Sunday, August 29, 2010

একজন স্বার্থপর মানুষ এবং পলায়ন স্পৃহা

দুলাল মিয়াকে [১] নিয়ে বড়ো পেরেশানিতে ছিলাম। রাতে ঘুমে খানিকটা সমস্যাও হচ্ছিল। রাতে দরোজায় শব্দ হলেই মনে হতো: পুলিশ না তো? ঠাক-ঠাক, ধাম-ধাম। কর্কশ গলা, আমরা পুলিশের লোক, দরোজা খুলেন নইলে দরোজা ভেঙ্গে ফেলব। খুলতে দেরি হলেই অশ্রাব্য ভাষায়...।
হতে পারে না এমনটা, বেশ পারে। এই দেশে সবই সম্ভব। শাহআলমের মতো লোকগুলোর পক্ষে বুক চিতিয়ে দাঁড়ান জনাব ফজলে নূর তাপসের মত দুঁদে ল-অফিসার। আর আমাদের জন্য কলিমুল্লা-ছলিমুল্লা।

কারণ আছে এমনটা ভাবার। দুলাল মিয়াকে হাসপাতালে ভর্তি করার সময় আমার নাম-ঠিকানা বিস্তারিত দিতে হয়েছে, আমার কাঁধে অযাচিত দায়িত্ব বর্তেছে! তখন ডাক্তারসহ সবাই আমার বোকামি দেখে বিস্তর হাসাহাসি করেছেন। তাদের হাসির উৎস, এই মানুষটার উনিশ-বিশ হয়ে গেলে, তাকে যমে নিয়ে যাবে আর আমাকে পুলিশ।
আমি কোনো দল করি না। আমি ব্যতীত দল করে না এমন বেকুব আর কেউ এই দেশে নাই! আমার ধারণা, এই দেশে কাক-পক্ষী-গাছ-নদী-পুকুর কেউ বাদ নাই, সবারই কোনো-না-কোনো দলের সঙ্গে মাখামাখি আছে। এই দেশে যারা দল করেন না এদের মতো অভাগা আর কেউ নাই। না ঘার কা, না ঘাট কা। আরাফ, স্বর্গ-নরকের মাঝামাঝি ঝুলে থাকা। ঝুলাঝুলিই সার!
আহা, কার দায় পড়বে আমার মত সাধারণ একজন দলহীন মানুষের জন্য নড়াচড়া করার।

আজ সকালে ডাক্তার জানিয়ে দিলেন, এই রোগীকে এখানে রেখে খুব একটা লাভ হবে না কারণ ড্রেসিং করার সময় দুলাল মিয়ার পায়ের মাংস খসে খসে পড়ে যাচ্ছে। মানুষটাকে বাঁচাবার একটাই উপায় হাঁটু থেকে পাটা ফেলে দিতে হবে। এটা জন্য জেলার সদর হাসপাতালে যেতে হবে। 
আমার নিজের অনুমানটাও এমনটাই ছিল।
কারণ দুলাল মিয়ার কাছে দাঁড়ানো যাচ্ছিল না মাংস গলার অসহনীয় গন্ধে, টিস্যুগুলো ক্রমশ নষ্ট হচ্ছে। আমার নাড়িভুঁড়ি উল্টে আসত। সঙ্গে মাস্ক নিয়ে গিয়েছিলাম কিন্তু লাগাতে পারিনি। কেন যেন আমার মনে হতো, মানুষটা আহত হবেন। কিন্তু কী তীব্র, মাথা খারাপকরা গন্ধ! আমি নতজানু হই তাঁদের প্রতি যারা নিঃস্বার্থভাবে দুলাল মিয়ার মত মানুষদের নিয়ে কাজ করে যান।

সব কিছু মিলিয়ে ঠিক হয়, দুলাল মিয়াকে ব্রাক্ষণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হবে। যেহেতু এই মানুষটার কোন অভিভাবক নাই তাই আমার উপর কঠিন একটা দায়িত্ব পড়েছে দুলাল মিয়ার সম্মতি নেয়ার জন্য, চিকিৎসা না-করে সরে পড়বে না তো আবার? পাটা ফেলে দিতে হবে এটাও জানানোর জন্য।
তখন পর্যন্ত আমি কিছুই বলিনি কিন্তু আমাকে দেখামাত্র মানুষটা হাউমাউ করে কাঁদতে থাকেন। আমি দুর্বলচিত্তের একজন মানুষ, বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি; আমি বৃষ্টি দেখতে থাকি।
আমি চেষ্টাকৃত খানিকটা কঠিন গলায় বলি, এখানে আপনার আর চিকিৎসা হবে না। জেলা শহরে পাঠাতে হবে, এটা অনেক ঝামেলার কাজ; অ্যামবুলেন্স ঠিক করতে হবে, ওখানকার ডাক্তারকে ধরাধরি করতে হবে। আপনি কি চিকিৎসা করাবেন নাকি ওখানে নেয়ার পর পালিয়ে যাবেন। পালিয়ে গেলে ওখানে গিয়ে লাভ নাই, এখান থেকেই চলে যান।
মানুষটা ভাবলেশহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে ঘুরেফিরে একটা কথাই বলতে থাকেন, আপনে যেইটা ভালা মনে করেন।
আমি মাথা নাড়ি, না। আমি ভাল মনে করলে তো হবে না। চিকিৎসা করতে গিয়ে আপনার অপারেশন লাগতে পারে, পায়ের কিছুটা ফেলে দিতে হতে পারে।
দুলাল মিয়া নিস্তেজ গলা, কতডা কাটব?
আমি বলি, তা তো এখন বলা সম্ভব না। এখানে গেলে ডাক্তার দেখে-বুঝে ঠিক করবেন।
দুলাল মিয়ার ঘুরেফিরে একটাই কথা, আপনে...। আমি সময় নিয়ে বোঝাবার চেষ্টা করতে থাকি, দেখেন, শরীর আপনার। সিদ্ধান্তটা আপনাকেই নিতে হবে।

পরিশেষে ঠিক হয়, আগামীকাল দুলাল মিয়াকে ব্রাক্ষণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে পাঠানো হবে। আমি চেপে রাখা শ্বাস ছাড়ি। আমি নিজেকে বিলক্ষণ চিনি- একজন পলায়নপর মানুষ। যাক বাবা, বাঁচা গেল, এখানেই আমার কাজ শেষ। আমার এলাকাটা তো পরিষ্কার হল। এরপর এটা ওই শহরের লোকজনের সমস্যা-মাথাব্যথা। আমি স্বার্থপর টাইপের মানুষ, নিজের সমস্যার সমাধান হয়েছে এতেই আমি আনন্দিত। অন্যদের সমস্যা নিয়ে মাথা ঘামাবার অহেতুক আগ্রহ বোধ করি না। এখন ব্রাক্ষণবাড়িয়া শহরের লোকজন তাদের সমস্যা নিয়ে অস্থির হবে, কি হবে না এতে আমার কী!
...
যারা একটা গল্প-উপন্যাসের শেষ লাইনটি পড়ে ফেলার পর জানতে চান, 'হেষে কি হইল'- তারপর কি হলো? তাঁদের জন্যই সম্ভবত পরিশিষ্ট শব্দটা চালু করা হয়েছে। এই লেখার পরিশিষ্ট হচ্ছে, যাদের চোখ আমাদের মত ঘোলাটে না, ঝাঁ চকচকে এদের পক্ষেই সম্ভব আমরা যেটা করতে পারি না। অতীতে আমি এর অনেক উদাহরণ দেখেছি [২] । দুলা মিয়া নামের অসমসাহসী মুক্তিযোদ্ধার সমাধি এরা বেড়া দিয়ে ঘিরে দিয়েছে। প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূর থেকে এই বেড়া এরা বয়ে নিয়ে গেছে!

এই মানুষটার চিকিৎসা নিয়ে ফাঁকিবাজি করবে এই নিয়ে জেলা সদরের ডাক্তারদের আনন্দিত হওয়ার কিছু নাই কারণ ওখানে থাকে এমন এক ঝাঁক তরুণকে ডাক্তারদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছি। যেখানে আমার কাজ শেষ ওখান থেকেই ওই তরুণদের কাজ শুরু।

সহায়ক লিংক:
১. দুলাল মিয়া: http://www.ali-mahmed.com/2010/08/blog-post_27.html
২. দুলা মিয়া: http://www.ali-mahmed.com/2010/01/blog-post_04.html 

No comments: