Saturday, February 28, 2009

দানবের হাতে ক্ষুর!

আমাদের দেশটা বড় বিচিত্র। আমরা লাগাই ধুতুরা গাছ, প্রবল আশায় থাকি এটায় ধরবে আম!
গোটা দেশে, সম্ভবত ৩টা জেলা ব্যতীত, সবগুলো জেলায় একসঙ্গে, প্রায় একই সময়ে বোমা ফাটায় জঙ্গিরা- আমরা কেউ কিচ্ছু জানি না। সরকারের গোয়েন্দা বিভাগের দুঁদে-চৌকশ লোকজনরা টেরটিও পেলেন না। ভাগ্যিস, জঙ্গিরা এদের আন্ডার গার্মেন্টস খুলে নিয়ে যায়নি!

দানব বানাবার কারখানা খুলে, দানবের হাতে কেন ক্ষুর এই প্রশ্ন রসিয়ে রসিয়ে করা যায় বটে কিন্তু উত্তর দেবে কে?
দিনে-দিনে, ফোঁটায় ফোঁটায় জমে উঠা বিডিআরদের ক্ষোভ, ডাল-ভাত কর্মসূচি, বেতন বৈষম্য, চেইন অভ কমান্ডে গলদ; কেউ টেরটিও পায়নি-
কেমন করে এটা সম্ভব? প্রধানমন্ত্রী এর আগের দিন পিলখানায় গেলেন তখন লিফলেট বিলি করা হয়েছিল, কেউ গা করল না কেন?
আমার ধারণা, গোয়েন্দা বিভাগে টোকাইদের ভর্তি করলে এরা অনেক ভাল কাজ করে দেখাতে পারত।
নাকি গোয়েন্দারা তাঁদের অর্পিত দায়িত্ব পালন করেছেন ঠিকই; উপরওয়ালারা (উপরওয়ালা বলতে আমি ঈশ্বরের কথা বলছি না, যারা দেশটার চাকা বনবন করে ঘোরান)গা করেননি, রিপোর্টগুলো সর্দি মুছে ফেলে দিয়েছিলেন।

এমনিতে কেন আমরা বিস্মৃত হই, আর্মি-বিডিআর আর আম-জনতা সবাই এই দেশেরই সন্তান। হাতের পাঁচ আঙ্গুলের মত- কোন আঙ্গুল খাটো, কোনটা লম্বা এই যা। সামরিক লোকজনদের আমরা বিশেষ পছন্দ করি না, জনতাকেও এরা পছন্দ করেন না। কেন এমনটা হয়? কেন আমরা এদের চোখে সিভিলিয়ান থেকে ব্লাডি সিভিলিয়ান হয়ে যাই! এ সত্য চোর-চোট্টায় দেশটা ভরে যাচ্ছে কিন্তু কোথায় এর ছাপ নেই!

আরেকটা বিষয় আমাকে হতভম্ব করেছে। বিভিন্ন ওয়েব-সাইটে ঘুরে ঘুরে দেখেছি, স্পষ্টত ২টা ভাগ। যেন টকটকে লাল একটা আপেলকে কেটে দু-ভাগ করা হয়েছে, কেউ আর্মির পক্ষে তো কেউবা বিডিআরের পক্ষে- লাশের পাশে খুব কম মানুষ। এটাও সম্ভবত অমাদের বৈশিষ্ট, জন্মের পর থেকেই আমাদের বিভাজন শুরু হয়। বাচ্চাটা মানুষের না প্রানীর, হিন্দু না মুসলমান? ক্রমশ বড় হলে কোন দল, কোন এলাকার? এ থেকে আমাদের মুক্তি নাই- স্বাধীন দেশে পরাধিন মানুষ দলবাজির শেকলে বাঁধা। যারা কোন বিশেষ পক্ষে নাই তাদের চেয়ে অভাগা আর কেউ নাই।

এটা কেন আমি একজন মানুষের কাছ থেকে একজন মানুষের আচরণ আশা করতে পারব না। (এই অপমান কেমন করে ভুলি, আমাকে অনাহুতের মত গেইটে ঘন্টার পর ঘন্টা বসিয়ে রাখা হয়েছে। ক্যাপ্টেন নামের মানুষটা আমার সামনে বসে চা খাচ্ছেন অথচ এক কাপ চা আমাকে অফার করা হয়নি। অথচ আমি আমার সত্য একটা দাবি নিয়ে গিয়েছিলাম এবং তার এক সিনিয়রের কথামতে। পরবর্তীতে কেন এই অপরাধে আমার উপর খড়গ নেমে আসবে। অবশেষে নিরুপায় আমাকে হাইকোর্টের কব্জা নেড়ে বাঁচতে হবে?)
কিন্তু কেন আমরা ভুলে যাব সেই হাতের আঙ্গুলের কথা, এরাই কেউ না কেউ আমাদের স্বজন-বন্ধু। আমাদের স্বজনের, বন্ধুর লাশ এভাবে পড়ে থাকবে আর আমরা অতীতের ক্ষোভ পুষে রাখলে দানবের সঙ্গে আমাদের পার্থক্য রইল কই!


আমি বলছি না এটা, ইউনিফর্ম গায়ে দিয়ে একেকজন ভাঁড়ের আচরণ করুক কিন্তু রোবট হওয়ার অবকাশ কোথায়, হতে হবে কেন? শিক্ষা নেয়া যেতে পারে এখান থেকে, থাইল্যান্ডের আর্মিদের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল, হাসিমুখে থাকার জন্য যেন জনতা তাদের কাছাকছি ভাবে।



সামরিক-বেসামরিক লোকজনরা প্রতিপক্ষ হয় কেমন করে?
প্রবাসে সামরিক অল্প ক-জন মারা গেলে বুক ভেঙ্গে কান্না আসে, জাতীয় শোকদিবস থাকে। তা থাকুক, আমরা দোষ ধরছি না কিন্তু বেসামরিক ৩০০জন যাত্রী নিয়ে লঞ্চ ডুবে গেলে তাদের স্বজনদের চোখ ভরে আসে না বুঝি? কী হেলাফেলা ভঙ্গিতে মৃতদেহগুলোকে আমরা পশুর খাবার হতে দিয়েছি! সেই লঞ্চ উদ্ধারের ন্যূনতম চেষ্টাও হয়নি।

কে ভাল কে মন্দ সেই বিচারে এখন আমি যাচ্ছি না। এমন আর্মি অফিসারও আছেন যিনি একটা ফোন করে সরকারি কোষাগারে ৩ কোটি টাকা জমা করিয়ে সিনিয়র অফিসারের লাল চোখ দেখেছেন। কুখ্যাত সন্ত্রসীকে ছেড়ে দেয়ার জন্য ২ কোটি টাকা পায়ে ঠেলে ফেলেছেন।
পাশাপাশি বিডিআরদেরও দেখেছি অল্প কয়েকজন জওয়ান প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে, প্রাণ বিসর্জন দিয়ে তার চৌকি রক্ষা করেছেন (পদুয়া, রৌমারি)। শত-শত অহংকারি বিএসএফকে আটকে দিয়েছিলেন। পুরস্কৃত করার বদলে এই বীরদের আমরা বাধ্য করেছিলাম নতজানু হতে। চীফের চাকরি যায়-যায়।


এই দেশটার মত হতভাগা আর কেউ নাই। যতক্ষণ পর্যন্ত তার সন্তানদের রক্ত না ঝরবে ততক্ষণ পর্যন্ত তার সন্তানদের অধিকার আদায় হবে না। শিক্ষাঙ্গন বলুন আর রাজপথ। মসজিদও বাদ থাকেনি, জুতাজুতি করে অধিকার আদায় করতে হয়। ওই যে বললাম, বিভাজন শুরু হয় জন্মের পর থেকেই, মুসুল্লিরাও কোন দলের এটা বা বাদ থাকবে কেন?



পুলিশের বেতন সংস্কার প্রস্তাব বছরের পর বছর ধরে ঝুলে আছে। পুলিশের আই জি নিদারুন বেদনায় বলতে বাধ্য হয়েছিলেন, 'প্রস্তাব গেলেই আটকে যায়, এই জট আর খোলে না'।
বলতে বুক কাঁপে কিন্তু আমরা কী পুলিশ বিভাগেও এমন একটা ঘটনা ঘটার অপেক্ষায় আছি। পরে জনে জনে বলে বেড়াব, 'দানবের হাতে ক্ষুর কেন'?
এমনটাই চলবে। অভাগা আমরা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখব।


..........................................

সত্রাসে আজ অনেকে পরীক্ষা দিয়েছে। ১ দিনের জন্য চলতি পরীক্ষা পিছিয়ে দিলে প্রলয় শুরু হয়ে যেত বলে আমি মনে করি না। যায় যদি যাক প্রাণ, কেজি দরে প্রাণ- অভাগা দেশের শস্তা প্রাণ! আজ যদি কোন পরীক্ষার্থীর প্রাণ যেত আমরা উপরের দিকে মুখ তুলে বলতাম, আফসুস, হায়াত আছিল না।

এরিমধ্যে ২দিন চলে গেছে।
এই পোস্টের সঙ্গে ছবিটা দেখে আমার বুকটা হাহাকার করে উঠে। লাশ নামের মানুষটার গায়ের এই ইউনিফর্মটা খুলে ফেললে যে শরিরটা পড়ে থাকবে সেটা আমার সঙ্গে হুবহু মিলে যাবে এতে সন্দেহ নাই!

এখন যেটা ঘটে গেল এটার চেয়ে ভয়াবহ, অসহ্য আর কিছু হতে পারে না। আমার সহ্য হচ্ছে না। এতগুলো প্রাণ...! আমি কায়মনে প্রার্থনা করছি, হে পরম করুণাময়, আর যেন এক ফোঁটা রক্ত না ঝরে। যে প্রাণগুলো বিনষ্ট হল তাদের মধ্যে নিরপরাধ যারা, কে ফিরিয়ে দেবে তাদের? শিশুদের চোখ থেকে কেমন করে মুছে ফেলা যাবে তীব্র আতংক!

শিশুটি কী সামরিক নাকি বেসামরিক বাবা-মার সন্তান, এ প্রশ্ন বৃথা। শিশুটি আজীবন ফাঁকা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকবে তার বাবা-মার ছবির দিকে।
একদা বড় হবে। বাবা-মার কাপড় হাতড়ে খুঁজে ফিরবে স্বজনের গায়ের গন্ধ। হায়, কোথায় সেই ঘামের গন্ধ, নাকে ভক করে লাগবে ন্যাপথলিনের ঝাঁঝালো গন্ধ!

প্রিয়মানুষ হারানো বধুর হাতের মেহেদী রং সামরিক নাকি বেসামরিক এই তর্ক থাকুক পশু-মানবের জন্য।
এই মানুষটার চোখের জলের সঙ্গে কী জলপাই রং মেশে?
মানুষটা কোন প্রতিষ্ঠানের ইউনিফর্ম পরে আছে তাতে কী আসে যায়? পৃথিবীর এই একটা ভাষা হুবহু এক। কেউ হাউমাউ করে কাঁদে, কেউ চোখ চেপে। এই পার্থক্য!

এখন আমি পুরোপুরি বিভ্রান্ত- পাগল পাগল লাগছে নিজেকে। ক্ষোভের প্রকাশ এমনটা হতে পারে আমি বিশ্বাস করি না। মিছিলের মত আসছে লাশের পর লাশ- কোন অন্যায় বাদ থাকেনি।
মাথায় কেবল ঘুরপাক খাচ্ছে, এত মৃত্যু কেন- এত নৃশংসতা কেন? অতীতেও অনেক চৌকশ মানুষ 'সামরিক লাশ' হয়ে গেছে- সঠিক সত্যটা আমাদের জানা হয়নি। এবারও কী তাই হবে, কে জানে!

মাননীয় প্রতিমন্ত্রী নানক সাহেবকে দেখলাম, বলছেন, 'ভেতরে লক্ষ-কোটি টাকা বিলি করা হয়েছে'। তাও উম্মুক্ত হ্যান্ড-মাইকে!! এত দ্রুত এমন বক্তব্য আমার বোধগম্য হচ্ছে না। খোলা রাস্তায় এইসব বলার কোন প্রয়োজন ছিল কী!
ধরে নিলাম সত্য কিন্তু অফিসারদের বিরুদ্ধে সৈনিকদের এই সেন্টিমেন্ট কাজে লাগাবার সুযোগ আমরা দিলাম কেন? জানলাম না কেন? কে নেবে এর দায়?

আরেকটা বিষয় নিয়ে আমার মনে হচ্ছে, জানি না কতটুকু যথার্থভাবে এই তদন্ত হবে কিন্তু আমি প্রবলভাবে চাইব এই টিমের সাথে অন্তত একজন যেন মনোবিদ থাকেন। যিনি এই চলমান দানবদের মস্তিষ্ক আতালি-পাতালি করে খুঁজে দেখবেন, উঁকি দেবেন; কোন পর্যায়ে গেলে একজন মানুষ এই পর্যায়ে নেমে আসে- কোন নিতলে এর উত্স। একজন মানুষের ভেতরে লুকিয়ে খাকা পশুটা কেমন করে অবলীলায় বের হয়ে আসে।

অন্য রকম পশুত্ব দেখেছি মিডিয়াকে, এরা লাশ নামের একেকজন মানুষকে এমনভাবে দেখিয়েছে যা বর্ণনার বাইরে। এদের সামান্যতম বিবেক বোধটুকুও নাই যে ছবিগুলেতে সামান্য আড়াল ব্যবহার করা প্রয়োজন। এটা এদেরকে শেখাতে হবে কেন? ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলো তো নানা কায়দা-কানুন করে আমাদেরকে শেখাতে উদগ্রীব হয়ে থাকে। মিডিয়ার প্রয়োজন রগরগে খবর, ক-টা প্রাণ গেল সেটা আলোচ্য বিষয় না

আমাকে আরও যা বিভ্রান্ত করেছে, একটা ওয়েব-সাইটে একজন তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। ভাগ্যিস আমাকে দালাল বলেন নাই।
আজব, মানবতার পক্ষে কথা বলাও দোষের! হা ঈশ্বর!

আহা, যারা কোন দলে নাই তারা বড় অভাগা। খাপছাড়া- ভুল সময়ে ভুল মানুষ! এদের যাওয়ার কোন জায়গা নাই- এদের জন্য ইচ্ছামৃত্যুর অপশনটা থাকলে বেশ হত।

ছবিঋণ: প্রথম ছবি, 'ফোকাস বাংলা', ২য় ছবি: অজ্ঞাত (অজ্ঞাতের সূত্র পাইনি বলে ক্ষমা প্রার্থনা করি, এটা আমার ব্যর্থতা।)

No comments: