My Blog List

Friday, June 29, 2007

মস্তিষ্ক বেচারার ঘুম নাই!

মানুষের শরীর আমার কাছে মনে হয় অসীম আশ্চর্য, একজন মানুষের বেঁচে থাকাটাই মহা আশ্চর্য! মস্তিষ্ক হচ্ছে সবচেয়ে জটিল এবং চিন্তার অতীত এক সম্পদ!
ড. স্মীথের স্পষ্ট বক্তব্য, মানুষকে বুঝতে হলে মস্তিষ্ককে বুঝতে হবে।

মস্তিষ্ক নিয়ে আমি আমার অল্প জ্ঞানে যা বুঝি, আমি কি দেখতে চাই এবং মস্তিষ্ক আমাকে কি দেখাতে চায়? এ এক রহস্য।
এখানে প্রাসঙ্গিক একটা উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। উইলিয়াম জেমস এক লোকের বর্ণনা দিয়েছেন।
বিশেষ ড্রাগ বা ইচ্ছা শক্তির মাধ্যমে মস্তিষ্ককে অনেকখানি বিভ্রান্ত বা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। একজন লাফিং গ্যাসের ঘোরে যখন থাকতেন, তখন তিনি দাবী করতেন, তিনি মহাবিশ্বের রহস্য জেনে যেতেন। কিন্ত এই ঘোর কেটে গেলে তিনি মনে রাখতে পারতেন না। তাকে বলা হলো যে কোন রকমে এই রহস্যটা কোন একটা উপায়ে লিপিবদ্ধ করার জন্য। একদা তিনি সমর্থ হলেন কাগজে ওই রহস্য লিখে ফেলতে।

পরে কাগজটা খুলে দেখা গেল, তিনি লিখেছেন, 'চারদিকে পেট্রলিয়ামের গন্ধ'!

সমার্থক একটা কথা আছে হেরাক্লিটাসের, "আমরা একই নদীতে পা দেই এবং দেই না; আমরা আছি এবং নেই।"
 

প্লেটোর ইউটোপিয়ার এই উপমাটা আমার কাছে দুর্ধর্ষ মনে হয়। একটা গুহায়, কেবলমাত্র একদিকে তাকাতে পারে (বেঁধে রাখার কারণে) কিছু কয়েদিকে আটকে রাখা হলো। তাদের পেছনে আগুন, সামনে দেয়াল- মাঝামাঝি আর কিছু নাই। ছায়াগুলোকে এরা অবধারিতভাবে বাস্তব মনে করবে।
কারণ পেছনের আগুনের উৎস সম্পর্কে এদের কোন ধারণা নাই, মস্তিষ্ককে এর প্রয়োজনীয় উপাত্ত দেয়া হয়নি। অবশেষে একদিন, কেউ, এই গুহা থেকে পালিয়ে সূর্যের আলোতে এসে দাঁড়ালে প্রকৃত বাস্তবের মুখোমুখি হবে এবং নিশ্চিত হবে, এতে দিন যে যেটাকে বাস্তব জেনে এসেছে তা ভ্রান্ত!
ফিরে এলেও, পালিয়ে যাওয়া মানুষটির কথা ওই কয়েদিরা বিশ্বাস করবে না, যে পর্যন্ত না এরা নিজেরা মুক্ত হয়। পালিয়ে যাওয়া মানুষটি এই গুহায় ফিরে এলেও পূর্বের বাস্তবকে এলোমেলো মনে হলেও, অন্যরা এটাই সত্য মেনে প্রকৃত বাস্তবের মুখোমুখি হওয়া বোকামী মনে করবে।

এই যে আমরা একটা দ্রুতগতির গাড়ির নিচে পড়া থেকে বাঁচার জন্য চোখের নিমিষে সরে পড়ি। খুব সাধারণ একটা ঘটনা। অহরহই হয়।
অথচ মানুষের মস্তিষ্কের কোন কোন ক্যামিকেল রিঅ্যাকশন হতে সময় লাগে সেকেন্ডের ১০ লাখ ভাগের এক ভাগ। এই যে চট করে সরে পড়লাম এ জন্য মস্তিষ্কের ১ লাখ নিউরোনের মধ্যে যোগাযোগ এবং সমন্বয়ের প্রয়োজন হয়েছে এবং পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে ১ সেকেন্ডেরও অনেক অনেক কম সময়ে।
এরি মধ্যে মস্তিষ্ক তার প্রয়েজনীয় সমস্ত উপাত্ত নিয়ে, এ পর্যন্ত তার অর্জিত তথ্য নিয়ে পারিপার্শ্বিক অবস্থা, কার্যকারিতা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছে, সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এরপর এ মুহূর্তে শরীরের প্রয়োজনীয় অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলোকে একের পর এক নির্দেশ প্রেরণ করেছে।

অন্য রকম করে দেখা যাক। একজন গাড়ি চালক ঝড়ের গতিতে যাচ্ছেন। সামনে আরেকটা গাড়ি তিনি অতিক্রম করবেন। উল্টো দিক থেকে আরেকটা গাড়িও আসছে। খুব কঠিন কোন কাজ না- প্রায়শ এটা হয়েই থাকে।
এখন অতিক্রম করবেন, কি করবেন না, এ বিষয়ে তিনি একটা সিদ্ধান্ত নেবেন। সিদ্ধান্তটা আসলে তিনি নিচ্ছেন, নাকি মস্তিষ্ক?
মস্তিষ্ক প্রথমেই যাচাই করবে তার গাড়ির গতি, এরপর সামনের গাড়ির গতি, অবশেষে উল্টো দিক থেকে ছুটে আসা গাড়ির গতি, মাঝখানের দূরত্ব। সব কিছু মিলিয়ে মস্তিষ্ক সিদ্ধান্ত নেবে আদৌ অতিক্রম করা সম্ভব, কি সম্ভব না।
এবং যথারীতি এই নির্দেশ প্রেরণ করবে শরীরের সমস্ত কল-কব্জায়। এরপর এক্সিলেটর, ক্লাচ, গিয়ারের কারুকাজ। এত কিছুর জন্য মস্তিষ্ক বেচরাকে কি ১ সেকেন্ড সময়ও আদৌ দেয়া হয়!
একজন কৃষকের মস্তিষ্ককে এই হ্যাপা পোহাতে হয় না। গাড়ি সংক্রান্ত কমান্ডের সঙ্গে ওই মস্তিষ্ককে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়নি।


আরেকটু মোটা দাগে দেখা যাক। একটা চলনসই কম্পিউটারে আনুমানিক হাজার ত্রিশেক ফাইল থাকে, ছোট বড় মিলিয়ে। মজার বিষয় হচ্ছে, প্রচুর ফাইল নিস্ক্রিয় থাকে বছরের পর বছর ধরে অথচ একটা কমান্ড দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে এ্যাকটিভেট হয়ে তার কাজ শুরু হয়ে দেয় নিমিষেই।

মস্তিষ্ক হচ্ছে, ছুঁরির মতো- যত শান দেয়া হবে, হয়ে উঠবে ততই ক্ষুরধার, ওজনে কিঞ্চিৎ কম, তাতে কী! মস্তিষ্ক বেচারার বড়ো কষ্ট, ঘুমাবার কোন উপায় নাই, মারা যাওয়ার আগ অবধি! বেচারা!!

No comments: