Friday, July 26, 2019

আপনাদের সো-কল্ড ক...ওরফে একজন ডাক্তার বলছি-।

লেখক: মনোয়ার হোসেন ফয়সল

"আমি একজন সাধারন মানুষ,পেশায় চিকিৎসক। নিজেকে সাধারণ দাবি করার কারণ হচ্ছে আমি দেখতে সাধারণ আমার ক্যারিয়ারও সাধারণ। এখনও বড় ডাক্তার হই নাই আবার একদম জুনিয়রও নই। আমি মফস্বলের মানুষ স্কুল-কলেজ সবই ছোট্ট এক জেলা শহরের। মেডিকেলের পড়া পড়েছি ছোট-এক বিভাগীয় শহরের পুরনো এক মেডিকেল কলেজে। বাবাও একজন সাধারণ মানুষ, স্কুল শিক্ষক।

আমি আজ চিকিৎসক হিসেবে না আপনাদেরই একজন হিসেবে আপনাদেরকে কিছু কথা বলতে চাই। আজ থেকে ১৭ বছর আগে ২০০২ সালে, আমি তখন মাত্রই ১৭ বছরের এক যুবক, কলেজে পড়ি। তখন আমার আম্মু স্ট্রোক করেন। আপনারা যেটা ব্রেইন স্ট্রোক বা প্যারালাইসিস হিসেবে জানেন ওই রোগ। তখন রমজান মাস ছিলো সেহরি খেয়ে আম্মু ঘুমিয়েছিলেন। আহ, সেই ঘুম আর ভাঙ্গেনি! তখন আম্মুকে দ্রুত জেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। মেডিসিন কনসালটেন্ট স্যার দেখে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন, নাকে নল দিয়ে খাবার এর ব্যাবস্থাও করে দেন। জেলা সদরে সিটি স্ক্যান হয় না তাই স্ট্রোক-এর রোগীও রাখা হয় না। কারণটা হচ্ছে কোন ধরণের স্ট্রোক (রক্তক্ষরন নাকি রক্তনালি ব্লক) জানাটা চিকিৎসার জন্য অতি জরুরি। এটা সিটি স্ক্যান ব্যতীত জানা যায় না।

আম্মু ভোর রাতে স্ট্রোক করেন। আমরা বিকেলেই ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হই। ঢাকায় পৌছানোর কিছু আগে আম্মু অজানায় চলে যান। বিদায় নেয়া হয়নি কিছু বুঝতেও পারিনি, বুঝতে চাইওনি।

আজ ২০১৯ সাল। বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশ। আজও আমার জেলা সদর হাসপাতালে সিটি স্ক্যান হয় না। স্ট্রোকের রোগী ঢাকায় রেফার করে দেয়া হয়। ২০১৩ সালে তখন আমি পাস করা ডাক্তার ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন এ চাকরি করি। ওখানকার কলিগ রোমেল ভাই আমার জেলার বড় ভাই। মেধাবী মানুষ, মেডিকেলের তিন প্রফেই প্লেস করা। আমরা দুই ভাই মিলে গল্প করি, আমাদের জেলায় হার্ট ফাউন্ডেশন-এর একটা শাখা খোলা যায় কিনা? শুনেছি ফেনী, ফরিদপুর এসব জায়গায় শাখা আছে, জরুরী হৃদরোগের জরুরী প্রাথমিক চিকিৎসাটুকু এসব জেলার মানুষ ভালো পায়। কিছুদিন পর ভাইয়ের বাবা হার্ট-এটাক করলেন। জেলা সদরে হার্ট-এর ডাক্তার আছে কিন্তু সিসিইউ নাই! রেফার করে দেয়া হল। আংকেলও পথিমধ্যে অজানায় চলে গেলেন।

এরপর আর রোমেল ভাই বিসিএস দিলেন না, ইউকে চলে গেলেন। এখন ২০১৯ সালেও আমার জেলা সদরে এখনো সিসিইউ নাই। আমার বাবা ঢাকায় থাকতে রাজি নন, উনার হার্ট-এটাক হলে কি হবে আমি জানি না। ঘনিস্ট এক শিক্ষক বন্ধুর বাবার মাল্টিপল মায়লোমা (বোন ক্যান্সার) ডায়াগনোসিস হল।
জেলা সদরে কেমো দেয়া যায় না ঢাকায় এসে কেমো দেয়ার মত সাপোর্ট নাই তাই চিকিৎসা করাবেন না। আরেক ঘনিস্ট সাধারণ প্রাইভেট চাকুরীজীবি বন্ধুর মায়ের রেনাল ফেইলিওর। জেলা সদরে ডায়ালাইসিস হয় না তাই চিকিৎসা করাবেন না।

ভাই ও বোনেরা, আপনারা যারা আমাদের ডাক্তারদের গালি দেন আপনারা কি জানেন আমরা কতটা হতাশা-রাগ-ক্ষোভ-অভিমান নিয়ে কাজ করি? আমার বিসিএস পোস্টিংয়ের প্রথম আড়াই বছর আমি নিজ জেলায় কাজ করেছি। প্রভাবশালী এমপি, পৌর মেয়র কাউকে বলেও এসব সমস্যার সমাধান হয় নাই। হসপিটাল ২৫০ শয্যা ঘোষণা হয়েছে ২০০৮ সালে কিন্তু এখনও চলছে ৫০ শয্যার জনবল দিয়েই।

আমি ও আমার ডাক্তার বন্ধুরা জানি জেলা শহরে কয়েকজন করে ট্রেইন্ড মেডিকেল অফিসার এবং নার্স থাকলে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ-এর তত্তাবধানে স্ট্রোক ইউনিট, ডায়ালাইসিস ইউনিট, অনকোলজির কেমোথেরাপি, ডে-কেয়ার ইউনিট এমনকি আইসিইউ পর্যন্ত চালানো সম্ভব। কার্ডিওলজিস্ট-এর তত্তাবধানে সিসিইউ চলবে, রোগীরা উন্নত প্রাথমিক সেবা পাবেন। এরপর প্রয়োজনে ঢাকায় যাবেন। লাগবে শুধু কার্ডিয়াক মনিটর সহ কয়েকটি বেড, ইকো মেশিন, ডায়ালাইসিস মেশিন, সিটি স্ক্যান আরেন্টিলেটর মেশিন।সবই সম্ভব। বিশ্বাস করুন, উপরে যেসব মেশিনের কথা বললাম তা ৬৪ জেলায় ১০টি করে সাপ্লাই দেয়া সম্ভব শুধু এক আফজালের চুরি করা ১৫০০০ কোটি টাকা উদ্ধার করা লাগবে। আর হয়ত গুটিকয়েক ঋণখেলাপীর সম্পদ ক্রোক করা লাগবে। আর লাগবে সদিচ্ছা।

দয়া করে আমার এই লেখায় ডাক্তাররা কমিশন খায় ডাক্তারদের ব্যবহার খারাপ এইসব বলে হইচই করবেন না। শোনেন, একজন ডাক্তারকে আউটডোরে ৫০-৬০-৭০জন রোগি ধরিয়ে দেন তারপরো আমার কথা বলি, আমি নিজে একজন ডাক্তার আমি কমিশন খাই না অহেতুক আমার ব্যবহারও খারাপ না। আর যারা কমিশন খায় যাদের ব্যবহার খারাপ ওরা শোধরালে আমি যা বলছি তা আদায় হয়ে যাবে? কক্ষনো নয়। পয়েন্টে থাকুন, ফোকাস করুন। নিজের অধিকার নিজেরা আদায় করে নিন।
আমি চাকরি করি, আমার হাত পা বাঁধা। আমার বদলি আছে, শাস্তি আছে, আছে সম্মানহানীর ভয়। আপনার, আপনাদের কিসের ভয়? বাচ্চা ছেলেপেলে নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন করতে পারলে আপনারা স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলন কেন করবেন না? যৌক্তিক দাবীতে আন্দোলন করুন ঠিক-ঠিক আমাকে, আমাদেরকে পাশে পাবেন। ভাই, ভালো সার্ভিস না-পেয়ে আপনারা সাফারার হচ্ছেন, রাস্তায়তো আপনাদেরই নামতে হবে। এসব নিয়ে ভাবেন সমস্যার মূলে যাবার চেস্টা করুন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সচিবালয় ডাক্তাররা চালান না। আচ্ছা, একজন কেরানি কিভাবে হাজার কোটি টাকা কামায় ভেবেছেন কখনো

আমরা নাকি উন্নয়নশীল দেশ, তাহলে আপনার আমার স্বজন বেড না-পেয়ে ফ্লোরে থাকবে কেন? হসপিটালে সব পরীক্ষা হবে না কেন? কর্মচারী কম এই অজুহাতে হইলচেয়ার ট্রলি নিয়ে মানুষ হয়রানি হবে কেন? একটু ভাবুন। সরকার, জনপ্রতিনিধি সবাই আপনাদেরকেই ঠকাচ্ছে আর আমাদের ডাক্তারকে ভিলেন বানাচ্ছে। আপনাদের অধিকার আপনারা আদায় করে নেন আর না-পারলে আমাদের গালি দিতে থাকুন তাতে করে আর সমাধান আসবে না কিছুই।
হয়তো একসময় আমি দেশ ছাড়বো ওই রোমেল ভাইয়ের মত, ওটা হবে আমার সমাধান। আপনার, আপনাদের কি হবে ভেবে দেখেছেন কি?

No comments: