপন করতে পারতেন। সবাই কিন্তু না। কেবল যারা দূরদূরান্তর থেকে ঢাকায় এসেছেন চাকুরির ইন্টারভিউ দেয়ার জন্য। যারা অসামর্থ্য, যে দুয়েক দিন ঢাকায় থাকবেন তাঁরাই কেবল
এখানে থাকতে পারবেন।

জানি-জানি, এখনই অনেকের মুখ চুলবুল করছে এটা বলার জন্য, আরে মিয়া, কে না কে, কোত্থিকা না কোত্থিকা, 'হেষে' (শেষে) একটা ঝামেলা, পুলিশ কেইস ইত্যাদি। আসলে এটা নিয়ন্ত্রণ করা খুব জটিল কিছু না। কেবল এঁরা চাকুরির ইন্টারভিউ-এর কার্ড দেখাবেন, ব্যস, ঝামেলা চুকে গেল। সাধারণ একটা কোনো সফটওয়্যারের সহায়তায় নিদেনপক্ষে একটা এক্সেল শিট বানিয়ে ডাটা এন্ট্রি করে রাখা, এখানে নাম-ধাম হাবিজাবি সবই থাকল। হে-হে, বাওয়া, পালাবে কোথায়!

এই ভাবনাটা আমার মাথায় আসে তখন, সালটা ২০০৭। যখন আমি কমলাপুর স্টেশনে রাত কাটাতে বাধ্য হয়েছিলাম। ভাগ্যিস, হয়েছিলাম। এমন না ঢাকায় পরিচিত লোকজন, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়স্বজন নাই কিন্তু কেন যেন থাকার জন্য নাগরিক মানুষগুলোর কাছে যাওয়া হয় না। বাচ্চাদের মার কাছে আমি একজন সন্দেহজনক মানুষও কারণ ঢাকায় গেলে রাতে আমি বাচ্চাদের নানার বাড়িতেও থাকি না তাহলে থাকিটা কোথায়, ঘটনা কী!

ওই একরাতে অনেক কিছুই খুব কাছ থেকে দেখেছিলাম। দেখেছি ছোট-ছোট বাচ্চাগুলো যাদের আমরা পথশিশু-টোকাই বলি, এই সব বাচ্চারা মুখে পলিথিন লাগিয়ে নেশা করে। আমি হাঁ! ওই পলিথিনে কয়েক ফোঁটা রাবারে জোড়া দেওয়ার আঠা। যা 'ড্যান্ডি' নামেই এদের কাছে পরিচিত।
বুকে হাত দিয়ে বলি, আমি হতভম্ব-হতবাক, বেদনাহত হয়েছিলাম। কী অবলীলায়ই না এই বাচ্চাগুলো নেশার ফাঁদে আটকা পড়ছে। ক্রমশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এদের ফুসফুস, কিডনি। আমার এই অভিজ্ঞতা এদের নিয়ে লেখা উপন্যাসে খুব কাজে লেগেছিল। অথচ এটা নিয়ে লেখার জন্য পরিচিত কিছু সাংবাদিককে অনুরোধ করেছিলাম। এরা আগ্রহ দেখাননি। কেন, কে জানে! এরা হয়তো দেশ-দেশ নিয়ে মাথা ঘামাতে পছন্দ করেন!

যাই হোক, যেটা বলছিলাম, ওদিন রাতেই আমি দেখি শিক্ষিত ছেলেগুলোকে পেপার বিছিয়ে ষ্টেশনে ঘুমুতে। এরা প্রায় সবাই শিক্ষিত ছেলেপেলে, এঁদের অনেকেই ঢাকায় এসেছেন চাকুরির ইন্টারভিউ দিতে, কেউ কেউ বেকারও। দুয়েকজনের সঙ্গে আমার আলাপও হয়েছিল। রেলের পুলিশকে নাকি আবার টাকাও দিতে হয়!
এঁদের শোয়ার আয়োজন দেখে, আমি ভেবে কূল পেতাম না, কেমন করে ঘুম হয়? আমি রাজনীতিবিদ হলে নাহয় স্বীকার যেতাম আমার চোখ ভিজে এসেছিল। এটা স্বীকার করতে শস্তা একজন কলমবাজের কী দায় পড়েছে!

ওই পেপার বিছিয়ে শোয়ার বিষয়টা ভুলে গিয়েছিলাম। প্রকৃতির শোধ বলে একটা কথা আছে। হাসপাতালে প্রথম দু-রাত তো কেটে গেল চেয়ারে বসে শুয়ে-বসে। শরীর বলে কথা- কাঁহাতক আর সহ্য করা যায়!
অনেকের ধারণা হবে আমি খুব মা-ভক্ত টাইপের একজন মানুষ। ভুল! প্রথম সন্তান বলে কিনা জানি না, আমার মা অতিরিক্ত আদর দিয়ে দিয়ে আমাকে দুর্বিনীত-বেয়াদব বানিয়ে ফেলেছিলেন। খোকা এটা করিস নে, করেছি। খোকা সিগারেট খাস নে, খেয়েছি। তিনি আমার ক্যারিয়ার নিয়ে বড়ো চিন্তিত থাকতেন, সবারই যখন একটা-না-একটা ক্যারিয়ার তখন আমার হাতে টিফিন-ক্যারিয়ার।
আহা, মাকে কেমন করে বোঝাই, 'ছাতার' লেখালেখির কারণে ততোধিক 'ছাতাফাতা'-'বাছাল', হাবিজাবি কাজের কারণে আমার সময় কোথায়! আমাকে নিয়ে পরে মা হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন। তিনি হয়তো অলক্ষ্যে মন খারাপকরা শ্বাস ফেলতেন, কেন এমন দুর্বিনীত সন্তানের জন্ম দিলাম, বাপু!

আজ বুকে হাত দিয়ে বলি, বালকবেলায় কেন, ইয়া ধামড়া হয়েও এই দাপটে অস্থির মহিলার কালো-কালো মুখকে বড়ো ভয় করতাম। অপেক্ষায় থাকতাম এই মহিলা কখন পান খাবেন কারণ পান খেলে অজান্তেই এই মহিলায় মুখখানা বড়ো কমনীয়, মায়া-মায়া হয়ে উঠত!
এখন অসুস্থ হওয়ার পর এই মহিলাই যখন অসহায়ের মত পড়ে থাকতেন, কী এক দৃষ্টিতে তাকাতেন- এমন অসহ্য চোখে চোখ রাখার ক্ষমতা আমার কই! তখন আমি সহ্য করতে পারতাম না। যতই অমানুষ হই, মা বলে কথা। আমি স্থিরচিত্তে আগেই ঠিক করে নিয়েছিলাম, এমন কোনো কাজ করব না যাতে তাঁর চিকিৎসার অবহেলা হয়, বিন্দুমাত্রও।

এমন না, অন্য কোথাও, আশেপাশের কোনো হোটেলে থাকা যেত না। আগেই বলেছি, এটা আমি চাচ্ছিলাম না কারণ রাতে আমার মার জরুরি কোনো প্রয়োজন হলে তখন উপায়টা কি হবে?
পরে এই বুদ্ধিটা বের করলাম। এককোনায় পেপার বিছিয়ে ঘুম। রাতে কোনো সমস্যা হয়নি বলে আমাকে কেউ ডাকেনি, এক ঘুমে রাত কাবার! কে বলে পেপার-বিছানায় ভাল ঘুম হয় না? এই নিয়ে কারো সঙ্গে তর্কে যেতে আমি আগ্রহী না কারণ ক্ষেপে গিয়ে নাক ফাটিয়ে ফেললে এক মহাকেলেঙ্কারি হয়ে যাবে।

সবই ঠিক ছিল যদি না সকালে ঝাড়ুদার-সুইপার এসে ঝামেলা করত...।

*হাসপাতাল পর্ব, দশ: মহাপরিচালক, যথাযথ সম্মানপূর্বক: http://www.ali-mahmed.com/2011/12/blog-post_26.html

4 comments:

নিলয় said...

শুভ ভাই,এই বার বইমেলায় কি এই পর্বগুলা নিয়ে বই বের হচ্ছে?

।আলী মাহমেদ। ali mahmed । said...

না। কোনো সম্ভাবনা নাই।

সবিনয়ে বলি, বই-টই বের হওয়া নিয়ে এখন আর উৎসাহ পাই না। কারণ প্রকাশকের বিমর্ষ মুখ দেখতে ভাল লাগে না। বেচারাদের বই বিক্রি না-হলে ছাপাবেন কেন! আর আমিই বা বলব কেন? @নিলয়

নিশম said...

বছর কয়েক আগেও স্বপ্ন দেখতাম, আমার অনেক টাকা হবে। তখন পথশিশুদের জন্য লঙ্গরখানা খুলবো, দিনে দুবেলা পেট ভরে খিচুরী খেয়ে যাবে ! এখন নিজের অবস্থাই পথশিশুর থেকে সামান্য উন্নত। স্বপ্ন দেখতে পারিনা তাই, যোগ্যতা হারিয়েছি দেখবার :)

কেমন আছেন ?

।আলী মাহমেদ। ali mahmed । said...

"...স্বপ্ন দেখতে পারিনা তাই...।"
খবরদার, স্বপ্ন দেখা বন্ধ করবেন না কারণ এই স্বপ্নই আমাদেরকে বাঁচিয়ে রাখে নইলে কবে আমরা মরে ভূত হয়ে যেতাম @নিশম