Search

Showing posts with label সাদাকে কালো বলিব. Show all posts
Showing posts with label সাদাকে কালো বলিব. Show all posts

Saturday, September 24, 2016

নেমন্তন্ন!

এখানকার থানাভবন উদ্বোধন হবে, পুলিশ সুপার মহোদয় এই কাজটা করলে সমস্যা ছিল না কিন্তু স্বয়ং আইজিপি মহোদয় তকলীফ করে চলে এসেছেন। উদ্বোধন বড়ো কঠিন জিনিস এই এলাকাতেই একবার ফায়ার ফাইটিং স্টেশন উদ্বোধন করার জন্য  নাসিম সাহেব হেলিকপ্টারে করে উড়ে চলে এসেছিলেন- তিনি তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

যাই হোক, তিন টাকা দামের কলমবাজ আমি 'দাওয়াতিয়া' টাইপের মানুষ না যে ঘটা করে দাওয়াত দেওয়া হবে আর জেনে বসে থাকব। কিন্তু না-জেনে উপায় কী! জেলা শহর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গেছি জরুরি একটা কাজে। আমার নিজস্ব কোনও গাড়ি নাই পা-ই লোটাকম্বল, এই-ই সম্বল। যেখানে পা চলে না সেখানে ত্রিচক্রযানই ভরসা যার চালু নাম সিএনজি। ওয়াল্লা, আজ কোনও সিএনজি আখাউড়া পর্যন্ত যাচ্ছে না। কেন রে বাপু? তখন গিয়ে জানলুম ঘটনা! একজনকে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, বাপ, বিষয় কী? সে আবার পুলিশের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানাল, হাইওয়েতে সিএনজি ওরফে স্কুটার চলাচল নিষেধ। বেশ-বেশ, জেনে ভাল লাগল কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞাটা কেবল আজই জানা গেল, পালন করা হলো! তা ভালই, রাস্তা ফাঁকা!

আমার দাওয়াত না-পেয়ে মন খারাপ করার সুযোগ নেই কারণ স্কুলের ছেলেমেয়েরা তো নিমন্ত্রণ পেয়েছে। আজ স্কুল অলিখিত ছুটি- আনন্দই আনন্দ। আনন্দ ঝরনা!

আপডেট:
দু-দিন পরে ডা. সাইফুল ইসলাম আমাকে জানিয়েছিলেন এখানে উপস্থিত একজন ছাত্রীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার কারণে। 

Thursday, August 1, 2013

নোবেল জটিলতা!

আগ বাড়িয়ে জানিয়ে রাখা: (লেখাটা একটা ফিকশন। এই গ্রহ, গ্রহের বাইরে, কোনো গলিত শব, এমন কি তোতলা কোনো লাশের সঙ্গে মিলে গেলেও সেটা হবে নিছক কাকতালীয়।)

দেশটা নিয়ে [১] আগেও একটা লেখা দিয়েছিলাম। চিংগুরা দেশের [২, দেশটা কোথায় এটা বিস্তারিত বলা আছে এখানে] মহান সংসদের কথাবার্তার নমুনা শুনে নোবেল কমিটি স্বয়ং চলে এসেছেন। এর আরেকটা কারণও আছে অবশ্য, এরা এই দেশে এসে প্রচুর ওয়াইন এবং স্যান্ডুইচ গিলে পণ করেছেন যাওয়ার পূর্বে তারা একটা নোবেল গছিয়ে যাবেন, যাবেনই...।

সংসদে তুমুল বচসা হচ্ছিল। বিরাট হাউকাউ, কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না! স্পিকার দমাদম হাতুড়ি পেটাচ্ছেন, হাতুড়ির মাথা খুলে একজন সামান্য আহতও হয়েছেন। মাইক বন্ধ করেও কোনো তারতম্য হচ্ছিল না। সংসদ সদস্যরা খালি গলায় যে গলাবাজী করছেন এতে করে মাইক না-থাকলেও কী আসে যায়!

সমস্যাটার উদ্ভব হয়েছে নোবেলটা আসলে কোন দল (কোন্দল না) পাবে এই নিয়ে! সমস্ত দলই দাবী করছেন তাদের কৃতিত্বের কারণে এটা কেবল তাদেরই পাওনা! কোনো ভাবেই এ বিতর্কের মিমাংসা হচ্ছিল না!
সবচেয়ে বেশী হইচই করছিলেন প্রধান দুইটা দল। এরাই বহু বছর ধরে দেশটার চাকা ঘুরাচ্ছেন বনবন করে, নইলে কবে দেশটার চাকা চারকোনা হয়ে যেত! ভাগ্যিস, দেশ চালাবার জন্য এরা ছিলেন নইলে ঈশ্বরও সম্ভবত এই দেশের হাল ধরতেন না!

প্রথম দলের প্রধানকে বলা হয়েছিল 'পয়েন্ট অভ অর্ডারে' দাঁড়িয়ে তাঁর বক্তব্য বলার জন্য। প্রথম দলের প্রধান বললেন চিলকন্ঠে, 'আমি দাঁড়ামু না। এই অর্ডার আমি মানতে পারুম না, আমার পায়ে বিষ, ব্যথায় অস্থির। তো, আমার বক্তব্য হইল, নোবেলের কেরতিত্ব আমাদের। কালো টাকা সাদা করার সময় কালো টাকা দিয়া দিছি বইল্যা নোবেলও দিয়া দিমু, কাভি নেহি (হিন্দি সিরিয়াল দেখার ফল)! জান দিমু কিন্তু আমরা এই নুবেলের এক কুনাও দিমু না। আমি এক কথার মানুষ, আপোষহীন!'

দ্বিতীয় দলের প্রধান মুহাহা করে হেসে বললেন, 'তাইলে আমিও পয়েন্ট অভ অর্ডারে দাঁড়ামু না, মিডল অভ অর্ডারে বইসা বলমু। আমি স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, আমার অনেকগুলা ডিগ্রি। আমি এই নুবেল ডিগ্রিটা নিতে রাজী হই নাই বইলাই নোবেল কোম্পানির লুকজন চিংগুরা দেশে চইলা আসছে। কারেন্টে অনেক ছাড় দিছি, আর দিমু না। আর নুবেলও দিমু না।'

তৃতীয় দলের প্রধান বললেন, 'সয়্যার অন মাই বলস', (এটা বলেই তিনি মাথা ছুঁয়ে কেন শপথ করলেন এটা ঠিক বোঝা গেল না!) আর্মিতে ছিলাম বইলা বন্দুক চালানের পাশাপাশি দেশ সেবায় পিছায়া আছিলাম না। আমার মত বড়ো মুক্তিযোদ্ধা দ্যাশে নাই কারণ সবাই যুদ্ধ করছে দেশে থাইক্যা আর আমি করছি শত্রু গো দ্যাশে থাইকা।
ভিতরের খবর কেউ রাখে না। নোবেল আমিই পামু। ইয়ের নল আর বন্দুকের নলই সমস্ত ক্ষমতার উৎস...।'

চতুর্থ দলের প্রধান হাক-মাওলা বলে উঠে দাঁড়ালেন, 'নোবেল জিনিসটা আবিষ্কার করছে নাসারা। নাসারাদের কুনু কিছু আমরা বেবহার করি না, ধর্মে নিষেধ আছে। কুলুপ করার লিগ্যা দরকার হইলে টিলা-পর্বত উঠায়া নিয়া আসুম কিন্তু টিস্যু বেবহার করুম না।
নারী নেতৃত্ব হারাম কিন্তু আমাগো ম্যাডাম যখন বলছে, তাইলে ঠিকাছে। এইটা আমাদেরই পাওনা। 'জাযাকুল্লাহ খায়রুন'!'

নোবেলটা আসলে কোন দলকে দেয়া হবে এর কোনো সুরাহা হলো না। নোবেল কোম্পানির কর্তা দুঃখের শ্বাস ফেললেন কোন কুক্ষণে যে এদের দেশের ওই লুকটার সঙ্গে ওয়াইন আর স্যান্ডুইচ খেতে গেলাম। হিক...।

১. চিংগুরা দেশ এবং হেলিকপ্টার: https://www.facebook.com/723002334/posts/10151403135592335

২. চিংগুরা দেশের সঠিক অবস্থান: আফসোস, আমার হাতে এখন যে ম্যাপটা আছে ওটার অবস্থা এমন জরাজীর্ণ যে স্ক্যান করা গেল না নইলে আমি চিংগুরা দেশটা কোথায় তা দেখিয়ে দিতে পারতুম।

Wednesday, February 9, 2011

"নরমূত্র" এবং মুত্র বিসর্জন!

প্রথম আলোতে (৮ ফেব্রুয়ারি ২০১১) সৈয়দ আবুল মকসুদ 'নরমূত্র' শিরোনামে একটি লেখা লিখেছেন [১]। এমন একটি দৈনিকে কোনও লেখার শিরোনাম 'নরমূত্র' খানিকটা বৈচিত্রপূর্ণ খানিকটা সাহসের কাজও বটে!
আমাদের দেশের তা-বড় তা-বড় কলাম লেখকদের এক হাত-দেড় হাত লম্বা কলামগুলো আমার তেমন পড়া হয় না। লেখার দুর্বোধ্যতা, লম্বা লম্বা বাতচিত আমাকে তেমন আকর্ষণ করে না। এইসব ছাপিয়ে বিরক্তি উদ্রেক করে কারণ এদের অধিকাংশই চোখে রঙিন চশমা ঝুলিয়ে লেখা শুরু করেন। এরা কোনও এক বিচিত্র কারণে দেশে তেমন কোন সমস্যা দেখতে পান না। অনেকে বলবেন, এঁরা আশাবাদী। হতে পারে! আমার অল্প জ্ঞানে যেটা বুঝি, যে রোগীকে এখুনি অক্সিজেন দেয়া প্রয়োজন তা না-করে তার চারপাশে ঘুরপাক খেয়ে 'ধুম মাচা দে- ধুম মাচা দে' গান গাওয়া কোনও কাজের কাজ না। প্রকারান্তরে দেশের ক্ষতিই করা হয়।

এমনিতে সৈয়দ আবুল মকসুদের লেখা আমার পছন্দের কিন্তু মানুষটার মধ্যে অনেক ঝামেলা আছে- নামের কাঙ্গাল এমন পাগলা মানুষ আমি আর দেখিনি [২] । যা বলেন সাফ-সাফ! তাছাড়া হেনার [৩] বিস্তারিত জানার জন্য মানুষটা তাঁর গ্রামে পৌঁছে গিয়েছিলেন এটাও মকসুদ সাহেবের জন্য আমার অযাচিত ভাল লাগা। কিন্তু তাঁর 'নরমূত্র' লেখাটা নিয়ে আমার অনেকখানি অমত আছে। তিনি লিখেছেন, "...নিত্যদিনের আচরণে প্রমাণ করতে হবে, বাংলার মানুষ সভ্য না অসভ্য..."।
ভুল লিখলেন মকসুদ সাহেব, বাংলার মানুষের জায়গায় হবে বাংলার সরকার। অফিস-আদালত, পাবলিক প্লেসে পাবলিক আসবে, যথারীতি মুত্রবিসর্জন দেয়ারও প্রয়োজন দেখা দেবে। হাজার-হাজার মানুষের জন্য অতিরিক্ত ব্যবস্থা দূরের কথা যেটুকু ব্যবস্থা আছে তাতেই ইয়া বড় তালা ঝুললে [৪] পাবলিক মূত্রবিসর্জন করবেটা কোথায়, কার মাথায়? ছাদে উঠে করার চেষ্টা করলে কারও-না-কারও মাথায় পড়লে তাকে দোষ দেয়া কেন!
আচ্ছা, বুকে হাত দিয়ে বলুন তো রাস্তাঘাটে কোথায় কয়টা সরকারি টয়লেট--বাথরুম-টাট্টিখানা-পায়..., হালের ওয়শরুম চোখে পড়েছে আপনার? আর সরকারি যে টয়লেটগুলো আছে ওখানে মুত্রবিসর্জন দেয়ার পূর্বে 'জ্ঞানবিসর্জন' দিয়ে অজ্ঞান হয়ে যেতে হয়। কী বিশ্বাস হচ্ছে না বুঝি, লাগবেন বাজী? কী বুক কাঁপছে? আপনি চাইলে একটা অ্যাম্বুলেন্স দাঁড় করিয়ে রাখব।

আপনি লিখেছেন, "...২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নজরুল এভিনিউর ফুটপাত মুত্রমুক্ত চাই। তবে পুলিশি অ্যাকশন ছাড়া বাংলার মাটি মুত্রমুক্ত হবে না"।
বটে! বেচারা পুলিশ! মুত্রবিসর্জন আটকাতেও এদের প্রয়োজন হয়, হলি কাউ! আমার ছোট্ট একটা প্রশ্ন ছিল, ধরুন, একজন মুত্রবিসর্জন করছে। ধরুন, পুলিশ অ্যাকশনে যাবে। ধরুন, তখনও ওই মানুষটার মুত্রপ্রবাহ চালু আছে। আচ্ছা, ধরাধরি বাদ দিয়ে বলি, তখুনি কী পুলিশ অ্যাকশনে যাবে নাকি মানুষটার মুত্রবিসর্জন দেয়ার পর?
কাজটা কী ঠিক হবে? পবিত্রস্থানে এই কর্ম করলেও যেখানে অপেক্ষার ছাড় দেয়া হয় [বদু] সেখানে আপনি পুলিশ লেলিয়ে দিতে চাচ্ছেন, কাজটা কী ঠিক হবে, স্যার!

আপনি আরও লিখেছেন, "...প্রচুর পানি ও শীতল পানীয় শুধু বাংলাদেশের পুরুষরাই খায়। তাই রাস্তায় বের হওয়া মাত্র তাদের বেগ পায়..."।
আহা, আপনি কী চাচ্ছেন, পানি না-খেয়ে খেয়ে বাংলাদেশের পুরুষরা কিডনি বিসর্জন দিক! আর বেগ না পেলেও এই কাজ শখের বশে কেউ করেন এমন তথ্য অন্তত আমার কাছে নাই। থাকলে অবশ্য ভাল হতো।
প্রকাশ্যে নরের এহেন কর্মকান্ডে আপনার চোখ আহত হয়, ভাল-ভাল কিন্তু নারীদের জন্য আপনার মস্তিষ্ক আহত হয় না, ডিয়ার স্যার? নারীর জন্য দিকি আপনি একটা শব্দও ব্যয় করলেন না! আপনি কী জানেন স্যার, আমাদের দেশে নারীদের কী অসহনীয় কষ্ট সহ্য করতে হয়। আমাদের দেশের নারীদের ইউরিন ইনফেকশন হওয়ার অন্যতম কারণ প্রয়োজনীয় বাথরুম না-থাকা।

আসলে অতি প্রয়োজনীয় এই বিষয়টার নিয়ে আমাদের কোন ভাবনা নেই। ঝা-চকচকে একটা মার্কেট করা হবে, শত-শত মানুষ একস্থানে জড়ো হবে কিন্তু সেখানে একটা বাথরুম থাকবে না। আমাদের মন-মগজে যেমন এই ভাবনাটা নেই তেমনি আপনার লেখায়ও। আফসোস, বড়ই আফসোস!

সহায়ক সূত্র:

১. হেনা: http://www.ali-mahmed.com/2011/02/blog-post_06.html
২. নরমূত্র: http://www.eprothomalo.com/index.php?opt=view&page=12&date=2011-02-08
৩. সন্তান উৎপাদন কারখানা...: http://www.ali-mahmed.com/2011/10/blog-post_23.html
৪. সরকারি মূত্রালয়: http://www.ali-mahmed.com/2010/03/blog-post_07.html 

* [বদু]:
 "আবু হোরায়রা (রাঃ) বর্ণনা করিয়াছেন, এক বদু (বেদুইন) নবী (সাঃ)-এর মসজিদে আসিয়া এক কোনে বসিয়া প্রস্রাব করিতে লাগিল। সকলেই বদুকে ধমক দিতে আরম্ভ করিলে নবী (সাঃ) তাহাদিগকে নিষেধ করিলেন এবং বলিলেন, এই অবস্থায় তাহাকে বাধা দিও না।
বদুর প্রস্রাব করা শেষ হইলে তিনি তাহাকে নিকটে ডাকিয়া বুঝাইয়া দিলেন, মসজিদ পবিত্র স্থান, এখানে মল-মূত্র ত্যাগ করা সমীচীন নহে।
তাহার পর সাহাবীগণকে আদেশ করিলেন, পানি আনিয়া জায়গাটি পরিস্কার করো। তোমরা (মুসলিম জাতি) পৃথিবীর প্রতি আদর্শরূপে আবির্ভূত হইয়াছ, কর্কশ ব্যবহারেরর জন্য নহে।" (বোখারী শরীফ)
 

Sunday, February 6, 2011

কে অপরাধী, মিডিয়া নাকি প্রশাসন?

ছবি ঋণ: প্রথম আলো
হেনার মৃত্যু সংবাদে আন্তর্জাতিক মিডিয়াকে নিয়ে খুব গলাবাজি করেছিলাম [১] কিন্তু সবটাই কি মিডিয়ার দোষ? বিবিসি এবং এএফপি যেটা করেছে এখানে এদের খামখেয়ালি সুস্পষ্ট এবং ফাজলামিও। এমনিতে অন্য একটা সূত্র থেকে এদের তথ্যের বিভ্রান্তি নিয়ে মেইল করার পরও রা নেই! এদের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরও এই নিয়ে গা করেনি!

এই মিডিয়ারা বারবার যে প্রশাসনিক কর্মকর্তার বক্তব্য উদ্ধৃতি দিচ্ছে তিনি হচ্ছেন ওখানকার এসপি। এএফপি এসপির বক্তব্য আমাদেরকে জানাচ্ছে, "Fifteen-year-old Hena Begum died in hospital on Monday after a village court in the southern Bangladesh district of Shariatpur sentenced her to 100 lashes, said local police chief A.K.M Shahidur Rahman.
...and three villagers including the wife of the man who Hena Begum had an illicit relationship with," Mr Rahman told AFP.
According to Mr Rahman, the teenage girl was "beaten mercilessly" by the family of the married man, who was also Hena's cousin, after the affair was discovered."  

এসপি প্রসঙ্গান্তরে বলছেন অ্যাফেয়ার-পরকীয়া। যে কেউ এই কথাটার সরল অর্থ করবে, হেনার সঙ্গে ধর্ষক মাহাবুবের অবৈধ-অন্যায় সম্পর্ক ছিল। ভাল-ভাল! থাকলে আর কী করা! পুলিশ বলে কথা তাও পুলিশ সুপার! পুলিশ সুপার এহেন বক্তব্য দিলে এবং মিডিয়া এটার উপর রিপোর্ট করলে মিডিয়াকে খুব একটা দোষ দেয়াটা অন্যায় হয় বৈকি। আন্তর্জাতিক মিডিয়াগুলো এবং পাশাপাশি আমাদের দেশের অনেক মিডিয়াও এই এসপির বক্তব্য ছাপিয়েছে, মনের মাধুরী মিশিয়ে রিপোর্ট করেছে। তার উপর আবর্জনা সব তথ্য, কোনটায় হেনা মারা গেছে ছয় দিন পর, কোনটায় ৭ দিন পর। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে যেদিন হেনাকে দোররা মারা হয় সে সেদিনই মারা যায়। তথ্যের কী দৈন্যতা!

হেনার এই সংবাদটা বিভিন্ন মিডিয়া যে কত রকম করে ছাপিয়েছে এটা দেখে মাথা খারাপ হয়ে যায়! হলুদ সাংবাদিকতা আর কাকে বলে! এবং অধিকাংশ সংবাদই প্রায় হুবহু, কপি-পেস্টের কারণে একজন যে ভুলটা করেছে অন্যরা একই ভুল করেছে। আবার কেউ কেউ একগাদা টাকা দিয়ে এজেন্সি থেকে তথ্য কিনে একই ভুলের ফাঁদে পা দিয়েছে।

আজ ভাগ্যক্রমে শরীয়তপুরে একজনকে পেয়ে যাই যিনি খুব কাছ থেকে এই বিষয়ে কাজ করছেন। জটিলতা এড়াবার জন্য বিশদ পরিচয়ে যাই না। তাঁকে আমি অনুরোধ করেছিলাম, আপনাদের ওখানকার এসপি কীসব বক্তব্য দিয়ে বেড়াচ্ছেন, হেনার ওই ধর্ষকের সঙ্গে নাকি অন্য রকম সম্পর্ক ছিল। আপনি একটা কাজ করেন, হেনার যে ধর্ষকের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল এই বিষয়ে এসপিকে জিজ্ঞেস করেন। উত্তরটা আমাকে একটু জানান।
ওই মানুষটা অবিচল গলায় বলেন, "কেন, এসপির বক্তব্য নেব কেন? এসপি এই বিষয়ে কী জানেন? তিনি কী ওই গ্রামে থাকেন! তিনি কী হেনাদের প্রতিবেশী"?
আমি খানিকটা চিন্তায় পড়ে যাই, তাই তো? এসপি তো এই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী দূরের কথা ধারেকাছেও ছিলেন না, তাহলে? তাহলে তিনি নিশ্চয়ই এটা কারও মুখে শুনেছেন। এরপর থেকে মিডিয়ার কাছে মুখ হাঁ করলে অনবরত এই কথাটাই ভাঙ্গা রেকর্ডের মত বলে বেড়াচ্ছেন! যাক, এই বিষয় থাকুক। কেউ বললে তো আর মুখ চেপে ধরা যাবে না।

কিন্তু একজন দায়িত্বশীল সরকারী কর্মকর্তা এটা বলেন কেমন করে? কাউকে খুনি বলে রায় দেয়া [২] কী আদালতের কাজ নাকি আমাদের? তাঁর তো এই বিষয়ে বলার কথা না। তিনি কথা বলবেন আসামী ধরা নিয়ে, ফরেনসিক রিপোর্ট নিয়ে, কোথাও প্রচলিত আইন ভাঙ্গা হচ্ছে কিনা সেটা নিয়ে। যারা হেনার অনৈতিক সম্পর্ক থাকার কথা বলছেন তারা কী করে এটা বিস্মৃত হলেন হেনার গালে কামড়ের দাগ ছিল [৪]। যে স্বইচ্ছায় দেহদান করবে তাঁর শরীরে কামড়ের দাগ থাকবে কেন আর সে চীৎকার করে সবাইকে জানাবেই বা কেন?

আমি আগের লেখায়ও লিখেছিলাম (Sailent features of the children act of 1974, Section 2 (F)-এ বলা হচ্ছে, "A child means a person under 16 years of age...")আমাদের দেশের আইনে হেনা শিশু। হেনার সম্মতি থাকলেও তাঁর সঙ্গে দৈহিক মিলন করা আমাদের দেশের আইনে ধর্ষণ। এটা সত্য ধর্ষণ এবং তাঁকে হত্যা করাটা বদলে যাচ্ছে না কিন্তু এই গ্রহে রটে গেছে হেনা একজন স্বৈরিণী-ব্যাভিচারিণী। এই মেয়েটির ১৪ বছরের স্বোপার্জিত অর্জন এক নিমিষে ফুৎকারে উড়ে গেছে! আন্তর্জাতিক অন্য মিডিয়া কী ফলাও করেই না তা আমাদেরকে জানাচ্ছে। ডেইলি মেইলের শিরোনাম: "Whipped to death for having 'affair' with married man: Horrific fate of girl, 14, lashed 70 times after alleged rape by cousin" [৩]
অনুমান করি, এই পরকীয়া সংক্রান্ত বিষয়টার উৎস একই সংবাদ সংস্থা!

আমাদের পত্রিকার পন্ডিত সম্পাদক মহোদয়গণ জানেন কিনা জানি না, প্রায়শ যা হয়, ঢাকার বাইরে কোন ঘটনা ঘটলে ওখানকার অধিকাংশ পত্রিকার সাংবাদিক মহোদয়গণ নিজেদের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে বসে বসেই নিউজ পাঠান, কষ্ট করে পশ্চাদদেশ উত্তোলন করে আর ঘটনাস্থলে যান না! কোনও একজন ঘটনাস্থলে যান এবং তার তথ্যগুলোই খানিকটা এদিক-সেদিক করে অন্য সাংবাদিকরা নিজ নিজ পত্রিকা অফিসে পাঠিয়ে দেন। কারণ হচ্ছে অধিকাংশ পত্রিকাই মফস্বল সংবাদদাতাদের যথেষ্ঠ টাকা দেন না, প্রায় সাংবাদিক মহোদয়েরই সাইড বিজনেস আছে। দেখা গেল যিনি একটি চালু দৈনিকের সংবাদদাতা, যে খবরটা তার পত্রিকায় পাঠাচ্ছেন তিনিই খানিকটা বদলে বিডিনিউজে পাঠাচ্ছেন! ফল যা হওয়ার তাই হয়!

যাই হোক, কেঁচো খুড়তে গিয়ে সাপ বেরিয়ে আসার কথা জানতাম কিন্তু বাস্তবে এখন দেখলাম, কেন্নো খুড়তে গিয়ে তেলাপোকা বেরিয়ে এসেছে! ধর্ষকের পরিবার চেষ্টা করেছিল সাত লাখ টাকা হেনার পরিবারকে দিয়ে মিটমাট করার জন্য কিন্তু হেনার বাবা রাজি হননি। তিনি যদি রাজি হতেন তাহলে এখান থেকে বিশেষ একটি সংস্থার ২ লাখ টাকা পাওয়ার কথা ছিল। অর্থাৎ হেনার পরিবার পেত ৫ লাখ আর ওই সংস্থা ২ লাখ!
আরও আছে! একটি দৈনিক পত্রিকার সাংবাদিক ঘটনাকে অন্যদিকে প্রবাহিত করে দেবেন এই শর্তে ধর্ষকের পরিবারের কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা আগাম নিয়েছেন, বাকী টাকা কাজ উদ্ধার হওয়ার পর। গা শিউরানো সব ঘটনা!

মানুষ হিসাবে নিজেকে দাবী করতে আজ আমার বড়ো সংকোচ। কাপড় পরেও আজ নিজেকে সভ্য বলতেও কেমন বাঁধো বাঁধো ঠেকে। কোন একটা লেখায় আমি লিখেছিলাম ভাল দাম পেলে আমরা মাকেও বেচে দেব, তাঁর কিডনি-ফুসফুস-লিভার; কেবল দামটা ভাল হওয়া চাই। হেনা নামের মেয়েটির প্রতি যে অন্যায় করা হয়েছে এটা নিয়ে হেনার এখন আর কিছু যায় আসে না। সে মৃত কিন্তু আমরা জীবিত এই যা পার্থক্য!
আমি কেবল অপেক্ষায় আছি যারা এই অভাগা মানুষটার প্রতি যে অন্যায়টা করা হচ্ছে ঠিক এমন একটা ঘটনা এদের কোন প্রিয় মানুষের সঙ্গেও ঘটুক। কসম আমার লেখালেখির, তখন এরা কেমন করে কাঁদে এটা দেখার আমার বড়ো আগ্রহ; আমাদের মত হাউমাউ করে নাকি পশ্চিমাদের মত দাঁতে দাঁত চেপে?
চারদিকে সব শক্তিশালী বুদ্ধিমান মানুষেরা যারা একবার তাঁকে খুন করেছে, এখন মৃত হেনাকে দ্বিতীয়বার খুন করছে! কেবল এদের বুদ্ধির খেলা দেখব, একের পর এক
কিন্তু আমরা কতিপয় নির্বোধ অশক্ত হাতে হেনার প্রাণহীন হাত ধরে অনবরত বকেই যাব, হেনা, তুমি ঘুমাও, আমরা জেগে আছি...।

সহায়ক সূত্র:
১. হলুদ সাংবাদিকতা: http://www.ali-mahmed.com/2011/02/blog-post_6336.html

২. খুনি এবং আদালত: http://www.ali-mahmed.com/2011/01/blog-post_24.html
৩. dailymail.co.uk: http://tinyurl.com/6ldaxh5
৪. বিডিনিউজ: http://tinyurl.com/5v9fq8a 

*আজ নিজের জাগতিক বেদনায় মনটা ভারী বিষণ্ণ। সাত সাগর তেরো নদীর পার থেকে একজন ফোন করেন, হেনার ধর্ষক গ্রেফতার হয়েছে এবং পুনরায় করা হেনার পোস্টমর্টেমে হেনার পক্ষে আলামত পাওয়া গেছে।
নিমিষেই আমার জাগতিক বেদনা মিলিয়ে যায়। কেবল মনে হয়, মেয়েটা আজ খানিকটা শান্তিতে ঘুমাবে...।
ডয়চে ভেলের সংবাদ: http://tinyurl.com/5whtk2v

Thursday, July 15, 2010

কুত্তা জহির

জহিরের জন্মের ইতিহাস, ধর্মীয় আচার পালন, দলীয় পরিচিতি, এলাকার পরিচিতি ছাপিয়ে চাউর হয়ে গেল অন্য একটা নাম, কুত্তা জহির! জহির কি গালকাটা রমজান, বাইট্টা মনির বা মুরগি মিলনের মত দুর্ধর্ষ?
দুর্ধর্ষ না ছাই, জহির নিতান্ত ছাপোষা মানুষ। তার নামের পূর্বে এই উপাধি কিভাবে যোগ হলো এই ইতিহাস খানিকটা বিচিত্র।

জহিরের অফিস আড্ডা দেওয়ার জায়গাটা দোতলায়। সেদিন নিচে নেমে জহির মুখ ফেরাতেই জমে গেল। ইয়া তাগড়া পালোয়ান টাইপের একটা কুত্তা! ঠিক তার পায়ের কাছে। আরেকটু হলেই চাপা দিয়েছিল আর কী! হুশ বলতে গিয়ে শ্বাস বন্ধ হয়ে এলো। কুকুরটার ঘাড়ে কে যেন কোপ দিয়েছে। শরীরে ছোপ ছোপ রক্ত। এখনও রক্ত ঝরছে। ইস-স কী বীভৎস! গা কেমন গুলিয়ে উঠছে।
কুকুরটা সেই যে বসেছে উঠার আর নাম নেই। উঠে কোথাও হারিয়ে গেলে চলে গেলেই তো হয়।

জহির পাশের দোকানের হাফেজ সাহেবকে পাকড়াও করল। দুখি মুখ করে বলল, 'হাফেজ সাব ঘটনাডা দেখছেন'?
হাফেজ সাহেব বিরক্ত হলেন, 'খেদান-খেদান এইডারে, বড়ই নাপাক জিনিষ'।
জহির নাছোড়বান্দা, 'হাফেজ সাব, ভাইরে কুত্তাডারে একটু দেহেন না, আহ দেখেনই না, কোপ দিয়ে ঘাড়টা প্রায় আলাদা করে ফেলছে'।
হাফেজ সাহেব এবার বিরক্তি গোপন না করেই বললেন, দুরো মিয়া, বেশি যন্ত্রণা করেন, এইডার একটু ধুলা আমার গায়ে পড়লে এই অবেলায় গোসল করতে হইব। হুশ-হুশ, থুবা আসতাগফিরুল্লা। এইডারে পশু হাসপাতালে দিয়া আসেন'।
জহির এবার রাগী গলায় বলল, 'আপনে নিয়া যান না, টাকা যা লাগে আমি দিমু'।
হাফেজ বিড়বিড় করেন, 'কী বেদাত কথাবার্তা আসতাগফিরুল্লাহ-আসতাগফিরুল্লাহ। নাফরমান বান্দা'।

পাশেই একজন মনোযোগ সহকারে কথাবার্তা শুনছিলেন, তিনি বললেন, এইডারে পশু হাসপাতালে নিলে চিকিৎসা হইত'।
জহির আগ্রহী হলো, 'আপনি নিয়া যাইতে পারেন ভাই, যা খরচ লাগে আমি দিমু নে'। লোকটা অন্য দিকে তাকিয়ে দাঁত খোঁচাতে লাগল।

জহিরের বড় অস্থির লাগছে। আল্লাহর একি অবিচার, দেড় লক্ষ লোকের বাস এখানে। কুকুরটা তার ঘাড়েই কেন পরবে! হোয়াই আল্লা, হোয়াই?
জহির বিমর্ষমুখে দাঁড়িয়ে ছিল। ভাগ্যক্রমে একজন মানুষের ডাক্তারকে পেয়ে গেল। মুখ শুকিয়ে কুকুরটাকে দেখাল। মানুষের ডাক্তারের সঙ্গে জহিরের খানিকটা রসিকতার সম্পর্ক আছে।
তিনি হা হা করে হেসে বললেন, 'ভাইরে, আপনি তো বেশ লোক। যা হোক, শেষ পর্যন্ত আমাকে কি কুত্তার ডাক্তার হতে বলছেন! হা হা হা। সমস্যাটা কি জানেন, কুকুরটা তো আর আপনার পোষা না, জোর করে তো পশু হাসপাতালে নিতে পারবেন না। শেষে র‍্যাবিস-ট্যাবিস বাধিয়ে বসবেন। আচ্ছা এক কাজ করেন, সিরিঞ্জে করে ভায়োডিন দূর থেকে কুকুরটার আহত স্থানে ছিটিয়ে দেন আর একটা ক্যাপসূল লিখে দিচ্ছি চার-পাঁচটা খুলে পাউরুটির ভেতরে করে খাওয়াতে পারেন কিনা দেখুন'।

এই চিকিৎসা পদ্ধতিটা জহিরের বেশ মনে ধরল। সম্ভব, এটা ওর পক্ষে সম্ভব। সিরিঞ্জে ভায়োডিন ভরে অন্য একজনকে দায়িত্ব দিল ছিটাবার জন্য। নিজে থাকল ক্যাপসূলে পাউডার ভরা পাউরুটির দায়িত্বে। মানুষের হিংস্রতা নিয়ে কুকুরটার স্মৃতি ভারাক্রান্ত। প্রচুর কাঠখড় পোহাতে হলো পাউরুটি খাওয়াতে। ক-দিন এই চিকিৎসা চলল। পরে জহির ভুলেই গিয়েছিল কুকুরটির কথা।

বেশ কিছুদিন পরের কথা। যথারীতি তুমুল আড্ডা হচ্ছে। জহিরের এক বন্ধু এসে বলল, 'জহির রে, দুমরি যা-দুমরি যা তোর গেষ্ট আসছে কয়েকজন বান্ধবী নিয়া'।
জহির দুদ্দাড় করে  নিচে নামতে-নামতে ভাবল, বহুজাতিক কোম্পানির কোনও কর্মকর্তা-টর্তা আবার চলে এলে নাকি! নেমে দেখল সেই পালোয়ান টাইপের কুকুরটা সঙ্গে বেশ কটা মহিলা কুকুর। আনন্দে জহিরের চোখে পানি চলে এল। কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। চশমার কাঁচ যে ঝাপসা!

কুকুরটা ঘুরেফিরে জহিরের কাছে আসে। বন্ধুরা আড়ালে তাকে 'কুত্তা জহির' ডাকা শুরু করল।

Monday, December 21, 2009

অপার সৌন্দর্য এবং একপেট আবর্জনা!


বাড়ির কাছেই ছোট্ট একটা রেলের পুল। আগেও দেখেছি কিন্তু আজ দেখে হাঁ করে তাকিয়ে রইলাম। কী এক অপরূপ দৃশ্য, মনে হয় এটা এ গ্রহের কোন অংশ না, হলেও অপরিচিত কোন এক স্থানের, অন্য ভুবনের!

কী বিপুল ফেনা! দেখো দিকি ঢং, এই ফেনার উপর আবার সূর্যের আলো পড়ে আলোর খেলা, ক্ষণে ক্ষণে বদলায়। ইচ্ছা করে এই শ্বেত-শুভ্র ফেনায় গা ভাসিয়ে দেই। অন্তত পেঁজা-পেঁজা এই শুভ্র ফেনা গায়ে মেখে শুয়ে থাকি।

কিন্তু...!
এই অপার সৌন্দর্যের পেছনের কথা জেনে গা শিউরে উঠে। আমাদের পানির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে আগরতলা থেকে আসা কুচকুচে কালো রঙের বর্জ্য!

প্রকৃতি এবং মানুষ অনেক কসরত করে শরিরের একপেট আবর্জনা ঢেকে রাখে। নইলে মিস ওয়ার্ল্ড এবং কদাকার জরিনার মধ্যে কোন ফারাক থাকত না। 
তো, যেটা উল্লেখ করলাম, এই বিপুল ফেনার উৎস হচ্ছে, ভারত থেকে যে পানি বাংলাদেশে নামছে ওই পানির সঙ্গে মেশা বিভিন্ন কলকারখানার রাসায়নিক উপাদান, বর্জ্য। যা মানুষের জন্য ভয়াবহ রকম ক্ষতিকর। ক্ষতিটা কি-কি হচ্ছে এটাও আমাদের জানা নাই। এই পানি দিয়ে চাষবাস হবে, সেই খাবার আমরা খাব।

এই পানি–ঘাস গরু খাবে, আমরা সেই গরুর দুধ খাব। এই পানিতে ভেসে থাকা মাছ খাব, দূরারোগ্য রোগ ঠেকায় কে! আমাদের দেশে কেউ এসব নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে বলে মনে হয় না, ঘামালেও লাভ কী—দাদা বলে কথা! আমরা দাদাদের দয়ায় বেঁচে আছি।

দাদারা তাদের রাসায়নিক বর্জ্য আমাদের এখানে পাঠিয়ে দেন, সেই বর্জ্য থেকে উৎপন্ন সৌন্দর্যে আমরা কবিতা লিখি। দাদারা আমাদের এখান থেকে ইলিশ মাছ, নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে যান কিন্তু তারা মেয়াদ উত্তীর্ণ সামগ্রী পাঠিয়ে দেন।
তারকাঁটার বেড়া গলে কিছুই এদিক-ওদিক হবার যো নাই ভুলক্রমে একটা গরু চরতে-চরতে এদের সীমানায় চলে গেলে, গরুটাকে ফিরিয়ে আনতে যাওয়া মানুষটাকে পাখির মতো গুলি করে মারেন—শরীরে পেট্রোল পুশ করে দেন।

কিন্তু স্রোতের মত ফেন্সিডিল আসতে কোন সমস্যা নাই। দাদাদের পাঠানো ফেন্সিডিল নামের কফের সিরাপ খেয়ে আমরা ঝিমাই, সাহিত্য রচনা করি।
ঝিমুনি কমে এলে ক্ষুর চালাই, মার গলা থেকে হারটা ছিঁড়ে নিয়ে যাই।
একটা ফেন্সিডিলের মূল উপাদান কোডিন আমাদের দেশে সর্বোচ্চ দাম হবে ৩৫ টাকা যা আমাদের দেশের লোকজনেরা কেনে হাজার-বারোশো টাকায়। 
দাদা বলে কথা...!

*ছবিস্বত্ব: সংরক্ষিত

Tuesday, December 1, 2009

ভীতিবি এবং একালের ব্রুটাস!


ভোরের কাগজে তখন (৯২-৯৩) প্রতি সপ্তাহে 'একালের রূপকথা' নামে একটা ফিচার লিখতামওই সময় ওই পাতাটি দেখতেন সঞ্জীব চৌধুরীদলছুটের সঞ্জীব চৌধুরী, লেখক বানাবার মেশিন
তো সঞ্জীব চৌধুরী একদিন অফিসে বললেন: ভোরের কাগজে 'মেলা' নামের নতুন একটা পাতা বেরুচ্ছে, ...হক এর দায়িত্বে আছেনলেখকদের কাছে মেলার জন্য লেখা চাচ্ছেন, আপনি মেলার জন্য একটা লেখা লিখে দেন 
আমি খুব একটা আগ্রহী ছিলাম না কারণ সঞ্জীবদার সঙ্গে কাজ করার মজাই আলাদা। তারপরও সঞ্জীব চৌধুরী ...হকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। 
...হক বললেন: মেলার জন্য মজার একটা লেখা লিখে দেন। 
আমি বিনীতভাবে বললাম: মজার লেখা আসলে ঠিক কিভাবে লিখতে হয় আমি  জানি না তবুও চেষ্টা করব'

'ভীতিবি' লেখাটি লিখে দিলামবিটিভিকে ব্যঙ্গ করে ভীতিবিযথারীতি 'মেলা' বেরুল। 'ভীতিবি' লেখাটির কোন খবর নাইআমি বিব্রত-লজ্জিত হলামলেখাটি যে রকম মজার হওয়ার উচিত ছিল আমি সম্ভবত সেভাবে লিখতে পারিনি। 
হা ঈশ্বর, এই লেখাটিই একমাস পর মেলায় ছাপ হলো। আমার 'ভীতিবি' লেখাটা ছাপা হবার পর বিষাদে মনটা ছেয়ে গেল।

তখন ঘটনা হয়ে গেছে অন্য রকম! 'মেলা' পাতাটিতে শুরু থেকেই টিভি সমালোচনা নামে একটি ফিচার চালু করা হয়েছিল ওই ফিচারটির নাম এবং লোগো 'ভীতিবি'। সপ্তাহের পর সপ্তাহ, মাসের পর মাস ভীতিবি লোগোসহ টিভি সমালোচনা বেরুতে লাগল 
কেউ বলেনি কিন্তু নিজেকে তখন চোর চোর মনে হচ্ছিল! কেবল মনে হচ্ছিল, এখান থেকে আইডিয়া নিয়ে আমি আমার ওই লেখাটি লিখেছি!  
সেই প্রথম খুব কাছ থেকে ছুঁরি খাওয়ার অভিজ্ঞতা! 

আমার লেখা 'ভীতিবি' ব্যবহার করার জন্য আমার কাছ থেকে মৌখিক অনুমতিও নেয়া হয়নি, অন্তত জানাবার মত ন্যূনতম ভদ্রতাও করা হয়নি। এই সামান্য সৌজন্যটুকু দেখালে আমার মতো অখ্যাত লেখকের আনন্দের কোন সীমা থাকত নাকিন্তু ...হকদের মতো, যারা পত্রিকা চালান তারা কী একবারও ভাবেন না প্রত্যেকটি থিম একজন লেখকের নিজস্ব সম্পদপৃথিবীতে অসংখ্য থিম ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে, একজন লেখক ওইসব থিম- শব্দের ইট একের পর এক সাজিয়ে ইমারত বানান, চরিত্র সৃষ্টি করেনকারও অনুমতি ব্যতীত থিম ব্যবহার করার অর্থ থিম ছিনতাই

পৃথিবীতে অসংখ্য সম্পদ ছড়িয়ে আছে কিন্তু কারও অনুমতি ব্যতীত সম্পদ ছিনিয় নেয় কেবল ছিনতাইকারী... হকের মতো একজন জনপ্রিয় লেখক (জনপ্রিয় লেখক হওয়ার অনেক হ্যাপা) যখন থিম ছিনতাই করেন তখন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতেই হয়, হায়, একালের ব্রুটাস!

*আমার মনটা নরোম তাই এই মানুষটাকে ব্রুটাস বললাম। নইলে 'জুডাস' বলতে চেয়েছিলাম, 'একালের জুডাস'। জুডাসের মত বিশ্বাসঘাতক বিরল! যীশুখ্রীস্টের বারোজন শিষ্যের অন্যতম। জুডাসের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে যীশুখ্রীষ্টকে ক্রুশবিদ্ধ হয়ে মৃত্যু বরণ করতে হয়।

Tuesday, September 22, 2009

গণতন্ত্রের শেকলে বাঁধা নগ্ন একজন মানুষ

 
সুমি জানালা দিয়ে দূরে তাকিয়ে আছে, আচ্ছা জানালা দিয়ে লাফিয়ে পড়লে কী হয়!

ওর দৃষ্টিতে রাজ্যের বিষণ্নতা! হা ঈশ্বর, এ লজ্জা কোথায় রাখি? এ পাহাড়সম অপমান আমি লুকাব কোথায়! বাবার সামনে দাঁড়াব কী করে, চোখ তুলে তাকাব কেমন করে? 
অথচ বাবা কী সহজ আচরণই করছেন। মানুষটাকে এ অভিনয় করতে কী অমানুষিক কষ্টই না করতে হচ্ছে।

অসামান্য একটা ঘটনা আমুল বদলে দিয়েছে ওদের অসম্ভব সুন্দর এই পৃথিবীটা। কেন এই বেঁচে থাকা- জীবনটা মনে হচ্ছে একটা গা ঘিনঘিনে ঘেয়ো কুকুর!
ওর বাবা একটা ক্ষমাহীন অপরাধ করেছিলেন। হরতালের দিনে অফিস যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। ভদ্রলোকের সন্তানেরা তার বাবাকে একটা কঠিন শাস্তি দিয়েছে। না, মেরে ফেলেনি। মেরে ফেললেই হয়তো ভাল হতো অন্তত এ অপমানের বোঝা সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হত না। 

বাবাকে-বাবাকে, ওর প্রিয় বাবাকে, ওরা মধ্য রাস্তায় একেক করে কাপড় খুলে উলঙ্গ করে ফেলেছিল। পত্রিকাওয়ালারা ঘটা করে এ ছবি পত্রিকায় ছাপিয়েছে। একজন কাতর মানুষের ছবি। তথাকথিত গণতন্ত্রের শেকলে বাঁধা একজন নগ্ন মানুষ। পরিবারের শেকলে বাঁধা একজন দুর্বল মানুষ, যার আত্মহত্যা করার সাহসটুকুও নেই।

এ বড়ো বিচিত্র দেশ, এখানে গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে একজন মানুষের মুখের কথায় ‘হরতাল’ নামের একটা শেকল গোটা দেশটাকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলে। বিশাল এক কারাগারে আটকে ফেলা যায় কোটি কোটি মানুষকে! নপুংসক কোটি-কোটি মানুষ হাঁ করে তাকিয়ে থাকে আকাশ পানে। কখন, কোন সেই শুভক্ষনে অন্য গ্রহ থেকে নেমে আসবে কৌপিন পরা কোন এক মহাপুরুষ। গণতন্ত্রের এই নোংরা শেকল ভেঙে মেঘ গর্জনে বলবে, হে সৃষ্টির সেরা জীব, আজ থেকে তোমরা মুক্ত, স্বা-ধী-ন। 

ফ্রী- ড-ম!


*পুরনো লেখা কিন্তু পছন্দের। পোস্টের সঙ্গে ছবিটার একটা শানে-নজুল আছে। কয়েদীর ওই অংশটুকু লেখার সূত্র এটা। এর মূল হোতা মিডিয়ার একজন সেলিব্রেটি (যিনি টিভিতে লম্বা লম্বা বাতচিত করে আমাদেরকে শেখান, নসিহত করেন), যিনি যুগ্ন-সচীব পদমর্যাদার এই মানুষটার একেক করে কাপড় খুলে ফেলেছিলেন, ভদ্রলোক হরতালে অফিস যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন এই অপরাধে।।

সহায়ক লিংক: 
১. কয়েদির অংশবিশেষ: http://www.ali-mahmed.com/2009/02/blog-post_18.html

Saturday, September 5, 2009

রাজসভা এবং সেলিনার গোপন কথা

­রাজসভা বসেছে।
বর্তমানে রাজসভায় (link) রাজা নাই, রানী আছেন। রাজা যায় রানী আসে, রানী
যায় রানী ­আসে। মন্ত্রীরা অধিকাংশই উপস্থিত আছেন। এই মন্ত্রী-সেই মন্ত্রী, খাদক মন্ত্রী, কোনও মন্ত্রীরই অভাব নাই। পশু মন্ত্রী নাই কিন্তু পশু সম্পদ মন্ত্রী আছেন। এরাই দেশটার চাকা বনবন করে ঘুরাচ্ছেন।

এই পবিত্র রাজসভা (পবিত্র শব্দটি যোগ করা আবশ্যক-ফরযে আইন, নইলে এটা অপবিত্র বলে কারও ভ্রম হতে পারে) থেকেই দেশ চালাবার নীতি নির্ধারিত হয়। দেশের বিভিন্ন জটিল সমস্যা নিয়ে এখানে আলোচনা হয়। প্রতি মিনিটে হাজার-হাজার টাকা খরচ!
আলোচনার একটা সময় ব্যয় হয় যখন যে রাজা থাকেন তার বাবার, স্বামীর গুণকীর্তন করে। অধিকাংশ সময় বিরোধীদলের কুৎসা গেয়ে।
­বিরোধীদল­ দেশটার চাকা খুলে পাখা লাগাতে চাচ্ছেন, এইসব। বিরামহীনভাবে এই খেলা চলেই আসছে। আফসোস, এরা বেলের শরবত খেলে পেটের সঙ্গে সঙ্গে মাথাও ক্লিয়ার থাকত!

সেই দেশেরই এক মহিলা লেখক। ইনি একাই একশ, বিজ্ঞাপনের আবশ্যকতা কী! একটা বই লিখেছেন ‘বোরখাওয়ালী সেলিনার গোপন কথা’। এই নিয়ে বড় হইচই। কারা কারা নাকি আবিষ্কার করেছেন বোরখার বাইরে এক রং, ভেতর দিকে অন্য রং। বাইরের রং কালো তো ভেতর দিকে সবুজ- এই অঙ্গে অনেক রূপ। কী অবাক কান্ড!
'বোরখাওয়ালী সেলিনার গোপন কথা'র লেখক বিশদে লিখেছেন কারা কারা বোরখার রং দেখেছেন। এই নিয়ে সৈয়দ ভংশের (!) এক লেখক কাজীর দরবারে এগারো কোটি স্বর্ণ মুদ্রার মানহানী মামলা ঠুকেছেন, ইয়ালী! পাশের দেশেও নাকি কয়েক কোটি টাকা-টংকার মামলা হয়েছে। দুগগা-দুগগা!

'বোরখাওয়ালী সেলিনার গোপন কথা'র লেখকের এক কথা, আমরা সমস্ত শরীর বোরখায় ঢেকে রাখলেও দু-চোখ তো খোলা থাকে। আমরা পুরুষদের সব দেখতে পারব, পুরুষেরা কেন বোরখার ভেতরের রং দেখতে পারবে না? আমাদের কি ঝিনিকি ঝিনিকি মন থাকতে নেই? অন্য এক লেখককে নিয়ে এই বইটির লেখক নাকি
­ঝিনিকি-ঝিনিকি খেলা খেলেছিলেন কিন্তু তাদের মিলন হয়নি! আফসোস!
­
যথারীতি রাজসভায় এ প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা হলো। তর্ক, কুতর্কের ঝড় বয়ে গেল। হাস্যরসেরও সৃষ্টি হলো। একেকজন বিপুল আমোদে অন্যজনের গায়ে এলিয়ে পড়ছিলেন। কী আনন্দ-কী আনন্দ!
­এখানে কিছু ভাঁড় মন্ত্রী সর্বদাই থাকেন। এদের কাজ হচ্ছে প্রজাদের হাসানো। হাসতে হাসতে ­প্রজাদের ­খানিকটা পেশাব বেরিয়ে যায় বিধায় অযু ভেঙ্গে যায়! কেন অযু ভেঙ্গে যায় এই বিষয়ে বিশদে যেতে চাচ্ছি না।

­আকবরিয়া নামের একজন মন্ত্রী ওদিন বললেন: আমার ছয় বছরের ছেলে এখনও মার দুধ খায়, আমি নিজে বার বছর পর্যন্ত মার দুধ খেয়েছি। হি হি হি।
­ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ে ভেঙ্গে সবজি চাষ করলে দেশের হাদ্য (খাদ্য) সমস্যার সমাধান হতো। হাক্কু হাক্কু হাক্কু।
­দূর্ঘটনায় যারা মারা গেছেন তারা ছাগল পাবেন না তবে তাদের পরিবারের লোকজনরা একটা করে ছাগল পাবেন, ফিনফিনে দাড়িসহ। রশি ফ্রি। হা-হা-হা। 


অন্য একজন মন্ত্রী মহামতি ছাফু বললেন: বিল গেটস ব্যাটা কম্পিউটার বিকরি করিয়া এই দ্যাশ থ্যিকা কুটি কুটি টাকা নিয়া যাইতেছে। হো হো হো।
­চিনির দাম বাড়াইছি তো কি হইছে, চিনি খাওয়া ভালা না? যে বেশি চিনি খায় হে পট নিয়া ডায়বেটিস রোগির পিছন পিছন ঘুরব। হোঃ হোঃ হোঃ।
দেশ উন্নতি করছে, ফকিরের হাতেও অহন মুবাইল। খিক খিক খিক।
 
কারেন্টের মন্ত্রী না তবুও বললেন, পাবলিকের হাতে হাতে মোবাইল। মোবাইল চার্জ দিয়া সব কারেন্ট শ্যাষ কইরা ফেলাইতেছে। বিকল্প উপায়ে কারেন্ট উৎপাদন করিতে হইবেক।

­মাথায় গ্রিজ মেখে অন্য-এক মন্ত্রী চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, উই লুকিং ফ শাতরু। আসো, ক্রসফায়ার-ক্রসফায়ার খেলা খেলব।

­আজ একজন আলতাফিয়া বললেন: মেথরের মল মেথর লইয়া গেলে হামি কি কারিবে? ­যার মাল ছে (সে) লইয়া গেছে। হিক হিক হিক।
­(সত্যি সত্যি এই কথাগুলো আমাদের মন্ত্রী বাহাদুররা বলেছিলেন, অতি সামান্য বদলে দেয়া হয়েছে, এই যা। ভাল কথা, মন্ত্রী বাহাদুররা আবার শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে পারেন না। তাদের বক্তব্য শুদ্ধ ভাষায় কথা বলে, মিডল-ক্লাস।)

­আমাদের মন্ত্রী-টন্ত্রী বাহাদুররা পারেন না এমন কোন কাজ নাই, এরা চাইলে হনুমানজীকে পর্যন্ত কাজে লাগিয়ে দিতে পারেন! ইচ্ছা করলে এরা ২৫ ঘন্টায় দিন করে দিতে পারেন। ­আজকাল ­ফকিরদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে যেতে হয় না, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীই ছুটে যান ফকিরের কাছে! বিচিত্র কারণে এঁরা ডন কুইক্সোটের মত ভাবের জগতে থাকেন। ফ্রিগেট কেনার কথা ভাবেন কিন্তু রুস্তম-হামজার বিকল্প ভাবেন না! মুক্তিযুদ্ধের আবেগ নিয়ে জাগলিং করেন। ­
­সবই তাঁদের ইচ্ছা, আমরা শুনি কিচ্ছা!

­সেলিনার গোপন কথা নিয়ে রাজসভায় তুমুল আলোচনা হচ্ছে। একজন মন্ত্রী মহোদয় বললেন, ছেলিনা পাইছেটা কি, কেনু সে এইসব গুপুন কথা লিখবে? কেনু-কেনু-কেনু, উয়াই?
অন্যজন কটাক্ষ করে বললেন, লিখছে তো কি হইছে , গুপন কথায় আপনের
­তো আর নাম নাই, ইয়ুর ফব্লেমটা কি?
তুমুল বচসা। বইটি রাজসভায় জমা রাখা হলো পরবর্তিতে এটা খুঁটিয়ে দেখা হবে বলে। তাখলিয়া-বারখাস্ত বলে
­আজকের মত সভা মুলতবি হলো।­

সমস্যা দেখা দিল, ভয়াবহ সমস্যা। রাজসভায় জমা দেয়া ‘বোরখাওয়ালী সেলিনার গোপন কথা’ বইটি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। খোঁজ খোঁজ খোঁজ। কোথাও নাই। দ্বাররক্ষক, কতোয়াল সবাইকে ডাকা হলো। নির্দেশ দেয়া হলো, যেভাবেই হোক এই বইটা খুঁজে বের করার জন্য। খানাতল্লাসী শুরু হলো। নাই তো নাই।
­বই তো আর পায়রা না যে ডানা মেলে উড়ে যাবে। ­ভয়ের চোটে দ্বাররক্ষকের মলদ্বারের দ্বার বন্ধ হয়ে গেল।

তান্ত্রিক ডাকা হলো। তান্ত্রিক মহাশয় অসংখ্য খুলিতে ধুপ জ্বালিয়ে রাজসভা প্রায় অন্ধকার করে ফেললেন। একবার ডানে একবার বায়ে ঝাড়ু দিয়ে পেটাচ্ছেন। বিচিত্র সব মন্ত্র পড়ছেন:

­"অং-বং-চং, হং হং হং, ঠং ঠং,
­করো নাকো ভং-চং-ফং, ঞ্চঁ-ঞ্চঁ
­পাশের বাড়ির মেয়েটি খেলে কুত-কুত,
­কোথায় গেলি সেলিনার গোপন ভূত।
­আহারে চুক চুক চুক- ভুক ভুক ভুক"
­তান্ত্রিক মন্ত্র পাঠ শেষ করে অমায়িক হাসি হেসে বললেন: মুসকিল আসান। মিল গিয়া, সাব কুছ খুল গিয়া।
সবাই উদগ্রীব: পেয়েছেন তান্ত্রিক ভা। (ভা মানে ভাইয়া)
­তান্ত্রিক ভাইয়া চুকচুক করে মানুষের খুলিতে চা পান করতে করতে বললেন, ­কিতাব সেলিনা গোপন কিয়া হ্যায়।
­সবাই স্তম্ভিত। ওরি শ্লা, কুতুয়া বলে কি! সেলিনার বইটা গোপন করেছে, মানে কী! বই গেল কিভাবে ওর কাছে? বইটার কি বিশেষ 'পাতা' গজিয়েছিল যে উড়ে-উড়ে চলে গেল!
রাজপাট অচল। পরদিন শুভ সংবাদটি পাওয়া গেল। একজন মন্ত্রী সাহেব বইটা পড়ার জন্য বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন।


*লেখাটা নেওয়া হয়েছে 'সাদাকে কালো বলিব' থেকে। ছবিঋণ: বই-মেলা ডট কম
...
লেখাটার এখানেই সমাপ্তি। এখন অন্য এক প্রসঙ্গ। তসলিমা নাসরিনের 'ক' বইটা বের হওয়ার পর অনেক নাটক হয়েছিল। লেখক সৈয়দ সাহেব ১১ কোটি টাকার মানহানির মামলা করেছিলেন। পরে এই মামলার গতি কী হয়েছিল এটা অবশ্য আমার জানা নাই! লেখক মিলন সাহেব বিশেষ উচ্চবাচ্য করেননি।
সবচেয়ে বিস্ময়কর কান্ডটা ঘটেছিল আমাদের মহান সংসদে এই নিয়ে তুলকালাম কান্ড হয়ে গিয়েছিল। কীসব হাস্যরসই না সৃষ্টি হয়েছিল, স্পীকার-মন্ত্রী-সাংসদদের আমোদে আমরাও আমোদিত হয়েছিলাম। যখন এখানে একজন অন্যজনকে কটাক্ষ করে বলছিলেন, আপনের সমস্যা কী, বইয়ে তো আপনার নাম তো
­নাই! 

আহারে-আহারে, এঁদের নাম নাই বলে এঁদের কী চাপা কষ্ট! ঝিনিকি-ঝিনিকি রক্তে ফিনিকি-ফিনিকি। কী কষ্ট-কী কষ্ট!
স্পিকার সাহেবের কাছে বইটা জমা রাখা হয়েছিল কিন্তু পরবর্তীতে বইটার আর হদিস পাওয়া যাচ্ছিল না। খোঁজ-
­খোঁজ-­খোঁজ­ । অবেশেষে জানা গেল, একজন মন্ত্রীবাহাদুর 'ক' বইখানা বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন পড়ার জন্য!­ মন্ত্রীবাহাদুররা বই পড়েন এরচেয়ে আনন্দের আর কী আছে! ধন্য মায়ের ধন্য সন্তান...!

Sunday, April 19, 2009

আইনস্টাইন, অতিমানব একজন

আলবার্ট আইনস্টাইন ১৮৭৯ সালের ১৪ মার্চ, জার্মানীর মিউনিখ শহর হতে চুরাশি মাইল দূরে উলম শহরে জন্মগ্রহণ করেন। এই মহান বিজ্ঞানী কচুরিপানার মতো সারাটা জীবন কাটিয়েছেন।

একজন বিজ্ঞানীর কোনও দেশ হয় না- গোটা পৃথিবীই তার দেশ। তবুও তাঁকে যদি জিজ্ঞেস করা হতো, আপনার দেশ কোনটি? কি বলতেন তিনি, বলার মতো আদৌ কি কিছু ছিল? তাঁর শৈশব কেটেছে জার্মানীতে, কৈশোর ইতালী, যৌবন সুইট্‌জারল্যান্ডে, পৌঢ়ত্ব জার্মানী আর বার্ধক্য আমেরিকায়।
এ নিয়ে তাঁর বেদনার শেষ ছিলো না। ১৯২০ সালে বন্ধু ম্যাক্স বর্নকে চিঠিতে লিখেন, "AS A MAN WITHOUT ROOTS ANYWHERE..., I MYSELF HAVE WANDERED CONTINUALLY HITHER AND THITHER A STRANGER EVERYWHERE".

আইনস্টাইনের শৈশব মোটেও সুখকর ছিল না। শিক্ষকদের মতে তিনি ছিলেন হাবা শিষ্য- গাধার গাধা। বিখ্যাত গণিতজ্ঞ মিনস্কি তাঁর ওপর এমন খেপেছিলেন, প্রায়ই গালির খই ফোটাতেন, 'তুমি একটা অলস কুত্তা'।
এই অলস কুত্তাই, আইনস্টাইন আপেক্ষিক মতবাদ দিয়ে সারা পৃথিবী কাঁপিয়ে দিলেন।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় ১৯৪৪ সালে ক্যানসাস সিটিতে তার তৃতীয় প্রবন্ধের পান্ডুলিপি ৬০ লক্ষ ডলারে বিক্রি হয়। সারাটা জীবন যেমন দু-হাতে টাকা কামিয়েছেন তেমনি দুস্থদের অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছেন। দুস্থদের জন্যে বেহালা বাজিয়েছেন। চমৎকার বেহালা বাজাতেন তিনি। তৎকালীন নামকরা পত্রিকাগুলো বিখ্যাত বেহালাবাদক আইনস্টাইন শিরোনামে বাড়াবাড়ি রকম প্রশংসা করেছিল।

একবার জাপানে মানুষে টানা রিকশায় তাঁকে উঠতে বলা হলে, ব্যথিত হয়ে তিনি বলেন: 'একজন মানুষ পশুর মতো টানবে, আমি নির্বিকারচিত্তে বসে থাকব তা কি করে হয়'!
বহু অনুরোধ করেও ফল হয়নি। উঠানো যায়নি রিকশায়।

অহংকারী ছিলেন না, কিন্তু আত্মবিশ্বাসের অভাব ছিল না। জার্মানী শেষবার ছাড়ার পর সে সময়কার একশ বিজ্ঞানী তার তত্ত্ব ভুল বলে মহা হইচই শুরু করে। আইনস্টাইন রাগ করলেন না, ব্যাপারটা সহজভাবেই নিলেন। অসম্ভব আত্মবিশ্বাস নিয়ে বললেন: 'আরে এসব কি, একশ জনের কি প্রয়োজন, মাত্র একজন ভুল ধরিয়ে দিলেই তো হয়'!

নিউইয়র্কে প্রথমবার যাবার পর সাংবাদিকরা তাঁকে ছেঁকে ধরল। একজন মজার এক প্রশ্ন করল: 'আচ্ছা বিষয়টা কি বলুন দেখি, আপনার আপেক্ষিকবাদের নাম শুনে মেয়েরা এতো উচ্ছ্বসিত কেন'?
আইনস্টাইন হা হা করে হেসে বললেন: 'কেন আবার, ফি বছরই তো নতুন নতুন ফ্যাশনের হুজুগ শুরু হয়, লেটেস্ট হলো আপেক্ষিকবাদ।

ঢিলেঢালা আটপৌরে বেশভূষা, মাথায় কাকের বাসা, প্রায় সবসময়ই ঠোঁটে ঝুলছে সিগার, বুদ্ধিদীপ্ত ঝকঝকে চোখ- এসব নিয়েই আইনস্টাইন।
তার ধারণা ছিল, নাৎসীরা যদি আণবিক শক্তির প্রয়োগ করে তাহলে ভয়াবহ অবস্থা হবে। কিন্তু জাপানের ওপর আমেরিকার আণবিক বোমা নিক্ষেপ এবং এর পরিণাম দেখে ভীষণ আঘাত পান। মানুষের কল্যাণে এ শক্তি মুঠোয় আটকাতে গিয়ে ফল হলো সম্পূর্ণ উল্টো। নিমিষেই হাজার হাজার প্রাণ জড় পদার্থ হলো, লাখ লাখ লোক চিরতরে পঙ্গু।
আইনস্টাইন চোখের জলে ভাসতে ভাসতে বলেছিলেন: 'ফর গড সেক, শুধু যদি একটু ইঙ্গিত পেতাম জার্মানরা আণবিক বোমা তৈরি করতে পারবে না, তাহলে কখনই এ বোমা বানাতে সহায়তা করতাম না, কখখনো না'।

আইনস্টাইন ছিলেন অসম্ভব জনপ্রিয়। একটা নমুনা এরকম, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ চৌদ্দজন বিজ্ঞানীর নাম বিজ্ঞানীদের কাছ থেকে গোপন ভোটের মাধ্যমে চাওয়া হলে, বিভিন্ন নাম ওঠে এলো। কিন্তু আইনষ্টাইনের নাম কারও পছন্দ থেকে বাদ পড়ল না।

তাঁকে একবার প্রশ্ন করা হয়েছিল: 'আপনার ল্যাব কোথায়'?
উত্তরে মাথায় টোকা মেরে বললেন: 'এই তো, এটাই'। এক টুকরো কাগজ আর একটা পেন্সিল দেখিয়ে বললেন, 'এটাই আমার ল্যাব-ইন্সট্রুমেন্ট'।

সাংবাদিকরা তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিল: আচ্ছা ধরুন আপনার আপেক্ষিকতত্ত্ব ভুল প্রমাণিত হল। ফল কি দাঁড়াবে মনে করেন?
তিনি কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে থেমে থেমে বললেন: 'হবে আর কি, ফ্রান্সের লোকেরা বলবে: ওহ, ঐ ব্যাটা তো জার্মান আর জার্মানরা ঠোঁট ওল্টে বলবে, ও তো ইহুদী'।

অশান্ত নরকতুল্য পৃথিবী দেখে হতাশাগ্রস্ত হয়ে বলেছিলেন: আহ, আবার যদি যৌবন ফিরে পেতাম। নিজ ইচ্ছার পেশা বেছে নিতে বলা হলে, মোটেও বিজ্ঞানী হতাম না। হকার হতাম। ক্ষীণ আশা, কিছুটা হলেও স্বাধীনতা পেতাম।

যে ছোট বালক বাবার কাছ থেকে কম্পাস উপহার পেয়ে বিজ্ঞানের যাদু দেখে প্রবল নাড়া খেয়েছিল। পরবর্তীকালে সেই বালকটি বিজ্ঞানের চমক দেখিয়ে পৃথিবীর জড়শুদ্ধ নাড়িয়ে দিল। এই মহান বিজ্ঞানী ১৯৫৫ সালের ১৮ এপ্রিল শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর প্রখ্যাত কার্টুনিস্ট হারব্লক সৌরজগত এঁকে পৃথিবীর ওপর লিখে দিলেন, "ALBERT EINSTEIN LIVED HERE..."

*যেসব প্রবন্ধের সহায়তা নেয়া হয়েছে:

আণবিক নয় মানবিক: রশীদ হায়দার,
আইনস্টাইন: তপন চক্রবর্তী,
আইনস্টাইনের জগৎ: আব্দুল্লাহ আলমুতী,
আইনস্টাইন শতবর্ষের আলোক: শাহজাহান তপন,
আইনস্টাইন এত বিখ্যাত কেন: আলী আসগর।

**ছবিসূত্র: প্রথম আলো। প্রথম আলোর সূত্র কী এটা এরা উল্লেখ করেননি (হোমওয়ার্ক হয়ে থাকলে ঠিক আছে!)।

Saturday, February 14, 2009

স্যার, কোথায় গেলে আপনার খোঁজ পাব, যাদুঘরে?

এই পোড়া দেশে আমার ভাল লাগার মত মানুষের সংখ্যা হাতে গোনা। আমার অসম্ভব পছন্দের একজন মানুষ।

ছোটখাট শিশুর মত মানুষটা। ভারি সাদাসিধে জীবন-যাপন ছিল তাঁর। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে থেকেও দু'টা স্যুট পরে কাটিয়ে দিয়েছিলেন বছরের-পর-বছর। এই মানুষটার কাজ-কারবারের অল্প কিছু নমুনা:
অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ, তাঁকে নিয়ে এক ভিত্তিহীন খবরের প্রতিবাদে মানহানীর মামলা করেছিলেন, ফৌজদারী-দেওয়ানী আদালতে না, প্রেস কাউন্সিলে।
ভাবা যায়, এমন চল যে আমাদের দেশে আর নাই! 


দায়িত্বে থাকার সময় (বঙ্গভবনে) প্রবাসী পুত্রের সঙ্গে কথা বলার কারণে টেলিফোনের বিল আলাদা রাখার জন্য নির্দেশ দেন এবং এটা অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন তাঁর নিজ বেতন থেকে পরিশোধ করেন। 
টেলিভিশনে প্রচারিত তাঁর ভাষণের অংশগুলো ক্যাসেটে রেকর্ড করিয়ে দেয়ার জন্য টিভি কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করেন। দেশের এক নম্বর ব্যক্তির কাছ থেকে এহেন অনুরোধ পেয়ে টিভি কর্তৃপক্ষ যখন উচ্ছ্বসিত তখন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন এ বাবত কি পরিমাণ খরচ হয়েছে এটা জানতে চান। এবং সেটার বিল পাঠাতে বলে তাদের উচ্ছ্বাসে পানি ঢেলে দেন। কর্তৃপক্ষ প্রথমে গা করেন না- খরচের এই যত্সামান্য বিল তাঁর নামে না-পাঠালে মহারাগ করেন। পরে কর্তৃপক্ষ বাধ্য হন তাঁর নামে বিল পাঠাতে।
 
অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে থাকাকালীন তিনি বারবার বলছিলেন, যথাসময়ে তিনি তাঁর দায়িত্ব হস্তান্তর করবেন, কালবিলম্ব করবেন না। এই নিয়ে তখন দেশের পন্ডিতরা কষে ভদ্রস্থ গালি দিচ্ছিলেন, এটা বলার পেছনে নাকি তাঁর মনে কু আছে। কিন্তু ঠিকই তিনি বিন্দুমাত্র কালক্ষেপন করেননি! এ চলও আমাদের দেশে নেই!
 
প্রথমবার ক্ষমতার শীর্ষে থেকে ক্ষমতা ছেড়ে দেয়ার পর সাংবাদিকরা তাঁর অনুভূতি জানতে চাইলে তিনি তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলেছিলেন:
'আহ, এবার অন্তত আরাম করে সিঙ্গারা খাওয়া যাবে'।
শোনো কথা! মানুষটা সিঙ্গারা খুব পছন্দ করতেন কিন্তু ঘড়ির কাঁটা ধরে চলতে হয় বলে বঙ্গভবনের ডাক্তারের বারণ ছিল। এহেন পদে থেকে এটা উপেক্ষা করার উপায় নেই!
 
কিন্তু... প্রবল অনুরোধ উপেক্ষা করতে না-পেরে দ্বিতীয়বার ক্ষমতা গ্রহণের পর তিনি ক্রমশ আওয়ামীলীগের খপ্পরে পড়ে যান। কালে-কালে তিনি একটা পুতুলে পরিণত হন। আফসোস, অদৃশ্য শ্যাওলা জড়িয়ে যায় এই ভাল মানুষটার গায়ে...!
 
মানুষটার খোঁজ রাখার প্রয়োজন ফুরিয়েছে আজ আমাদের!

*লেখাটা 'সাদাকে কালো বলিব' (আলী মাহমেদ) বই থেকে:
**স্কেচ: (আসলে ডুডল: আঁকাআঁকির অর্থহীন অপ-চেষ্টা। আহা, বিকলাঙ্গ হলেও নিজের সন্তান যে।)

***স্কেচস্বত্ব: সংরক্ষিত 

Monday, January 12, 2009

পাই... থেরাপী

বহুজাতিক কোম্পানিগুলো হচ্ছে একেকটা চলমান রোবট বানাবার কারখানা। এরা ততক্ষণ পর্যন্ত মানুষকে চোখে চোখে রাখবে যতক্ষণ পর্যন্ত সে পুরোপুরি রোবট হয়ে না উঠে। আসলে উপায় থাকে না কারণ একের পর এক চকচকে লোভের হাড় মানুষের দিকে ঝড়ের গতিতে ছুটে আসতেই থাকবে- এই হাড় থেকে অবিরত চুইয়ে পড়ে বাড়ি-গাড়ি-নারি আরও কত কী, ইয়াত্তা নাই!

এভাবেই ক্রমশ মানুষের যুগ শেষ হয়ে আসছে- শুরু হচ্ছে রোবটের যুগ। যে অল্প ক’জন মানুষ আছেন এরা কিছুটা মানুষ কিছুটা রোবট। কারও হয়ত দেখা গেল দু-চোখের এক চোখ মানুষের, অন্য চোখ রোবটের। তীব্র বেদনায় এক চোখে পানি বের হচ্ছে তো অন্য চোখ শুকনো খটখটে। জমজ শিশুর একটা হয়তো মানব-ভ্রুণ, অন্যটা রোবট-ভ্রুণ।
বড় হয়ে ওই মানব ভ্রুণটা একটি কুকুরের জন্য চোখের জল ফেলছে (কুকুরটিকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়েছিল। সাত-আটটি ছোট ছোট দুধের বাচ্চা। সবগুলো বাচ্চা মার মৃতদেহের ওপর পড়ে আছে। বৃথাই দুধ টানার চেষ্টা করছে)।
অন্য দিক। একটি মানব সন্তানের মৃত্যু হলে রোবট-ভ্রুণটা মরা মাছের চোখ করে বলছে: শিট, একটা চিপ নষ্ট হলো।

এক বহুজাতিক কোম্পানির বড় কর্তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আচ্ছা, তোমরা কাজ-কাম চালাও কেমনে?
সে উত্তর দিয়েছিল, আমরা তো কাজ করি না মিটিং করি, মিটিং-এর উপরই থাকি। খোদা না খাস্তা যখন কেউ ফ্রি থাকে তখন বলি, কোন কাজ নাই তো একটা মিটিং ডাক। আসলে আমরা মিটিং নিয়েই থাকি, মেটিং করারও সময় পাই না।
আবার প্রশ্ন করা হয়েছিল, তোমাদের এতোসব উদ্ভট আইডিয়া পাও কোত্থেকে?
সাবলিল উত্তর, কেন, কেন রেস্ট-রুম থেকে!
মানে টাট্টিখানা-পাইখানা থেকে!
ইয়াপ।

বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর ব্যবসা-বাণিজ্যর কিছু নমুনা দেয়া যাক। ধরা যাক একটা পণ্য, চিপস (যান্ত্রিক চিপস না, খাওয়ার চিপস। যেটা খেলে কুড়মুড় শব্দ হবে, হবেই, শব্দ না করতে চাইলে চিপস পানিতে ভিজিয়ে চামচ দিয়ে খেতে হবে)। তো ওই কোম্পানীর চিপস দেশে-বিদেশে (বুধ, বৃহস্পতি গ্রহ ব্যতীত) হু হু করে বিক্রি হচ্ছে।
এমনি এমনি না, বাজারজাত করা একটা ভারী কু-জটিল প্রক্রিয়া।
মাসের শুরুতে জানতে চাওয়া হবে এ মাসে কত বিক্রি হবে। যিনি বিক্রি করবেন তিনি অনেক আঁকজোক কষে, বৃষ্টি মেপে, গোপন জায়গায় রোদ লাগিয়ে, চুলকিয়ে; রোদের তীব্রতা বুঝে এবং ওই এলাকায় কতজন লোক আসবে কতজন যাবে এই সূক্ষ্ম হিসাব করে বললেন: ত্রিশ টন।
কিন্তু বিক্রি করতে বলা হলো চল্লিশ টন। ত্রিশ টনের হিসাব নাক মুছে কোথায় ফেলে দেয়া হয়েছে কে রাখে এর হিসাব।

তো চিপস বিক্রি শুরু হলো। চাহিদার হেরফের হলো। কিছু লোক হুট করে অন্যখানে চলে গেল ব্লাডার খালি করতে নচেৎ কিছু লোক বিচিত্র কারণে এখানে চলে আসল।
কিন্তু অমোঘ নির্দেশ এলো: চল্লিশ টন থেকে এক প্যাকেট চিপসও বেশি বিক্রি করা যাবে না। এমনটি এক প্যাকেট কমও না। মাস শেষে হাতে মজুদ থাকবে কত এটাও নাকি মাসের শুরুতেই নির্ধারিত হয়ে আছে।

তাহলে উপায়? মানব-রোবটদের এ দুর্দশা দেখে বহুজাতিক কোম্পানি তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে। হাসে মানে ডিজটাল ডিসপ্লেতে হাসির একটা ভংগি ফুটে উঠল। গোলের নামে ব্যাখ্যা দেয়া হল, এ তো খুব সোজা। তোমরা কিছু নিম্ন শ্রেণীর রোবট
মার্কেটে ছেড়ে দাও। যখন দেখবে বিক্রির বারোটা বেজে গেছে তখন এরা উদ্বৃত্ত চিপস কপাকপ করে খেয়ে ফেলবে। বিক্রি বেশি হলে কোথায় বাড়তি চিপস পাওয়া যাবে এটা অবশ্য এড়িয়ে যাওয়া হল।

আরও বলা হলো, জীবনটা হচ্ছে একটা দৌড়, লম্বা দৌড়- এখানে হিসাব ব্যতীত অন্য কিছুর স্থান নাই। তোমরা আমাদের ‘পাই... থেরাপীর’ দিকে তাকাও- আমরা যখন পাই...-এ যাই ডেলিভারী দেয়ার জন্য, হররোজ, প্রত্যেকবার ডেলিভারি নির্দিষ্ট সংখ্যা থাকে যেমন তিনশো আউন্স- এক আউন্স বেশি-কম হলে পাইখানার দরোজা আর খূলবে না।

ছবিসূত্র: ইন্টারনেট, বাথবিজ