Search

Sunday, March 24, 2024

একজন 'মহা-লেখক' এবং আমার শপথ!

এ সত্য, আমার সমস্ত জীবনে অন-লাইন মিডিয়ার মিলিয়ন-মিলিয়ন শব্দের মধ্যে প্রিন্ট মিডিয়ায় লক্ষ-লক্ষ শব্দ ছাপা হয়েছে কিন্তু এখনও আমি নিজেকে লেখক বলে দাবী করি না। কারণ যে জিনিস আমার না তা আমি দাবী করব কেমন করে! কে লেখক কে লেখক না এটা ঠিক করেন পাঠক। পাঠককে খাটো করে দেখার কোন অবকাশ নাই কারণ একজন পরিণত পাঠক তাঁর গ্রে-মেটার ফ্লাওয়ার ভাসে রেখে কোন লেখকের লেখা পাঠ করতে বসেন না। এরা একেকটা ক্ষুরধার ব্রেন...!

সবিনয়ে বলি, লেখক অন্য জিনিস! এরা নিজের আনন্দের জন্য লিখেন কিন্তু আমি কেবল নিজের আনন্দের জন্যই লিখি না। পাঠক না- ছুঁয়ে দিলে, না-পড়লে সে লেখা কোন কাজের!

আর এই একটা কাজ ব্যতীত অন্য কিছুই যে পারি না, গো! আফসোস, সেই লেখালেখিটাও আমার হল না কারণ জীবনে আমি কোন কাজই গুছিয়ে শেষ করতে পারিনি। আশেপাশের সবার যখন একটা করে ক্যারিয়ার তখন আমার হাতে টিফিন-ক্যারিয়ার! ভারী অকাজের, বাতিল খাপছাড়া একজন মানুষ! নিজেকে আমার জেমস জয়েসের সেই ডেডোলাস চরিত্রের মত মনে হয় [*]। না-ঘারকা, না ঘাটকা!

এমনকি ধারাবাহিক লেখাগুলোও আর শেষ করা হয়ে উঠেনি। 'বৈদেশপর্ব ' [] অসমাপ্ত! তারচেয়েও বড় এক অন্যায়- 'হাসপাতালপর্ব ' [] শেষ করা হয়ে উঠেনি! আমার মা মারা গেছেন যুগ পেরিয়ে গেল কিন্তু 'হাসপাতালপর্বে ' ভদ্রমহিলা এখনও বিছানায় শুয়ে আছেন, বাড়ি ফেরার অপেক্ষায়। থাকুক অপেক্ষায়, অন্তত আমার অসমাপ্ত লেখায় তিনি বেঁচে থাকুন। আমি মারা যাব কিন্তু মা বেঁচে থাকবেন, এই-ই আনন্দ!

'ল্যাকক' ওরফে লেখক ('উঁচা পদের' লেখকদের আমি 'তমিজের' সঙ্গে ল্যাকক বলি) নিয়ে একটা ধারাবাহিক লেখা শুরু করেছিলাম [] কিন্তু যথারীতি ছন্দপতন। কিন্তু এইবার মনে হয় ইতিহাস হতে যাচ্ছে কারণ আমি এমন একজন 'ল্যাকক' ওরফে লেখকের খোঁজ পেয়েছি এরপর আমার জীবদ্দশায় আর কোন লেখককে নিয়ে লেখার প্রয়োজন হবে না! অন্তত এই ছাতার এক জীবনে!

লেখক হতে পারিনি কিন্তু পাঠক হতে পেরেছি- পাঠক হতে আসলে কোন যোগ্যতা লাগে না কেবল আকন্ঠ পড়ার পিপাসা! হাজার-হাজার বই পড়ে যার অপেক্ষায় ছিলুম অবশেষে তাকে পেলুম। বই পড়ার জন্য কচ্ছপের আয়ু পাওয়ার আমার যে হাহাকার ছিল [] তার অবসান হয়েছে কারণ এখন আর 'উড়াউড়ি-পড়াপড়ি'-এর অবকাশ নাই। আমার কাছে এখন কেবল এই মহান লেখকের ৩টা 'মহা-গ্রন্থ' থাকবে। এখান থেকে হররোজ দু-চারটে করে অক্ষর পড়ব- জীবনটা 'অক্ষরের কুতকুত' খেলে বেশ কেটে যাবে।

আমার জমানো সমস্ত বই ফেলে দেওয়ারও সময় চলে এসেছে। বই নামের এই সমস্ত আবর্জনা কে নেবে, হায়! যাই হোক, কাঁপাকাঁপি থামিয়ে মূল কথায় আসি:

সোস্যাল মিডিয়ায় মহা-লেখক হারুন স্যার বলছেন, তার ৩টি উপন্যাস নামক মহা-গ্রন্থের ধারেকাছেও বিগত ২০ বছরে যারা বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছেন তারা নেই। মানুষটা বিনয় করে ২০ বছর বলেছেন- আমি বলি কী, হাজার বছরেও...!
এখানে হারুন স্যার দাবী করছেন হাসনাত আবদুল হাই কখনও তার মত গদ্য সাহিত্য লিখতে পারবেন না। আমি 'গোয়াল ঘরের পাঠক' [] (আমার জীবনে অধিকাংশ বই পড়েছি গোয়াল ঘরে বসে) হিসাবে স্যারের দাবীর প্রতি কোন দাবী রাখার সাহস করছি না।

মহা-লেখক হারুন স্যার বলছেন, আহমদ ছফা কখনওই তার মত গদ্য সাহিত্য লিখতে পারতেন না। আচ্ছা 'গদ্য সাহিত্য' এই জিনিসটা কী! কেবল গদ্য বললে সম্ভবত ইংরাজি অক্ষর পিলারের ডাবল এল আসে না, অনেকটা এমন! যাগ গে, অহেতুক পিলার নিয়ে নাড়াচাড়া না-করাটাই আমার জন্য সমীচীন। পিলার চাপা পড়লে আর বাঁচব না- সাধ করে কে চায় চ্যাপ্টা হতে!
আহা, আহমদ ছফা যার 'বৃক্ষ বিহঙ্গ পুরান' [] পড়ে আমার মনে হয়েছিল এই মাপের লেখা কেন আন্তর্জাতিক পুরষ্কার পাবে না? আমি আমার এই ভাবনা সদ্য এই লেখক স্যারের কথায় অদ্য ফিরিয়ে নিচ্ছি। এই নিয়ে রা কাড়ব না- এটা এই আমি নিম্ন স্বাক্ষরকারী 'গোয়াল ঘরের পাঠক' সেই গোয়াল ঘরের গরুর শপথ নিয়ে বলছি!
ঢেউয়ের-পর-ঢেউ যেমন থাকে তেমনি কথার-পর-কথা থাকে।  আপনারা ভাবছেন হারুন স্যার এখানেই থেমে আছেন! না-না-না! আহমদ ছফার 'ফাউস্ট' [**] অনুবাদকে তরতর করে ছাড়িয়ে যেতে তিনি দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় জেমস জয়েসের 'ইউলিসিস' অনুবাদ করছেন, ধারাবাহিক আকারে। 
তিনি দৃঢ়ভাবে বলে দিয়েছেন..., সাফ কথা, এই বিশ্বে এখন পর্যন্ত যত ভাষায়  জয়েসের 'ইউলিসিস' অনুবাদ হয়েছে তা তার অনুবাদের (কার আবার? হারুন স্যার) টিকিটিও স্পর্শ করার ক্ষমতা নাই। 'গোয়াল ঘরের পাঠক' হিসাবে আমার বিশ্বাস ভবিষ্যতেও এর হেরফের হবে না। 'নাক্কো'-'কাভি নেহি'!
মহা-লেখক হারুন স্যার জয়েসের 'ইউলিসের' যে অনুবাদ করছেন তার একটা নমুনা:
সলাজে স্বীকার যাই, আমার কান্না পায় অক্ষম ওই গাছটার মত [] যদি সব ছেড়ে লেখকের দিদারে চলে যেতে পারতাম। কিন্তু আফসোস, কড়ি কোথায় বাওয়া, বৈদেশে যেতে বিনা টিকেটে প্লেনে দাঁড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ এখনও চালু হয়নি! 
চুপিচুপি বলি কেউ যেন না জানে, এই 'অনুবাদ-শেল' আমার মাথার উপর দিয়ে গেছে- 'গোয়াল ঘরের পাঠক' বলে কথা! মাথার উপর দিয়ে না-গেলেও এই 'অনুবাদ-শেলাঘাতে' খোদা না খাস্তা' চোখ গেলেও চশমা রক্ষা পেলেই আমি বেজায় খুশি! আর এদিকে দেখো দিকি কান্ড, আমার এক সুহৃদ (ইনি আবার আমার মত 'গোয়াল ঘরের পাঠক' না, ঠান্ডা ঘরের পাঠক) যিনি ইয়েতে জব করেন; তিনি এই অনুবাদটা পড়ে ইয়ে করেছেন...ইয়ে মানে...আরে, কী বলে এটাকে? আচ্ছা বাদ দেন, আমার শর্ট মেমোরি বলে এখন মনে পড়ছে না!
 
স্ক্রিণশট কৃতজ্ঞতা: জনাব, হারুন আল রশিদের ফেসবুক পেজ থেকে নেওয়া। গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি।
 
যোগসূত্র:      

* জেমস জয়েসের A portrait of the Artist as a Young man-এর নায়ক স্টিফের ডেডেলাসের জবানীতে,

"a medical student, a oarsman, a tenor, an amateur actor, a shouting politician, a small land lord, a small investor, a drinker, a good fellow, a storyteller, somebody's secretary, something in distillery, a tax gatherer, a bankrupt and at present a praiser of his own past."
** ছফার ফাউস্টের অনুবাদ:
  "খোদাতালা: অধিক বলার আছে?
নালিশ সে তো তোমার সত্তার অংশ
কিছুই তোমার চোখে ঠেকেনি সুন্দর?
মেফিস্ট: না-হে প্রভু, সত্য কহি
তোমার এ দুনিয়াটা অতিশয় খল
সেখানে মানুষ গেলে
এতো বেশি পাপে ডোবে
শয়তানও বিরক্ত হয় চাতুরি খেলাতে
পাপপুণ্য বোধহীন পামর মানুষ।"

১. বৈদেশ পর্ব: https://tinyurl.com/3dyh96xu

২. হাসপাতাল পর্ব: https://tinyurl.com/4r6k3yd4

৩. 'ল্যাকক' পর্ব: https://tinyurl.com/4p8av54j

৪. পাঠ রয়ে যায়...: https://www.ali-mahmed.com/2023/12/blog-post.html

৫. গোয়াল ঘরের পাঠক: https://www.ali-mahmed.com/2009/09/blog-post_02.html

৬: ছফা: https://www.ali-mahmed.com/2009/05/blog-post_15.html

৭. গাছটার কান্না পায়...: https://www.ali-mahmed.com/2009/06/blog-post_1608.html

No comments: