Friday, October 15, 2010

জীবনটাই যখন নিলামে: ৬

রাব্বি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে। হেড অফিস থেকে যে বিলের কপিটা ফেরত এসেছে এটায় এইসব কি হাবিজাবি লেখা আছে! সইটা ওর বস সৈয়দের কিন্তু প্রত্যেকটা ভাউচার অপরিচিত মনে হচ্ছে। যেসব আইটেম এখানে উল্লেখ করা হয়েছে এগুলো তো কেনাই হয়নি! হায় খোদা, এক-দুই টাকা না, লক্ষ-লক্ষ টাকার বিল। ওর গা কাঁপছে। এসি চালু আছে তবুও কুলকুল করে ঘামছে। মাথাটা একেবারেই কাজ করছে না। অথচ এই সময় মাথা বরফের মত ঠান্ডা থাকা প্রয়োজন।
খানিকটা সামলে নিয়ে বিলের পুরো সেটটা ড্রয়ারে ঢুকিয়ে তালা মেরে দিল। এইবার ঠান্ডা মাথায় ভাবা যেতে পারে। বিষয়টা তাহলে কী দাঁড়াল? এই বিলের কপি অনুযায়ী মার্কেট ডেভেলপ করার জন্য লক্ষ-লক্ষ টাকার বিভিন্ন আইটেম কেনা হয়েছে যার সম্বন্ধে বিন্দুবিগর্স ওরা জানে না। অথচ সইটা সৈয়দের এতে কোন সন্দেহ নেই! কেমন করে এটা সম্ভব?


রাব্বি বুঝে উঠতে পারছে না এমন একটা বিল ওদের অগোচরে সৈয়দ পাঠিয়েছে কেন? কেন-কেন-কেন? এটা ওদের আজও জানা হতো না, যদি না বিলের হেড বদলে দেবার জন্য হেড অফিস থেকে ফেরত আসত। সৈয়দ অফিসে নেই নইলে এটা তার টেবিলেই যাওয়ার কথা। সচরাচর হেড অফিসের চিঠিগুলো ওরা সরাসরি সৈয়দের কাছেই পাঠিয়ে দেয়।
রাব্বি ড্রয়ার খুলে চিঠির সঙ্গের ভাউচারগুলো বের করল। একের পর এক উল্টে যাচ্ছে। অপিরিচিতসব আউটেম। ও ১০০ ভাগ নিশ্চিত অধিকাংশই কেনা হয়নি। ড্রাইভারকে বলল গাড়ি বের করতে। কয়েকটা দোকান থেকে একটাকে বেছে নিল। যেতে যেতে ভাবছে, কেমন করে বিষয়টা উত্থাপন করতে হবে? দোকানদারের সন্দেহ হলে ভজকট হয়ে যাবে। ব্যাটা আবার সৈয়দের লোক হলে ফট করে বলে দেবে। কাজের কাজ কিছুই হবে না। ও ফেঁসে যাবে।


রাব্বি দোকানে ঢুকে এটা-সেটা নেড়েচেড়ে দেখতে লাগল। এরা মুলত বিভিন্ন গিফট আইটেম বিক্রি করে। ক্যালকুলেটর, ঘড়ি, ছাতা, বালতি এইসব। এখান থেকে আউটলেটের জন্য বিভিন্ন গিফট কিনেছে সৈয়দ। প্রতিটি দোকানে যে-কোনও একটা আইটেম গিফট হিসাবে দেয়া হয়েছে এমনটাই সৈয়দ ক্লেইম করেছে। কী বিপুল অংক!
ছেলেটা রাব্বিকে বলল, আপনি কি কিছু খুঁজছেন, স্যার।
রাব্বি মুখ ভরে হাসল, আসলে আমি না, আমার কোম্পানি কিনবে। আপনাদের কাছ থেকে আগেও অনেক টাকার জিনিসপত্র আমরা নিয়েছি।
কোম্পানির নাম শুনেই ছেলেটা হাত কচলাতে শুরু করল, স্যার, আগে বলবেন না। যা লাগে নিয়ে যান, আপনাদের টাকা-পয়সা কোন বিষয় না।
রাব্বি অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে বলল, আচ্ছা, মেমোটা-।
স্যার, কি যে বলেন। এইটা কোন সমস্যা না। আগেও তো আস্ত মেমো বই আপনাদের দিয়ে দিয়েছি, দেই নি!
রাব্বি চেপে রাখা শ্বাস ছাড়ল। আচ্ছা, এই তাহলে বিষয়! সৈয়দ অল্প কিছু জিনিস এখান থেকে কিনেছে এরপর আস্ত মেমো নিয়ে ভুয়া বিল বানিয়ে পাঠিয়েছে। পরে যোগাযোগ করবে বলে রাব্বি এখান থেকে বেরিয়ে পড়ল।
অন্য দোকানে ঘুরে আর লাভ নেই। সব জায়গায় একই ফল হবে। দস্তুরমতো ওর মাথা ঘুরছে। কী অনাচার, কী লোভ। সৈয়দ কোম্পানি থেকে প্রায় ১ লক্ষ টাকা বেতন ড্র করে, বেসুমার সুবিধা ভোগ করে। তারপরও একজন মানুষ কেমন করে এমনটা করতে পারে, অসৎ হয়!


এটা নিয়ে কারও সঙ্গে আলাপ করা ঠিক হবে না। চাকুরির খাতিয়ে অন্যরা ঠিকই সৈয়দের কানে কথাটা তুলবে। আগেভাগে সাবধান হয়ে গেলে সব ভেস্তে যাবে। হেড-অফিসে কার কাছে এটা জানানো যেতে পারে। এম.ডি-কে প্রমাণসহ জানালে কেমন হয়? এমডির নামটা বড়ো অদ্ভুত, হার্ট উইক। শুনেছে বাস্তবে হার্ট উইক না, স্ট্রং টাইপের মানুষ। কোন এক ডিপোতে নাকি কি একটা ঝামেলা হয়েছিল। এ কেমন করে যেন টের পেয়ে যায়। প্রত্যন্ত অঞ্চলে অফিস, যেখানে সচরাচর একজিকিউটিভ টাইপের কেউ যায় না সেখানে বেস্ট এয়ারের হেলিকপ্টার ভাড়া করে স্বয়ং এম.ডি গিয়ে হাজির। এ নিমিষেই সব তছনছ করে ফেলল। ওখানকার ইনচার্জ বমাল ধরা। ট্যাঁ ফোঁ করার সুযোগও রইল না!
রাব্বি মনস্থির করল সরাসরি এম.ডিকেই লিখবে। এমনিতে এই ভদ্রলোক জয়েন করার পরই কিছু নতুন নতুন নিয়ম-সুবিধা চালু করেছিলেন। ‘ব্যাকবোন’ নামে একটা অপশন চালু করেছেন। এটা হচ্ছে এমন, অফিস সংক্রান্ত কোন রং-ডুয়িং বা অসঙ্গতি কেউ খুঁজে পেলে যে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে পারবে। এই অভিযোগ সরাসরি এম.ডিসহ লিগ্যাল এবং ফিন্যান্সের চীফকে নিয়ে গঠিত প্যানেল দেখবে। এবং অভিযোগ সত্য হলে কঠিন ব্যবস্থা নেয়া হবে। এইজন্য যে অভিযোগ করবে তার চাকুরি যাওয়া দূরের কথা গায়ে আঁচড়টিও পড়বে না। এটাও বলা হয়েছে, যদি এম.ডি বা প্যানেলের কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয় তারা এই দায়িত্ব থেকে তাঁরা সরে যাবেন। অন্য কেউ, আরও কোন উঁচু পর্যায়ের কেউ এই বিষয়ে তদন্তের দায়িত্বে থাকবেন।
রাব্বি ভাবছে, কি করবে? চিঠি কি দেবে, নাকি দেবে না? সিদ্ধান্তটা নেয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।


অনেকবার রিঙ হওয়ার পর রাব্বি ফোন ধরল। ধরবে কি ধরবে না এটা ঠিক করতে করতেই অনেকটা সময় চলে গেছে। আজকাল সৈয়দের ফোন ধরাও বড়ো কষ্টকর মনে হয়। এই মানুষটার সামনে বা কথা বলার সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখা মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু উপায় কী, শালার পেট! আসলে পেটকে দোষ দিয়ে লাভ নাই, দোষ দিতে হবে একপেট আবর্জনাকে। এই আবর্জনাই সমস্ত কষ্টের উৎস। আচ্ছা, স্বর্গে যে নিষিদ্ধ ফল খেতে নিষেধ করা হয়েছিল এটাই কী মানুষের খাওয়ার উপযোগি কোন খাবার, যা খেলে হাগু হয়। বিকট সমস্যটা এইজন্যই হয়েছিল কী, প্রথম মানব খেয়ে তো ফেলল এখন হাগু না হয়ে তো উপায় নেই। স্বর্গে যে আবার হাগু করার ব্যবস্থা রাখা হয়নি। হলে স্বর্গের আর মান রইল কই! বাধ্য হয়ে প্রথম মানবের জন্য স্বর্গের বাইরে স্থান ঠিক করে দেয়া হলো। মানবের জানামতে কথিত পৃথিবী।

ফোনের ওপাশ থেকে সৈয়দ গলা ফাটাচ্ছে, হ্যালো, হ্যালো, হ্যাল-লো।
রাব্বি আপ্রাণ চেষ্টায় গলা স্বাভাবিক করে বলল, জ্বী বস।
কি ব্যাপার আপনার ফোনে রিঙের পর রিঙ হচ্ছে। যাও ধরলেন, কথা বলছেন না!
কি বলেন বস, আপনি আমার কথা শুনতে পাচ্ছিলেন না, আমি তো আপনার কথা স্পষ্ট শুনছিলাম। আপনি কেবল হ্যালো হ্যালো বলছিলেন। সম্ভবত নেটওয়ার্কে সমস্যা, বস।
কতবার বললাম আপনার এই সিটিসেল নাম্বার বদলান।
বস, সব সময় তো সমস্যা হয় না। কখনও কখনও-।
রাখেন আপনার কখনও কখনও, সিটিসেল ফোন কারা ব্যবহার করে জানেন, রিকশাওয়ালারা ব্যবহার করে।
রাব্বির মেজাজ ক্রমশ খারাপ হচ্ছে, জ্বী, তা করে। বস, গ্রামীনের নাম্বার আমি মেথরের হাতেও দেখেছি। ওই দিন এক মেথর ফোন করে বলছিল-।
সৈয়দের নাম্বার গ্রামীন। বলতে পেরে রাব্বির এখন মেজাজ শরীফ। ব্লাডার ফেটে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে, এমতাবস্থায়
এখন মুত্র ত্যাগের ন্যায় আরাম লাগছে।
এবার সৈয়দের গলা গম্ভীর, শুনুন, ফিজুল আলাপের জন্য আপনাকে ফোন করিনি। আপনি আমার টেবিল থেকে না-বলে পার্কার কলমটা কেন নিয়েছেন? অফিসে ফিরলে পাঠিয়ে দেবেন।
রাব্বি হাসবে না কাঁদবে বুঝে উঠতে পারছে না। কাল ও সৈয়দের টেবিলে কোন একটা কলম অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে নাড়াচাড়া করেছিল এটা সত্য কিন্তু না-বলে কলম নিয়ে আসবে কেন? আজিব! অন্তত সৈয়দ এটা বললেও পারত, আপনি কি ভুলে কলমটা নিয়ে এসেছিলেন? অথচ এই চুতিয়া এমন করে বলছে যেন ও একটা দাগী চোর। কলম ওই নিয়েছে। শালার দুনিয়ায় কত ধরনের মানুষ যে পয়দা হয়েছে। ক-পাতা পড়ে ফেলেছে বলে এই কুতুয়াকে আবার লোকজন ঘটা করে চাকুরিও দেয়! হারামজাদাকে ও নিজে পিয়নের চাকুরিও দিত না। কার বরাতে যেন চাকুরি পেল? এমপি, না স্পিকার? মাল্টি-ন্যাশনাল কোম্পানিগুলো এই দেশে ব্যবসা ভালই বোঝে। কাকে ক-কেজি তেল দিতে হবে, কাকে হাতে রাখতে হবে এটা এদের চেয়ে কে ভাল জানে! শালারা এই দেশের কাঁঠাল এ দেশের লোকজনের মাথায় ভেঙ্গে খাচ্ছে কি এমনি এমনি! ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি এদের কাছে কোন ছার, নস্যি!
রাব্বির এই মুহূর্তে মনে পড়ল, সৈয়দ একবার অপারেটিং সিস্টেমের  একটা সি.ডি চেয়েছিল ওর কাছে। এর কাছে কোন জিনিস গেলে সেটা ফেরত এসেছে এমন উদাহরণ গোটা অফিসে নাই। রাব্বি সি.ডি-টার কপি করে দিয়েছিল। কাজ চালাতে কোন সমস্যা নাই। ওমা, এই হার্মাদ এই নিয়ে কী নাটকই না করল! দস্তুরমতো একটা অফিসিয়াল চিঠির মতো লিখল। হাস্যকর একটা কাজ। কী চিঠি রে বাবা!


রাব্বি চিঠিটা পেয়ে নিশ্চিত হয়েছিল এ একটা বদ্ধউম্মাদ। ল্যাংটা পাগলের চেয়েও ভয়াবহ, স্রেফ কাপড় পরে থাকে এই পার্থক্য। একে পাগলা গারদে না রেখে খুব বড়ো ভুল করা হচ্ছে।
এর বিজনেস কার্ডটা দেখলেও কারও সন্দেহ থাকবে যে এর মাথায় সমস্যা আছে। ভাঁজ করা যায় এমন দু-পাতার একটা কার্ড। প্রথম পাতায় 'হেড অভ ট্রেড' এইসব ঠিক আছে কিন্তু অন্য পাতায় হাবিজাবি কী নেই যে লিখে রাখেনি। আল্লা জানে কোনটা সত্য কোনটা মিথ্যা!
 
সৈয়দ এই বিজনেস কার্ড আবার সবাইকে দেয় না, বেছে বেছে। অফিসের অনেকেই জানে না, বিশেষ করে বড় কর্তারা। এর বিজনেস কার্ডে এই সব বাছাল পড়ে রাব্বির হাসতে হাসতে চেয়ার থেকে উল্টে পড়েছিল। কেমন চুতিয়ার চুতিয়া!
রাব্বি আরেকটা বিষয় লক্ষ করেছে,  সৈয়দ ফোনটা উঠিয়েই বলবে,  সৈয়দ সাহেব বলছি। আবার অনেক সময় এমনও হয়, কাউকে বলবে, আচ্ছা তুমি যেটা করবে, ওর কাছে গিয়ে বলবে আমাকে সৈয়দ সাহেব পাঠিয়েছেন। হা হা হা। রাব্বির বিস্ময়ের শেষ নাই একটা মানুষ এতোটা নির্বোধ হয় কেমন করে। কেউ কি নিজেই নিজেকে সাহেব বলে নাকি!
রাব্বিকে একদিন বলছে, আচ্ছা, আপনি নাকি মার্কেটে দোকানদারদের কাছে আমার নাম ধরে বলেন?
রাব্বি অবাক, কই, না তো, বস!
হ্যা বলেন, ওই আর কি, আমার ডেজিগনেশনের সঙ্গে নাম জুড়ে দেন। এটা কি ঠিক?
বস, কি বলব তাহলে?
দোকানদারদের কি বলবেন, এটাও আপনাকে শিখিয়ে দিতে হবে! পান দোকানদার ডেজিগনেশনের কি বুঝবে? বলবেন,  এটা সৈয়দ সাহেবের...।
রাব্বি হাসবে না কাঁদবে বুঝে উঠতে পারছিল না। এই মানুষটার মাথায় কী এক ছটাক ঘিলুও নাই! এতো ছোট ছোট বিষয় নিয়ে কেউ এমন অস্থির হতে পারে। অজান্তেই মনখারাপ করা শ্বাস বেরিয়ে এলো, এই সব অযোগ্য মানুষরাই যোগ্য স্থানে বসে আছে।


ফোনের ওপাশে হ্যালো হ্যালো শুনে রাব্বির চমক ভাঙ্গল। রাব্বি সামলে নিয়ে হিম গলায় বলল, মি. সৈয়দ, আপনার কলম আমি নেইনি। আমি কেন না-বলে আপনার কলম নিতে যাব!
সৈয়দ সম্ভবত রাব্বির গলার উত্তাপ টের পেলেন, আপনি নেন নাই তো কলম গেল কোথায়?
রাব্বির মুখে এসে গিয়েছিল, গেল কোথায়-গেল কোথায়, হুম। এক কাজ কর চিমটা দিয়ে তোর রেকটামে খুঁজে দেখ, না পেলে আমার নাম বদলে ফেলব। মুখে বলল, আপনার কলম কোথায় এটার উত্তর তো আমার কাছে নাই। বস, এক কাজ করলে কেমন হয়, পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিলে?
সৈয়দ হিসহিস করে বললেন, আপনি কি আমার সঙ্গে রসিকতা করছেন। আপনি খুব দ্রুত দৌড়াচ্ছেন, একটু আস্তে।
জ্বী বস, আস্তে, এতো আস্তে দৌড়াব পিপড়াও আমাকে ওভার-টেক করে চলে যাবে।
ওপাশের লাইন কেটে গেছে।


সহায়ক লিংক:
১. জীবনটাই যখন নিলামে: http://tinyurl.com/2522ss6 

No comments: