Thursday, May 22, 2014

গুডবাই, আ ‘বাইক-বয়’।

‘নিষিদ্ধ জ্যোৎস্না’ নামে একটা উপন্যাস আছে আমার যেটা ছাপা হয়েছিল ১৯৯৪ সালে। এই উপন্যাস জুড়ে অদ্ভুত এক চরিত্র আছে। আমার সৃষ্ট অদ্ভুতদর্শন এক চরিত্র, 'ফুয়াদ'! বিভিন্ন সময়ে যখন কোনও পাঠক আমার কাছে জানতে চেয়েছেন এমন অদ্ভুতদর্শন চরিত্র যেটা বাস্তবতা বিবর্জিত এটা কেন গোটা উপন্যাস জুড়ে? এর উত্তরে আমি এমন এক হাসি হাসতাম যার অর্থ হ্যাঁ-না কিছুই বোঝায় না।

আমার সৃষ্ট চরিত্র যে বললাম এটা আসলে জাঁক করে বলা। বলা হয়ে থাকে, সৃষ্টি-বিনাশ বলে আসলে কিছু নাই- সবই প্রকৃতি, প্রকৃতির সন্তানের নকল। এমনিতে আমি যেটা বলি, ফ্যান্টাসির জন্ম রিপোর্টিং-বাস্তবের গর্ভে! এই ফুয়াদ নামের চরিত্রটির পেছনে যে বাস্তব মানুষটার ছায়া ...বাস্তবের এই মানুষটার সমস্ত কর্মকান্ড লিখতে গেলে কয়েকটা উপন্যাস হয়ে যাবে। আমার চেয়ে বয়সে অনেক বড়ো এমন একজন মানুষের সঙ্গে এমন তীব্র বন্ধুত্ব কেমন করে হলো এ এক বিস্ময়! বাস্তবের এই মানুষটার নাম খুব জরুরি না এখানে, লেখার সুবিধার কারণে বাস্তবের এই মানুষটার নাম দিলাম, ‘বাইক বয়’। এঁর সঙ্গে কতশত স্মৃতি...!

একজন কাউবয়ের যেমন অধিকাংশ সময় কাটে ঘোড়া- স্ট্যালিয়নের পিঠে তেমনি এই বাইকবয়ের সময় কাটত মটরসাইকেলের পিঠে, এবং যথারীতি অধিকাংশ সময়ে পেছনে আমি। ও তখন চালাতো হন্ডা সিডিআই। ওর কথামতে ‘সুইটি’। অঘনঘটনপটীয়সী সুইটি।

আমি সেসময়ের কথা বলছি যখন আমার এখনকার মত শেকড় গজিয়ে যায়নি। প্রচুর ঘুরতাম তখন। আমরা তিন জন। আমি বাইক-বয় আর সুইটি। কেবল ঘোরাঘুরির সময়ই যে সুইটি থাকত এমন না, অতি প্রয়োজনেও।
সেটা ১৯৯৭ সালের কথা। আমার ছোটবোনের বাচ্চা হবে। আগেভাগেই তাকে জেলা শহর কুমিল্লায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বাচ্চা হওয়ার তারিখ আরও কদিন পরে কিন্তু কী যে একটা ভজকট হলো, প্লেসেন্টা না কি যেন...তখনই অপারেশনের প্রয়োজন দেখা দিল। আমার মাথা পুরোপুরি ফাঁকা। কী করি, কেমন করে যাই?
দুপুর বেলা। বাইক-বয়ের বাসায় পা ছড়িয়ে বসে আছি। বাইক-বয় আরেক জেলা শহর থেকে মাত্র ফিরল বাসায় ভাত খেতে। এমন অবস্থায় ওকে কিচ্ছু বলার সাহস করতে পারছিলাম না। বাইক-বয় বলে, ‘কি হইছে তোমার’? আমি বিড়বিড় করি। মানুষটা অস্থির। সবটা শোনার প্রয়োজন বোধ করে না। শিস বাজাতে বাজাতে বলে, ‘চাল মেরে ভাই’। আমার চোখে তখন আনন্দের জল!


সুইটি উড়ে যাচ্ছে! হাইওয়েতে কখনও ১০০ কিলোমিটারের নীচে ওঁ চালিয়েছে এমনটা আমার মন পড়ে না! ৭০ কিলোমিটার যাত্রাপথে কেবল একবার  সুইটিকে থামিয়ে দিলাম। কারণ ক্ষিধায় ওঁর হাত কাঁপছিল। আমার ঝোলায় সবসময়ই চকোলেট হাবিজাবি থাকত। ওকে বললাম, ‘আপনি এমন অবস্থায় ড্রাইভ করতে পারবেন না। খায়া নেন’। এরপর আবারও সুইটি উড়ে চলে। ঢাকা-চট্টগ্রাম-সিলেট এর কাছে নস্যি। একবার আমার পেছনে পড়ল, ‘চলো বান্দরবন থেকে ঘুইরা আসি’। তখন আমি হড়বড় করে বলেছিলাম, ‘ওয়াল্লা, বাইক নিয়ে! মাফ চাই, দোয়াও চাই’।

একবার গেছি চট্টগ্রাম। আমরা দুজন হোটেলে এবং যথারীতি সুইটি বাইরে। তীব্র দাঁতের ব্যথায় মধ্যরাতে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। আমি আপ্রাণ চেষ্টা করছি যেন বাইক-বয়ের ঘুম না-ভাঙ্গে। কেমন করে টের পেলেন আমি জানি না... চোখ অবিকল গরুর চেখের মত করে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার কী হৈছে’?
আমি দাঁতে দাঁত চেপে বলি, ‘কিছু না, দাঁত ব্যথা’।
তিনি স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে রসিকতা করতে ছাড়েন না, ‘তুমি মঘার হালুয়া লাগাও’।
রাগ করা কথা কিন্তু রাগ করার কোনও সুযোগ থাকল না কারণ তিনি একের-পর-এক গল্প শুরু করলেন। সকাল পর্যন্ত চলত এই গল্পের খেলা। এরিমধ্যে অবশ্য বেশ ক-বার এটা তাঁর বলা হয়ে গেছে যে তাঁর নাকি ঘুম আসছে না। শোনো কথা, আমি কী শালা বেকুব নাকি, নাকি ঘাস খাই! ওরে, কখনও কখনও অসহ্য ভালোবাসা সহ্য হয় না রে।


অনেক কটা বছর প্রবাসে থেকে আসা এই মানুষটা দেশের বিভিন্ন অনাচার দেখে দেশের প্রতি ছিল দুর্দান্ত রাগ। কথায় কথায় বলতেন, ‘হেল আউট অভ হিয়ার’। আমাকে পটাতে আপ্রাণ চেষ্টা করতেন দুজনে মিলে কোনও উন্নত দেশে একেবারের জন্য চলে যেতে। খরচ নিয়ে পরোয়া নেই এটা তার দায়িত্ব।
আমি হাঁই তুলে বলতাম, 'আমার যদি দেশের বাইরে সেটেল করতে  হয় তাহলে... আমার যে লাইফ লাইন এর থেকে পাঁচ বছর কমে যাক তবুও আমি দেশ ছেড়ে যাব না। কচ্ছপের মত কামড় দিয়ে থাকব'।


যেবার আমি দেশের বাইরে জার্মানিতে গেলাম এক আমন্ত্রণে এই মানুষটা আমার কানের পোকা নাড়িয়ে দিলেন, ‘এদেরকে বলো তোমার সঙ্গে একজন যাবে। তোমার তো খরচ নিয়া চিন্তা নাই ওরা দিবে- আমার খরচ নিয়াও চিন্তা নাই। আমি দিব’। মানুষটার শিশুসুলভ আচরণের সঙ্গে আমি পরিচিত। হাসি গোপন করে বলি, ‘আপনি ওখানে গিয়ে কী করবেন’?
মানুষটার তড়িঘড়ি উত্তর, ‘কও কী, দেশ দেখব। তুমি এদেরকে বইলা দেখো’।
আমি উদাস হয়ে বলি, ‘পাগল তাই কী হয়’।
অনেকগুলো দেশে ভ্রমণের সুযোগ থাকা সত্বেও তিন দিনের মাথায় ফিরে আসার পর মানুষটা হিসহিস করে বললেন, ‘এই দেশে অরিজিনাল গাধা এইটাই আছে ওইটা তুমি, লেইখা রাখো’।
আমি পাগলটাকে ঠান্ডা করার জন্য গা দুলিয়ে বলি, ‘আলবত, আমি আপনার সঙ্গে একমত। আপনি সত্য বলছেন’।


হন্ডা চুরি হওয়ার পর বেশ কটা বাইক বদল হয়েছিল। হালে লাখ পাচেঁক টাকা দিয়ে কি একটা ব্রান্ডের বাইক কিনেছিলেন আমি জানি না কারণ...। খুব বেশি দিন হয়নি এই বাইক-বয়ের সঙ্গে আমার দূরত্ব সৃষ্টি হলো। দুইটা জিনিস আমি সহ্য করতে পারি না। এক, আমাকে কেউ অপমান করলে। দুই, খুব কাছের মানুষের কাছ থেকে সামান্যতমও অবহেলা। তখন মানুষটার অস্তিত্ব আমার কাছে অর্থহীন হয়ে পড়ে। বাইক-বয় আমার এফবি লেখার নিয়মিত পড়তেন। আমি নিষ্ঠুর প্রকৃতির মানুষ। আমার যে সমস্ত সুহৃদ বিচিত্র করণে আমার দোষ দেখতে পান না আসুন, আমি পরিচয় করিয়ে দেই আমার ভেতরের পশুটার সঙ্গে। এই মানুষটা যেন আমার লেখা আর পড়তে না-পারেন সেই ব্যবস্থাও করলাম। ব্লক করে দিলাম। এই ব্লক এখনও করা আছে, আনব্লক করব কার জন্য?

আমার ওই উপন্যাসটার শেষ লাইনটা এমন,  ‘...ফুয়াদ এই শহরেই থাকে, দেখা হয় কদাচিৎ’। সেই ফুয়াদ যার আদলে সৃষ্টি সেই বাইকবয় সিলেট যাত্রাপথে হবিগঞ্জে পড়ে থাকেন হাত-পা-কোমর ভেঙ্গে। মসৃণ রাস্তায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে একমাত্র আদরের  মেয়ের জন্য কেনা এটা-সেটা...। গলগল  করে গড়িয়ে পড়া রক্ত রাস্তার পিচ নিমিষেই শুষে নেয়। শুষে নেয় ওঁর সমস্ত প্রাণশক্তি।  যে মানুষটার মারা যাওয়ার বড়ো শখ সেই মানুষটার বাঁচার কী তীব্র আকুতি। প্রিয়মানুষকে ফোন দিয়ে কাঁদে, 'তাড়াতাড়ি আসো, আমি মরে যাচ্ছি যে...'।

মানুষটা আজ অন্য ভুবনে- দেখা হবে না আর কোনও দিন। ওকে, বাইক-বয়, সারাটা জীবন অনেক করলে অস্থিরতা এবার একটু চুপচাপ ঘুমাও...।

...

উন্নত দেশগুলোতে লোকজন প্রথমেই যাবে পুলিশের কাছে। আমাদের দেশে উল্টো- আজরাইলের কাছে যাবে কিন্তু পুলিশের কাছে যাবে না! পুলিশ নিয়ে কোনও ভাল কথা আমরা শুনতে পছন্দ করি না। তাই মিডিয়ারও এই বিষয়ে আগ্রহ প্রায় শূন্য!

হবিগঞ্জে এই দুর্ঘটনা ঘটার পর পুলিশ যদি যথা সময়ে চলে না-আসত তাহলে এই বাইক, সঙ্গে থাকা টাকা এবং দামী দুইটা মোবাইল হাপিশ হয়ে যেত। ইনি মারা যাওয়ার পূর্বে সঙ্গে থাকা এক লাখ তেইশ হাজার টাকা সার্জেন্টের হাতে তুলে দেন। তাঁর স্ত্রী যাওয়ার পর বাইক, টাকা, সেল ফোন সবই ঠিক-ঠিক বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

ও পুলিশ, নতজানু হই...।

1 comment:

Anonymous said...

তাঁর আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি৷ আল্লাহ তাঁকে বেহেস্ত নসিব করুক৷