Tuesday, June 30, 2020

একালের হিমু!


লেখক: Ratul Khan

"‘নাম কি?’ রমনা থানার ওসি রবিউল্লাহ খাদেম নাক চুলকাতে চুলকাতে জিজ্ঞেস করলেন।
‘জ্বি, হিমু। ভাল নাম হিমালয়। হিমালয় থেকে হিমু।’

‘এত রাতে রাস্তায় কি করছিলেন?’ ঘোঁতঘোঁত করে উঠলেন ওসি সাহেব।
‘খালার বাসায় দাওয়াত খেতে যাচ্ছিলাম স্যার।’
‘খালার বাসা কোথায়? ঠিকানা কি?’
‘ঠিকানা তো জানি না স্যার, তবে বাসাটা চিনি।’
‘আপনার খালার মোবাইল নাম্বার বলেন।’
‘মোবাইল নাম্বার তো জানি না স্যার’
হাসি ফুটলো ওসি সাহবের মুখে। আসামীকে কোনঠাসা করে ফেলছেন প্রায়।
‘কি করা হয়?’
‘কিছু করা হয় না স্যার।’
‘কিছু একটা তো অবশ্যই করা হয়,’ রাগী গলায় বললেন ওসি সাহেব।
‘স্যার, আমি হাঁটাহাঁটি করি।’
‘হাঁটাহাঁটি করে নিশ্চয়ই পেট চলে না!’
‘জ্বি না স্যার। হাঁটাহাঁটি করে পা চলতে পারে, পেট চলার তো প্রশ্নই আসে না।’

ওসি সাহবের নাকের ফুটো বড় হয়ে গেছে, স্পস্ট বোঝা যাচ্ছে রেগে গেছেন তিনি, ‘যা যা জিজ্ঞাস করবো, স্ট্রেইট উত্তর দিবি। বোঝা গেছে?’ ওসি সাহেব তুমি থেকে ডাইরেক্ট তুই এ চলে গেছেন।
‘জ্বি আচ্ছা স্যার,’ ভয় পাওয়া গলায় বললাম আমি।
‘গুড। তোর প্রফেশনটা কি? চাকরি , ব্যবসা নাকি বেকার?’
‘স্যার, আমি একজন দেখক।’
‘কি বললি? তুই লেখক?’
‘জ্বি না স্যার। লেখক না, দেখক। আমি একজন দেখক।’
‘দেখকের কাজটা কি?’ মেঘস্বরে জিজ্ঞেস করলেন ওসি সাহেব।
‘স্যার দেখকের কাজ হচ্ছে শুধু দেখে যাওয়া। আমি হাঁটাহাঁটি করি এবং দেখি।’
‘হিউয়েন সাং হয়েছিস? নাকি ইবনে বতুতা?’
‘জ্বি না স্যার,’ গম্ভীর ভঙ্গিতে বললাম আমি, ‘উনারা পর্যটক ছিলেন, ট্রাভেলার। দেখকের ইংরেজি কি জানি না, তবে আপতকালীন ব্যবস্থা হিসেবে ‘অবজার্ভার’ শব্দটা ব্যবহার করা যেতে পারে।’
‘বাংলাদেশ অবজার্ভারের নাম শুনেছিস?’ টেবিলের উপর ঝুঁকে এলেন ওসি সাহেব।
‘শুনেছি স্যার,’ খুশি খুশি গলায় বললাম, ‘ইংরেজি পত্রিকা। এক সময় খুব চলত। এখন কোমায় আছে। কর্মচারীরা বেতনের দাবীতে পত্রিকার বামপাশের কলামের উপরের দিকে এক বাই তিন ইঞ্চি জায়গা ফাঁকা রাখছে।’
‘কাল শুধু বাংলাদেশ অবজার্ভারে না, দ্বিতীয় আলো, আকালের কন্ঠ, ঋণখেলাপ, মিথ্যাফাক সহ সব পত্রিকায় খবর ছাপা হবে তোর। ছবি সহ। রঙিন ছবি।’
‘কেন স্যার?’ ভীত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলাম।
‘তুই দেখক, না? আমি তোকে দেখিয়ে ছাড়ব ওসি রবিউল্লাহ কি জিনিস! আমার লগে বাইচলামি!’
‘আমার অপরাধটা কি হবে? ইয়াবা বিক্রেতা আটক? নাকি দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী 'হলুদ হিমু' গ্রেপ্তার?’

ওসি সাহবের নাকের ফুটো বড় হয়ে গেছে, যে-কোন মুহুর্তে শারীরিক আক্রমণ শুরু হয়ে যেতে পারে।
‘না মানে বলছিলাম কেসটা ঠিকমত সাজাতে না পারেন তাহলে পড়ে ভজঘট হয়ে যেতে পারে। যেমন ধরেন লিখলেন যে আমার পাঞ্জাবীর পকেট থেকে ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে। কিন্তু পরে দেখা গেল যে আমার পাঞ্জাবীর পকেটই নাই!’
‘তোকে শেষবারের মত সুযোগ দিচ্ছি! হাঙ্কিপাঙ্কি না করে বল তোর প্রফেশন কি?’
‘স্যার আমি হাবিখা  প্রকল্পের সাথে জড়িত।’
‘হাবিখা প্রকল্পটা কি?’
‘হাবিখা হচ্ছে স্যার হাঁটার বিনিময়ে খাদ্য। সরকারের যেমন কাবিখা- কাজের বিনিময়ে খাদ্য, পুলিশের যেমন ঘুবিকা– ঘুষের বিনিময়ে কাজ; এইরকম আমার হচ্ছে হাবিখা। সোজা কথায় ভিক্ষাবৃত্তি বলতে পারেন স্যার।’
‘তুই ফকির? ভিক্ষা করে খাস?’
‘ফকির না স্যার, ভিক্ষুক। ফকির এবং ভিক্ষুকের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য আছে আশা করি জানেন?’
‘রোলারের ডলা আর রোলারের গুতোর মধ্যে যে মৌলিক পার্থক্য আছে সেটা জানিস?’
‘জ্বি না স্যার।’
‘এখন জানবি,’ মধুর করে হাসার চেষ্টা করলেন ওসি সাহেব, মধুর হলনা হাসিটা। দেখে মনে হচ্ছে ওসি সাহেব অনেক কষ্ট করে পায়খানা চেপে আছেন, কিন্তু পারছেন না। যে কোন মূহুর্তে ঘটনা ঘটে যাবে।
আমি শঙ্কিত বোধ করলাম, এবার সম্ভবত আর কোন ভাবেই রোলারের ডলা থেকে বাঁচা গেল না। প্রতিবারই কোন-না-কোন ভাবে বেঁচে যাই। রোলারের ডলা’ সম্ভাবনায় থানায় কেমন একটা উৎসব উৎসব ভাব চলে এসেছে। ওসি সাহেবের জন্য গরম চা এবং বাসি কেক চলে এসেছে। সেকেন্ড অফিসার আয়েশ করে সিঙ্গারা খাচ্ছেন। গায়ে শক্তি বাড়িয়ে নিচ্ছেন মনে হয়।
ওসি সাহেব একটা সিগারেট ধরিয়ে চায়ের কাপটা টেনে নিলেন, চুমুক দিতে যাবেন তখন আমি গম্ভীর ভঙ্গিতে বললাম, ‘এখন চা না খাওয়াটাই ভাল হবে স্যার।’
ওসি সাহেব কোন কথা না বলে চোখে প্রশ্ন নিয়ে তাকিয়ে রইলেন, তবে চায়ে চুমুক দিলেন না। আমি কাঁচুমাচু মুখ করে বললাম,‘স্যার, চা এবং সিগারেটের কম্বিনেশন খুব মারাত্মক জিনিস। বিশেষ করে হাগু চেপে রাখার সময় এই দুটো জিনিস একসাথে খাওয়া কখনই ঠিক না।’

এবারও কোন কথা বললেন না ওসি সাহেব, তাঁর চোখে এখন অজগর সাপের দৃষ্টি। আমি ভয়ে ভয়ে বললাম, ‘এটা আমার কথা না স্যার, পরীক্ষিত সত্য। চা এবং এবং সিগারেটের যৌথ বিক্রিয়ায় কোষ্ঠের প্রকোষ্ঠের মধ্যে সুনামি সৃষ্টি করে। আর তখনই স্যার ফারাক্কা বাঁধ ভেঙ্গে কোষ্ঠ বের হয়ে আসে। কোষ্ঠ মানে জানেন তো স্যার? কোষ্ঠ মানে হচ্ছে গু। ধরুন আপনি অনেকক্ষন ধরে চেষ্টা করে হাগু চেপে আছেন, কিন্তু সেই সময় ভুল করে একটা সিগারেট আর এক কাপ চা খেয়ে ফেললেন। তারপর চেয়ার থেকে উঠতে গেলেন, আর তখনই বুঝতে পারলেন যে পাছার নিচে আঠা আঠা ভেজা ভেজা কি যেন লেগে আছে। শিওর হওয়ার জন্য পাছা চুলকানোর ভান করে আঙুলটা নাকের কাছে নিয়ে গন্ধ শুঁকে শিওর হয়ে গেলেন যে ঘটনা ঘটে গেছে, আপনি টেরই পাননি!’

এখনও কোন কথা বলছেন না ওসি সাহেব। আমাকে অবাক করে দিয়ে ঠোঁটের কোনা দিয়ে বিচিত্র ভঙ্গিতে হাসলেন তিনি। তাঁর হাসি দেখে আমি আশ্বস্ত হবার বদলে শঙ্কিত বোধ করলাম। ওসি সাহেবের যে হাসিটা হাসছেন সেটাকে পিশাচ হাসি বলা যেতে পারে, ইবলিশ যদি কখনও হাসে তখন এভাবেই হাসে সম্ভবত। চায়ে চুমুক দিলেন ওসি সাহেব, চোখমুখ বিকৃত হয়ে গেল সাথে সাথে, চায়ের স্বাদের কারণে নাকি তলপেটে নিম্নচাপের বেগ বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে কে জানে।
‘স্যার, সব রেডি।’ দুবলা ধরণের একটা কনস্টেবল এসে বলল।
কথা না বলে চোখ বন্ধ করে মুখ বিকৃত করে হাত নাড়লেন ওসি সাহেব। ফরমালিন দিয়ে পাকানো টমেটোর টকটকে লাল হয়ে গেছে ওসি সাহেবের দুই কানের লতি। কি করবে বুঝতে না পেরে স্ট্যাচু অফ লিবার্টির মত দাঁড়িয়ে রইল দুবলা কনস্টেবল, ডান হাত দিয়ে মশাল ধরে রাখার বদলে সে চুলকাচ্ছে বাম বগল।

কিছুক্ষণের মধ্যেই ওসি সাহেবের মুখের অবস্থা স্বাভাবিক হয়ে এল, মনে হয় এ দফায় সামলে নিয়েছেন, ঠেকিয়ে দিয়েছেন বাঁধভাংগা তীব্র চাপ। বগল চুলকানো স্ট্যাচু অফ লিবার্টির দিকে তাকিয়ে হুংকার ছাড়লেন, ‘সব রেডি?’
‘ইয়েস স্যার!’ পান খাওয়া লাল দাঁত বের করে বলল দুবলা।
‘হুম,’ চিড়বিড় করে বললেন ওসি সাহেব, ‘এবার এই হারামজাদাকে লকআপে ঢুকাও। আমি নিজে ওর গু বের করব আজ!’
‘স্যার খালি হাতেই বের করবেন? একটা গ্লাভস পরে নিলে ভাল হত না?’ নিরীহ ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করলাম আমি। ..."

1 comment:

রায়হান said...

স্যার,আমার মনে হচ্ছিল হুমায়ুন আহমেদের লেখা পড়ছি।