Sunday, July 3, 2011

অন্ধকার ছেয়ে ফেলে চারদিক

এই মানুষটার বিরুদ্ধে শত-শত মামলা করা হয়েছিল কিন্তু আমাদের দেশে মামলা হচ্ছে মাকড়সার জালের মত। ক্ষমতাবানরা চট করে ছিঁড়ে ফেলে কিন্তু দুর্বল আটকে থাকে আষ্টেপৃষ্ঠে। এরশাদ সাহেব যে শত-শত মামলা (কমিশন এরশাদের বিরুদ্ধে ৫৩৪টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ চিহ্নিত করেছিল। আরও ৮২৮টি অভিযোগ তদন্তাধীন ছিল। প্রতিটি অভিযোগের জন্যে আলাদা আলাদা মামলা দায়ের করা সম্ভব ছিল) মোকাবেলা করে দাঁত কেলিয়ে তিন তিনটে আসন থেকে দাপটের সঙ্গে নির্বাচিত হয়েছেন অথচ সাধারণ মানুষ এই শত শত মামলার কেবল একটা মামলাতেই হাবুডুবু খেতে খেতে প্রাণপাত করতেন!

এরশাদ সাহেব এমন কোন দিক নেই যেটা নষ্ট করেননি
সাহিত্যের বিষয়টা পূর্বেই বলেছি [১]। ধর্ম নিয়েও কম খেলা দেখাননি। আটরশি পীরের কাছে যাওয়ার জন্য হেলিকপ্টার, আমরা যেমন গরু-ছাগল বেঁধে রাখি তিনি তেমনি হেলিকপ্টার বেঁধে রাখতেন। বেচারা এই হেলিকপ্টারটা নিজস্ব তালুক বিক্রির টাকায় খরিদ করেছিলেন। (এরশাদ ব্যক্তিগত কাজে, পীরদর্শনে আটরশি গিয়েছিলেন প্রায় ১০০বার। কেবল একা যাননি, সঙ্গে গেছে তার মন্ত্রী, উপমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী সকলেই। এতে তৎকালীন প্রায় সাড়ে ১৬ কোটি টাকা নষ্ট হয়েছিল।)
সব বাদ দিয়ে কেবল একটা উদাহরণ দেই। ৯১ সালে আদালত থেকে বেরিয়ে তিনি বলেন, "প্রাকৃতিক দুর্যোগ এলে জনগণের পক্ষে আমি আল্লার দরবারে প্রার্থনা করতাম। সেজন্যে আমি সাফল্যের সঙ্গে সব দুর্যোগ মোকাবেলা করেছি। পৃথিবীর কোন রাষ্ট্রপতির প্রার্থনায় বৃষ্টি এসেছে? আমার প্রার্থনায় এসেছে"
হুটহাট করে কোন একটা মসজিদে নামাজ পড়তেন। রসিয়ে রসিয়ে বলতেন, তিনি নাকি কাল রাতে স্বপ্নে দেখেছেন এই মসজিদে নামাজ পড়ছেন তাই আজ চলে এসেছেন। অথচ নিরাপত্তার লোকজনরা হপ্তা-দশদিন পূর্ব থেকেই মসজিদের আশেপাশে চক্করের পর চক্কর লাগাতেন!

এই বিষয়টা নিয়ে পূর্বেও কোথাও লিখেছি: কবি এরশাদ সাহেবের সমস্ত কুকর্ম বিস্মৃত হলেও তিনি এমন একটা অন্যায় করেছিলেন যা ক্ষমার অযোগ্য। তিনি যদি অমর হন তাহলে কোন কথা নেই কিন্তু মরণশীল হলে মৃত্যুর সময় এর শাস্তি অবশ্যই ভোগ করবেন। করতেই হবে।

সেলিম নামের একটি শিশুকে ফাঁসি দেয়া হয়েছিল। যদিও তার বয়স ছিল ১৪ কিন্তু আমাদের দেশের আইনমতে সে শিশু! Sailent features of the children act of 1974, Section 2 (F)-এ বলা হচ্ছে, "A child means a person under 16 years of age..."। 
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সেলিমের ফাঁসির আদেশ রদ করার জন্য আবেদনও জানিয়েছিল। কিন্তু এরশাদ সাহেব সে আবেদন উপেক্ষা করে সেলিমের মৃত্যুদন্ডাদেশকে অনুমোদন দেন।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা সে সময়ের প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হোসেইন মোহাম্মদ এরশাদের কাছে জরুরি আবেদনে এটাও জানায়, সেলিমের মৃত্যুদন্ড দিলে সেটা হবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার এবং জাতিসংঘ মানবাধিকার সনদের সুস্পষ্ট লংঘন। কারণ ১৮ বছরের নিচে কাউকে মৃত্যুদন্ড দেয়া যায় না, দিলে সেটা হবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার লংঘন।
এবং যেহেতু সেলিমের বিচার হয়েছে সামরিক আদালতে (সামরিক আদালত চালু করা হয়েছিল ১৯৮২-র মার্চ মাসে)। সেখানে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নেই। যদিও প্রত্যেক নাগরিকেরই আছে আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার।
কিন্তু এরশাদ কর্ণপাত করেননি! এই শিশুর ফাঁসির আদেশ বহাল রাখেন।

১৯৮৫ সালে ঢাকার মিরপুরের ১৪ বছরের মোহাম্মদ সেলিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় খুনের। মামলা চলার পুরোটা সময় তাকে রাখা হয়েছিল ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের কনডেম সেলে। 
অবশেষে ২৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যরাতে তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়। তাকে ফাঁসি দেয়ার পূর্বে তার বাবা মাকে একটা খবর পর্যন্ত দেয়া হয়নি।

কেবল আমার স্মৃতিশক্তিই যাচ্ছেতাই, না? আমাকে নিয়ে রসিয়ে রসিয়ে গল্প করতে লোকজনের বড়ো উল্লাস হয়, না? আমার মেমোরি গোল্ডফিসের মত? আর জাতি হিসাবে আমাদের মেমোরি গোল্ডফিসের চাইতেও যে খারাপ এটা বললে বুঝি সূর্য একহাত নিচে নেমে আসে! 
নইলে কী আর ধার্মিক এরশাদ সাহেব তিন তিনটে আসন থেকে দাপটের সঙ্গে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তাও একটা আবার ঢাকার আসন থেকে। যেখানে সমস্ত শিক্ষিত মানুষের বাজার, প্রখর স্মৃতিশক্তির লোকজন!
নির্বাচনের পূর্বে নিজেদের দলে টানার জন্য দুই নেত্রী ওনার হাত ধরে কম টানাটানি করেননি। ভাগ্যিস, এরশাদ সাহেবের হাত ছিঁড়ে যায়নি! কখনও ভাবী-দেবর, কখনও ভাই-বোন! এখনও এক নেত্রী এরশাদ সাহেবকে ধর্মের ভাই বলতে অজ্ঞান!
আমরা কত দ্রুত সব ভুলে যাই! বড়ো বিচিত্র এই দেশ! এমন দেশ কোথায় খুঁজে পাওয়া যাবে!

*সেলিম বিষয়ক কিছু তথ্য নেয়া হয়েছে: আ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল নিউজ লেটার, আজকের কাগজ ০৬.০৭.৯১।

সহায়ক সূত্র:
১. উঠে আসে অন্ধকার: http://www.ali-mahmed.com/2011/06/blog-post_4419.html  

1 comment:

Anonymous said...

Arshad kutta ontoto amader 2 netri theke valo