Search

Showing posts with label আমাদের ইশকুল: দুই. Show all posts
Showing posts with label আমাদের ইশকুল: দুই. Show all posts

Monday, September 27, 2010

ছেলে-মেয়ে, মেয়ে-ছেলে

আমি আগেও লিখেছি স্কুলগুলোয় আমি কেবল অক্ষর শেখাবার উপরই জোর দিচ্ছি না [১]। পারলে আমার অর্জিত অল্প জ্ঞানও গুলে খাইয়ে দেই।

স্কুল, দুই-এ যখন ফুটবল দেয়া হয়েছিল [২] তখন ছাত্ররা সল্লোসে বলেছিল, মেয়েরা কিন্তু ফুটবল খেলবে না।
আমি তখন বলেছিলাম, কেন?
এদের সাফ উত্তর, ফুটবল মেয়েরা খেলে না।
কে বলেছে ফুটবল মেয়েরা খেলে না?
সবাই চুপ।
এবার আমি বললাম, মেয়েরা তোমাদের সাথে পড়তে পারবে কিন্তু ফুটবল খেলতে পারবে না এটা কেমন কথা!
কারও মুখে রা নেই। আমি বুঝতে পরছিলাম, এরা এটা মেনে নিতে চাচ্ছে না।
কখনও কখনও কঠিন আচরণ জরুরি হয়ে পড়ে। আমি কঠিন গলায় বললাম, হয় মেয়েরাও খেলবে নইলে ফুটবল খেলা বন্ধ।
পরে খোঁজ নিয়ে দেখেছি ছেলেরা মেয়েদেরকেও খেলায় নিত।

এই স্কুলে ছাত্রের চেয়ে ছাত্রীর সংখ্যা বেশি। এখানে সুই-সুতার কাজ শেখার জন্য ফ্রেমসহ আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র কিনে দেয়া হয়েছিল। এরা শিখতে পারলে আমার ভাবনা আছে, এরপর এদেরকে শেখার জন্য আপাতত পুরনো একটা সেলাই মেশিন কিনে দেয়া। একটা মেয়ে সেলাইয়ের কাজ করে গোটা একটা পরিবারকে কেমন করে দাঁড় করিয়ে দিতে পারে এর নমুনা হচ্ছে রানি [৩]। ছোট্ট এই মেয়েটি তার গোটা পরিবারকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। এবারের ঈদে নাকি প্রচুর কাজও পেয়েছে!

স্কুলে যখন সুই-সুতোর কাজ শেখার জন্য জিনিসপত্রগুলো দেয়া হচ্ছিল তখন এই স্কুলের 'সফর' নামের এক ছাত্র ফট করে জিজ্ঞেস করে বসল, সেলাইয়ের কাজ আমরা ছেলেরা কি শিখতে পারব?
এখানে আমি ভুল করে ফেলি। মুখ ফসকে বেরিয়ে পড়ে, সেলাই তো মেয়েদের কাজ।
কথাটা মাটিতে পড়তেও পারেনি, উত্তর হাজির, স্যার, মেয়েরা ফুটবল খেলতে পারলে আমরা ছেলেরা সেলাই শিখতে পারব না কেন?
কঠিন যুক্তি। আমি কুপোকাত!
আমি বিস্মিত দৃষ্টিতে ছেলেটার দিকে তাকাই কারণ ক-দিন আগে এর হাত ভেঙ্গেছে। মাত্র প্লাস্টার করে একে নিয়ে আসা হয়েছে। আমাদের হাবিজাবি অনেক কাজের মধ্যে এদেরকে চিকিৎসা দেয়াটাও যুক্ত।
সফর (ছবিতে যার হাতে প্লাস্টার)
একে একজন ছেলে বলছে সেলাইয়ের কাজ শিখবে কি না তার উপর এর হাত ভাঙ্গা। আমি মিনমিন করে বললাম, পারলে শেখো।

এরিমধ্যে চলে গেছে অনেক কটা দিন। আজ স্কুলে সফর মিয়ার কিছু কর্মকান্ডের নমুনা দেখলাম। এ অনায়াসে মেয়েদেরকে সেলাইয়ে পেছনে ফেলে দিয়েছে। ফাজিলের দল- এই সব পোলাপাইন সম্ভবত আমাকে গিনিপিগ পেয়েছে। আমার উপর একের পর এক পরীক্ষা চালিয়ে হতভম্ব করে দিচ্ছে।


সহায়ক লিংক:
১. অক্ষর শেখা...: http://www.ali-mahmed.com/2010/09/blog-post_2229.html
২. ফুটবল...: http://www.ali-mahmed.com/2010/08/blog-post_07.html
৩. রানি: http://www.ali-mahmed.com/2010/05/blog-post_25.html 

Friday, September 10, 2010

কাকে কাকে যে ধন্যবাদ জানাই!

আমি বিশ্বাস করি, আমাদের সবার ভেতরের শিশুটা অবিরত কাঁদে। এই শিশুটা বড়ো লাজুক-অভিমানী, পারতপক্ষে এ জনসমক্ষে বেরুতে চায় না।
কোন এক লেখায় আমি বলেছিলাম, "আমাদের ভেতরের পশু এবং শিশু ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকে- হরদম এদের মারামারি লেগেই আছে। কে যে বিজয়ী হবে এটা আগাম বলা মুশকিল। অগ্রজদের রেখে যাওয়া অর্জিত জ্ঞান-অভিজ্ঞতা-নরোম মন-ধর্মীয় শেকল এই সব হচ্ছে আমাদের বাড়তি সুবিধাটুকু। এই সুবিধা নামের অস্ত্রের জোরে পশুটা ফালাফালা হয়"!

পশু এবং মানুষের মধ্যে পার্থক্য কি এটা আমার মত সাধারণকে জিজ্ঞেস করলে আমরা চট করে বলব, লেজ। কিন্তু কে কথাটা বলেছিলেন, কোথায় পড়েছিলাম মনে পড়ছে না:
"পশু এবং মানুষের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে, পশু তার পূর্বপুরুষের অর্জিত জ্ঞান কাজে লাগাতে পারে না কিন্তু মানুষ পারে"।

আমি কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, আমাদের অনেকের মধ্যে কিছু একটা করার গোপন স্পৃহা লুকিয়ে থাকে কেবল দিকনির্দেশনার অভাবে আমরা উৎসাহ বোধ করি না! সবার ছোট-ছোট সহায়তা আমাকে যে কী মুগ্ধ করে!
যেদিন চোখে দেখতে পান না তাঁদের সন্তানদের জন্য স্কুল [১] এবং মসজিদ করে দেয়া হলো, সেদিন সন্তানদের বাবা-মা সবাই উপস্থিত ছিলেন।

দুলাল ঘোষ নামের একজন কেবল এঁদের ছবি উঠিয়েই ক্ষান্ত হলেন না সেই ছবির বিশাল এক ব্যানার বানিয়ে দিলেন। সেই ব্যানার এখন স্কুলে ঝুলছে। ছাত্র-ছাত্রীরা স্কুলে ঢুকেই অপার বিস্ময়ে ব্যানারটা দেখে। তাদের বাবা-মা চোখে দেখতে পান না কিন্তু এরা নিশ্চয়ই ঝলমলে মুখে বলতে থাকে, জানো বাজান, তোমার লগে আম্মা আছে, আমিও আছি; ওয়াল্লা, আমাগো কী সোন্দর যে লাগতাছে!


আমি যখন হরিজন পল্লীর স্কুলের [২] জন্য তিনটা মাদুর কিনি তখন স্কুলে নিয়ে খুলে দেখি চারটা মাদুর। আমি প্রথমে ধারণা করেছিলাম, দোকানদার ভুল করেছে। ফিরে এসে বলার পর দোকানদার উদাস হয়ে বললেন, 'থাকুক, আমার এখানে চাডিডা (মাদুর) পইরা ছিল, পোলাপান পড়ব'।

আমি যখন স্টেশনের বাচ্চাদের জন্য স্কুল [৩] করার জন্য পাগলের মত একটা ঘর খুঁজছি তখন রেলের লোকজনরা আস্ত একটা অফিস আমাদের জন্য দিয়ে দিলেন!
স্কুলের কিছু মেয়ে হাতের কাজ শেখে। এদের জন্য ফ্রেম এবং আনুসাঙ্গিক জিনিসপত্র কিনতে গেলে দোকানদার এর সঙ্গে আরও অনেক কিছু দিয়ে দেন, বিনে পয়সায়!

একটি দৈনিকে [৪] স্কুল নিয়ে যখন প্রতিবেদন ছাপা হয় আমার জানার আগেই রটে যায় এটা। স্টেশনের যেসব ছেলেরা পানি বিক্রি করে দিনযাপন করে, তিনবেলা ঠিকভাবে খেতেও পায় না, এরা আস্ত একটা পত্রিকা কিনে ফেলে আমাকে দেখাবে বলে। আমি জানি এদের এই পত্রিকার দাম ৮০০ পয়সা! আমার চশমার কাঁচ ঝাপসা হয়।

আবার এর উল্টোটাও আছে। একজন মানুষ কিছু টাকা জমিয়েছিলেন চোখের ছানি অপারেশন করাবার জন্য। এই টাকায় অপারেশন হয় না। তাঁকে বলেছিলাম, আগে আপনাকে ডাক্তার দেখাই তারপর দেখা যাক। ডাক্তার দেখাবার পর জানা গেল এই মানুষটার অপারেশন করা যাবে না। চোখে অসম্ভব প্রেসার। তাঁকে প্রেসার নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য ডাক্তার ওষুধ দিলেন।
যথারীতি আমাদের দেশে অতি প্রয়োজনীয় ওষুধগুলোর দাম চড়া। তো, আমি দোকানদারকে অনুরোধ করলাম, 'ভাই, মানুষটা খানিকটা সমস্যায় আছে; পারলে ওষুধের দাম একটু কম রাখবেন'।
দোকানদার নামের মানুষটা অহেতুক রূক্ষ গলায় বলেছিল, 'কিন্না যখন দিবেন পুরা টাকা দিয়াই কিন্না দেন'। আমার বুকে একটা ধাক্কার মত লাগল, একজন না পারলে না করবে কিন্তু এমন জানোয়ারের মত গাঁ গাঁ করছে কেন?
পরে এই লোকটাই বলেছিল, 'আচ্ছা, ৫ টাকা কম দেন'।
তখন আমি আর কিচ্ছু বলিনি। গুণে গুণে টাকা দিলাম, ওষুধ নিলাম। যখন চলে আসছি তখন ওই মানুষটা আমাকে বলছে, 'আরে, ৫ টাকা নিয়া যান'।
আমি শান্ত গলায় বলেছিলাম, 'এটা রেখে দেন। আপনার ইফতারের জন্য দিলাম'।
আহ, এটা বলতে পেরে কী যে শান্তি লেগেছিল! আমি এটাও মনে করি, যার যা প্রাপ্য তা তাকে বুঝিয়ে দেয়াই সমীচীন। এটা তার পাওনা, একটা পশুর প্রাপ্য।
 
যে মানুষটার জন্য ওষুধ কেনা হয়েছিল, মানুষটা একদিন রাস্তায় আমায় পেয়ে একটা শিশুর মত হাত-পা ছুঁড়ে হড়বড় বলতে থাকেন, 'কী তামশা, অহন সব ফকফকা দেখি'।
আমি হাসিমুখে বলি, 'আমাকে দেখতে পাইতাছেন, বলেন তো আমার হাতে এইটা কি'?
মানুষটা ঠিক-ঠিক বলে দেন আমার হাতে সেল-ফোন।

আমি লম্বা লম্বা পা ফেলে এগুতে থাকি। দূর-দূর, ওই দোকানদারের মত পশু-মানবদের নিয়ে মাথা ঘামাবার অবকাশ কই আমার...।

সহায়ক লিংক:
১. আমাদের স্কুল, দু্ই: http://tinyurl.com/2fs9j4p
২. আমাদের স্কুল, এক: http://tinyurl.com/3xpuov5
৩. আমাদের স্কুল,তিন: http://tinyurl.com/327aky3
৪. দৈনিকের প্রতিবেদন: http://tinyurl.com/3adh7uu  

Wednesday, August 18, 2010

২০০ স্কয়ার ফিটের স্বপ্ন

ছোট্ট একটা টিনের ঘর। দশ ফিট বাই ২০ ফিট। ২০০ স্কয়ার ফিট। এটা কেবল ২০০ স্কয়ার ফিটের একটা টিনের ঘরই না। আনুমানিক ২৫টা পরিবার, প্রায় ২০০ মানুষের স্বপ্ন।

আমি পূর্বের লেখায় [১] উল্লেখ করেছিলাম, ঈশ্বরের বিশেষ সন্তান, যারা চোখে দেখতে পান না (অবশ্য এঁদের সন্তানদের অধিকাংশই চোখে দেখতে পায়)। এঁরা দীর্ঘ দিন ধরে যে স্বপ্নটা লালন করছিলেন, একটা ছোট্ট ঘরের জন্য, যেটা দশ ফিট বাই বিশ ফিটের। সেই ঘরটার মাধ্যমে এটার সমাপ্তি হলো। ঘরের কাজ প্রায় শেষ, মাটি দিয়ে মেঝে করা এবং টুকটাক কাজ এঁরা নিজেরাই শেষ করতে পারবেন।

এটা নিয়ে খুবই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ছিলাম কারণ কথা দেয়া হয়ে গিয়েছিল, কাজও শুরু করে দেয়া হয়েছিল কিন্ত এটার জন্য যথেষ্ঠ ফান্ড ছিল না। এ এক বিচিত্র, অন্যদের জন্য আমার প্লাসিবো বিষয়টা ভালই কাজ করে- শেষঅবধি কেমন কেমন করে যেন হয়েই যায়! বা হতে পারে শহীদ কাদরীর কথাই ঠিক:
"আমার মতো ভীরু সাঁতারু- না জানা লোক
পার হ'লো নদী-
এটাই নিয়তি।
অন্যরকম পরিণামও যে দেখিনি এমন নয়
সাঁতারু জাঁদরেল ক্যাপ্টেন এক
জাহাজ শুদ্ধ ডুবে গেলো
ঊর্ধ্বকাশ থেকে বোয়িং- ৭০৭ অজগ্রাম পুকুরে তলালো।"
(একবার দূর বাল্যকালে/ শহীদ কাদরী) 

কাজটা শেষ করতে পারার পেছনের গল্পটা না বললে অন্যায় হয়। সিংহভাগ টাকার যোগান দিয়েছেন জাপান প্রবাসী একজন মানুষ, নাম প্রকাশে যার রয়েছে তীব্র অনীহা। তাঁর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি।
এবং কৃতজ্ঞতা পড়শী ফাউন্ডেশনের প্রতিও। বাকী অর্থের যোগান দিতে গিয়ে এদের নিয়মিত কার্যক্রমের ব্যাঘাত ঘটেছে। এই জন্য দুঃখ প্রকাশ করা ব্যতীত বলার কিছুই নাই।

সহায়ক লিংক:
১. অদেখা এক স্বপ্ন: http://www.ali-mahmed.com/2010/08/blog-post_15.html 

*আমার দেশ: http://www.amardeshonline.com/pages/details/2010/08/22/40362

Sunday, August 15, 2010

অদেখা এক স্বপ্ন

যাতায়তে সমস্যা তবুও ঈশ্বরের বিশেষ সন্তানদের স্কুলে সুযোগ পেলেই আমি চলে যাই। এটার প্রতি আমার আলাদা বাড়তি টান আছে কারণটা পূর্বেও বলেছিলাম, এখানকার বাচ্চারা অল্প সময়ে আমাকে যথেষ্ঠ বিভ্রান্ত করছে। দাবা একটা কঠিন খেলা, আমি নিজেও ভাল পারি না। স্কুলের বাচ্চাদের জন্য ফুটবল, লুডু, লাফাবার দড়ির সঙ্গে একটা দাবা কিনে দেয়া হয়েছিল, দাবাটা এখানকার দু-চারজন ভালই রপ্ত করে ফেলেছে, হাতি-ঘোড়া-মন্ত্রী-রাজা নিয়ে মারামারি করে।

এখানকার বয়স্ক মানুষদের আমি এড়িয়ে চলি, ঘটনাটা খানিকটা অন্য রকম। এখানকার লোকজনের একটা অদেখা স্বপ্ন আছে; সেটা হচ্ছে, একটা মসজিদ। এখানে আশেপাশে কোন মসজিদ নেই, চোখে দেখতে না-পাওয়ার কারণে দূরের মসজিদে যাওয়াটা এঁদের জন্য বড়ো কঠিন।
বেশ ক-বার একটা মসজিদের ব্যবস্থা করে দেয়ার কথা আমাকে বলার পর আমি চেষ্টাকৃত খানিকটা কঠিন করে বলেছিলাম, আমার পক্ষে এটা সম্ভব না।
এমন না মসজিদ করার বিষয়ে আমার কোন অনীহা আছে। আমি নিজে কতটুকু ধর্মীয় আচার পালন করি, কি করি না এই নিয়ে কারও সঙ্গে আলাপ করতে আগ্রহ বোধ করি না। কিন্তু কারও ধর্ম-বিশ্বাসের প্রতি আমার শ্রদ্ধা অটুট। তাঁদের বিশ্বাস কোনটা ঠিক-বেঠিক এই নিয়েও আমার মাথা ঘামাবার প্রয়োজনও দেখি না।
একটা মসজিদ ভেঙ্গে ফেললে আমি যে কাতরতা অনুভব করি তেমনই আদিমানুষদের কোন প্রার্থনাস্থল ভেঙ্গে ফেললেও [১]

এই গ্রহে এটা একটা জঘণ্য অপরাধ, প্রার্থনা করার সময় কাউকে মেরে ফেলা। কারণ তখন সেই মানুষটা মনে-প্রাণে-শরীরে সমর্পিত অবস্থায় থাকেন, তাঁর মধ্যে একটা পিপড়াকেও প্রতিরোধ করার ক্ষমতা থাকে না। তখন কাউকে মেরে ফেলার মত কাপুরুষতা আর নাই! যে পাকিস্তানী আর্মি প্রার্থরনারত [২] দানবীর নতুনচন্দ্রকে মেরে ফেলেছিল আমি যেমন ওই পাকিস্তানি আর্মিদের শাস্তি মৃত্যু চাইব তেমনি যে দানব পাকিস্তানি মসজিদে বোমা মেরে শতাধিক মানুষকে হত্যা করেছে, তাকেও। এবং আমি সেই দানবদেরও তাচ্ছিল্য করব যারা এই অন্যায়ে উল্লসিত হয় [৩]

বিশ্বাস। কারও বিশ্বাসটাকে আমি প্রচন্ড গুরুত্ব দেই কারণ আমি মনে করি, বিশ্বাস বিষয়টার শক্তি অসাধারণ, দানবীয়। আমি কোন একটা লেখায় লিখেছিলাম, প্লাসিবো এবং নসিবোর কথা [৪]। প্লাসিবোটা আসে তীব্র বিশ্বাস থেকে, অদেখা স্রষ্টার কাছে একজন যখন তাঁর শরীর-মন-ভাবনা শিথিল করে বারবার একটাই জিনিস চাইছে তখন ওই মানুষটার সমগ্র সত্ত্বা প্রস্তুত হচ্ছে জিনিসটা পাওয়ার জন্য। হতে পারে এটা জটিল কোন রোগ। ফলশ্রুতিতে উপশম না-হওয়ার কোন কারণ দেখি না।
কোন রোগির যদি ডাক্তারের উপর আস্থা না-থাকে বা সেই রোগি যদি হাল ছেড়ে দেন, এই গ্রহের সমস্ত ডাক্তার গুলে খাইয়ে দিলেও তিনি সেরে উঠবেন এমনটা আমি মনে করি না। আমি এও মনে করি, আমাদের মত দেশগুলোতে অস্ত্রপচার অসফল হওয়ার হার বেশি হওয়ার এটাও একটা কারণ হতে পারে ডাক্তাররা রোগির সঙ্গে মানসিক যোগাযোগ স্থাপন করতে পারেন না, রোগি জ্ঞান হারিয়ে ফেলার আগ পর্যন্ত একটার বেশি দুটা কথা জানতে চাইলেই ডাক্তার বাবু ধমকে থামিয়ে দেন, 'আপনে কি ডাক্তার'?
আরে শ্লা, আমরা ডাক্তার হলে তোকে জিজ্ঞেস করতাম কেন? আমরাই তো তোর ঠ্যাং কাটতাম।
বিশ্বাসের খারাপ দিকও আছে। বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে একটা মানুষকে অনায়াসে তৈরি করা যায় একটা 'হিউম্যান বম্ব'-এ। এর একটা উদাহরণ হতে পারে তামিল, এলটিটিই-এর ৭৫ জন নারী যোদ্ধা গ্রেনেড বিস্ফোরন ঘটিয়ে একেক করে নিজেদের উড়িয়ে দিয়েছিলেন। কী ভয়াবহ, কী দানবীয় এই বিশ্বাসের ক্ষমতা!

যাক সে প্রসঙ্গ। পরে এরা বয়স্কদেরকে আমার বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিলেন। এখন বয়স্কদের মুখের উপর ফট করে কঠিন কথা বলা যায় না, তাই আমি এঁদের এড়িয়ে চলতাম। আমি পা টিপে টিপে গেলেও কেমন করে যেন এঁরা টের পেয়ে যেতেন, 'কে যায়-কে যায়'। বাধ্য হয়েই বলতে হতো, আমি। ব্যস, শুরু হয়ে যেত সেই মসজিদের কথা। কাঁহাতক আর সহ্য করা যায়!


হপ্তাখানেক আগে ওখানে আমাকে বাধ্য হয়ে যেতে হয়েছিল। ওঁদের ওখানে থাকেন রমজান নামের একজন মানুষ। চোখে দেখতে না-পাওয়া এই মানুষটার প্রতি আমার আলাদা টান আছে, এঁর কারণেই আমি এঁদের খোঁজ পাই এবং অবশেষে স্কুল করা হয় [৬]
রমজান পায়ে কুড়ালের কোপে আহত, এই ডাক্তারকে [৫] দেখাবার কথা বলে এসেছিলাম কিন্তু রমজান আসেননি।
আজ গিয়ে দেখি এঁর পায়ের অবস্থা ভয়াবহ। আমি ডাক্তার না কিন্তু চোখ বুজে বলে দেয়া যায় এর সঠিক চিকিৎসা না হলে পা-টা কেটে ফেলতে হবে। অথচ মানুষটা হাতুড়ে ডাক্তার দেখিয়ে এরিমধ্যে হাজারখানেক টাকা খরচ করে ফেলেছেন। মেজাজ খারাপ হয় কিন্তু এঁদের উপর রাগ করা বৃথা। এক প্রকার চ্যাংদোলা করে নিয়ে আসতে হয়েছিল এঁকে।

সেদিন বাঁচা গেল না! সবাই মিলে আমাকে কোণঠাসা করে ফেললেন। এঁরা বারবার বলতে থাকেন, মসজিদ এখন আমরা চাই না, আপনি খালি বলেন, হবে। আমি নির্বোধের মত বলি, আচ্ছা হবে। ইয়ে, কত লাগে মসজিদের জন্য একটা ঘর করতে?
এঁরা হিসাব দেন, টিন-বাঁশ দিয়ে দশ ফুট বাই বিশ ফুট একটা ঘর করতে আনুমানিক বিশ হাজার টাকা লাগবে। আমি বলি, আচ্ছা কাজ শুরু করেন কিন্তু আমার একটা শর্ত আছে সেটা হচ্ছে, আপনারা এখানে নামাজ পড়েন, কোরান পড়েন, জিকির করেন কোন সমস্যা নেই কেবল এক ঘন্টার জন্য বাচ্চারা এখানে পড়বে।
এরা একটা ধাক্কার মত খান। মসজিদ হচ্ছে আল্লার ঘর এখানে বাচ্চারা পড়বে কেমন করে? আমি বলি, দেখেন আগে কিন্তু মসজিদ কেবল নামাজ পড়ার জন্যই ব্যবহৃত হত না, শিক্ষা দেয়ার জন্যও। বোঝাবার পর এঁদের আর আপত্তি থাকে না।

আমার আনন্দিত হওয়ার কথা কিন্তু মনখারাপ করা শ্বাস ফেলি, আমার কাছে এখন এই বাড়তি খরচ করার মত টাকা নেই। যারা আমাকে আর্থিক সহায়তা করেন তাঁদের কোন মুখে বলব? কিন্তু তাঁদের কেমন করে বোঝাব, ব্যাটলফিল্ডে থাকা আর নিরাপদ দুরত্বে থাকার মধ্যে অনেক ফারাক। এঁদের সঙ্গে কাজ করতে হয় আমাকে, এঁদের চোখে চোখ রাখতে হয় আমাকে, আপনাদের না।
পরে ভাবছিলাম, আচ্ছা, আহাম্মকের মত এটা কেন বলতে গেলাম, আমি কি আহাম্মক? নাকি এঁদের অদেখা স্বপ্ন এঁরা আমার মধ্যে সঞ্চারিত করতে সফল হয়েছিলেন? হতে পারে। কে বলেছে, যারা চোখে দেখেন না তাঁরা স্বপ্ন দেখতে পারবেন না, কে মাথার দিব্যি দিয়েছে তাঁদের স্বপ্নটা অন্যের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারবেন না?  আমার মত দুর্বল মানুষকে কাবু করা যাবে না...!


*ঈশ্বরের বিশেষ সন্তানদের ইশকুল: http://www.ali-mahmed.com/2010/08/blog-post_05.html 

সহায়ক লিংক:
১. আদিমানুষ: http://www.ali-mahmed.com/2010/02/blog-post_23.html 
২. দানবীর নতুনচন্দ্র: http://www.ali-mahmed.com/2007/06/blog-post_4432.html 
৩. দেশপ্রেমিক: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_30.html 
৪. প্লাসিবো, নসিবো: http://www.ali-mahmed.com/2009/12/blog-post_20.html 
৫. ডাক্তার: http://www.ali-mahmed.com/2010/03/blog-post_06.html 
৬. রমজান মিয়া: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_3014.html

Saturday, August 7, 2010

ঈশ্বরের বিশেষ সন্তানদের ইশকুল: ৩

আমাকে খুব ভুগিয়েছে যেটা সেটা হচ্ছে, এই শিশুদের চিকিৎসা সমস্যা। কোন ডাক্তার মহোদয় যেতে রাজি হচ্ছিলেন না। এতগুলো বাচ্চাকে ওখান থেকে নিয়ে এসে এখানে দেখানোটা কঠিন। ডাক্তার মহোদয়দের কেজি-কেজি তৈল মর্দন করেও কোন লাভ হচ্ছিল না। এমন না তিনি বিনে পয়সায় দেখে দেবেন। একটা সম্মানি তাদের দেয়া হবে এটাও জানানো হয়েছিল।

একজন এমবিবিএস ডাক্তার সাহেবকে অনেক বলে-কয়ে রাজি করানো হয়েছিল। ওনাকে অন্যরা এবং আমি সবাই প্রাণপণে বোঝাবার চেষ্টা করেছিলাম এই স্কুলগুলো চলছে কষ্টেসৃষ্টে। যাওয়ার পূর্বে তিনি জানিয়ে দিলেন, ওনাকে আনা-নেয়ার পর এক হাজার টাকা দিতেই হবে। এই দাবী করলে আমার মনটাই খারাপ হয়ে যায়। এই দেশের বেশিরভাগ ডাক্তাররাই নীচ-লোভী, এঁদের সীমাহীন লোভ!  এবং এঁরা অমর!
অথচ আমি এঁদেরকে বলি, দ্বিতীয় ঈশ্বর। মুমূর্ষু কোন মানুষ যখন আধ-জবাই পশুর মত ছটফট করতে থাকে ঠিক সেই মুহূর্তে একজন ডাক্তারের উপস্থিতিকে মনে হয় উপরে ঈশ্বর আর নীচে দ্বিতীয় ঈশ্বর। 
ব্যতিক্রমও আছেন অনেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সাইফুলের যখন দু-পা কাটা যায় তখন তাঁর প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। সেই মুহূর্তে পঙ্গু হাসপাতালের চিকিৎসক আরিফ আনোয়ার তাঁর নিজের শরীরের রক্ত দিয়ে সাইফুলকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন।

পূর্বের একটা লেখায় লিখেছিলাম [১], এই একটা পেশার প্রতি আমার ঈর্ষা আছে। আমি কিছুই হতে পারিনি এই নিয়ে আমার কখনও হা-হুতাশ ছিল না কেবল মনে হতো ডাক্তার হতে পারলে বেশ হতো। অন্তত হাঁটতে-শুতে-বসতে মানুষের জন্য কিছু একটা করা যেত। অসুস্থ একটা মানুষ যখন শেষ আশাটা-হাল ছেড়ে দেয় তখন তার পাশে দাঁড়াতে পারাটা যে আনন্দের এটা লিখে কেমন করে বোঝাই?

ডাক্তার নামের মানুষটাকে [২] ঈশ্বরের বিশেষ সন্তানদের ইশকুলে নিয়ে যাই। আমরা যখন গিয়ে পৌঁছি তখনও স্কুল শুরু হওয়ার সময় হয়নি। বাচ্চারা দেখলাম, রিকশার টায়ার দিয়ে চমৎকার গাড়ি চালাচ্ছে। আফসোস হলো, সঙ্গে একটা ফুটবল নিয়ে আসলে মন্দ হতো না, বাচ্চারা খেলত! ফুটবলে দু-চার লাথি আমিও দিলে আটকাত কে!
ডাক্তার এখানে বাচ্চাদের যতটুকু দেখার দেখে দিয়েছেন। 
আমার তীব্র আগ্রহ ছিল নার্গিস নামের মেয়েটিকে দেখানো। বাচ্চাদের মধ্যে এই কেবল চোখে দেখতে পায় না। এই মেয়েটার কখনও দেখতে পারবে কি না এটা জানাটা আমার বড়ো জরুরি। এই ডাক্তার যদিও চোখের ডাক্তার না তবুও খানিকটা হলেও তো ধারণা পাওয়া যাবে। প্রাথমিকভাবে অনুমান করা যায়, খানিকটা হলেও সম্ভাবনা আছে। আমি চেষ্টা করব এই মেয়েটাকে ভাল একটা চোখের ডাক্তার দেখাতে।

এই বাচ্চাদের বাবা-মা, যাদের সমস্যা প্রবল এদেরকে তিনি যে ক্লিনিকে বসেন সেখানে নিয়ে আসা হয়েছে। একবারে সবাইকে দেখা তো সম্ভব না, ঠিক হয়েছে প্রতি সপ্তাহে দু-তিনজন করে দেখে দেবেন। কারণ এখানে তিনি আসেনই সপ্তাহে একদিন।

আমাকে খুব বেগ পেতে হয় ডাক্তার নামের মানুষটার ছবি উঠাতে কারণ এতে তাঁর বড়ো অনীহা। কিন্তু আমার চিন্তা অন্য, অন্য ডাক্তাররা অন্তত এটা দেখে খানিকটা লজ্জা পাক, অন্তত লজ্জা স্থানটা ঢেকে রাখার চেষ্টা করুক।

*ইশ্বরের বিশেষ সন্তানদের ইশকুল, ২: http://www.ali-mahmed.com/2010/08/blog-post_05.html 

সহায়ক লিংক:
১. মা এবং তার অদেখা সন্তান: http://www.ali-mahmed.com/2010/02/blog-post_10.html 
২. ডাক্তার নামের মানুষটা: http://www.ali-mahmed.com/2010/03/blog-post_06.html
...   ...   ...
আজ হুট করে মনে হলো একটা চক্কর দিয়ে আসি। ছাত্র-ছাত্রী ছিল ২৬ জন। আজ দেখছি আরেকজন বেড়েছে! চোখে দেখতে পায় না এমন আরেকটা ছেলে বিড়বিড় করছিল, আমিও পড়তাম।
আমি তাকে বলি, তুমি টিচারের সঙ্গে কথা বলো, তোমাকেও পড়াবে। সব মিলিয়ে দাঁড়াল ২৮ জন! আমি খানিকটা শংকিত, এই ২৮ জন ছাত্র-ছাত্রীকে টিচার পড়াতে পারবে তো, খুব বেশি চাপ হয়ে যাচ্ছে না?

আজ সঙ্গে ফুটবল নিতে ভুল হয় না। বলটা এদের দেখানো মাত্র স্কুলের সমস্ত শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে। এরা যে আচরণ করে মনে হচ্ছিল এটা বিশ্বকাপ! 
পরে এদের কাছে আমি জানতে চাই, এটা দিয়ে কি কেবল তোমরাই খেলবা, মেয়েরা খেলব না?
ছেলেদের সাফ উত্তর, মেয়েরা খেলব না, এইটা মেয়েদের খেলা না।
আমি জানতে চাই, কেন? মেয়েরা তোমাদের সাথে পড়লে সমস্যা নাই কিন্তু খেললে সমস্যা হবে কেন? তোমরা যদি মেয়েদেরকে একেবারেই খেলায় না নাও তাহলে খেলা বন্ধ।
এরা মুখ শুকিয়ে রাজি হয়। দেখা যাক, কেবল কি ছেলেরাই খেলে নাকি মেয়েদেরকেও খেলায় নেয়...।

আপডেট: ১৮ আগস্ট, ২০১০
আজ এখানে এসেছি অন্য কাজে। উঁচু এক টিলা থেকে যখন ছবি উঠাচ্ছি, মেয়েদের কাউকে এখানে খেলতে দেখলাম না! ছেলেরা কী দাদাগিরি দেখানো শুরু করে দিল?

পরে খোঁজ নিয়ে জানা গেল ঘটনা এটা না, মেয়েরা তখন সেলাইয়ের কাজ শিখছিল।    

Thursday, August 5, 2010

ঈশ্বরের বিশেষ সন্তানদের ইশকুল: ২


আজ এদের [১] স্কুল ড্রেস দেয়া হয়েছে। কেবল টিচারেরটা (সবার মাঝখানে) অন্য রকম, হলুদ কালো।  

২৩ জনের মাপ নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, ৩জন আরও বেড়েছে। এদের জন্য আলাদা করে ব্যবস্থা করতে হবে।

খানিকটা সমস্যা দেখা দিল নার্গিসকে নিয়ে, এদের মধ্যে কেবল এই মেয়েটাই দেখতে পায় না। আমাকে বারবার জিজ্ঞেস করছে, আমার জামাডা কেমুন হইছে?
আমি এর ছবি উঠিয়ে সবাইকে বলি, বলো তো, নার্গিসের ছবি কেমন হইছে? (এখানকার বাচ্চাদের আগে থেকেই এটা বলা আছে নার্গিসের যে কোন প্রসঙ্গ জানতে চাইলে সমস্বরে বলতে হবে, সুন্দর হইছে)। সমস্ত বাচ্চা গলা ফাটিয়ে বলে, সু-ন্দ-র হ-ই-ছে। 
নার্গিসের আনন্দ দেখে কে!

ঈশ্বরের বিশেষ সন্তানদের স্কুল [২] নিয়ে আমার মুগ্ধতার কথা বলেছিলাম। আজ দেখি বাংলাদেশের পতাকা আঁকা শিখে ফেলেছে! এরা এতো দ্রুত সব কিছু শিখছে!
গতবার আমি বলে এসেছিলাম, বাচ্চারা রং-পেন্সিল দিয়ে যা এঁকেছে তা যেন স্কুলে ঝুলিয়ে রাখা হয়। এখানের টিচার বড়ো গোছানো। সব ঠিক ঠিক মনে রাখে, করে রাখে!

আজ ক্লাশে খানিকটা ফাঁকিবাজি চলে। নতুন কাপড়ের আনন্দে একজন অন্যজনের গায়ে গড়িয়ে পড়ছে। আমি না-দেখার ভান করে ফিরে আসছি। নিজের থইথই আনন্দ নিয়ে এমন কাবু আমি, এদের আনন্দ দেখার সময় কোথায় আমার...।

*আর্থিক সহায়তার জন্য বিশেষ কৃতজ্ঞতা: পড়শী ফাউন্ডেশন

সহায়ক লিংক: 
১. ঈশ্বরের বিশেষ সন্তানদের ইশকুল, ১: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_24.html
২. ঈশ্বরের বিশেষ সন্তানদের ইশকুল, ২: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_27.html

Tuesday, July 27, 2010

নার্গিস এবং অন্যান্য

'ইশ্বরের বিশেষ সন্তানদের ইশকুল' [১] নিয়ে পূর্বে যে পোস্টটা করেছিলাম ওখানে আমার একটা খেদ ছিল নার্গিসের ছবি উঠানো হয়নি বলে। আজ এই সুযোগটা চলে আসে। 
বাচ্চাদের স্কুল ড্রেস বানানো হবে, কাপড় সেলাইয়ের মাস্টারকে সাথে নিয়ে গেছি। আজ গিয়ে দেখি বাচ্চা আরেকজন বেড়েছে, সর্বসাকল্যে গিয়ে দাঁড়াল ২৪ জন।

উল্লেখ করেছিলাম, এখানকার সমস্ত বাচ্চাদের বাবা-মা অন্ধ কিন্তু বাচ্চাগুলো স্বাভাবিক, দেখতে পায়।

কেবল নার্গিসই ব্যতিক্রম, ও দেখতে পায় না। কিন্তু ওর শেখার আগ্রহের শেষ নাই! 
এমনিতে এখানকার বাচ্চাগুলো আমাকে বিভ্রান্ত করে দিচ্ছে। আজও এরা আমাকে হারিয়ে দিয়েছে। মাথা গুণে একটা চকলেট বেশি রেখে নেয়ার জন্য বলেছিলাম, ঠিক ঠিক একটা রয়ে যায়। 
গতবার বলে আসা গল্পটা চমৎকার করে বলতে পারে। 
স্কুল চালু হয়েছে ৪/৫ দিন হবে, এখন পর্যন্ত এরা মাত্র ৪টা বর্ণমালা শিখেছে। কিন্তু বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করি, উল্টাপাল্টা যে কোন বর্ণমালা জিজ্ঞেস করলে অধিকাংশ বাচ্চাই সঠিক উত্তরটা দিতে পেরেছে। সালমা নামের টিচার, ক্লাশ এইট পড়ুয়া পিচ্চি মেয়েটার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। যেটা দেড় মাসেও হরিজন পল্লীর বাচ্চাদের মাস্টার মশাই শেখাতে পারেননি!

আজ সঙ্গে রঙ-পেন্সিল নিয়ে গিয়েছিলাম। এদের সবাইকে কাগজ দিয়ে বললাম, যে যা পারো আকোঁ। এরা জীবনের এই প্রথম রঙ পেন্সিল দিয়ে ছবি আঁকবে। 
নার্গিসকেও আমি অবশ্যই দিতাম কিন্তু ও আগ বাড়িয়ে হইচই শুরু করে। এখানকার দু-এক জন বাচ্চা ফট করে বলে বসে, হে চোখে দেখে না, হে কি আঁকব। 
আজ এই প্রথম এখানকার এই বাচ্চাদের ধমক দেই। টিচারকে বলে দেই, নার্গিসের প্রতি যেন আলাদা করে খেয়াল করে। এবং আজকের পর এখানকার কোন বাচ্চা যেন এই ধরনের কথা না বলে যে, ও তো এটা পারবে না কারণ ও চোখে দেখে না।

কিন্তু নার্গিস যখন বলে, আমি কি আকুম? আমার মনটা অহেতুক খারাপ হয়ে যায়, জীবনে কত অকাজের জিনিস শিখলাম কিন্তু এই বাচ্চাটাকে শেখাবার মত কোন শিক্ষা কেন শিখলাম না! আমি স্তব্ধ হয়ে বসে থাকি। এই বাচ্চাটাকে আমি কি আঁকতে বলব? অন্ধকার? এ তো কিছুই দেখেনি, এর ভুবনে অন্ধকার ব্যতীত কোন কিছু দেখার স্মৃতি নাই- চারপাশে জ্যোৎস্নায় থই থই তবুও নিতল অন্ধকার। আমি একে কি আঁকতে বলব? এদিকে মেয়েটা যে বড়ো আশা নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। 
আমি নিরুপায় হয়ে বলি, নার্গিস, তুমি ফুল আঁকো। শোনো, এই দেখো, আমি তোমার হাত ধরছি, এই ভাবে গোল গোল করে আঁকবে তাহলে ফুল হবে। নার্গিস আঁকতে থাকে।

আমার ভাল লাগছিল না, কষ্ট হচ্ছিল। আমি দুর্বলচিত্তের মানুষ, শেষে এখানে একটা কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। আমি বেরিয়ে আশেপাশে হাঁটাহাঁটি করি। কী কান্ড, চারপাশটা এতো চমৎকার এটা এর আগে খেয়াল করিনি। জায়গাটা কী শান্ত- মনে হয় দিনভর এখানে কাটিয়ে দেয়া যেতে পারে! ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে পেয়ারা গাছ, এদের একেকজনের ভাগে নাকি ২২টা করে পেয়ারা গাছ পড়েছে। পাশেই লাল মাটির উঁচু রাস্তা, দশ কদম গেলেই নাকি ভারতের সীমান্ত! আরেক দিন গেলে এই রাস্তা ধরে হাঁটব, বিএসএফ না আবার দুম করে গুলি করে বসে।
বলতে গেলে টিলার মাঝখানে স্কুলটা।


সবার আঁকা হলে আমি অবাক হই, যারা কখনও রঙ-পেন্সিল ছুঁয়ে দেখেনি এরা যা এঁকেছে আমার মত সাধারণ একজন মানুষকে মুগ্ধ করার জন্য যথেষ্ঠ। সবার আঁকা কাগজে যার যার নাম লিখে স্কুলের টিনের দেয়ালে ঝুলিয়ে দেয়ার জন্য টিচারকে বলে আসি। পরবর্তীতে এরা স্কুলে ঢুকলেই যার যার শিল্পকর্মগুলো দেখবে। 
কেবল নার্গিসের ছবিটা আমি সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি। মেয়েটাকে ইচ্ছা করে আমি সবুজ রঙ দিয়েছিলাম। এই গ্রহে কতো বিচিত্র ঘটনা ঘটে, আরেকটা ঘটলে আসমান একহাত নীচে নেমে আসবে এই দিব্যি কে দিয়েছে? এটা আশা করতে কে আমাকে আটকাচ্ছে, একদিন এই মেয়েটাও সবুজ দেখবে...।

সহায়ক লিংক:
১. ঈশ্বরের বিশেষ সন্তানদের ইশকুল: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_24.html
২. হরিজন পল্লীর ইশকুল: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_9016.html    

Saturday, July 24, 2010

ঈশ্বরের বিশেষ সন্তানদের ইশকুলের প্রথম দিন

ছোট-ছোট স্বপ্নের [১] একটা অংশ এই ইশকুল। ইশকুলের সময় ৫টা থেকে ৬টা। ইচ্ছা করেই সময়টা কম রাখা হয়েছে কারণ দীর্ঘ সময়ে বাচ্চারা বিরক্ত হবে। একবার পড়ায় এদের অনীহা এলে ধরে রাখা মুশকিল।

ইশকুলের আজ (২৩ জুলাই, ২০১০) প্রথম দিন। আজ আমার যাওয়ার কথা না। কী করব, আমার চেয়ে লোকজনের উৎসাহ প্রবল, বাইক-বয় ২০ কিলোমিটার পথ মাড়িয়ে এসে হাজির। যেতে হয়, ভালই হলো।
আমার ধারণা ছিল, এলোমেলো একটা অবস্থা থাকবে। তেমন কাউকেই পাওয়া যাবে না। ধারণা করি, কাঁটায়-কাঁটায় পাঁচটায় ক্লাশ শুরু হয়ে গেছে। আমরা গেছি ১০ মিনিট পর। ছাত্র আরও ৩জন বেড়েছে। সব মিলিয়ে হলো ২৩ জন। আজ পেয়েছি ২০ জনকে।

হরিজন পল্লীতে যেটা করতাম, বসি বাচ্চাদের সঙ্গে মাদুরে। টিচার নামের পিচ্চি মেয়েটা উঠে দাঁড়িয়েছিল।

তাকে নিষেধ করলাম। এই মেয়ে, তোমাকে কাল কি বলেছিলাম, বাচ্চাদের কাছে আমি যেটা চাইছি, এরা ভাবতে শিখুক এখানে টিচারের উপর কেউ নেই। টিচারের সংকোচ কাটাতে বেগ পেতে হয়।  
আক্ষরিক অর্থেই আমি অভিভূত! আজ গিয়ে দেখি, গতকাল বলে আসা অনেক কাজ এরা করে ফেলেছে। বাচ্চাদের হাতের নোখ ছোট, দাঁত পরিষ্কার। 
টিচারকে জিজ্ঞেস করছিলাম, বাচ্চাদের জন্য আর কি যোগ করা যায়? বাচ্চারা আমাকে শেখায়, বাথরুম থেকে বের হয়ে সাবান দিয়ে হাত ধুতে হয়।
আমি বলি, সাবান না পাইলে কি করবা?
বাচ্চারা চিন্তায় পড়ে যায়।
আমি বলি, সাবান না পাইলে ছাই। আবারও বলি, ছাই না পাইলে?
বাচ্চারা আবারও চিন্তিত। আমি বলি, ছাই না পাইলে মাটি।

সাথে নেয়া চকলেট সবগুলো রেখে এদের বলি, প্রত্যেকে একটা কইরা নিবা। যে দুইটা নিবা সে চোর। 
বাড়তি একটা চকলেট টিচারের জন্য থাকার কথা। আমাকে অবাক করে দিয়ে টিচারের জন্য একটা চকলেট থেকে যায়। হরিজন পল্লীর সঙ্গে এদের ফারাকটা আকাশ-পাতাল। ওখানকার বাচ্চাদের এটাই শেখাতে আমার প্রায় দু-মাস লেগেছে!

রাজা-রানি-রাজকুমার-দুষ্ট-স্কুলের ফাঁকিবাজি-টিচার, বাবা, মার কথা না শোনা-মিথ্যাবাদি-চোর-আল্লাহর শাস্তি-কাক এই রূপকথাটা [২] বলার পর গল্পটা এরা ভালই মনে রাখতে পেরেছে। গল্পের মূল বিষয়টাও চট করে ধরতে পেরেছে। এখন আমার স্থির বিশ্বাস এই বাচ্চারা অনেক অনেক ভালো করবে। 
এবং এটাও আমি মনে করি, হরিজন পল্লীর জন্য যে টিচার রাখা হয়েছে ওই টিচার থেকে ক্লাশ এইট পড়ুয়া এই পিচ্চি মেয়েটা অনেক ভালো করবে। অথচ ওই টিচার প্রফেশনাল, বাচ্চা পড়ানোই ওনার কাজ, সমস্তটা দিন এটাই তিনি করেন। তারপরও আমি ঠিক কি চাচ্ছি এটা সম্ভবত তিনি এখনো ধরতে পারেননি। অথচ এই মেয়েটা চট করে ধরে ফেলেছে। যার নমুনা আমি আজ দেখলাম।

গতকাল এদের যে ছবিগুলো উঠিয়েছিলাম আজ ল্যাপটপে ওই ছবিগুলো দেখিয়ে বলি, তোমরা এখানে কারা কারা আছো খুঁজে দেখো তো। একেকজন নিজেদের খুঁজে পায়, উল্লাসের চিহ্ন ছড়িয়ে পড়ে চোখে-মুখে। নার্গিস নামের মেয়েটি অতি উৎসাহে বলে, আমারটাও দেখব।
আমার মনটা গভীর বিষাদে ছেয়ে যায়। সবার মধ্যে কেবল এই মেয়েটিই চোখে দেখতে পায় না। আমি বিষাদ চেপে তাকে মিথ্যা বলি, তুমি দেখবা কিন্তু এখন তো দেখতে পারবা না। নীচুস্বরে শিখিয়ে অন্যদেরকে  বলি, এই তোমরা বলো নার্গিসের ছবি কেমন এসেছে। সবাই সমস্বরে বলে, সুন্দর। আমি আবারও বলি, কত সুন্দর? ওরা এবার উচুস্বরে বলে, অনেক সুন্দর। নার্গিসের মুখ হাসিতে ভরে যায়।
জানি না হয়তো মনটা ভারী বিষণ্ন ছিল কি না, নার্গিস নামের এই অভাগা মেয়েটার হাসিমাখা ছবি উঠাতে মনে থাকেনি, মনে থাকলে ভাল হতো। খুব ইচ্ছা করছে এই অভাগা মেয়েটার হাসিটা দেখতে...।

সহায়ক লিংক:
১. স্বপ্ন: http://tinyurl.com/3y7bpz3
২. ঈশ্বরের বিশেষ সন্তানদের ইশকুল: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_22.html   

Thursday, July 22, 2010

ঈশ্বরের বিশেষ সন্তানদের ইশকুল, আজ থেকে

রমজান মিয়ার সঙ্গে যখন দেখা হয়েছিল [১] তখন হাতে যে বই দেখেছিলাম তার বাচ্চার জন্য, আজ এখানে বাপ-ব্যাটাকে পেয়ে যাই।

আমার বিস্ময়ের সীমা নেই, এরা ঠিক-ঠিক কথা রেখেছেন। বলেছিলাম, একটা স্কুল-ঘরের ব্যবস্থা করার জন্য। সেই ব্যবস্থা হয়েছে। এটাও বলা হয়েছিল একজন টিচার ঠিক করার জন্য। সেটাও হয়েছে। ভাল রকমই হয়েছে।
এখানে খানিকটা জটিলতা ছিল কারণ এঁরা যেখানে থাকেন এটা প্রায় দুর্গম একটা জায়গা! জায়গাটা চিনে আমার পক্ষে যাওয়াটা প্রায় অসম্ভব ছিল। ডানে-বায়ে-সামনে-পেছনে অনেক হ্যাপা। আবারও সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন 'বাইক-বয়'। তিনি ঝড়ের গতিতে বাইক উড়িয়ে নিয়ে যান, পেছনে আমি আপ্রাণ চেষ্টায় ঝুলে থাকি।

তো, টিচারের যে সমস্যাটা ছিল সেটা এমন, আমাদের এখান থেকে একজনের পক্ষে ওখানে গিয়ে পড়িয়ে আসাটা কঠিন। আসতে যেতেই ম্যালা টাকা খরচ হবে। 
সালমা নামের এঁদেরই একটা মেয়ে পড়ে ক্লাশ এইটে। যে পূর্বে থেকেই এখানকার দু-একজন বাচ্চাকে পড়িয়েছে। এই মেয়েটা পড়ালে বাড়তি সুবিধা যেটা পাওয়া যাবে, বাইরে থেকে টিচার আনার ঝামেলাটা থাকল না, এঁদের নিজেদের লোকজনরাই পড়াবে এবং এঁদেরই একটা পরিবারের আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা হলো।
টিচারকে আমি একটা গাইড-লাইনও দিয়ে এসেছি, পড়ার পাশাপাশি যেটা লক্ষ রাখবে বাচ্চাদের হাতের নোখ ছোট, দাঁত পরিষ্কার, খাওয়ার আগে হাত ধোয় কি না ইত্যাদি। এখানকার লোকজনের একটা কঠিন আবদার, বাচ্চারা আরবিও পড়বে। সমস্যা নাই, সপ্তাহে ২দিন আরবি পড়বে।

মাঝেমধ্যে গল্পও বলা হবে। আমার বানানো একটা গল্প আছে, যেটা আমি হরিজন পল্লীতে বাচ্চাদের শুনিয়েছি। সহজ-সরল একটা গল্প। এক দেশে এক রাজা ছিল। রাজার একটা রানি ছিল। রাজকুমার, তাদের একটা ছেলেও ছিল। রাজকুমার ছিল খুব দুষ্টু। সে স্কুলে যেত না। টিচার, বাবা-মার কথা শুনত না, মিথ্যা বলত, চুরি করত। একদিন ভগবান তার উপর খুব রাগ করলেন। রাজকুমারের গায়ের রঙ কালো হয়ে গেল, সে কাক হয়ে গেল। 
সে কাক হয়ে গেল, গল্পের এখানে আসলেই হরিজন পল্লীর বাচ্চারা শব্দ করে বলে, কা-কা-কা। এটা কেউ এদের শিখিয়ে দেয়নি, এরা নিজে থেকেই বলে। আমি হাসি চাপি।
তো, এখানেও এই গল্প দিয়েই শুরু হবে। হুবহু এটাই বলা হবে, কেবল ভগবানের জায়গায় আল্লাহ হবে। 

এখানে আপাতত ছাত্র-ছাত্রী পাওয়া গেল ২০ জন। ১৯ জনকে এখানেই পেয়েছি, ১জন আজ ছিল না। ঈশ্বরের বিশেষ সন্তান এঁরা, চোখে দেখতে পান না। আহারে-আহারে, একটা মানুষগুলোর দিনরাত নেই, কেবলই রাত! চারপাশে থইথই চাঁদের আলো অথচ সব নিকষ অন্ধকার।
এখানে এখন থাকেন প্রায় ২০টা পরিবার, সবাই পেশায় ভিক্ষুক। এঁদের কেউই চোখে দেখতে পান না কিন্তু তাঁদের সন্তানদের কোন সমস্যা নেই। কেবল একটা বাচ্চাকে পেয়েছি যে চোখে দেখতে পায় না। ব্রেইল পদ্ধতিতে আপাতত শেখাবার কোন ব্যবস্থা এখানে নাই কিন্তু ওই বাচ্চাটার বিপুল আগ্রহ। সে তার টিচারকে বাধ্য করেছে একটা বইয়ে তার নাম লিখে দিতে; এটা তার বই, কেউ হাত লাগাতে পারবে না :)।
এ আপাতত মুখস্ত পড়া পড়ুক। অন্তত স্কুলের ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে সমানতালে চলার ভাবনাটা তার মধ্যে কাজ করুক।
(পেছনের টিনের ঘরটা এদের ইশকুল)। এঁদের যে বিষয়টা আমাকে মুগ্ধ করেছে সেটা হচ্ছে, এঁরা কেউই চান না তাঁদের সন্তানরাও ভিক্ষুক পেশায় আসুক। এটা এঁদের স্বপ্ন। আমি বিশ্বাস করি, স্বপ্ন এবং বাস্তবের মধ্যে ফারাক খুব একটা নাই। এও বিশ্বাস করি, সবাই স্বপ্ন দেখতে পারেন না, এঁরা পেরেছেন।

একদল স্বপ্নবাজদের কাছ থেকে তীব্র ভাল লাগা নিয়ে আমি যখন ফিরে আসছি মাঝপথে এই মানুষটাকে পাই, রাস্তার পাশে। এমন তো আমরা আকসার দেখি কিন্তু এই বৃদ্ধার মধ্যে এমন একটা হাহাকার, নিঃস্ব ভঙ্গি ছিল যে কষ্টটা আমাকে এখনও তাড়া করছে- সমস্ত ভাল লাগা উবে গেছে আমার। বুকে একটা ধাক্কার মতো এসে লাগে। কখনও কখনও নিজেকে বড়ো ক্ষুদ্র-নিঃস্ব-অসহায়-কাতর লাগে। আমার ভাল লাগছে না, ভাল লাগছে না আমার...

:কৃতজ্ঞতা:
আর্থিক সহায়তা: পড়শী ফাউন্ডেশন
লজিস্টিক সাপোর্ট: ফাহমি আজিজ

সহায়ক লিংক:
১. রমজান মিয়া: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_3014.html
২. হরিজন পল্লীর ইশকুল: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_9016.html 

Sunday, July 18, 2010

ইশ্বরের বিশেষ সন্তানদের ইশকুল

রমজান মিয়া। 

কিছু ক্রাচ এবং ব্লাইন্ড স্টিক (এটার ভাল নাম আমি জানি না) আমাকে এনে দেয়া হয়েছে। ঈশ্বরের বিশেষ সন্তান [১], যারা চোখে দেখতে পান না তাঁদেরকে দেয়ার জন্য।

অনেকেই আছেন জন্ম থেকেই দেখতে পান না। এমন একজন রমজান মিয়ার সঙ্গে কথা হচ্ছিল। কিন্তু মানুষটার হাতে ঘড়ি দেখে আমি থমকে যাই। মনে আমার একগাদা সন্দেহ- মানুষের প্রতি চট করে অবিশ্বাস করাটা আমাদের মজ্জাগত!। আমরা সন্দেহের বোঁচকাটা সঙ্গে নিয়েই ঘুরে বেড়াই, আমিও তো এদেরই একজন।

আমি অবিশ্বাসের বোঁচকাটা খুলতে খুলতে রমজান মিয়াকে বলি, আপনে ঘড়ি দিয়া কি করেন?
রমজান মিয়া খানিকটা বিরক্ত, ঘড়ি দিয়া মাইনষে কী করে! টেম দেখি।
না, মানে বলছিলাম কি, আপনি তো চোখে দেখতে পান না। সময় দেখেন কেমন করে?
রমজান মিয়া বলেন, দাঁড়ান, আপনেরে কই কয়টা বাজে।
তিনি ঘড়ির একটা বোতামে চাপ দিলে শব্দ বের হয়, এতোটা বেজে এতো মিনিট। আমি হাঁ। এই সম্ভাবনা আমার মাথাতেই আসেনি।

রমজান মিয়ার হাতে বাচ্চাদের একটা ছবিওয়ালা বই দেখে অবাক হয়ে জানতে চাই, এই বই দিয়া কি করবেন? আইজকা কিনলাম। এইটা আমার বাচ্চা পড়ব।
আপনার বাচ্চা কোথায় পড়ে?
একজন মাস্টার কইছে টেকা দিলে সপ্তাহে একদিন পড়াইব।
আমি চকচকে চোখে বলি, আমাদের একটা স্কুল আছে, আপনার বাচ্চাকে ওখানে দিলে পড়তে পারবে, টাকা-পয়সা লাগবে না।
মানুষটা রাজি। আনন্দিত গলায় বলেন, যদিও ম্যালা দূর, কষ্ট হইব। তারপরও আমি বাচ্চাটারে নিয়া আমু, আবার নিয়া যামু।

আমি অনেক ভেবে দেখলাম, স্কুলটা যে জায়গায় ওখান থেকে রমজান মিয়া যেখানে থাকেন ৮/১০ কিলোমিটারের কম হবে না। রমজান মিয়া করেন ভিক্ষা। এই বাচ্চাটা পড়ার পর তার বাবার সঙ্গে সঙ্গে স্টেশনে ঘুরবে। এবং এ দেখবে, শিখবে, হাত বাড়ালেই অনায়াসে পয়সা পাওয়া যায়। যে একবার হাত বাড়িয়ে টাকা আয় করার কৌশলটা শিখে যায় সে আর এই চক্র থেকে বেরুতে পারে না।
আমাদের দেশে ভিক্ষুকদের টাকা-আধুলি দিয়ে দানবীর সাজার আগ্রহটা আমাদের মধ্যে আবার প্রবল। তাছাড়া হরিজন পল্লীর বাচ্চাদের সঙ্গে অন্য বাচ্চাদের মেশালে কিছু অহেতুক ঝামেলার সৃষ্টি হবে। যেটা আপাতত আমি চাচ্ছি না।

যেমন হরিজন পল্লীর ইশকুলে [২] গিয়ে আমি একদিন বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করলাম, বাচ্চারা আমাকে আসসালামুয়ালাইকুম বলছে। মাস্টার মশাইকে আমি নিষেধ করলাম। বললাম, এরা আদাব-নমস্কার যা বলে তাই শেখান। কারণটাও আমি ব্যাখ্যা করলাম। এদের বাবা-মার মনে যেন অহেতুক এই আতংকটা কাজ না করে যে, আমরা ইশকুলের নামে এদের বাচ্চাদেরকে অন্য ধর্মে শিক্ষা দেয়ার চেষ্টা করছি।

রমজান মিয়ার কাছেই পাই চমৎকরণ তথ্য। তিনি যেখানে থাকেন সেখানে ১৫টা পরিবার থাকে। বয়স্করা সবাই অন্ধ। প্রত্যেক পরিবারের ১জন সন্তান ধরলেও ১৫ জন হয়। আমি রমজান মিয়াকে বলি, আচ্ছা, ওখানে একটা স্কুল খুললে কেমন হয়?
রমজান মিয়ার বিশ্বাস হয় না। কেন হয় না কে জানে! যখন খানিকটা বিশ্বাস হয় তখন তাঁর মুখভর্তি হাসি!

আমি আবারও বলি, একজন মাস্টার রেখে দিলে আপনারা কি আমাকে ১ ঘন্টার জন্য একটা ঘরের ব্যবস্থা করে দিতে পারবেন? যেখানে আপনাদের বাচ্চারা পড়বে।
মানুষটা সব শর্তেই রাজি। কী তীব্র প্রকাশ তাঁর বাচ্চা পড়বে এই আনন্দে।

আমি বেদনার শ্বাস ফেলি, ঈশ্বরের এই সব বিশেষ সন্তানদের যাদের অধিকার [২] আমাদের চেয়েও বেশি থাকা প্রয়োজন ছিল তাঁরা কেন এই নিয়ে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলায় দুলবেন? আকিতার মার [৩] মতো এরাও কেন বলতে পারেন না,
"পৃথিবীতে অনেক লোক আছে যারা চুরি করে, অনেকে আবার নিজের অপকর্ম বা পাপের কথা স্বীকার করে না। মা বলতেন, তুমি তো একটা ঘটনার স্বীকার মাত্র। প্রকৃতি তোমার প্রতি অন্যায় করেছে, তাই তুমি এই রোগের সংস্পর্শে এসেছ, যাতে তোমার কোন হাত নাই! ...যখন কারো সঙ্গে কথা বলবে, তার চোখে চোখ রেখে কথা বলবে, বিন্দুমাত্র বিব্রতবোধ করবে না!"


আফসোস, এঁদের তো চোখে চোখ রাখার সেই ক্ষমতাটুকুও নাই! 
এঁদের এখানে সহসাই যাওয়ার ইচ্ছা আমার। একটা স্কুল চালাবার মত বাচ্চা থাকলে একটা স্কুল খোলা হবে।

তোতা যেমন বলে, ছোলা দে। তেমনি আমিও বলি, টাকা দে। ছোলা কোত্থেকে আসবে এটা যেমন তোতার জানার প্রয়োজন নাই তেমনি টাকা কোত্থেকে আসবে এটাও আমার জানার প্রয়োজন নাই।
এটা 'পড়শী ফাউন্ডেশন'-এর সমস্যা, আমার না।

সহায়ক লিংক:
১. ঈশ্বরের বিশেষ সন্তান: http://www.ali-mahmed.com/2010/05/blog-post_03.html 
২. ইশকুল: http://www.ali-mahmed.com/2010/07/blog-post_9016.html 
৩. আকিতার মা: http://www.ali-mahmed.com/2010/05/blog-post.html