Monday, March 30, 2009

শিশু-পশুটার মুখোমুখি

মুহম্মদ জাফর ইকবাল 'মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস'-এ যুদ্ধের গ্লানি পর্বে উল্লেখ করেছেন, "...মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশে বসবাসকারী বিহারীরা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পক্ষে থেকে এক ধরনের অমানুষিক নৃশংসতায় বাঙালীদের নির্যাতন নিপীড়ন আর হত্যাকান্ডে অংশ নিয়েছিল। তাদের নৃশংসতার জবাবে মুক্তিযুদ্ধের আগে, পরে এবং চলাকালে অনেক বিহারীকে হত্যা করা হয়, যার ভেতরে অনেকেই ছিল নারী, শিশু কিংবা নিরপরাধ..."।

জাফর ইকবালকে আমি আবারও কুর্নিশ করি, আমাদের এই অন্ধকার দিকটা তুলে ধরার জন্য। আমরা এই বিষয়গুলো ঠান্ডা মাথায়, সযতনে এড়িয়ে চলি। কিন্তু এই বিষয় নিয়ে আলোচনা, জানাটা অপরাধ না। এটা জ্ঞান। অন্ধকারকে বিস্মৃত হওয়া মানে হচ্ছে ক্রমশ আপাদমস্তক অন্ধকারে নিমজ্জিত হওয়া।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লিখতে গেলে একাধারে হওয়া প্রয়োজন নির্মোহ। ভাবনাটা নির্মেদ। একজন নিরাসক্ত দৃষ্টিতে ইতিহাস লিখবেন, আবেগে ছাপাছাপি হলেই সেটা আর যাই হোক ইতিহাস থাকে না, এক ধরনের ফিকশন হয়ে উঠে। সত্যর গর্ভে ফিকশনের জন্ম! এতে কেবল প্রজন্মকে দিকভ্রষ্টই করা হয়।
এ অন্যায়, ঘোর অন্যায়!




ইতিহাস লিখলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালিন সময়ে আমাদের দ্বারা যেসব অন্যায় হয়েছে সেসবও আসতে হবে বৈকি, নইলে তা হবে বিকলাঙ্গ একটা ইতিহাস! ইতিহাসে আবেগ মেশালে সেটা আর যাই হোক ইতিহাস থাকে না।
কোন পরিস্থিতিতে এই অন্যায়গুলো হয়েছিল সেই তর্ক এখন না-হয় নাই করলাম। কিন্তু এই অন্যায়গুলোকে প্রশ্রয় দেয়ার মানে হচ্ছে নিজে একজন অন্যায়ের প্রশিষ্য হওয়া। নইলে পাকসেনার নৃশংসতাকে আমরা ছাড়িয়ে যাব।
বা লেন্দু উপজাতি আর আমাদের মধ্যে খুব একটা তফাৎ থাকবে না। লে
ন্দুদের নিয়ে বিস্তারিত বলি না, বীর জাতি কিন্তু...। কেবল ২টা ছবি দেখে সহজেই অনুমেয়। লেন্দু উপজাতিদের যুদ্ধের নমুনা: যে ২টা ছবি দিচ্ছি এগুলো দুর্বলচিত্ত কারও না দেখাই ভাল। বারণ করি। সতর্কতার জন্য ছবিগুলো পোস্টের একেবারে নীচে দিচ্ছি।

একটা ওয়েব-সাইটে লেখালেখি করার সময়ে বিহারীদের নিয়ে একটা পোস্ট দিয়ে তোপের মুখে পড়েছিলাম। প্রতিক্রিয়া ছিল তীব্র, অতিরিক্ত তীব্র। কেউ কেউ ঠারেঠোরে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন আমি একটা রাজাকার। এই হয়েছে এক বিপদ, দুম করে কাউকে রাজাকার বলে দেয়া- বয়সটা রাজাকার হওয়ার জন্য যথেষ্ঠ কিনা এসব নিয়ে মাথা ঘামাবার আবশ্যকতাও নাই! এবং এটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ- তাঁদের বিনীত ভঙ্গিতে বলি, ইচ্ছা হলেই কাউকে রাজাকার বলা যায় না।

বিহারীদের মধ্যে অনেকে এই দেশের পক্ষে ছিলেন, যুদ্ধ করেছেন এমন উদাহরণের অভাব নাই। এখানে উল্লেখ করা যায়, বিহারী, বীর প্রতীক সৈয়দ খানের কথা। তার ভাষায়, 'এই দেশকে হামি কবুল করিয়ে লিয়েছি'। এই মানুষটার কথা এই দেশ মনে রাখেনি। তাঁকে ন্যূনতম অধিকারের ব্যবস্থা করা হয়নি। অথচ এই মানুষটিকে তাঁর পরিবারের সবাই ফেলে চলে গেছে কিন্তু তিনি এই দেশের মায়া কাটাতে পারেনি! কচ্ছপের মতো এখনও এই দেশের মাটি কামড়ে পড়ে আছেন!

আবেগ থাকা ভাল কিন্তু এতটা না যেটা মানুষকে অন্ধ বানিয়ে দেয়! এই রকম অন্ধ হলেই সম্ভবত এমনটা বলা যায়! অনেককে বলতে শুনি, একজন মুক্তিযোদ্ধা কখনও অন্যায় করতে পারেন না। তার মানে কী, মুক্তিযোদ্ধাদের কী আসমানি মানুষ বানিয়ে দেয়া হচ্ছে? মুক্তিযুদ্ধকে আর যাই হোক আসমানি কিতাব বানাবেন না,
মুক্তিযোদ্ধাদের আসমানি মানুষ। দয়া করে আমাদের এই প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে পড়তে দিন, বুঝতে দিন, বুকে আগলে রাখতে দিন, আবেগে থরথর করে কাঁপতে দিন।

*ভিডিও ক্লিপিং, কৃতজ্ঞতা: nbc news




*ছবিঋণ: কঙ্গো, নরখাদক ও পিগমিদের দেশে। মেজর মো: হাবিবুল করিম

No comments: