Friday, May 17, 2013

লং লিভ মাই কান্ট্রিম্যান: তাহের

এটাই ছিল তাহেরের শেষ কথা। এরপরই তার স্বরযন্ত্র ভেঙ্গে দেয়া হয়। এই অগ্নিপুরুষকে ১৯৭৬ সালের ২১ জুলাই ভোরে যখন ফাঁসি দেয়া হয়, ফাঁসির মঞ্চে রশিতে ঝোলার ৩০ সেকেন্ড আগে ঠিক এই কথাটাই তাহের উচ্চারণ করে গিয়েছিলেন।
তাহেরের গোপন বিচারের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা নিয়ে রিট আবেদনে হাইকোর্টে তৎকালীন ম্যাজিষ্ট্রেট খন্দকার ফজলুল রহমান, যিনি তাহেরের ফাঁসির সময় উপস্থিত ছিলেন; তিনি এই তথ্যটি জানান।

তিনি আরও বলেন, "...ওই সময় তাহের একটি কবিতা এবং ২টি সিগারেট পাইপ আমার হাতে দিয়ে বলেন, তাঁর বড় ভাইয়ের কাছে পৌঁছে দিতে। তাহের আমাকে আরও বলেছিলেন, 'দেখেন, (ফাঁসির) রশি ঠিক আছে কি না, ভ্যাসলিন দেওয়া হয়েছে কি না'।
ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যাওয়ার সময় তাহের বললেন, 'আমি মাস্ক পরব না'। (যে কালো কাপড়ে দিয়ে মুখ ঢেকে দেয়া হয়)
আমি বলি, 'আইনে আছে মাস্ক পরে যেতে হয়'। ..."

'লং লিভ মাই কান্ট্রিম্যান', মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও তাহের দেশ, দেশের মানুষের কথা ভোলেননি! আমার একটা কথা আমি লেখায় প্রায়শ ব্যবহার করি, 'মৃত্যু এসে গা ছুঁয়ে বলে, পাগল তোকে ছুঁয়ে দিলাম'। তাহেরের বেলায় হবে উল্টোটা। তিনি মৃত্যুর গা ছুঁয়ে হা হা করে হাসেন। এমন একজন মানুষের মুখোমুখি হয়ে মৃত্যু কী খানিকটা বিমর্ষ, কুন্ঠিত-লজ্জিত হয়, কে জানে!

তাহেরের স্ত্রী মিসেস লুৎফা তাহের বলেছিলেন:
"...তাহেরের সঙ্গে দেখা করতে গেছি। জেলখানায় থাকাকালীন এত মজার মজার ঘটনা আমাদের বলল। ...আমরাও হাসতে হাসতে বিদায় নিলাম। আমরা চিন্তাই করতে পারিনি আজকে রাতেই ফাঁসি হবে। (পরে জেনেছি আজকে রাতেই যে ফাঁসি হবে এটা তাহের জানত)
...জেলখানা থেকে টেলিফোন আসল লাশ নেয়ার জন্য। আমরা বললাম, ঢাকায় কবর দেব। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় বলল, না। তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আমার শাশুড়ি অনেক ঝগড়া করলেন। কিছুতেই তারা ঢাকায় কবর দিতে দেবে না।

অবশেষে সিদ্ধান্ত হলো তাহেরের কাজলা গ্রামে লাশ হেলিকপ্টারে করে নিয়ে যাওয়া হবে। হেলিকপ্টারে উঠে এই প্রথম আমি তাহেরের লাশ দেখলাম। আমি চেয়ে চেয়ে দেখলাম, একজন শীর্ষস্থানীয় মুক্তিযোদ্ধার আজ এই পরিণতি! জেলখানার একটা ছেঁড়া চাদর দিয়ে তাঁর শরীর ঢাকা। তাঁর পা ও মাথা বের হয়ে আছে! তাহেরের মাথার চুল উড়ছে!
তাহেরের মা চিৎকার করে বললেন, 'আমার ছেলের জন্য একটা কফিনও হলো না'।...।"

কথিত আছে, নিষ্ঠুর আইয়ুব খান একবার তার সৈন্য-সামন্ত নিয়ে যাচ্ছিলেন। পেছনে পেছনে একটি বেসরকারী লাশবাহী গাড়ি আসছিল কিন্তু আইয়ুব খানের গাড়িকে অতিক্রম করার সাহস পাচ্ছিল না। আইয়ুব খান বিষয়টি লক্ষ করলেন এবং খোঁজ নিয়ে যখন জানলেন এই গাড়িতে লাশ আছে, তখন তিনি নিজের গাড়ি থামালেন, লাশবাহী গাড়িকে আগে যেতে বললেন এবং স্যালুট করলেন।

কেবল যে তাহেরের সঙ্গে ঘোরতর অন্যায় করা হয়েছিল তাই না, তাহের নামের লাশের প্রতিও চরম অবজ্ঞা দেখানো হয়েছিল। আমরা ভুলে যাই কিন্তু ইতিহাস ভোলে না। প্রকৃতির শোধ বলে একটা কথা আছে। হিস্ট্রি রিপিট...।


* আইয়ুব খানের বিষয়টা সম্বন্ধে আমার খানিক সংশয় ছিল কারণ এটা আমি শুনেছিলাম এক আর্মি অফিসারের মুখ থেকে। কেবল শুনেই তো লিখে দেওয়া যায় না। তাই আমি লিখেছিলাম, 'কথিত আছে'।
কিন্তু এই বিষয়ে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন Abdullah Al Imran
"তবে মোটামুটি বছর ছয় কি সাত আগে 'ছুটির দিনে' ম্যাগাজিনের কাভার স্টোরি করা হয়েছিল 'আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম'-কে নিয়ে। আমার স্পষ্ট মনে আছে সেখানে একেবারে শুরুর লাইনটাই ছিল এটা। আইয়ুব খান যে লাশের গাড়িটাকে স্যালুট করেছিলেন সেটা ছিল আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামের লাশ বহনকারী ঘোড়ার গাড়ি। লাশটা থেকে নাকি পঁচা দুর্গন্ধ ও বের হচ্ছিল...।" Abdullah Al Imran


No comments: