Tuesday, May 17, 2011

একজন স্বপ্নদ্রষ্টার স্বপ্নের ভুবন থেকে বিদায়!

­আজকের অতিথি লেখক আরাফাতুল ইসলাম। তিনি লিখেছেন, একজন স্বপ্নদ্রষ্টা প্রফেসর ইউনূসকে নিয়ে:

"গ্রামীণ ব্যাংক একটি বিশেষায়িত ব্যাংক। ১৯৮৩ সালে এই ব্যাংকটি আনুষ্ঠানিক সরকারি অনুমোদন পেয়েছিল তবে, এই ব্যাংক তথা ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস গবেষণা শুরু করেছিলেন আরো আগে থেকে, সেই ১৯৭৬ সালে। যখন তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। জনাব ইউনূস শনিবার তাঁর সহকর্মীদের উদ্দেশ্যে লিখেছেন,
'...যে ব্যাংকের যাত্রা শুরু হয়েছিল ৮৫৬ টাকা দিয়ে সে ব্যাংক এখন মাসে এক হাজার কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করছে...'।


জনাব ইউনূস ইতিমধ্যেই গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক থেকে পদত্যাগ করেছেন। চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি এই ব্যাংকে ফিরতে পারবেন কিনা সেটা বলা মুশকিল। তাছাড়া চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পেলে ইউনূস দুটি কাজ নিঃসন্দেহে করার চেষ্টা করবেন সেগুলো হচ্ছে, প্রথমত, ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিয়োগের বিষয়টিকে তিনি গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের হাতে তুলে দিতে চাইবেন, যেটা বর্তমানে সরকার করছে। দ্বিতীয়ত, এই ব্যাংকের ৯৬.৫ শতাংশ মালিকানা গ্রামীণ নারী মানে গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণগ্রহীতাদের হাতে যেন চিরস্থায়ীভাবে থাকে সেটার আইনি ব্যবস্থা করা। বর্তমান সরকার এই দু’টি কাজ করার সুযোগ অধ্যাপক ইউনূসকে সহসাই দেবেন বলে মনে হয়না! অন্তত সরকারের শীর্ষ কর্তাদের বক্তব্যে এমনটাই মনে হচ্ছে। 

তবে, এখানে একটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে, শুধু বাংলাদেশ নয় পুরো বিশ্বের কাছেই গ্রামীণ ব্যাংক এক অভিনব অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বিশ্বের একমাত্র নোবেল জয়ী ব্যাংক এটি। ২০০৬ সালে ব্যাংকটির প্রতিষ্ঠাতা প্রফেসর ইউনূসের সঙ্গেই নোবেল জয় করে গ্রামীণ ব্যাংক। আধুনিক ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থাকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিয়েছে এই ব্যাংক এবং প্রফেসর ইউনূস। স্বভাবতই এই ব্যাংকের ভবিষ্যতের দিকে তাই আন্তর্জাতিক সমাজেরও নিবিড় নজর রয়েছে।
গ্রামীণ ব্যাংকের মালিকানার বিষয়ে আলোচনা কিন্তু আজ হঠাৎ শুরু হয়নি। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই ব্যাংকটির শেয়ার নিয়ে সরকারের সঙ্গে লড়েছেন জনাব ইউনূস। তিনি তাঁর নিজের বই 'ক্রিয়েটিং এ ওয়ার্ল্ড উইদআউট পোভার্টি'-তে পরিষ্কারভাবে সেটি উল্লেখ করেছেন। বইটির অনুমোদিত বাংলা সংস্করণ, 'গ্রামীণ ব্যাংক ও আমার জীবন'-এর ১৫৮তম পাতায় প্রফেসর ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকের সরকারি অনুমোদন সম্পর্কে লিখেছেন:

'অংশীদারিত্ব সম্পর্কে যা কথা হয়েছিল তার অনুপাত সম্পূর্ণ উল্টে দেওয়া হয়েছে। সরকারের থাকবে ৬০ শতাংশ, গ্রহীতাদের প্রাপ্য হতে চলেছে ৪০ শতাংশ। অর্থাৎ গ্রামীণ ব্যাংক একটি সরকারি মালিকানার ব্যাংক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এটা আমি একেবারেই চাইনি'। 

১৯৮৩ সালে গ্রামীণ ব্যাংকের সরকারি অনুমোদনের সময় বাংলাদেশ সরকারের অর্থমন্ত্রী ছিলেন আবুল মাল আব্দুল মুহিত। ইউনূস এর ভাষ্য অনুযায়ী, জনাব মুহিত নিজেই শেয়ারের এই হিসেব উল্টে দিয়েছিলেন। অর্থাৎ গ্রহীতাদের ৬০ শতাংশর বদলে সরকারকে বৃহৎ অংশ শেয়ার দিয়েছিলেন। এটা তখন তিনি কোন অসৎ উদ্দেশ্যে করেননি। বরং ব্যাংকটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরুর স্বার্থেই করেছিলেন। কথা ছিল, পরবর্তীতে মালিকানার হার পরিবর্তন করা হবে।
বর্তমানে গ্রামীণ ব্যাংকের মালিকানার বড় অংশই ঋণগ্রহীতাদের হাতে৷ প্রশ্ন আসতে পারে, কিভাবে এটা সম্ভব হল? ইউনূস তাঁর বইতেই উল্লেখ করেছেন, অর্থমন্ত্রী মুহিত ১৯৮৫ সালে পদত্যাগ করেছিলেন। এরপর অর্থমন্ত্রণালয়ের সে সময়কার সচিব জনাব সাইদুজ্জামান সাহায্যে এগিয়ে আসেন।


বইটির ১৬৩তম পাতায় লেখা হয়েছে, 'তিনি (সাইদুজ্জামান) কথা রেখেছিলেন। ধীরে ধীরে তিনি গ্রামীণ ব্যাংকের মালিকানা সংক্রান্ত পরিকাঠামোয় পরিবর্তন আনলেন। গ্রাহকদের মালিকানা হল ৭৫ শতাংশ এবং বাকি ২৫ শতাংশ সরকার, রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক ও বাংলাদেশের কৃষিব্যাংকের মালিকানায় রইল। ১৯৮৬ সালে মালিকানার পরিবর্তন আনার ফলে পরিচালকমণ্ডলীর কাঠামোগত বিরাট পরিবর্তন আসল। এখন মোট ১৩ জন সদস্যের মধ্যে ৯ জনই হবেন ঋণগ্রহীতাদের মধ্য থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধি'। 

গ্রামীণ ব্যাংকের শেয়ারের এই হিসেব থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার। এটি এখন আর কোন সরকারি ব্যাংক নয়, এই ব্যাংকের মালিকানার বৃহৎ অংশই গ্রামীণ নারীদের হাতে৷ তাই সরকার কেন এটির চেয়ারম্যান নিয়োগ দেবেন? এই প্রশ্নটাও অধ্যাপক ইউনূস নিজেই করেছেন তাঁর বইতে। তিনি লিখেছেন, (পৃ, ১৬৫):
'গ্রামীণ ব্যাংকের ভবিষ্যত নিরাপত্তার জন্য পরিচালকমণ্ডলীর চেয়ারম্যান নিয়োগ সংক্রান্ত একটি আইনে পরিবর্তন এখনও জরুরী। এখনও পর্যন্ত সরকার চেয়ারম্যান নিয়োগ করে যাচ্ছেন এমন একটি ব্যাংকে যেটি বেসরকারি মালিকানাধীন। এটি অপ্রয়োজনীয়, ভবিষ্যতে এর থেকে অনেক বিপদ সৃষ্টি হতে পারে এমন আশঙ্কা থেকে যায়'

ইউনূস তাঁর বইতে বিপদের আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন গত শতাব্দিতে। আর সেটাই সত্যি হলো ২০১১ সালে। নানা বাধাবিপত্তি, আইনি লড়াইয়ের পর গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ ছেড়ে চলে গেছেন তিনি। একটি নোবেল জয়ী ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে কিংবা বাংলাদেশের একমাত্র নোবেল জয়ী হিসেবেও যোগ্য সম্মান তিনি পাননি। বিদায়ী চিঠিতে জনাব ইউনূস সহকর্মীদের উদ্দেশ্যে লিখেছেন, 'তোমাদের সঙ্গে আমার সম্পর্কের প্রথম অধ্যায়ের আজ ইতি টানলাম এক দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতিতে। এটা আনন্দময় পরিস্থিতিতে হওয়াটাই স্বাভাবিক হতো। কিন্তু তা হতে পারলো না। এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতেই আমাদের সম্পর্কের দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু হলো'। 

গ্রামীণ ব্যাংক শুধু প্রফেসর ইউনূসকে নয় বরং পুরো বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে প্রতিনিধিত্ব করে। এই ব্যাংকের মালিকানা সরকার বা পল্লী নারী যার কাছেই থাক, এটি বাংলাদেশিদের গর্ব। তবে, পল্লীর গরীব নারীর হাতেই ব্যাংকটি সুরক্ষিত থাকলে সরকারের বরং সুবিধা বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নের এক উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে গ্রামীণ ব্যাংককে তখন বিশ্বের সামনে তুলে ধরা সম্ভব হবে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সরকারের সুনামও এতে বাড়বে।
তাছাড়া পশ্চিমা সমাজ ইউনূস ইস্যুতে সরকারের যে সমলোচনা করছে, তাও বন্ধ হবে, যদি ব্যাংকের মালিকানা পাকাপোক্তভাবে গ্রামীণ নারীদের হাতেই তুলে দেয় সরকার৷ এতে করে বাংলাদেশেরই লাভ৷ প্রশ্ন হচ্ছে, সরকার কি সেটা করবেন?
 

সহায়ক সূত্র:
০১. গ্রন্থ: গ্রামীণ ব্যাংক ও আমার জীবন, প্রকাশক: মাওলা ব্রাদার্স
০২. দ্যা ডেইলি স্টার :  http://www.thedailystar.net/newDesign/news-details.php?nid=185696
০৩. বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম: http://av.bdnews24.com/file/all/Yunus_14_05.pdf

4 comments:

শাহেদ said...

লেখা ভাল হয়েছে, একটা জাতিকে বোঝার আগে এটা জানতে হয় সে তার সেরা সন্তানদের কেমন মুল্যায়ণ করে। আমরা যে ভাগ্যহীন একটা জাতি এটা জানার জন্য দুরে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।

Anonymous said...

ইউনুইচ্চারে দেক্তাম ফারি না

।আলী মাহমেদ। said...

সহমত @শাহেদ

।আলী মাহমেদ। said...

হাউডি Anonymous,
ইউনূস সাহেব ফেরেশেতা এটা কেউ বলার চেষ্টা করছে না। তাঁর প্রতি আপনার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে সেটা বলতে পারতেন! আপনি সেটা না-করে অহেতুক কাউকে অপমানসূচক কথা বলছেন!

আপনাদের কারও কারও হাতে গ্রিন-কার্ড আমাদের হাতে সবুজ পাসপোর্ট, পার্থক্যটা এখানেই।

আপনি বাক-স্বাধীনতার ফল ভোগ করছেন বলেই আপনার মন্তব্যটা ডিলেট করা হলো না।