Thursday, March 6, 2014

ফাজিল, তোর জন্য...।


আমি যে প্রাইমারি স্কুলে পড়াশোনা করেছি এখন সেই স্কুলের হেড-টিচার, জাকির আমার ক্লাশ-ফেলো। স্বভাবতই এই স্কুলের জন্য আমার আছে অন্য রকম তীব্র টান। মাঝে-মধ্যে যাওয়া পড়ে।
আমার মধ্যে কিছু ঝামেলা আছে। আমি এক জায়গায় স্থির হয়ে বসতে পারি না। হেড-টিচার নামের মানুষটার মাথায় কিছু পোকা আলগোছে ঢুকিয়ে দেই। আচ্ছা জাকির, স্কুলে একটা বাগান করলে কেমন হয়? ফুল-ফল সবই থাকবে। জাকির নামের মানুষটা স্বল্পভাষী। সংক্ষিপ্ত উত্তর, হ, ভালই হয়
তো, বাগান হয়। টিচারের সঙ্গে শিক্ষার্থীরাও মাটি কোপায়। ভাল লাগে।

একদিন জাকিরকে বললাম, স্কুলটাকে কাগজ-টাগজ ফেলে বাচ্চারা খুব নোংরা করে। প্রতিটা ক্লাশরুমে একটা করে ময়লা ফেলার ঝুড়ি থাকলে কেমন হয়? জাকির বলে, হ, ভালই হয়
স্কুলটা আগের চেয়ে অনেক পরিচ্ছন্ন থাকে। দেখতে ভালই লাগে।

মুর্দা বলে তো কাফান ফাড় কে বলে- ওয়াল্লা, জাকির নামের মানুষটার দেখি মুখে খই ফোটে। তিন দিন পূর্বে যখন জাকির বলল, স্কুলে কিছু বাচ্চা আছে। এদের অনেকের বাবা-মা অতি দরিদ্র বা কারো বাবা নেই। এদের স্কুল ড্রেস বানাবার সামর্থ্য নেই। এরা খুব মন ছোট করে থাকে
আমি খানিকটা থমকে যাই। কারণ আপাতত এটা আমার জন্য ক্ষমতাবহির্ভূত একটা ব্যাপার। মিইয়ে গিয়ে চিঁ চিঁ করে বলি, ক-ক্ক-কত জন?
জাকির সবগুলো দাঁত বের করে বলে, বেশি না, পঁচিশ-ত্রিশ হবে

আমি ভাবছিলাম সায়েরা বেগমের অপারেশন এই রবিবারেই, এখন ওটাই আমার কাছে জরুরি। কী করা যায়? আমার এক বন্ধু তার কাপড়ের দোকানে খুব করে যাওয়ার জন্য বলেছিল। এটাও ঘটা করে বলেছিল: তোর কাপড় লাগলে নিয়ে আসিস, তোর জন্য ফ্রি। যাব-যাব করেও যাওয়া হয়ে উঠেনি। পরশু ওর দোকানে পায়ের ধুলি ছড়িয়ে সোজাসাপটা বললাম, আমার মাগনা কিছু কাপড় দরকার
ও হেলাফেলা ভঙ্গিতে বলল, ক-গজ লাগবে, বল?
আমি অমায়িক ভঙ্গিতে বললাম, শতেক গজ লাগবে। পারবি না?
ব্যাটা ফাজিল বলল, তুই তো পড়িস ফতুয়া এটার জন্য তো এতো কাপড় লাগার কথা না। আর তোর কাফনের কাপড় হলেও তো...।
আমি বিড়বিড় করছি দেখে এ বলল, কী বলছিস! আমি বললাম, ফাজিল-ফাজিল-ফাজিল। তুই একটা ফাজিল। তাই দশবার ফাজিল বলছি

ঝুলাঝুলি করে শেষ পর্যন্ত এই ফাজিল মানুষটাকেই পঞ্চাশ গজ কাপড়ে রাজি করাতে সমর্থ হই। আসার সময় ফাজিলটা চিড়বিড় করে বলল, শোন, তোর সব খবরই আমি রাখি। তুই ছাতাফাতা লেখালেখি করিস এটা আমার অজানা না। ভুলেও আমার নাম নিবি না- খবরদার কিন্তু খবারদার। তোর মত সন্ত্রাসী এসে লাইন ধরুক এটা আমি চাই না
আমি সুবোধ বালকের মত মাথা দুলিয়ে বলি, আইচ্ছা

হেড-টিচার জাকিরকে বললাম, ছেলে-মেয়ে সবার তো হবে না। এক কাজ করো, মেয়েদেরকে আমরা দেই আপাতত। ছেলেদেরটা পরে দেখা যাবে। মাস্টার মানুষ তবুও আমি জ্ঞান দিতে ছাড়ি না, বুঝলা, একজন ছেলেকে শিক্ষিত করা মানে কেবল একজন ছেলেকে শিক্ষিত করা কিন্তু একজন মেয়েকে শিক্ষিত করার মানে গোটা একটা পরিবারকে শিক্ষিত করা। জাকিরের অতি সংক্ষিপ্ত উত্তর,
অবশেষে এটাই ঠিক হলো আপাতত মেয়েদের ড্রেসের ব্যবস্থা করা হবে। ছেলেদেরটা দেয়ার চেষ্টা করা হবে পরে সুযোগ করে। দুই সেশনে এই প্রাইমারি স্কুলটা চলে বিধায় সব মেয়েদেরকে পাওয়া গেল না, আমার আবার অন্য এক অকাজের তাড়া। জাকির ১৫ জন মেয়েকে ড্রেসের জন্য বের বেছে-বেছে বের করল যাদের স্কুলের ড্রেস নেই, নিজেরা বানাবার কোনো সুযোগ নেই। একজন সেলাই-মাস্টারকে দায়িত্ব দেওয়া হলো স্কুল থেকেই মাপ নিয়ে যাবেন।
জ সেই পর্বটার একটা গতি হলো। এবেলা এটা বলে রাখি ওহে ফাজিল, লেখাটা উৎসর্গ করছি তোর জন্য...। 
...   ...   ...

আমার অজান্তেই কুৎসিত একট ভুল হয়ে গেছে। সচরাচর এমন একটা কাপড় সেলাই করা জন্য সেলাই-মাস্টাররা নেন অন্তত ১৫০ টাকা। এই কর্মকান্ডে অংশগ্রহন করার জন্য এই মানুষটা, মো. মনির ৭৫ টাকা করে কাপড়গুলো সেলাই করে দিয়েছেন। লেখায় তাঁর এই অবদান পুরোপুরি বিস্মৃত হয়েছি। এ অন্যায়! অনিচ্ছাকৃত এই ভুলের কারণে আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করি।
   

No comments: