Monday, December 12, 2011

হাসপাতাল পর্ব, নয়: দৈন্যতা

পরের দিন সকালে যে নার্স এসেছেন তিনি মা-মা টাইপের! অসম্ভব মায়া মানুষটার মনে। এই হাসপাতালে আমি কিছু-কিছু মানুষ পেয়েছি যাদের দেখে আমার বুকের গভীর থেকে যে অনুভূতিটা বেরিয়ে আসত, এঁরা এতো ভাল কেন! কোন কারণে আজ পোস্ট অপারেটিভের অন্য রোগিরা অন্যত্র চলে গেছেন। আছেন কেবল আমার মা।
নার্স ভদ্রমহিলা লজ্জিত গলায় বললেন, অটিতে কেউ নেই আমাকে একটু যেতে হবে। আপনি কি আপনার মার কাছে একটু থাকতে পারবেন?
আমি মনের আনন্দ গোপন করে বললাম, কোনো সমস্যা নাই। আহা, কী মজা, কেবল আমরা আমরাই।

বাইরে ঝকঝকে রোদ।
একটা ঝলমলে দিন! কাঁচের জানালা দিয়ে তীব্র রোদে মার কষ্ট দেখে 'ওই ডাক্তার' আর আমার বোনটা কি-কি বুদ্ধি করে একটা আড়ালের মত সৃষ্টি করেছে। ফ্যানের বাতাসে কুলাচ্ছিল না। এসি নষ্ট। অথচ এসি চালু থাকলে মার খানিকটা আরাম হতো।
'ওই ডাক্তার' নামের মানুষটার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই না কারণ...। থাক না, কিছু-কিছু মানুষের কাছে ঋণী থাকতে সমস্যা কোথায়!

আগেও বলেছিলাম, এই হাসপাতালের অনেক সুবিধা দেখে আমি মুগ্ধ। যেমন ধরা যাক, আমার মার অসংখ্য টেস্ট করাতে হয়েছে। একবার চেয়েছিলাম, একই টেস্ট ক্রস চেক করার জন্য। মেডিনোভায় করতে চেয়েছিলাম। গিয়ে দেখি রাত আটটায় বন্ধ। এই আহাম্মকদের কে বোঝাবে, এটা ডালপুরির দোকান না! ফাজিল, এর মানে কী! ঘড়ির কাঁটা ধরে রোগির প্রয়োজন হবে নাকি!

অথচ এই হাসপাতালে ক্ষণে ক্ষণে কত টেস্ট করা হয়েছে। কোনো বাড়তি ঝামেলা নেই, নীচে কাউন্টারে টাকা জমা দিলেই ঝামেলা শেষ। বাকী হ্যাপা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের। হোক রাত বারোটা একটা, কোনো সমস্যা নেই। এমন অপারেশনের রোগির জন্য যা অতি জরুরি। তাঁর ইউরিয়া-সোডিয়াম-পটাশিয়াম-ক্লোরাইড-কিটিনাইন। কেবল ডাক্তার না, আমাদের নিজেরও বুঝতে সুবিধা হচ্ছিল।
আমাকে অবাক করে দিয়ে তাঁর সমস্ত রিপোর্টই ভাল আসছিল কেবল সোডিয়াম নিয়ে খানিকটা ঝামেলা ছিল। এটা থাকা প্রয়োজন ১৩৬ থেকে ১৪৫ কিন্তু পাওয়া গেল ১১৮। রাতের বেলায় আমাকে এক ইন্টার্নি ডাক্তার বলছে ৩ পার্সেন্ট সোডিয়াম ক্লোরাইড নিয়ে আসতে।

এই আইভি ফ্লুইডটা কোনো ফার্মেসিতে পাওয়া যায় না! এটা নিয়ে আবার এক ধরনের ফাজলামি আছে। এটা আইসিডিডিআরবি ব্যতীত অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। ওখানে আবার ধরাধরিরও কিছু বিষয় আছে। এমনটা কেন? এর কোন উত্তর কেউ আমাকে দিতে পারেননি। আমি বুঝে গেলাম এটা বাংলা একাডেমির মতই এক ধরনের ফাজলামি [১]। নীলরক্ত প্রতিষ্ঠানের মত এরাও লোকজনকে যন্ত্রণা দিয়ে আরাম বোধ করে। আমি চিঁ চিঁ করে ওই ডাক্তারকে বললাম, এই গভীর রাতে ওখানে যাব কেমন করে? সঙ্গে তো গাড়ি-ঘোড়া নাই। কাল সকালে এনে দেব।

সকালে এটা বলার কারণ ছিল। ফোন করলে ডাঃ গুলজার আমাকে আশ্বস্ত করেছিলেন, ১১০ নীচে না-গেলে ভয়ের কিছু নেই। কিছু ইন্টার্নি ডাক্তারদের নিয়ে আসলে সমস্যাও হয়। এরা অল্পতেই অস্থির হয়ে পড়েন। ডাঃ মাকসু... নামের এক ইন্টার্নিকে তো আমার থাপ্পড় দেয়া উচিৎ ছিল। মা ছটফট করছিলেন বিধায় একে ডেকে নিয়ে এসেছিল আমার বোন। এসেই এ ফটাফট আমার মার পেটের ব্যান্ডেজ খুলে ফেলল। নার্সের কাছে গজ-ব্যান্ডেজ চাইল, নার্স এনে দিতে দিতে এই লোক আসছি বলে উধাও। নার্স পর্যন্ত হতভম্ব!

উধাও তো উধাও। এর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। আমি নড়তে পারছিলাম না কারণ আমার বোনকে এখান থেকে সরিয়ে দিয়েছিলাম। আমার মার পেটের সেলাইগুলো এমন, এ সহ্য করতে পারবে না। ডাক্তার নামের এই অপদার্থের কাছে এই মানুষটা একটা সাবজেক্ট ব্যতীত আর কিচ্ছু না কিন্তু এ যে আমার মা। দাপুটে এই মহিলা এই অবস্থায় পড়ে আছেন, কী অসহায়, কী কাতরই না লাগছিল তাঁকে। আমি মার চোখের দিকে তাকাচ্ছিলাম না। আমি কেমন করে সহ্য করেছিলাম আমি জানি না। কেবল জানি সহ্য করতে হয়। চশমার কাঁচ ঝাপসা হয় তাতে কী! আমি কি বেকুব যে হাউমাউ করে কাঁদব!

আমার বোন পাগলের মত এই ডাক্তারকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। অবশেষে এর আগমণ বিশ-পঁচিশ মিনিট পর। হাতে একটা পানির বোতল, দরদর করে ঘামছে। এ নাকি পানির জন্য গিয়েছিল। আজব, পানির সমস্যা থাকলে ধাম করে গজ-ব্যান্ডেজ খুলে ফেলার প্রয়োজন কী ছিল?
কোথায় গ্লভস, কোথায় জীবাণূনাশক লোশন। এ এর কাজ করে যাচ্ছে। ওহ, এর কাজ করার সময় আগের তুলো সরাবার পর কিছু কালো পিপড়া দেখেছিলাম। এর কাছে জানতে চেয়েছিলাম কিন্তু এই অপদার্থের উত্তর দেয়ার সময় কোথায়! এর ভাব দেখে মনে হলো কালো পিপড়া থাকা দোষের কিছু না। রোগির জন্য ভাল!
এখন যদি আমি এই হারামজাদার কাছে জানতে চাই অদ্যাবদি তুই ডাক্তারির কি শিখেছিস? কেন অপারেশনের এমন রোগিকে আধ ঘন্টা ধরে উম্মুক্ত ফেলে রাখলি? তুই ব্যাটা আমাকে বল, ইনফেকশন কাহাকে বলে, কত প্রকার ও কি কি, কেমন করে ইনফেকশন ছড়ায়? আমি তোর কাছে শিখতে চাই। কেবল শুয়োরের মত দরদর করে ঘামলেই তো হয় না, ঘোৎ ঘোৎ করে পানি পান করলেই কেবল চলে না; আমার মত অশিক্ষিত মানুষদেরকে খানিকটা শেখাতেও তো হয়!

এই হাসপাতালে কি আছে এই প্রশ্ন না-করে বলা চলে কী নেই! কোটি-কোটি টাকা দামের যন্ত্রপাতি, সবই আছে। নেই কেবল মনিটরিং। অবশ্য থাকার কথা না কারণ:
এই টাইপের পোস্টার লাগিয়ে হাসপাতাল ভরিয়ে ফেলেছে! "স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ"? এইটা কি জিনিস! যেখানে এই জিনিস থাকবে সেখানে কোনো কাজ করার আদৌ প্রয়োজন আছে কি?

কে কার কাছে ফরিয়াদ জানাবে? বিনা অনুমতিতে প্রবেশ নিষেধ। বেশ-বেশ! তা নাহয় অনুমতি নিয়েই প্রবেশ করলাম। কিন্তু কোথায় প্রবেশ করব? আমি যে ক-দিন এই হাসপাতালে ছিলাম কোনো দিন এই দরোজা খোলা পাইনি।

পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে দুই দুইটা এসি। বললে কেউ বিশ্বাস করবে দুটাই বন্ধ ছিল। গরম, মাথায় উপর ফ্যান ঘোরে। অথচ আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম, এসিটা চালু থাকলে আমার মার কষ্ট অনেকখানি কম হতো। কয়েকজন নার্সকে বলেছিলাম সবাই একই উত্তর দিয়েছে, এসি নষ্ট।
আজ যখন ফাঁকা ছিল, সুযোগটা কাজে লাগালাম। কি মনে হলো প্লাগ লাগিয়ে এসি অন করে দেখি চমৎকার কাজ করছে, দুটাই। গোটা রুমটা ঠান্ডা। এমন না সব নার্সই ইচ্ছা করে কপটতা করেছেন। আমার ধারণা এই নার্সরা নিজেরাও হয়তো জানেন না।

এই হাসপাতালে এই সব দেখার কেউ নেই। কারণ দলবাজী [২], [৩] করলেই হয়, কাজ করার প্রয়োজন কী!          

*হাসপাতাল পর্ব, আট, মাখন: http://www.ali-mahmed.com/2011/12/blog-post_10.html 

**সবগুলো পর্ব: http://tinyurl.com/boya6xk

সহায়ক সূত্র:
১. বাংলা একাডেমি...: http://www.ali-mahmed.com/2009/05/blog-post_01.html
২. দলবাজী: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_09.html 
৩.  স্যারদের দলবাজী...: http://www.ali-mahmed.com/2009/12/blog-post_19.html

6 comments:

জয় said...
This comment has been removed by a blog administrator.
।আলী মাহমেদ। ali mahmed । said...

মনে আছে আপনার কথা। আহ, সামুর সেইসব সোনানী দিন! আপনি আগের মতই মারদাঙ্গা আছেন দেখছি :)। থাক, মারপিটে কাজ নেই।

আপনার মন্তব্য কেন মুছে দিলাম আশা করি আপনি বুঝবেন। ভাল থাকুন। আমার মত অভাজনের প্রতি আপনার এই মায়া মনটা অন্য রকম করে দেয়...@জয়

admin said...

joyki sorkarke gali disilen?

eisob kahini shunle desh chere palate iccha kore!

admin said...

offtopic
জীবিকা নির্বাহের জন্য কী করেন?

জয় said...

হেঃহেঃ হেঃ,সরকাররে গালি দেই নাই ওই মাকসু ডাক্তাররে নিয়া কইছিলাম। কি কইছিলাম হেইডা লেখলে কমেন্টো আবারও ডিলিট খাইব। offtopic কারে কইলেন, আমারে?

admin said...

na.mahmedke bolsilam.apni ki koen joy?