Search

Showing posts with label ‘কয়েদি’ বই থেকে অংশবিশেষ. Show all posts
Showing posts with label ‘কয়েদি’ বই থেকে অংশবিশেষ. Show all posts

Wednesday, September 15, 2010

মৌসুমি লেখক: ২

লেখক সাহেবের লেখা এগুচ্ছিল তরতর করে কিন্তু এখন কলম চিবুচ্ছেন। লেখা আটকে গেছে। ডান হাতে লেখকদের আঙুল নাকি ছয়টা, কলমসহ- অন্য আঙুলগুলো চিবুলে ব্যথা হয় বলে ‘কলম আঙুল’ চিবুচ্ছেন।
যে  হরতাল লেখককে অখন্ড অবসর এনে দিয়েছে সেই হরতালের জন্য বেনাপোল সীমান্তে চার হাজার ট্রাক আটকে আছে, পচনশীল দ্রব্য সব পচে যাচ্ছে। চট্টগ্রামে রপ্তানীযোগ্য চিংড়ি দূর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, এ নিয়ে লেখক মাথা ঘামাচ্ছেন না। লেখক-টেখকদের এই সব তুচ্ছ বিষয় নিয়ে মাথা ঘামালে চলে না। লেখকদের অনেক বড়ো বড়ো সমস্যা নিয়ে মাথা ঘামাতে হয়। চাঁদ থেকে কতটা জ্যোৎস্নার ছটা ছিটকে পড়ল, মগ দিয়ে কেমন করে জ্যোৎস্না ঢেলে গোসল করতে হয় এই সব।

মোদ্দা কথা, হরতালের কারণে, অবসরে তিনি লিখতে পেরে আনন্দিত, এই মুহূর্তে জটিল সমস্যা তাঁকে কাবু করে ফেলেছে। যে উপন্যাসটা লিখছেন এটা একটা রাজনৈতিক উপন্যাস। একজন খারাপ মানুষ কী এক বিচিত্র কারণে ভালোমানুষ- ভালোমানুষ খেলা খেলে, কু ছাপিয়ে সু উঠে আসার সেই চেষ্টা আর কী! উপন্যাসের নাম ... উহু, এখন যেটা দিয়েছেন সেটায় জোর আছে কিন্তু পতিতার মত বহুভোগ্যা বহুল ব্যবহারে... তিনি চাচ্ছেন উপন্যাসের নামটা অন্যভাবে দিতে।
আচ্ছা, ওই জায়গাটার  নামটা যেন কী, স্বর্গ নরকের মাঝামাঝি জায়গাটা...এইখানেই লেগেছে গেরো। স্বর্গ নরকের মাঝামাঝি জায়গাটার চমৎকার একটা নাম আছে। এই মুহূর্তে মনে করতে পারছেন না। ঝড়ের গতিতে অভিধান-শব্দকোষের পাতা উল্টাচ্ছেন। ফলাফল শূণ্য। দিন যায়, রাত যায়! লেখকের দীর্ঘশ্বাস ভারী হয়। লেখা আটকে গেছে- লেখা আটকে যাওয়ার এই কষ্টটা অন্য কেউ বুঝবে না। অন্যভাবে লিখে দিলেই হয় কিন্তু তা তিনি করবেন না।

তিনি মনে করেন অশিক্ষিত নারী এবং জন্তু প্রসব করে বেশি। কিন্তু এই অখ্যাত নির্বোধ লেখক বুঝতে চাচ্ছেন না তিনি বিখ্যাত লেখক মিরোশ্লাফ হোলুব না, যে তাকে মোটা অংকের স্কলারশীপ দিয়ে সসম্মানে বার্লিন নিয়ে যাওয়া হবে। হোলুব ঘুরে বেড়াবেন, আলস্য কাটিয়ে উঠলে ইচ্ছা হলে লিখবেন। লিখবেন, যা-খুশী! হোলুব এক বছরে মাত্র একটি কবিতা লিখবেন দয়া করে, যে-কবিতা  ঘষামাজা করতে লাগবে আরও বছরখানেক। অবশেষে লেখকের মনে পড়ল, লেখা এখন এগুলো দুর্দান্ত গতিতে। রক্ত চাই-রক্ত চাই টাইপের লেখা:

“আমি, আমি কে? আমি কেউ না এটা জাঁক করে বলতে পারলে বেশ হত। বেশ একটা সাহিত্যি-সাহিত্যি ভাব চলে আসত কিন্তু ব্রাদার আমি তো আর সাহিত্যিক-টাহিত্যিক না, ছা-পোষা একজন সন্ত্রাসী। ছা-পোষা অবশ্য বিনয় করে বললাম কারণ বিশ্ববিদ্যালয় পাড়ায় আমাকে একডাকে চেনে। আমার নাম? উঁহু, এটা আপনাদের বলব? 'পাগাল, কাভি নেহি'। কইমাছের প্রাণ এমন কাউকে কাউকে ‘ইন্নালিল্লাহ ’ বা ‘রাম নাম সাত্য হ্যায়’ অথবা ‘জিশু তার আত্মাকে শান্তি দিক’ এইসব দুর্লভ ভূষণে যদি কাউকে ভূষিত করতে চান তো সোজা চলে আসুন এই অভাজনের কাছে। ইয়ে, টাকাকড়ি সঙ্গে নিয়ে আসবেন এটা বলে আপনাদের সূক্ষ্মবুদ্ধি খর্ব করতে চাচ্ছি না। কলাগাছ ফেলবেন অথচ খালি হাতে আসবেন এ তো আর মামা বাড়ির আবদার না। ক্ষমা করবেন, আপনাদের সঙ্গে একটু উঁচু গলায় কথা বলে ফেললাম। আহা, আপনারাই তো আমার 'মাই বাপ'। কী অবলীলায়, কী অনায়াসেই না আমার হাতে অস্ত্র তুলে দিলেন, আমার লম্বা লম্বা শিল্পীর আঙুলে ট্রিগার পেঁচিয়ে মায়াভরা গলায় বলেছিলেন, ডোন্ট টক, শ্যূট-শ্যূট! প্লিজ-প্লিজ, হইচই করবেন না, বেশ বুঝতে পারছি আপনারা বুক ঠুকে সদম্ভে বলছেন: আমরা, আমরা কেন, আমরা তো ভালমানুষ। এই দেখুন, কী যন্ত্রণা, ভালমানুষের কথা ভাবতেই মুখে একগাদা থুথু জমেছে। ভাই, থুতু নিয়ে তো কথা বলতে পারব না। হোল্ড অন প্লিজ, থুথুটা ফেলে দেই- থু, থু!

তো কি বলছিলাম? কিরুপে হামার খোঁজ পাইবেন? কেন ভাই, এখনি কি কাউকে ফেলে দিতে চান? চাইলে প্রয়োজন হলেই চলে আসবেন। ও হ্যা, আমি বলছিলাম আপনাদের ভালমানুষির কথা। আপনারা তো আবার ভারি অহংকার নিয়ে বলেন, আমার সোনার বাংলা...ই ই ই। আমি ভাই ছা-পোষা সন্ত্রাসী বিনয় করেই বলি, আমার প্রাণপ্রিয় সোনার বাংলা নামের মাটির বাংলাকে নিয়ে এ-ও-সে যেভাবে খুশি যেভাবে ইচ্ছা বলৎকার করছে আর আপনারা উচ্ছ্বসিত দর্শক গোল হয়ে দাড়িয়ে-বসে-ঘুমিয়ে 'আহা কী আনন্দ আজি এ আকাশে' গাইছেন। কী বললেন? ধর্ষণ যখন অবধারিত তখন উপভোগ করাই শ্রেয়। তা বেশ, গা বাঁচিয়ে মন্দ বলেননি, একপাল শকুন মাংস খুবলে খুবলে ডিনার সারবে আর আমরা যারপরনাই বিস্মিত হয়ে বলব: শকুনের বাচ্চা শকুন, মাংসটা সিরকায় ডুবিয়ে নরোম করে নিবি, তা-না অনন্তকাল ধরে চিবিয়েই যাচ্ছিস। হ্যা-রে, তোর চোয়াল ব্যথা করে না?

আপনাদের প্রিয় মানুষ জনতার সেবক এ দেশকে কিছুই দিতে পারেননি এটা আমি মন্দমানুষও বলি না। পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে জনবহুল দেশ হওয়ার সম্ভবনা, এ বিরল সৌভাগ্য এনে দিয়েছেন। এই যে টানা এতদিন সমগ্র দেশ অচল করে দেয়া হয়েছে নো-কাজ, নো-কাম। ধর্মে ভরাপেটে অবশ্য ওইসব করা নিষেধ আছে; ভাগ্যিস, বিশাল একটা কারাগারে আটকে এ অভূতপূর্ব সুযোগ সৃষ্টি হয়েছেবাজারে আগুন, পাকস্থলি ভরো-ভরো থাকার সম্ভাবনা নেই যখন তো দিনরাত বাচ্চা পয়দা করো । বুঝলেন, দেশের এহেন অগ্রগতিতে আপনাদের সঙ্গে আমার কোনো সহযোগীতা নেই ভাবলেই মনটা ভার-ভার হয়। কি করব বলুন, আমার তো আর আপনাদের মতো দু-একটা বউ নেই। অবশ্য আমার বউ এর প্রয়োজনই বা কী বলুন, পরিচিত সবারই তো একটা করে বউ আছে। আমি যে মহান জনসেবকের ছত্রছায়ায় নিরুদ্বিগ্ন জীবন যাপন করছি, ওঁর সমস্ত কাজই তো অন্য কেউ করে দেয়। ওঁর বাবা হওয়ার ক্ষমতা আল্লাহপাক ওনাকে দেননি অথচ ওনার একমাত্র ছেলে আরিজোনায় পড়াশুনা করছে। তো, জনসেবকের বেগব সাহেবা আবার কখনো-সখনো তাঁর বিছানাটা এই অধমকে ধার দেন। অথবা ধরুন গিয়ে ‘মহিলা কসাই’, এই যারা ঘুরে ঘুরে নোংরা কটা কাগজের বিনিময়ে মাংস বিক্রি করেন। আফসোস, এরা কেউই আমার সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখাতে চান না। আফসোস, বড়ই আফসোস! এইসবে এখন আর মজা পাই না বুঝলেন, বিশ্বাস করুন, একেকটা 'ঠান্ডা গোসত'। বুঝলেন, ভেজা বারুদে আগুন ধরাতে ভাল্লাগে না।

হা হা হা। ফানি! হুটহাট করে আপনাদেরই কেউ কেউ গরুর মতো মায়া-মায়া চোখে বলেন: ফিরে এসো খোকা। মাইন্ড ইয়োর ল্যাংগুয়েজ সার, আমি তো আর এখন ছোট্ট খোকা না, আপাদমস্তক দানব। আপনাদের এইসব মূর্খতা দেখে যারপরনাই বিস্মিত হই। মানব চট করে দানব হয়, দানব থেকে বাচ্চা-দানব হতে পারে বড় জোর কিন্তু দানব থেকে মানব হওয়া যায় না। আভূমিনত প্রণাম গ্রহন করুন মহান মনুষ্যজাতি, কী অপরিসীম ক্ষমতা আপনাদের- আমার নিউক্লিয়াসের তথ্য পর্যন্ত গোলমাল করে দিয়েছেন। এখন যা খুশি তাই করতে পারি। চুইংগাম চিবুতে চিবুতে মেরে ফেলতে পরি আমার প্রিয় সৃষ্টিকর্তাকে যিনি গভীর মমতায় এই আমাকে দানব বানিয়েছিলেন। হাসি-হাসি মুখে লাশ ফেলে দিতে পারি আপনারও। কী বিশ্বাস হচ্ছে না? তাহলে তো ভাই আপনাকে মরিয়া প্রমাণ করিতে হইবে সত্যি-সত্যি মরিয়া গিয়াছেন।
এ দেশের জনসেকদের মতো আমারও মৃত্যু নাই- সিন্দাবাদের ভূতপ্রেতের মতো জনতার ঘাড়ে চেপে বসে থাকব। জনসেবক যেখানে, আমি আছি সেখানে।


কার্ল সাগান সাহেব তাঁর The Dragons of Eden-এ বলেছেন: 'আমরা যাকে কখনো কখনো মন বলি তা হচ্ছে ব্রেন। আর এই ব্রেনের কাজ কর্ম হচ্ছে শরীরের যাবতীয় নাট-বল্টুর নড়াচড়ার ফলাফল'। মাফ করবেন, অনুবাদটা কাজ-চলা গোছের হল। বেশ বুঝতে পারছি বিস্ময়ে আপনাদের চোখ বড় হয়ে এসেছে। অজান্তেই বলে ফেলেছেন: ওই মা, ব্যাটা দেখি, ‘শিকখিত’ আছে। এ তো ক-অক্ষর গোমাংস অকাট মূর্খ না, এ-বি-সি-ডি ছাড়াও কিছু জানে! হোয়াট ননসন্স, ফাজলামো নাকি? প্রায় দশ-পনের বছর ধরে ছাত্রনেতার জোব্বা গায়ে দিয়ে নিরলশ অধ্যয়ন করছি না বিশ্ববিদ্যালয়ে! এ কিন্তু ভারি অন্যায়, নিজেরা মূর্খ বলে সব্বাইকে মূর্খ ভাবেন। কী ভাই, মূর্খকে কি মূর্খ বলতে নাই! কিন্তু ভাই, নারকেল গাছ কিসে তোমার পরিচয়, নারকেলে? আপনি যদি নেহায়েৎ গোঁ ধরে বলেন না-না আমগাছ, বেশ!
একটা শেষ-হয়ে আসা নাটকের কথা বলি, আপতত আমি যে ‘বড় ভাই’ এর কোলে বসে থাকি, এই তো সেদিন ঝকঝকে এক তরুনের পাসপোর্ট সাইজের একটা ছবি দিয়ে আড়মোড়া ভেঙে বললেন, এই মুখ আমার পছন্দ না একে এমন একটা মুখবন্ধ বাক্সে ফেলে দাও যে বাক্স কেউ কোনোদিন খুলবে না। এই শুয়োরের বাচ্চা কাউকে চিরতরে সরিয়ে ফেলার নির্দেশ এভাবেই দেন। চিনে রাখার চেষ্টায় ভাল করে তাকালাম, বিশ-বাইশ বছরের এই ছেলের চোখগুলো কী মায়া-মায়া। অল্পক্ষণ তাকালেই চোখ ধাঁধিয়ে যায়, গা-ছমছম করে। একজন যন্ত্রদানবের তো এতসব দেখলে চলে না। যথারীতি নির্দেশ পালিত হল।


বড় ভাই তো আবার প্রখ্যাত জনসেবক তাই মৃতের পরিবারকে এই চরম দুঃসময়ে সান্ত্বনা না দিলে আপনারাই তো আবার ভারি গোলামাল করবেন। সর্বজনশ্রদ্ধেয় বড় ভাই সাঙ্গোপাঙ্গ সাংবাদিকসহ যথাসময়ে উপস্থিত হলেন। মৃতের মা-বোন লাশের উপর ঝাঁপিয়ে চিৎকার করে কাঁদছিল: খোকা-খোকা, তুই ফিরে আয়। বড় ভাইয়ের উপস্থিতি হারিয়ে-যাওয়া মানিকের মতো এ পরিবারে খানিকটা স্বল্পমেয়াদি স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে এল। বড় ভাই তাঁর স্বভাব অনুযায়ী পরিবারের একজনকে বেছে নিলেন- তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদার মতো একটা ভাব করলেন। কাছে-পিঠে দাঁড়ানো সাংবাদিকগণ নিমিষে অতি তৎপর হলেন। পরদিন প্রায় সমস্ত দৈনিকে বিশাল বিশাল হেডিং-এ বড় ভাইয়ের কাঁদো-কাঁদো চেহারা মোবারকের ছবি ছাপা হল।
জনগণ সব্বাই মুগ্ধ। থ্যাঙ্ক গড, মুগ্ধতা চুঁইয়ে পড়ার ব্যবস্থা নেই নইলে অসময়ে বন্যা বয়ে যেত। যাক, চিন্তার কিছু নেই ওই মৃত ছেলে আপনার আমার ভাই-বন্ধু কেউ না। খানিকটা সমস্যা অবশ্য থেকেই যাচ্ছে । পৃথিবীর সবচাইতে ভারী ওজন এ মুহূর্তে ধারণ করে আছেন যিনি- মৃত সন্তানের যে-লাশ, যে-পিতা শিরদাঁড়া বাঁকা করে আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, অনঢ়। তিনি, তিনি কি ভাবছেন? যে-সব জনতার সেবক জনগণের সেবা করবেনই বলে পণ করে আছেন তাদের সবাইকে জড়ো করে বঙ্গোপসাগরে ফেলে দিতে? কী লাভ, এদের শূণ্যস্থানে অন্য কেউ আসবে। অবশ্য এ-ও সত্য এরিমধ্যে দেশ বহুদূর এগিয়ে যাবে। নোংরা সে-সব মানুষদের সঙ্গে আমাকেও ছুঁড়ে ফেলো হে পিতা, দেখো তখন যেন তোমার চোখের পাতাটিও না কাঁপে।”

লেখক উপন্যাসের নাম কেটে গোটা গোটা অক্ষরে লিখলেন, পশুর পিঠে শিশু। কারণ তিনি জানেন এমন রগরগে নাম পাবলিক খাবে ভাল... 

মৌসুমি লেখক, ১: http://www.ali-mahmed.com/2010/09/blog-post_14.html

Tuesday, September 14, 2010

মৌসুমি লেখক: ১

ওঁ একজন লেখক। তেমন জনপ্রিয় নন। জনপ্রিয় নন এই জন্য তাঁর এখনও কোনও সাক্ষাৎকার ছাপা হয়নি। বহুদিনের স্বপ্ন ওঁর কোনও-না-কোনও দিন, কখনও-না-কখনও, কোথাও-না-কোথাও একটা সাক্ষাৎকার ছাপা হবেই। সাক্ষাৎকারে অতি প্রয়োজনীয় একটা প্রশ্ন থাকে, আপনি কি খেতে পছন্দ করেন? লেখক তখন আলাদা একটা ভাব নিয়ে বলবেন, তিমি মাছের ঝোল। সঙ্গে এটাও বলবেন, আফসোস, চাইলেই এই দুর্লভ ঝোলটা রেস্টুরেন্টে পাওয়া যায় না।

বয়স প্রায় চল্লিশ ছুঁই ছুঁই হলে তাকে কি যুবক বলা চলে? বেশ, তাহলে লেখক যুবক। এখনো ‘চির কুমার সভা’র সদস্য। বিয়ে করবেন কিন্তু কাকে? অন্তত একটা মেয়ে তো প্রয়োজন! ভালবাসাবাসির কোনও মানুষ না থাকলে বিয়ে করবই পণ করলেই তো আর বিবাহযোগ্য মেয়ে পয়দা হয় না। অবশেষে ‘পাত্রী চাই’ বিজ্ঞাপনই শেষ ভরসা। বিজ্ঞাপনটা লিখলেন নিজেই। কপটতা, ছাপাছাপি লেখকের অপছন্দ বলেই বিজ্ঞাপনটা দাড়াল এরকম:
"ত্রিশ দাঁত বিশিষ্ট (৫-১১) একজন ‘লেখক কাম ব্যবসায়ী’ মুসলিম গ্রাজুয়েট পাত্রের জন্য পাত্রী খোঁজা হচ্ছে। এক কাপড়ে এবং অনুষ্ঠান ছাড়া বিয়েতে আগ্রহী পরিবারের লোকজন যোগাযোগ করুন।"
লোকজন জোর নিষেধ করে বলল: এ বিজ্ঞাপন ছাপা হলে সমস্যা হবে।
লেখক ভারি অবাক হলেন: সমস্যা হবে কেন?
ফাজিল ধরনের চিঠি আসবে।
ফাজিল ধরনের চিঠি আবার কি রকম?
এই বখা ছেলেরা মেয়ে বা মেয়ের অভিভাবক সেজে ফাজলামো করবে।


এইসব নিষেধ লেখককে খুব একটা কাবু করল না। ওঁর এক আত্মীয় একটা খবরের কাগজে চাকরি করেন তাকেই কাজটা গছিয়ে দিলেন।
আত্মীয় বেচারা দুদিন পরেই মুখ শুকিয়ে এলেন, এই বিজ্ঞাপন আমাদের কাগজ ছাপবে না।
লেখক অবাক, কেন, ছাপবে না কেন?
আমাদের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক বলেছেন: এটা উম্মাদ-কার্টুন পত্রিকার অফিস না।
সমস্যাটা কি?
আত্মীয় এবার রাগী গলায় বললেন, এই সব কি লিখেছেন ‘ত্রিশ দাঁত বিশিষ্ট’ লেখক কাম ব্যবসায়ী, হাবিজাবি।
লেখক এবার চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন: সাদাকে সাদা বলিতে পারিব না! সাদাকে কি গাধা বলিতে হইবে?  আল্লাহপাকের নির্দেশে ডেন্টিষ্ট বাবাজী আমার দুটা দাঁত শখ করে রেখে দিয়েছেন, এতে তো আমার হাত নাই ব্রাদার।
পাত্রী চাই বিজ্ঞাপনে দাঁতের প্রসঙ্গ আসছে কেন?
আসছে এই জন্য, বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে লোকজনকে একটা ইঙ্গিত দেয়ার চেষ্টা করেছি যে আমার গোপন করার কিছু নাই। আর ‘লেখক কাম ব্যবসায়ী’ লেখালেখির পাশাপাশি ব্যবসা করি এটা বললে অনেকে তাচ্ছিল্য-তাচ্ছিল্য ভঙ্গি করে বলেই হিউমার করে এটা লেখা। অনেকের বদ্ধমূল ধারণা লেখক মানেই ওরাংওটাং টাইপের একটা কিছু। একজন লেখকের পোশাক-পরিচ্ছদ থাকবে অপরিছন্ন, সস্তা, চুলের সঙ্গে চিরুনির কি সম্পর্ক এ নিয়ে থিসিস সাবমিট করবেন, আকন্ঠ মদ্যপান করে নর্দমা কেন রাস্তার মাঝখানে এ নিয়ে মাঝরাতে নর্দমার সঙ্গে কাপড় খুলে ঝগড়া করবেন। বড় বড় নোখ দিয়ে বেশ্যাকে অহরহ খামচাবেন। অনেকেরই ধারণা লেখক-টেখকরা অন্যভুবন থেকে এ গ্রহে আসেন দেশ উদ্ধার করার মিশন নিয়ে। লেখালেখি ছাড়া কিছুই করবেন না।


আত্মীয় বেচারা পড়লেন মহা ঝামেলায়। তিনি ছা-পোষা চাকুরে, সাহিত্য-টাহিত্য বঙ্গোপসাগরে ভেসে যাক তার কী! কম্বল ছেড়ে দিতে পারেন কিন্তু কম্বল ছাড়বে কেন, নৈব নৈব চ!
লেখক এইবার হংকার দিলেন: এই-এই, তোমাদের কাগজের একজন কর্মীকে জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানিয়ে তার সহকর্মীরা- কি মনে  পড়ছে না ওই দিনের বিজ্ঞাপনটা: কবি-উপন্যাসিক-গদ্যকার্টুনিষ্ট-কলাম লেখক-সাংবাদিক-প্রকৌশলী ও সদ্য আমেরিকা ফেরত অমুককে জানাই জন্মদিনের শুভেচ্ছা। সদ্য আমেরিকা ফেরত কি এই ভদ্রলোকের উপাধি? নামের শেষে কি লেখা হবে স.আ.ফে? এটা কি স্থূল বিজ্ঞাপন না? তখন কি সূক্ষ্মরুচি ভোঁতা হয়ে যায় এই জন্য, এরা তোমাদেরই পত্রিকার লোক, সেই জন্যই কি তোমাদের ব্যবস্থাপনা সম্পাদকের অসুস্থ হওয়ার সংবাদ আসে তোমাদের পত্রিকার প্রথম পাতায়?
আত্মীয় বেচারা লেখকের কাছ থেকে পালিয়ে বাঁচলেন এবং মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলেন, এই জিনিস যন্ত্রদানব ট্রাকের মতই ভয়াবহ। ইহার নিকট হইতে একশো হাত দূরে থাকিবেক। লেখকের আত্মীয় হওয়ারও দূর্ভাগ্যও কম না। এরা বড় যন্ত্রণা করে, চারপাশের লোকজনকে জ্বালিয়ে মারে। এটা এমন কেন, ওটা তেমন কেন? আরে ব্যাটা এত কথা কিসের! 
লেখক একমনে লিখে যাচ্ছেন। হরতাল-অবরোধের কারণে অখন্ড অবসর এ বিরল সৌভাগ্য এনে দিয়েছে। সময়ের অভাবে লেখালেখি হয় না। এইবার একটা উপন্যাস নামিয়ে ফেলবেন বলে পণ করেছেন।

Sunday, May 23, 2010

কয়েদী: রেল-বাড়ি: ২

উপবন ট্রেনটা সিলেট স্টেশন থেকে ছেড়েছিল কাঁটায় কাঁটায় দশটায়। ভোর পাঁচটার দিকে ঢাকা পৌঁছার কথা। ইঞ্জিনে সমস্যা দেখা দিল। আখাউড়া জংশন পৌঁছতেই ভোর ছ’টা বেজে গেল। ওদের টিকেট শোভন চেয়ার কোচের কিন্তু বগিগুলো প্রায় ফাঁকা। ইতিমধ্যে বিভিন্ন স্টেশনে লোকজন নেমে গেছে। আখাউড়া এসে সেই যে ট্রেন দাঁড়াল আর নড়াচড়া নেই।

সাকিব শূণ্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। লুবাবা ইচ্ছার বিরুদ্ধে সাকিবকে পাঠিয়েছিল স্টেশনে খোঁজ নিয়ে আসতে। সাকিব ফিরে এসেছিল শুকনো মুখে, চোখে ভীত দৃষ্টি।
লুবাবা ভয়ে ভয়ে জানতে চাইল, জিজ্ঞেস করলে ট্রেন ছাড়ছে না কেন, হরতাল তো শুরু হয়ে গেছে।
হুঁ।
আঃ সাকিব, কি হয়েছে বলো!
টঙ্গির কাছে রেললাইন উপড়ে ফেলেছে, ট্রেন আর যাবে না।
ক্কি, কি বলছ এসব!
হুঁ।
ট্রেন টঙ্গি পর্যন্তও যাবে না?
না। ওরা বলছে দু-স্টেশনের মাঝখানে আটকা পড়লে নিরাপত্তার সমস্যা হবে।


লুবাবার মত শক্ত মেয়েও ভেঙে পড়ল। হায় হায় এখন কি হবে? ট্রেনের গার্ড এসে বলল, সার, আপনাদের তো নেমে যেতে হবে।
সাকিব অবাক হল: কেন নামব কেন?
ট্রেনের এমাথা থেকে ওমাথা পর্যন্ত সমস্ত দরজা জানালা বন্ধ করে তালা মারতে হবে। এভাবে খোলা রাখলে ট্রেনটার তো লোকাল ট্রেন থেকেও খারাপ অবস্থা হবে। সিট-ফিট সব খুলে নিয়ে যাবে।
সাবিক চেঁচিয়ে উঠেছিল: পেয়েছেন কি আপনারা, মগের মুল্লুক, সময়মত ট্রেন পৌঁছাতে পারেন না আর এখন বলছেন নেমে যেতে হবে। হোয়াই, কি করবেন, জোর করে নামিয়ে দেবেন? নামান তো দেখি, ইয়েস-ইয়েস। টাচ মি, টাচ মি নাউ। গায়ে হাত দিয়ে দেখুন, দিন না, দিন না গায়ে হাত।


লুবাবা জোর করে সাকিবকে বসিয়ে দিল। নরোম গলায় বলল: গার্ড সাহেব, প্লিজ ওর আচরণে কিছু মনে করবেন না, ওর মার খুব অসুখ। খবর পেয়ে আমরা ঢাকা যাচ্ছিলাম। প্লিজ, গার্ড সাহেব, প্লিজ, আপনিই দয়া করে বলুন আমরা এখন কি করব?
গার্ড সাহেব আর্দ্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। অল্পক্ষণ ভেবে বললেন: আমার ক্ষমতায় থাকলে আপনাদেরকে ঢাকায় পৌঁছে দিলাম কিন্তু আমি নিরুপায়, সে উপায় নেই। আপনাদের কোথায় যে থাকার ব্যবস্থা করি? আমি তো থাকব রানিং রুমে। পুরুষ হলে সমস্যা ছিল না আপনাকে নিয়েই সমস্যা।
লুবাবা বলল: এখানে ভাল হোটেল আছে না?


গার্ড সাহেব একজনকে হোটেলের খোঁজে পাঠালেন। সে ফিরে এলে জানা গেল আজেবাজে ধরনের যে দু-একটা হোটেল আছে ওগুলোতেও জায়গা নেই। গার্ড সাহেব প্রচুর ছুটাছুটি করেও কোনো ব্যবস্থা করতে পারলেন না। দেখে লুবাবার মায়াই হচ্ছিল। শেষ পর্যায়ে গার্ড সাহেব করুণ গলায় বললেন: আফসোস, আপনাদের জন্য কিছুই করতে পারলাম না।
লুবাবা ইতস্তত করে বলল: ভাই, আমরা এই রেলের কামরায় থাকলে আপনার কি খুব সমস্যা হবে?
গার্ড সাহেব গর্জে উঠলেন: হলে হবে, কি আর হবে ঘোড়ার ডিম, বেশি-বেশি চাকরি চলে যাবে। আপনারা এক কাজ করেন, এই কামরায় না থেকে প্রথম শ্রেণীর স্লিপিং কোচে চলে যান। আরামে থাকবেন এবং ওই কামরা এটার চেয়ে সেফ। ট্রেনের দরজা জানালা আমি বন্ধ করিয়ে দিচ্ছি।


এবার সাকিবের দিকে ফিরে বললেন: একটা চাবি আপনাকে দিয়ে যাব ডাইনিং কার দিয়ে আপনি খুলে ঢুকতে এবং বেরুতে পারবেন। অন্য দিক থেকে বের হলে লোকজন কৌতুহলী হবে। এমনিতে কোনো সমস্যা নেই তবুও সতর্ক থাকা উচিত। শক্ত হন, সাহস হারাবেন না। কোন-না-কোন একটা রাস্তা বেরুবে। সুযোগ করে আমি আপনাদের খোঁজ-খবর নেব। অন্য কোনও ব্যবস্থা হলে সঙ্গে সঙ্গে খবর দেব। রাফার চিবুক নেড়ে খুব আদর করে বললেন: খুকি, এখন গোটা বাড়িটা তোমার। যাও, তোমাকে দিয়ে দিলাম, হা হা হা।

দু-দিন ধরে এই রেলের বগিটাই ওদের থাকার জায়গা। মাঝে-মাঝে সাকিবের দমবন্ধ হয়ে আসে, মনে হয় শ্বাস নিতে পারছে না। আজ সকালেও যখন সিগারেট খাচ্ছিল, তখন অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল। সিগারেটের ছাইগুলো বাম হাতের তালুতে জমাচ্ছিল। কেউ হঠাৎ করে দেখলে ভাববে হয়তো মেঝে অপরিস্কার হবে এ কারণে মেঝেতে ফেলছে না। 
আসল ঘটনা হচ্ছে, পেস্ট নেই, দাঁত মাজা যাচ্ছে না। ছাই দিয়ে দাঁত ঘসালে অনেকখানি পরিস্কার হয়। লুবাবাকে অনেক বলে-কয়েও সিগারেটের ছাই দিয়ে দাঁত মাজতে রাজি করানো যায়নি। ওর নাকি বমি আসে। আজ ডাইনিং কারের লোকজন কাউকে টাকা দিয়ে বলতে হবে, একটা পেস্ট কিনে নিয়ে আসার জন্য।
সাকিব দাঁত ঘসাচ্ছে, দরদর করে ওর চোখ দিয়ে পানি পড়ে ছাই পানিতে মাখামাখি। রায়হান পরিষ্কার করে কিছু বলল না, মা কি গুরুতর অসুস্থ, নাকি...? মাকে কি শেষ দেখাটা দেখা যাবে না। অ আল্লা-অ আল্লা, এই শাস্তিটা আমাকে দিও না, আল্লা।

গার্ড সাহেব তার সাধ্যাতীত করার চেষ্টা করেছেন। ডাইনিং কারের লোকজনরা নিজেদের জন্য রান্না করবে। ওদের জন্যও তিনবেলা রান্নার ব্যবস্থা করতে বলেছেন। ডাইনিং কারের লোকদের খাবারের দাম দেয়া যাচ্ছে না। গার্ড সাহেব নাকি পইপই করে নিষেধ করে গেছেন, খাবারের দাম ওঁর নামে লেখা হবে। 
পরদিন গার্ডসাহেব খোঁজ নিতে এসেছিলেন, সাকিব টাকার প্রসঙ্গ উঠাতেই গার্ড সাহেব হা হা করে হাসতে হাসতে বলেছিলেন: আরে ভাই, সময় হোক দেখবেন জোঁকের মত লেগে টাকা আদায় করব।
আজ সকালেও এই প্রসঙ্গ নিয়ে সাকিব জোরাজুরি করলে গার্ড সাহেব মন খারাপ করা নিঃশ্বাস ফেলে বলেছিলেনন, আজ এখানে আমার বাসা থাকলে, তখনও কি আপনারা আমার বাসা থেকে যাওয়ার সময়ও খাবারের দামটা দিয়ে যেতেন।


এরপর সাকিব একটা টুঁ-শব্দও করেনি। হাত বাড়িয়ে এই ভাল-মানুষটাকে হাত ধরে ছলছল চোখে কেবল বলেছিল: জানেন আমার মা না মারা যাচ্ছে। আমি মার কুসন্তান তো তাই মা চাচ্ছে না তাঁকে শেষ দেখাটা দেখি।

*রেল-বাড়ি, ১:http://www.ali-mahmed.com/2010/05/blog-post_7540.html 

আমি কোথাও লিখেছিলাম, "ফিকশনের জন্ম রিপোর্টিং-এর গর্ভে"। 
সালটা আমার মনে নেই। তখন পরিবহণ ধর্মঘটের নামে সম্ভবত টানা ২২ দিন হরতাল চলছিল। ছোট্ট একটা রেল-স্টেশনে একটা পরিবার আটকা পড়েছিলেন, বাচ্চাসহ। এঁরা ২দিন রেলের একটা কামরায় আটকে ছিলেন। আমি যখন এটা শুনি, তখন আর এঁদের গিয়ে পাইনি। কেউ তেমন ভালো খোঁজ-খবর দিতে পারল না, এরা কেমন করে, কোথায় গেলেন। আমাদের এতো সময় কোথায়। বড়ো কষ্ট হচ্ছিল তখন- গোটা এলাকায় হাজার-হাজার মানুষ কিন্তু আমার নিজেকেই কেন যেন নগ্ন মনে হচ্ছিল
আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি, ওই পরিবারটির অনুভূতির কথা জানা- কেবল চোখ বন্ধ করে খানিকটা ভাবার চেষ্টা করা।

২৭ জুন হরতাল ডাকা হয়েছে। আমি আরেকটা "রেল-বাড়ি" দেখতে চাই না। আগের পোস্টে বিস্তারিত বলেছি, চর্বিতচর্বণ আর করি না। গণতন্ত্রের লেবেনচুষ: http://www.ali-mahmed.com/2010/05/blog-post_22.html 

এক কথায় বলি, আপনাদের হরতাল আমি মানি না। আমাকে কয়েদী বানাবার অধিকার আপনাদেরকে দেই না। 

Saturday, May 22, 2010

কয়েদী: রেল-বাড়ি: ১

(শুরু হলো এক অন্য রকম দিন! যথারীতি আজও সূর্য উঠেছে। ঝকঝকে গাঢ় একটা নীল আকাশ। আজ ৫৬ হাজার বর্গমাইল নামের এই গ্রহের সবচেয়ে বড়ো কারাগারে আটকা পড়েছে, সাকিব-লুবাবা-রাফা নামের তিনজন মানুষ। অন্য ১৫ কোটি কয়েদীর সঙ্গে। একটা রেলগাড়িতে।
আটকা পড়ে আছে সাকিবের মার দুর্বল হৃদপিন্ড, যেটা এখনো চলছে ধুকধুক করে, প্রিয় মানুষের অপেক্ষায়। প্রিয় মানুষের স্পর্শ কী মৃত্যুযন্ত্রণা কমিয়ে দেয়? কে জানে, হয়তো দেয়, হয়তো দেয় না। জানা নেই।)

‘বাবা- বাবা, এটাই কি আমাদের দাদাবাড়ি?’
‘না’, সাকিব অসংখ্যবার এ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে। ওর এই মেয়ে এমন অবুঝ হয়েছে কেন? অবশ্য এর বয়সই বা-কি, পাঁচ শুরু হল।
‘বাবা-বাবা, ও বাবা, ঠিক করে বলোই না ছাই, এটাই কি আমাদের দাদাবাড়ি না?’
সাকিব ধমক দিতে গিয়েও সামলে নিল, ‘বললাম তো মা এটা আমাদের দাদাবাড়ি না, তোমাকে তো আগেও অনেকবার বলেছি, বলিনি?’
রাফা ওর রেশমের মতো চুল নাড়িয়ে বলল, ‘হুঁ-উ।’
‘এই তো লক্ষ্মী মেয়ে, যাও খেলা কোরো গে।’


রাফা খানিকক্ষণ লক্ষ্মী মেয়ের মতো নিজে নিজে খেলল।
‘বাবা-বাবা, ও বাবা।’
‘আবার কি মা!’
‘এটা তাহলে কাদের বাড়ি? আমরা কি এখানে বেড়াতে এসেছি?’
‘রাফা বকবক করো না তো, চড় খাবে।’


এমন শক্ত কথায় কাজ হল না। রাফা বাবার মার দেওয়ার ব্যাপারটা এখনও দেখেনি, মা হলে অন্যকথা। রাফা সাকিবের গলা ধরে ঝুলে পড়ল, ‘বলতে হবে-বলতে হবে, এটা কাদের বাড়ি?'
‘এটা সরকারের বাড়ি, রেলবাড়ি, হলো তো।’
‘রেলবাড়ি কি, বাবা?’
‘রেলগাড়িই রেলবাড়ি, খবরদার আর একটা কথা না।’
‘আচ্ছা বাবা।’
‘রাফা, আর একটা কথাও না, লুবাবা প্লিজ রাফাকে সামলাও তো বড্ড বিরক্ত করছে। শেষে মেরে-টেরে বসব।’


লুবাবা পুরনো একটা ম্যাগাজিন পড়ছিল। শঙ্কিত দৃষ্টিতে সাকিবের দিকে তাকিয়ে ছোঁ মেরে রাফাকে একেবারে বুকের মাঝে নিয়ে এল। সাকিবকে কেমন উম্মাদ-উম্মাদ মনে হচ্ছে। মুখে ক-দিনের না-কামানো দাড়ি, টকটকে লাল চোখ, এই ক-দিন সম্ভবত চুলে চিরুনিও পড়েনি। সাকিব যখন খুব রেগে থাকে তখনই ওকে লুবাবা ডাকে নয়তো সুর করে বলে বাবা-লু-লু-লু। লুবাবা প্রথম প্রথম রাগ করে বলেছিল: খবরদার নাম নিয়ে ফাজলামো করবে না।
বেশ, তুমি আমায় বলো কোন শালা লুবাবা নাম রাখে।
লুবাবা রেগে আগুন হয়ে গিয়েছিল। সাকিব সমস্তটা দিন রাগ ভাঙাতে পারেনি অবশেষে রাতে-। 

সাকিব নরোম গলায় বলেছিল: পাগল নাকি, ঠাট্টা করলাম আর তুমি কি-না!
লুবাবার গলাও নরোম: কেন তুমি এমন রসিকতা করবে। তুমি তো খোকা না, জানো না নাম-ধাম রাখে গুরুজন। তোমার কি একেবারেই লঘুগুরুজ্ঞান নেই।
সাকিব হাসতে হাসতে বলেছিল: আমি খোকাই তো, এই দেখ খোকার গায়ে কোন কাপড় নাই।
ছি!
ছি কেন, খোকার গায়ে কাপড় নেই এটা বললে, ‘নজ‌-জা’ আর খোকার সঙ্গে ওইসব-।
লুবাবা সাকিবের মুখ চেপে ধরেছিল। অন্যভাবে ওকে থামানো যেত না।


এখন রাফা দুহাতে মাকে জাপটে ধরে আছে। বাবার কাছ থেকে মার ওকে সরিয়ে নেয়ার ভঙ্গি দেখে রাফা তার ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে বুঝতে পারছে কোন একটা সমস্যা আছে। রাফা সর্বক্ষণ মাকে লক্ষ করে। মা হাসি-হাসি মুখ করে থাকলে তার আনন্দ হয়। মা মুখ অন্ধকার করে রাখলে ওর কিচ্ছু ভাল লাগে না, এমনকি কাঁদতেও না। মার শরীরে যেমন একটা মা-মা গন্ধ বাবার ঠিক উল্টোটা। বাবার শরীরে সবসময় সিগারেটের বিশ্রি গন্ধ। ওয়াক! 
বাবা বাবাই, অন্য কিছু কখনো মনে হয়নি। তবে বাবার সঙ্গে খুব কথা বলতে ইচ্ছা করে। বাবাও তো ওর সঙ্গে বকবক করে বিরক্ত করে ফেলে কিন্তু আজ যে বাবা এমন করল? 
লুবাবা সহজ গলায় বলল, ‘সাকিব, রাফাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছ।’
সাকিব চেঁচিয়ে বলল, ‘বেশ করেছি।’
‘আঃ, চেঁচাচ্ছ কেন?’
‘বেশ করছি।’
‘আঃ সাকিব’।
‘বেশ করছি।’


লুবাবা ভীত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল, সাকিবের মধ্যে এখন পাগলামীর লক্ষণ স্পষ্ট। কেবলমাত্র পাগল এবং মাতালই ক্রমাগত একই কথা আউড়ে যায়। নাকি সত্যি সত্যি মদ খেয়েছে, তা কি করে সম্ভব? অবশ্য ওরা যেভাবে জীবন যাপন করছে বদ্ধউম্মাদ হয়ে যাওয়া বিচিত্র কিছু না। ওরা দু-দিন ধরে যেখানে বাস করছে, এটা আসলে একটা রেলগাড়ির কামরা। চারদিকের জানালা বন্ধ, ফাঁক-ফোকর দিয়ে আলো বাতাস আসে। দিনেই দমবন্ধ হয়ে আসে রাতে তো, লূবাবা খানিকটা অন্যমনস্ক হয়ে গেল।

সেদিন একনাগাড়ে টেলিফোনের রিং বাজছিল। লুবাবা শাওয়ারের নিচে ভিজতে ভিজতে ভাবছিল কখন রিং থেমে যাবে। নিরুপায় হয়ে প্রায় নগ্ন লুবাবাকে ফোন ধরতে হয়েছিল। রাফা গেছে পাশের বাড়ি। ‘জুলাপাতি’ খেলতে। সাকিব বাসায় থাকলেও ফোন ধরবে না। ও নির্ঘাত ঘুমাচ্ছে। ছুটির দিনে ওর কাজ একটাই মোষের মত পড়ে পড়ে ঘুমানো। ঘোষণা দিয়ে রেখেছে ছুটির দিনে কেউ বিরক্ত করলে, ঘুম ভাঙিয়ে দিলে তার মৃত্যু অবধারিত। জনে-জনে এটা বলে রেখেছে। টেলিফোনের রিং তো মাছি-মশা, কামান দাগালেও সাকিবের ঘুমের কোন সমস্যা হয় না, লুবাবা রাগ চেপে বলেছিল: হ্যালো।
কে ভাবি, ওপাশ থেকে কাঁপা কাঁপা গলা ভেসে এসেছিল।
হুঁ, কে?
ওপাশ থেকে ফোপানোর শব্দ এল: ভাবি, আমি, ভাইয়াকে ফোন দাও, ভাইয়া বাসায় আছে তো?
তুমি কে?
আমি রায়হান।
লুবাবা নাম বলায় চিনতে পারল। রায়হান ওর দেবর। আশ্চর্য ওর গলা শুনে একদম বুঝতে পারছিল না।
হ্যালো ভাবি, হ্যালো শুনতে পাচ্ছ না, ভাইয়া কি বাসায় নেই?
আছে, সমস্যাটা কি আমাকে বলো?
তুমি ভাইয়াকে দাও।
শোনো রায়হান, ও ঘুমাচ্ছে। ওকে এখন ডেকে তোলা যাবে না। আর এক্ষণ ওর ঘুম ভাঙিয়ে দিলে কি অনর্থ করবে তুমি চিন্তাও করতে পারবে না।
প্লিজ ভাবি, প্লিজ।
লুবাবা এবার রাগ করে বলল, সমস্যাটা আমাকে বলতে অসুবিধা আছে?
ভাবি, তুমি ভাইয়াকে বল মা কথা বলতে চান।


লুবাবার গা বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা পানি ঝরছে তবুও ঘেমে গোসল হয়ে গেল। অবশেষে সাকিব দয়া করে সিকিভাগ চোখ খুলে পাশ ফিরে বলল, এখন না রাতে।
লুবাবা ভাবল ঘুমের ঘোরে প্রলাপ বকছে। গা ধরে এবার ঝাঁকাতেই সাকিব বলল: তুমি নিমফোম্যানিয়াক নাকি!
সাকিবের কথার অর্থ এতক্ষণে বুঝল। কী লজ্জা-কী লজ্জা! পাশাপাশি রাগে গা জ্বলে গেল। ওর এখন ইচ্ছা হয়ে থাকলেও নিমফোম্যানিয়াক হয়ে গেল, বাহ! অথচ সাকিব যখন খুশি যেভাবে খুশি-।
লুবাবা হিসহিস করে বলল: আমি তোমার সঙ্গে গা ঘষাঘষি করতে আসিনি। তোমার মা টেলিফোনে কথা বলতে চাচ্ছেন।


সাকিব যে ভঙ্গিতে ছুটে ফোন ধরল এই গতির সঙ্গে কেবল তুলনা চলে সপাং করে পড়া একটা চাবুকের সঙ্গে।
সাকিব টেলিফোন ধরেই ব্যাকুল হয়ে বলেছিল, হ্যালো মা।
ভাইয়া-ভাইয়া, হ্যালো ভাইয়া।
ও রায়হান তুই, ফোন দে মাকে।
এরপর রায়হান কি সব বলছিল সাকিব গুছিয়ে কিছুই বুঝতে পারছিল না। রায়হান কথা বলতে গুলিয়ে ফেলছে কেন, গাধা নাকি!
সাকিব চেঁচাচ্ছিল: রায়হান পরিষ্কার করে বল কি হয়েছে! আগের মত উল্টাপাল্টা বলে দেখ, এমন মার দেব জনমের মত টেলিফোন করা ভুলিয়ে দেব।
রায়হান থেমে থেমে বলেছিল: ভাইয়া, তোরা চলে আয়, মার অসুখ। মা-মা, মা, তোদের দেখতে চেয়েছে।
আবার বল।


সাকিব এবার রিসিভার কানে চেপে গভীর মনোযোগ নিয়ে মোনার চেষ্টা করছিল। রায়হান হুবহু আগের বলা কথাগুল্ই আউড়ে গেল। সাকিবের পায়ে জোর নেই। ভাঙা গলায় বলল: কাল থেকে হরতাল শুরু হচ্ছে এটা জেনেও বলছিস চলে আসতে?
ওপাশে কোনো সাড়া-শব্দ নেই লাইন কেটে গেল নাকি, রায়হান কি ফোন রেখে দিল!
হ্যালো রায়হান, হ্যালো।
হ্যা ভাইয়া, চলে আয়।


লুবাবা গা মুছে ফিরে এসে ভারী অবাক হয়েছিল। সাকিব রিসিভার হাতে ঠায় বসে আছে। অভিমান ভুলে ছুটে এসে সাকিবকে ধরে অবাক হয়ে বলেছিল: কি হয়েছে?
সাকিব শিশুর মত চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলল, আমার মা, আমার মা মারা যাচ্ছে।

*রেল-বাড়ি, ২: http://www.ali-mahmed.com/2010/05/blog-post_23.html

সহায়ক লিংক:
কয়েদী, ৪: http://www.ali-mahmed.com/2010/05/blog-post_22.html

Wednesday, May 19, 2010

কয়েদী: ৩

শাহেদ ফাঁকা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ডাক্তার কিসব বলছেন হড়বড় করে। অথচ ডাক্তার সাহেব কথা বলছেন ধীরলয়ে, 'আপনার বাচ্চা "হুইজি চাইল্ড"। হুইসেল থেকে হুইজি। ওকে নেবুলাইজ করতে হবে। প্রয়োজন হলে, হবে সম্ভবত, অক্সিজেন দিতে হবে। আপনি তো এখানে এইসব সুবিধা এখানে পাবেন না।'
 

শাহেদ বিভ্রান্ত গলায় বলল, 'শুধু অষুধে কাজ হবে না?'
ডাক্তার সাহেব মাথা নাড়লেন, 'উহুঁ, ওর ফুসফুসে খানিকটা সমস্যা আছে, আ লিটল বিট। দেখছেন না কি প্রচন্ড কাশি হচ্ছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। দিনে দুইবার, প্রয়োজন হলে চার ঘন্টা পর পর নেবুলাইজার দিতে হবে। বেশি সমস্যা হলে অক্সিজেন। নরসলের সঙ্গে ভেনটোলিন রেসপিরেটর সলিউশন এর সঙ্গে সাত ফোঁটা ইপরেভেন্ট।'
'এখানে নেবুলাইজার মেশিন নাই?'
'উহুঁ,  এত বড় হাসপাতাল, এক লক্ষ মানুষের বসবাস এখানে, অথচ জানেন মেশিনটার দাম কত, মাত্র ২৭০০ টাকা। এই অল্প টাকার বিনিময়ে কতগুলো শিশুর প্রাণ বাঁচানো যায়।' 

'একটা প্রাইভেট ক্লিনিক আছে, ওখানে খোঁজ নিয়ে দেখব?'
'দেখেন, কিন্তু আমার মনে হয় ওদের নাই, থাকলে নিশ্চই শুনতাম। এই তো কদিন আগেই একটা বাচ্চা মারা গেল। নিঃশ্বাস নিতে পারছিল না।'
 

শাহেদ নিশ্চল হয়ে বসে রইল।
ডাক্তার অনুচ্চকন্ঠে ভয়ংকর শব্দটা উচ্চারণ করলেন, 'ঢাকা নিয়ে যান।'
শাহেদ ভাঙ্গা গলায় বলল, 'আপনি জানেন, কি অসম্ভব কথা বলছেন?' 

'জানি, এছাড়া কোন বিকল্প নাই, আপনার বাচ্চাটার ঠান্ডার সমস্যা ছাড়াও হাই টেম্পরেচার, বমি, ডায়ারিয়ার সমস্যা আছে। এই সব রোগ এ বয়সে হয়েই থাকে। কিন্তু একসঙ্গে হওয়ায় আপনার বাচ্চাটা দুর্বল হয়ে পড়ছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে ওর শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।'
শাহেদ হাহাকার করে উঠল, 'ডাক্তার, সবই বুঝতে পারছি কিন্তু আপনি তো জানেন এখন ঢাকা নিয়ে যাওয়া কি অসম্ভব একটা ব্যাপার।'
 

এই ডাক্তারটা নতুন, মাত্র পাস করে জয়েন করেছেন। এখনও পুরোপুরি প্রফেশনাল হতে পারেননি। কে জানে, হয়ত চোখের ভুল- এর চোখ খানিকটা ভেজা ভেজা। ইনি এখনও এই হাসপাতালের ডাক্তারদের মতো হতে পারেননি। ভুয়া সার্টিফিকেট দিতে চান না। ওষুধ কোম্পানীর স্যাম্পল চেয়ে-চিন্তে নেয়া দূরে থাক কেউ দিলে গরীব রোগীদের বিলিয়ে দেন। অন্য ডাক্তাররা যেখানে কসাইকে ছাড়িয়ে যান, অনায়াসে মাসে ষাট সত্তুর হাজার টাকা দুনম্বরী করে উপার্জন করেন। সেখানে এই ডাক্তারের বেতন ২৫ তারিখেই ফুরিয়ে যায়।
 

শাহেদ মাথা নিচু করে বসেছিল বলেই ডাক্তারের সূক্ষ্ম পরিবর্তন চোখে পড়েনি। শাহেদ ভাবছিল, এই ডাক্তার মানুষ নাকি, কী অবলীলায় বলে ফেলল ঢাকা নিয়ে যান, কয়েকদিন ধরেই অবরোধ চলছে। গাড়ি-ঘোড়া সব বন্ধ। কিভাবে এই দশমাসের শিশুটিকে নিয়ে ঢাকা যাওয়া সম্ভব! তার অসহায় অবস্থা কি ডাক্তার বুঝতে পারছেন না, কেন পারছেন না? প্রিয়জন কেউ যখন ছটফট করে তখন মনে হয় উপরে পরম করুনাময় নীচে ডাক্তার, মাঝামাঝি আর কেউ নাই। আফসোস, এরা কখনো এটা বুঝবে না। ডাক্তার মুখ অন্য দিকে ফিরিয়ে বললেন, 'সরি, আপনি ঢাকা নিয়ে যান, আমি সরি।'
 

শাহেদ ডাক্তারের চেম্বার থেকে বেরিয়ে এলো।
ফারা দশ মাসের শিশু কুশীকে বুকে আঁকড়ে ধরে আছে। পৃথিবীতে এত বাতাস অথচ কুশী তার প্রয়োজনীয় অল্প বাতাস পুরোটা নিতে পারছে না। আহারে, যদি পারত খানিকটা বাতাস কুশীকে দিতে। আচ্ছা, কোথায় যেন দেখেছিলো মুখে মুখ লাগিয়ে শ্বাস দেয়া যায়, দেখবে নাকি চেষ্টা করে, যদি হিতে বিপরীত হয়? 

শাহেদ বেরিয়ে আসতেই ফারা উদগ্রীব হয়ে বলল, 'কি বলল?'
'তেমন কিছু না।'
ফারা সবেগে মাথা নাড়ল, 'না-না, ঠিক করে বলো, তুমি সত্য বলছ না।' 

'বললাম তো কিছু না।' 
'তুমি না বললে আমি ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করব।'
শাহেদ অন্য দিকে তাকিয়ে বলল, 'গুরুতর কিছু না। ওকে নেবুলাইজার, অক্সিজেন এসব দিলেই ভাল হয়ে যাবে।' 

'ভাল হয়, ভাল হয় মানে কি, না দিলে চলবে?’ 
'না, মানে ইয়ে দিলে ওর শ্বাস কষ্টটা কমত।'
ফারা এবার ঝাঁঝাল গলায় বলল, 'তাইলে দেরি করছ কেন।' 

'ইয়ে ফারা এই সুবিধাগুলো তো এইখানে নাই।'
ফারা কান্না চেপে বলল, 'তাহলে কুশী-মার কি হবে।'
'ডাক্তার তো বলল ঢাকা নিয়ে যেতে।' 

'ঢাকা নিয়ে গেলে নিয়ে যাব, ঢাকা তো আর লন্ডন প্যারিস না। চলো এখনই রওয়ানা দেই।' 
'আঃ ফারা, বললেই কি যাওয়া যায়! 
'কেন যাওয়া যাবে না, গাড়ি নিয়ে গেলে ঘন্টা তিনেক লাগবে।' 
'সেটা সমস্যা না!'
'সমস্যাটা কি!'
শাহেদ এবার রুক্ষ গলায় বলল, 'তুমি তো কোন কিছুর খবরই রাখ না। হরতাল-অবরোধ চলছে কদিন ধরে। বললেই কি যাওয়া যায়!'
ফারা কুশীকে আরও আকড়ে ধরে বলল, 'আমি এসব জানি না, আমার বাচ্চার আল্লাহ না করুক যদি কিছু হয়ে যায় আমি তোমাকে কখ-খনো ক্ষমা করব না।'
 

শাহেদ ঝিম মেরে আছে। ওর মাথাটা ঠিক কাজ করছে না। 
'ফারা, একটা ক্লিনিক আছে, চলো ওখানে খোঁজ করে দেখি। ওদের নিশ্চয়ই নেবুলাইজার মেশিন আছে।'
ক্লিনিকের মালিক ডাঃ তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে বললেন, 'নাই, এইসব রেখে সময় নষ্ট করার মতো সময় আমার নাই।'
ফারা কিভাবে জানি টের পেল। একহাতে কুশীকে ধরে অন্য হাতে শাহেদকে আকড়ে ধরে আছে। বিড়বিড় করে বলল, 'চলো এখান থেকে যাই।'
শাহেদের অসহ্য রাগ হচ্ছে। ইচ্ছা করছে পায়ের জুতা খুলে আলম নামের এই ডাক্তারকে পেটায়। ওর শিক্ষা, অবস্থান, ঔচিত্যবোধ বাধা হয়ে আছে। বুচার কোথাকার, এই ক্লিনিকের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। রিএজেন্ট এর চড়ামূল্যের দোহাই দিয়ে সর্বোচ্চ টাকা টেষ্টের নামে নিচ্ছে। অথচ ২৭০০ টাকা দিয়ে একটা নেবুলাইজার মেশিন রাখবে না। কত শিশুর প্রাণ রক্ষা পেত।
 

শাহেদ অসহ্য রাগ চেপে বলল, 'এইসব রাখলে সময় নষ্ট।' 
ডাক্তার বললেন, 'একবার নেবুলাইজার দিলে কত দেবেন, পঞ্চাশ টাকা। একটা শিশুকে নেবুলাইজার দিতে অন্তত দশ মিনিট সময় লাগে। এই সময়ে আমি দুজনকে দেখতে পারি। আশি দুগুনে একশো ষাট টাকা পাব, আপনিই বলেন-?'
'আমি বলি কি, আপনার চেয়ে কসাই অনেক ভালমানুষ। বাজারে গিয়ে মাংশের দোকান দেন। পুঁজি লাগলে আমার কাছ থেকে নিয়েন।'
ফারা ভিত গলায় বলল, 'চলো-চলো এখান থেকে।'
 

শাহেদের বাসায় ফিরে মেজাজ আরও খারাপ হলো। সবার এক কথা, ঢাকায় নিয়ে যাও। আরে, এরা কী দেশের খবর রাখে না; বললেই হলো।
মা ভাঙ্গা রেকর্ডের মতো বলেই চলেছেন: খোকা, দেরি করিস নে, আল্লার নাম নিয়ে রওয়া দে।
শাহেদ হিম গলায় বলল, 'মা তুমি কি বলছ, জানো?' 

'আয়তুল কুরসী পড়ে রওয়ানা দে, কিচ্ছু হবে না।' 
'দোয়া-দরুদ পড়ে রওয়ানা দিলে হরতাল উঠে যাবে নাকি?'
'তুই তো ধর্মকর্ম করিস না এইজন্যই তোর বাচ্চার অসুখ হয়।'
'বেশ হয়, তুমি তো মহিলা হুজুর! আমার যে ছোটবেলায় সারা গা পচে গিয়েছিল সেটা কি?
তখন আয়তুল কুরসী পড়লে না কেন?
'তুই আমার সামনে থেকে যা।' 
'আমার বয়ে গেছে তোমার সামনে থাকতে।'
'আর শোন, আমার নাতিনের যদি কিছু হয় তোকে আমি এ বাড়ি থেকে বের করে দেব।' 

'বাড়ি-বাড়ি, বাবার এই বাড়ি যেন আমার বুকে একটা পাথর রেখে গেছে। আমি মরে গেলে এ বাড়ির একটা পাথর আমার কবরে রেখে দিও।'
 

ফারা শাহেদকে সরিয়ে না নিয়ে গেলে নির্ঘাত একটা অনর্থ হতো। শাহেদ পাগলের মতো বিড়বিড় করছে: ইস কারও মেয়ে কারও নাতনি; যেন আমার কিছু না! কুশীটার কষ্ট দেখলে বাঁচতে ইচ্ছা করে না। সত্যি সত্যি মরে যেতে ইচ্ছা করে। শাহেদ দুহাতে মুখ ঢেকে ক্রমাগত বলতে থাকল: মা কুশী, মা- কুশী।
 

সহায়ক লিংক:
১. কয়েদী, ১: http://www.ali-mahmed.com/2007/06/blog-post_5073.html
২. কয়েদী, ২: http://www.ali-mahmed.com/2009/02/blog-post_18.html

Wednesday, February 18, 2009

কয়েদী: ২

 
"শহীদ সাহেব দ্রুত দাঁড়ি কামাতে গিয়ে গাল অনেকটা কেটে ফেলেছেন। দরদর করে রক্ত বেরুচ্ছে। টিস্যু চেপে রক্ত মোছার চেষ্টা করছেন। তিনি চাচ্ছিলেন কাউকে না জানিয়ে চুপিসারে বাসা থেকে বেরুতে কিন্তু গোল বাধল জুতো খুঁজে পাচ্ছেন না। জুতো ছাড়া অফিসে গেলে বসের আজেবাজে কথা শুনতে হবে।

সুমিকে ঘুম থেকে উঠালেন। সুমির ঘুমে চোখ ফোলা। চোখ বড় বড় করে বলল, ‘বাবা, কী আশ্চর্য, তুমি অফিসে যাচ্ছ!’
‘যেতে হবে রে মা, চাকুরীর ব্যাপার।’
‘বাবা-বাবা, এই হরতালে তুমি যাবে কিভাবে! প্লিজ বাবা, যেও না, দোহাই তোমার।’
‘মা-রে, দু-দিন যাইনি। আজও না গেলে চাকরি থাকবে না!’
‘যেও না বাবা প্লিজ। তুমি গেলে আমি দুঃশ্চিন্তায় মরে যাব।’
শহীদ সাহেব সুমীর মাথায় হাত রাখলেন। ‘কিছু হবে না মা, সন্ধ্যায় দেখবি তোর এই বুড়ো বাপ ঠিক ঠিক ফিরে আসবে।’
‘বাবা-!’
‘ মা নিষেধ করিস না, লক্ষী বেটি না আমার।’

সুমি ছলছল চোখে বাবার জুতো খুঁজতে লাগল। বাবাটা কেমন, জুতোতে কালি নেই। আশ্চর্য, মানুষটা নিজের সম্বন্ধে এত উদাসীন কেন! সুমি জুতো খুঁজে চেঁচিয়ে বলল, ‘বাবা, পাঁচ মিনিট, টিফিন দিয়ে দিচ্ছি।’
‘না রে বেটি, দেরি হয়ে যাবে।’
‘পাঁচ মিনিট বাবা, পাঁচ মিনিট। মাথা খাও আমার, বাবা যেও না।’

সুমীর কাছ থেকে শহীদ সাহেব বিদায় নিয়ে পা চালিয়ে হাঁটছেন। হরতালের কারণে রিকশা ছাড়া কিছুই চলছে না। কী দাম- দশ টাকার ভাড়া ত্রিশ টাকা চাচ্ছে! কিছুদূর হেটে হাঁপ ধরে গেছে। না পেরে একটা রিকশা নিলেন। সামনে জটলা দেখে রিকশাওয়ালা চেষ্টা করেছিল রিকশা ঘুরিয়ে নিতে। হইহই করে একঝাক তরুন রিকশা ঘিরে ফেলল।
‘এই শালার রিকশা ভেঙ্গে ফেল।’
রিকশাওয়ালা ভীত গলায় বলল, ‘ভাইজান, এইবার হরতালে রিকশা চলতাছে বইলাই তো বাইর হইছি।’
একজন হাত নেড়ে বলল, ‘ভাগ, শালা, খালি রিকশা নিয়া যা।'

এইবার শহীদ সাহেবকে নিয়ে পড়ল। ‘আঙ্কল, আস্‌সালামু আলাইকুম। কোথায় যাচ্ছেন এই সাত সকালে।’
শহীদ সাহেবের মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল, ‘অফিস যাচ্ছি।’
‘আঙ্কল, সর্বনাশের কথা বললেন দেখি। হরতালে অফিস, কী সর্বনাশ!’
শহীদ সাহেব দুরুদুরু বুকে ভাবছিলেন; ছেলেগুলো শিক্ষিত। সম্ভবত ভার্সিটিতে পড়ে। এরা নিশ্চয়ই বুঝিয়ে বললে বুঝবে। কতই বা বয়স এদের, সুমির বয়সের হবে।
‘বাবারা, অফিসে না গেলে আমার চাকরি থাকবে না।’
‘আহারে। চাকরি না থাকলে ব্যবসা করবেন। বুড়া মানুষ- সাহস তো কম না রিকশায় ঠ্যাং তুলে অফিসে যান। হাতে ওটা কি টিফিন বক্স? দেখি দেখি, এই খোল তো- ওয়াও, পরোটা ডিম।’ নিমিষে ভাগাভাগি করে এরা পশুর মতো চিবুতে লাগল।
একজন ঢেকুর তুলে বলল, ‘আঙ্কল, সার্টটা খুলেন।’

শহীদ সাহেব বিভ্রান্ত চোখে তাকিয়ে রইলেন। এইবার সত্যি সত্যি ভয় পেলেন। এখন এদেরকে খানিকটা বুঝতে পারছেন- এরা তাকে নিয়ে একটা মজার খেলা খেলতে চাচ্ছে। তিনি বিড়বিড় করে বললেন, ‘বাবারা, আমাকে যেতে দাও। বাসায় চলে যাব।’
‘না-না আঙ্কল, আপনাকে অফিসে যেতে হবে যে কিন্তু আঙ্কল আপনার তো অফিসের পোষাক তো ঠিক নাই। খুলেন-খুলেন, সার্টটা খুলেন ফেলেন।’
শহীদ সাহেব দেরি করছেন দেখে একজন ফড়ফড় করে পকেট ছিঁড়ে ফেলল। যেন কাঠের স্তুপে আগুন ধরাবার বাকি ছিল। কাপড় ছেঁড়ার শব্দে সবার মধ্যে একটা মাদকতা সৃষ্টি হলো। একসময় শহীদ সাহেবের গায়ে একটা সুতোও রইল না।

তিনি কান্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছেন। বোধ শক্তি সম্পূর্ণ লোপ পেয়েছে।
ঝকঝকে দিন- গাঢ় নীল আকাশ- চারপাশের অতি ব্যস্ত মানবসন্তান- ক্যামেরার ক্লিক ক্লিক শব্দ, সব কেমন দূরে সরে যাচ্ছে। তিনি দু-হাত ছড়িয়ে অবিকল ভিক্ষুকের গলায় বলছেন: আল্লার ওয়াস্তে আমারে একটা কাপড় দেন।"

 
*ছবিঋণ: ডেইলি স্টার। (আমি ডেইলি স্টারেই দেখেছিলাম কিন্তু তখন সংরক্ষণ করে রাখা সম্ভব হয়নি। অনেক খুজেঁও পাচ্ছিলাম না- পরে এই সূত্রে একটা নিউজপ্রিন্ট পত্রিকা ছাপিয়েছিল। পুরনো ওই কাগজের অবস্থা তখন যা-তা।)

**লেখাঋণ: 'কয়েদী' (২০০৫) বইটির এই অংশটুকু লেখার উত্স এই ছবিটি। এই ছবিটা অনেকদিন আমাকে তাড়া করত। এই ছবিতে পশুমানব নামের এমন একজন মানুষ আছেন যিনি পরবর্তীতে বিটিভি'র একজন দুঁদে উপস্থাপক হয়ে লম্বা লম্বা বাতচিত করতেন। ভাগ্যিস, এই মানুষটার মত শিক্ষিত হতে পারিনি। বড় বাঁচা বেঁচে গেছি!


***কয়েদী: ১

****কয়েদী বইটির সমালোচনা করেছিলেন আনোয়ার সাদাত শিমুল। ভাল ভাল কথা লিখেছেন বলেই না, তিনি লেখাটার মূল সুরটা চমৎকার করে ধরতে পেরেছিলেন বলে এটা আমার পছন্দের লেখা। 
"আমরা যখন কয়েদী এ গ্রহের সবচেয়ে বড় কারাগারের খবর পেয়েছিলাম আগেই। কিন্তু এবার যখন 'কয়েদী' পড়া শুরু করলাম তখন ক্রমান্বয়ে তিন পাশে গজিয়ে উঠে অক্ষমতার দেয়াল আর অন্যপাশে বাধা দেয় কষ্ট ও ক্ষোভের কপাট। গৌরবময় ইতিহাসের সবুজ শ্যামল বাংলাদেশ যখন হরতাল নামক দানবের হিংস্র ছোবলের শিকার তখন নিষ্ঠুরভাবে দেশটির ১৪ কোটি মানুষ বন্দী হয় অদ্ভুত এক কারাগারে। এ কারাগারের পাঁচটি সেলের গল্প উঠে এসেছে আমাদের ব্লগার শুভ'র 'কয়েদী' উপন্যাসে। প্রথম সেলে আমরা দেখি - গার্মেন্টস মালিক জামিল আহমেদ এবং তার জাপানীজ বায়ার রিউনোসুকে আকুতাগাওয়ার গল্প। টানা অসহযোগ আন্দোলনের ফাঁদে ফ্যাক্টরী বন্ধ, শ্রমিকদের জীবন অনিশ্চিত। বৈরী পরিস্থিতিতে তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে বাংলাদেশ ছাড়ে আকুতাগাওয়া। জামিল আহমেদ হারায় প্রসপেক্টিভ বিজনেস ডিল। তবে আকুতাগাওয়ার রেখে যাওয়া চিঠি ছুঁড়ে দেয় অনেকগুলো প্রশ্ন। দেশপ্রেমের অসহায় বোধ প্রকট হয়ে উঠে।
দ্বিতীয় সেলে রয়েছে মরণাপন্ন মায়ের মুখ শেষবারের মতো না দেখার যন্ত্রণায় সন্তানের করূণ কান্না। অসুস্থ মা'কে ঢাকা দেখতে যাওয়ার পথে সাকিবের ট্রেন আঁটকা পড়ে আখাউড়া জংশনে। বৌ-বাচ্চা নিয়ে সাতদিন বন্দী থাকে রেলের কামরায়। কয়েদী জীবনের উপায়হীন হাহাকার তখন কেবলই শুন্যে প্রকম্পিত হয়।
তবুও কয়েদী জীবন উপভোগ করে কেউ কেউ। তৃতীয় সেলে আমরা দেখি, হরতালের অখন্ড অবসরে একজন লেখক আনমনে লিখে যাচ্ছেন। দেশের ক্ষতি তাকে ভাবাচ্ছে না। 'পাঠক খাওয়ানো' রাজনৈতিক উপন্যাস লিখতে ব্যস্ত তিনি। ...এ অংশে 'কয়েদী'-র পাঠক খানিকটা খেই হারাতে পারে। তবে একটু ধৈর্য্য নিয়ে পরের সেলে তাকাতেই চোখে পড়বে - হরতাল দানবের আরেকটি কুৎসিত আঁচড়; অফিসগামী শহীদ সাহেবকে বিবস্ত্র করছে সন্তান-বয়েসী পিকেটাররা। মিরর অব দ্য সোসাইটির অভিজ্ঞ রাঁধুনির ক্যামেরা তখন ক্লিক ক্লিক ছবি তুলে যায়। এটুকু পড়ে পাঠক বিবেক কুঁকড়ে যায় অক্ষমতার যাতনায়। অনেকগুলো তীর এসে মূল্যবোধের ঘরে হানা দেয়।
উপন্যাসের শেষ অংশে আমরা দেখি - অসুস্থ দশ মাসের শিশুকে চিকিৎসার জন্য ঢাকা নিয়ে যাচ্ছে শাহেদ-ফারা দম্পতি। তিন ঘন্টার রাস্তায় মোড়ে মোড়ে হাত-পা ছড়িয়ে বসে থাকে হরতাল দানব। দানবের মেদ জমা শরীরের ফাঁক-ফোকর পেরিয়ে খানিকটা এগুলেও গন্তব্যে পৌঁছা যায় না। ...পিকেটাররা উৎসব করে ভাঙছে শাহেদের গাড়ী!
'কয়েদী' পড়ে প্রথমে মনে হতে পারে ঘটনাগুলো সম্পর্কহীন-বিক্ষিপ্ত। অমনটিই স্বাভাবিক। কয়েদখানার সেলগুলোয় পাশাপাশি থেকেও কোন যোগসূত্র স্থাপিত হয় না, অথচ খুব কাছাকাছি অবস্থান সবার। ঠিক তেমনি জামিল আহমেদ, সাকিব, লেখক, শহীদ সাহেব কিংবা শাহেদ - এরা আমাদেরই আশেপাশের মানুষ। হয়তো তাদের পাশের সেলে বাস করছি আমি-আপনি এবং আমরা। হরতাল প্রেক্ষিতে আমাদের এক একটি নিজস্ব গল্প পূরণ করে দেয় 'কয়েদী' কাহিনীর শুন্যতাগুলো!
'কয়েদী' সম্ভবত: বাংলাদেশে হরতাল নিয়ে লেখা একমাত্র উপন্যাস। বিবেক নাড়া দেয়া বইটি প্রকাশ করেছে জাগৃতি প্রকাশনী।"

Wednesday, December 17, 2008

একটি ব্যর্থ নাটক নিয়ে নাটক!

সালটা ২০০৩। সুতীব্র ইচ্ছা, হরতালের উপর আমার লেখা 'কয়েদী' নিয়ে নাটক করার। কিন্তু কারা কারা নাটক বানান তাঁদের তো কাউকেই আমি চিনি না।
থাকি মফস্বলে, ঢাকা যাই কালেভদ্রে। গাঁও-গেরামে থাকা গায়ে সরষে তেলমাখা আমি এক ভুত, আমার এমন লোভ থাকাটা দোষের বৈকি! এই দেশে বিখ্যাত হতে হলে তো কথাই নেই, মানুষ হওয়ার জন্যও নাকি ঢাকায় বসবাস করাটা খুব জরুরি, অতি জরুরি।


যাই হোক, ব্যক্তিগত জটিলতায় ১৯৯৩ পর থেকে ২০০৩ পর্যন্ত আমার লেখালেখি আর করা হয়ে উঠেনি! আগে যাও-বা কিছু মানুষকে চিনতাম, তাঁদের অনেকের সঙ্গেই পরে আর যোগাযোগ ছিল না। একদিন, প্রথম আলো অফিসে একজনকে খুঁজতে গেছি। ওখানেই আনিসুল হককে পেয়ে গেলাম। এই মানুষটাকে আমি চিনতাম ভোরের কাগজের 'মেলা'র কল্যাণে। তখন আমি ভোরের কাগজে ফি হপ্তাহে 'একালের রুপকথা' নামের একটা লেখা লিখি। ওই পাতা যিনি দেখতেন, সঞ্জীব চৌধুরী- একজন লেখক বানাবার মেশিন [১]। তিনি আনিসুল হকের সঙ্গে পরিচয় করে দিয়ে বলেছিলেন, ইনি 'মেলা' পাতাটা এখন থেকে শুরু করছেন, লেখা চাচ্ছেন। আপনি মেলার জন্য লেখা দেন।
আমি অবশ্য খুব একটা উচ্ছ্বসিত হইনি কারণ... সঞ্জীব চৌধুরীর সঙ্গে কাজ করার মজাই আলাদা। তাছাড়া আমার গায়ের মফস্বলের গন্ধ নিয়ে সঞ্জীব চৌধুরী খুব একটা মাথা ঘামাতেন না- তাঁর নাক কখনও উঁচু হতে দেখিনি।
যাই হোক, মেলায় লেখা দিয়ে সে এক কাহিনি হয়েছিল, সে এক চোট্টামির অন্য কাহিনি...অন্য কোন দিন!

আনিসুল হককে বললাম, 'কয়েদী' নামের যে পান্ডুলিপিটা আমার ওটা নিয়ে নাটক করবে, এমন কেউ তাঁর পরিচিত আছেন কিনা। তিনি ওই লাইনেই গেলেন না। আমাকে বুঝিয়ে প্রায় ফেললেন, দেশের অবস্থা দেখছেন না, এখন নাটকের তেমন বাজার নাই।ইত্যাদি, ইত্যাদি...। আনিসুল হক, নামকরা মানুষ, আমার কী আর না-বুঝে উপায় আছে!
তারপর বললেন, আর আপনি যে নাটক করবেন, আপনার স্ক্রিপ্টটার তো নাট্যরূপ দেয়া নাই। নাট্যরূপ দিতে হবে।
আমি বললাম, নাট্যরূপ, এটা তো আমি আগে কখনও করিনি। আপনি কী এটার নাট্যরূপ করে দিতে পারবেন।
আনিসুল হক বললেন, আমাকে দিয়ে করালে ২০ হাজার দিতে হবে।
আমি কুর্নিশ করে চলে এসেছিলাম।


পরে যখন আমি এটার নাট্যরূপ দিয়েছিলাম তখন বিস্মিত হয়ে ভাবছিলাম, হা ঈশ্বর, এটার জন্য ২০ হাজার টাকা! শ্লা, সব টাকা দেখি এখন মিডিয়াতে! ২০০৩-এ ২০ হাজার হলে এখন ২০০৮-এ এই টাকার মান সম্ভবত লাখখানেক হবে! না আরও বেশি? আল্লা জানে...।
২০০৫ সালে 'কয়েদী' যখন বই আকারে বের হল তখন এটা পড়ে শংকর সাওজাল বিচিত্র কোনো এক কারণে অযাচিত মুগ্ধতা প্রকাশ করেছিলেন, তখন এটা নিয়ে নাটক করার জন্য বাড়াবাড়ি রকমের আগ্রহ দেখালেন। আমার ধারণা, এই চমঃকার মানুষটা 'হুদাহুদি', অল্পতেই মুগ্ধ হয়ে যান!


কিন্তু... ২০১২ শেষ হয়-হয়, এখনো নাটকের ন-ও হয়নি! হরতাল নিয়ে নাটক নাকি পটাবলিক খাবে না। এই দেশের মানুষ নাকি আলকাতরা খায় আর এই অখাদ্য খাবে না, 'আজিব'! কথা সেটা না, এই দেশে হরতাল নিয়ে কোনো ফিকশন নাই, কোনো নাটক নাই। কেন? হরতাল নামের অতি কুৎসিত গা ঘিনঘিনে এই দানবটাকে নিয়ে কোনো নাটক করা যাবে না!
শংকর দা অবশ্য এখনও আশার বাণী শোনান। এই চমত্কার মানুষটার উপর আমার কোন ক্ষোভ নাই কারণ তিনি নিজে নাটক বানান না। যে দুজন বিখ্যাত নাট্যপরিচালকের সঙ্গে তাঁর কথা পাকা হয়েছিল এঁরা গা না করলে শংকরদার কীই-বা করার আছে!
এখনও ফোনে কথা হলে তিনি হাল ছাড়েন না, মাহমেদ, দাঁড়াও হবে-হবে।
আমার আর এই মানুষটাকে বিব্রত করতে ভাল লাগে না। তবে মনে মনে বলি, দাদা, আমি তো আর এখন দাঁড়িয়ে নাই, বসে বসে থেকে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছি।


আশিক নামের এক ছেলে আমার লেখা নিয়ে নাটক করার জন্য খুব ঝুলাঝুলি করছিল। তার নাকি কার-কার সঙ্গে জানা-শোনা আছে। আসলেই ছিল। একদিন নিয়ে গেল আফসানা মিমির কাছে। ও আল্লা, মিমির সঙ্গে দেখি এর ভালই খাতির। একজন অন্যজনের হাত ধরে আছে। কৃষ্ণচুড়া না কি যেন নাম, ওই প্রডাকশন হাউজ থেকে মিমি নাটক বানাচ্ছেন।
মিমির সঙ্গে কথা হল। শুটিং নিয়ে খুব ব্যস্ত। তবুও এই মানুষটার আচরণ আমাকে মুগ্ধ করেছে।


ওখানেই প্রথম দেখলাম সুবর্ণা মুস্তফাকে। স্রেফ, এই ভদ্রমহিলাকে আমার অভব্য, অমার্জিত মনে হয়েছে। আমার কাছে মনে হয়েছিল এই ভদ্রমহিলার আচরণ খানিকটা মার্জিত হলে তিনি নিশ্চয়ই অ-সেলিব্রটি হয়ে যেতেন না।
তো, মিমির মোদ্দা কথা, এই দেশে ভাল স্ক্রিপ্টের আকাল তাই তিনি ভারতীয় স্ক্রিপ্ট নিয়ে নাটক বানাচ্ছেন। আগামিতেও এমনটাই ইচ্ছা।


আমার এখানে আর ভাল লাগছিল না। এদের দেয়া চা-টাও বিস্বাদ লাগছিল। এটা কেমন কথা! আমি না-হয় ছাতাফাতা তিন টাকা দামের কলমবাজ, তাই বলে কী এ দেশের সমস্ত লেখক মারা গেছেন যে ভারত থেকে স্ক্রিপ্ট আমদানী করতে হবে? এই সব ফাজিলদের ফাজলামি কথা শুনে গায়ে আগুন ধরে যায়। মিমি ব্যতীত আরও অনেকে দাদাদের লেখা নিয়ে ঝাপিয়ে নাটক বানাচ্ছেন।

আশিক ছেলেটা আরেকজনের কাছে নিয়ে গেল। ওর চ্যাংড়া নাটকনির্মাতার নামটা ভুলে গেছি। উনি আবার প্রেমের নাটক ব্যতীত অন্য নাটক করেন না। আমাকে বললেন, প্রেমের নাটক হলে আছি।
আমি বললাম, আমার কিছু উপন্যাস আছে, ওগুলো নাট্যরূপ করে দেই? 'কনকপুরুষটা'...।
তিনি বললেন, আরে না-না, আধুনিক প্রেমের উপন্যাস। যেটা পাবলিক খাবে। হে মাবুদ, পাবলিক যে কি খায় এটা সম্ভবত তুমি ব্যতীত আর কেউ জানে না।
তিনি একটা প্লটের আইডিয়াও দিয়েছিলেন। ভয়াবহ, গায়ের রক্ত হিম হয়ে আসে! সবটা মনে নাই। অনেকটা এমন: এক দেশে এক ছেলে ছিল। সে এক মেয়ের সঙ্গে প্রেম করে। করুক...কিন্তু সে যে মেয়ের সঙ্গে প্রেম করে সেই মেয়ের মায়ের সঙ্গেও সে প্রেম করে। এটা আবার মা-মেয়ে জানে না। এমনসব উদ্ভট আইডিয়া নিয়ে নাটক এগুবে। তিনি আমাকে হাত-পা নিড়ে বুঝিয়ে দিচ্ছেলেন কেমন করে আমাকে লিকতে হবে।

আমি বিরক্ত হয়ে বলেছিলাম, এক কাজ করেন, আপনি নিজেই লিখে ফেলেন না কেন! এটাই উত্তম হবে।
ওখান থেকে ফিরে আসতে আসতে জনান্তিকে বিড়বিড় করছিলাম, হে প্রভূ, আর নাটক ভাল লাগে না...।


*কয়েদীর লিংক: http://www.ali-mahmed.com/2007/06/blog-post_5073.html

সহায়ক সূত্র:
১. সঞ্জীব চৌধুরী: http://www.ali-mahmed.com/2007/11/blog-post.html

Friday, June 29, 2007

‘কয়েদি’ থেকে অংশবিশেষ

"কাঁটায় কাঁটায় বারোটা।
থাই এয়ারওয়েজের একটি যাত্রীবাহী বিমান যথাসময়ে জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করল।

যাত্রীদের মধ্যে একজন রিউনোসুকে আকুতাগাওয়া, জাপানী ব্যবসায়ী। লম্বা জার্নি ওঁকে অনেকখানি কাবু করে ফেলেছে। প্রচন্ড মাথা ব্যথা হচ্ছে। থেকে থেকে গা কেমন গুলাচ্ছে। হোটেলের বরফ-ঠান্ডা বাথটাবের পানিতে গা ডুবিয়ে চিল্ড বিয়ারে চুমুক দিতেই অবসাদ অনেকখানি কেটে যাবে এটা ভাবতেই শরীরে ঝিরঝিরে একটা স্বস্তির একটা পরশ বয়ে গেল।

ঘোষণা দেয়ার মতো কিছু নেই বলেই গ্রিনচ্যানেল দিয়ে গুটিগুটি পায়ে পেরিয়ে আসতেই পেটমোটা একজন কাষ্টমস অফিসার হড়বড় করে ইংরাজীতে কি সব বলতে লাগল। আকুতাগাওয়া ভাঙা ভাঙা ইংরেজীতে বিনীত ভাবে বললেন, ‘মাফ করবে, তোমার কথা বুঝতে পারছি না, দয়া করে একটু বুঝিয়ে বলবে?’
কাষ্টমস অফিসার ঝড়ের গতিতে একগাদা কথা বললেন, আকুতাগাওয়া এবারও বিন্দুবিসর্গ বুঝতে পারলেন না। ভারী লজ্জিত হয়ে বিনয়ে গলে গিয়ে বললেন, 'মার্জনা করো, আমার ইংরাজী জ্ঞান খুব সীমিত তবে শব্দগুলো আলাদা-আলাদাভাবে বললে আমি বুঝতে পারব।'
কাষ্টমস অফিসার এবার থেমে থেমে চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, ‘আয়্যাম নট আ ব্লাডি টিচার, ইউ নো, কাষ্টমস অফিসার আয়্যাম।’

আকুতাগাওয়া হকচকিয়ে গেলেন। এমনিতেই ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে পড়েতে চাইছে, এই ভদ্রলোক এমন অভব্য আচরণ করছেন কেন? অলক্ষ্যে গালে হাত বুলালেন তার কি দাড়ি বড়, তাকে কি ড্রাগ স্মাগলারদের মতো দেখাচ্ছে।

আকুতাগাওয়া নিচুস্বরে বললেন, ‘আমি বড় ক্লান্ত, কি জানতে চাইছ দয়া করে বলো?’
‘তুমি যে বড় গটগট করে গ্রিন চ্যানেল পেরিয়ে এলে!’
আকুতাগাওয়া গটগট শব্দটার মানে বুঝতে পারলেন না তবে মূল বক্তব্য বোধগম্য হল। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন, ‘কেন চ্যানেল ব্যবহার করা নিষেধ নাকি, অফিসার?’

‘অবশ্যই নিষেধ, যদি তুমি ঘোষণা না দিয়ে এবং যথার্থ ট্যাক্স না দিয়ে কোন দ্রব্য নিয়ে আসো,’ কাষ্টমস অফিসারের গলা একধাপ চড়ে গেল।
আকুতাগাওয়া এতক্ষণে হাসলেন, ‘তেমন কিছুই আমার কাছে নেই।’
কাস্টমস অফিসারের কথা এবার হুমকির মতো শোনাল, ‘বেশ, সেটা দেখা যাবে। তোমার সঙ্গের জিনিসপত্র আমি দেখব।’
‘অবশ্যই, আনন্দের সঙ্গে।’
কাস্টমস অফিসার আকুতাগাওয়ার নামিয়ে রাখা একটি মাত্র হাত ব্যাগ দু-মিনিটেই তছনছ করে রাগী গলায় বললেন, ‘তোমার আর লাগেজ কোথায়?’
‘এই-ই।’
‘এই-ই’, কাস্টমস অফিসার গভীর সন্দেহ পোষণ করলেন!
‘বিশ্বাস না হলে দয়া করে খোঁজ নিয়ে দেখো।’

এতক্ষণে কাস্টমস অফিসারের মুখের কঠিন রেখাগুলো নরোম হয়ে এল। একদৃষ্টে পাসপোর্টের দিকে তাকিয়ে আছেন। আসলে অন্য কিছু দেখছেন না ঠোঁট না নাড়িয়ে নাম মুখস্ত করছেন। কী কঠিন নাম রে বাবা!
‘সো, আকুতাগাওয়া, এ দেশে আগমনের উদ্দেশ্য কি?’
আকুতাগাওয়া এবার অসহ্য রাগে ফেটে পড়লেন, ‘লিসেন অফিসার, তুমি ভব্যতার সমস্ত সীমা অতিক্রম করেছ এ দেশে কেন এসেছি এটা তোমার কাছে বলতে আমি বাধ্য নই। উপযুক্ত কারণ দেখিয়ে যথার্থ কাগজপত্র ভিসা নিয়ে আমি এসেছি। ভাল কথা, আবার যখন আমার নাম ধরে সম্বোধন করবে তখন নামের পূর্বে জনাব যোগ করবে। আমাদের দেশে তো আমরা যে কাউকে যা-তা লোককেও জনাব ছাড়া সম্বোধন করার কথা ভাবতেই পারি না।’

হইচই-এ লোক জমে গেল। একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নম্রভঙ্গিতে বললেন, ‘সার, দয়া করে বলো সমস্যাটা কি?’
আকুতাগাওয়া আদ্যোপান্ত সব খুলে বললেন, ওই ভদ্রলোক গভীর মনোযোগ নিয়ে শুনলেন, শুনতে শুনতে ওঁর চোখ মুখ কেমন শক্ত হয়ে গেল।

যে কাস্টমস অফিসারের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হচ্ছিল তাকে পরিস্কার ইংরাজিতে বললেন, ‘তুমি যখন গায়ের এই পোষাকটা পরে এখানে দাঁড়াও তখন একটা দেশ, গোটা জাতির প্রতিনিধিত্ব করো। বাইরের গেষ্টদের সামনে তোমার একটা অসভ্য আচরণে তোমার পোশাক গায়ে থাকে ঠিকই কিন্তু আমরা তেরো কোটি মানুষ নগ্ন হয়ে পড়ি। তোমার বিরুদ্ধে অফিসিয়াল পদক্ষেপ অবশ্যই নেয়া হবে। আমি আপ্রাণ চেষ্টা করব তোমার যেন কঠিন শাস্তি হয়,’ এবার আকুতাগাওয়ার দিকে ফিরে বললেন, ‘সার, সব কিছুর জন্য আমি ওর হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করি প্লিজ সার, প্লিজ।’

আকুতাগাওয়া এই বাঙালী কর্মকর্তার আচরণে অভিভূত হয়ে পড়লেন। সামনে অনেকখানি মাথা ঝুকিয়ে সশ্রদ্ধ বো করলেন।

কাস্টমস ব্যারিয়ারের বাইরে জটলার মধ্যে একজন বাঙালীকে দেখে হাত নাড়লেন। ইংরাজি ক্যাপিটাল লেটারে বড় বড় করে তার নাম লেখা প্লাকার্ড উঁচিয়ে রেখেছে। আকুতাগাওয়া লম্বা-লম্বা পা ফেলে এগিয়ে গেলেন।
তিনি লোকটার দিকে সহাস্যে হাত বাড়িয়ে বললেন, ‘আমি কি জনাব আহমেদের সঙ্গে কথা বলছি?’

পরিচিতি এবং সৌজন্য বিনিময় চলাকালে তিনি খানিকটা অস্বস্তি বোধ করছিলেন আহমেদ ভদ্রলোকের ভাবভঙ্গি কেমন যেন একটু অন্যরকম। কেমন ভীত সন্ত্রস্ত দেখাচ্ছে।

কোথায় যেন ভারি একটা অসঙ্গতি আছে। এমন তো হওয়ার কথা না, তিনি মূলত বাংলাদেশে এসেছেন কাপড় কেনার জন, দু-একটা কাপড় না লক্ষ লক্ষ কাপড়। চলতি ভাষায় তিনি একজন বায়ার। জামিল আহদের জোর আমন্ত্রণে এই দেশে এসেছেন।
জামিল আহমেদের ঢাউস কটা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি। বাংলাদেশ থেকে পাঠানো কাপড়ের নমুনা দেখে তিনি চমত্কৃত- এমন কাপড় এই দেশে তৈরী হয় বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল। স্বচক্ষে দেখাই আসার মূল উদ্দেশ্য। তিনি যথাসম্ভব প্রস্তুতি নিয়েই এসেছেন কথাবার্তা চুড়ান্ত হলে এগ্রিমেন্ট সই করে ফিরে যাবেন।

কিন্তু সমস্যটা কী! আসার পূর্বে যথারীতি ফ্যাক্স চালাচালি হয়েছে। কোথায় উঠবেন তাও ঠিক করা হয়েছে। জামিল আহমেদ চাচ্ছিলেন সোনারগাঁয়ে রিজার্ভেশন করার জন্য। এই পাঁচতারা হোটেলটার ব্যাপারে আকুতাগাওয়ার প্রবল আপত্তি জানিয়েছিলেন। ক-দিন আগে হোটেলের লোকজনরা নিজেরাই ভাংচুর করেছে। এই হোটেল তাকে কতটুকু নিরাপত্তা দিতে পারবে এতে ঘোর সন্দেহ আছে। যদিও এ হোটেলে ওঁর দেশের স্বার্থ আছে তবু যে কান্ড কদিন আগে হয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত আই টি টির শেরাটনকে বেছে নেয়া হল।


আকুতাগাওয়া লজ্জিত হয়ে বললেন, ‘কিছু মনে করো না বড় ক্লান্ত লাগছে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হোটেলে যেতে চাচ্ছি।’
কথাটা বলেই তিনি ভারি কুন্ঠিত হলেন। ভদ্রলোক আহমেদ এমন হাঁ করে তাকিয়ে আছে কেন- তিনি কী কোনো বাড়াবাড়ি করে ফেলেছেন? তার আচরণে কী কোনো অসৌজন্য আচরণ প্রকাশ পেয়েছে? নাকি এই ভদ্রলোক তার ভাঙা ভাঙা ইংরাজি বুঝতে পারছেন না। অবশ্য তিনি প্রথমেই বলে রেখেছিলেন তাঁর ইংরাজি বুঝতে খানিকটা জটিলতা দেখা দিতে পারে, পাশাপাশি এ অনুরোধও করেছিলেন দ্রুত কথা না বলার জন্য। এই কথাটাই গুছিয়ে আবারও বললেন।

জামিল আহমেদ ইতস্তত করে বললেন, ‘ইয়ে, ব্যাপারটা হলো গিয়ে তোমার-।’
‘তুমি প্লিজ আমার নাম ধরে বলো বন্ধুরা আমাকে আকু বলে, প্লিজ আহমেদ। আর তোমার নামটা কি আমি ঠিকভাবে বলতে পারছি?’
জামিল আহমেদের মধ্যে এতক্ষণে সহজভাব ফিরে এসেছে। ‘ধন্যবাদ আকু, ভালই বলেছ। বিদেশিরা আমাদের নাম সঠিকভাবে বলে না সম্ভবত ইচ্ছা করেই।’

আকুতাগাওয়া লাজুক হাসলেন, তার ঝুলিতে আরও কটা চমক আছে। জাপানে জামিল আহমেদের যেসব ফ্যাক্স পেতেন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তেন, নাম-ধাম, এমন কি ফ্যাক্টরী ম্যানেজারের নাম পর্যন্ত। যে দেশের সঙ্গে ব্যবসা করবেন সে দেশ, মানুষ, এদের সম্বদ্ধে না জানলে চলবে কেন?
‘তোমাকেও ধন্যবাদ আহমেদ, আকু উচ্চারণটাও তোমার চমত্কার হয়েছে।’

জামিল আহমেদের নাম ভুলে যাওয়ার সমস্যা আছে কিন্তু এ নাম ভুল হওয়ার সম্ভাবনা নেই। চুলের পেছনে ঝুঁটি বাধে এমন একজনের নাম প্রায়শ খবরের কাগজে চোখে পরে অবশ্য ওই লোকের নাম আকু না আক্কু। একটা বাড়তি ক আছে।
‘ওয়েল, আহমেদ, চলো যাওয়া যাক।’
জামিল আহমেদ অসম্ভব বিব্রত গলায় বললেন, ‘আকু, একটা সমস্যা হয়ে গেছে, বিরাট সমস্যা। আমাদের দেশে এখন অসহযোগ আন্দোলন চলছে, অনির্দিষ্টকালের জন্য।’
আকুতাগাওয়া নির্বিকারভঙ্গিতে কাধ ঝাঁকালেন, ‘এত টেনস হচ্ছ কেন! ব্যাপারটা কি একটু বুঝিয়ে বলো তো।’
'সমগ্রদেশে সমস্ত ধরনের কাজকর্ম বন্ধ কিছুই চলবে না। তুমি নিশ্চই লক্ষ করোনি টার্মিনাল ফাঁকা একটা গাড়িও নেই।'
আকুতাগাওয়ার মুখ ঝুলে পড়ল, ‘তুমি এসব কী প্রলাপ বকছ। সব কিছু বন্ধ?’
জামিল আহমেদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘হ্যাঁ, কেবল মাত্র আকাশ পথ খোলা আছে; এটা খোলা থাকা না-থাকা সমান। কারণ আকাশপথ ব্যবহার করতে হলে রাজপথ ব্যবহার করতে হবে।'
‘হোটেল এখান থেকে কত দূর?’
‘হেঁটে-হেঁটে গেলে বহু দূর।’
‘আশে-পাশে কোনো হোটেল নেই,’ আকুতাগাওয়ার মুখ ক্রমশ অন্ধকার হচ্ছে।
‘দুঃখিত, আমি খোঁজ নিয়ে এসেছি, গেষ্ট উপচে পড়ছে, কোনো সম্ভাবনাই নেই।’
‘তোমার গাড়ি থাকলে ফোন করিয়ে আনিয়ে নাও।’
‘আকু, পরিস্থিতি বুঝতে পারছ না, কোন অবস্থাতেই গাড়ি এয়ারপোর্ট পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে না, অলৌকিক কোন উপায়ে যদি পৌঁছেও আমরা গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে পারব না। গাড়ি ভেঙেচুরে আগুন তো ধরাবেই আমাদেরকেও প্রাণে মেরে ফেলবে।’

আকুতাগাওয়ার থমথমে মুখ। এবার ক্ষুব্ধ গলায় বললেন, ‘এবার তুমি বলো কোন বুদ্ধিতে এমন নরকে আমাকে আসতে বললে। বলো, চুপ করে থেকো না।’
জামিল আহমেদ ম্লান গলায় বললেন, ‘আমার বক্তব্য শুনে যা ইচ্ছা তা বলো। তোমাকে আমি যখন আসতে ফ্যাক্স করেছিলাম তখন অবস্থা এমন ছিল না। সব স্বাভাবিক হয়ে যাবে মনে করা হচ্ছিল। যখন নিশ্চিত হলাম অসংখ্যবার তোমাকে ফ্যা করার চেষ্টা করেছি, ফোন করেছি তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারিনি। অবশেষে তোমার এমব্যাসীকে অনুরোধ করেছি তোমার আসা পিছিয়ে দেয়ার জন্য। আমার দুর্ভাগ্য কোনভাবেই তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারিনি।’

আকুতাগাওয়ার চুল ছিড়তে ইচ্ছা করছে। এই কদিন ছুটি কাটাতে গ্রামের বাড়ি চলে গিয়েছিলেন। ওখানে মাত্র দুদিন ছিলেন, কী শখ চাপল, ফুজি মাউন্টেন দেখতে চলে গেলেন। এরপর ডমেষ্টিক ফ্লাইট ধরে নারিতা, নারিতা থেকে সরাসরি এখানে। ভারি লজ্জিত হলেন, ছি-ছি, কী লজ্জা-কী লজ্জা!
লজ্জিত দু-হাতে জামিল আহমেদকে ধরে বললেন, ‘তোমার প্রিয় মানুষের দোহাই আমাকে ক্ষমা করো, ভুলটা আমারই। তুমি এলে কিভাবে?’
‘হেঁটে-হেঁটে কিছুদুর তারপর রিকশায়,’ জামিল আহমেদ ভাবছিলেন অসহযোগ আন্দোলনে রিকশাকে এবার ছাড় দেয়া হয়েছে এটাই ভরসা। যে রিকশা নিয়ে এয়ারপোর্ট এসেছিলেন মোটা টাকার লোভ দেখিয়েও ওই লোককে রাখা সম্ভব হয়নি।

আকুতাগাওয়া এখন বুঝতে পারছেন কেন বোয়িংটা ছিল ফাঁকা-ফাঁকা। হাত-পা ছড়িয়ে শুতে ইচ্ছা করছিল বলে এয়ার হোস্টেসকে জিজ্ঞেস করেছিলেন আসন পরিবর্তন করা যাবে কিনা? এয়ার হোস্টেস মুচকি হেসে বলেছিলঃ যেখানে তোমার পছন্দ হয়, ভাল করে বিশ্রাম নাও আমি নিশ্চিত আগামী সময়টা তোমার জন্য হবে কষ্টকর।

প্রচন্ড মাথাব্যথা হচ্ছিল বলে কথা বাড়াননি। নয়তো তখই জেনে যেতেন, অবশ্য আগাম জেনেও অবস্থার খুব একটা হেরফের হত না।

জামিল আহমেদ ছুটাছুটি করায় গা থেকে দরদর করে ঘাম ঝরছে। কিচ্ছু নেই, একটা রিকশাও না! রাস্তার পাশে ঠেলাগাড়ি জাতীয় একটা ভ্যানে গাছের ছায়ায় একজন মহা আরামে ঘুমাচ্ছে।

জামিল আহমেদ নিচু গলায় ডাকলেন, ‘এই-এই।’
কাজ হচ্ছে না দেখে গা ধরে ঝাঁকুনি দিলেন। লোকটা ধড়মড় করে উঠে বসল। ট্রাফিক পুলিশ না দেখে বিকট হাই তুলে উপুড় হল।

জামিল আহমেদ নাছোড়বান্দার মতো বললেন, ‘এই-এই।’
‘এই-এই, হেই মিয়া বিষয়ডা কী।
‘যাবে?’
‘জ্বে না, এইবার যান গিয়া ঘুমাইতে দেন।'
‘চলো না, ভাল টাকা পাবে।’
লোকটা এবার উঠে বসল, কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, ‘এই মিয়া হুনেন নাই, একবার যে কইলাম যামু না আবার টেকার গরম দেখায়। আপনার টেকায় আমি হাগি।’

জামিল আহমেদ হতভম্ব। দেশের অস্থির-অসুস্থ পরিবেশ সবাইকে কেমন বদলে দিচ্ছে। মাথা গরম করলে হবে না। মুহুর্তে ভোল পাল্টে ফেললেন, ‘ভাই, সঙ্গে বিদেশি মেহমান আছে, বিপদে পড়েছি, একটু কষ্ট করে পৌছে দাও না।’
‘কোন জায়গায় যাইবেন?’
হোটেলের নাম বললে চিনতে পারল না, লোকেশন বলা মাত্রই হাত উঠিয়ে থামিয়ে দিল, ‘হ-হ চিনছি, ওই বড় বড় ঢুলাওয়ালা হঢলডা তো। তয় হেইডা তো বিআইবি রোড যাইতে দিব না।’
জামিল আহমেদ চকচকে চোখে বললেন, ‘আচ্ছা সে দেখা যাবে।’
‘ওরি আল্লা, ম্যালা দূর পাঁচশো টেকা লাগব। দরদাম নাই। এইডা মাছ বাজার না।’
জামিল আহমেদ থ মেরে গেলেন। এ বলে কী, পাঁচশো টাকা!

সমস্যা দেখা দিল বসা নিয়ে। আকুতাগাওয়া উবু হয়ে বসেছিল বলে কেমন হাস্যকর দেখাচ্ছিল। জামিল আহমেদ দেখিয়ে দিলেন পা ঝুলিয়ে কেমন করে ভ্যানে বসতে হয়।
‘সরি, আকু, তোমার কষ্ট হচ্ছে, রিকশা পেলে আরাম করে বসতে পারতে। ও দুঃখিত, তুমি তো আর আমাদের রিকশা দেখো নি।
‘দেখি নি তবে এ সম্বন্ধে পত্রপত্রিকায় ছবি ছাপা হয়েছিল প্রচুর লেখালেখি হয়েছিল। আমাদের জাপানে ১৯৯৪ সালে ‘ফুফুওকা’ শহরে Rickshaw Painting- Traffic Art in Bangladesh আর্ট শো হওয়ার কথা ছিল।

ঠেলাওয়ালা ঝড়ের গতিতে দৌড়াতে দৌড়াতে গলা ছেড়ে গান ধরেছে। জামিল সাহেবের গা কাঁপছে, রাগ হচ্ছে, ভয়াবহ রাগ। রাগ সামলাতে বেগ পেতে হচ্ছে। এখন পর্যন্ত যত বদ দেখেছেন এদের মধ্যে এই ঠেলাওয়ালা হারামজাদা হচ্ছে বদের হাড্ডি। হারামজাদা ওদের নিয়ে রসিকতা করছে।
ঘুরে ফিরে একটাই গান গাইছে ‘ফান্দে পরিয়া বগা কান্দে রে-এ-এ।’

রাস্তায় যে দু-চারজনকে দেখা যাচ্ছে এরা দাঁত বের করে হাসছে। জামিল আহমেদ মনে মনে বললেন, ‘ধরণী ····’ ।

আকুতাগাওয়া আনন্দিত। গানের তালে তালে মাথা দোলাচ্ছেন। এক পর্যায়ে বললেন, ‘আহমেদ, ভাষা না বুঝলেও ওর গান শুনে আমি মুগ্ধ, তুমি কি গানের কথাগুলো ইংরেজীতে অনুবাদ করতে পারো?’ জামিল আহমদে উদাস হলে বললেন, ‘এই আকাশ বাতাস দেখে আমাদের ড্রাইভার সাহেবের মাথা আউলা-ঝাউলা হয়ে গেছে। এরই বর্ণনা এ গানের মূল ভাবার্থ। আমি সম্ভবত তোমাকে ঠিক বোঝাতে পারলাম না। আসলে অনুবাদ কাজটা খুব জটিল কিনা।’

আকুতাগাওয়া খানিকক্ষণ ইতস্তত করে বললেন, ‘আহমেদ, প্রথমেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি ব্যাপারটা তোমাদের নেহায়েত ব্যক্তিগত তাই তোমার ইচ্ছা না করলে এই উত্তর দিয়ো না। এই যে তোমরা দেশ অচল করে দিচ্ছ, এটা কেন?’
‘সরকার দেশ ঠিকভাবে চালাতে পারছে না এই বিষয়ে বিরোধীদলের প্রবল আপত্তি আছে, এর ফলাফল এই।’
‘দেখো, হুজ রাইট হুজ রং আ ডোন্ট নো, আমার ভাসাভাসা জ্ঞান নিয়ে কোনও মন্তব্যও করতে চাচ্ছি না। কিন্তু এভাবে গোটা দেশ অচল থাকলে ক-বছরের জন্য পিছিয়ে যাচ্ছ সেটা নিশ্চয়ই জানো? জাপানের চেয়েও ধনী, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশ লুক্সেমবার্গ যাদের মাথাপিছু আয় প্রায় চল্লিশ হাজার ডলার, ওরাও তো এভাবে একদিনের জন্যও দেশ অচল করে দেয়ার কথা কল্পনাও করবে না। তেমাদের মাথাপিছু আয় কত এখন?’
জামিল আহমেদ ক্ষীণ গলায় বললেন ‘আমি ঠিক জানি না। কিন্তু এক পর্যায়ে হরতাল না করে উপায় থাকে না। ক্ষমতাবান কেউ যখন কোন কথাই শুনবে না তখন তো জনগণের শেষ অস্ত্র হরতাল।’
‘প্লিজ আহমেদ, দয়া করে ভুল তথ্য দেবে না। আজই প্রথম এ দেশে হরতাল হচ্ছে না, পূর্বেও বহুবার হয়েছে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে। আমাদের পত্র-পত্রিকায়ও কিছু লেখালেখি হয়েছে। তুমি বললে জনগনের ইচ্ছায় এ হরতাল, এই দেশের বেশিরভাগ জনগণ কি এটা চাচ্ছে? তোমরা মাঝে মধ্যে সমীক্ষা করো হরতালের পক্ষে-বিপক্ষে । সেখানে তো হরতালের বিপক্ষের পাল্লাই ভারী। আর যে-সব সমীক্ষা করা হয় এদের মধ্যে কারা থাকে? একজন কৃষক, একজন মজুর, নিম্ন আয়ের এইসব মানুষ কি চাচ্ছে হরতাল হোক? এরাই তো এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ, নাকি ভুল বললাম? আহমেদ তুমিই কি চাও?
জামিল আহমেদ মুখ নিচু করে বললেন, ‘না।’

‘আহমেদ একটা অন্যায় হলে প্রতিবাদ হবে অবশ্যই কিন্তু প্রতিবাদের ভাষা কি এই-ই! একটা ক্রাইমকে থামানোর জন্য ক্ষমার অযোগ্য আরেকটা ক্রাইম করা কি সমর্থনযোগ্য? যখন খুশি, যে- কারোর একটা মুখের কথায় কোটি-কোটি শ্রম ঘন্টা নষ্ট করবে আমরা এটা স্বপ্নেও ভাবি না। সাম্প্রতিক একটা ঘটনা তুমি নিশ্চয়ই পড়েছ, ফ্রান্সে পরমাণু বিরোধী কর্মীরা পরমাণু চুল্লি সুপার ফিনিক্স বন্ধের দাবিতে চুল্লিটির বাইরে প্রায় দশ হাজার জোড়া পুরনো জুতা জড়ো করে রাখে। প্রতি জোড়া জুতার ভেতর একটি করে কাগজ। ওই কাগজে লেখা সুপার ফিনিক্স বন্ধ কর। এ নিয়ে সমগ্র বিশ্বে তোলপাড় পড়ে গেছে। যুগোশ্লাভিয়া একবার কি হল শোনো, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা প্রতিবাদ জানালেন এভাবে এঁরা ওইদিন পড়াবেন ঠিকই কিন্তু একদিনের বেতন নেবেন না, এ নিয়ে হই হই পড়ে গেল।’
‘আকু, আমি বিস্মিত হচ্ছি এটা ভেবে তুমি কোন যুক্তিতে ওইসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনা করছ?’
‘কেন তোমরাই তো বলো তোমরা পৃথিবীর সেরা জাতি। তোমাদের রয়েছে মহান মুক্তিযুদ্ধের অতুলনীয় ইতিহাস। ওয়েল, তোমরা খোঁজ হরতালের বিকল্প তোমাদের দেশের সেরা সন্তানরা কোথায়? তোমাদের দেশেও তো অসম্ভব প্রতিভাবান সন্তান আছে যারা বিশ্বকে চমকে দিয়েছেন, এই মুহুর্তে আমার মনে পড়ছে একজনকে মি. ইউনুস, ওঁরা আজ কোথায়?’

জামিল আহমেদ চুপ করে রইলেন। কথা বাড়াতে ইচ্ছা করছে না। প্রখর রৌদ্র চামড়া পুড়িয়ে দেবে মনে হচ্ছে। এই জাপানি ভদ্রলোক কি উপায়ে নির্বিকার আছেন এর রহস্য বুঝতে পারছেন না।
এবার আকুতাগাওয়া বললেন, ‘তুমি সম্ভবত আমার কথায় আহত হয়েছ, এ জন্য ক্ষমা চাচ্ছি। কী আশ্চর্য, আমার ঘড়ির সময় এখন ছটা, তোমার ঘড়িতে এখন সময় কত?’
‘তিনটা।’
জামিল আহমেদ এইবার ঠেলাভ্যান থামাতে বললেন। ঠেলাওয়ালা অবাক হয়ে বলল, ‘হোডল তো এইহানো না।’
‘চুপ থাক ব্যাটা,’ রাগ চেপে রাখতে পারছেন না। ভাড়া মিটিয়ে বললেন,‘সরি, আকু, কিছু দূর হাঁটতে হবে।’
‘কেন, এটা কি শেরাটন পর্যন্ত যাবে না?’
‘দুঃখিত, না, এটা ভি আই পি রোড, ধীরগতির যানবাহন চলা নিষেধ।’

এই কপটতা জামিল আহমেদ ইচ্ছা করেই করলেন। এমনিতেই সমস্তটা রাস্তায় নিজেকে কেমন বাঁদর-বাঁদর মনে হচ্ছিল। সবই কেমন হাঁ করে তাকাচ্ছিল। একটা ঠেলাভ্যান শেরাটনে পার্ক করল এর চেয়ে হাস্যকর আর কী হতে পারে!

ভাগ্য ভাল রিকশা পেয়ে গেলেন। টিমেতালে রিকশা এগুচ্ছে।
‘আহমেদ তুমি কি দয়া করে এই ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করবে ইনি আসলেই হরতাল চাচ্ছেন কি না?’ এই ভদ্রলোক মানে রিকশাওয়ালা। জামিল আহমেদ এইবার অসন্তুষ্ট হলেন, এই জাপানি ভদ্রলোকের এই দেশ নিয়ে এত কৌতুহল কেন? তিনি মুখের ভাব অপরিবর্তিত রেখে জিজ্ঞেস করলেন, কি-ও, কি বুঝতেছেন দেশের অবস্থা এই হরতাল···’
রিকশাওয়ালা মুখ না ফিরিয়েই বলল, ‘আমারে কন?’
‘জ্বী’ ।
‘দুই টেকার আকিজ বিড়ি অখন হইল গিয়া দশ টেকা, কি বুঝবার পারলেন? এইবার আল্লার কুদরতে হরতালের সময় রিকশা চালাইবার পারতাছি অন্যবার তো রিকশা ভাইঙা ফালাইত। হেছা কই, এইবার হরতালে আল্লার রহমতে রুজি রুজগার ভালা খুব ভালা, তয় মনে শান্তি নাই, জীবনের কুনু গিরান্টি নাই এই দেখছেন বাইচা আছি এই দেখছেন নাই, মইরা গেছি। অহন জেবনডা হইল কচু পাতার পানি। চামার কি করে জানেননি যতজন মরা গরু দেখব ততজনের ভাগ। এই দেশডা হইল গিয়া আপনের মরা গরু।’
বলতে গিয়ে জামিল আহমেদের চোখের পাতা কেঁপে গেল, ‘আকু, এ বলছে গণতন্ত্রের জন্য এইসব হরতাল-টরতালের প্রয়োজন আছে।’

আকুতাগাওয়া তাঁর পাসপোর্টের সঙ্গে ক্রেডিট কার্ড দিয়ে রিসেপশনিষ্টকে বললেন, ‘আমার যাবতীয় বিল এই ক্রেডিট কার্ডে চার্জ হবে। আশা করি ভিসা ক্রেডিট কার্ডে আপনাদের সমস্যা হবে না?’

জামিল আহমেদের শত-অনুরোধেও কান দিলেন না, বিনীত ভাবে তার অনুরোধ ফিরিয়ে দিলেন। জামিল আহমেদ ক্রমাগত বোঝাবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলেনঃ তুমি আমার গেষ্ট, তোমার সেবা করার সুযোগ দিলে আমার আনন্দের শেষ থাকবে না। এ জাতীয় বাক্য আকুতাগাওয়াকে বিন্দুমাত্র টলাতে পারল না।

জামিল আহমেদের একগাদা টাকা বেঁচে যাচ্ছে তাতে আনন্দিত হওয়ার কথা কিন্তু তাকে ভারি হতাশ দেখাল। ব্যবসায়ীদের মধ্যে অলিখিত একটা নিয়ম প্রচলিত আছে যাকে আমন্ত্রণ করে নিয়ে আসা হবে তাঁর যাবতীয় ব্যয়ভার আমন্ত্রণকারী বহন করবে। জামিল আহমেদ পরবর্তীতে জাপান গেলে তাঁরও সমস্ত খরচাপাতি বহন করতেন আকুতাগাওয়া। জামিল আহমেদের মনে হল এই জাপানি ভদ্রলোক আগ বাড়িয়ে ক্রেডিট কার্ড দিয়ে তাঁকে একটা ইঙ্গিত দেয়ার চেষ্ট করছেন।
হা ইশ্বর, এ ডিলটার উপর তাঁর ভবিষ্যত নির্ভর করছে। দয়া করো ইশ্বর, দয়া করো। গার্মেন্টস শ্রমিকদের ছাটাই করতে হবে অন্তত এদের কথা ভেবে দয়া করো।

আকুতাগাওয়া এরি মধ্যে কোথায় কোথায় যেন ফোন করছে।
চেক-ইন পর্ব সমাপ্ত হলে আকুতাগাওয়া গাঢ় গলায় বললেন, ‘আহমেদ, আমার প্রিয় বন্ধু তোমার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাবার ভাষা আমার নেই। তুমি যেভাবে কষ্ট করে আমাকে এয়ারপোর্ট থেকে নিয়ে এসেছ তোমার এ আতিথেয়তার কথা আমি ভুলব না। ওয়েল, এমব্যাসীকে ফোন করেছি হরতাল চলাকালীন এরা আমাকে হোটেল থেকে বের হতে নিষেধ করেছে। এয়ারপোর্ট থেকে ওদের ফোন করলে ওরা নাকি কোনও একটা ব্যবস্থা করত। যাই হোক হরতাল শেষ হলে তুমি এখানে যোগাযোগ কোরো। প্লিজ আহমেদ, প্রাণের ঝুকি নিয়ে হরতালের মধ্যে তুমি কিন্তু আসবে না এমন হলে আমি কিন্তু খুব রাগ করব।’

বিদেশিরা যে কাজ সচরাচর করে না আকুতাগাওয়া তাই করলেন। জামিল আহমেদকে গভীর আবেগে জড়িয়ে ধরে বিদায় দিলেন, হোটেলের টেরেস পর্যন্ত এগিয়ে এলেন। তাঁকে ভারি বিমর্ষ দেখাচ্ছিল। বারবার জানতে চাইছিলেন, জামিল আহমেদ ফিরতে পারবেন তো বাসায় ফিরতে কোনো সমস্যা হবে না তো?

.................
আজ ২৬ শে মার্চ। স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী আজ। চারদিকে উত্সব উত্সব ভাব। জামিল আহমেদেরও দু-চোখে আনন্দ উপচে পড়ছে। ৯ মার্চ থেকে যে টানা অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়েছিল আজ এবং আগামীকাল দু-দিনের জন্য শিথিল করা হয়েছে। এই ক-দিন তাঁর সমস্ত ফ্যাক্টরীতে তালা ঝুলেছে। মেশিনের সুতা থেকে এক ইঞ্চি সুতাও খরচ হয় নি, একটা কাপড়ও তৈরি হয়নি।

জামিল আহমেদ এই ক-দিন বাসা থেকে বের হননি, সম্পূর্ণ বন্দি জীবন যাপন করেছেন। কিছুটা নিরাপত্তার অভাব, কিছুটা স্বেচ্ছায়। এক ধরনের অভিমানও কার উপর তিনি জানেন না। সন্ধ্যায় অবশ্য নিয়মিত তার ফ্যাক্টরির ম্যানেজাররা আসতেন তারা গোল হয়ে বি,বি,সি শুনতেন।
এই দেশ যখন ইংরেজদের কাছে পরাধীন ছিল তখন ইংরেজদের সব কথাই অবিশ্বাসের চোখে দেখা হত আজ এদের কথাই বেদবাক্য মনে হয়। একটা স্বাধীন দেশের নাগরিকেরকে নির্ভর করতে হয় অন্য দেশের তথ্য মাধ্যমের উপর। এ যে কি নিদারুন অপমান।

প্রতিদিন তারা তীব্র উৎকন্ঠায় খবর শুনতেন এই বুঝি বিবিসি থেকে বলা হবে আগামীকাল থেকে অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করা হল। আগামীকাল থেকে তাঁরা পূর্ণ উদ্যমে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েবেন। কিন্তু সে আশায় গুড়ে বালি।

একদিন তার এক ব্যবসায়ী বন্ধুকে অসম্ভব মন খারাপ করে ফোন করেছিলেনঃ রশিদ, আমি সহ্য করতে পারছি না। আমার লোকসান না-হয় মেনে নিলাম, কিন্তু হাজার হাজার শ্রমিক বেতন পাচ্ছে না, এদের যে কিভাবে দিন চলছে?
রশিদ সাহেব বলেছিলেন: তোর ইচ্ছা হলে এদের বেতন দিলেই তো পারিস।
কোত্থেকে দিব বল, হাজার হাজার পিস তৈরি কাপড় বিক্রির অপেক্ষায় পড়ে আছে। ভেবেছিলাম বিক্রি হলে এদের বোনাস দেব জাপানি একজন বায়ার এসে শেরাটনে বসে আছে। কিছুই হচ্ছে না।
রশিদ হাসতে হাসতে বলেছিলেন: তোর শ্রমিক মানে তো মেয়ে?
তো!
আরে, এরা বসে আছে নাকি দেহ ব্যবসায় নেমে পড়েছে না!
জামিল আহমেদ প্রচন্ড ক্রোধে থরথর করে কাঁপছিলেন: রশিদ, তুই যদি কুত্তার বাচ্চা না হোস আমার সঙ্গে কোন দিন কথা বলবি না।
টেলিফোন আছড়ে ফেলেছিলেন। তাতেও স্বস্তি পাননি। ফোনের প্লাগ খুলে ফেলেছিলেন।

জামিল আহমেদ নিজেই গাড়ি চালাচ্ছেন। পাথ ফাইন্ডারটা ইচ্ছা করেই বের করেননি। অসহযোগ আন্দোলন শিথিল করা হয়েছে ঠিকই কিন্তু ঝামেলা বাঁধতে কতক্ষণ। গাড়ি ভেঙে ফেলা আগুন লাগিয়ে দেয়া একটা নিয়ম হয়ে দাড়িয়েছে। একটা গন্ডগোল হলেই সরকারী-বেসরকারী সম্পদ নষ্ট করা এখনকার নষ্ট রাজীতির ফসল। দেশের অস্থির অবস্থা সব কিছু এলোমেলো করে দিচ্ছে। অসংখ্য ফ্রাঙ্কেষ্টাইন তৈরি হচ্ছে। এখন চোখের সামনে একজন মানুষকে মরে যেতে দেখলে গা গুলায় না।
জনসমুদ্রের মাঝে ইচ্ছা করলেই একজন মানুষকে উলঙ্গ করে ফেলা যায়। সেই উলঙ্গ মানুষটার ছবি আবার ঘটা করে পত্রিকায় ছাপানো হয়। সেই মানুষটার অপরাধ এটুকুই ছিল হরতালের দিনে তিনি অফিস করতে যাচ্ছিলেন। জনগণ স্বতস্ফুর্ত হরতাল পালন করেছে এর নমুনা এই!
একটা সভ্য দেশের অসভ্য এমন কান্ডের জন্য মরে যেতে ইচ্ছা করে।

জামিল আহমেদের প্রচন্ড ঝাঁকুনিতে দম বন্ধ হয়ে এল। রিসেপশনে দাঁড়ানো লোকটা পাগলের মত কী সব বলছে। আকুতাগাওয়া প্রথম সুযোগেই বাংলাদেশ ত্যাগ করেছেন, তার জন্য মেসেজ ছেড়ে গেছেন। জামিল আহমেদ অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে অনেকক্ষণ ম্যানিলা এনভেলাপ নাড়াচাড়া করলেন খোলার কথা মনেই রইল না। এক সময় খাম ছিঁড়ে ফেললেন। গোটা গোটা অক্ষরে লেখা:
“প্রিয় বন্ধু আহমেদ,
তুমি আমাকে ক্ষমা করতে পারবে না তবুও ক্ষমা চাই তোমার সঙ্গে দেখা না করে, না জানিয়েই দেশে ফিরে যাচ্ছি। প্লিজ, চিঠি সবটা না পড়ে ফেলে দিয়ো না। আমরা বিদেশীরা চট করে মুগ্ধ হই না। তোমাকে আজ আমার খুশি করার প্রয়োজন নেই তাই বলি অল্প সময়ে তোমাকে আমার অসম্ভব পছন্দ হয়েছিল- কেন, এটা ঠিক আমি বলত পারব না। তুমি ঠিকভাবে বাসায় পৌছলে কিনা এ নিয়ে আমি খুব দুঃশ্চিন্তায় ছিলাম। তুমি হোটেল থেকে রওয়ানা হওয়ার একঘন্টা পর থেকে প্রতি দশ মিনিট অন্তর তোমার বাসায় ফোন করেছি। যেই মাত্র তুমি বললে জামিল আহমেদ স্পিকিং তখন আমি টেলিফোন রেখে দিলাম। কেন, বলছি। ওই অল্প সময়েই তুমি আমাকে যথেষ্ঠ মায়ায় জড়িয়ে ফেলেছিলে আমি মায়া বাড়াতে চাচ্ছিলাম না।

আহমেদ, আমরা ব্যবসায়ী, আবেগ এবং ব্যবসা গুলিয়ে ফেলা ঠিক না। যে জন্য তোমার সঙ্গে দেখা করে আসিনি, এমন করলে হয়তো আমি দুর্বল হয়ে যেতাম। এ দেশে আসার উদ্দেশ্য ব্যবসা সেখানে আবেগপ্রবণ হওয়ার স্থান কোথায় বলো? এক নাগাড়ে যে হরতাল চলছিল পনের দিন পর্যন্ত আমি বাংলাদেশেই ছিলাম। বাংলাদেশ ত্যাগ করার আগ মুহুর্ত পর্যন্ত হরতাল চলছিল। কখন এ দুঃসহ অবস্থার অবসান হবে কেউ জানে না।

এই পনের দিন মূলত আমি নিজেকে একজন প্রিজনার ছাড়া কিছুই ভাবতে পারিনি। অতিথিদের জন্য জুয়া খেলা ছাড়া হোটেলে সমস্ত সুবিধাই ছিল। তাতে কী। আমার সমস্ত জীবনে কখনোই এত শ্রমঘন্টা নষ্ট করিনি!
আহমেদ, বন্ধু আমার, জীবনটা একটা লম্বা দৌড় এখানে থমকে দাঁড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। পনের দিন কাজের মানুষ কোনো কাজ করবে না এ-ও কী সম্ভব! যেখানে প্রতিটি সেকেন্ড মূল্যবান সেখানে প্রায় তেরো লক্ষ সেকেন্ড একজন মানুষ ঝিম মেরে বসে থাকবে!

এটা লিখতে ভীষণ মন খারাপ হচ্ছে, আমি নিরুপায় আহমেদ, সব কিছু মিলিয়ে দেখলাম তোমার সঙ্গে ব্যবসা করা সম্ভব না। তোমাকে বলিনি, এ কপটতার জন্য ক্ষমা করো, বাংলাদেশে আসার আগে বাংলার ভাষার উপর একটা শর্ট কোর্স করেছিলাম। এই দেশের উপর যথাসম্ভব পড়াশুনা করেছি। তুমি একজন ব্যবসায়ী বলেই বুঝতে পারবে যে দেশে আমি মিলিয়ন-মিলিয়ন ইয়েন ইনভেষ্ট করব সেই দেশ সম্বন্ধে কিছুই জানব না তা তো হয় না।
তোমাদের দেশের অবস্থা খারাপ এটা জানতাম কিন্তু এমন শোচনীয় অবস্থা আমি কল্পনাও করতে পারিনি।

রিকশাওয়ালার সঙ্গে তোমার যখন বাংলায় কথা হচ্ছিল কিছু কিছু বুঝতে পারছিলাম যে তোমাদের অবস্থা কতটা শোচনীয়। তুমি কিন্তু আমাকে মিথ্যা বললে।
আমি অবাক হয়ে ভালছিলাম তোমরা দেশকে এত ভালবাসো। তুমি আমি আমরা এশীয়ান এ টান তো আছেই এছাড়াও তোমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার বাবা তোমাদের দেশে জাপানি দুতাবাসে কিছুদিন চাকরি করেছেন। ফিরে এসে বাবা তোমাদের কত গল্পই না করেছেন। সব মিলিয়ে তোমাদের দেশের প্রতি একটা টান অনুভব করতাম। তোমাদের দেশের প্রতি ভালবাসার ছোট্ট একটা নমুনা দেবো। জাপানের কোবো ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ইয়োশিতাকা মাসুদা তোমাদের জাতীয় সঙ্গীত অনুবাদ করেন। গোটা জাতীয় সঙ্গীত আমার মুখস্ত। তুমি নিশ্চয়ই বিশ্বাস করছ না? বেশ ভুলচুক হলে ক্ষমা করো-

‘ওয়াগা ওউগুন নো বেংগাল ইয়ো,
আই সরু ওয়াগা সোকোকু ।
আতাকামো ফুরুতো নো নেইরো নো ইয়োনা
সোরা ইয়া কুকি ইয়ো এইএননি।
আ ওয়াগা সোকোকু কিয়ো,
হারু নিওয়া, ম্যাংগো নো কাওরিগা ওতাশি ও
ইয়োরোকোবি দে ওয়াইল দো নি সাসেতে কুরেরু ।
আ নান তো ইউ কানগোকি দা।'
বিদায় বন্ধু, বিদায়।”

জামিল আহমেদের চশমার কাঁচ ঝাপসা হয়ে গেছে তিনি আর পড়তে পারছিলেন না। তিনি কাঁদতে কাঁদতে নিজের অজান্তেই গাইতে শুরু করলেন “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি।”
হোটেলের সিকিউরিটির লোকজন ছুটে এসেছে। লবিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা লোকজন হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে।

সিকিউরিটির একজন চেষ্টাকৃত কঠোর হয়ে বলল, আপনি এরকম করছেন কেন আপনার সমস্যাটা কী?’
জামিল আহমেদ ভেজা চোখে হা হা করে হাসতে হাসতে বললেন, ‘নাথিং, কেন তোমাদের হোটেলে কি জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া নিষেধ আছে?’

*কয়েদী: ২

কয়েদীর জনৈক সমালোচক নিজেই যখন লেখক!

জনৈক সমালোচক কয়েদী নিয়ে কঠিন একটা সমালোচনা করেছেন। অবশ্য এটাকে আমি সমালোচনা বলে স্বীকার করি না। এটা হচ্ছে একজন মানুষকে কলম নামের চাপাতি দিয়ে ঠান্ডা মাথায় কুপিয়ে আহত করা। 'কয়েদী' নামে একটা বই আছে আমার। গোটা বইটাই হরতাল নিয়ে।

আমাদের দেশে হরতালের মতো দানবকে নিয়ে অন্য কোন লেখক কেন বই লেখেননি এটা আমার কাছে অষ্টম আশ্চর্যের একটি। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর ধরে চলে আসা হরতালকে তাইলে এঁরা সমস্যা মনে করছেন না- প্রকারান্তরে সমর্থন দিচ্ছেন! ভাল ভাল- জয় হোক মহান কলমবাজদের!

তো, সমালোচক সাহেবের বক্তব্য হলো, এটাকে কেন উপন্যাস বলে প্রকাশক বিজ্ঞাপন দিলেন। বিজ্ঞাপনটা ছিল এই রকম: 'হরতাল নিয়ে এই দেশের একমাত্র উপন্যাস'!
বিজ্ঞাপনটা হরতাল নিয়ে এ দেশের একমাত্র বই এমনটা গেলে আর দোষ হতো না। এটা না হয় মেনে নেয়া গেল।

সমালোচক সাহেব লিখেছেন, "৪২ পাতার কয়েদী পড়তে ৪০ মিনিট লাগল। যারা দ্রুত পড়তে পারেন তাদের ৩০ মিনিট লাগবে।" বেশ যা হোক, এখন থেকে একটা বই পড়তে কতোটা সময় লাগবে, এটাও ট্যাগ হিসাবে সংযোজন করা আবশ্যক।

আসলে বইটা ৪২ পাতার না, ৪৮ পৃষ্ঠার। এ নিয়ে আমার তীব্র বেদনা আছে। প্রকাশক সাহেবের আপত্তি ছিল, অন্তত ৪ ফর্মা বা ৬৪ পৃষ্ঠার ম্যাটার দেয়ার জন্য। কিন্ত আমার উপায় ছিল না। সে অন্য কাহিনি।

একটি বই বের হওয়ার পেছনের বেদনার কথা পাঠক জানেন না- তাঁর জানার প্রয়োজনও নেই।
আমার স্পষ্ট মনে আছে, যে বছর এই বইটা বের হয়। গভীর রাতেই আমার মেয়েটা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল- কারণ, পরদিন ছিল হরতাল। আমি ১৫০ কিলোমিটার দূরে। সকালে আমাকে যখন ফোন করে এ খবরটা দেয়া হয়, আমি ফোনে আমার মেয়ের কান্না শুনতে পাচ্ছিলাম অথচ আমি যেতে পারছিলাম না। কী কষ্ট-কী কষ্ট! এ গ্রহের সবচেয়ে বড়ো কারাগারে আটকে পড়া একজন বাবা-কয়েদী! এর নাম নাকি গণতন্ত্র!
তো, পরদিন যাওয়া ব্যতীত আমার কোন উপায় ছিল না। আমার মেয়ে হাসপাতালে আর আমি প্রকাশকের এখানে বসে কয়েদী বইটা প্রুফ দেখছি- চোখের জলে ভাসতে ভাসতে। ৬৪ পৃষ্টা লেখব কি, প্রুফ দেখেই শেষ করতে পারিনা এমন অবস্থা। গোপন ইচ্ছা ছিল, পরবর্তী সংস্করণে আরও কিছু পৃষ্ঠা যোগ করে দেব কিন্তু আমাদের মতো অগাবগা লেখকদের তো আর আবার প্রথম সংস্করণই কখনও শেষ হয় না!

সমালোচক সাহেব আলী মাহমেদ নাম নিয়ে তার আপত্তি বোঝাতে গিয়ে শিশ্ন শব্দটা ব্যবহার করেছেন। আমি সমালোচক সাহেবের লেখার ধাঁচের সঙ্গে পরিচিত- খেয়াল করেছি, গদ্য হোক আর পদ্য, প্রায় লেখায় শিশ্ন শব্দটা না থাকলে যেন লজ্জায় ওনার মাথা কাটা যায়। আমার কাছে মনে হয় এমন, কেউ যেন অনবরত বকেই যাচ্ছে, জানিস, আমার না একটা ইয়ে আছে। জানিস আমার না একটা। ওরে, তোরা জানিস আমার…।
ওনার মূল বক্তব্য হচ্ছে, কয়েদীর নামের বইটা একটা যাচ্ছেতাই । বেশ, নিরানন্দ ভঙ্গিতে না হয় মেনে নিলাম। একজনের লেখা সবার ভাল লাগতে হবে এমন মাথার দিব্যি কে দিয়েছে!

কিন্ত, টুইস্ট হচ্ছে এই, তিনি শেষে বলেন, "আমি যদি এই বইটা লিখতাম তাহলে চরিত্রগুলোর একটার সঙ্গে অন্যটার..." (এরপর তার কেরামতির বিস্তারিত কাহিনী, লম্বা ফিরিস্তি)। মুশকিলটা হয়েছে এখানেই, গ্যালারীর দর্শক যখন খেলতে নেমে পড়ার জন্য লাফিয়ে পড়েন তাইলে খেলা দেখবে কে?

ওঁকে কে বোঝাবে, এটা একটা নতুন ধরনের কাজ করার চেষ্টা। বাপের সঙ্গে চাচার সম্পর্ক, চাচার সঙ্গে নানার এইটা চাচ্ছিলাম না। বইটায় তথাকথিত কোন নায়ক নেই। এই বইটায় একটা চরিত্রের সঙ্গে অন্য একটা চরিত্রের কোন সংযোগ না থাকার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করা হয়েছিল। যেন একটা কারাগারের বিভিন্ন সেল। একটা সেলের কয়েদীর সঙ্গে অন্য কয়েদীর কোন যোগ নাই, একেকটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপ! কাছ থেকে কিছুই বোঝা যাবে না কিন্ত দূর থেকে তাকালে ক্রমশ গোটা কারাগারের একটা অবয়ব ফুটে উঠবে।