কল্লোলের চোখ ঘুমে বন্ধ হয়ে আসছে।
ওপাশ থেকে জামির উৎফুল্ল গলা, ‘আচ্ছা শোন, যে জন্য ইনফ্যাক্ট ফোন করেছি। মহা সমস্যায় পড়েছি। রুমে দাঁত মাজছি। বুঝলি! রাত তখন পৌনে-।’
‘আ, জিলাপী বানাচ্ছিস কেন!’
‘কী মুশকিল, বলতে দিবি তো! বেসিনে বেশ কটা পিঁপড়া ডিনার সেরে হাঁটাহাঁটি করছে, পায়চারী-টায়চারী গোছের কিছু একটা আর কী! শালার পিঁপড়ারা সম্ভবত রবার্ট ফ্রস্টের কবিতা-টবিতা পড়ে...ওয়াকস আ ন্যানো মাইল বিফোর আ স্লীপ।
‘আচ্ছা-আচ্ছা, বুঝলাম, রবার্ট ফ্রস্ট এদের কবিতা পড়ার জন্য পাঠিয়েছে। হুঁ, তারপর,’ ঘুমে কল্লোলের চোখ ভারী হয়ে আসছে। নিঃশব্দে হাই তুলল। পাগলটা কতক্ষণ জ্বালাবে কে জানে! অসাধারণ লোকগুলো আধপাগলা হয় কেন কে জানে!
জামি মহা উৎসাহে আবারও শুরু করল, ‘তুই ব্যাটা দেখি থ্রি স্টুজেসকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছিস। তো, পিঁপড়াদের সরাতে বেশ ক’বার চেষ্টা করেছি। এরা গা করছে না। এদের কাছে আমি কি, বল কি, দৈত্য না? কান্ড দেখ, আমার মত দৈত্যকে মোটেই পাত্তা দিচ্ছে না। শালা সব আহাম্মক তো, শরীরের চেয়ে চল্লিশ গুণ বেশি ওজন অনায়াসে হাসতে হাসতে টেনে নিয়ে যায়। কুলি করতে পারছি না, পেস্ট শুকিয়ে চটচট করছে। কী অবস্থা, বল দেখি।’
‘বিরাট সমস্যা,’ ঘুমে কল্লোলের দু'চোখ বন্ধ হয়ে এসেছে, হাত থেকে রিসিভার গড়িয়ে পড়তে চাইছে। চোখের পাতা জোর করে সিকিভাগ খুলে বলল, ‘এক কাজ কর, টানাটানি করে বেসিনটা খুলে ফেল। সমস্যা হলে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে গুড়িয়ে দে। এইবার বেসিনের পাইপে মুখ লাগিয়ে কুলি কর, আরাম পাবি।’
এই প্রথম জামি খানিকটা রেগে গেল, ‘আমি সিরিয়াস, আর তুই কী না ফাজলামো করছিস!’
‘আচ্ছা, তুই সিরিয়াস তাহলে, আই সী! এক কাজ কর, পানি ঢেলে দে।’
‘কী বলছিস, সব ভেসে যাবে যে।’
‘ভেসে গেলে ভেসে যাবে, পিঁপড়াই তো! পিঁপড়া খাওয়ার চল এদেশে এখনও চালু হয়নি। চল থাকলে, কোটি কোটি পিঁপড়া ভাজি করে খেয়ে ফেলতি, মচ্ছব হয়ে যেত। অথবা ধর, ভাতের বদলে পিঁপড়া সেদ্ধ করে খাওয়া শুরু হল। নাম হল, 'পিঁপড়া ভাত'।’
‘এই, এই সব কী বলছিস,’ জামির আহত গলা।
‘জেনেশুনেই বলছি। মিঞা রসিক লাল, রস করার আর জায়গা পাও না! কুলি করার জায়গা পাচ্ছ না, হুপ। দুর্গের মত বাড়িতে আর বেসিন-টয়লেট নেই, নিদেনপক্ষে একটা ডিব্বাও নেই!’
জামি কিছুক্ষণ চুপ থেকে ক্ষীণ গলায় বলল, ‘আমার রুমে এ্যাটাচ বাথ নাই। এটা তুই জানিস, জানিস না? সরি, তোকে ডিস্টার্ব করলাম। বাই।’
কল্লোল কথা বলতে গিয়ে থেমে গেল, ওপাশ থেকে যোগযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ও কী রাগ করল? আধ ঘন্টা ধরে চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দিল! ওপাশ থেকে কেউ টেলিফোন উঠাল না! সম্ভবত টেলিফোনের প্লাগ খুলে ফেলেছে। এই আধ ঘন্টায় কল্লোল জামির তিন চৌদ্দ বেয়াল্লিশ গুষ্টি উদ্ধার করল।
কল্লোল নিজের রুমে ঢুকে অস্বস্তিতে পড়ে গেল। কাছাকাছি কোথাও ওয়াজ হচ্ছে। নিশুতি এ রাতে কিসের ওয়াজ! ফুল ভল্যুমে মাইক। ওর প্রচন্ড ইচ্ছা করছে, উঠে দেখে আসে, এই মধ্য রাতে ক’জনের ধর্ম উদ্ধার হচ্ছে। সংখ্যা গরিষ্ট এই ধর্মের লোকজনের কথা উপেক্ষা করলেও অন্য ধর্মের লোকজনকে যন্ত্রণা দেয়া কেন?
পূর্বে ওরা যে বাসায় থাকত, পাশেই মসজিদ ছিল। মসজিদের ছাদের সমস্ত পানি ফেলার ব্যবস্থা করা হয়েছিল রাস্তার উপর, মসজিদের অন্য পাশগুলো ফাঁকা। বর্ষাকালে রাস্তায় পানি পড়ে প্যাচপ্যাচে কাদা হয়ে যেত। লোকজন ভিজে জবজবা। বৃষ্টি থামার অনেকক্ষণ পরও চুঁইয়ে চুঁইয়ে পানি পড়ত।
ওই মসজিদের চারপাশে জানালা ছিল। অধিকাংশ সময় রাস্তার দিকে জানালাগুলো খোলা থাকত। মুসুল্লী সাহেবানগণ প্রচুর সময় নিয়ে গলা পরিস্কার করে, কফসহ থুথু সজোরে রাস্তার উপর ফেলতেন। একবার কল্লোলের উপর থুথু পড়ল। সর্তক হয়ে থুথু ফেলার জন্য ও কেন বলল, এ নিয়ে মুসল্লীরা বাজার জমিয়ে ফেললেন। প্রায় সবারই বক্তব্য অভিন্ন। মসজিদ থাকলে জানালা থাকবে, জানালা থাকলে থুথু ফেলা হবেই, থুথু ফেললে কারও না কারও গায়ে পড়বে, এ তো বিচিত্র কিছু না।
পরে একসময় এ মসজিদের ইমাম সাহেবকে ব্যাপারটা জানাল। ইমাম সাহেব অমায়িক ভঙ্গিতে জানালেন, নামাজীদের মত থুথুও পবিত্র। এইসব নিয়ে হইচই করায় খানিকটা ভৎর্সনাও করলেন। কল্লোল কেবল নির্বোধ চোখে তাকিয়ে ছিল, একটা কথও না-বলে ওখান থেকে সরে এসেছিল।
আগুনে সিগারেটের ছ্যাকা লাগতেই তাড়াহুড়ো করে এ্যাসট্রেতে সিগারেট ফেলল। উঠে জানালা বন্ধ করেও খুব একটা লাভ হল না। এ ঘরের ফ্যানটা নস্ট, গরমে সেদ্ধ হতে হবে। ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে জামির কথা ভাবল, ছেলেটা হুটহাট করে এমন সব পাগলামী করে। বেশ ক’বছর আগের কথা। বই মেলায় এক লেখিকাকে দেখে ফট করে বলে বসল: ম্যাডাম, আপনার কি জ্যাক দ্য রিপার-এর সঙ্গে পরিচয় আছে?
ঐ ভদ্রমহিলা সম্ভবত কোন বান্ধবী-টান্ধবীর সঙ্গে গল্প করছিলেন। থতমত খেয়ে গেলেন: কি বলছেন, কে আপনি?
ম্যাম, আমি কে এটা তো আপনার জেনে কাজ নেই। আপনার গদ্য লেখার হাত পছন্দ করি, অবশ্য সব লেখা না। ওদিন লিখলেন, আপনার প্রতিভা বুঝতে পারে এমন কোন পুরুষ এ শহরে নেই। আপনার যোগ্য কোন পুরুষ নেই। ঘুরিয়ে বললে, কোন পুরুষ আপনার নখের যোগ্য না, এইসব আজেবাজে কথা। এই জন্যই জানতে চাইছিলাম, জ্যাক দ্য রিপারের সঙ্গে আপনার পরিচয় আছে কি না, ওই ভদ্রলোক পরম যত্নে নেইল কাটার দিয়ে আপনার পায়ের নখগুলো কেটে দিত।
লেখিকার ডাগর চোখে আগুন, শাটআপ, ইয়্যু রাস্কেল!
ইজি ম্যাম। লেখেন তো শুধু এইসব অথচ তুচ্ছ, অমানুষ পুরুষদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ মাখামাখি করতে বিন্দুমাত্র সঙ্কোচবোধ করেন না। কী অসাধারণ একটা উপায়ই না বের করেছেন। অসংখ্য মূর্খ লোকজন, সরকার আপনাকে নিয়ে লাফাতে থাকবে, অজান্তেই অসম্ভব নাম করে ফেলবেন। নোবেল-টোবেল পেয়ে যাওয়া বিচিত্র কিছু না।
কল্লোল জামিকে জোর করে সরিয়ে নিয়ে এসেছিল। জামি অসহ্য রাগে ওকে খামচে দিয়েছিল। চোখ লাল করে বলেছিল: আহাম্মক, আগ বাড়িয়ে দিলি তো পন্ড করে।
কল্লোলও সমান তেজে বলেছিল: এনাফ, যথেষ্ট পাগলামী হয়েছে।
হোয়াইট ডু য়্যু মীন বাই পাগলামী, জামি দুর্দান্ত রাগে কাঁপছিল বলেই ওর কথা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল। সমানে চেঁচাচ্ছিল, নারী মুক্তি, নারী স্বাধীনতা এইসব নিয়ে এত হল্লা করার কী প্রয়োজন। নারীরা আজ পাইলট হচ্ছে, মহাশূন্যে যাচ্ছে, বডি বিল্ডিং করছে। কাজের ক্ষেত্রে পুরুষদের চেয়ে ওদের একাগ্রতা বেশি, অনেক ক্ষেত্রে আই কিউও বেশি। নারী পুরুষে পার্থক্যটা কী? নারীদের গর্ভধারন করতে হয়, মাসের বিশেষ কিছু দিনে অনেকে কাবু হয়ে পড়ে, এই-ই তো! এটা তো কাঠামোগত পার্থক্য। একজন প্রাচীন লোকের শরীলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে, যুবকের বেশি, সো। লড়াই করা উচিত মানুষের স্বাধীনতা নিয়ে। নারী স্বাধীনতা কি আবার , বা...।
কল্লোল ভারী বিব্রত হচ্ছিল। কী লজ্জা, চারপাশে লোকজন জমে গিয়েছিল। আসলে জামি রেখে ঢেকে কথা বলতে জানে না। ভান জিনিসটা ওর মধ্যে একেবারেই নেই। ওদের এক বন্ধু সুবির, মহা গল্পবাজ। দুনিয়ার যতসব গায়ে জ্বালা ধরানো কথা কল্লোলরা সহ্য করে যেত। কিন্তু জামি থাকলেই সেরেছে, মহা ভজঘট। একদিন সুবির চোখ মুখ আলো করে বলছিল: জানিস, আমার মামার না ডেইলি দশ হাজার টাকার ফ্রুটস লাগে।
জামি তক্কে তক্কে ছিল, কথাটা মাটিতে পড়তে দিল না। দু’কান লম্বা হাসি নিয়ে বলল: তোর কোন মামা?
আরে ওই যে, চিনিস না, গোল্ড মার্চেন্ট।
ওয়াও, ওদের টয়লেট কটা রে, জামির নিরীহ মুখ।
সুবির চোখ ছোট করে বলল: ওদের টয়লেট কটা এ খবর জানতে চাচ্ছিস কেন!
জামি গৃহপালিত জন্তুর মত মুখ করে বলল: না মানে জানতে চাচ্ছিলাম এজন্যে, ডেইলি দশ হাজার টাকার ফ্রুটস, আঙ্গুরই পাওয়া যাবে আনুমানিক দেড় মণ। তা, দু-চারটা টয়লেটে তো কুলাবে না।
জামি, খবরদার, খবরদার বলছি, সুবির রাগে দিশেহারা।
আরে যা-যা, মামদোবাজি আর কী। শালা চাপাবাজ, আমরা ডুডু খাই না।
কল্লোলের চোখের পাতা ভারী হয়ে গেল। জামির কথা, ওয়াজের কথা সব মিলিয়ে গেল।
সহায়ক লিংক:
*ফিরে দেখা, ১: http://www.ali-mahmed.com/2010/11/blog-post_24.html
Showing posts with label তিতলি তুমিও. Show all posts
Showing posts with label তিতলি তুমিও. Show all posts
Friday, November 26, 2010
ফিরে দেখা: ২
বিভাগ
তিতলি তুমিও
Wednesday, November 24, 2010
ফিরে দেখা: ১
জামির মেজাজ ফরটি নাইনের জায়গায় নাইনটি ফোর হয়ে আছে। রাত বাজে একটা দশ। চার পেগ হুইস্কি গিলে ফুরফুরে ভাব নিয়ে দাঁত ব্রাশ করে কুলি করতে বেসিনে যখন দাঁড়াল, ঘড়ির কাঁটা তখন বারটা চল্লিশ, ছুঁইছুঁই। এখনও জামি ঘোড়ার মত দাঁড়িয়ে আছে। বেসিনে বেশ ক’টা কালো পিপড়া। কুলি করতে পারছে না, পানি ঢেলে দিলেই সব ভেসে যাবে।
কে যেন বলতেন এটা, দাদি? যে কাল পিঁপড়া মুসলমান। তাহলে লাল পিঁপড়া কী হিন্দু! এ মুহূর্তে হিন্দু-মুসলমান নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে না। বেসিনে বেশ ক’বার টুথব্রাস দিয়ে ঠুকঠুক করল, বিশেষ কোন হেরফের হল না। শালার পিঁপড়া করছে কী, পায়চারি-টায়চারি করছে নাকি! আগুন চোখে তাকিয়ে রইল, ভস্ম করে দিলে বেশ হত। সমস্যা হচ্ছে, এই ক্ষমতা কেবল সাধু-টাধুদের দেয়া হত। কী যন্ত্রণা, ওর এই রুমটা আবার অ্যাটাচ বাথ না। এটাও সম্ভবত মন্তাজ মিয়ার কোন চাল। এই লোকটার কি ধারণা অ্যাটাচ বাথ হলে ওই কাজটা বেশি বেশি করা হবে। পুরনো ধাঁচের এ বাড়িটা কী বুদ্ধিতে কিনেছে কে জানে!
জামি পিঁপড়া এড়িয়ে মুখ ভরে পেস্ট ফেলল। পেস্ট শুকিয়ে মুখ কেমন চটচট করছে। বিরস মুখে সিগারেট ধরাল। কেমন ঝাল ঝাল লাগছে। তিতলি যে মোর সিগারেট খায় অনেকটা ওরকম। মেয়েটা কেমন যেন বদলে গেছে। খুবই সূক্ষ্ণ পরিবর্তন কিন্তু ওর চোখকে ফাঁকি দিতে পারেনি! এই তো সেদিন পর্যন্ত, সারাটা দিন, নিশুত রাত অবধি টো টো করে ঘুরত। ঢাকা শহর ভাজাভাজা করে ফেলছিল। ওদিন তো জামির মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ার দশা, তিতলিকে পড়ার বই ঘাঁটতে দেখে। জামি কপালে ভাঁজ ফেলে বলতে বাধ্য হয়েছিল: কি তিতলি, ওরফে প্রজাপতি, কাম ফ্রম শুঁয়োপোকা, বিষয় কি!
ভাইয়া, ভাবছি অনার্সটা দিয়ে দেব।
হাহ, আপনার সংখ্যা বয়ফ্রেন্ডদের কী গতিটা হবে তাহলে!
তিতলি মাথা নিচু করে দাঁত দিয়ে নখের কোন খুঁটতে লাগল। জামির আর কিছু বলতে ইচ্ছে করেনি। নিঃশব্দে ওখান থেকে সরে এসেছিল। জামি উঠে এসে বেসিনে উঁকি দিল। মাথা ঝাঁকিয়ে বিড়বিড় করে বলল, হারামজাদা পিঁপড়া, ব্লাডি সফটিজ, লাইফ ইজ গোয়িং টু বি হেল।
পিঁপড়ার সংখ্যা আরও বেড়েছে। হারামজাদারা বাচ্চাকাচ্চা-কাচ্চাবাচ্চা সব নিয়ে এসেছে। জামি দাঁতে দাঁত ঘষল, ভাই পিঁপড়া সকল, বিষয় কী, ঘুম নাই! যান ভাইসব, ঘুমান গিয়া। সকাল সকাল উঠিয়া বলিবেন, সকালে উঠিয়া আমি পিঁপড়া মনে মনে বলি...।
মহা মুসিবত। কি করা যায়, আচ্ছা, টেলিফোন করে কল্লোল ব্যাটার ঘুম ভাঙ্গিয়ে দিলে কেমন হয়। ওদের কি ফোন আছে এখনও, না কেটে দিয়েছে? অনেকক্ষণ রিং হওয়ার পর ওপাশ থেকে ঘুম জড়ানো হেঁড়ে গলা ভেসে এলো, ‘কে-কে?’
‘কে কথা বলছেন, প্লিজ?’
‘আপনি কাকে চান?’
‘এটা কি ২৪০৪১...?’
ওপাশ থেকে টেলিফোনের রিসিভার সম্ভবত সশব্দে নামিয়ে রাখা হল। শালার রঙ নাম্বার। জামি আবার চেষ্টা করল। ওপাশ থেকে যে কান ফাটানো শব্দ ভেসে এলো, তা জোড়া দিলে হবে, ‘কে-এ-এ-এ?’
জামি কানের পাশ থেকে রিসিভার ইঞ্চি তিনেক সরিয়ে বলল, ‘এটা কি ২৪০-?’
‘হারামজাদা, এত রাতে ফাজলামি করার জায়গা পাস না। কুত্তার ছাও! ফোন তোর হো...।’
জামি স্তম্ভিত, এ কী কথা! চট করে সামলে নিয়ে যথাসম্ভব মোলায়েম গলায় বলল, ‘ভাইয়া প্লিজ, আমার কথা শুনুন। ভাইয়া কসম, আমি তো আর আপনার নাম্বার জানি না। অন্য নাম্বারে করছি, আপনার নাম্বারে চলে যাচ্ছে। এতে আমার কি দোষ বলুন ভাইয়া, আপনি অযথা রাগ করছেন। বড় ভাই, এক্সকিউজ করে দেন।’
ভদ্রলোক সম্ভবত খানিক লজ্জিত হলেন। প্রায় শোনা যায় না এরকম গলায় বললেন, ‘আপনার নাম্বার কত?’
জামি এবার অসম্ভব অমায়িক স্বরে বলল, ‘বড় ভাইয়া, আমার উপর রাগ নাই তো?’
‘আরে না, কী যে বলেন, হে হে হে!’
‘ভাই অনুমতি দিলে একটা কথা বলি?’
‘জ্বী-জ্বী, বলেন।’
জামি শান্ত গলায় বলল, ‘য়্যু ব্লাডি ফাকিন গাই, য়্যু ব্লাডি শিট অভ আ মিউল, নাউ বাজ অফ...।’
ওপাশে কবরের নিস্তব্ধতা।
‘ভাইজান রাখি?’
লাইন কেটে গেল। ও চোয়াল শক্ত করে আবারও চেষ্টা করল। রিং যাচ্ছে কেউ উঠাচ্ছে না। রেখে দেবে ভাবছে, মেয়েলি চিকন গলা ভেসে এলো, ‘হ্যালো, কে বলছেন?’
‘আপনি কে বলছেন, প্লিজ?’
‘আমি মৌ।’
‘জিস, রাত বাজে দেড়টা, তুমি টেলিফোন ধরেছ! সরি মৌ, তোমার কাঁচা ঘুম ভাঙ্গিয়ে দিলাম।’
‘জামি ভাই! না-না, আমি তো পানি খেতে উঠেছিলাম।’
‘কী অবস্থা, তোমার গলা একদম বুঝতে পারিনি!’
‘ঘুম থেকে উঠেছি তো, তাই।’
‘ইয়ে মৌ, কল্লোল কি জেগে আছে?’
‘জামি ভাই, কী যে বলেন আপনি, এতরাতে জেগে থাকবে ভাইয়া! ও হল কুম্ভকর্ন, ঘুমের রাজা। আমি না রাতে ভাইয়ার খাটের পাশে একজগ পানি রেখে দেই। সকালে ওর মাথায় ঢেলে দেই। জামি ভাই, তখন যদি ভাইয়াকে দেখতেন। হি হি হি।’
‘তোমাদের টেলিফোন লাইন চালু আছে। গুড-গুড।’
‘টেলিফোনের কথা কেন বললেন, জামি ভাই।’
‘এমনি-এমনি। অ্যাঁ মৌ, তোমাকে টেলিফোন চালু আছে কিনা এটা জিজ্ঞেস করেছি, এটা কিন্তু তোমার ভাইয়াকে বলো না, ঠিক আছে?’
‘কেন, জামি ভাই?’
‘এমনি-এমনি, কোন কারণ নেই। তোমার ভাইয়ার সঙ্গে একটা বাজি ধরেছি, এই আর কী। তুমি কিন্তু বলো না, এ্যাঁ। কাল তোমার স্কুল আছে না, শুয়ে পড়ো। ইয়ে, কল্লোলকে একটু ডেকে দাও, বলবে আমি ফোন করেছি। খুব জরুরি দরকার।’
দীর্ঘ সময় পর কল্লোলের রাগী গলা ভেসে এলো, ‘আপনার কি সব গ্রে মেটারই আউট হয়ে গেছে। গেছে না, ঠিক ধরেছি। এবার টেলিফোনটা শক্ত করে ধরে নিজের মাথায় বাড়ি দেন।’
‘খুব মৌজে আছি রে, ফুরফুরে ভাব। খানিকটা অলিপান, আ মীন মদ্যপান করেছি। বেশি না, চার পেগ। হা হা হা। ভাবলাম তোর সঙ্গে শেয়ার করা যাক।’
‘তুই আবার কি ছাতাফাতা শেয়ার করবি!’
‘আরে শুনলে তুই পাগল হয়ে যাবি।’
কল্লোল রাগ চেপে বলল, ‘আজ পর্যন্ত কোন পাগল কাউকে পাগল বানাতে পেরেছে বলে অন্তত আমার জানা নাই। তা টেলিফোন করেছিস কেন?’
‘দেখলাম তুই জেগে আছিস কিনা। তুই ঘুমুচ্ছিলি নাকি? আচ্ছা যা, শুয়ে পড়।’
‘ঘুম ভাঙ্গিয়ে এখন এটা বলছিস, তুই দেখি বিরাট ফাজিল! আর আমি কি তোর মত নিশাচর ড্রাকুলা রে, যে এই মধ্যরাতে জেগে থাকব!’
‘শোন, কাল তোকে জরুরী একটা কথা বলতে ভুলে গেছি-’ এটুকু বলে জামি হাসি একান ওকান করে চুপ মেরে গেল।
‘জরুরি কথাটা কি, অবশ্য আমার ধারণা জরুরী কথাটার অর্থ আপনার জানা নেই।’
‘তোর লাল চশমাটা দেখে ভাবছিলাম এই জঘন্য জিনিস কোত্থেকে জোগাড় করলি। জিজ্ঞেস করতে পরে আর মনে ছিল না। তা, কোম্পানী কি এই একটাই মাল বাজারে ছেড়েছে, বাপ!’
‘জামি, তোর মাথাটা জোরে ঝাঁকা তো, ঝাঁকিয়েছিস? শব্দ হচ্ছে না, হচ্ছে? ঠিক ধরেছিস, কয়েকটা নাট-বল্টু ছুটে গেছে। কাল ওগুলো টাইট দিয়ে ফোন করিস।’
জামি গলা ফাটিয়ে গা দুলিয়ে হাসতে লাগল। কল্লোলের কানের পর্দা, সম্ভবত টেলিফোনের তারও কাঁপিয়ে। কল্লোল চট করে রিসিভারের কাছ থেকে কান সরিয়ে নিল। বদমাশটা দিয়েছিল কানের বারোটা বাজিয়ে। হিসহিস করে বলল, ‘জামি, এমন জঘন্য করে হাসতে আজ অবধি কাউকে দেখিনি।’
‘বাঁচা গেল-আজ তো দেখলি। অ, দেখবি কি করে, টেলিফোনে তো সে উপায় নেই! ইয়ে, বিশ্বকাপের খেলা দেখছিস না?’
‘না।’
‘আশ্চর্য, তুই একটা মানুষ!’
‘ব্যাটা গর্দভ, বিশ্বকাপের খেলা কী দেয়ালে দেখায়, টিভি থাকলে না দেখব!’
‘বলিস কী, তোদের টিভি কি হয়েছে?’
‘অ্যাকুরিয়াম বানিয়ে ফেলেছি। রং বেরং-এর মাছ ছেড়েছি।’
‘অ,’ জামি একটা জোর ধাক্কা খেল। টিভি বিক্রি করে ফেলেছে! এদের তাহলে চরম দুঃসময় যাচ্ছে। গলার ভাব গোপন করে বলল, ‘সৌদি আরব-হল্যান্ডের খেলা দেখছিলাম, বুঝলি। ক্যামেল টু ক্যাডিলাক ভাইজানরা কেমন খেলে এটাই ছিল কৌতুহল। খেলা আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল। তুই তো জানিস, খেলা-টেলায় আমার তেমন আগ্রহ নাই। আমি খেলা দেখা শুরু করলাম এখান থেকে, সৌদি এক, হল্যান্ড শূণ্য। আমার মনে হচ্ছিল সৌদি ভাইজানরা এক গোল খেয়ে ফেলছে। কিছুক্ষণ পর ভুল ভাঙ্গল, হল্যান্ড এক গোলে পিছিয়ে আছে। চিন্তা কর, কী বোকা আমি, ব্রেন হয়ে গেছে হালুয়া। হা হা হা।’
‘এই সত্যটা জানতে তোর এতটা সময় লাগল! তোর খুলির ভেতর বাতাস হুহু করে বয়, এটা সবাই জানে; কল্লোল রাগে গরগর করে উঠল। পাগলটার কতক্ষণে পাগলামি থামবে কে জানে! কল্লোলের চোখ ঘুমে জড়িয়ে আসছে।
সহায়ক লিংক:
* তিতলি তুমিও: http://tinyurl.com/3y93om8
কে যেন বলতেন এটা, দাদি? যে কাল পিঁপড়া মুসলমান। তাহলে লাল পিঁপড়া কী হিন্দু! এ মুহূর্তে হিন্দু-মুসলমান নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে না। বেসিনে বেশ ক’বার টুথব্রাস দিয়ে ঠুকঠুক করল, বিশেষ কোন হেরফের হল না। শালার পিঁপড়া করছে কী, পায়চারি-টায়চারি করছে নাকি! আগুন চোখে তাকিয়ে রইল, ভস্ম করে দিলে বেশ হত। সমস্যা হচ্ছে, এই ক্ষমতা কেবল সাধু-টাধুদের দেয়া হত। কী যন্ত্রণা, ওর এই রুমটা আবার অ্যাটাচ বাথ না। এটাও সম্ভবত মন্তাজ মিয়ার কোন চাল। এই লোকটার কি ধারণা অ্যাটাচ বাথ হলে ওই কাজটা বেশি বেশি করা হবে। পুরনো ধাঁচের এ বাড়িটা কী বুদ্ধিতে কিনেছে কে জানে!
জামি পিঁপড়া এড়িয়ে মুখ ভরে পেস্ট ফেলল। পেস্ট শুকিয়ে মুখ কেমন চটচট করছে। বিরস মুখে সিগারেট ধরাল। কেমন ঝাল ঝাল লাগছে। তিতলি যে মোর সিগারেট খায় অনেকটা ওরকম। মেয়েটা কেমন যেন বদলে গেছে। খুবই সূক্ষ্ণ পরিবর্তন কিন্তু ওর চোখকে ফাঁকি দিতে পারেনি! এই তো সেদিন পর্যন্ত, সারাটা দিন, নিশুত রাত অবধি টো টো করে ঘুরত। ঢাকা শহর ভাজাভাজা করে ফেলছিল। ওদিন তো জামির মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ার দশা, তিতলিকে পড়ার বই ঘাঁটতে দেখে। জামি কপালে ভাঁজ ফেলে বলতে বাধ্য হয়েছিল: কি তিতলি, ওরফে প্রজাপতি, কাম ফ্রম শুঁয়োপোকা, বিষয় কি!
ভাইয়া, ভাবছি অনার্সটা দিয়ে দেব।
হাহ, আপনার সংখ্যা বয়ফ্রেন্ডদের কী গতিটা হবে তাহলে!
তিতলি মাথা নিচু করে দাঁত দিয়ে নখের কোন খুঁটতে লাগল। জামির আর কিছু বলতে ইচ্ছে করেনি। নিঃশব্দে ওখান থেকে সরে এসেছিল। জামি উঠে এসে বেসিনে উঁকি দিল। মাথা ঝাঁকিয়ে বিড়বিড় করে বলল, হারামজাদা পিঁপড়া, ব্লাডি সফটিজ, লাইফ ইজ গোয়িং টু বি হেল।
পিঁপড়ার সংখ্যা আরও বেড়েছে। হারামজাদারা বাচ্চাকাচ্চা-কাচ্চাবাচ্চা সব নিয়ে এসেছে। জামি দাঁতে দাঁত ঘষল, ভাই পিঁপড়া সকল, বিষয় কী, ঘুম নাই! যান ভাইসব, ঘুমান গিয়া। সকাল সকাল উঠিয়া বলিবেন, সকালে উঠিয়া আমি পিঁপড়া মনে মনে বলি...।
মহা মুসিবত। কি করা যায়, আচ্ছা, টেলিফোন করে কল্লোল ব্যাটার ঘুম ভাঙ্গিয়ে দিলে কেমন হয়। ওদের কি ফোন আছে এখনও, না কেটে দিয়েছে? অনেকক্ষণ রিং হওয়ার পর ওপাশ থেকে ঘুম জড়ানো হেঁড়ে গলা ভেসে এলো, ‘কে-কে?’
‘কে কথা বলছেন, প্লিজ?’
‘আপনি কাকে চান?’
‘এটা কি ২৪০৪১...?’
ওপাশ থেকে টেলিফোনের রিসিভার সম্ভবত সশব্দে নামিয়ে রাখা হল। শালার রঙ নাম্বার। জামি আবার চেষ্টা করল। ওপাশ থেকে যে কান ফাটানো শব্দ ভেসে এলো, তা জোড়া দিলে হবে, ‘কে-এ-এ-এ?’
জামি কানের পাশ থেকে রিসিভার ইঞ্চি তিনেক সরিয়ে বলল, ‘এটা কি ২৪০-?’
‘হারামজাদা, এত রাতে ফাজলামি করার জায়গা পাস না। কুত্তার ছাও! ফোন তোর হো...।’
জামি স্তম্ভিত, এ কী কথা! চট করে সামলে নিয়ে যথাসম্ভব মোলায়েম গলায় বলল, ‘ভাইয়া প্লিজ, আমার কথা শুনুন। ভাইয়া কসম, আমি তো আর আপনার নাম্বার জানি না। অন্য নাম্বারে করছি, আপনার নাম্বারে চলে যাচ্ছে। এতে আমার কি দোষ বলুন ভাইয়া, আপনি অযথা রাগ করছেন। বড় ভাই, এক্সকিউজ করে দেন।’
ভদ্রলোক সম্ভবত খানিক লজ্জিত হলেন। প্রায় শোনা যায় না এরকম গলায় বললেন, ‘আপনার নাম্বার কত?’
জামি এবার অসম্ভব অমায়িক স্বরে বলল, ‘বড় ভাইয়া, আমার উপর রাগ নাই তো?’
‘আরে না, কী যে বলেন, হে হে হে!’
‘ভাই অনুমতি দিলে একটা কথা বলি?’
‘জ্বী-জ্বী, বলেন।’
জামি শান্ত গলায় বলল, ‘য়্যু ব্লাডি ফাকিন গাই, য়্যু ব্লাডি শিট অভ আ মিউল, নাউ বাজ অফ...।’
ওপাশে কবরের নিস্তব্ধতা।
‘ভাইজান রাখি?’
লাইন কেটে গেল। ও চোয়াল শক্ত করে আবারও চেষ্টা করল। রিং যাচ্ছে কেউ উঠাচ্ছে না। রেখে দেবে ভাবছে, মেয়েলি চিকন গলা ভেসে এলো, ‘হ্যালো, কে বলছেন?’
‘আপনি কে বলছেন, প্লিজ?’
‘আমি মৌ।’
‘জিস, রাত বাজে দেড়টা, তুমি টেলিফোন ধরেছ! সরি মৌ, তোমার কাঁচা ঘুম ভাঙ্গিয়ে দিলাম।’
‘জামি ভাই! না-না, আমি তো পানি খেতে উঠেছিলাম।’
‘কী অবস্থা, তোমার গলা একদম বুঝতে পারিনি!’
‘ঘুম থেকে উঠেছি তো, তাই।’
‘ইয়ে মৌ, কল্লোল কি জেগে আছে?’
‘জামি ভাই, কী যে বলেন আপনি, এতরাতে জেগে থাকবে ভাইয়া! ও হল কুম্ভকর্ন, ঘুমের রাজা। আমি না রাতে ভাইয়ার খাটের পাশে একজগ পানি রেখে দেই। সকালে ওর মাথায় ঢেলে দেই। জামি ভাই, তখন যদি ভাইয়াকে দেখতেন। হি হি হি।’
‘তোমাদের টেলিফোন লাইন চালু আছে। গুড-গুড।’
‘টেলিফোনের কথা কেন বললেন, জামি ভাই।’
‘এমনি-এমনি। অ্যাঁ মৌ, তোমাকে টেলিফোন চালু আছে কিনা এটা জিজ্ঞেস করেছি, এটা কিন্তু তোমার ভাইয়াকে বলো না, ঠিক আছে?’
‘কেন, জামি ভাই?’
‘এমনি-এমনি, কোন কারণ নেই। তোমার ভাইয়ার সঙ্গে একটা বাজি ধরেছি, এই আর কী। তুমি কিন্তু বলো না, এ্যাঁ। কাল তোমার স্কুল আছে না, শুয়ে পড়ো। ইয়ে, কল্লোলকে একটু ডেকে দাও, বলবে আমি ফোন করেছি। খুব জরুরি দরকার।’
দীর্ঘ সময় পর কল্লোলের রাগী গলা ভেসে এলো, ‘আপনার কি সব গ্রে মেটারই আউট হয়ে গেছে। গেছে না, ঠিক ধরেছি। এবার টেলিফোনটা শক্ত করে ধরে নিজের মাথায় বাড়ি দেন।’
‘খুব মৌজে আছি রে, ফুরফুরে ভাব। খানিকটা অলিপান, আ মীন মদ্যপান করেছি। বেশি না, চার পেগ। হা হা হা। ভাবলাম তোর সঙ্গে শেয়ার করা যাক।’
‘তুই আবার কি ছাতাফাতা শেয়ার করবি!’
‘আরে শুনলে তুই পাগল হয়ে যাবি।’
কল্লোল রাগ চেপে বলল, ‘আজ পর্যন্ত কোন পাগল কাউকে পাগল বানাতে পেরেছে বলে অন্তত আমার জানা নাই। তা টেলিফোন করেছিস কেন?’
‘দেখলাম তুই জেগে আছিস কিনা। তুই ঘুমুচ্ছিলি নাকি? আচ্ছা যা, শুয়ে পড়।’
‘ঘুম ভাঙ্গিয়ে এখন এটা বলছিস, তুই দেখি বিরাট ফাজিল! আর আমি কি তোর মত নিশাচর ড্রাকুলা রে, যে এই মধ্যরাতে জেগে থাকব!’
‘শোন, কাল তোকে জরুরী একটা কথা বলতে ভুলে গেছি-’ এটুকু বলে জামি হাসি একান ওকান করে চুপ মেরে গেল।
‘জরুরি কথাটা কি, অবশ্য আমার ধারণা জরুরী কথাটার অর্থ আপনার জানা নেই।’
‘তোর লাল চশমাটা দেখে ভাবছিলাম এই জঘন্য জিনিস কোত্থেকে জোগাড় করলি। জিজ্ঞেস করতে পরে আর মনে ছিল না। তা, কোম্পানী কি এই একটাই মাল বাজারে ছেড়েছে, বাপ!’
‘জামি, তোর মাথাটা জোরে ঝাঁকা তো, ঝাঁকিয়েছিস? শব্দ হচ্ছে না, হচ্ছে? ঠিক ধরেছিস, কয়েকটা নাট-বল্টু ছুটে গেছে। কাল ওগুলো টাইট দিয়ে ফোন করিস।’
জামি গলা ফাটিয়ে গা দুলিয়ে হাসতে লাগল। কল্লোলের কানের পর্দা, সম্ভবত টেলিফোনের তারও কাঁপিয়ে। কল্লোল চট করে রিসিভারের কাছ থেকে কান সরিয়ে নিল। বদমাশটা দিয়েছিল কানের বারোটা বাজিয়ে। হিসহিস করে বলল, ‘জামি, এমন জঘন্য করে হাসতে আজ অবধি কাউকে দেখিনি।’
‘বাঁচা গেল-আজ তো দেখলি। অ, দেখবি কি করে, টেলিফোনে তো সে উপায় নেই! ইয়ে, বিশ্বকাপের খেলা দেখছিস না?’
‘না।’
‘আশ্চর্য, তুই একটা মানুষ!’
‘ব্যাটা গর্দভ, বিশ্বকাপের খেলা কী দেয়ালে দেখায়, টিভি থাকলে না দেখব!’
‘বলিস কী, তোদের টিভি কি হয়েছে?’
‘অ্যাকুরিয়াম বানিয়ে ফেলেছি। রং বেরং-এর মাছ ছেড়েছি।’
‘অ,’ জামি একটা জোর ধাক্কা খেল। টিভি বিক্রি করে ফেলেছে! এদের তাহলে চরম দুঃসময় যাচ্ছে। গলার ভাব গোপন করে বলল, ‘সৌদি আরব-হল্যান্ডের খেলা দেখছিলাম, বুঝলি। ক্যামেল টু ক্যাডিলাক ভাইজানরা কেমন খেলে এটাই ছিল কৌতুহল। খেলা আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল। তুই তো জানিস, খেলা-টেলায় আমার তেমন আগ্রহ নাই। আমি খেলা দেখা শুরু করলাম এখান থেকে, সৌদি এক, হল্যান্ড শূণ্য। আমার মনে হচ্ছিল সৌদি ভাইজানরা এক গোল খেয়ে ফেলছে। কিছুক্ষণ পর ভুল ভাঙ্গল, হল্যান্ড এক গোলে পিছিয়ে আছে। চিন্তা কর, কী বোকা আমি, ব্রেন হয়ে গেছে হালুয়া। হা হা হা।’
‘এই সত্যটা জানতে তোর এতটা সময় লাগল! তোর খুলির ভেতর বাতাস হুহু করে বয়, এটা সবাই জানে; কল্লোল রাগে গরগর করে উঠল। পাগলটার কতক্ষণে পাগলামি থামবে কে জানে! কল্লোলের চোখ ঘুমে জড়িয়ে আসছে।
সহায়ক লিংক:
* তিতলি তুমিও: http://tinyurl.com/3y93om8
বিভাগ
তিতলি তুমিও
Monday, September 20, 2010
আমার আকাশটা নিয়ে নাও, বন্ধু
বিশু ফোনের ওপাশ থেকে গলা ফাটাচ্ছে, ‘হ্যালো-হ্যালো।’
কল্লোল এপাশ থেকে বলল, ‘ষাড়ের মত চেঁচাচ্ছিস কেন, আস্তে বল। আরেকটা কাজ করতে পারিস, ফোনটা বিচ্ছিন্ন করে কথা বল!’
‘বাছাল, এতক্ষণ ধরে চেষ্টা করছি, রিং যাচ্ছে কেউ উঠাচ্ছে না, ঘটনা কি! জামি আছে নাকি তোর ওখানে?’
‘ইয়েস-ইয়েস।’
‘তোকে বলেছে কিছু?’
‘ইয়েস-ইয়েস, বলেছে তুই নাকি কী হাতির ডিম দেখাবি। অই-অই, অইত, তুই আবার কী দেখাবি, কুমড়া দেখেও বলিস 'উই-ই মা'।’
‘কল্লোল মার্ডার হয়ে যাবি, জাষ্ট মার্ডার।’
‘হুপ।’
‘তোর সঙ্গে কথা বলতে চাই না, জামিকে ফোন দে।’
কল্লোল মাউথপীসে হাত চাপা দিয়ে জামিকে হাসতে হাসতে বলল, ‘বিশু তোর সঙ্গে কথা বলতে চাচ্ছে। বী কেয়ারফুল, আগুন হয়ে আছে কিন্তু।’
‘কি খবর শিশু মিঞা, টেলিফোন করাকরি কেন আবার, আমরা এই মাত্র তোর ওখানে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বেরুচ্ছিলাম।’
‘জামি, হোয়াট ননসেন্স, তোরা কি ফাজলামির দোকান খুলেছিস। আর এই সব কী, নাম বিকৃত করিস! ’
‘কী বলছিস, বিকৃত করলাম কোথায়! তুই শিশু তাই শিশু বললাম, ভুল বলেছি।’
ওপাশ থেকে বিশুর দাঁত ঘষার শব্দ ভেসে এলো। জামি হাসি চেপে বলল, ‘বিশু, বাপ, এমন করে না। দাঁত এ অত্যাচার সইবে না, খুলে আসবে।’
‘জামি, ইউ রাস্কেল, টেলিফোন রাখছি।’
‘করিস কী-করিস কী, ইয়ে ফোন করলি কি জন্যে সেটা বল?’
‘এটা জানাতে, আমার সঙ্গে যে প্রোগ্রাম ছিল, বাতিল। জরুরী একটা কাজে এখুনি বেরিয়ে যাব।’
‘শালা, তুই কি ভাঁড়, থ্রি ষ্টুজেসের ওয়ান ষ্টুজ নাকি! আমাদের এভাবে খবর দিয়ে-।’
‘সরি, জরুরি কাজ না হলে-।’
‘তা জরুরি কাজটা কি?’
‘বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে দেখা করব।’
‘কা-কার সঙ্গে! কিক-কি জন্য!’
‘আমাদের দেশের জাতীয় ঋণ-লেটেস্ট মাথাপিছু যে ঋণ আসে তা আমি জমা দিয়ে দিতে চাই। আমিই হব এ দেশে প্রথম 'জাতীয় ঋণমুক্ত ব্যক্তি'।’
জামি হাসবে না কাঁদবে বুঝে উঠতে পারছে না। সামলে নিয়ে বলল, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্ণর কে, জানিস?
‘খোরশেদ আলম।’
‘তুই খোরশেদ আলমকে কেমন করে চিনিস?’
‘চিনি না, তবে নোটের গায়ে নাম ছাপানো দেখলাম।’
‘নোটটা কত সালে ছাপানো হয়েছে, তুই জানিস রে হাঁদারাম? একজন কী আজীবন গভর্ণর থাকে!’
‘আগে তো যাই, তারপর দেখা যাবে।’
জামি কাঁধ ঝাঁকাল, ‘কী আর করা, প্রোগ্রাম যখন হয়েই গেছে চল আমরাও যাই।’
বিশু বলল, ‘মাথা খারাপ, এত বড় লোকের কাছে যাচ্ছি তোদের নিয়ে যাই আর কি! যেখানে সেখানে একপাল মূর্খ নিয়ে ঘুরি।’
‘হ্যালো, হ্যালো বিশু।’
‘হ্যাঁ, বল শুনছি।’
‘বিশু, তোর মুখে করি হিসু।’
‘জামি, হারামজাদা আজই আমার হাতে খুন হয়ে যাবি, জাষ্ট মার্ডার।’
জামি এর উত্তর না দিয়ে ধড়াম করে রিসিভার নামিয়ে রাখল। রাগে গরগর করে বলল, ‘বানচোত, বলে কী খুন করে ফেলবে। একটা চড় দিলে ছটা দাঁত খুলে আসবে, প্যান্ট নষ্ট করে ফেলবে। হারামজাদার কী সাহস, বলে কি না একপাল মূর্খ নিয়ে ঘুরি।’
কল্লোল ওপাশের বক্তব্য আন্দাজ করে উঠতে পারছিল না, এবার সবগুলো দাঁত বেরিয়ে পড়ল, ‘জামি, তোকেও মৃত্যুদন্ড দিয়েছে?’
‘হুঁ, আজই নাকি আমার শেষদিন।’
‘এটা ওর দু-নম্বর মুদ্রাদোষ হয়ে গেছে। বাদ দে, এখন কি করবি?’
‘কি আর করবো, অসহ্য রাগে গা জ্বলে যাচ্ছে, দিনটাই মাটি। বাসায় চলে যাব। দেখি একটা ম্যারাথন ঘুম দেয়া যায় কিনা। শোন, ভুলিস না, বিকেলেই কিন্তু যাব বিশুর ওখানে। হারামজাদাকে সাইজ করতে হবে।’
...
বিকেলে বিশুকে স্টুডিওতেই পাওয়া গেল। ছবি আঁকছে। জামি উঁচু স্বরে বলল, ‘হ্যালে টিস্যু, কী হচ্ছে?’
‘জামি, প্লিজ ডিস্টার্ব করিস না, ছবি আঁকছি। প্লিজ এখন যা, আমাকে ছেড়ে দে।’
‘ওয়েল টিস্যু, রিমেম্বার, গড ইজ অলমাইটি ইন স্কাই লাইন, অ্যান্ড মাইটি জামি ইন বাংলাদেশ। ছেড়ে দেব আবার কিরে লেদার হেড। কোন ছাড়াছাড়ি নাই।’
‘প্লিজ তোরা এখন যা, পরে আসিস। সামনে আমার একক প্রদর্শনী, একগাদা ছবির শেষ করতে হবে।’
‘তোর কাজ তুই কর, আমরা বসে বসে দেখি।’
‘খামোখা বসে থাকবি কেন, বিকেলটা নষ্ট না করে কোথাও থেকে ঘুরে আয়।’
‘বেশ, দে আমিও কিছু আঁকি।’
‘ছ্যাহ, একটা রেখা সোজা টানতে পারিস না, তুই ছবি আঁকবি, তু-ই!’
‘ইয়েস, তবে কি আঁকব এটা এখন বলব না। সময় হলে দেখবি। ব্যবস্থা করে দে নইলে তোর আঁকা ছবির উপর-।’
বিশু খুঁজে বাতিল রং ক্যানভাস জামির সামনে ছুঁড়ে ফেলে চা’র কথা বলতে ভেতরে গেল।
জামি কড়াৎ-কড়াৎ করে হাড় ফুটিয়ে কাজে লেগে গেল। সমস্ত রং মাখামাখি করে কোনটাই লাগাতে বাকি রাখল না। লম্বাটে কি যেন একটা আঁকছে। জিনিসটা কি কল্লোল ঠিক ধরতে পারছে না, ভয়ে ভয়ে জানতে চাইল, ‘স্যার, জিনিসটা কি?’
‘ডিপ শিট, ভোন্ট গ্রিন।’
ক্যানভাসের অবয়বটা ক্রমশ লম্বা হতে থাকল। কল্লোল নিঃশব্দে হাসল, ক্যানভাসে আটবে তো! বিশু চা নিয়ে ঢুকল, দুপদাপ পা ফেলে। তাচ্ছিল্য করে বলল, ‘শেষ হয়েছে?
‘হুঁ, এই দেখ।’
‘জিনিসটা কি?”
জামি চা’র কাপ টেনে নিয়ে বলল, ‘তোর সার্টিফিকেটটা কি আমারটার মতই জাল!’
‘কচকচানি বাদ দিয়ে বল এইটা কি আবর্জনা?’
‘কদু।’
‘ক্কি-কি!’
‘লাউ রে বেটা, লাউ।’
কল্লোল আয়েশ করে চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, ‘জামি নিচে লিখে দে, লাউ । অনেকে রকেট ভেবে বসতে পারে।’
চলে আসার সময় বিশু রক্তচক্ষু মেলে বলল, ‘তোর এই নোংরা মোজাটা ফেলে যাচ্ছিস কি ভেবে!’
‘মাই গড, তোকে বলিনি। প্রদর্শনীতে দিয়ে দিস, তোর নাম লিখে। তোলপাড় পড়ে যাবে। আনন্দের চোটে সবাই বিশুর মুখে, হা হা হা। ’
সহায়ক লিংক:
১. তিতলি তুমিও: http://tinyurl.com/3y93om8
কল্লোল এপাশ থেকে বলল, ‘ষাড়ের মত চেঁচাচ্ছিস কেন, আস্তে বল। আরেকটা কাজ করতে পারিস, ফোনটা বিচ্ছিন্ন করে কথা বল!’
‘বাছাল, এতক্ষণ ধরে চেষ্টা করছি, রিং যাচ্ছে কেউ উঠাচ্ছে না, ঘটনা কি! জামি আছে নাকি তোর ওখানে?’
‘ইয়েস-ইয়েস।’
‘তোকে বলেছে কিছু?’
‘ইয়েস-ইয়েস, বলেছে তুই নাকি কী হাতির ডিম দেখাবি। অই-অই, অইত, তুই আবার কী দেখাবি, কুমড়া দেখেও বলিস 'উই-ই মা'।’
‘কল্লোল মার্ডার হয়ে যাবি, জাষ্ট মার্ডার।’
‘হুপ।’
‘তোর সঙ্গে কথা বলতে চাই না, জামিকে ফোন দে।’
কল্লোল মাউথপীসে হাত চাপা দিয়ে জামিকে হাসতে হাসতে বলল, ‘বিশু তোর সঙ্গে কথা বলতে চাচ্ছে। বী কেয়ারফুল, আগুন হয়ে আছে কিন্তু।’
‘কি খবর শিশু মিঞা, টেলিফোন করাকরি কেন আবার, আমরা এই মাত্র তোর ওখানে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বেরুচ্ছিলাম।’
‘জামি, হোয়াট ননসেন্স, তোরা কি ফাজলামির দোকান খুলেছিস। আর এই সব কী, নাম বিকৃত করিস! ’
‘কী বলছিস, বিকৃত করলাম কোথায়! তুই শিশু তাই শিশু বললাম, ভুল বলেছি।’
ওপাশ থেকে বিশুর দাঁত ঘষার শব্দ ভেসে এলো। জামি হাসি চেপে বলল, ‘বিশু, বাপ, এমন করে না। দাঁত এ অত্যাচার সইবে না, খুলে আসবে।’
‘জামি, ইউ রাস্কেল, টেলিফোন রাখছি।’
‘করিস কী-করিস কী, ইয়ে ফোন করলি কি জন্যে সেটা বল?’
‘এটা জানাতে, আমার সঙ্গে যে প্রোগ্রাম ছিল, বাতিল। জরুরী একটা কাজে এখুনি বেরিয়ে যাব।’
‘শালা, তুই কি ভাঁড়, থ্রি ষ্টুজেসের ওয়ান ষ্টুজ নাকি! আমাদের এভাবে খবর দিয়ে-।’
‘সরি, জরুরি কাজ না হলে-।’
‘তা জরুরি কাজটা কি?’
‘বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে দেখা করব।’
‘কা-কার সঙ্গে! কিক-কি জন্য!’
‘আমাদের দেশের জাতীয় ঋণ-লেটেস্ট মাথাপিছু যে ঋণ আসে তা আমি জমা দিয়ে দিতে চাই। আমিই হব এ দেশে প্রথম 'জাতীয় ঋণমুক্ত ব্যক্তি'।’
জামি হাসবে না কাঁদবে বুঝে উঠতে পারছে না। সামলে নিয়ে বলল, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্ণর কে, জানিস?
‘খোরশেদ আলম।’
‘তুই খোরশেদ আলমকে কেমন করে চিনিস?’
‘চিনি না, তবে নোটের গায়ে নাম ছাপানো দেখলাম।’
‘নোটটা কত সালে ছাপানো হয়েছে, তুই জানিস রে হাঁদারাম? একজন কী আজীবন গভর্ণর থাকে!’
‘আগে তো যাই, তারপর দেখা যাবে।’
জামি কাঁধ ঝাঁকাল, ‘কী আর করা, প্রোগ্রাম যখন হয়েই গেছে চল আমরাও যাই।’
বিশু বলল, ‘মাথা খারাপ, এত বড় লোকের কাছে যাচ্ছি তোদের নিয়ে যাই আর কি! যেখানে সেখানে একপাল মূর্খ নিয়ে ঘুরি।’
‘হ্যালো, হ্যালো বিশু।’
‘হ্যাঁ, বল শুনছি।’
‘বিশু, তোর মুখে করি হিসু।’
‘জামি, হারামজাদা আজই আমার হাতে খুন হয়ে যাবি, জাষ্ট মার্ডার।’
জামি এর উত্তর না দিয়ে ধড়াম করে রিসিভার নামিয়ে রাখল। রাগে গরগর করে বলল, ‘বানচোত, বলে কী খুন করে ফেলবে। একটা চড় দিলে ছটা দাঁত খুলে আসবে, প্যান্ট নষ্ট করে ফেলবে। হারামজাদার কী সাহস, বলে কি না একপাল মূর্খ নিয়ে ঘুরি।’
কল্লোল ওপাশের বক্তব্য আন্দাজ করে উঠতে পারছিল না, এবার সবগুলো দাঁত বেরিয়ে পড়ল, ‘জামি, তোকেও মৃত্যুদন্ড দিয়েছে?’
‘হুঁ, আজই নাকি আমার শেষদিন।’
‘এটা ওর দু-নম্বর মুদ্রাদোষ হয়ে গেছে। বাদ দে, এখন কি করবি?’
‘কি আর করবো, অসহ্য রাগে গা জ্বলে যাচ্ছে, দিনটাই মাটি। বাসায় চলে যাব। দেখি একটা ম্যারাথন ঘুম দেয়া যায় কিনা। শোন, ভুলিস না, বিকেলেই কিন্তু যাব বিশুর ওখানে। হারামজাদাকে সাইজ করতে হবে।’
...
বিকেলে বিশুকে স্টুডিওতেই পাওয়া গেল। ছবি আঁকছে। জামি উঁচু স্বরে বলল, ‘হ্যালে টিস্যু, কী হচ্ছে?’
‘জামি, প্লিজ ডিস্টার্ব করিস না, ছবি আঁকছি। প্লিজ এখন যা, আমাকে ছেড়ে দে।’
‘ওয়েল টিস্যু, রিমেম্বার, গড ইজ অলমাইটি ইন স্কাই লাইন, অ্যান্ড মাইটি জামি ইন বাংলাদেশ। ছেড়ে দেব আবার কিরে লেদার হেড। কোন ছাড়াছাড়ি নাই।’
‘প্লিজ তোরা এখন যা, পরে আসিস। সামনে আমার একক প্রদর্শনী, একগাদা ছবির শেষ করতে হবে।’
‘তোর কাজ তুই কর, আমরা বসে বসে দেখি।’
‘খামোখা বসে থাকবি কেন, বিকেলটা নষ্ট না করে কোথাও থেকে ঘুরে আয়।’
‘বেশ, দে আমিও কিছু আঁকি।’
‘ছ্যাহ, একটা রেখা সোজা টানতে পারিস না, তুই ছবি আঁকবি, তু-ই!’
‘ইয়েস, তবে কি আঁকব এটা এখন বলব না। সময় হলে দেখবি। ব্যবস্থা করে দে নইলে তোর আঁকা ছবির উপর-।’
বিশু খুঁজে বাতিল রং ক্যানভাস জামির সামনে ছুঁড়ে ফেলে চা’র কথা বলতে ভেতরে গেল।
জামি কড়াৎ-কড়াৎ করে হাড় ফুটিয়ে কাজে লেগে গেল। সমস্ত রং মাখামাখি করে কোনটাই লাগাতে বাকি রাখল না। লম্বাটে কি যেন একটা আঁকছে। জিনিসটা কি কল্লোল ঠিক ধরতে পারছে না, ভয়ে ভয়ে জানতে চাইল, ‘স্যার, জিনিসটা কি?’
‘ডিপ শিট, ভোন্ট গ্রিন।’
ক্যানভাসের অবয়বটা ক্রমশ লম্বা হতে থাকল। কল্লোল নিঃশব্দে হাসল, ক্যানভাসে আটবে তো! বিশু চা নিয়ে ঢুকল, দুপদাপ পা ফেলে। তাচ্ছিল্য করে বলল, ‘শেষ হয়েছে?
‘হুঁ, এই দেখ।’
‘জিনিসটা কি?”
জামি চা’র কাপ টেনে নিয়ে বলল, ‘তোর সার্টিফিকেটটা কি আমারটার মতই জাল!’
‘কচকচানি বাদ দিয়ে বল এইটা কি আবর্জনা?’
‘কদু।’
‘ক্কি-কি!’
‘লাউ রে বেটা, লাউ।’
কল্লোল আয়েশ করে চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, ‘জামি নিচে লিখে দে, লাউ । অনেকে রকেট ভেবে বসতে পারে।’
চলে আসার সময় বিশু রক্তচক্ষু মেলে বলল, ‘তোর এই নোংরা মোজাটা ফেলে যাচ্ছিস কি ভেবে!’
‘মাই গড, তোকে বলিনি। প্রদর্শনীতে দিয়ে দিস, তোর নাম লিখে। তোলপাড় পড়ে যাবে। আনন্দের চোটে সবাই বিশুর মুখে, হা হা হা। ’
সহায়ক লিংক:
১. তিতলি তুমিও: http://tinyurl.com/3y93om8
বিভাগ
তিতলি তুমিও
Sunday, June 20, 2010
পিতা ও পুত্র: অন্য পিঠ
প্রতিদিন সকালে জামির গা রাগে জ্বলে যায়। ব্যাপারটা ঘটে ঠিক তখনি যখন ওর টয়লেটে যাওয়ার প্রয়োজন হয়। এই বিশাল বাড়ির সব ক-টাই হাই কমোড, একটাও লো-প্যান নেই। আধুনিকতার সমস্ত উপকরণের সঙ্গে ও মানিয়ে নিয়েছে কিন্তু হাই কমোড বড় ভোগাচ্ছে!
প্রথমবার হাই কমোড ব্যবহার করার কথা মনে পড়ে গেল। বেশ আগের কথা তখন বয়স কতই বা! মাঝারি ধরনের হোটেল। রিসেপশনিষ্ট জানতে চেয়েছিল: এ্যাটাচ বাথ কী নিবেন, বাংলা না ইংলিশ?
জামি একরাশ আলগা গাম্ভীর্য এনে অবজ্ঞা ভরে বলেছিল: ইংলিশ-ইংলিশ।
হোটেল রুমে ঢুকে ইংলিশ জিনিসটা দেখে জামির বুক কেঁপে উঠেছিল। সকাল বেলায় চোখ ফেটে কান্না আসছিল। শুরু হল অসামান্য কসরত। স্পঞ্জের স্যান্ডেল নিয়ে পিচ্ছিল কমোডের সরু দু’ধারে বসার চেষ্টা। আপ্রাণ চেষ্টার ফল দু-মিনিটেই মিলল। পিছলে পড়ে এক পা বেকায়দা ভঙ্গিতে কমোডে আটকে গেল। বিশ মিনিটের মাথায় জামি অসাধ্য সাধন করল। স্বস্তিতে বিড়বিড় করেছিল, ওয়াট আ রিলিফ-ওয়াট আ রিলিফ।
আজ বিরস মুখে বেরিয়ে বাবাকে খোঁজাখুঁজি করতে লাগল। জামির বাবা মন্তাজ মিয়া এখন লেখেন, এম. এইচ. মেন্টাজ। এই এম. এইচ-এর অর্থ কী মেল্টাজ সাহেব নিজেও জানেন ন। আড়ালে আনেকে তাঁকে তিমিঙ্গিল বলে। টাকার গন্ধ পেলে ইনি নাকি তিমিকেও গিলে ফেলতে পারেন! খুব অল্প সময়ে ধাঁ করে বেশ ক-কোটি টাকা বানিয়ে ফেললেন, এক্সপোর্ট ইমপোর্ট করে। জামি খুব ভাল একটা জানে না ইনি আসলেই কী করেন! তবে এটা বেশ জানে, ওর বাবা আপাদমস্তক একজন অসৎ লোক। নীতি-ফীতি প্রতিবার নিঃশ্বাসের সঙ্গে বের করে দেন। সততা এঁর কাছে খোলামকুচি।
অবশেষে খাবার ঘরে পাওয়া বাবাকে গেল। মন্তাজ সাহেবের শালপ্রাংশু দেহ, রগরগে একটা গাউন গায়ে জড়িয়ে রেখেছেন। কারিগরী ফলানো রুপার চামচ দিয়ে প্যাচপ্যাচে কাদার মতো জাউ খাচ্ছেন। জামি ভাবল, আহ আফসোস, এসব অসাধু লোকগুলো প্রচুর ভালো ভালো খাবার থাকার পরও খেতে পারে না। এরকম একজন মন্দ লোকের মন্দ সন্তান না হয়ে উপায় কী!
জামি মুখ কালো করে বলল, ‘বাবা, তোমার খাওয়া-দাওয়া শেষ হলে একটা কথা বলব। কথাটা জরুরী।’
মেন্টাজ সাহেবের নিষ্প্রভ চোখ, এ পাথরের চোখ, স্বাভাবিক মানুষের হতে পারে না, আশ্চর্য! এ মুহূর্তে ভয় পেলে চলবে না। বাবার সামনে একবার ভেঙ্গে পড়লেই হয়েছে।
‘বাবা বলছ কেন স্টুপিডের মতো, বিশ্রী শোনাচ্ছে, ‘মেন্টাজ সাহেব বললেন, যথাসম্ভব কম মুখ নাড়িয়ে।
‘ড্যাড-ফ্যাড বলতে আমার ইচ্ছা করে না। তো, বাবা, যা বলতে চাচ্ছিলাম, মানুষের আবিষ্কার একটা কুৎসিত এবং একটা চমৎকার জিনিসের নাম বলতে পারো? দুটা জিনিসই কিন্তু ব্যঞ্জনবর্ণের প্রথম অক্ষর দিয়ে?’
মেন্টাজ সাহেব এ নিয়ে মাথা ঘামানো দূরের কথা, উত্তরই দিলেন না। ওঁর ধারণা ছেলেটার মাথায় গন্ডগোল আছে। এ দেশে মাথার সমস্যার চিকিৎসা কি হয়, নাকি বিদেশে কোথাও চেষ্টা করে দেখবেন! এ ছেলে দিনে দিনে জটিল সমস্যা সৃষ্টি করবে এটা চোখ বুজে বলে দেয়া যায়। আঠালো জিনিসটা বেশ কায়দা করে মুখের ভেতর নাড়াচাড়া করছেন। গলায় আটকাচ্ছে, গিলে ফেলা যাচ্ছে না।
কল্লোল মুখ আরও অন্ধকার করে বলল, ‘অসাধারণ জিনিসটা হলো কম্পিউটার আর কুৎসিত জিনিসটা হলো হাই কমোড। হাই ড্যাড, হাই কমোড।’
মেন্টাজ সাহেব মেঘ গর্জনে বললেন, ‘তুমি কী আমার সঙ্গে রসিকতা করার চেষ্টা করছ!’
‘তুমি কি রসিক লোক, যে তোমার সঙ্গে রসিকতা করব। আমি ঘুরিয়ে যেটা বলতে চাচ্ছি, কমোডে বসে আরাম পাই না। প্রতিদিন এ যন্ত্রণা ভালো লাগে না।’
‘তোমার কী ধারণা, এ কথায় খুব প্রভাবিত হয়ে কমোডগুলো সব ভেঙে বাঁশের টাট্টি বানিয়ে দেব?’
‘বাঁশের টাট্টি একবার ট্রাই করে দেখো, সেটা কমোডের চেয়ে আরাম।’
‘হাউ ডেয়ার য়্যু! তোমার অবাধ্যতা দেখে বিস্মিত হচ্ছি। কী পড়াশোনা করেছ, কে কী পছন্দ-অপছন্দ করছে এই জ্ঞানটুকুও তোমার নাই।’
‘তোমার অনেক কিছুতে আমরাও অবাক হই, বাবা। ম্যানেজার জলিল কাকু, যে লোক চল্লিশ বছর বিশ্বস্ততার সঙ্গে তোমার সেবা করেছে, তাকে তুমি লাথি মেরে বিদায় করে দিলে।’
মেন্টাজ সাহেব আঠালো জিনিসটা চিবানো বন্ধ করে খরখরে চোখে বললেন, ‘মুখ সামলে কথা বলো। বানিয়ে বানিয়ে বলছ কেন, তুমি দেখেছ জলিলকে লাথি মেরেছি!’
ওই এক কথাই হল। সরকার কাকু, কাকীমা ছোট ছোট বাচ্চা নিয়ে হররোজ গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকেন। তুমি দেখা করো না। দারোয়ানকে বলে দিলে ভেতরে ঢুকলে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিতে। তোমার মতো একজন অমানুষের সন্তান আমি, ভাবতে খুব কষ্ট হয়।’
মেন্টাজ সাহেব দূর্দান্ত রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে লাফিয়ে উঠলেন, ‘ফাজিল, তোকে জুতিয়ে লম্বা করে দেব।’
জামি সহজ ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকাল। সমস্ত শরীর অজান্তেই ঋজু-টানটান হয়ে গেছে। এ মুহূর্তে মোটেও বাবাকে ভয় পাচ্ছে না। প্রলয়ংকরী রাগ ফুঁসে উঠছে। জলিল কাকু, কাকীমা রোদ বৃষ্টি উপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে থাকেন। কী নিদারুণ লজ্জার মাথা খেয়ে ফি রোজ অপেক্ষা, একটুখানি দয়ার জন্যে!
ছোটবেলায় ও কাকীমার গলা ধরে ঝুলে পড়ত: কাকীমা আরেকটা গল্প বলো। ওর শত অত্যাচারেও কাকীমার হাসি মলিন হতো না।
এখন বাসা থেকে বের হলেই কাকীমার সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। মুখ নিমিষে উদ্ভাসিত হয়ে উঠে। কাকীমা বরাবরের মতো স্নেহ ভরা নরম গলায় বলেন: খোকা, ভালো আছিস? দিনে-দিনে তুই কেমন শুকিয়ে যাচ্ছিস রে।
জামির কী ইচ্ছাই না করে কাকীমাকে জড়িয়ে ধরে গলা ফাটিয়ে কাঁদে। জামি চোখ তুলে তাকাতে পারে না। অন্য দিকে তাকিয়ে চোখের পানি গোপন করে। দ্রুত অন্যদিকে তাকিয়ে সরে পড়ে। একদিন খুব সাহস করে বলেছিল: কাকীমা তোমাকে কিছু টাকা দেই?
তীব্র বেদনায় কাকীমা কুঁকড়ে গিয়েছিলেন। কান্না ভেজা গলায় বলেছিলেন: ছি জামি, ছি!
জামি বাবার চোখে চোখ রেখে ভাবছিল, বাবা কী ওর গায়ে হাত তুলবেন? সমস্ত জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটা কী এ মুহূর্তে করতে যাচ্ছেন?
জামির মা হাত মুছতে মুছতে ভেতরে না ঢুকলে হুলস্থূল কান্ড একটা হয়েই যেত। এই অসাধারণ মহিলা এক পলকে অনেকটা আঁচ করে ফেললেন। অসম্ভব শান্ত গলায় বললেন, ‘জামি, তোমার রুমে যাও।’
জামি টুঁ-শব্দ না করে মাথা নুইয়ে হাঁটা ধরল। বেরিয়ে যেতে যেতে অবাক হচ্ছিল, ভদ্রলোক যেভাবে লাফাচ্ছেন ছাদে না মাথা ঠুকে যায়।
জামি তিতিবিরক্ত। বেরিয়েই তিতলীর সামনে পড়ে গেল। ওর ইচ্ছা করছে চোঁচা দৌড়ে এর সামনে থেকে পালিয়ে যেতে। তিতলীর পাশ কাটিয়ে এটা এখন সম্ভব না। এ মেয়েটা বাবার দ্বিতীয় সংস্করণ। ক’দিন পর পর সাপের খোলসের মতো বয়ফ্রেন্ড বদলায়। তিতলীর চোখে বিদ্রুপ উপচে পড়ছে, ‘হ্যালো বদ, কিসের হইচই?’
জামি রাগ চেপে বলল, ‘বড় ভাইয়ের সঙ্গে এসব কী ফাজলামো।’
‘আহা চটচিস কেন; বাবা-মা, ড্যাড-মম হলে ব্রাদার বদ হবে না? বল, ভুল বললাম? হি হি হি। আর তুই তো নিরেট বদ।’
জামি দাঁতে দাঁত ঘসে বলল, ‘বদ আমি, না তুই। তুই-তুই, তুই বদের হাড্ডি। ইউ ব্লাডি নোংরা মেয়ে, কাল তোর রুমে ক্যাসেট খুঁজতে গিয়ে তোষকের নিচে কন্ট্রাসেপটিভ পিল পেয়েছি, ভাবতেই গা গুলিয়ে উঠছে।’
তিতলী বিপন্ন চোখে তাকিয়ে রইল। হায়-হায়, এ ভুল ও কী করে করল, তোষকের নিচে আহাম্মকের মতো রাখল!
সামলে নিয়ে রাগে জ্বলতে জ্বলতে বলল, ‘কেন তুই আমার রুমে ঢুকলি?’
‘বেশ করেছি, দাঁড়া বাবাকে বলছি।’
তিতলী ঠোঁট উল্টে নির্লজ্জের মতো বলল, ‘যা-যা, বলে দে, এসবে আমার প্রেজুডিস নাই। আর তুই কী ধোয়া তুলসী পাতা? তোর মানিব্যাগে খুঁজলে কনডম পাওয়া যাবে।’
জামির দু-কান ঝাঁ ঝাঁ করছে। মাথায় কেমন ঝিমঝিম ভাব। কখন তিতলীর গালে ঠাস করে চড় মেরেছে বলতেও পারবে না। সত্য-মিথ্যা যাই থাকুক কোনো মেয়ে কী তার বড় ভাই সম্বন্ধে এমন বলতে পারে!
তিতলী গালে দুহাত চেপে আগুন চেখে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, ‘তুই কী ভাবিস, পুরুষেদের বেলায় সাত খুন মাপ, না?’
জামি স্তব্ধ মুখে পা টেনে টেনে নিজের রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করল। ব্যাকুল হয়ে কাঁদতে কাঁদতে বারবার বলতে থাকল, ‘কী কুৎসিত একটা দিন, কী কুৎসিত একটা পরিবার!
দরজা ধাক্কানোর শব্দে কর্কশ গলায় বলল, ‘কে-কে?’
জামির মা পৃথিবীর সমস্ত মমতা ঢেলে বললেন, ‘আমি, দরজা খোল।’
জামি দরজার দিকে এগুতে এগুতে ভাবল, এই পরিবারের সব কুৎসিত যে মহিলা স্বর্গীয় ডানা দিয়ে আড়াল করে রেখেছেন, এই মুহূর্তে তাঁকে এড়াবার কী কোন উপায় নেই!
প্রথমবার হাই কমোড ব্যবহার করার কথা মনে পড়ে গেল। বেশ আগের কথা তখন বয়স কতই বা! মাঝারি ধরনের হোটেল। রিসেপশনিষ্ট জানতে চেয়েছিল: এ্যাটাচ বাথ কী নিবেন, বাংলা না ইংলিশ?
জামি একরাশ আলগা গাম্ভীর্য এনে অবজ্ঞা ভরে বলেছিল: ইংলিশ-ইংলিশ।
হোটেল রুমে ঢুকে ইংলিশ জিনিসটা দেখে জামির বুক কেঁপে উঠেছিল। সকাল বেলায় চোখ ফেটে কান্না আসছিল। শুরু হল অসামান্য কসরত। স্পঞ্জের স্যান্ডেল নিয়ে পিচ্ছিল কমোডের সরু দু’ধারে বসার চেষ্টা। আপ্রাণ চেষ্টার ফল দু-মিনিটেই মিলল। পিছলে পড়ে এক পা বেকায়দা ভঙ্গিতে কমোডে আটকে গেল। বিশ মিনিটের মাথায় জামি অসাধ্য সাধন করল। স্বস্তিতে বিড়বিড় করেছিল, ওয়াট আ রিলিফ-ওয়াট আ রিলিফ।
আজ বিরস মুখে বেরিয়ে বাবাকে খোঁজাখুঁজি করতে লাগল। জামির বাবা মন্তাজ মিয়া এখন লেখেন, এম. এইচ. মেন্টাজ। এই এম. এইচ-এর অর্থ কী মেল্টাজ সাহেব নিজেও জানেন ন। আড়ালে আনেকে তাঁকে তিমিঙ্গিল বলে। টাকার গন্ধ পেলে ইনি নাকি তিমিকেও গিলে ফেলতে পারেন! খুব অল্প সময়ে ধাঁ করে বেশ ক-কোটি টাকা বানিয়ে ফেললেন, এক্সপোর্ট ইমপোর্ট করে। জামি খুব ভাল একটা জানে না ইনি আসলেই কী করেন! তবে এটা বেশ জানে, ওর বাবা আপাদমস্তক একজন অসৎ লোক। নীতি-ফীতি প্রতিবার নিঃশ্বাসের সঙ্গে বের করে দেন। সততা এঁর কাছে খোলামকুচি।
অবশেষে খাবার ঘরে পাওয়া বাবাকে গেল। মন্তাজ সাহেবের শালপ্রাংশু দেহ, রগরগে একটা গাউন গায়ে জড়িয়ে রেখেছেন। কারিগরী ফলানো রুপার চামচ দিয়ে প্যাচপ্যাচে কাদার মতো জাউ খাচ্ছেন। জামি ভাবল, আহ আফসোস, এসব অসাধু লোকগুলো প্রচুর ভালো ভালো খাবার থাকার পরও খেতে পারে না। এরকম একজন মন্দ লোকের মন্দ সন্তান না হয়ে উপায় কী!
জামি মুখ কালো করে বলল, ‘বাবা, তোমার খাওয়া-দাওয়া শেষ হলে একটা কথা বলব। কথাটা জরুরী।’
মেন্টাজ সাহেবের নিষ্প্রভ চোখ, এ পাথরের চোখ, স্বাভাবিক মানুষের হতে পারে না, আশ্চর্য! এ মুহূর্তে ভয় পেলে চলবে না। বাবার সামনে একবার ভেঙ্গে পড়লেই হয়েছে।
‘বাবা বলছ কেন স্টুপিডের মতো, বিশ্রী শোনাচ্ছে, ‘মেন্টাজ সাহেব বললেন, যথাসম্ভব কম মুখ নাড়িয়ে।
‘ড্যাড-ফ্যাড বলতে আমার ইচ্ছা করে না। তো, বাবা, যা বলতে চাচ্ছিলাম, মানুষের আবিষ্কার একটা কুৎসিত এবং একটা চমৎকার জিনিসের নাম বলতে পারো? দুটা জিনিসই কিন্তু ব্যঞ্জনবর্ণের প্রথম অক্ষর দিয়ে?’
মেন্টাজ সাহেব এ নিয়ে মাথা ঘামানো দূরের কথা, উত্তরই দিলেন না। ওঁর ধারণা ছেলেটার মাথায় গন্ডগোল আছে। এ দেশে মাথার সমস্যার চিকিৎসা কি হয়, নাকি বিদেশে কোথাও চেষ্টা করে দেখবেন! এ ছেলে দিনে দিনে জটিল সমস্যা সৃষ্টি করবে এটা চোখ বুজে বলে দেয়া যায়। আঠালো জিনিসটা বেশ কায়দা করে মুখের ভেতর নাড়াচাড়া করছেন। গলায় আটকাচ্ছে, গিলে ফেলা যাচ্ছে না।
কল্লোল মুখ আরও অন্ধকার করে বলল, ‘অসাধারণ জিনিসটা হলো কম্পিউটার আর কুৎসিত জিনিসটা হলো হাই কমোড। হাই ড্যাড, হাই কমোড।’
মেন্টাজ সাহেব মেঘ গর্জনে বললেন, ‘তুমি কী আমার সঙ্গে রসিকতা করার চেষ্টা করছ!’
‘তুমি কি রসিক লোক, যে তোমার সঙ্গে রসিকতা করব। আমি ঘুরিয়ে যেটা বলতে চাচ্ছি, কমোডে বসে আরাম পাই না। প্রতিদিন এ যন্ত্রণা ভালো লাগে না।’
‘তোমার কী ধারণা, এ কথায় খুব প্রভাবিত হয়ে কমোডগুলো সব ভেঙে বাঁশের টাট্টি বানিয়ে দেব?’
‘বাঁশের টাট্টি একবার ট্রাই করে দেখো, সেটা কমোডের চেয়ে আরাম।’
‘হাউ ডেয়ার য়্যু! তোমার অবাধ্যতা দেখে বিস্মিত হচ্ছি। কী পড়াশোনা করেছ, কে কী পছন্দ-অপছন্দ করছে এই জ্ঞানটুকুও তোমার নাই।’
‘তোমার অনেক কিছুতে আমরাও অবাক হই, বাবা। ম্যানেজার জলিল কাকু, যে লোক চল্লিশ বছর বিশ্বস্ততার সঙ্গে তোমার সেবা করেছে, তাকে তুমি লাথি মেরে বিদায় করে দিলে।’
মেন্টাজ সাহেব আঠালো জিনিসটা চিবানো বন্ধ করে খরখরে চোখে বললেন, ‘মুখ সামলে কথা বলো। বানিয়ে বানিয়ে বলছ কেন, তুমি দেখেছ জলিলকে লাথি মেরেছি!’
ওই এক কথাই হল। সরকার কাকু, কাকীমা ছোট ছোট বাচ্চা নিয়ে হররোজ গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকেন। তুমি দেখা করো না। দারোয়ানকে বলে দিলে ভেতরে ঢুকলে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিতে। তোমার মতো একজন অমানুষের সন্তান আমি, ভাবতে খুব কষ্ট হয়।’
মেন্টাজ সাহেব দূর্দান্ত রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে লাফিয়ে উঠলেন, ‘ফাজিল, তোকে জুতিয়ে লম্বা করে দেব।’
জামি সহজ ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকাল। সমস্ত শরীর অজান্তেই ঋজু-টানটান হয়ে গেছে। এ মুহূর্তে মোটেও বাবাকে ভয় পাচ্ছে না। প্রলয়ংকরী রাগ ফুঁসে উঠছে। জলিল কাকু, কাকীমা রোদ বৃষ্টি উপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে থাকেন। কী নিদারুণ লজ্জার মাথা খেয়ে ফি রোজ অপেক্ষা, একটুখানি দয়ার জন্যে!
ছোটবেলায় ও কাকীমার গলা ধরে ঝুলে পড়ত: কাকীমা আরেকটা গল্প বলো। ওর শত অত্যাচারেও কাকীমার হাসি মলিন হতো না।
এখন বাসা থেকে বের হলেই কাকীমার সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। মুখ নিমিষে উদ্ভাসিত হয়ে উঠে। কাকীমা বরাবরের মতো স্নেহ ভরা নরম গলায় বলেন: খোকা, ভালো আছিস? দিনে-দিনে তুই কেমন শুকিয়ে যাচ্ছিস রে।
জামির কী ইচ্ছাই না করে কাকীমাকে জড়িয়ে ধরে গলা ফাটিয়ে কাঁদে। জামি চোখ তুলে তাকাতে পারে না। অন্য দিকে তাকিয়ে চোখের পানি গোপন করে। দ্রুত অন্যদিকে তাকিয়ে সরে পড়ে। একদিন খুব সাহস করে বলেছিল: কাকীমা তোমাকে কিছু টাকা দেই?
তীব্র বেদনায় কাকীমা কুঁকড়ে গিয়েছিলেন। কান্না ভেজা গলায় বলেছিলেন: ছি জামি, ছি!
জামি বাবার চোখে চোখ রেখে ভাবছিল, বাবা কী ওর গায়ে হাত তুলবেন? সমস্ত জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটা কী এ মুহূর্তে করতে যাচ্ছেন?
জামির মা হাত মুছতে মুছতে ভেতরে না ঢুকলে হুলস্থূল কান্ড একটা হয়েই যেত। এই অসাধারণ মহিলা এক পলকে অনেকটা আঁচ করে ফেললেন। অসম্ভব শান্ত গলায় বললেন, ‘জামি, তোমার রুমে যাও।’
জামি টুঁ-শব্দ না করে মাথা নুইয়ে হাঁটা ধরল। বেরিয়ে যেতে যেতে অবাক হচ্ছিল, ভদ্রলোক যেভাবে লাফাচ্ছেন ছাদে না মাথা ঠুকে যায়।
জামি তিতিবিরক্ত। বেরিয়েই তিতলীর সামনে পড়ে গেল। ওর ইচ্ছা করছে চোঁচা দৌড়ে এর সামনে থেকে পালিয়ে যেতে। তিতলীর পাশ কাটিয়ে এটা এখন সম্ভব না। এ মেয়েটা বাবার দ্বিতীয় সংস্করণ। ক’দিন পর পর সাপের খোলসের মতো বয়ফ্রেন্ড বদলায়। তিতলীর চোখে বিদ্রুপ উপচে পড়ছে, ‘হ্যালো বদ, কিসের হইচই?’
জামি রাগ চেপে বলল, ‘বড় ভাইয়ের সঙ্গে এসব কী ফাজলামো।’
‘আহা চটচিস কেন; বাবা-মা, ড্যাড-মম হলে ব্রাদার বদ হবে না? বল, ভুল বললাম? হি হি হি। আর তুই তো নিরেট বদ।’
জামি দাঁতে দাঁত ঘসে বলল, ‘বদ আমি, না তুই। তুই-তুই, তুই বদের হাড্ডি। ইউ ব্লাডি নোংরা মেয়ে, কাল তোর রুমে ক্যাসেট খুঁজতে গিয়ে তোষকের নিচে কন্ট্রাসেপটিভ পিল পেয়েছি, ভাবতেই গা গুলিয়ে উঠছে।’
তিতলী বিপন্ন চোখে তাকিয়ে রইল। হায়-হায়, এ ভুল ও কী করে করল, তোষকের নিচে আহাম্মকের মতো রাখল!
সামলে নিয়ে রাগে জ্বলতে জ্বলতে বলল, ‘কেন তুই আমার রুমে ঢুকলি?’
‘বেশ করেছি, দাঁড়া বাবাকে বলছি।’
তিতলী ঠোঁট উল্টে নির্লজ্জের মতো বলল, ‘যা-যা, বলে দে, এসবে আমার প্রেজুডিস নাই। আর তুই কী ধোয়া তুলসী পাতা? তোর মানিব্যাগে খুঁজলে কনডম পাওয়া যাবে।’
জামির দু-কান ঝাঁ ঝাঁ করছে। মাথায় কেমন ঝিমঝিম ভাব। কখন তিতলীর গালে ঠাস করে চড় মেরেছে বলতেও পারবে না। সত্য-মিথ্যা যাই থাকুক কোনো মেয়ে কী তার বড় ভাই সম্বন্ধে এমন বলতে পারে!
তিতলী গালে দুহাত চেপে আগুন চেখে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, ‘তুই কী ভাবিস, পুরুষেদের বেলায় সাত খুন মাপ, না?’
জামি স্তব্ধ মুখে পা টেনে টেনে নিজের রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করল। ব্যাকুল হয়ে কাঁদতে কাঁদতে বারবার বলতে থাকল, ‘কী কুৎসিত একটা দিন, কী কুৎসিত একটা পরিবার!
দরজা ধাক্কানোর শব্দে কর্কশ গলায় বলল, ‘কে-কে?’
জামির মা পৃথিবীর সমস্ত মমতা ঢেলে বললেন, ‘আমি, দরজা খোল।’
জামি দরজার দিকে এগুতে এগুতে ভাবল, এই পরিবারের সব কুৎসিত যে মহিলা স্বর্গীয় ডানা দিয়ে আড়াল করে রেখেছেন, এই মুহূর্তে তাঁকে এড়াবার কী কোন উপায় নেই!
বিভাগ
তিতলি তুমিও
Saturday, April 3, 2010
তিতলি তুমিও: ২
(এই লেখা বয়স্ক মানুষদের জন্য না। অহেতুক তাঁদের সময় নষ্ট করার কোনো মানে হয় না।)
তিতলির বিরক্তির একশেষ। এর মানে কী? কল্লোলের আসার কথা চারটায় এখন বাজে প্রায় পাঁচটা। সময়ের কী কোন দাম নেই, একঘন্টা কিছুই না! আর বসে থাকার কোন মানে হয় না। উঠতে যাবে, চোখের কোন দিয়ে দেখল; ওই তো আসছে, আসছে ভুট্টা কমড়াতে কামড়াতে। তিতলি স্ধির চোখে চুপ করে দেখছে।
কল্লোল হাসিমুখে বলল, ‘ভুট্টা খাবে, প্রচুর ক্যালোরী?’
তিতলির খুব ইচ্ছা করছে খামচে একে ফালাফালা করে ফেলে। সামলে নিয়ে হিম গলায় বলল, ‘ভুট্টা ঘোড়া খায় আরাম করে, তুমি তো ঘোড়া না’, রাগে গা জ্বলে যাচ্ছে। এ কেমন কপকপ করে খাচ্ছে!
‘ঘোড়া খায় না ছাগল, সেটা কথা না। তুমি খাবে কিনা বলো, প্রচুর ক্যালোরি, শরীরের জন্য উপকারী,’ কল্লোল প্রবলবেগে মুখ চালাতে চালাতে বলল।
‘না তুমি খাও, ক্যালোরি তোমার প্রয়োজন। ঘোড়ার খাবার খেয়েই এ অবস্থা। তুমি তো নরকংকাল হিসাবে ভাল দামে বিক্রি হবে। মেডিকেল পড়ুয়া কারও সঙ্গে যোগাযোগ করে দেখতে পারো।’
কল্লোল ঠিক ধরতে পারছে না এর রাগের কারণ। ভুট্টা কী এতই খারাপ জিনিস, ফেলে দেবে? দশ টাকা দিয়ে জাম্বো সাইজ দেখে কিনেছে, মাত্র চার ভাগের একভাগ খাওয়া হয়েছে। আমতা আমতা করে বলল, ‘ইয়ে তিতলি, এটা ফেলে দেব?’
‘যা খুশি কর, আমাকে জিজ্ঞেস করছ কেন!’
‘জাস্ট এক কামড় দিয়ে ফেলে দেব।’
তিতলি পণ করেছিল হাসবে না। এর এক কামড়ের নমুনা দেখে সব ভেসে গেল। ও চাচ্ছে এক কামড়ে যেন ভুট্টার একটা বিচিও না থাকে। কল্লোল ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘ঘটনা কি?’
তিতলি মুখের হাসি ঝেঁটিয়ে বিদায় করে দিল। রাগ-রাগ গলায় বলল, ‘কেন, তুমি জান না।’
‘বারে, কি জন্যে রেগে আছ আমি জানব কী করে, আমি কি এস্ট্রডমাস!’
‘তোমার ঘড়িতে ক’টা বাজে?’
‘ক’টা বাজে?’
‘দেখ, দেখলেই হয়।’
‘আমার তো ঘড়ি নাই, নাই মানে পরি না আর কি।’
‘চমৎকার, দারুন তো। ঘড়ি পরা হয় না। সূর্য-চন্দ্র দেখে সময় বলা হয়। তুমি দেখি বিরাট প্রতিভা।’
‘আসলে ঘড়ির প্রয়োজনই হয় না। ধরো, একজন অন্যজনকে জিজ্ঞেস করল, ক’টা বাজে? ব্যস আমি জেনে গেলাম। তারপর ধরো, পাশে একজন বসে আছে বা বাসের হ্যান্ডেল ধরে বাদুর ঝুলে আছে, চট করে দেখে ফেললাম কটা বাজে। এই ধরো, তোমার ঘড়িতে এখন বাজে পাঁচটা তিন। জিয়াউর রহমানের মানি ইজ নো প্রব্লেম, আমার ঘড়ি ইজ নো প্রব্লেম।’
‘ধরো-ধরো, এত কী ধরাধরি। প্রত্যেক বাক্যে একবার ধরো বলছ,’ তিতলি এবার পলক না ফেলে বলল, ‘এভাবে তুমি মেয়েদের হাতের ঘড়ি দেখে সময় জেনে যাও।’
‘হুঁ, এ আর কী।’
তিতলির মুখ শক্ত, চোখ শীতল, ‘শোনো কল্লোল, আজকের পর তুমি আর আমার সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করবে না।’
কল্লোল হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। তিতলি এসব কি বলছে! ও এমন নিষ্ঠুর করে বলতে পারল, ‘তিতলি, এই সব কী!
'যা বলার বললাম। একই কথা বারবার বলতে চাচ্ছি না।'
বেশ, তুমি না চাইলে আর কখনও যোগাযোগ হবে না।’
তিতলির সব কেমন ওলট-পালট হয়ে গেল। কল্লোল কী অবলীলায়ই না বলে ফেলল। এ সম্ভবত কোনো দিনই জানবে না এর জন্য তিতলির রয়েছে কী অপার্থিব ভালবাসা! ওর সুতীব্র এই ভালবাসার কথা কল্লোল কী কোন দিনই জানবে না? তিতলি কি বলবে বুঝে পেল না, চোখের পলকে কল্লোলকে জাপটে ধরে ফেলল, ‘এভাবে বলো না, আমি মরে যাব, আমি মরে যাব...।’
কল্লোল ভারী বিব্রত হচ্ছে। জোর খাটিয়েও একে ছাড়াতে পারছে না, তিতলি যে ভাবে ধরে আছে এ চেষ্টা বৃথা। তিতলির কোমল শরীর ক্রমশ সহ্যাতীত উষ্ণতা ছড়াচ্ছে। কী কান্ড, একজন মায়াবী নারী এমন করে ধরে থাকলে চারপাশটা বুঝি এমন বদলে যায়! এ কুৎসিত গ্রহটা তখন কী এমনই মায়াবী, অসাধারণ মনে হয়! এর নাম তাহলে ভালবাসা! কল্লোল ঢোক গিলে বলল, ‘ছাড়ো-ছাড়ো।’
‘না।’
‘কী সব কান্ড, লোকজন দেখলে কী ভাববে! ’
‘ভাবুক, প্রমিজ করো, এমন করে কখ-খনও বলবে না।’
‘তুমি যে ওভাবে বললে এতে বুঝি দোষ হয় না। আমার রাগ হতে নেই?'
‘তুমি অন্য মেয়েদের দিকে তাকিয়ে থাক। মেয়েদের হাতের ঘড়ি দেখে সময় জেনে নাও।’
‘পাগল, এই ব্যাপার তাহলে! ঠিক আছে আর তাকাব না। এখন ছাড় তো।’
‘ছাড়ব না, কি করবে তুমি?’
‘বেশ, কিন্তু তোমার ইয়ে যে চ্যাপ্টা হচ্ছে সে খেয়াল আছে।’
তিতলি তীব্র গতিতে সরে গেল, ‘তুমি একটা ছোটলোক কল্লোল, তোমার মনে কু আছে ।’
কল্লোল ছদ্ম নিঃশ্বাস ফেলল, ‘আহ, ছোটলোক হতে পারলে বেশ হত। কী নির্বোধ আমি।'
‘ছি, কী নোংরা করে কথা বল, অসভ্য।’
অনেকক্ষণ পর কল্লোল থেমে থেমে বলল, 'তোমাকে যেটা প্রাণপণ চেষ্টায় বুঝাতে পারছি না। সেটা হচ্ছে, যেটা তুমি বুঝেও বুঝতে চাচ্ছ না। আমাদের এভাবে মেলামেশার কোন অর্থ হয় না। আমরা দু’জন দু’ভূবনের বাসিন্দা। আমি শালা সব বুঝেও তোমাকে এড়াতে আপ্রাণ চেষ্টা করেও পারি না। খুব রাগ হয়, আমার জীবনটা এলোমেলো করে দিলে অযথাই। তিতলি আমরা কি পারি না পরস্পরকে ভুলে যেতে, অন্তত চেষ্টা করতে তো দোষ নেই। আমরা যদি -।’
কল্লোলের কথা শেষ হল না তিতলি হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ওর শার্ট ধরে প্রবল বেগে ঝাঁকাচ্ছে। দু’হাতে মুখ ঢেকে ফেলল। যখন মুখ তুলল কল্লোলের অন্যরকম কষ্ট হতে থাকল। বড় বড় চোখ করে কী এক ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে, এ চোখকেই কি শরবতী চোখ বলে? কী টলটলে এর চোখ- বিষন্ন, মায়াভরা!
তিতলি নিস্তেজ গলায় বলল, ‘আমার অসৎ বাবার অঢেল টাকা আছে এটাই কি আমার অপরাধ, অযোগ্যতার মাপকাঠি। শুধুমাত্র এ জন্য তুমি আমাকে বলতে চাইছ, এ গ্রহের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটার হাত ছেড়ে দিতে? দিনে একশোবার ভালবাসি ভালবাসি বললেই ভালবাসা হয়, নইলে হয় না?’
কল্লোল স্তব্ধমুখে বসে রইল। তিতলির এ জটিল প্রশ্নের উত্তর কি হয় কে জানে!
*তিতলি তুমিও: ১
বিভাগ
তিতলি তুমিও
Thursday, April 1, 2010
তিতলি তুমিও: ১
বাবার এ গাড়িটা তিতলীর খুব পছন্দ। ঝড়ের গতিতে চালালেও চলে পানির মতো, বাড়তি কোনো শব্দ নেই। ঢাকায় এখন অনেক মেয়েই গাড়ি চালায় তবুও লোকজন ড্যাবড্যাব চোখে তাকায় কেন কে জানে!
ওর মন অসম্ভব খারাপ। কেমন দমবদ্ধ ভাব হচ্ছে, ভাইয়া যে ওকে চড় মারল এ জন্যে না। ওদের পরিবারটা একটা অস্বাভাবিক পরিবার। সবাই যেন একেকটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপ, একাকী। কারো সঙ্গে কারো প্রাণের যোগ নেই। মা’র থাকা না থাকা সমান। চিররুগ্না এই মহিলা বিছানা থেকে উঠতেই পারেন না। বিজয়নগরে এসে স্পীড কমাতে বাধ্য হল। ঢাকায় এই এক মহা সমস্যা। গাড়ি চালিয়েও সুখ নেই। স্পীড কমতে কমতে শূণ্যের কোঠায় এসে ঠেকেছে। যথারীতি ট্রাফিক জ্যাম, রাগে হাত কামড়াতে ইচ্ছা করছে। গাড়ি এখানে ফেলে হেঁটে যেতে পারলে বেশ হত। এ অচিন্তনীয়, বাবা জ্যান্ত পুঁতে ফেলবেন।
সামনের ট্রাকটার পেছনে লেখা, একশো হাত দূরে থাকুন অথচ সাফারী নাক ঠেকিয়ে আছে। এইসব লেখা সম্ভবত নিয়ম হয়ে গেছে। একশো হাত দূরত্বে থাকতে হলে তো বাংলাদেশের জন্য পুরো এশিয়া লেগে যাবে। একবার বাসে উঠেছিল, নানা উপদেশ: বেবোহারে ভংশের পরিচয়, পকেট সাবদান, আপনার অভিযুগ চালককে বলুন। মজার ব্যাপার হল, চালক বাবাজী একের পর এক সিগারেট টেনে বাস অন্ধকার করে ফেলছিল।
তিতলী ফিক করে হেসে ফেলল। বাঁ পাশের ট্রাকটার ফুয়েল ট্যাঙ্কারে জ্বলজ্বল করছে: জন্ম থেকে জ্বলছি, মাগো। প্রচুর ট্রাকের গায়ে দেখেছে: আমাকে কিছু খেতে দিন। আরেক দিন এক ট্রাকের গায়ে দেখেছিল: আপনিও বাঁচুন, আমাকেও বাঁচতে দিন। যন্ত্রদানবের গায়ে কী বুদ্ধিদীপ্ত মন্তব্য!
ওয়ারী পৌঁছতে কতক্ষণ লাগবে কে জানে! ও এখন যাচ্ছে জাকিয়ার বাড়িতে। জাকিয়া ওর একমাত্র মেয়ে বন্ধু। একসঙ্গে অনার্স করছে। কী চমৎকার একটা মেয়ে, কখনও মলিন মুখ দেখে নি। হাজার জটিলতায়ও দেখেছে হেসে কুটি কুটি হতে।
জাকিয়াদের ছোট গেট দিয়ে খুব কায়দা করে গাড়ি ঢোকাতে হল। জাকিয়া বাগানে ফুলের চারা লাগাচ্ছিল। ধুলো কাদায় মাখামাখি হয়েও হাসি একটু মলিন হয়নি। এর ভাব দেখে মনে হচ্ছে ঝাঁ ঝাঁ রোদ্দুরে কঠিন পরিশ্রম করা জলভাত। জাকিয়াকে এ মুহুর্তে দেখে ওর মন আরও বিষণ্ন হলো। কী সুখী একটা মেয়ে! বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করে না পৃথিবীর কোনো মালিন্য একে ছুঁতে পারে।
জাকিয়া মাথা সজোরে ঝাঁকিয়ে কপাল থেকে ঝাঁকড়া চুল সরাল। চারদিক আলো করে বলল, ‘ওমা, কী কান্ড, তুই, আয়-আয়। মোড়াটা টেনে বোস, না-কী চেয়ার এনে দেব।’
তিতলীর চোখ অজান্তেই ডবডবে, ‘প্লিজ জাকিয়া, তুই অন্তত আমার সঙ্গে এমন করিস না।’
জাকিয়ার বিস্ময়ের সীমা রইল না। তাড়াহুড়ো করে এগিয়ে তিতলীকে জড়িয়ে ধরল। গলায় সমস্ত মায়া ঢেলে বলল, ‘এ্যাই পাগল, ঠাট্টা করলাম, বন্ধুর সঙ্গে ঠাট্টাও করতে পারব না। তবুও আমি সরি, খুব সরি। তারপরও রাগ না কমলে আয় আমরা চুলোচুলি করি। ভয় পাস নে, আমার দু’হাত পেছনে বাঁধা থাকবে।’
পরক্ষণেই ছিটকে সরে গেল। আধ হাত জিব বের করে বলল, ‘হায়-হায়, মাটি লাগিয়ে তোর সুন্দর ড্রেসটা নোংরা করে দিলাম।’
‘দিয়েছিস, বেশ করেছিস।’
জাকিয়া কচলে কচলে হাতের মাটি ধুয়ে মোড়া টেনে বসল, ‘তোর আজ খুব মন খারাপ, না?’
‘হুঁ।’
‘হয়েছে কী?’
‘জানি না, জাকিয়া, আসলেই জানি না। কিচ্ছু ভাল্লাগে না। আমার মরে যেতে ইচ্ছা করে। কোথাও কোনো আনন্দ নাই, বাড়ির অবস্থা তো জানিস।’
‘পাগল না-কী, কি সব বলছিস।’
তিতলির মাথা নিচু হতে হতে হাঁটুতে ঠেকেছে। প্রাণপণ চেষ্টা করছে চোখের জল আটকাতে। জাকিয়ার উপর খুব রাগও হচ্ছে। এ মেয়েটার নিজের জীবনে কোনো সমস্যা নেই বলে এর ধারণা পৃথিবী নামের এ গ্রহটায় কারো কোন সমস্যা নেই।
জাকিয়া আলতো করে তিতলীর মাথায় হাত রেখে স্থির বিশ্বাসে বলল, ‘অসাধারণ কোনো ছেলের সঙ্গে যখন তোর পরিচয় হবে, দেখবি চারপাশ কী মায়াবীই না মনে হচ্ছে।’
তিতলি চোখ মুছে সোজা হল, ‘তুই খুঁজে পেয়েছিস মনে হচ্ছে?’
‘ইশ্শ্, হিংসুক।’
‘এ দেশে সব পাওয়া যায়। অসাধারণ ছেলে কোথায় পাওয়া যায়, বল। তুই-ই দে না একটা খুঁজে?’
‘আরে, এ বলে কী, এটা কী আলু-পটল, বাজার থেকে খুঁজে এনে দেব? এ্যাই, কিছু খাবি? বেশি করে পেঁয়াজ মরিচ দিয়ে মুড়ি বানাই।’
‘জলদি-জলদি।’
জাকিয়া জামবাটিতে মুড়ি বানিয়ে নিয়ে এসেছে। পেঁয়াজের ঝাঁঝে ওর টলটলে চোখ থেকে পানি গড়াচ্ছে। হাতের উল্টো পিঠে চোখ মুছে হাসতে হাসতে বলল, ‘বাবাকে দিয়ে এলাম এক বাটি। বাবা কী বলল জানিস? ইয়ে, জাকিয়া, তোর বন্ধুর সঙ্গে তুইও কী মুড়ি খাবি? না খেলে, তোর দাঁতগুলো একটু দিয়ে যা, আরাম করে মুড়ি খাই। হি হি হি। বাবাকে নিয়ে কী যন্ত্রণা, সারাটা দিন হাসিয়ে মারে!’
নিজের বাবার কথা মনে করে তিতলি দীর্ঘশ্বাস চাপল। রিটায়ার্ড জজ জাকিয়ার বাবাটা কী প্রাণবন্ত, এখনও হাসেন শিশুর মতো করে। এ সংসারে মাত্র দু’জন লোক। তিতলি একবার জাকিয়াকে জিজ্ঞেস করেছিল: হ্যাঁ রে, তোর বাবার কোন জিনিসটা তোর খারাপ লাগে?
জাকিয়া অনেকক্ষণ ভেবে বলেছিল: বাবা কাক-কোকিলের দরে বাজার করেন।
কী রকম?
ওই আর কী, সবাই বাবাকে ঠকায়।
ওদিন তিতলিকে উঠে যেতে দেখে জাকিয়ার বাবা ছদ্ম রাগে বলেছিলেন: এই যে, ইয়াং মেয়ে, চলে যাচ্ছ যে বড়, আমার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছা করছে না বুঝি? ওহ-হো, তুমি বুঝি আমার রূপালী চুল দেখে ধন্ধে পড়ে গেছ। শোনো, চুলের গল্পটা তোমায় বলি। এক রাতে ভয়াবহ এক স্বপ্ন দেখলাম।
বুঝলে, স্পষ্ট দেখলাম, জাকিয়ার মা খাটে বসে প্রবল বেগে পা নাচাচ্ছে। আমি তো ভয়ে কাঠ। ভয় চেপে কাঠ-কাঠ গলায় বললাম, জাকিয়ার মা, যাও তো, এমন বুড়ো একটা মানুষের মাঝ রাতে ঘুম ভাঙানো ঠিক না।
জাকিয়ার মা নাকি ঘুরে বলল, ইঃ, এক রাতের ঘুমের সমস্যায় মরে যাচ্ছে। আমি যে কতো কাল ঘুমাই না তা বুঝি কিছু না। আর তোমার শরীরে কী বিকট গন্ধ, আজকাল বিড়ি ধরেছ না কি! আসো আমার কাছে, বিড়ি খাওয়া বের করছি। বুঝলে ইয়াং মেয়ে, ভোর বেলায় উঠে দেখি ভয়ে আমার সব চুল ধবধবে সাদা। হা হা হা।
তিতলি ওদিন আন্তরিক ভাবে বলেছিল: চাচা আপনার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বললে মনটা অসম্ভব ভালো হয়ে যায়।
জাকিয়া কেমন কুচুর-মুচুর করে মুড়ি চিবুচ্ছে। মুখ ভরা মুড়ির দলা নিয়ে জড়িয়ে জড়িয়ে বলল, ‘তিতলী, ওদিন বাবা কী বলল জানিস? ইয়ে জাকিয়া, তোর জন্য এবার তাহলে ছেলে-টেলে দেখতে হয়। বল দেখি কী লজ্জা। আমি মুখ-টুখ লাল করে বললাম, যা-ও বাবা, তুমি বড়ো ফাজিল।
না-না, তোর একটা পছন্দ-অপছন্দ আছে না, বাবা ঝকমকে চোখে বলছিলেন।
আমি তোমাকে ছেড়ে কোত্থাও যাব না।
বাবার হাল ছেড়ে দেয়ার কোনো লক্ষণই নেই, জানি-জানি, এসব তোদের বলতে হয়। বিয়ের আগে তোর মাও বলেছিল, তুই বললি, তোর মেয়েও বলবে। আমি পালিয়ে যেতে চাইলাম, বাবা নিমিষে আমার হাত ধরে ফেললেন। আমি বাবার হাত থেকে বাঁচার জন্য বললাম, আচ্ছা যাও বাবা, তোমার পছন্দই আমার পছন্দ।
তাই? আমার যে বুড়োদের বড়ো পছন্দ। বাবার কী হাসি, একটা শিশুও লজ্জা পেয়ে যাবে।
তিতলির মনে হচ্ছে ঝালের তীব্রতায় চোখ কোটর ছেড়ে টুপ করে বাটিতে পড়বে। মুখ হাঁ করে লম্বা লম্বা শ্বাস নিচ্ছে। জাকিয়া ভয় পেয়ে গেল, ‘কী রে, খুব ঝাল?'
তিতলী একটু ধাতস্ত হয়ে বলল, ‘হুঁ।’
‘তুই কি একেবারেই ঝাল খাস না?’
‘হুঁ। শোন, বললে বিশ্বাস করবি না, আমাদের বাসায় কল্লোল ভাই একদিন আট-দশটা কাঁচা মরিচ কচকচ করে চিবিয়ে খেয়ে ফেলল। আমি একটার এক কোনায় কামড় দিয়েছিলাম। মাগো, কী ঝাল!’
জাকিয়া মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে ছিল। এ মুহুর্তে তিতলির মুখখানা কেমন ঢলঢল করছে, চোখ কী কমনীয়! জাকিয়া বিস্ময় চেপে বলল, ‘কল্লোল ভাইটা কে?’
‘অ, তুই তো চিনিস না। ভাইয়ার বন্ধু, গাধার গাধা একটা। ওদিন ট্রাফিক জ্যামে আটকে বিরক্ত হচ্ছি। অলস ভঙ্গিতে এদিক ওদিক তাকাচ্ছি। পেছনের রিকশায় দেখি কল্লোল ভাই। পাশের রিকশায় কী চমৎকার একটা মেয়ে, আমারই চোখ ফিরিয়ে নিতে কষ্ট হচ্ছিল। অথচ কল্লোল ভাই একবার তাকিয়ে মাথা নিচু করে বসে রইল। দ্বিতীয়বার ভুলেও তাকাল না। কী গাধা, বল দেখি।’
‘ছি, তিতলী, ভাইয়ের বন্ধুকে কেউ এভাবে বলে!’
‘বলব, একশোবার বলব। লোচ্চা মার্কা ছেলে দেখে দেখে চোখ পচে গেছে, কী যে রাগ হয় জানিস। একদিন ভাইয়ার খোঁজে বাসায় এলো। ভাইয়া ছিল না। কল্লোল ভাই সোফায় গা এলিয়ে বসে ছিল। আমাকে দেখে লাফ মেরে উঠে দাঁড়াল। আমি তো হতবাক। সামলে নিয়ে বললাম: প্লিজ কল্লোল ভাই বসুন, আমি তো আপনার অনেক ছোট।
কল্লোল ভাই লাজুক হাসলেন: আফটার অল তুমি মেয়ে, একজন লেডিকে সম্মান দেখাব না? আমি গল্প করার জন্য পাশে বসতেই মিছে ছল করে পাঁচ হাত দূরে সোফায় বসলেন। এমন মেজাজ খারাপ হল। চোখ মুখ শক্ত করে বললাম: কল্লোল ভাই, আপনার কী ধারণা আমার কুষ্ঠ রোগ আছে?’
জাকিয়া ফিচেল হাসি গোপন করার চেষ্টা করছে দেখে তিতলি চিড়বিড় করে বলল, ‘ষ্টুপিড, হাসছিস যে?’
জাকিয়া বুয়ার হাত থেকে চা’র কাপ নামাতে নামাতে যথাসম্ভব গম্ভীর মুখ করে বলল, ‘এখন কিন্তু আমি তোকে অসাধারণ একটা ছেলের খোঁজ দিতে পারি। ছেলেটার নাম হচ্ছে, কুমড়া, সরি, কল-।’
তিতলী চোখের পলকে জাকিয়ার চুল ধরে ফেলল।...
ওর মন অসম্ভব খারাপ। কেমন দমবদ্ধ ভাব হচ্ছে, ভাইয়া যে ওকে চড় মারল এ জন্যে না। ওদের পরিবারটা একটা অস্বাভাবিক পরিবার। সবাই যেন একেকটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপ, একাকী। কারো সঙ্গে কারো প্রাণের যোগ নেই। মা’র থাকা না থাকা সমান। চিররুগ্না এই মহিলা বিছানা থেকে উঠতেই পারেন না। বিজয়নগরে এসে স্পীড কমাতে বাধ্য হল। ঢাকায় এই এক মহা সমস্যা। গাড়ি চালিয়েও সুখ নেই। স্পীড কমতে কমতে শূণ্যের কোঠায় এসে ঠেকেছে। যথারীতি ট্রাফিক জ্যাম, রাগে হাত কামড়াতে ইচ্ছা করছে। গাড়ি এখানে ফেলে হেঁটে যেতে পারলে বেশ হত। এ অচিন্তনীয়, বাবা জ্যান্ত পুঁতে ফেলবেন।
সামনের ট্রাকটার পেছনে লেখা, একশো হাত দূরে থাকুন অথচ সাফারী নাক ঠেকিয়ে আছে। এইসব লেখা সম্ভবত নিয়ম হয়ে গেছে। একশো হাত দূরত্বে থাকতে হলে তো বাংলাদেশের জন্য পুরো এশিয়া লেগে যাবে। একবার বাসে উঠেছিল, নানা উপদেশ: বেবোহারে ভংশের পরিচয়, পকেট সাবদান, আপনার অভিযুগ চালককে বলুন। মজার ব্যাপার হল, চালক বাবাজী একের পর এক সিগারেট টেনে বাস অন্ধকার করে ফেলছিল।
তিতলী ফিক করে হেসে ফেলল। বাঁ পাশের ট্রাকটার ফুয়েল ট্যাঙ্কারে জ্বলজ্বল করছে: জন্ম থেকে জ্বলছি, মাগো। প্রচুর ট্রাকের গায়ে দেখেছে: আমাকে কিছু খেতে দিন। আরেক দিন এক ট্রাকের গায়ে দেখেছিল: আপনিও বাঁচুন, আমাকেও বাঁচতে দিন। যন্ত্রদানবের গায়ে কী বুদ্ধিদীপ্ত মন্তব্য!
ওয়ারী পৌঁছতে কতক্ষণ লাগবে কে জানে! ও এখন যাচ্ছে জাকিয়ার বাড়িতে। জাকিয়া ওর একমাত্র মেয়ে বন্ধু। একসঙ্গে অনার্স করছে। কী চমৎকার একটা মেয়ে, কখনও মলিন মুখ দেখে নি। হাজার জটিলতায়ও দেখেছে হেসে কুটি কুটি হতে।
জাকিয়াদের ছোট গেট দিয়ে খুব কায়দা করে গাড়ি ঢোকাতে হল। জাকিয়া বাগানে ফুলের চারা লাগাচ্ছিল। ধুলো কাদায় মাখামাখি হয়েও হাসি একটু মলিন হয়নি। এর ভাব দেখে মনে হচ্ছে ঝাঁ ঝাঁ রোদ্দুরে কঠিন পরিশ্রম করা জলভাত। জাকিয়াকে এ মুহুর্তে দেখে ওর মন আরও বিষণ্ন হলো। কী সুখী একটা মেয়ে! বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করে না পৃথিবীর কোনো মালিন্য একে ছুঁতে পারে।
জাকিয়া মাথা সজোরে ঝাঁকিয়ে কপাল থেকে ঝাঁকড়া চুল সরাল। চারদিক আলো করে বলল, ‘ওমা, কী কান্ড, তুই, আয়-আয়। মোড়াটা টেনে বোস, না-কী চেয়ার এনে দেব।’
তিতলীর চোখ অজান্তেই ডবডবে, ‘প্লিজ জাকিয়া, তুই অন্তত আমার সঙ্গে এমন করিস না।’
জাকিয়ার বিস্ময়ের সীমা রইল না। তাড়াহুড়ো করে এগিয়ে তিতলীকে জড়িয়ে ধরল। গলায় সমস্ত মায়া ঢেলে বলল, ‘এ্যাই পাগল, ঠাট্টা করলাম, বন্ধুর সঙ্গে ঠাট্টাও করতে পারব না। তবুও আমি সরি, খুব সরি। তারপরও রাগ না কমলে আয় আমরা চুলোচুলি করি। ভয় পাস নে, আমার দু’হাত পেছনে বাঁধা থাকবে।’
পরক্ষণেই ছিটকে সরে গেল। আধ হাত জিব বের করে বলল, ‘হায়-হায়, মাটি লাগিয়ে তোর সুন্দর ড্রেসটা নোংরা করে দিলাম।’
‘দিয়েছিস, বেশ করেছিস।’
জাকিয়া কচলে কচলে হাতের মাটি ধুয়ে মোড়া টেনে বসল, ‘তোর আজ খুব মন খারাপ, না?’
‘হুঁ।’
‘হয়েছে কী?’
‘জানি না, জাকিয়া, আসলেই জানি না। কিচ্ছু ভাল্লাগে না। আমার মরে যেতে ইচ্ছা করে। কোথাও কোনো আনন্দ নাই, বাড়ির অবস্থা তো জানিস।’
‘পাগল না-কী, কি সব বলছিস।’
তিতলির মাথা নিচু হতে হতে হাঁটুতে ঠেকেছে। প্রাণপণ চেষ্টা করছে চোখের জল আটকাতে। জাকিয়ার উপর খুব রাগও হচ্ছে। এ মেয়েটার নিজের জীবনে কোনো সমস্যা নেই বলে এর ধারণা পৃথিবী নামের এ গ্রহটায় কারো কোন সমস্যা নেই।
জাকিয়া আলতো করে তিতলীর মাথায় হাত রেখে স্থির বিশ্বাসে বলল, ‘অসাধারণ কোনো ছেলের সঙ্গে যখন তোর পরিচয় হবে, দেখবি চারপাশ কী মায়াবীই না মনে হচ্ছে।’
তিতলি চোখ মুছে সোজা হল, ‘তুই খুঁজে পেয়েছিস মনে হচ্ছে?’
‘ইশ্শ্, হিংসুক।’
‘এ দেশে সব পাওয়া যায়। অসাধারণ ছেলে কোথায় পাওয়া যায়, বল। তুই-ই দে না একটা খুঁজে?’
‘আরে, এ বলে কী, এটা কী আলু-পটল, বাজার থেকে খুঁজে এনে দেব? এ্যাই, কিছু খাবি? বেশি করে পেঁয়াজ মরিচ দিয়ে মুড়ি বানাই।’
‘জলদি-জলদি।’
জাকিয়া জামবাটিতে মুড়ি বানিয়ে নিয়ে এসেছে। পেঁয়াজের ঝাঁঝে ওর টলটলে চোখ থেকে পানি গড়াচ্ছে। হাতের উল্টো পিঠে চোখ মুছে হাসতে হাসতে বলল, ‘বাবাকে দিয়ে এলাম এক বাটি। বাবা কী বলল জানিস? ইয়ে, জাকিয়া, তোর বন্ধুর সঙ্গে তুইও কী মুড়ি খাবি? না খেলে, তোর দাঁতগুলো একটু দিয়ে যা, আরাম করে মুড়ি খাই। হি হি হি। বাবাকে নিয়ে কী যন্ত্রণা, সারাটা দিন হাসিয়ে মারে!’
নিজের বাবার কথা মনে করে তিতলি দীর্ঘশ্বাস চাপল। রিটায়ার্ড জজ জাকিয়ার বাবাটা কী প্রাণবন্ত, এখনও হাসেন শিশুর মতো করে। এ সংসারে মাত্র দু’জন লোক। তিতলি একবার জাকিয়াকে জিজ্ঞেস করেছিল: হ্যাঁ রে, তোর বাবার কোন জিনিসটা তোর খারাপ লাগে?
জাকিয়া অনেকক্ষণ ভেবে বলেছিল: বাবা কাক-কোকিলের দরে বাজার করেন।
কী রকম?
ওই আর কী, সবাই বাবাকে ঠকায়।
ওদিন তিতলিকে উঠে যেতে দেখে জাকিয়ার বাবা ছদ্ম রাগে বলেছিলেন: এই যে, ইয়াং মেয়ে, চলে যাচ্ছ যে বড়, আমার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছা করছে না বুঝি? ওহ-হো, তুমি বুঝি আমার রূপালী চুল দেখে ধন্ধে পড়ে গেছ। শোনো, চুলের গল্পটা তোমায় বলি। এক রাতে ভয়াবহ এক স্বপ্ন দেখলাম।
বুঝলে, স্পষ্ট দেখলাম, জাকিয়ার মা খাটে বসে প্রবল বেগে পা নাচাচ্ছে। আমি তো ভয়ে কাঠ। ভয় চেপে কাঠ-কাঠ গলায় বললাম, জাকিয়ার মা, যাও তো, এমন বুড়ো একটা মানুষের মাঝ রাতে ঘুম ভাঙানো ঠিক না।
জাকিয়ার মা নাকি ঘুরে বলল, ইঃ, এক রাতের ঘুমের সমস্যায় মরে যাচ্ছে। আমি যে কতো কাল ঘুমাই না তা বুঝি কিছু না। আর তোমার শরীরে কী বিকট গন্ধ, আজকাল বিড়ি ধরেছ না কি! আসো আমার কাছে, বিড়ি খাওয়া বের করছি। বুঝলে ইয়াং মেয়ে, ভোর বেলায় উঠে দেখি ভয়ে আমার সব চুল ধবধবে সাদা। হা হা হা।
তিতলি ওদিন আন্তরিক ভাবে বলেছিল: চাচা আপনার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বললে মনটা অসম্ভব ভালো হয়ে যায়।
জাকিয়া কেমন কুচুর-মুচুর করে মুড়ি চিবুচ্ছে। মুখ ভরা মুড়ির দলা নিয়ে জড়িয়ে জড়িয়ে বলল, ‘তিতলী, ওদিন বাবা কী বলল জানিস? ইয়ে জাকিয়া, তোর জন্য এবার তাহলে ছেলে-টেলে দেখতে হয়। বল দেখি কী লজ্জা। আমি মুখ-টুখ লাল করে বললাম, যা-ও বাবা, তুমি বড়ো ফাজিল।
না-না, তোর একটা পছন্দ-অপছন্দ আছে না, বাবা ঝকমকে চোখে বলছিলেন।
আমি তোমাকে ছেড়ে কোত্থাও যাব না।
বাবার হাল ছেড়ে দেয়ার কোনো লক্ষণই নেই, জানি-জানি, এসব তোদের বলতে হয়। বিয়ের আগে তোর মাও বলেছিল, তুই বললি, তোর মেয়েও বলবে। আমি পালিয়ে যেতে চাইলাম, বাবা নিমিষে আমার হাত ধরে ফেললেন। আমি বাবার হাত থেকে বাঁচার জন্য বললাম, আচ্ছা যাও বাবা, তোমার পছন্দই আমার পছন্দ।
তাই? আমার যে বুড়োদের বড়ো পছন্দ। বাবার কী হাসি, একটা শিশুও লজ্জা পেয়ে যাবে।
তিতলির মনে হচ্ছে ঝালের তীব্রতায় চোখ কোটর ছেড়ে টুপ করে বাটিতে পড়বে। মুখ হাঁ করে লম্বা লম্বা শ্বাস নিচ্ছে। জাকিয়া ভয় পেয়ে গেল, ‘কী রে, খুব ঝাল?'
তিতলী একটু ধাতস্ত হয়ে বলল, ‘হুঁ।’
‘তুই কি একেবারেই ঝাল খাস না?’
‘হুঁ। শোন, বললে বিশ্বাস করবি না, আমাদের বাসায় কল্লোল ভাই একদিন আট-দশটা কাঁচা মরিচ কচকচ করে চিবিয়ে খেয়ে ফেলল। আমি একটার এক কোনায় কামড় দিয়েছিলাম। মাগো, কী ঝাল!’
জাকিয়া মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে ছিল। এ মুহুর্তে তিতলির মুখখানা কেমন ঢলঢল করছে, চোখ কী কমনীয়! জাকিয়া বিস্ময় চেপে বলল, ‘কল্লোল ভাইটা কে?’
‘অ, তুই তো চিনিস না। ভাইয়ার বন্ধু, গাধার গাধা একটা। ওদিন ট্রাফিক জ্যামে আটকে বিরক্ত হচ্ছি। অলস ভঙ্গিতে এদিক ওদিক তাকাচ্ছি। পেছনের রিকশায় দেখি কল্লোল ভাই। পাশের রিকশায় কী চমৎকার একটা মেয়ে, আমারই চোখ ফিরিয়ে নিতে কষ্ট হচ্ছিল। অথচ কল্লোল ভাই একবার তাকিয়ে মাথা নিচু করে বসে রইল। দ্বিতীয়বার ভুলেও তাকাল না। কী গাধা, বল দেখি।’
‘ছি, তিতলী, ভাইয়ের বন্ধুকে কেউ এভাবে বলে!’
‘বলব, একশোবার বলব। লোচ্চা মার্কা ছেলে দেখে দেখে চোখ পচে গেছে, কী যে রাগ হয় জানিস। একদিন ভাইয়ার খোঁজে বাসায় এলো। ভাইয়া ছিল না। কল্লোল ভাই সোফায় গা এলিয়ে বসে ছিল। আমাকে দেখে লাফ মেরে উঠে দাঁড়াল। আমি তো হতবাক। সামলে নিয়ে বললাম: প্লিজ কল্লোল ভাই বসুন, আমি তো আপনার অনেক ছোট।
কল্লোল ভাই লাজুক হাসলেন: আফটার অল তুমি মেয়ে, একজন লেডিকে সম্মান দেখাব না? আমি গল্প করার জন্য পাশে বসতেই মিছে ছল করে পাঁচ হাত দূরে সোফায় বসলেন। এমন মেজাজ খারাপ হল। চোখ মুখ শক্ত করে বললাম: কল্লোল ভাই, আপনার কী ধারণা আমার কুষ্ঠ রোগ আছে?’
জাকিয়া ফিচেল হাসি গোপন করার চেষ্টা করছে দেখে তিতলি চিড়বিড় করে বলল, ‘ষ্টুপিড, হাসছিস যে?’
জাকিয়া বুয়ার হাত থেকে চা’র কাপ নামাতে নামাতে যথাসম্ভব গম্ভীর মুখ করে বলল, ‘এখন কিন্তু আমি তোকে অসাধারণ একটা ছেলের খোঁজ দিতে পারি। ছেলেটার নাম হচ্ছে, কুমড়া, সরি, কল-।’
তিতলী চোখের পলকে জাকিয়ার চুল ধরে ফেলল।...
বিভাগ
তিতলি তুমিও
Sunday, March 14, 2010
শৈশব!
নঈম সাহেব দোকানে বসে খুশি মনে পান চিবুচ্ছেন। এ ক-দিন ওঁর মনে ভারী আনন্দ! কনফেকশনারীর ব্যবসাটা এখন জমজমাট। দু’জন মিলেও বিক্রি করে কূল পাওয়া যাচ্ছে না। পাশেই বেশ কটা বাচ্চাদের স্কুল চালু হয়েছে। টিফিন টাইমে বাচ্চারা সব সাফ করে দিচ্ছে। পেটিস, সিঙ্গারা এইসব আবার বিকেলে কিনে আনতে হচ্ছে। ওদিন বেশ ক’টা সিঙ্গারা থেঁতলে গিয়েছিল, কাঁচের বাক্সের এক কোনায় পড়ে ছিল।
ছোট একটা ছেলে কী চমৎকার করেই না বলল: কাকু, একটা সিঙ্গারা দেন তো।
নাঈম সাহেব লজ্জিত হয়ে বলেছিলেন: সিঙ্গারা তো নাই খোকা।
ওই তো, দেন না, কাকু।
ওগুলো ভেঙ্গে গেছে, খাওয়া যাবে না যে।
কিছু হবে না। দেন না, খুব খিদে লেগেছে।
তিনি সীমাহীন বিব্রত হয়ে যতটুকু সম্ভব টিপেটুপে ঠিক করে দিলেন। মুখ মুছে ছেলেটি টাকা দিলে হাঁ হাঁ করে উঠেছিলেন: ওকি, টাকা কেন।
কাকু সিঙ্গারার দাম নিবেন তো।
না-না, ঠিক আছে। ওগুলো এমনিতেই ফেলে দিতাম।
ফেলে দিলে অন্য কথা। আমি খেয়েছি, টাকা দিতে হবে না বুঝি।
ছি-ছি, টাকা লাগবে না।
উহুঁ, মা বলেন কিছু খেলে টাকা দিতে হয়।
তোমার মা বলেছেন বুঝি, ঠিক বলেছেন। আচ্ছা তুমি অন্য দিন দিয়ো।
উহুঁ-উহুঁ, আজ নিতে হবে।
নঈম সাহেব অপার বিষ্ময়ে শিশুটির দিকে তাকিয়েছিলেন। ওঁর চোখ থেকে মুগ্ধতা চুঁইয়ে পড়ছিল। এখনকার শিশুরা কী সৎ, অমায়িকই না হচ্ছে। ওঁর ছেলেবেলার কথা মনে করে হাসলেন। তখন ফোর-ফাইভে পড়েন। এক দোকান থেকে আধসের জিলাপী কিনলেন।
দোকানি বলেছিল: খোকা বাবু পয়সা দেও।
তিনি ডাহা মিথ্যা বললেন, কি বলেন, পয়সা না দিলাম!
হই হই-এ লোক জমে গেল। সবাই দোকানিকে বকা দিল। জলিল মিঞা তোমার কী মাথা খারাপ। এই দুধের শিশু মিথ্যা বলবে, এরা হল ফেরেশতার জাত।
অন্য একজন বলল, জলিল, তোমাকে কতদিন নিষেধ করেছি দিনের বেলা গাঁজায় টান দেবে না।
জলিল মিঞা অসহ্য রাগে লাফিয়ে উঠেছিলেন: তাহলে-তাহলে, আমি কি মিথ্যা বলছি। হুলস্থূল কান্ড, বয়স্ক একলোক হাত উঠিয়ে সবাইকে থামতে বললেন, এই ছেলে, যাও, বাড়ি যাও। জলিল, কত হয়েছে, দাম আমি দেব।
জলিল মিঞা মুখ লম্বা করে বললেন: দাম লাগবো না।
এই ব্যাটা, দাম লাগবো না এটা এখন বলছিস কেন। এতক্ষণ তো আকাশ ফাটিয়ে ফেলছিলি।
নঈম সাহেব গুটিগুটি পায়ে সরে পড়ছিলেন। জলিল মিঞা পেছন থেকে চেঁচাতে থাকল: এ্যাই, এ্যাই পুলা, জিলাপীর পোটলা ফালাইয়া কই যাও।
নঈম সাহেব মহা সুখে জিলাপী চিবুতে চিবুতে বাবার সামনে পড়ে গেলেন। মুখ রসে মাখামাখি। বাবাকে এড়িয়ে গিয়েছিলেন প্রায়। একটুর জন্যে ধরা পড়ে গেলেন!
বাবা শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করেছিলেন, কি খাচ্ছিস?
জিলাপী।
পেলি কোথায়?
নঈম সাহেব ঝড়ের গতিতে চিন্তা করছিলেন। বাসার কেউ দিয়েছে এটা বলে পার পাওয়া যাবে না, সঙ্গে সঙ্গে ধরা পড়ে যাবেন। মাথায় যা এল তাই বললেন: একজন দিল।
বাবার এবার হিম গলা, এমনি দিল?
নঈম সাহেব বুঝতে পারছিলেন ফাঁদে পা দিচ্ছেন। তখন আর ফেরার উপায় নেই।
জ্বি।
হুম, যে দিল সে তোর কি লাগে, মামা-ফুফা-চাচা? বল, চুপ করে আছিস কেন?
এই মুহূর্তে আকাশের সমস্ত তারা ঝপ করে নঈম সাহেবের চোখে নেমে এসেছে। একেকটা তারার কী রঙের ছঁটা! জাড়িয়ে জড়িয়ে বললেন: জ্বি, এক দোকানী দিল। আমি নিতে চাই নি, জোর করে দিয়ে দিল। বলল, না নিলে খুব রাগ করবে।
বাবা চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, পয়সা না নিয়েই দিল?
জ্বি, বলল, না নিলে রাগ করবে।
আহা, তাহলে তো নিতেই হয় নইলে রাগ করবে যে। আয় আমিও আধ মন মাগনা জিলাপী নিয়ে আসি। চ-ল!
বাবা ঘাড় ধরে প্রায় উড়িয়ে নিয়ে চললেন। এখন কোন সংশয় নেই, পেটের জিলাপীগুলো বাবা বের করে ফেলবেন। এজন্য বাবাকে খানিকটা ফ্রিহ্যান্ড এক্সসারসাইজ করতে হবে। মাদ্রাসায় যা দোয়া-দরুদ শিখেছিলেন সব কয়েকবার রিভিশন দিয়ে ফেললেন। জলিল মিয়া নামের লোকটা অসম্ভব শান্ত গলায় বলেছিলেন: জ্বি, আমি দিছি।
বাবার তখন চন্ডাল রাগ: কেন, কেন দিলেন!
জলিল মিয়া বাবার চোখে চোখ রেখে বললেন, ছেলেপুলে নাই তো, মায়ায় পইড়া দিছি। ভুল হইছে, মাফ কইর্যা দেন।
ঠিক তখনি রোগামত কাল-কাল একটা ছেলে, দোকানের ভেতর থেকে উচুঁ গলায় বলল: বাজান, চুলা নিভাই ফেলমু।
জলিল মিয়ার রক্তশূন্য মুখ। বাবা হতভম্ব। টুঁ-শব্দও করলেন না। ঘোরলাগা ভঙ্গিতে জলিল মিঞাকে হাত বাড়িয়ে ছুঁলেন। বিড়বিড় করে কীসব বলতে থাকলেন।
একটা ভিক্ষুক গলা ফাটিয়ে ভিক্ষা চাচ্ছে। নঈম সাহেব কড়া কথা বলতে গিয়েও বললেন না। বয়স্ক অন্ধ একটা লোক, সঙ্গে মৌ’র বয়সী একটা মেয়ে। এই মেয়েটা ঠোঁট কী ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে। নঈম সাহেবের চোখ ভিজে এল, কী অনিশ্চিত একটা জীবন! এই শিশুটি অন্ধ লোকটার হাত ধরে কোথায় কোথায় ঘুরবে, কতদিন ঘুরবে? পাঁচটা টাকা দিলেন। মেয়েটি চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। সমস্ত মুখ কৃতজ্ঞতায় ভিজে আছে। আশ্চর্য, এর জীবনরেখার সীমা এই! মাত্র পাঁচ টাকা পেয়ে এ অন্য জগতের আনন্দ অনুভব করছে। মেয়েটা ভিক্ষে করতে বেরিয়েছে সম্ভবত খুব বেশিদিন হয় নি। বিস্মিত হওয়ার ক্ষমতা এর প্রবল।
নঈম সাহেব এইসব নিয়ে ভাবার সুযোগ পেলেন না। টিফিন টাইম হয়ে গেছে। শিশুরা দল বেঁধে কলকল করে ঢুকছে। একা হাঁপিয়ে উঠলেন। দোকানের ছেলেটা এত দেরি করছে আজ। কল্লোলকে ঢুকতে দেখে চোখ কপালে তুলে বললেন, ‘তুই।’
কল্লোল তেমন দোকানে আসে না। কল্লোল হাসিমুখে বলল, ‘কি বাবা, ঝামেলা। এরা দেখি বাজার জমিয়ে ফেলেছে।’
‘ছি, এইসব বলতে নেই। এরা খরিদ্দার, লক্ষী। হোক শিশু, আমরা যে খাবারটা খাই, পোশাকটা গায়ে দেই এতে এদের অবদান কম না।’
‘মাইগড, বাবা, তুমি দেখি একেবারে পাকা ব্যবসায়ীর মত কথা বলছ।’
‘তোদের ধারণা, ব্যবসায়ী মানেই অবজ্ঞার বিষয়, এটা ঠিক না। ব্যবসায়ী মানেই বুদ্ধিমান। এমন না হলে কেউ পিচ্ছিল টাকা আটকাতে পারে।’
‘সরি, বাবা। তুমি খালি কথার উল্টা অর্থ কর। ইয়ে বাবা, আমি তোমাকে সাহায্য করি?’
‘পাগল, তুই সাহায্য করবি, তুই! এক গ্লাস পানি ঢেলে খেতে পারিস না। এইসব পারবি না।’
‘ফুঃ, এটা কোন কাজ, শিশুরাও পারে।’
অল্পক্ষণেই দেখা গেল শিশুরা নঈম সাহেবকে পাত্তা দিচ্ছে না। যা বলার কল্লোলকেই বলছে, আংকেল এটা দেন, ওটা দেন, পানি দেন। একজন তো বলল, আংকেল দেখেন তো মুখে খাবার লেগে আছে কিনা।
কল্লোলের কী আনন্দই না হচ্ছে, বাবাকে খানিকটা সাহায্য করতে পেরে।
‘বাবা এখন থেকে আমি কিন্তু সময় পেলেই আসব।’
নঈম সাহেব আঁতকে উঠলেন, ‘না-না, তোর পড়াশোনার ক্ষতি হবে।’ কল্লোল কথা বাড়াল না। প্রায় রোজই দোকানে আসতে থাকল।
*পিতা ও পুত্র
বিভাগ
তিতলি তুমিও
Saturday, March 13, 2010
পিতা ও পুত্র
সোয়া এগারটা বাজে। নঈম সাহেব এখনও রাতের খাবার খাননি। ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে ভাবলেন, কল্লোল আজ কী দেরীই না করছে। ছেলেটা যে কোথায় কোথায় থাকে, কী খায়, কে জানে! ও বড় লক্ষী ছেলে।
অবশ্য এতে ওঁর নিজের অবদানও কম না। কিছু সূক্ষ্ণ চাল দেন। এই যে এখনও খাননি, একসঙ্গে খাবেন বলে অপেক্ষা করছেন। ও বিপন্ন বোধ করবে। ওর বিব্রত মুখ দেখতে ভালো লাগে। কল্লোলের মা সম্ভবত ঘুমিয়ে কাদা। মহিলা জীবনটা ভাজা ভাজা করে ফেলল। কিভাবে স্বামীকে অপদস্ত করা যাবে-নিচু দেখানো যাবে, এ ভাবনা ছাড়া এর মাথায় অন্য কিছুই খেলা করে না! অল্প কথায়, অসাধারণ রাঁধুনি এবং দুর্দান্ত ঝগড়া বিশারদ।
ওদিন কল্লোল খেতে বসে থু-থু করে বলেছিল: ডালে কী বিশ্রী গন্ধ, মুখে দেয়া যাচ্ছে না! ওয়াক!
ফাতেমা বেগম কঠিন ভঙ্গিতে বললেন: তোর বাবাকে নতুন একটা চশমা এনে দে।
মা কী বলছ-বলছি ডালে গন্ধ, তুমি বলছ চশমার কথা!
বেচারা, তোর বাবা এই চশমায় ভাল দেখতে পায় না। দশ বছরের পচা ডাল আগ্রহ করে কিনে নিয়ে এসেছে।
নাঈম সাহেব হা হা করে হেসে বলেছিলেন: চশমা ঠিকই আছে। ওই তো তোমার ভুরুর নিচে তিলটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি।
চুপ, আবার আহাম্মকের মতো ফ্যা-ফ্যা করে হাসে। পচা ডাল কিনেছ পয়সা বাঁচাতে, তুমি তো আবার ডাল খাও না। আসলে আমরা মরে যাই তাই চাও, ভেবেছ, আমি বুঝি না কিছু, না!
কল্লোলের মা, দয়া করে এখন আরাম করে খেতে দাও, কাল ডাল ফেরত দিয়ে আসব।
ফিরাফিরি পরের কথা, তুমি এ কান্ডটা কেন করলে?
কল্লোল লজ্জায় মরে যাচ্ছিল, মা ওর জন্যে হূলস্থুল কান্ড করছেন। তাছাড়া বাবা ডাল খান না কথাটা ঠিক না, খান, কম খান। মিনমিন করে বলল: বাদ দাও তো, মা।
বাদ দেব কেন, এই না বললি মুখে দেয়া যাচ্ছে না!
ভুল বলেছি, খেতে অসুবিধা হচ্ছে না।
বললেই হল, ওই ভাত সরিয়ে অন্য ভাত নে।
আঃ মা, লাগবে না।
উহুঁ, ওই ভাত সরিয়ে ফেল!
কল্লোল অল্পক্ষণ পলক না ফেলে মা’র দিকে তাকিয়ে পুরো ডালের বাটি নিজের পাতে ঢেলে দিল। প্লেট উঠিয়ে সুড়ুৎ সুড়ুৎ করে নির্বিকার ভঙ্গিতে খেতে লাগল। ফাতেমা বেগম হতবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলেন। নঈম সাহেব চোখ বড় বড় করে কল্লোলকে দেখার চেষ্টা করছিলেন। কল্লোলকে কেমন অস্পষ্ট-ঝাপসা দেখাচ্ছিল। ছেলেটা এমন পাগলু হয়ে কেন?
কলিং বেলের শব্দে চমকে উঠলেন। যাক, শেষ পর্যন্ত ফিরল! কল্লোল মাথা নিচু করে ঢুকে অস্ফুটে বলল,‘সরি বাবা, একটু দেরি হয়ে গেল।’
নঈম সাহেব নিঃশব্দে দরজা লাগালেন।
‘সরি বাবা।’
নঈম সাহেব চেষ্টাকৃত যথাসম্ভব গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘এক কথা দু’বার বলছিস কেন! কই, তোকে বকা দিয়েছি।’
‘বকাবকি করো না বলেই তো আরও খারাপ লাগে।’
‘আয় খেয়েনি।’
‘এসব কী বাবা, তুমি এখনও খাওনি!’
নঈম সাহেব খাবার টেবিলে বসে কল্লোলের প্লেটে ভাত বেড়ে অল্প ভাত নিজেও নিলেন। খাবার সব কেমন ঠান্ডা মেরে গেছে।
‘বাবা, এটা কিন্তু মোটেও ঠিক হচ্ছে না। এ বয়সে না খেয়ে বসে থাকো শুধু শুধু।’
‘এটা তুই এখন বুঝবি না, ছেলে-মেয়ের বাবা হলে তখন বুঝবি।’
কল্লোল বেসিনে সশব্দে নাক ঝাড়ল। নঈম সাহেব তীক্ষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। বলবেন না ভেবেও বললেন,‘এই-এই ছোকরা।’
‘কী, অ, এই ব্যপার নাক ঝাড়া!’
‘দেখ-দেখ কান্ড ছেলের, কী অবহেলা করে বলছে, অ-এই ব্যপার। মার্জিত আচরণ বলে একটা ব্যাপার আছে, না কি?’
‘হুঁহ, মার্জিত আচরণ আমাদের মতো হাভাতের! এসব দিয়ে কী করব!’
‘কীসব কথা, ভালো আচরণ কী কেবলমাত্র খুব পয়সাঅলাদেরই থাকবে! শোন, মজার একটা কথা বলি। এক লোক ট্রেনে মহা আনন্দে পান চিবুচ্ছে। যেখানে সেখানে পানের পিক ফেলে নোংরা করছে। এক ভদ্রলোক অনেকক্ষণ ধরে ব্যাপারটা লক্ষ করছিলেন। শেষ পর্যন্ত কড়া করে ধমক দিলেন। লোকটা নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল: গরীব মানুষ মাফ করে দেন। কী বুঝলি?’
‘গরীব হওয়া বড় লজ্জা, বড় কষ্ট, বাবা। এর চেয়ে জঘন্য কিছু এ পৃথিবীতে হতে পারে না।’
‘খুবই সত্য কথা কিন্তু তাই বলে তাইরে-নাইরে করে দিন কাটালে তো হবে না। আয়, খেতে আয়।’
কল্লোল চেয়ার টেনে বসল। ভাতে তরকারী মাখতে মাখতে বলল, ‘মৌ, মা, এরা কী সব ঘুমিয়ে গেছে?’
‘হুঁ, মৌ জেগে থাকতে চেয়েছিল। ন’টা থেকেই আমার কানের কাছে ঘেনঘেন করছিল, তুই এলে এক সঙ্গে খাবে বলে। তোর মা চড় দিয়ে ওর গালে আঙ্গুলের দাগ বসিয়ে দিল। তোর মা যে কী জিনিস, খারাপ ছাড়া ভালো কিছুই নেই।’
নঈম সাহেব চেষ্টা করেও গভীর শ্বাস আটকাতে পারলেন না। কল্লোল মুখ তুলে তাকাতেই বাবার সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে গেল। কেউই চাচ্ছিল না তাকাতাকির পর্বটা অন্তত এ মুহূর্তে হোক, তবুও হল। বাবার চোখ পানিতে ছাপাছাপি অবস্থা। কল্লোলের শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, কী করুণই না দেখাচ্ছে বাবাকে!
‘বাবা, প্লিজ মন খারাপ করো না, শেষে আমি কিন্তু কেঁদে ফেলব।’
নঈম সাহেব বিচিত্র উপায়ে নিমিষেই মুখ হাসি-হাসি করে ফেললেন। এখন কেউ দেখলে ভাববে এতোক্ষণ খুব হাসির কথা হচ্ছিল। যেন হাসির দমকে ওঁর চোখ খানিকটা ভিজে গেছে। বাবার নিয়ন্ত্রণ দেখে কল্লোল মুগ্ধ হল।
‘হ্যাঁ রে, কল্লোল, তোর পড়াশোনা, ইউনিভার্র্সিটির কথা বল।’
‘কি বলব, বলো। ভার্সিটি বছরে তিনশো পয়ষট্রি দিনে তিনশো দিন বন্ধ থাকে। চোখের সামনে মেধাবী ছেলেগুলো লাশ হয়ে যায়। কেউ কেউ কী নিষ্ঠুর ভঙ্গিতেই না বলে, আজ কটা কলাগাছ পড়ল? ওয়াল্লা, একটাও পড়ে নাই! ধুর, ছেলেগুলো সব একেকটা ভেবাগঙ্গারাম। পুলিশ দাঁড়িয়ে থাকে ফার্নিচারের মতো। রাজনৈতিক নেতা-নেত্রী নিহত ছাত্রের পরিবার-পরিজনকে ধরে কাঁদার মতো একটা ভাব করেন। ওই ছবি পরদিন দেশের প্রায় সমসত পত্রিকায় বিশাল আকারে ছাপা হয়। থু, এসবের কোনো মানে হয়, বাবা।’
নঈম সাহেব কাতর গলায় বললেন, ‘তোকে নিয়ে বড়ো ভয় রে, কল্লোল।’
কল্লোল হেলাফেলা ভাবে হাসল, ‘ফুঃ, গুলি লেগে লাশ হয়ে যাই কী না এ জন্যে?’
‘এভাবে বলিস না। আমি আর কয় দিন, বল। আমার পর মৌ, তোর মাকে তুইই তো দেখবি।’
‘বাবা, মার জন্যে তোমার এতো ভাবনা!’
‘বলিস কী পাগল, ত্রিশ বছর এক সঙ্গে ঘর করলাম! এ দীর্ঘ সময় কাঠের সঙ্গে থাকলেও তো মায়া পড়ে যায়, ও তো একটা মানুষ।’
কল্লোল এঁটো থালা একপাশে সরিয়ে বলল, ‘বাবা, হাত ধুয়েনি?’
‘না।’
‘তুমি খাও না ধীরেসুস্থে। এমনিতেও তোমার ভালো করে চিবিয়ে খাওয়া উচিত। আমি হাত ধুয়েনি?’
‘অনুমতি দিলাম না। আচ্ছা যা, ধুয়ে নে। আর শোন, বেসিনে গিয়ে গলা খাঁকারি দিবি না খবরদার, টান মেরে কান ছিঁড়ে ফেলব।’
বাবার খাওয়া হয়ে গেলে কল্লোল এঁটো বাসন রান্না ঘরে জড়ো করে একে একে সব ধুয়ে ফেলল। বাবা সিগারেট ধরিয়ে আয়েশ করে একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, ‘আহ, চা হলে মন্দ হত না।’
কল্লোল লাজুক ভঙ্গিতে বলল, ‘বাবা, আমি বানাব?’
‘তুই বানাবি কী রে, চা করতে পারিস?’
‘চেষ্টা করে দেখতে পারি, তুমি খেতে পারবে কী না বুঝতে পারছি না।’
বাবা কী শিশুর মতোই না হাত পা ছুঁড়ছেন! এ মুহূর্তে দেখে মনে হচ্ছে ওঁর চেয়ে সুখী কেউ আর এ পৃথিবীতে নেই। অতি তুচ্ছ ব্যাপারগুলো এ মানুষটাকে কী প্রভাবিতই না করে!
‘আরে ছোকরা বলে কী! কর, চা কর।’
চা নামের যে জিনিসটা শেষ পর্যন্ত দাঁড়াল, এর নমুনা দেখে কল্লোল একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। আনেকটা পাতলা সিরাপের মতো। রং টা অবশ্য ঠিক ধরতে পারছে না। এমন রং আগে কখনও দেখেছে? কই, মনে পড়ছে না তো। বাবার সামনে চা’র কাপটা রেখে ভাবছিল চট করে সরিয়ে ফেলব কী না। বাবা সেই সময়টুকু দিলেন না। লম্বা চুমুক দিয়ে বললেন, ‘আহ, অসাধারণ।’
কল্লোল নিজের কাপে ভয়ে ভয়ে চুমুক দিল। নিমিষেই মুখে প্রচুর ভাংচুর হল, কপালে ভাঁজ পড়ল, মুখ কুঁচকে গেল, ‘অসাধারণ! চা না, বাবা, তোমার অভিনয়। এ দেশে পড়ে আছ কী মনে করে- হলিউড চলে যাও, ওরা তোমায় লুফে নেবে।’
নঈম সাহেব হা হা করে হাসলেন, ‘তুই কী কম অভিনেতা। ওদিন ওই নষ্ট ডাল খেয়ে তোর পেট নেমে গেল। সবার চোখ বাঁচিয়ে টয়লেটে ছুটাছুটি করছিস। একবার আমার সামনে পড়ে গেলি। হড়বড় করে বললি: কী কান্ড দেখো, বাবা, তোমার ডায়বেটিস আমাকে ধরে ফেলেছে। একটু পর পর যেতে হচ্ছে।
কল্লোল খসখস করে গাল চুলকাতে চুলকাতে বলল, ‘যা-ও বাবা।’
বাবা চোখ সরু করে ওর ক’দিনের না-কামানো দাড়ি লক্ষ করছেন দেখে কল্লোল তাড়াহুড়া করে বলল, ‘বাবা, আমি তোমাকে হাজার দশেক টাকা দিতে পারি।’
‘এত টাকা কোথায় পেলি?’
‘যেখান থেকেই পাই, ছিনতাই করি নি।’
‘তা না, কিন্তু এত টাকা!’
‘আঃ বাবা, সব জানা চাই। জামির কাছ থেকে, হল তো?’
‘ছি, তুই চেয়েছিলি?’
‘উহুঁ, কোথেকে আমার একাউন্ট নাম্বার জোগাড় করে জমা দিয়েছে। আগে জানতাম না। আজ জানলাম।’
‘বলিস কী!’
‘হুঁ, তাই। পরে সময় করে ওকে ফেরত দেব।’
নঈম সাহেব বিড়বিড় করতে লাগলেন ‘আশ্চর্য, কী আশ্চর্য!’
কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, ‘তবু কল্লোল, বন্ধুর কাছ থেকে টাকা নেয়া ঠিক না। তুই টাকা ফিরিয়ে দে।’
কল্লোল একটু উষ্ণ হয়ে বলল, ‘তোমরা বুড়োরা আসলে জীবনটাকে বড় জটিল করে ফেলো। এবং তোমাদের মতো আমাদেরকেও ভাবতে বাধ্য করো। দুঃসময়ে বন্ধু পাশে এসে না দাঁড়ালে, বন্ধু আর রাজনৈতিক নেতার মধ্যে পার্থক্য কী?’ এবার ধীর গলায় বলল, ‘তাছাড়া বাবা, এ টাকা এক্ষুনি ফেরত দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব না। এটা করলেই ও যে কী অনর্থ করবে ভাবতেও গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। কাল তোমাকে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে দেব।’
‘টাকা দিয়ে আমি কী করবো, তুই রেখে দে।’
‘না বাবা। তোমার ভালো কোনো জামা-কাপড় নেই, হররোজ একই কাপড় পরে দোকানে যাও। মা’রও ভালো কোনো শাড়ি নেই। মৌকেও কিছু কিনে দিয়ো।’
নঈম সাহেব মন খারাপ করা নিঃশ্বাস ফেললেন। মগবাজারে কনফেকশনারীর দোকান ভালোই চলছিল। হুট করে কী যে হল, বাজারে প্রচুর ধার-দেনা হয়ে গেল। একের পর এক শখের জিনিস গুলো বিক্রি করলেন। চোখের জলে ভাসতে ভাসতে কালার টিভি, ভিডিও বাঁধাছাঁদা করছিলেন। চশমার কাঁচ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল। অসম্ভব লজ্জাও হচ্ছিল। এসব তুচ্ছ জিনিসের এত মায়া!
কল্লোল ওঁকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলেছিল: ভালোই হল, বাবা, পরের বার আমরা লেটেষ্টটা দেখে কিনব।
মৌ ঠোঁট উল্টে তার ভাইকে কটাক্ষ করে বলেছিল: ভাইয়া রাত-দিন ছবি দেখে বলে আমি পড়তে পারতাম না। এখন কী মজা-আরাম করে পড়ব। আমি বড়ো ডিস্টার্ব হইতাম।
নঈম সাহেবের বড় বোন কার কাছে যেন খবর পেয়ে ঝড়ের গতিতে ছুটে এসেছিলেন। এই অসম্ভব মমতাময়ী ছোটখাটো মহিলাটি ওঁর হাত চেপে ধরেছিলেন। আর্দ্র গলায় বলেছিলেন: তোর শখের জিনিস বিক্রি করতে হবে না। আমি তো এখনও মারা যাই নাই। কত টাকা দরকার আমাকে বল, আমি দেব।
নঈম সাহেব আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন কেঁদে না ফেলতে। গাল-টাল ভাসিয়ে বলেছিলেন: তা হয় না, আপা।
কেন হয় না, আমি কী তোর কেউ না।
প্লিজ, তুমি অনুরোধ করো না। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি। অন্যকিছু শুনব না।
বড় আপা আহত চোখে তাকিয়ে ছিলেন। ওঁর অজানা নেই- ছোট ভাইটা পাগলা ধরনের, খুব একরোখা। একবার না বললে হ্যাঁ করানো যাবে না। অস্ফুটস্বরে শুধু বলেছিলেন: তোর আসলে কার উপর রাগ আমি জানি।
নঈম সাহেব ব্যাপারটা এড়াতে চাইছিলেন বলেই উত্তর দিলেন না।
চমক ভাঙ্গল কল্লোলের কথায়, ‘বাবা একটা বাজে, ঘুমুবে না?’
‘আচ্ছা কল্লোল, জামি তোর কী রকম বন্ধু?’
‘হঠাৎ এ কথা!’
‘এমনি জানতে চাচ্ছিলাম।’
‘অল্প কথায় বোঝানো অসম্ভব, বাবা। আমি ওকে ভালো বুঝতে পারি না। অনেকের সঙ্গে ওর আচরণ দেখে ইচ্ছে করবে খুন করে ফেলতে অথচ আমি যদি বলি: জামি, চোখ বুজে এখান থেকে লাফিয়ে পড়, ও লাফিয়ে পড়বে। আমি ঠিক তোমাকে বোঝাতে পারলাম না।’
‘হুম-ম, এই তাহলে কাহিনী!’
‘তুমি শোবে না?’
‘এই সিগারেটটা শেষ করে যাচ্ছি।’
‘বাবা, আজকাল খুব সিগারেট খাচ্ছ।’
‘সিগারেট তোরও খুব কম লাগে না, আই বেট। যা, ঘুমুতে যা। আর শোন, নো নাক ডাকাডাকি...।’
বিভাগ
তিতলি তুমিও
Subscribe to:
Posts (Atom)