Search

Showing posts with label আমাদের ইশকুল: এক. Show all posts
Showing posts with label আমাদের ইশকুল: এক. Show all posts

Monday, October 25, 2010

কথার বেলুন!

প্রত্যেকটা স্কুলে [১] বাচ্চাদের জন্যে কিছু নিয়ম-কানুন লিখিত আকারে ঝোলানো থাকে। প্রায় একই ধরনের কথাবার্তা: হাতের নোখ ছোট থাকবে, খাওয়ার আগে হাত ধুতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। স্কুল ভেদে খানিকটা পরিবর্তন হয়। যেমন, স্টেশনের স্কুলে বাড়তি যোগ হয়, ট্রেনের ছাদে উঠা যাবে না; আবার হরিজন পল্লীর স্কুলে, রেললাইনে হাঁটা যাবে না।
বাধ্য হয়ে এখন হরিজন পল্লীর স্কুলে বাড়তি একটা যোগ করতে হয়েছে, বেলুন(!) নিয়ে স্কুলে আসা যাবে না। এর ইতিহাস খানিকটা বিচিত্র।

যেদিন ডা. গুলজার হোসেনকে স্কুলের বাচ্চাদেরকে দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলাম, চিকিৎসার জন্য [২]। সেদিন হরিজন পল্লীর বাচ্চাদের কাছে বিচিত্র ধরনের কিছু বেলুন(!) পাওয়া গেল। ডাক্তার সাহেব সম্ভবত হকচকিয়ে গিয়েছিলেন কারণ এগুলো পুরুষদের জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী (আমার ধারণা আমার লেখার অধিকাংশ পাঠক প্রাপ্তবয়স্ক। তাই বিস্তারিত বলার চেষ্টা করলাম না। অধিকাংশ বললাম এই কারণে, কখনও-সখনও কিছু পাঠকের কথা শুনে মনে হয় এরা কখন বড়ো হবে? এতে খানিকটা নিশ্চিত হয়েছি কিছু অপ্রাপ্তবয়স্ক পাঠকও আছেন তাদের জন্য বলি, ব্যাটা বড়ো হও, তখন বলব নে।)।

ডাক্তার সাহেব যতই বলেন, এটা ফেলো, মুখে দিয়ো না। কে শোনে কার কথা! এ ফেলবে না। মাস্টার মশাইয়ের চোখ রাঙানিও কাজে আসছে না। মহা মুশকিল!
লোকজন আমাকে তেমন একটা পছন্দ না-করলেও বাচ্চারা কেন জানি না আমাকে খানিকটা পছন্দ করে। কেন করে আমি জানি না, জানার চেষ্টায় আছি! আমি একে বললাম, এইটা ফালায়া আসো, মুখে দিতাছো, পেটে কিন্তু বড়ো বড়ো সাপ হইব।
এ খানিকটা দ্বিধায় পড়ে গেছে, কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না। অনেক ভেবে-টেবে বলল, স্যার, তুমি কিন্তুক হামারে বেলুন আইনা দিবা? (এদের একসেন্টে খানিকটা ঝামেলা আছে)। আমারও :)!
আমি বললাম, আচ্ছা। এখন এটা ফেলে আসো। এ ফেলে আসে। আমি মাস্টার মশাইকে কেবল মুখেই বলে আসি না, লিখেও দিয়ে আসি, স্কুলে বেলুন(!)...।

আমি খানিকটা লজ্জিতও হলাম। খেলার জন্য এদের বেশ কিছু খেলার সামগ্রী দেয়া হয়েছে কিন্তু তালিকায় বেলুন ছিল না। এটা কেন মাথায় আসেনি এটাই ভেবে কূল পাচ্ছি না। একটা বেলুন একটা শিশুর কাছে কতটা আগ্রহের বিষয় এটা তো সইজেই অনুমেয়। এই অনুমানটা আমি কেন করতে পারলাম না!
তাই আজ ছিল এদের বেলুন উড়াবার দিন।
আমি পূর্বের একটা লেখায় লিখেছিলাম:
"স্বাস্থ্যসচিব হাইকোর্টে হলফনামা দিয়েছেন, এই দেশের সব দম্পতি পরিবার পরিকল্পনা সম্পর্কে অবহিত [৩]
ভাল-ভাল। যেদিন (২৭.০৯.১০) এটা পত্রিকায় পড়েছি সেদিন কেবল হাসিই চাপিনি, হাতে-নাতে পরীক্ষাও করেছি। এই নিয়ে হরিজনপল্লীর কয়েকজনের সঙ্গে আলাপও করেছি। আলাপের বিশদে যাই না, কেবল বলি, আমাদের স্বাস্থ্যসচিব সাহেবের মুখের হাসি যে মিলিয়ে যাবে এতে অন্তত আমার কোন সন্দেহ নাই"।

ওখানে লিখেছিলাম, বিশদে যাই না...। এখানেও বিশদে যাব না। অল্প কথায় বলি, হরিজন পল্লীতে এই বিষয়ে সচেতন করার কোন উদ্যোগ কারও নাই। হরিজন পল্লীর লোকজনরা সংশ্লিষ্টদের প্রতি যে ভাষা ব্যবহার করেছেন এখানে লিখলে আমার কী-বোর্ড সাবান দিয়ে ধুতে হবে। বলার পর আবার এটাও বলতে ভুলছেন না, বাবু, আপনি কিন্তুক মনে কষ্ট লিয়েন না, হামরা সুইপার আছে তো...।
ফল যা হওয়ার তাই হচ্ছে। ফি-বছর নিয়ম করে বাচ্চা! এখন আমাদের লোকসংখ্যা কত? ১৬ কোটি কি ছাড়িয়ে গেছে? আফসোস, আমাদের দেশে ৬ মাসে বাচ্চা হওয়ার কোন সুযোগ নেই নইলে আমরা অনায়াসে ভারত-চীনকে ছাড়িয়ে যেতে পারতাম। আরেক সুপার পাওয়ার হয়ে উঠতাম।
"এই দেশের সব দম্পতি পরিবার পরিকল্পনা সম্পর্কে অবহিত..."। এটা অবিশ্বাস করার কোন কারণ দেখি না যে দেশের শিশুদের হাতের নাগালে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী চলে এসেছে...!

সহায়ক লিংক: 

১. আমাদের ইশকুল: http://tinyurl.com/39egrtn
২. স্কুল, রোবট এবং মানুষের গল্প: http://www.ali-mahmed.com/2010/10/blog-post_23.html
৩. প্রথম আলো: http://www.eprothomalo.com/index.php?opt=view&page=3&date=2010-09-27 

Sunday, October 10, 2010

আমি ত্রিকালজ্ঞ না বলেই...

স্কুলগুলোয় [১] যাওয়ার আগামাথা নাই আমার। কখনও শুরু হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে, কখনও স্কুল শেষ হয়-হয় এমন সময়ে। এর কিছু কারণ আছে। এক স্কুলের, সঙ্গত কারণেই স্কুলটার নাম বলতে চাচ্ছি না। তখনও স্কুলের নির্দিষ্ট ঘর হয়নি; স্কুল হয় উম্মুক্ত এক স্থানে, উঁচু চাতালের মত একটা জায়গায়।
স্কুল শুরু হওয়ার সময় হয়ে গেছে অথচ গিয়ে দেখি ধু-ধু মাঠ, মাস্টার মশাইয়ের পাত্তা নেই। আমি চাতালে বসে ফোন করি। মাস্টার মশাই অতি আনন্দের সঙ্গে জানান, তিনি স্কুলে আছেন এবং বাচ্চাদের পড়াচ্ছেন!

আমি মনে মনে বলি, আমার বুদ্ধিশুদ্ধি কম কিন্তু আমাকে ফাঁকি দিতে হলে আমার বুদ্ধিকে ছাড়িয়ে যেতে হবে যে। মুখে বলি, আমি স্কুলেই আছি।
মাস্টার মশাই হন্তদন্ত হয়ে আসার পর আমি কিচ্ছু বললাম না, অন্য প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলতে লাগলাম। কিন্তু মাস্টার মশাই বুঝে গেলেন আমি মানুষটা বিশেষ সুবিধের না। এরপর থেকে আর সমস্যা হয়নি।

যাই হোক, আজ গেছি ইশকুল এক হরিজনপল্লীতে। এই সময়টা এদের খেলার। সবাই খেলায় ব্যস্ত। আমাকে দেখলেই এরা বিভিন্ন আবদার জুড়ে দেয়।
নিয়ম করে যেটা করতে হয় এদের ছবি তুলে দিতে হয়। কাঁহাতক ছবি তুলতে ভাল লাগে! এদের এই আবদার মেটাতে গিয়ে কখনও কখনও চালবাজি করি। ছবি না তুলেই বলি, হয়েছে, ছবি সোন্দর আসছে। এরা বুদ্ধির খেলায় আমাকে হারিয়ে দেয় যখন বলে, কই দেখান, দেখি কেমন আসছে?
আমি বিপদে পড়ি।

এই স্কুলের ছাত্রী প্রিয়া নামের ৭/৮ বছরের এক মেয়ে আজ অনুপস্থিত। টিচারের কাছে জানতে চাইলে তিনি জানালেন, প্রিয় ছুটি নিয়েছে, বাবা-মার সঙ্গে কোথাও বেড়াতে যাবে। এরিমধ্যে প্রিয়া এসে উপস্থিত। বেড়াতে যাবে বলে এ খানিকটা সাজগোজও করে এসেছে। আমিই প্রিয়াকে বলি, আসো, তোমার একটা ছবি উঠিয়ে দেই। 

সেল-ফোনের ছোট্ট ডিসপ্লেতে তেমন বুঝিনি এখন ছবিটা বড়ো পর্দায় দেখে আমি আক্ষরিক অর্থেই হতভম্ব হয়ে আছি! কী অদ্ভুত, কী অদ্ভুত সুন্দর! কে বলবে এই শিশুটি হরিজন পল্লীতে জন্ম নিয়েছে! সৌন্দর্যের বিচারে আমার নিজের মেয়েও এর ধারেকাছে আসতে পারবে না।
আমি তর্কবাজ না কিন্তু তবুও তর্কেতর্কে তর্ক করতে ছাড়ব না, কে বলেছে এই মেয়েটি আগামীতে মিস ওয়ার্ল্ড হতে পারবে না? অন্তত এমন ভাবাটা দোষের...।
জানি-জানি, অনেকে অট্টহাস্যে গা দুলিয়ে হাসছেন। চোখের ভুল হতে পারে কিন্তু আমার মনিটরের পর্দা খানিকটা দুলে উঠতে দেখলাম সম্ভবত। ওহো, আপনারা ত্রিকালদর্শী বুঝি, এ হতে পারে না, 'কাভি নেহি'! ভবিষ্যৎ অনায়াসে টের পান নাকি? তাই বলুন...!

সহায়ক লিংক:
১. আমাদের ইশকুল: http://www.ali-mahmed.com/2010/10/blog-post_07.html

Tuesday, August 10, 2010

শিক্ষার সমতুল্য কিছু নাই

হরিজন পল্লীতে কাজ করতে গিয়ে বিচিত্রসব বিষয় জানার সুযোগ হচ্ছে। এই বাচ্চাগুলোর যিনি মা, তিনি আবার আনন্দের মার বোন [১]। এঁরা দু-বোন দেখতে প্রায় একই রকম, প্রায়শ আমি গুলিয়ে ফেলতাম। এবং দুজনেরই সুখি-সুখি চেহারা, বাইরে থেকে দেখে কেউ আঁচ করতে পারবে না এঁদের কোন দুঃখ স্পর্শ করতে পারে!


এই পরিবারের বাচ্চাগুলো পিংকি, প্রিয়াংকা, পিয়াস। এদের মধ্যে দু-বোনের একজন পড়ে ক্লাশ নাইনে, অন্যজন সিক্সে। দু-ভাইয়ের একজন ফোরে, অন্যটা ছোট, 'আমাদের ইশকুল' [২]-এ পড়ে (ওর নামটা এখন মনে পড়ছে না)।
এই বাচ্চাগুলোর স্কুল ফি জমে গিয়েছিল। গতবার যখন 'পড়শী ফাউন্ডেশন'-এর লোকজন এসেছিলেন তখনই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল এদের ফির টাকা দিয়ে দেয়া হবে। সমস্যা এটা না।
এই পরিবারের লোকজন একদিন আমাকে ধরে বসলেন, পরিবারের কর্তাকে বোঝাবার জন্য। তিনি বড় মেয়েটা, যে ক্লাশ নাইনে পড়ে তার পড়া বন্ধ করে দিতে চাচ্ছেন। আমি যেন মেয়ের বাবাকে একটু বুঝিয়ে বলি। শোনার পর থেকে মেয়েটা খুব মনখারাপ করে আছে।
মনে মনে আমি বলি, হায়রে দুনিয়া, ঘরের মানুষকেই বোঝাতে পারি না বাইরের লোকজনকে কি বোঝাব!
আবার এই শংকাও কাজ করে, দেখা গেল মানুষটা ক্ষেপে গেল, তখন?

মুশকিল হচ্ছে মানুষটার নাগাল পাই না। আমি তক্কে তক্কে থাকি। সুভাষ চন্দ্র দাস নামের মানুষটাকে একদিন ঠিক-ঠিক পাকড়াও করি। তার সঙ্গে কথাবার্তা নিম্নরূপ:
আমি বলি, আপনি নাকি মেয়েটার লেখাপড়া বন্ধ করে দিতে চাইছেন, সমস্যা কি?
তিনি বলেন, হাদে (শুধুশুধু) কি পড়া বন্ধ করতাম চাই, মেটরিকে ম্যালা টেকা লাগে।
অনেক দিন পর এসএসসির বদলে মেট্রিক শব্দটা শুনলাম। আমি অবাক হয়ে বলি, ম্যালা টেকা মানে কত টাকা লাগে?
তিনি মাথা চুলকে বলেন, হুনছি দশ হাজার টেকা লাগে। আপনেই কন, কোত্থিকা পামু এতো টেকা?

আমি বলতে গিয়ে সামলে নেই, কোন হা...। আমি অবাক হয়ে ভাবি, মানুষের জন্য শিক্ষা যে কত জরুরি, শিক্ষার কোন বিকল্প নাই। মানুষটা শিক্ষিত হলে অন্তত সামান্য হলেও খোঁজ-খবর নেয়ার চেষ্টা করতেন। 'কর্তাতান্ত্রিক' সমাজ আমাদের- এই পরিবারের অন্যরাও খোঁজ নেয়ার চেষ্টা করেনি। মেয়েটাও মাথা ঘামায়নি। 
আমি সামলে নিয়ে বলি, কে বলেছে আপনাকে দশ হাজার টাকা লাগে! আমি ঠিক জানি না তবে হাজার দুয়েকের বেশি হওয়ার কথা না। আর এ তো এখন কেবল নাইনে পড়ছে। পরীক্ষার তো এখনও অনেক দেরী, এখনই আপনি মেয়েটার পড়া বন্ধ করে দেবেন এটা কেমন যুক্তি! আপনি মেয়েটাকে 'মেটরিক' পরীক্ষা দিতে দেন আর আপনার কাছ থেকে কেউ দুই হাজার টাকার বেশি চাইলে আমাকে আটকে রাখবেন। তাছাড়া আপনাকে তখন ফির টাকা নিয়ে যেন মাথা না ঘামাতে হয় সেটাও আমরা দেখব। আপনি কেবল বলেন, মেয়েটার পড়া বন্ধ করবেন না।
মানুষটা মাথা ঝাকান, আইচ্ছা।
আমি এবার চেষ্টাকৃত গম্ভীর হয়ে বলি, না আইচ্ছা না। আপনি আপনার বউ-বাচ্চার সামনে আমাকে কথা দেন। 
মানুষটা এবার মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলেন, আইচ্ছা, সবার সামনেই কইলাম। আইচ্ছা।
আমি হাসি চেপে বলি, আইচ্ছা, ঠিক আছে।

সহায়ক লিংক
১. আনন্দ: http://www.ali-mahmed.com/2010/08/blog-post_10.html
২. আমাদের ইশকুল: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_9016.html

Monday, July 12, 2010

ইশকুল এবং বিবিধ...

পূর্বের পোস্টে [১] আমি লিখেছিলাম, ইশকুলটার বেশ কিছু সমস্যা রয়ে গেছে।  একটা ইশকুল ঘরের প্রয়োজন ছিল কারণ বৃষ্টি এলেই পড়া পন্ড হত। বাচ্চাদের পোশাকের সমস্যাও ছিল। এই সমস্যাগুলোর সমাধান হয়েছে। ইশকুলের জন্য একটা ঘর পাওয়া গেছে। যদিও এই ঘরটায় আলো-বাতাসের সমস্যা আছে, তবুও ইশকুলের জন্য একটা নির্ধারিত ঘর তো হলো। আশা করছি, কালকের মধ্যে আলো-বাতাসের সমস্যার সমাধান হবে।

বাচ্চাদের পোশাকের সমস্যারও সমাধান হয়েছে। প্রথমে ভাবা হয়েছিল, আলাদা কাপড়ের ব্যবস্থা করা হবে। কিন্তু পরে এটা বাদ দেয়া হয়েছে। এরচেয়ে অনেক ভালো হয় এদের ইশকুল ড্রেস হলে। তাই করা হয়েছে।
ইশকুলের ড্রেস পরে সারি বেঁধে বাচ্চারা ইশকুলে যাচ্ছে এ দৃশ্যটা একবার আমার মাথায় এমন আটকে গিয়েছিল যে তখন মনে হচ্ছিল, এই গ্রহে এরচেয়ে চমৎকার দৃশ্য আর নাই! 
আর এখন এই বাচ্চাদের তো কথাই নেই। অবশ্য বাচ্চাদের চেয়ে এদের মাদের আনন্দ কম এ কথা জোর দিয়ে বলতে পারি না।

আলী মাহমেদ নামটা নিয়ে অনেকে খুব সমস্যা বোধ করেন। সাধারণ মানুষ কোন ছার, জ্ঞানী মিডিয়ারও কেউ কেউ এটাকে আলীম আহমেদ বানিয়ে দেন, তো কেউ আলী আহমেদ, কেউ-বা আলী মাহমুদ। 
কেউ কেউ আবার ভুরু জোড়া দিয়ে বলেন, এইটা আবার একটা নাম হইল! তাঁদের সদয় অবগতির জন্য বলি, দয়া করে ইংরাজিতে গুগলে সার্চ দিয়ে দেখবেন বিভিন্ন দেশে কত আলী মাহমেদ আছে।
প্রসঙ্গটা এই কারণে বললাম, এই হরিজন পল্লীতে সবচেয়ে শিক্ষিত ছেলেটার নাম হচ্ছে, আকাশ বাসপোর। বাসপোর? বাসপোর কি নাম, বাওয়া? নামটাকে নিয়ে মিডিয়া যে কী খেলা খেলত এই নিয়ে বড়ো চিন্তায় আছি।

যাগ গে, এই আকাশ বাসপোর, পিতা প্রদীপ বাসপোর। এ প্রথম শ্রেণীতে ট্যালেন্টপুল বৃত্তি পেয়েছিল। বৃত্তি পেয়েছিল ক্লাশ ফাইভে। আমার খানিকটা অবিশ্বাস ছিল কিন্তু আজই তার সনদগুলো হাতে পেলাম।

এখন এ পড়ছে ক্লাশ এইটে, তার বোন ক্লাশ ফাইভে। তার প্রবল আশা, ক্লাশ এইটেও সে বৃত্তি পাবে।
কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, ওর বাবা নাই। আর্থিক সমস্যার কারণে পড়া চালিয়ে যেতে তার সমস্যা হচ্ছে। এই সমস্যারও একটা সমাধান করা হয়েছে।

*এই সব সমস্যা নিয়ে আমি চোখে অন্ধকার দেখছিলাম। আর্থিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন পড়শী ফাউন্ডেশন, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ডাক্তার, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ভদ্র মহিলা। তাঁদের প্রতি আমার অনেক অনেক কৃতজ্ঞতা।

**এখন আমার জন্য সবচেয়ে বড়ো যে সমস্যা সেটা হচ্ছে, আজও লক্ষ করলাম, বেশ কটা বাচ্চার শরীর খারাপ থাকায় এরা অনুপস্থিত। ডাক্তার পাচ্ছি না। অনীক নামের একটা বাচ্চার চোখ দেখলাম হলুদ। এটাকে ধরে নিয়ে টেস্ট করে অবশ্য গুরুতর কিছু পাওয়া যায়নি। বিলরুবিন ২.৭। এইচবিএস নেগেটিভ। আপাতত এর বিশ্রাম।
এই আয়োজনের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন এমন একজন জুনিয়র বন্ধুকে গতকাল ডাক্তারের সমস্যার কথা বলায় সে বলছিল, দেখি, ডাক্তার একটা মেয়ে খুঁজছি বিয়ে করার জন্য। বুদ্ধিটা মন্দ না। :)

***আরেকটা কাজ অচিরেই শুরু করব। 'স্মল ক্রেডিট'। 'মাইক্রো ক্রেডিট' এটা বললে আমাদের ইউনূস সাহেব [২] আবার আপত্তি জানাতে পারেন তাঁর বিরাট আবিষ্কার ছিনতাই হয়ে যাচ্ছে বলে। 
'স্মল ক্রেডিট' হচ্ছে খুব সাধারণ একটা ভাবনা। ছোট্ট একটা কাজ। অনেক মহিলা আছেন যাদের খুব স্বল্প পুঁজি হলে গোটা পরিবারটা দাঁড়িয়ে যায়। এঁরা অনেকে মোয়া বানান, ঠোঙ্গা বানান, সমুসা বানান (এটা এখন গাড়িতে হরদম বিক্রি হয়)। 
এঁদেরকে যে স্বল্প পুজিটা দেয়া হবে সেটা (এঁদের সঙ্গে আলোচনা করে) প্রতি মাসে অল্প অল্প করে টাকাটা এঁরা পরিশোধ করবেন। এবং অবশ্যই আমাদের মহান ইউনূস সাহেব, স্যার ফজলে আবেদের [৩] মতো চড়া সুদে না। 
বিনা সুদে।

সহায়ক লিংক:
১. ইশকুল: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_1768.html   
২. লাইফ-এচিভমেন্ট-সেক্রিফাইস: http://www.ali-mahmed.com/2008/07/blog-post_3333.html
৩. লাশ-পদক-বানিজ্য: http://www.ali-mahmed.com/2010/04/blog-post_23.html

Sunday, July 11, 2010

ইশকুল: অগ্রগতি

ইশকুলটা [১] চালু করা হয়েছিল (১৩ জুন, ২০১০)। প্রায় এক মাস হতে চলল। দেশের বাইরে যাওয়ার কারণে এবং আমার নিজস্ব কিছু জাগতিক সমস্যায় জড়িয়ে পড়েছিলাম বলে ইশকুলে নিয়মিত যাওয়া সম্ভব হয়নি। 
কিছু কারণে আজ আমার মনটা ভারী বিষণ্ন। আমার মন খারাপ হলে হাঁটতে হাঁটতে ইশকুলে চলে যাই- বিচ্ছুদের যন্ত্রণায় কখন মনটা ভালো হয়ে যায় টেরটিও পাই না!

আজ এখানে আসার পর মাস্টার মশাই শশব্যস্ত হয়ে এদের পড়ার অগ্রগতি আমাকে বোঝাবার চেষ্টা করেন। কিন্তু আমি আগের পোস্টেও [২] উল্লেখ করেছিলাম, মাস্টার মশাইকে আমি স্পষ্ট করে বলেছিলাম, আমার কাছে এদের পড়ার চেয়ে গুরুত্ব বেশি যেটা এদের সহবত, পরিছন্নতা...। কারণ এরা আপনার আমার সন্তান না, এরা হরিজনদের সন্তান- যাদের আমরা তাচ্ছিল্য করে বলি, মেথরদের সন্তান।

ভাল লাগে এটা দেখে, এদের নোখগুলো ছোট করে কাটা, দাঁত পরিষ্কার! খাওয়ার পূর্বে হাত ধোয়ার অভ্যাসটাও এরা রপ্ত করে ফেলেছে।
ধন্যবাদ, মাস্টার মশাই।
ডান পাশেরটাকে আমি বলি, ব্যাটা দাঁত দেখি। এ একটু বেশি দাঁত দেখাতে গিয়ে মুখের চকলেটটা পড়ে গিয়েছিল। এদের জন্য আবার চকলেট না নিয়ে গেলে বড়ো যন্ত্রণা করে।

ডান পাশের বাচ্চাটাকে তার মা নিয়ে যেতে চাচ্ছিল কারণ এর গায়ে জামা নাই। এই পরিবারটা এতই হতদরিদ্র, বাচ্চাটা ইশকুলে আসে জামা ছাড়া।

অনেক সমস্যা রয়ে গেছে। এদের জামা-কাপড় প্রয়োজন, প্রয়োজন একটা ইশকুল ঘরের। এখন যে উঁচু চাতালটায় ক্লাশ করা হয় বৃষ্টি এসে সব পন্ড করে ফেলে। প্রয়োজন এদের প্রাথমিক চিকিৎসার। 
ডাক্তার সাহেবদের তৈলমর্দন করে করে আমার ঘটির তৈল ফুরিয়ে গেছে। এমন না যে এদের মাগনা দেখে দেবেন কিন্তু ওখানে যেতে এদের বড়ো সমস্য। একজন ডাক্তার সাহেব আবার অতি ধার্মিক টাইপের, ধর্মের গাট্টি নিয়ে দেখি প্রায়ই ছুটাছুটি করতে। তো, ওনার আবার সামনে যেন কি একটা পরীক্ষা, তিনি ৩০ মিনিট সময়ও বের করতে পারছেন না! তিনি স্বর্গ জয় করুন!
কেন যে 'নেকাপড়াটা' ভালো করে করলাম না। ...শ্লার জীবন একটা আমার! ছোটখাটো একজন ডাক্তার হতে পারলেও কাজ হতো। এই একটা পেশাকে আমি ঈর্ষা করি। 
আমার ভাষায় এঁরা দ্বিতীয় ঈশ্বর- একজন মুমূর্ষু রোগি যখন আধ-জবাই পশুর মত ছটফট করতে থাকে তখন উপরে প্রথম ঈশ্বর আর নীচে দ্বিতীয় ঈশ্বর ডাক্তার; মাঝামাঝি আর কেউ নাই, কিছু নাই।
আমি এই মা-টার মুখ [৩] এখনো ভুলতে পারি না।

সহায়ক লিংক:
১. ইশকুল, এক: http://www.ali-mahmed.com/2010/06/blog-post_14.html 
২. ইশকুল, দুই: http://www.ali-mahmed.com/2010/06/blog-post_5273.html 
৩. মা এবং তাঁর অদেখা সন্তান: http://www.ali-mahmed.com/2010/02/blog-post_10.html    

Monday, June 14, 2010

ইশকুল: স্বপ্ন পাঁচ

পুর্বের পোস্টে [১] লিখেছিলাম, এই বিচ্ছুদের কাবু করা নিয়ে। আজ বাচ্চাদের বই দেয়া হয়েছে। ঠিক এখুনি বইয়ের প্রয়োজন ছিল না কিন্তু এদের একের পর এক ফাঁদে না ফেলে উপায় নেই। ঝাঁ-চকচকে, ছবিঅলা রঙিন বইগুলোর আবেদন এদের কাছে কেমন এটা নিজ চক্ষে দেখলাম। একজনের পর একজনের অনুরোধ, সবগুলো বিচ্ছুর ছবি তুলতে হয়েছে আমাকে!



মাস্টার মশাইয়ের হাতে বেত দেখলাম, আমার অপছন্দের কথা জানিয়ে দিলাম। তাঁকে আমি বললাম, প্রচলিত পড়ানো আমি চাচ্ছি না। এদের অক্ষর জ্ঞানের পাশাপাশি যেটা দেখা প্রয়োজন, খাবার আগে হাত ধোয় কি না, হাতের নোখ বড়ো কি না, দাঁত মাজে কি না? কারণ আপনি যে বাচ্চাদের পড়াচ্ছেন এরা শিক্ষিত বাবা-মার সন্তান না। এখুনি অক্ষর নিয়ে মারামারি করার প্রয়োজন নাই। বই থেকে ছবিগুলো চিনুক, ছবিগুলো নিয়ে গল্প করুন।
আর ভুলেও কখনও আমাকে দেখে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াবেন না কারণ আমি চাই এই বাচ্চারা বুঝতে শিখুক শিক্ষকের উপরে আর কেউ নাই।

গত পোস্টে বলেছিলাম, বাচ্চাদের বাবারা, বয়স্করাও শিখতে আগ্রহ দেখিয়েছেন। আজ থেকে এটা চালু হলো, ৮জন ছাত্র পাওয়া গেল। খারাপ কী! বয়স্করা পড়বেন সন্ধ্যা ৭টা থেকে। এরা মিনমিন করে বললেন, আমরা কিন্তু পড়ব ঘরের ভেতর।
সমস্যাটা বুঝতে পারি। আমি হাসি গোপন করে বললাম, যেখানে আপনাদের ভাল লাগে সেখানে পড়েন, আমার সমস্যা কি।

আজ হয়েছে আরেক কান্ড! মহিলারাও পড়তে চাচ্ছেন। আমি বললাম, বেশ কিন্তু আমি মহিলা শিক্ষক পাব কোথায়?  আপনারা কি এই শিক্ষকের কাছে পড়বেন? এতে তাঁদের কোন আপত্তি নাই।
মাস্টার মশাই অবশ্য বয়স্ক এবং মহিলাদের পড়ার বিষয়ে খানিকটা সন্দিহান। আমি মাস্টার মশাইকে এঁদের অলক্ষ্যে শিখিয়ে দিয়েছি, এঁদের কানের কাছে তোতা পাখির মত জপ করবেন। টিপসই দেয়া বড়ো লজ্জা। যে সই করতে জানে তাকেই শিক্ষিত ধরা হয়, কে এম.এ পাশ কে এস.এস.সি ফেল সেটা পরের কথা।

দেখা যাক...।
(আজ রাত ৯টার আপডেট: সন্ধ্যা ৭টায় সময়টা এঁরা সবাই মিলে পরিবর্তন করেছেন। কারণটা আমি ধরতে পারছি, এটা এখানে শেয়ার করা যাবে না। এঁরা সবাই মিলে সময়টা ঠিক করেছেন দুপুর ১২ টায়) 

*স্বপ্ন: http://tinyurl.com/3y7bpz3 

সহায়ক লিংক: 
১. স্বপ্ন চার, আপডেট: http://www.ali-mahmed.com/2010/06/blog-post_14.html 

স্বপ্ন, চার: আপডেট

পূর্বের পোস্টে আমি লিখেছিলাম, স্বপ্ন চার [১]। এটার কাজ শেষ। আজ সকালে বাচ্চাদের এই স্কুলটা চালু হওয়ার কথা। অথচ আমি থাকতে পারছিলাম না। বাংলাদেশের বিখ্যাত এক রক্তচোষার খপ্পরে [২] আমাকে সকালে-সকাল ভৈরব যেতে হবে বলে নটায় স্কুলের প্রথম দিনে থাকা হবে না!

কপাল, যেখানে আমি যেতে চাই না সেখানেই আমাকে যেতে হয়! এমনিতে কোথাও যেতে আমার ভাল লাগে না। মাঝে মাঝে মনে হয়, আমি তো কোথাও যেতে চাই না [৩]

নটায় স্কুলের কাজ শুরু হওয়ার কথা। আমি মত পরিবর্তন করলাম, ভৈরব পরে যাব। ভাগ্যিস, মত পরিবর্তন করেছিলাম।
আজই প্রথম এখানে এলাম। আক্ষরিক অর্থেই আমি মুগ্ধ। 'মেথর পট্টি' নামের এই জায়গায় যারা বসবাস করেন তাঁদের কাজই হচ্ছে আবর্জনা নিয়ে অথচ এখানকার ঘরবাড়িগুলো ঝকঝকে-তকতকে! 
প্রথমেই আমি পড়ে গেলাম তোপের মুখে। সর্দাররা সর্দারি শুরু করলেন। একজনকে দেখলাম, হাত-পা নেড়ে বলছেন, 'হে যে আমার ঘরে স্কুল বসাইতে কইল, হের ঘর নাই? হের ঘরে জায়গা দিল না ক্যান'?

আমি আয়োজন পন্ড করার সুযোগই দিলাম না। বললাম, আমার ঘরের প্রয়োজন নাই। কেবল উপরে ছাউনি আছে, বৃষ্টি পড়বে না এমন একটা জায়গা ঘন্টাখানেকের জন্য আমাকে দেন। আর পড়বে তো আপনাদের বাচ্চারাই। আমি এনজিও-ফেনজিওর কোন লোক না। আমার অন্য কোন উদ্দেশ্য নাই। আমি কেবল চাইছি আপনাদের বাচ্চাগুলো অক্ষর শিখুক। আমাকে কিছুটা সময় দিন, দেখুন। এরপর আপনাদের পছন্দ না হলে এই স্কুল আমি বন্ধ করে দেব।

উপরে আবরণ দেয়া উঁচু যে চাতাল বাচ্চাদের পড়াবার জন্য আমি বেছে নিলাম তা এতোটাই পরিছন্ন যে আমার ওখানে পা ছড়িয়ে বসতে বিন্দুমাত্র অস্বস্তি লাগেনি!
বিস্ময়ের আরেক ধাক্কা, মাস্টার মশাই কাঁটায়-কাঁটায় নটায় চলে এসেছেন। এমন না আমি আসব বলে, আগেই এটা জানিয়ে দেয়া হয়েছিল আজ আমি থাকব না।

আমি ধারণা করেছিলাম, ৮/১০ জন বাচ্চাও হবে না কিন্তু আমার ধারণা ছাড়িয়ে ১৫জন ছাত্র-ছাত্রী পাওয়া গেল!
আমার পরিচিত দু-একজন আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন মুফতে এদের পড়াবার জন্য কিন্তু আমি গা করি নি। এর পেছনে আমার যুক্তি আছে। আমরা বড়োই আবেগ প্রবণ জাতি। কাউকে এটার দায়িত্ব দিলে প্রচন্ড আবেগে কিছু দিন পড়াবে তারপর আর হয়তো তার ভালো লাগবে না।

আমি খুঁজছিলাম একজন প্রফেশনাল, একজন দক্ষ শিক্ষক, যিনি বাচ্চাদের পড়াবার জন্য ওস্তাদ। এবং যথারীতি জনাব বকুল নামের মানুষটাকে মাস শেষে উপযুক্ত সম্মানী দেয়া হবে। আমার সৌভাগ্য সম্ভবত ঠিক মানুষটিকেই আমি খুঁজে পেয়েছি। 
তো, বাচ্চারা ইতস্তত এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। মাস্টার মশাইকে বললাম, মাস্টার সাব, আপনি ছিপ ফেলার আগে মাছের চারা করেন। আজ কোন পড়া না, চকলেট দেন, বাচ্চাদের সঙ্গে গল্প করেন। দেখবেন, চকলেটের লোভে এরা সুড়সুড় করে চলে আসবে।
হলোও তাই। আমি মনে মনে বলি, বাচ্চারা রসো, এরপর আসছে পড়া। বাছাধনরা, না পড়ে উপায় নাই।
তবে অধিকাংশ বাচ্চাদের পেটভরা কৃমি। একদিন এখানে একজন ডাক্তার নিয়ে আসতে হবে। এবং কোন ডাক্তার মুফতে দেখুক এটাও আমি চাই না। কেন না, এর প্রয়োজন হবে প্রায়ই। 

এমনিতে মাস্টার মশাইকে দেখলাম, বাচ্চাদের পড়াবার জন্য উদগ্রীব হয়ে অছেন। আমি তাঁকে বললাম, আমি এটা চাই না আপনি এদের কেবল গতানুগতিক পড়া পড়ান। এদের সঙ্গে আমার কিছু খেলা আছে। একদিন ১৬টা চকলেট রেখে ১৫জন বাচ্চাদের বলবেন, সবাই একেকটা করে নিয়ে যাও; যখন দেখবেন একটা চকলেটও পড়ে নাই তখন বুঝবেন ঘাপলা আছে। তখন এদের এটা বোঝাবার চেষ্টা করবেন তোমাদের মধ্যে কেউ একজন মন্দ কাজ করেছ। এ অন্যায়।

এরপর আমার বিস্ময়ের শেষ ধাক্কা! পুরুষ-মহিলা, এঁদের সবার মধ্যে আমি যে বিপুল উৎসাহ লক্ষ করেছি এটা আমার আশাতীত! ঘর তেকে, রাস্তা থেতে ধরে ধরে বাচ্চাদের নিয়ে আসছিলেন। অন্তত এতোটা আমি কল্পনা করিনি। একেকজন অভিভাবকের কী উদ্দীপনা!

এঁদের কথাবার্তা খানিকটা প্রলম্বিত, কয়েকজন বুড়া আমাকে চেপে ধরলেন, 'বা-বু, হা-মা-দের পড়ার একটা বে-বু-স্তা করা যায় না'?
আমি মনে মনে হাতে কিল মেরে বলি, চিয়ার্স-চিয়ার্স-চিয়ার্স, তিন চিয়ার্স! আমার স্বপ্নগুচ্ছের মধ্যে এটাও ছিল, বয়স্কদের জন্যও একটা স্কুল করা। মনে মনে ভাবছিলাম, এই স্কুলটা দাঁড়িয়ে গেলে পরবর্তীতে ওটায় হাত দেব। কিন্তু এটা কোথায় শুরু করব ভেবে পাচ্ছিলাম না। দেখো দিকি কান্ড, এ যে না চাইতে জল- আমি কুয়ার কাছে যাব কী, কুয়াই আমার কাছে চলে এসেছে!

আমি আমার উল্লাস গোপন করে গম্ভীর হয়ে বলি, হুম। ভেবে দেখতে পারি কিন্তু আগে বাচ্চাদের স্কুলটা আপনারা ঠিকভাবে চলতে দিন। বাচ্চাদের বই-খাতা কিচ্ছু লাগবে না আপনারা কেবল নটা বাজলেই বাচ্চাদের এখানে পাঠিয়ে দেবেন। এই আপনাদের কাজ।
বুড়ারা ঘন ঘন মাথা নাড়েন, 'আলবাত-আলবাত'।
তাহলে ঠিক আছে আপনাদের পড়ার ব্যবস্থাটাও হবে। বুড়াদের ফোকলা দাঁত বেরিয়ে পড়ে। আমি জানতে চাই, আপনারা কয়জন পড়বেন? এঁরা নিশ্চিত করেন অন্তত ১০ জন। ওয়াল্লা, এ তো অনেক!
আমি ঠিক করেছি, এই জায়গায় সকালে বাচ্চারা পড়বে, রাতে বুড়ারা।

আমি হেঁটে হেঁটে ফিরে আসছি। এঁদের কি আনন্দ হলো, না হলো এ নিয়ে মাথা ঘামাবার সময় কোথায় আমার! আমার নিজের আনন্দ রাখার জায়গা কই- হাঁটছি, নাকি ভাসছি? এই আনন্দের তুলনা কিসের সঙ্গে হয় এটা আমি জানি না, জানলে ভাল হতো। 
কে জানে, মৃত্যুর সময় আমার মস্তিষ্ক সচল থাকলে এই সব সুখ-স্মৃতির কথা মনে পড়ে গেলে মৃত্যু যন্ত্রণা হয়তো বা অনেকখানি লাঘব হবে।

ফিরে আসার সময় দেখি, ৭/৮ বছরের এক শিশু 'নাংগাপাংগা' হয়ে মহা আনন্দে উপর থেকে পড়া পানিতে গোসল করছে। ওর নাচের কাছে সাম্বা নৃত্য কোন ছার!


এই শিশুটির এই অন্য ভুবনের আনন্দের সঙ্গে আমার আনন্দের পার্থক্য কোথায়? অন্তত আমি তো কোন ফারাক খুঁজে পাই না। ফারাক খুঁজতেই আমি চাই না।

*এঁদের সঙ্গে যোগাযোগ ঘটাবার জটিল কাজটা করেছেন জুটন বণিক। তাঁকে আমার কৃতজ্ঞতা।
**স্বপ্ন: http://tinyurl.com/3y7bpz3 

সহায়ক লিংক:
১. স্বপ্ন চার: http://www.ali-mahmed.com/2010/06/blog-post_8254.html 
২. লাশ-বানিজ্য-পদক: http://www.ali-mahmed.com/2010/04/blog-post_23.html 
৩. আমি কোথাও যেতে চাই না: http://www.ali-mahmed.com/2009/07/blog-post.html  

Monday, June 7, 2010

স্বপ্ন: চার


আমরা জাতি হিসাবে বড়ো আবেগময়- উঠল বাই তো তিমি চিবিয়ে খাই! ফেব্রুয়ারি এলে বাংলা বাংলা করে মিডিয়া কাঁদতে কাঁদতে দেশে অকাল বন্যা বইয়ে দেবে। ৩০ মিনিটের স্বপ্নদ্রষ্টা মতিউর রহমান [১] ৩০ হাত লম্বা একটা নৌকা বানিয়ে ফেলবেন। এই দেশ থেকে ব্রিটিশ পগারপার হয়েছে কতো বছর হবে, নাকি এখনও রয়ে গেছে?

ট্রেনে করে কোন কিছু রেলে পাঠাতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ে এখনো যে রসিদটা দেবে তাতে হাবিজাবি অনেক কিছুর সঙ্গে লেখা, "...কোন সরকারী অফিসারের (ব্রিটিশ বা বিদেশী উর্দি নহে কিংবা উর্দির অংশ বিশেষ নহে...)"
এখনও বাংলাদেশের অধিকাংশ আইন ইংরাজিতে। ফটাফট ইংরাজি বলতে না পারলে ওই মানুষটা এবং কলাগাছের মধ্যে কোন পার্থক্য নাই। মুখে মুখে বাংলা ভাষার জন্য আমাদের কী মায়া!

বিশ্বকাপের জ্বরে কাঁপছে দেশটা। এই কাঁপাকাঁপি নিয়ে আমার দ্বিমত নাই। অনেকে বিভিন্ন দেশের পতাকা লাগাচ্ছেন, এটার যথার্থতা নিয়ে তর্ক করার ইচ্ছা আমার নাই। কেন আমাদের স্বাধীনতার উৎসবে আমরা বাঁশ খুঁজে পাই না লম্বার ঝাড়ুর উল্টা পিঠে আমাদের পতাকা লাগাই এই নিয়ে কুতর্কেও আমি যাব না। আমাদের বাঁচার জন্য কোন-না-কোন একটা উপলক্ষ থাকার প্রয়োজন আছে। প্রয়োজন আছে খেলার আবেগেরও। এই নিয়ে আমার অমত নাই।

কেবল যেটা বলতে চাই, কমছে আমাদের মার শাড়ির বহর, বাড়ছে অন্য দেশের পতাকার নহর! যে মানুষটা তার মার ১২ হাতের শাড়ির বদলে ১০ হাত শাড়ি কেনে সে বানাচ্ছে ২২ হাতের পতাকা। গোটা দেশে এ এক অসভ্য প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে। কে কার চেয়ে লম্বা পতাকা লাগাতে পারে। লেখার শুরুতে যা বলেছিলাম...।

অন্য দেশের পতাকা নিয়ে আমাদের মাতামাতির শেষ নাই, নিজের দেশে ফুটবল খেলার মাঠের কোন খোঁজ নাই, ফুটবল ম্যাচের পাত্তা নাই! কয়েকজনকে আমি বললাম, আমি টাকার ব্যবস্থা দেখি, তোমরা কি পারবে একটা ফুটবর ম্যাচের আয়োজন করতে? সবাই আমাকে নিরাশ করলেন। তাদের বক্তব্য, আরে না, মারপিট হবে। 
শোনো কথা!

হরিজন পল্লী, যার চালু নাম 'মেথর পট্টি'। এখানে পতাকার নমুনা দেখে থমকে দাঁড়াই। আমি যখন ছবি উঠাচ্ছি তখন এখানকার একজন আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনে কি সাম্বাদিক?
আমি বললাম, না।
তাইলে ছবি উঠাইতেছেন ক্যান?
আমি মনে মনে বলি, ভাল মুসিবত দেখি। জার্মান এম্বেসিতেও আমি সাংবাদিক কিনা এর ব্যাখ্যা দিতে হয়, লোকজনকেও। ভাবছি, কামনা বা বাসনা নামের কোন একটা রগরগে সাপ্তাহিকে জয়েন করে ফেলব কিনা?
মুখে বললাম, এমনিই তুললাম। আপনেরা পতাকা লাগাইছেন, সোন্দর দেখা যাইতাছে।

মানুষটা এইবার খুশী হয়। আমি এর সঙ্গে টুকটাক কথা বলি কারণ এখানে আসার আমার অন্য একটা উদ্দেশ্যও আছে। জানতে চাই, এখানকার ছোট-ছোট বাচ্চারা ইস্কুলে যায় কিনা?
যায় না জানার পর আমি বললাম, আচ্ছা, যদি একজন মাস্টার এসে বিনা পয়সায় আপনাদের বাচ্চাদের পড়িয়ে যায় তাহলে আপনারা কি আপনাদের এখানেই একটা ঘর ঘন্টাখানেকের জন্য দিতে পারবেন?
তিনি বলেন, এইটা সর্দারের পুলা ভালো বলতে পারব। তাইনে আপনের মতোই শিকখিত।

আমি মনে মনে বলি, বাপ, শিক্ষিত হলে বাচ্চাগুলোকে স্কুলে পাঠায় না কেন! নাকি শিক্ষাবিদ আনিসুজ্জামানের [২] মত হঠাৎ মনে পড়বে, ওরে, তোরা কে কোথায় আছিস বই-খাতা নিয়া আয়? 
কোন নিশ্চয়তা পাওয়া গেল না কারণ এই সিদ্ধান্ত সর্দারের 'শিকখিত' ছেলে ব্যতীত সম্ভব না। বেলা বাজে একটা। তিনি এখনও ঘুমাচ্ছেন, কখন জাগবেন বলা যাচ্ছে না। পরে আবার যেতে হবে।

এটাও আমার ছোট্ট স্বপ্নের একটা অংশ। আমার ইচ্ছা আছে, এখানে ছোট-ছোট বাচ্চাদের পড়াবার জন্য একজন টিচার ফি-রোজ পড়িয়ে যাবেন। এই বাচ্চাগুলোকে পড়তে বসাবার জন্য কিছু চালবাজি করতে হবে। পড়া শেষ হলে চকলেট পাবে এই ফাঁদে ফেলতে হবে। দেখা যাক।

*স্বপ্ন: http://tinyurl.com/3y7bpz3

সহায়ক লিংক:
১. শপথবাজ মতিউর রহমান: http://www.ali-mahmed.com/2010/02/blog-post_19.html
২. শিক্ষাবিদ আনিসুজ্জামান: http://www.ali-mahmed.com/2010/01/blog-post_03.html