Friday, June 29, 2007

অপারেশন জ্যাকপট

…আমার ক্যাম্পে আগত অফিসার বললেন, আমি কয়েকজন নিপুন সাতারু বাছাই করতে চাই, তাদেরকে তরুণ এবং ভাল স্বাস্থ্যের অধিকারী হতে হবে। (পাক সৈন্যদের) নৌ পথে সৈন্য অন্যান্য সমর সরঞ্জাম পরিবহনের ব্যবস্থা বানচাল করা এবং নৌযানগুলে কে ধ্বংস করা।

অভিযানের সাংকেতিক নাম দেয়া হয় অপারেশন জ্যাকপট!

…২৮ জুলাই আমি ডেল্টা সেক্টরের কমান্ডিং অফিসার ভারতীয় সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার সাবেগ সিং এর সঙ্গে বসে চুড়ান্ত পরিকল্পনা তৈরী করছিলাম।

…চট্টগ্রাম বন্দর ও কর্নফুলি নদীর ম্যাপ ও চার্ট পর্যালোচনা করি। চন্দ্রতিথি, আবহাওয়ার অবস্থা, জোয়ার ভাটার সময় বাতাসের গতি প্রকৃতি, স্রোতের গতি এবং আরো অসংখ্য তথ্য আমাদের আলোচনায় প্রাধান্য লাভ করে।

…অপারেশনে আমাদের নৌ মুক্তিযোদ্ধারা কোথায় কোন ধরনের সমস্যার মোকাবেলা করবে অখবা পাক আর্মীদের অবস্থান ইত্যাদি। ১০ আগস্ট অপারেশন জ্যাকপট শুরু হয়। চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য ৬০ জন তরুণকে তিন ভাগে ভাগ করি। তিনটি গ্রুপেই সার্বিক কমান্ডে থাকবেন একজন কমান্ডার। তাদের সকলের কাছে থাকবে লিমপেট মাইন, এক জোড়া ফিন (সাতারের সময় পায়ে লাগানো হয়) এবং শুকনো খাবার। প্রতি তিনজনের কাছে থাকবে একটা করে স্টেনগান। গ্রুপ কমান্ডারকে দেয়া হলো হালকা অথচ শক্তিশালী ট্রানজিস্টার।

…তার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে, অল ইন্ডিয়া রেডিও কলকাতা কেন্দ্র থেকে প্রতিটি সঙ্গীত অনুষ্ঠান শুনতে হবে খুব মন দিয়ে। ওই সঙ্গীত অনুষ্ঠানের মাধ্যমেই জানানো হবে কখন অপারেশন শুরু করতে হবে!

…১৩ আগস্ট কলকাতা রেডিও থেকে প্রচারিত হলো বাংলা গান আমার পুতুর আজকে প্রথম যাবে শ্বশুরবাড়ী। এই গানটির মাধ্যমেই কমান্ডার প্রথম সংকেত লাভ করেন। তিনি জানেন ২৪ ঘন্টার মধ্যে দ্বিতীয় গান প্রচারিত হবে, ওই গান শোনার সঙ্গে সঙ্গে ট্রানজিস্টার ফেলে দিতে হবে, শুরু হয়ে যাবে অপারেশন জ্যাকপট!

…১৪ আগস্ট প্রচারিত হলো, দ্বিতীয় গান, আমি তোমায় যতো শুনিয়েছিলাম গান, তার বদলে চাইনি কোন দান। শুরু হয়ে গেল অপারেশন জ্যাকপট! গেঁয়ো পোশাক পরা একদল লোক ফলমুল মাছ, শব্জীর ঝুড়ি নিয়ে ফেরী নৌকায় উঠলো। পাক আর্মিও সন্দেহও করতে পারেনি, ওইসব ঝুড়ির নীচে আছে লিমপেট মাইন, ফিন, স্টেনগান!
…কিন্তু দূর্ভাগ্য, এই দলের অভিযান একদিন পিছিয়ে গেল- ৩ নং গ্রুপ ছাড়া সকলেই রাতের মধ্যেই চরলায় পৌঁছে গিয়েছিল। জেটিতে নোংগর করা পাক আর্মিদের এমভি আব্বাসে আছে ১০৪১০ টন সামরিক সরঞ্জাম। এমভি হরমুজ এ আছে ৯৯১০ টন সামরিক সরজ্ঞাম।
…মাথাটা পানির উপর রেখে আমাদের ছেলেরা পৌঁছে গেছে। তারা পাক আর্মির জাহাজগুলোতে লিমপেট মাইন লাগিয়ে দিয়েই নিঃশব্দে নদীর ভাটিতে ভেসে যায়।

…রাত ১টা ৪০ মিনিট। কান ফাটানো আওযাজে বন্দর নগরী কেঁপে ওঠে।

…১টা ৪৫। আরেকটি বিস্ফোরণ। তারপর তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম। একটির পর একটি বিস্ফোরনে চট্টগ্রাম তখন থরথর করে কাঁপছে।

…পাক আর্মির আল আব্বাস, হরমুজ দ্রুত ডুবতে থাকে! আশেপাশের জাহাজগুলো প্রচন্ড রকম তিগ্রস্থ হয়। একদিকে যেমন শত্রুর বিপুল সম্পত্তির, সমরাস্ত্রের ক্ষতি হয় তেমনি পাক আর্মিদের মিথ্যা দম্ভ এবং অহংকার, অহমিকা হয় চুর্ণ!

(একাত্তরের মার্চে রফিক-উল-ইসলাম সাবেক ইপিআর সেক্টর হেডকোয়ার্র্টার, চট্টগ্রামে ক্যাপ্টেন পদে সেক্টর এ্যাডজুটেন্টের দায়িত্ব পালন করেন।)
সূত্র: বাংলাদেশ স্বাধীনতা যুদ্ধ (১০ম খন্ড)। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে-মেজর (অবঃ)রফিক-উল ইসলাম, বীর উত্তম।
*আফসোস, এইসব দুর্ধর্ষ নৌকমান্ডোদের প্রতি সুবিচার, যথার্থ সম্মান দেয়া হয়নি।

No comments: