Thursday, July 15, 2010

কুত্তা জহির

জহিরের জন্মের ইতিহাস, ধর্মীয় আচার পালন, দলীয় পরিচিতি, এলাকার পরিচিতি ছাপিয়ে চাউর হয়ে গেল অন্য একটা নাম, কুত্তা জহির! জহির কি গালকাটা রমজান, বাইট্টা মনির বা মুরগি মিলনের মত দুর্ধর্ষ?
দুর্ধর্ষ না ছাই, জহির নিতান্ত ছাপোষা মানুষ। তার নামের পূর্বে এই উপাধি কিভাবে যোগ হলো এই ইতিহাস খানিকটা বিচিত্র।

জহিরের অফিস আড্ডা দেওয়ার জায়গাটা দোতলায়। সেদিন নিচে নেমে জহির মুখ ফেরাতেই জমে গেল। ইয়া তাগড়া পালোয়ান টাইপের একটা কুত্তা! ঠিক তার পায়ের কাছে। আরেকটু হলেই চাপা দিয়েছিল আর কী! হুশ বলতে গিয়ে শ্বাস বন্ধ হয়ে এলো। কুকুরটার ঘাড়ে কে যেন কোপ দিয়েছে। শরীরে ছোপ ছোপ রক্ত। এখনও রক্ত ঝরছে। ইস-স কী বীভৎস! গা কেমন গুলিয়ে উঠছে।
কুকুরটা সেই যে বসেছে উঠার আর নাম নেই। উঠে কোথাও হারিয়ে গেলে চলে গেলেই তো হয়।

জহির পাশের দোকানের হাফেজ সাহেবকে পাকড়াও করল। দুখি মুখ করে বলল, 'হাফেজ সাব ঘটনাডা দেখছেন'?
হাফেজ সাহেব বিরক্ত হলেন, 'খেদান-খেদান এইডারে, বড়ই নাপাক জিনিষ'।
জহির নাছোড়বান্দা, 'হাফেজ সাব, ভাইরে কুত্তাডারে একটু দেহেন না, আহ দেখেনই না, কোপ দিয়ে ঘাড়টা প্রায় আলাদা করে ফেলছে'।
হাফেজ সাহেব এবার বিরক্তি গোপন না করেই বললেন, দুরো মিয়া, বেশি যন্ত্রণা করেন, এইডার একটু ধুলা আমার গায়ে পড়লে এই অবেলায় গোসল করতে হইব। হুশ-হুশ, থুবা আসতাগফিরুল্লা। এইডারে পশু হাসপাতালে দিয়া আসেন'।
জহির এবার রাগী গলায় বলল, 'আপনে নিয়া যান না, টাকা যা লাগে আমি দিমু'।
হাফেজ বিড়বিড় করেন, 'কী বেদাত কথাবার্তা আসতাগফিরুল্লাহ-আসতাগফিরুল্লাহ। নাফরমান বান্দা'।

পাশেই একজন মনোযোগ সহকারে কথাবার্তা শুনছিলেন, তিনি বললেন, এইডারে পশু হাসপাতালে নিলে চিকিৎসা হইত'।
জহির আগ্রহী হলো, 'আপনি নিয়া যাইতে পারেন ভাই, যা খরচ লাগে আমি দিমু নে'। লোকটা অন্য দিকে তাকিয়ে দাঁত খোঁচাতে লাগল।

জহিরের বড় অস্থির লাগছে। আল্লাহর একি অবিচার, দেড় লক্ষ লোকের বাস এখানে। কুকুরটা তার ঘাড়েই কেন পরবে! হোয়াই আল্লা, হোয়াই?
জহির বিমর্ষমুখে দাঁড়িয়ে ছিল। ভাগ্যক্রমে একজন মানুষের ডাক্তারকে পেয়ে গেল। মুখ শুকিয়ে কুকুরটাকে দেখাল। মানুষের ডাক্তারের সঙ্গে জহিরের খানিকটা রসিকতার সম্পর্ক আছে।
তিনি হা হা করে হেসে বললেন, 'ভাইরে, আপনি তো বেশ লোক। যা হোক, শেষ পর্যন্ত আমাকে কি কুত্তার ডাক্তার হতে বলছেন! হা হা হা। সমস্যাটা কি জানেন, কুকুরটা তো আর আপনার পোষা না, জোর করে তো পশু হাসপাতালে নিতে পারবেন না। শেষে র‍্যাবিস-ট্যাবিস বাধিয়ে বসবেন। আচ্ছা এক কাজ করেন, সিরিঞ্জে করে ভায়োডিন দূর থেকে কুকুরটার আহত স্থানে ছিটিয়ে দেন আর একটা ক্যাপসূল লিখে দিচ্ছি চার-পাঁচটা খুলে পাউরুটির ভেতরে করে খাওয়াতে পারেন কিনা দেখুন'।

এই চিকিৎসা পদ্ধতিটা জহিরের বেশ মনে ধরল। সম্ভব, এটা ওর পক্ষে সম্ভব। সিরিঞ্জে ভায়োডিন ভরে অন্য একজনকে দায়িত্ব দিল ছিটাবার জন্য। নিজে থাকল ক্যাপসূলে পাউডার ভরা পাউরুটির দায়িত্বে। মানুষের হিংস্রতা নিয়ে কুকুরটার স্মৃতি ভারাক্রান্ত। প্রচুর কাঠখড় পোহাতে হলো পাউরুটি খাওয়াতে। ক-দিন এই চিকিৎসা চলল। পরে জহির ভুলেই গিয়েছিল কুকুরটির কথা।

বেশ কিছুদিন পরের কথা। যথারীতি তুমুল আড্ডা হচ্ছে। জহিরের এক বন্ধু এসে বলল, 'জহির রে, দুমরি যা-দুমরি যা তোর গেষ্ট আসছে কয়েকজন বান্ধবী নিয়া'।
জহির দুদ্দাড় করে  নিচে নামতে-নামতে ভাবল, বহুজাতিক কোম্পানির কোনও কর্মকর্তা-টর্তা আবার চলে এলে নাকি! নেমে দেখল সেই পালোয়ান টাইপের কুকুরটা সঙ্গে বেশ কটা মহিলা কুকুর। আনন্দে জহিরের চোখে পানি চলে এল। কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। চশমার কাঁচ যে ঝাপসা!

কুকুরটা ঘুরেফিরে জহিরের কাছে আসে। বন্ধুরা আড়ালে তাকে 'কুত্তা জহির' ডাকা শুরু করল।

2 comments:

Aurnab Arc said...

হায়রে বেচারা ভালু কাম কৈরা শ্যাষ পর্যন্ত কুইত্তা জহির হৈগেলো........

আলী মাহমেদ-ali mahmed said...

হ। কী আর করা, কপালের ফের। বেচারা জহির :D @Aurnab Arc