Tuesday, October 15, 2013

বড়ো লোভ হে...

খবরের খোঁজে’ পত্রিকার ২য় সংখ্যায় লিখেছিলাম (http://khoborer-khoje.blogspot.com/search?updated-max=2013-10-07T07%3A58%3A00-07%3A00&max-results=2) এক অন্য রকম নায়কের কথা:


“একেকজনের লড়াই করার ভঙ্গি একেক রকম! কেউ লড়াই করেন অস্ত্র নিয়ে, কেউ কলম, কেউ-বা ক্যামেরা নিয়ে। কিন্তু অন্য এক রকম লড়াইয়ের গল্প বলি আজ।
মুসলিম মিয়া, রহিমা বেগমের সন্তান সুরুজ মিয়া। রেললাইনের পাশেই তাদের বাড়ি। শৈশবে সুরুজ মিয়ার দুই পা-ই কাটা পড়ে। এরপর পা ব্যতীত ক্রমশ বেড়ে ওঠা। এই ছেলেটিই প্রাইমারির গন্ডি পেরিয়ে ভর্তি হয় এলাকার একটি হাই স্কুলে। এখন সে পড়ছে ক্লাশ সেভেনে। রেললাইন পেরিয়ে প্রতিদিন তাকে রিকশায় করে স্কুলে যেতে হয়। সামান্য আয়ের বাবার জন্য সেটাও কম ঝক্কির না! প্রতি দিন আসা-যাওয়ার রিকশা ভাড়া অন্তত ৩৫ টাকা!
জানতে চেয়েছিলাম, এতো যন্ত্রণা করে পড়ে কী হবে? সুরুজ মিয়ার যে এক অদেখা স্বপ্ন, পড়ালেখা করে সে একটা ভদ্রোচিত চাকরি করবে।
সুরুজ বাসা থেকে বের হয় অন্তত এক ঘন্টা আগে। কেন? সুরুজ মিয়া জানায়, নইলে সামনে জায়গা পাওয়া যায় না- পড়া বুঝতে সমস্যা হয়। কী আশ্চর্য, স্কুলের শিক্ষকরা কী এই বিষয়টা খেয়াল করেন না! খানিকটা ছাড় কী সুরুয মিয়া পেতে পারে না? এই ছাড় দেয়ার জন্য, কেন? এটা জানাটা তো বিদেশে গিয়ে জানার প্রয়োজন পড়ে না! হালে চালু হাওয়া ডেমু ট্রেনে শিক্ষক মহোদয়গণ উঠে থাকলে অবশ্যই খেয়াল করে দেখবেন, সুরুজ মিয়ার মত মানুষদের জন্য আলাদা বসার ব্যবস্থা রাখা আছে...।
আমার মাথায় যে প্রশ্নটা ঘুরপাক খায়, সুরুজ মিয়ার এই অদম্য লড়াই চালিয়ে যাওয়ার জোরটা আসলে কোথায়? তার জেনেটিক কোডে কোত্থেকে এলো এই তথ্য, অবিরাম এমন লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অদম্য স্পৃহাটা?
সুরুজকে দেখার পর থেকে, আমি যখন লম্বা-লম্বা পা ফেলে হনহন করে হেঁটে যাই তখন কেমন যেন একটা ঘোরের মধ্যে থাকি। অজান্তেই বিড়বিড় করি, হে পরম করুণাময়, কেমন করে তোমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি, কেমন করে?
কে জানে, এই বিশ্ব-ব্রক্ষ্মান্ডের সবচেয়ে বড়ো ম্যাজিশিয়ান পর্দার আড়াল থেকে হাসেন কিনা! কারণ কখন যে কীভাবে আমাকে নিয়ে তাঁর ম্যাজিকটা দেখাবেন এটা তো আমি জানি না! জানা থাকলে ভাল হতো- আফসোস, জানার যে কোনো উপায় নেই...।
সুরুজের ঝকঝকে চোখে কী তীব্র হাহাকার, যদি..., যদি হাঁটতে পারতাম, যদি, যদি আমার একটা নকল পা থাকত...! কী তীব্র সেই চোখের দৃষ্টি, এই চোখে চোখ রাখার ক্ষমতা আমার কই!
আর এমনিতে আজকাল নতুন একটা ফ্যাশান হয়েছে, পা থেকেও আমরা হাঁটতে চাই না। দু’মিনিটে যেখানে হেঁটে যাওয়া যায় সেখানেও আমরা লাফ দিয়ে রিকশায় উঠে পড়ি- মটর সাইকেলে চেপে বসি। বেচারা আমরা, যেন আমাদের পা থেকেও নেই! হায়, ক্ষমতার কী এক নিদারুণ অপচয়!”

১ম সংখ্যায় রিকশাচালক লিটন মিয়াকে নিয়ে যে লেখাটা লিখেছিলাম, যেটা ফেসবুকে শেয়ার করেছিলাম: (https://www.facebook.com/ali.mahmed1971/posts/10151679681627335) । যিনি ৫০ হাজার টাকা পেয়েও সেই টাকার মালিকের কাছে ফেরত দিয়েছিলেন।
এই লিটন মিয়া দায়ে পড়ে রিকশা চালালেও তিনি সেলুনের কাজ জানেন এবং তার এক অদেখা স্বপ্ন, নিজের একটা সেলুন হবে। কিন্তু সেই সেলুন করার জন্য সব মিলিয়ে টাকা লাগে অন্তত ৫০ হাজার টাকা!

তো, ওই লেখাটার পর, লেখাটায় একজন ছোট্ট একটা মন্তব্য করেছিলেন, “Liton, apner saloon ekdin hobe Inshallah”। মন্তব্যটা পড়ে তেমন গা করিনি কিন্তু তখনও আমি জানি না যে এই ছোট্ট মন্তব্যটার পেছনে কী লুকিয়ে আছে! এই মানুষটারই কল্যাণে লিটন মিয়ার আজ একটা সেলুন হচ্ছে। খুব সহজে লিখে ফেললাম, একটা সেলুন হচ্ছে, আসলে আমার একটা স্বপ্নপূরণ হচ্ছে!
এই সদাশয় মানুষটা আমার লোভটা বাড়িয়ে দিয়েছেন- বড় লোভ হে, বড়ো লোভ! সুরুয মিয়ার এই লেখাটারসূত্রে বেশ ক-বারই তার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। এই ছেলেটা অন্য রকম চোখে বারবার আমার কাছে বলছিল, ‘আমারে একটা নকল পা-র ব্যবস্থা কইরা দেন না...’। পাগল, আমি কোত্থেকে এনে দেব?
কিন্তু এখন, লোভী আমি, আবারও স্বপ্ন দেখি, এই গ্রহের কোথাও-না কোথাও কেউ-না-কেউ সুরুযের প্রতি তার মমতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। কৃত্রিম পা নিয়ে সুরুয নড়বড়ে করে হলেও হাঁটছে। আহ, এই দৃশ্য দেখার চেয়ে তাজমহল দেখাটা আমার কাছে তুচ্ছ, অতি তুচ্ছ...।


* 'বড় লোভ হে', কথাটা নেয়া হয়েছে Najmul Albab Opu -এর লেখা থেকে 

No comments: