Wednesday, March 31, 2010

কর্ণেল এবং সান্তিয়াগো

গেব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের অসাধারণ একটা বই 'নো ওয়ান রাইটস টু কর্ণেল'। বইটি ছাপা হয় ১৯৫৮ সালে। মার্কেজকে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয় ১৯৮২ সালে।

কর্ণেল নামের চরিত্রটি জীবনের প্রায় শেষ প্রান্তে চলে এসেছেন। জীবনযুদ্ধে লড়ছেন মর্যাদার সঙ্গে, একপেট আগুন নিয়ে!
তিনি বছরের পর বছর ধরে নিয়ম করে পোস্ট আপিসে যান। যুদ্ধফেরত এই সৈনিক অপেক্ষায় আছেন সরকারের তরফ থেকে তার প্রাপ্য বুঝিয়ে দেয়ার চিঠিটার জন্য। চিঠির জন্য অপেক্ষা কিন্তু কেউ কর্ণেলকে লেখে না! এক অনিশ্চিত অপেক্ষা!
তাঁর হাহাকার করা কথাগুলো এমন, "আমার সব সহযোদ্ধারাই চিঠির জন্য অপেক্ষা করতে করতে মারা গেছে।"

তাঁর সঙ্গে তাঁর স্ত্রীও আশায় বুক বাঁধেন। কর্ণেল পত্মীর একসময় এই অপেক্ষা, শব নিয়ে অপেক্ষার চেয়েও দীর্ঘ মনে হয়। তিনি কর্ণেলের কাছে জানতে চান আগামী এই অপেক্ষার দিনগুলো কাটবে কেমন করে।
কর্ণেল পত্মী আবারও জানতে চান, খাব কি?
কর্ণেল উত্তর দেন, গু!

মার্কেজের সৃষ্ট এই চরিত্রটির সঙ্গে অনেকখানি মিল খুঁজে পাওয়া যায় আর্নস্ট হেমিংওয়ের 'দি ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সী'-র সেই বুড়ো সান্তিয়াগোর সঙ্গে। হেমিংওয়ে ১৯৫৪ সালে নোবেল পুরস্কার পান। নোবেল কমিটি সাহিত্যে তাঁর অবদান উল্লেখ করতে গিয়ে
'দি ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সী'-এর কথা উল্লেখ করেন:
"His vigorous art and the influence of his style on the literary art of our times as manifested in his book 'The Old Man and the Sea'..."


হেমিংওয়ের অমর সৃষ্টি বুড়ো সান্তিয়াগো। অমর সেই সংলাপ, "...মানুষ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে কিন্তু পরাজিত কখনও হয় না।"
বুড়ো জেলে সান্তিয়াগো। যখন সবাই তাঁকে বাতিলের খাতায় ফেলে দিয়েছে। তখনও বুড়ো স্বপ্ন দেখে, এক অদেখা স্বপ্ন! ৮৪ দিনেও একটিও মাছ পায়নি সে। ৮৫ দিনের মাথায় ১৮ ফিট লম্বা বিশাল এক মার্লিন মাছ ধরা পড়ে তাঁর বড়শিতে। শুরু হয় এক অন্য রকম লড়াই।
উত্তাল সমুদ্র, দানবীয় মাছ, ক্ষুধা-পিপাসার সঙ্গে টিকে থাকার যুদ্ধ। মাছের লোভে হাঙরের মিছিল। আমার ধারণা, সমুদ্র এখানে রূপক অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে, আসলে প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ। কারণ বুড়ো সান্তিয়াগোর প্রকৃতির সন্তান মাছটার প্রতি মমতার কমতি নেই। বুড়ো বলছে, "...মাছটাকে খাওয়াতে পারলে ভাল হতো...।"
আবার এও বলছে, ...মাছ, তোমার সঙ্গে আমি আমৃত্যু লড়ে যাব...।"

বুড়ো কর্ণেল এবং বুড়ো সান্তিয়াগোর মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে, শেষঅবধি কর্ণেলের স্বপ্ন-লড়াইটা সম্বন্ধে জানা যায় না কিন্তু সান্তিয়াগো লড়াই শেষ করে। হাঙরের মুখ থেকে ছিনিয়ে বিশাল সেই মাছটাকে তীরে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়, যদিও তখন মাছটার কন্ঙ্কাল ব্যতীত আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। তাতে কী, বুড়ো সান্তিয়াগো একাই লড়াই চালিয়ে তাঁর অদেখা স্বপ্নকে হাতের মুঠোয় আটকে ফেলে।

কর্ণেল এবং সান্তিয়াগো এই দুই দুর্ধর্ষ লড়াকু আর কিছুই না।
জীবনের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার এক স্বপ্ন। এই স্বপ্নই আমাদের বাঁচিয়ে রাখে।
আমি বিশ্বাস করি, "একজনকে মেরে ফেলা যায় কিন্তু তার স্বপ্নকে মেরে ফেলা যায় না। সেই মানুষটার গলিত শব থেকে বেরিয়ে আসে এক প্রাণ, তাঁর সেই অদেখা স্বপ্নকে হাতের মুঠোয় আটকে ফেলে। যারা এই স্বপ্নগুলো দেখতে পায় না তারা ভোরের ঠিক আগমুহূর্তে হাল ছেড়ে দিয়ে মারা যায়।

1 comment:

our war criminals said...

ভালো লাগলো...লিখাটা পড়ে সাথে সাথে ফেইসবুক এ শেয়ার দিলাম।এবং লেখক কে সার্চ করে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট দিলাম।
ধন্যবাদ