Thursday, May 23, 2013

জিয়া-মঞ্জুর-এরশাদ

"...(জেনারেল মঞ্জুর ছিলেন গরম মেজাজের লোক! ১৯৭১ সাল। তখন তিনি একজন মেজর। তৎকালীন মেজর আবু তাহের এবং জিয়াউদ্দিনের সঙ্গে পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এসে ভারত যাচ্ছিলেন।)
...ভারতীয় সরকারের একজন অফিসার মঞ্জুর এবং সঙ্গীদের অভ্যর্থনা জানান এবং ট্রেনে তুলে দেন। ট্রেনে থালায় করে যে খাবার পরিবেশন করা হয় মজ্ঞুর সে খাবারের থালা হাতে নিয়ে চলন্ত ট্রেনের জানালা দিয়ে বাইরে ছুঁড়ে ফেলেন এবং তার চাহিদামত খাবার পরিবেশন করতে বাধ্য করেন। যে কারণে ট্রেনটির বিলম্বে যাত্রা করেছিল।..."

"...জেনারেলর শফিউল্লাহ শাফায়েত জামিলকে ফোন করলেন। কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে জেনারেল শফিউল্লাহ [*] জামিলকে জানান, 'শেখ মুজিব আর বেঁচে নেই'। এমনকী সেনাবাহিনীর প্রধান, শাফায়েত জামিলকে বিদ্রোহ দমনের নির্দেশটি পর্যন্ত দিলেন না!
...এরপর শাফায়েত জামিল, জেনারেল জিয়ার বাসায় হাজির হলেন। তিনি দেখলেন, জেনারেল জিয়া দাঁড়ি কামাচ্ছেন। জামিল জিয়াকে বললেন, 'স্যার প্রেসিডেন্ট ইজ ডেড। এখন আমার করণীয় কী'?
জিয়াকে তখন অত্যন্ত শান্ত দেখাচ্ছিল। তিনি উত্তর দিলেন, 'প্রেসিডেন্ট যদি বেঁচে না-থাকেন, ভাইস প্রেসিডেন্ট তো আছেন...'।..."

"...চার নেতাকে জেলে গুলি করে মেরে ফেলা হয়। ১৯৭৫ সালের নভেম্বর। তিনজন সুপ্রিম কোর্টের জজকে নিয়ে একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়। কিন্তু জেনারেলর জিয়া তাঁর শাসনামলে এই তদন্ত কমিশনকে কাজ করতে দেননি, সুতরা এই কমিশনের কোনো অস্তিত্বই ছিল না। এই ঘটনাটি জেনারেল জিয়ার স্মৃতিকে কলঙ্কিত করে রাখবে।..."
(বাংলাদেশ: 'আ লিগেসি অভ ব্লাড'/ অ্যান্থনি মাসকারেনহাস)।

মেজর রেজাউল করিম চট্টগ্রামে সেনাবিদ্রোহ মামলার ১০ বছর সাজাভোগী। আনোয়ার কবির তাঁর এক সুদীর্ঘ সাক্ষাৎকার নেন। মেজর রেজাউল অকপটে বলেন:
"...আমি ঘুমাচ্ছিলাম। আমার রানার খুব ভোরে আমাকে জাগায়। ...কর্নেল মতিউর রহমান আমাকে বললেন, 'সার্কিট হাউজে জিয়াউর রহমানের ডেডবডি আছে। ডেডবডি পাহাড় এলাকায় নিয়ে যাবে। নিয়ে কোথাও কবর দিয়ে আসবে'।
আমি সরাসরি না বলে বললাম, 'স্যার, আমাকে অন্য কাজ দিন,। কর্নেল আমার উপর চটে গেলেন।

...(মঞ্জুরের নির্দেশে লে. কর্নেল মতি জিয়ার শরীর ঝাঁঝড়া করে ফেলেন) অফিস বারান্দায় মঞ্জুর পায়চারী করছিলেন। তিনি আমাকে দেখে বললেন, 'রাতের কিলিংয়ে তুমিও কি সার্কিট হাউজে গিয়েছিলে'?
আমি বললাম, 'না স্যার, আমি বাসায় ঘুমাচ্ছিলাম'।
তখন তিনি আমাকে বললেন, 'ওদের তো মাথা গরম, তোমার মাথা তাহলে ঠান্ডা আছে। এখন থেকে তুমি আমার চিফ সিকিউরিটির দায়িত্ব পালন করবে, ওকে'।
আমি বললাম, 'রাইট স্যার'।
এরপর আমি জেনারেল মজ্ঞুরের সব কাজ তদারকি শুরু করি। এক পর্যায়ে ঢাকা থেকে ফোন আসল, জেনারেল মঞ্জুর ফোনে কথা বললেন। জেনারেল মঞ্জুরকে বারবার অনুরোধ করা হচ্ছিল জেনারেল এরশাদের সঙ্গে কথা বলতে। কিন্তু মঞ্জুর বললেন, '...Bloody Ershad, i cannot talk to him. He is a thief, he is a corrupt person'.

শেষপর্যন্ত তিনি এরশাদের সঙ্গে কথা বলেননি। এটাই ছিল তার কফিনে শেষ পেরেক। কারণ এরশাদ এরপরই সরাসরি জিয়ার মৃত্যুর জন্য মঞ্জুরকে অভিযুক্ত করে সব ধরনের কলকাঠি নাড়া শুরু করলেন। টিভি-রেডিওতে বারবার ঘোষণা আসতে লাগল, চট্টগ্রামের সবাইকে বলা হলো বিদ্রোহী এবং যারা পক্ষ ত্যাগ করবে তাদেরকে ক্ষমা করা হবে এবং তাদেরকে কুমিল্লা ক্যান্টম্যান্টে যোগ দেওয়ার জন্য বলা হলো্।

...আমার (রেজাউল করিম) স্ত্রী বলল, 'চলো, আমরা কুমিল্লায় যাই। আমি তাকে বললাম, 'দেখো, আমি জিওসির নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছি। এটাই আমার ডিউটি। এই মুহূর্তে আমার পক্ষে যাওয়া সম্ভব না'। আমি স্ত্রী চিৎকার করে কাঁদতে লাগল। আমি তার হাত ছাড়িয়ে বাসা থেকে বের হয়ে এলাম।

...জেনারেল মঞ্জুর ক্যান্টনম্যান্ট ছেড়ে হাটহাজারির দিকে রওয়ানা দিলেন। পরে...বললেন, 'নো, আমি স্কেপ করব না। আমি সেরেন্ডার করব'। আমাকে বললেন, 'রেজা, তুমি পালাও'।
আমি বললাম, 'স্যার, আমি তো আপনার নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছি। আপনি না-গেলে আমিও যাব না। আপনার সঙ্গে আমিও সেরেন্ডার করব'।
জেনারেল মঞ্জুর বললেন, 'Reza, Why you have surrender, my boy. ওরা তো আমাকে মেরে ফেলবে। তুমিও যদি সেরেন্ডার করো, (তুমিও মরবে) তাহলে আমার কথা দেশবাসীকে কে জানাবে'?
অমি বললাম, 'স্যার, ওরা আপনাকে মেরে ফেললে আমিও আপনার সাথে মরব, And I want to die with you. একথা বলার পরই তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। তখন তিনি সিগারেট খাচ্ছিলেন। আধ-খাওয়া সিগারেটটা আমার ঠোঁটে গুঁজে দিয়ে দিয়ে বললেন, 'ওহ, মাই কমরেড-মাই কমরেড। ইউ স্মোক দিস। ইউ আর মাই অনলি কমরেড'।

জেনারেলর মঞ্জুর আত্মসমর্পণ করেছিলেন পুলিশের কাছে এবং বারবার বলছিলেন তাঁকে যেন আর্মির হাতে তুলে না-দেওয়া হয়। "...মঞ্জুর আত্মসমর্পণ করেছিলেন একজন হাবিলদারের কাছে। এরপর তাঁকে ওসির রুমে নেওয়া হয়। সেখানে খাবার এনে বিভিন্ন অজুহাতে দেরি করিয়ে দেওয়া হয় যেন আর্মি চলে আসে। তখন থানায় চলে এসেছিলেন চট্টগ্রামের তৎকালীন ডিআইজি শাহজাহান।
যিনি পরবর্তীকালে সচিব হয়েছিলেন এবং ২০০১ সালে তত্ত্ববধায়ক সরকারের  উপদেষ্টা হয়েছিলেন।


এই মানুষটাকে মঞ্জুর বারবার বলছিলেন, 'আমি পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেছি। আমাকে আর্মির কাছে দেবেন না, I should get an opportunity to face the trail. আমি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে চাই। আমার অনেক কথা বলার আছে এবং সেটি বলব আমি। দেশবাসির জানা প্রয়োজন। আমাকে তাড়াতাড়ি সেফ কাস্টডিতে পাঠান। আমাকে জেলে পাঠান'।
ডিআইজি শাহজাহান বিভিন্ন চল করে কালক্ষেপণ করেছিলেন এবং ঠিকই মঞ্জুরকে আর্মির হাতে তুলে দিয়েছিলেন।


...পরে আর্মি এসে জেনালের মঞ্জুর এবং আমাকে হাত, চোখ বেঁধে আলাদা আলাদা জায়গায় নিয়ে গেল। আমাকে যেখানে নিয়ে যাওয়া হলো সেখানে মেজর মুজিব আমার দায়িত্বে ছিলেন। তাঁর কাছে আমি মঞ্জুরের খবর জানতে চাইলে তিনি বললেন, 'গতরাতে আর্মি চিফের নির্দেশে তাঁকে গুলি করে মেরে ফেলা হয়েছে। তখন আমি চিফ হচ্ছেন এরশাদ'।"
...
তৎকালীন ডিআইজি শাহজাহান নামের মানুষটাও একজন কাপুরুষ! আর [*] তৎকালীন সেনাপ্রধান শফিউল্লাহ নামের কাপুরুষ সৈনিক এখনও পেট চিরে আত্মহত্যা করেননি এটা দেখে আমি বিস্মিত হই!
আমার মনে হয়, আমাদের দেশে কাপুরুষদের জন্য একটা আলাদা গোরস্তান থাকাটাই সমীচীন। যেখানে আমরা ঘটা করে ধুতুরা ফুল দিতে যাব। সঙ্গে থাকবে এই প্রজন্ম। তাঁদেরকে আমরা বলব, ব্যাটা, এই দেখ, এখানে শুয়ে আছে সব কাপুরুষেরা...!

 **ছবি সূত্র: তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পোস্টমর্টেমের রিপোর্টটা নেওয়া হয়েছে, 'বাংলাদেশ: আ লিগ্যাসি অভ ব্লাড' থেকে

No comments: