Monday, January 2, 2012

হাসপাতাল পর্ব, বারো: বর্জ্য

­আমরা হাতি কিনি কিন্তু হাতির খাবারের কথা চিন্তা করি না কারণ জাতি হিসাবে আমরা বড়ো হুজুগে! চিন্তার দৌড় আমাদের বড়ো সীমিত!
যেমন ধরা যাক, এই যে আমরা রাশিয়ার সঙ্গে শলা করে নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করতে যাচ্ছি কিন্তু এই চুল্লি থেকে যে তেজস্ক্রিয় বর্জ্য থেকে যাবে তার বিষয়ে আমাদের পরিষ্কার করে কোনো ধারণা নাই।
এই বর্জ্য কি রাশিয়া নিয়ে যাবে নাকি এটা আমাদের দেশের কোনো অংশে ফেলে দেয়া হবে এটা আমরা জানি না!
রাশিয়া এটা এখন ভাসা ভাসা স্বীকার গেলেও শেষপর্যন্ত
কি এই চুক্তিতে অটল থাকবে? আদৌ কি মূল চুক্তিতে এর সুস্পষ্ট উল্লেখ থাকবে? সম্ভবত মাথাওয়ালা লোকজনেরা জানেন নিরীহদর্শন এই বর্জ্য কিন্তু আমরা জানি এই বর্জ্য থেকে তেজস্ক্রিয়তা ছড়াতে থাকবে। আমরা এও জানি অন্তত ১০ হাজার বছর ধরে এই বর্জ্য থেকে তেজস্ক্রিয়তা ছড়াতে থাকবে। বিশেষ ব্যবস্থায় সংরক্ষণ করে রাখতে হবে অন্তত ১০ হাজার বছর!

আসলে বর্জ্য নিয়ে আমরা বড়ো উদাসীন! সে নিউক্লিয়ার বর্জ্য হোক বা মানুষের বর্জ্য। কে জানে কেন আমরা এই বর্জ্য জিনিসটাকে খাটো করে দেখি! মানুষ স্বর্গে হয়তো পরম আনন্দেই থাকত যদি-না বর্জ্যসংক্রান্ত ঝামেলাটা হতো [১]
এই বিষয়টাকে কেন যে হেলাফেলা করা হয় আমি জানি না। গোপাল ভাঁড় আর রাজার কিচ্ছাটা কি আমরা ভুলে গেছি! রাজা ক্ষেপে গিয়েছিলেন। গোপাল রাজাকে মূত্রত্যাগের স্বস্তির মত নাকি ভালোবাসে। রাজার মুত্রের বেগ চাপলে গোপাল একবার এদিক আরেকবার ওদিক করে কালক্ষেপণ করছিলেন আর রাজামশায়ের ব্লাডার ফেটে যায় যায় অবস্থা। অবশেষে রাজা যখন মূত্রত্যাগ করলেন তখন গোপালের কথার মূল সুরটা ধরতে পারলেন। এর আগপর্যন্ত গোপালের কথা রাজার কাছে কাঁইমাই-দুর্বোধ্য মনে হচ্ছিল!

খানিক লক্ষ করলে দেখা যাবে বিশাল একটা মার্কেট করা হবে কিন্তু একটা টাট্টিখানা, হালের টয়লেট খুঁজে পাওয়া যাবে না। পাওয়া গেলেও তালা মারা। আজিব, এরা যুক্তি দেখায় পাবলিক নাকি নষ্ট করে ফেলে। আরে, ওখানে পাবলিক যায় কেন? নৃত্য করার জন্যে!
এরা আরও বলে হেনতেন নাকি চুরি হয়ে যায়। আবে শ্লা, পাবলিক ওখানে কি অনাচারটা করে, শুনি? একখাবলা জিনিস নিয়ে দৌড় মারে?

ক-বছর আগের কথা। রাতের ট্রেনে ঢাকা গেছি। আমার সেলফোনের ওয়ারেন্টিসংক্রান্ত একটা ঝামেলার কারণে। চরম একটা বোকামি করেছিলাম, ট্রেন থেকে নামার পূর্বে ব্লাডার হাল্কা না করে! তো, ওই ফোন কোম্পানির সার্ভিস সেন্টারটা ঝাঁ চকচকে- পশ একটা অফিস।
অফিসের অতি চৌকশ একজনকে যখন জিগেস করলাম, ভাই আপনাদের ওয়শরুমটা কোন দিকে। তিনি বিমলানন্দে জানালেন এখানে এর ব্যবস্থা নাই। আমি ঝিম মেরে রইলাম, এই ব্যাটা বলে কী!
আমার পরিচিত সবাই বলে থাকেন ব্রেন নামের জিনিসটা আমার নাই কিন্তু আমি এঁদের সঙ্গে একমত না কারণ একচামচ ব্রেন আমার না-থেকে পারেই না। এটা প্রমাণ ওদিনই পেয়েছিলাম। কারণ তখন আমার মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকল, এই যে সারাদিন এরা অফিস করে, এরা কি এদের ফুটোগুলোয় ছিপি লাগিয়ে রাখে? নিশ্চয়ই নতুন সিস্টেম চালু হয়নি, বাওয়া।
আমি এবার বললাম, ভাই, আপনাদের ব্যবস্থা কি? তিনি জানালেন, আমরা স্টাফদের জন্য ওয়শরুম আছে কিন্তু গেস্ট এলাউ না।

উত্তেজিত হলে আমার কথা জড়িয়ে যায় এটা আমি বিলক্ষণ জানি কিন্তু সহ্যাতীত রাগ হলে কি যে হয়ে যায় আমি জানি না তখন কিন্তু গুছিয়ে কথা বলতে আমার মোটেও সমস্যা হয় না। আমি সহজভঙ্গিতে বললাম, আচ্ছা, ভাই, আপনাদের এই অফিসের ছাদে যাওয়ার ব্যবস্থা নাই।
তিনি বললেন, আছে তো কিন্তু ছাদে যাবেন কেন?
আমার লেখালেখির শপথ, আমি স্থির চোখে তাকিয়ে বলেছিলাম, মুতব।

মসজিদেও একই অবস্থা। মুসুল্লি ব্যতীত অন্য কেউ গেলেই দায়িত্বশীল মানুষদের মুখ অন্ধকার হয়। প্রায়শ এরা সাফ না করে দেন।
এই সব ধার্মিক মানুষদেরকে কি আমি এটা মনে করিয়ে দেব?
"...আবু হোরায়রা (রাঃ) বর্ণনা করিয়াছেন, এক বদু (বেদুইন) নবী (সাঃ)-এর মসজিদে আসিয়া এক কোনে বসিয়া প্রস্রাব করিতে লাগিল। সকলেই বদুকে ধমক দিতে আরম্ভ করিলে নবী (সাঃ) তাহাদিগকে নিষেধ করিলেন এবং বলিলেন, এই অবস্থায় তাহাকে বাধা দিও না।..."(বোখারি শরীফ)

এমনকি লেখক মহোদয়গণও এই সব বিষয় নিয়ে লিখতে আরাম পান না। ছ্যা, গু-মুত নিয়ে লিখে আবার বুঝি জাতে উঠা যায়! সৈয়দ আবুল মকসুদ যখন 'নরমূত্র' নিয়ে লিখেছিলেন তখন আমার মুগ্ধতার শেষ ছিল না। তবে অনেকখানি দ্বিমতও ছিল [২]

অনেক হলো তবলার ঠুকঠাক এবার গলা ছেড়ে গান গাইবার পালা। আজ আমার নিজের কাছেই অবিশ্বাস্য মনে হয়, ন্যাশনাল হাসপাতালে (এটা মেডিকেল কলেজও) আমি যে ক-দিন ছিলাম এর প্রথম ৪ দিন 'বড়ো বাথরুম' করতে পারিনি। ভাবা যায়! একজনের পরামর্শে ৪ দিন পর কাছেই একটা পাবলিক টয়লেট খুঁজে পেয়েছিলাম। পরিষ্কার কিন্তু এটার অবস্থাও নড়বড়ে। নিম্নবিত্তের লোকজনেরা ব্যবহার করেন তবুও আমার কাছে মনে হয়েছিল স্বর্গ হাতে পেয়েছিলাম। অন্তত পানির ব্যবস্থা ছিল আর দরোজা ধরে কেউ টানাটানি করে বলত না, ওই-ওই, জলদি বাইর হন।
হাসপাতালের টয়লেটগুলোর যে অবস্থা এর বর্ণনা আমি আগের লেখায় দিয়েছি। ওই লেখায় আমি লিখেছিলাম,
"...উপচে পড়া থইথই পানিতে (কোনো সহৃদয় ইট বিছিয়ে দিয়েছিল, এটাও পানিতে ডুবে গেছে) এই মেঝে মাড়িয়ে যেতে আপনার স্যুটে লাগেনি তো? স্যার ভেতরের হলুদ ফুলগুলো দেখেছেন তো?..." [৩]
আজ আনন্দের সঙ্গে এটাও বলি, মহাপরিচালক মহোদয় এই কর্মকান্ড করে ফেরার পর তাঁকে একখানা ক্রেস্ট দেয়া হবে, যাতে লেখা থাকবে, 'হে বীর, লহ মোর সালাম'। এবং সঙ্গে দশ হাজার টাকা। ক্যাশ।

 তর্কের খাতিরে না-হয় ধরেই নিলাম পুরনো ভবনটা যখন করা হয়েছিল তখন এতোটা ভাবা হয়নি। কিন্তু ন্যাশনাল হাসপাতালের পাশেও এদেরই আরেকটা ঝকঝকে নতুন বহুতল বিল্ডিং কিন্তু এখানেও একই অবস্থা। এরা একবারও ভাবলেন না যে রোগিদের জন্যই কেবল ব্যবস্থা রাখলে চলে না। রোগিদের সঙ্গে আসা হাজার-হাজার মানুষদেরও টয়লেট নামের এই জিনিসটার প্রয়োজন হয়। এদের গতি কী! এই সব বুদ্ধিশূণ্যদের কাছে এই প্রশ্ন করা যেতে পারে কিন্তু লাভ কী!

আইন বড়ো বিচিত্র, কাউকে সামান্য শারীরিক যন্ত্রণা দিলে এর প্রতিরোধে কতশত আইন কিন্তু এই সব নির্বোধদের সো কল্ড 'হাগু-মুতু' নামে তাচ্ছিল্য করে একজন মানুষকে তীব্র শারীরিক কষ্ট দেয়ার পরও কোনো আইনেই এদের স্পর্শ করার ক্ষমতা নাই।

নাই, সত্যি নাই? কি জানি! আমি আকাশপানে তাকিয়ে এটা জোর দিয়ে বলতে পারি না...।

*হাসপাতাল পর্ব, এগারো: 'পেপার বিছানা': http://www.ali-mahmed.com/2011/12/blog-post_28.html

**সবগুলো পর্ব: http://tinyurl.com/boya6xk 

সহায়ক সূত্র:
১. তিনি...: http://www.ali-mahmed.com/2009/09/blog-post_18.html
২. নরমূত্র এবং মূত্র বিসর্জন: http://www.ali-mahmed.com/2011/02/blog-post_09.html
৩. হাসপাতাল মহাপরিচালক, সম্মানপূর্বক...: http://www.ali-mahmed.com/2011/12/blog-post_26.html

1 comment:

Anonymous said...

মুতব,,,,হাঃহাঃহাঃ। কুনু দিন আপনার নাগাল পাইলে পা ধইরা সালাম করব আমি ও শপথ করলাম,