Saturday, October 13, 2012

দাঁড়াবার কোনো জায়গা নাই!

­"ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রানীখার 'আল-আমীন গাউছিয়া এতিমখানায়' এতিম না থাকলেও নিয়মিত সরকারি টাকা তুলে নেয়া হচ্ছে। এতিমখানা পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা পরিষদ প্রশাসক সৈয়দ একেএম এমদাদুল বারী এবং সাধারণ সম্পাদকের স্বাক্ষরে নিয়মিত এই টাকা তোলা হচ্ছে ব্যাংক থেকে।...।" [১]

ছবি ঋণ: মানবকন্ঠ
বুকে একটা ধাক্কার মত লাগে। এমন না, পত্র-পত্রিকায় এমন সংবাদ আর কখনও পড়িনি। কিন্তু...! জেলা পরিষদ প্রশাসক সৈয়দ একেএম এমদাদুল বারী মানুষটাকে অন্য এক সূত্রে আমি চিনি। এমন বড় মাপের মানুষের সঙ্গে আমার 'চিন-পরিচয়' থাকাটা খানিকটা অস্বাভাবিক। তবুও...।
যে এতিমখানা নিয়ে তাঁর প্রতি অভিযোগ উঠেছে সেই মাদ্রাসায় খোঁজ-খবর নিয়ে অবিকল এই তথ্যগুলোই পাওয়া গেছে। কথিত এই এতিমখানাটা বারী সাহেবের গ্রামের বাড়ির পাশেই। বাড়ির সঙ্গেই এর অবস্থান। মাসের-পর-মাস ওই এতিমখানায় সাতজন এতিমের জন্য প্রতিমাসে সাত হাজার টাকা উত্তোলন করে খরচ দেখানো হয়েছে অথচ কোনো এতিমের খোঁজ পাওয়া যায়নি।

"...জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের একটি সূত্র জানায়, ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত রানীখার আল-আমীন গাউছিয়া এতিমখানার সাতজন এতিমের জন্য সরকারিভাবে প্রতিমাসে বরাদ্দ আছে সাত হাজার টাকা। এছাড়া এদের পড়াশোনায় তিনজন শিক্ষকের জন্য বরাদ্দ আছে আরও এক হাজার টাকা।
...এদিকে সাংবাদিক আসার খবর পেয়েই ছুটে আসেন সৈয়দ এমদাদুল বারী গাউছিয়া মাদ্রাসার সুপার ও এতিমখানা পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক শেখ তাজুল ইসলাম। তিনি জানান, এখানে ৭ জন এতিম এবং ৮ জন দুস্থ থাকার ব্যবস্থা আছে। তবে এতিম কোথায় জানতে চাইলে তিনি কাউকে দেখাতে পারেননি। তিনি জানান, এখন এতিম পাওয়া খুব কষ্টকর। যারা ছিল তারা পাস করে চলে গেছে। আমরা চেষ্টা করছি এতিম আনতে।..." [১]

মাদ্রাসা সুপার এটা কী বললেন! এ গ্রহে আট জন মানুষের মধ্যে একজন খেতে পায় না। এই দেশে প্রায় ৭৫ লক্ষ মানুষ রাতে ঘুমাতে যায় না-খেয়ে অথচ তিনি এতিম খুঁজে পাচ্ছেন না! এতিমের সংজ্ঞা নতুন করে লিখলেই হয়। লিখুন, আমরাও তো এতিম- বাপ নাই, মা নাই। পাঠক নিজের গায়ে নেবেন না, আমি নিজের কথা বলছি...।

"...এ ব্যাপারে এতিমখানা পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও জেলা পরিষদ প্রশাসক আলহাজ অ্যাডভোকেট সৈয়দ একেএম এমদাদুল বারী মানবকণ্ঠকে বলেন, ‘এতিমখানাটি দেখাশোনা করছেন মাদ্রাসা প্রিন্সিপাল তাজুল ইসলাম। কিছু ভুল ত্রুটি থাকতে পারে। তবে এবারের ঈদের আগে বাড়ি গিয়ে এসব বিষয়ে খোঁজ নেব।..." [১]
ভদ্রলোক ভালই যুক্তি দেখিয়েছেন। ডিজিটাল দেশের ডিজিটাল প্রশাসক তিনি! তাও বাড়ির পাশে আরশিনগর...! এই ভদ্রলোক আইনের মানুষ। দুঁদে আইনজীবী ছিলেন। ছাপার অক্ষরে, আইনের গরম গরম কিতাবে আইন ভাজা ভাজা করেছেন। আমার জানায় ভুল না-হলে তাঁর এক ছেলের আছে গাড়ির শো-রুম, অন্য ছেলে আইনজীবী, তাঁর এক মেয়ে ডিসি।

যাই হোক, আমার বুকে ধাক্কা লাগার বিষয়টা বলি:
এবার পহেলা বৈশাখে পৌরসভা ঠিক করল বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের জন্য পাঁচজনকে সম্মাননা জানাবে। কোনো এক বিচিত্র কারণে তালিকায় আমার নামটাও চলে এল।
শপথ আমার লেখালেখির, আমি লবিং শুরু করলাম যাতে আমার নামটা না-দিয়ে অন্য কারো নাম দেয়া হয়। এর পেছনে আমার কঠিন যুক্তি ছিল। আমি চাচ্ছিলাম, এখানকারই অতি বয়স্ক কোনো একজনকে এটা দেয়া হোক। যিনি সমস্তটা জীবন এই নিয়ে পার করেছেন। কে জানে, হয়তো মানুষটাকে একটা শেষ সম্মান দেখানো হবে।
কেউ কেউ রসিকতাও করলেন, 'আপনি নিজেকে কি যুবক মনে করেন, জুলফি-টুলফি পেকে তো 'ছেড়াবেড়া' অবস্থা। আমি সাদা জুলফির জন্য দুঃখিত হই, বেচারা জুলফি!

অনেকের কাছে বালকসুলভ ভাবনা মনে হতে পারে কিন্তু তখন এটাই আমার মনে হয়েছিল। যেখানটায় আমি ক্রমশ বেড়ে উঠেছি সেখানে আমি কেন আবার...! আমার লজ্জা করে না বুঝি- এখানকার কতশত মুরুব্বির চোখে এখনও আটকে আছে হাফ-প্যান্টপরা সেই কিশোর, পারলে যে কিশোরটা তার চিকন চিকন ঠ্যাং নিয়ে মাটিতে সমাধি নেয়। এঁদের চোখে আমি আবার কবে বড় হলাম!
আরও যেটা মনে হচ্ছিল, যা হয় আর কী- রাজনীতির মধ্যে না পলিটিক্স ঢুকে যায়। এখানে আবার...।

আমাকে নিশ্চিত করা হল, এখানে কোনো রাজনৈতিক প্রভাব-ট্রভাব নাই। তারপরও আমার দ্বিধা যায় না। কী যন্ত্রণা, আলাদা গাম্ভীর্য নিয়ে মুখ গম্ভীর করে মঞ্চে বসে থাকতে হবে। তারচেয়েও ভয়ংকর যেটা আমাকে বক্তিমার নামে কিছু একটা বলতে হবে। কথা বলতে গেলেই তো আমার সব ভজকট হয়ে যায়।
ওয়াল্লা, এঁরা, আয়োজগণ দেখি বিরক্ত হন না। এঁরা সম্ভবত দেখতে চাচ্ছিলেন, এই দুর্বিনীত মানুষটা আর কী কী প্রলাপ বকে।
নাহ, মানুষগুলো সহৃদয়। আমাকে বলা হল, আচ্ছা যান, আপনাকে মঞ্চেও বসতে হবে না আপনি কেবল ক্রেস্টটা...।

কিন্তু যখন আমাকে বলা হল, প্রধান অতিথি থাকবেন জেলা প্রশাসক এবার আমি খানিকটা আঁতকে উঠলাম। আহ, ঘুরেফিরে সেই আমলা। আমাকে জানানো হল, না, জেলা প্রশাসক না, জেলা পরিষদ প্রশাসক। খুবই নীতিবান মানুষ। এই জেলা পরিষদ প্রশাসকই হচ্ছেন, এই মানুষটা, সৈয়দ একেএম এমদাদুল বারী। আলহাজ, এডভোকেট এমদাদুল বারী।
এই মানুষটার হাত থেকেই আমাকে ক্রেস্টটা নিতে হয়েছিল।
ছবি ঋণ: কাজী আজহার উদ্দিন
হা ঈশ্বর, কোথায় যাই, কার কাছে যাই। এই দেশে দাঁড়াবার মত জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে। আমরা আমাদের সন্তানদের কাকে দেখিয়ে বলব, ব্যাটা দেখ-দেখ, মানুটাকে ভাল করে দেখ। পারলে এর মত হওয়ার চেষ্টা করবি।
এই দেশে অধিকাংশ লেখক বুদ্ধিজীবীই আমাদের মাথা চিবিয়ে খান। এঁরা চোখে কালো চশমা লাগিয়ে আলো-আলো বেশি আলো বলে মিথ্যার বেসাতি করেন। এঁদের মত আমার এতো বুদ্ধি নাই বলেই আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, এই দেশটা এখন ফরমালিনে চুবানো আছে বলেই চকচক করছে। যেদিন ফরমালিনটা সরিয়ে নেয়া হবে সেদিন ভক করে গন্ধটা ছড়িয়ে পড়বে। গলায় আঙুল দিয়ে বমি করার আর প্রয়োজন পড়বে না। একে অন্যের গায়ে এমনিতেই হড়হড় করে বমি করে দেব...।

সহায়ক সূত্র: 
১. দৈনিক মানবকন্ঠ: http://www.manobkantha.net/archive_details.php?id=88046&&%20page_id=%2063&issue_date=%202012-10-11

No comments: