Wednesday, May 25, 2011

'সাই-ফাই' লেখক হওয়ার তরিকা

­আজকের অতিথি লেখক শওকত আলী। তিনি বাতলাচ্ছেন 'সাই-ফাই' লেখক হওয়ার তরিকা:

"স্যার, আমায় চিনতে পেরেছেন?
-না।
ফাস্ট ইয়ার, সায়েন্স ডিপার্টমেন্ট। আমি আপনার সবগুলি ক্লাস নিয়মিত এটেন্ড করতাম।’
-হ্যা, এইবার চিনতে পেরেছি। আমার সবগুলি পরীক্ষায় তুমি নিয়মিত ফেল মারতে। তা এখন কি করছ?


এই তো স্যার, লেখালেখি করে পেট চালাই আর কি।‌
-ও আচ্ছা! আচ্ছা কেউ যদি তোমার পেটের দায়িত্ব নিয়ে নেয় তবে তুমি আর লেখালেখি করবা না, নাকি?


ঠিক তা নয় স্যার। আমার ইচ্ছা একজন জনপ্রিয় সাই-ফাই লেখক হওয়া।
-সাই বাবার নাম শুনেছি। সাই-ফাই আবার কি জিনিস, ঠিক বুঝলাম না! বুঝায়া বলো।

ও আল্লা! এটা আধুনিক সায়েন্স ফিকশন। সংক্ষেপে সাই-ফাই। আমার ধারণা সায়েন্সের ছাত্র হওয়াতে আমি এই লাইনে ভাল করব। আপনি সায়েন্সের শিক্ষক, তাই আপনার কাছে এসেছি একটি ভাল সায়েন্স ফিকশন নামাতে হলে কি কি লাগে তার টিপস জানতে।
-বাছা, তোমার কি ধারণা এটা বাজারের ফর্দ, চাইলেই ধরিয়ে দেয়া মাত্র যে কেউ চাইলেই লেখালেখি শুরু করে দিতে পারে!


স্যার আমার এই স্ক্রিপ্টটা পড়লেই আপনি বুঝতে পারবেন আমি কেমন জাঁদরেল লেখক।
-ঠিক আছে তুমি রেখে যাও, আমি সময় করে দেখব।

স্যার, আমি আপনাকে একটু পড়ে শোনাই?
-এ তো ভালই মুসিবতে পড়া গেল দেখছি!


শুনুন তাহলে স্যার, এক দল অভিযাত্রী উত্তর মেরু অভিযানে বের হয়েছে। জুল ভার্নের 'ক্যাপটেন হ্যাটেরাস' নামে এ রকম একটি কাহিনী আছে না। আমারটা আরও ভয়াবহ। সেখানে টেম্পেরেচার মাইনাস ২৯৯ ডিগ্রী সেঃ। যেখানে শূন্য ডিগ্রীতে পানি বরফ হয়ে যায়। তাহলে বুঝেন অবস্থা। কঠিন অবস্থা। সবার অবস্থা কেরোসিন। সব চেয়ে বেশী সমস্যা হচ্ছে পেশাব করা নিয়ে। কেউ পেশাব করতে পারছে না। পেশাব জমে বরফ হয়ে যাচ্ছে। চিন্তা করেন, পেশাব না-করে! তারপর...।
-থামো, আমরা ধারণা, জুলভার্ন বেঁচে থাকলে তোমার এই কাহিনী শুনে নির্ঘাত সুইসাইড করার চেষ্টা করতেন। পদার্থবিদ্যার সূত্র অনুযায়ী মাইনাস ২৭৩ ডিগ্রীর নীচে টেম্পেরেচার পৌঁছতে পারে না। সেখানে টেম্পেরেচার মাইনাস ২৯৯ ডিগ্রী সেঃ তুমি কোথায় পেলে? ফাজিল কাঁহিকা!

স্যার, এবার তাহলে আরেকটা শোনাই। এবার একদল অভিযাত্রী মহাকাশ পর্যবেক্ষণে বের হয়েছে। নভোযান পৃথিবীর সীমা ছাড়িয়ে পৌঁছে গেল মহাকাশে। আমি জুলভার্নের 'এ জার্নি টু দ্যা মুন’ গল্পটিকে কাটছাঁট করে চালিয়ে দেব। কেউ ধরতে পারবে না। অভিযাত্রীদের মধ্যে রয়েছে এক পাড় মাতাল। এক মুহূর্ত এলকোহল না হলে তার চলে না। পকেট থেকে একটু পর পর বোতল বের করে চুকচুক করে চুমুক দিচ্ছে। তারপর তারা নামল গিয়ে চাঁদে। আপনি তো জানেন স্যার, চাঁদে হাঁটা খুব কষ্টকর। একেক জনের পা যেন দশ মণ ভারী হয়ে রয়েছে। উঠতেই চায় না।
-স্টপ। আরে আগে তো সায়েন্স, তারপর না ফিকশন। মহাশূন্যে গিয়ে কেউ চুমুক দিয়ে তরল পান করছে এটাতো আমি বাপের জন্মে শুনিনি। কোন নভোযান যখন পৃথিবীর অভিকর্ষ বলকে অতিক্রম করে যাবে তখন মহাশূন্যে থাকা অবস্থায় ইচ্ছা করলেও বোতল থেকে উপুড় করে পানি ঢালা যাবে না। আর চাঁদেও একই জিনিস ঘটবে। অভিকর্ষ বলের কারণে মানুষ তার ওজন হারাবে। অভিযাত্রীরা এমনিতেই নিজেদেরকে ওজনশূণ্য অনুভব করবেন। সেই জায়গায় পা দশ মণ ভারী হয়ে আছে, যত্তসব।


স্যার তাহলে আরেকটা শোনাই।
-আমাকে এবার মুক্তি দাও। বাবা, তুমি অন্য লাইনে চেষ্টা করো।

স্যার প্লিজ, এটাই লাস্ট। এবারের কাহিনী অতি আধুনিক। 'মেট্রিক্স' ছবি তো আপনি নিশ্চয়ই দেখে থাকবেন। এ লেখাটা অনেকটা তার ছায়া অবলম্বনে লেখা। আমার গল্পের নায়ক পুলিশ অফিসার। ক্রিমিনাল ধরতে লম্বা-লম্বা চুল বাতাসে উড়িয়ে প্রাণপণে ছুটছে। পরনে তার বিশেষ পোশাক। এদিকে ঘটনা দেখেন, নীল প্যান্টের নীচে তার লাল আন্ডারওয়্যার দেখা যাচ্ছে।
-'রুখ-রুখ', এক মিনিট। প্যান্টের নীচে তুমি কিভাবে আন্ডারওয়্যার দেখতে পেলে?
এটা আধুনিক স্বচ্ছ পলিমারের প্যান্ট। আর আগের সুপারম্যান প্যান্টের উপরে আন্ডারওয়্যার পরত। কিন্তু আমার আধুনিক সুপার হিরো এত আবুল নয়। পাঠক যখন ভাবতে শুরু করে দিয়েছে পুলিশ ক্রিমিনাল ধাওয়া করছে এ আর এমন নতুন কি। ঠিক তখনই আমি আসল চমক দেখাব। কারণ আমার হিরো কোন মানুষ নয়। মানুষের মত দেখতে একটি নবম স্কেলের রোবট।
-থামো। তুমি এই মুহূর্তে তোমার স্ক্রিপ্ট নিয়ে এখান থেকে বিদায় হবে, আর এক মুহূর্ত না। তুমি আর কিছুক্ষণ থাকলে আমাকেও জুলভার্নের মত অকালে বিদায় নিতে হবে। নীল প্যান্টের নীচে লাল আন্ডারওয়্যার! হলি কাউ! রঙ্গিন কাপড়ের নীচে অন্য কোন রঙ্গীন কাপড় কাল দেখাবে। আর তুমি দেখছ লাল! তুমি এই কঠিন লাইনে চেষ্টা বাদ দিয়ে প্রথমে হালকা মানের লেখা দিয়ে শুরু কর। যেমন বাচ্চাদের ছড়া। প্রেমের কবিতা ইত্যাদি।


ঠিক আছে স্যার, আমি পরবর্তীতে আরও ভাল স্ক্রীপ্ট নিয়ে আপনার কাছে আসব। আমাকে একজন ভাল সাই-ফাই লেখক হতেই হবে।

এক বছর পর। ওই লেখক এখনও পুরোদমে তার লেখালেখি চালিয়ে যাচ্ছেন। এখন তিনি বাংলা সিনেমার কাহিনী লেখেন। এখানে যুক্তি-ফুক্তির কোন বালাই নেই।
নায়িকা রোড অ্যাকসিডেন্টে আহত। হাসপাতালে নেবার সময় নেই। রক্ত দরকার। নায়ক পকেট থেকে নেশা করার সিরিঞ্জ বের করে নিজের শরীরের রক্ত টেনে-টেনে বের করে নায়িকার শরীরে ঢোকাতে শুরু করল। ব্লাড মেচিং এর কোন প্রয়োজন নেই। ভালোবাসার মাঝে রক্তের গ্রুপ কোন সমস্যা না। একটু পর নায়িকা চোখ মেলল। চৈত্রের ভর দুপুরে শুরু হল বৃষ্টি। আর তার সাথে বৃষ্টি ভেজা হেভি জোসীলা নাচ-গান।

নায়ক গেয়ে উঠল: নেশা আছে হেরোইনে, নেশা আছে প্যাথেডিনে
তারচাইতেও অধিক নেশা কইন্যা তোমার যৌবন সুধাতে…এ…এ…এ।


এরপর নায়িকা গেয়ে উঠল: আমার আঁচল উড়াইয়া নিল মরার বাতাসে
আমার যৌবন ভাসিয়া গেল বৃষ্টির বালুতে….এ….এ….এ।

(ভালবাসার গানে বালুবৃষ্টি হলেও কোন সমস্যা নেই
এখানে একটি তিন ঘন্টা ছবি চলার মত কাহিনী হলেই চলে। আর কাহিনীরও তেমন কিছু নেই। কয়েকটি হিন্দী-ইংরেজী ছবির কাহিনী কাট-পেস্ট করে দিলেই চলে। বর্তমানে তিনি এখন জনপ্রিয় একজন কাহিনী লেখক। ডিজিটাল লেখক...।"

6 comments:

your doctor said...

দা মু পে(দারুন মজা পেলাম)...।

রাশেদ said...

অনেকদিন পর চমতকার্ একটা লেখা পড়লাম

Anonymous said...

চমৎকার "সাই-ফাই"৷ ভালো লাগলো৷

nil said...

valo laglo :-)

।আলী মাহমেদ। said...

দামুপে না, দামপে :)@your doctor

।আলী মাহমেদ। said...

ধন্যবাদ, এটা লেখকের প্রাপ্য @রাশেদ, Anonymous,nil