Search

Showing posts with label ১৯৭১: প্রসব বেদনা. Show all posts
Showing posts with label ১৯৭১: প্রসব বেদনা. Show all posts

Thursday, February 12, 2026

সনদ-বিক্রেতা।

যারা ১৯৭১ নিয়ে মায়াকান্না করে তারা বাংলাদেশ- বিরোধী!

এই 'দেশবিরোধী সার্টিফিকেট' বিলি করেন ইনি:

ইনি কে? একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধকালের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডাদেশ থেকে খালাস পাওয়া জামায়াত নেতা, এ টি এম আজহারুল ইসলাম।

আজহারুল ইসলামের মৃত্যুদন্ডের বিরুদ্ধে আপিল সর্বসম্মতিতে মঞ্জুর করেছিলেন আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের বেঞ্চ এই রায় দেন। এই নিয়ে মন্তব্য করা থেকে বিরত রইলাম!

কিন্তু এই লোক ১৯৭১-কে স্রেফ অস্বীকারই করছে না, উপেক্ষা করছে অন্য ভূবনের নিতল কষ্টের কথা! একজন আলতাফ মাহমুদ ৭১-এ কেমন ত্যাগ স্বীকার করেছেন তা এই প্রজন্ম বিস্মৃত হয়েছে :


আহা, এদের কী-এক আস্ফালন! এরা দুম করে বলে বসে মুক্তিযুদ্ধের ত্যাগ বাদামের খোসা! [১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ৮, ৯, ১০, ১১, ১২, ১৩, ১৪, ১৫]
অন্যরা কেবল অস্বীকারই করে না বলার চেষ্টা করে, ৭১-এর চেয়ে ২৪ বড়—'বাপের চেয়ে পোলা বড়'! আর এ আগ বাড়িয়ে—গলা বাড়িয়ে বলছে,
"যারা ৭১ নিয়ে মায়াকান্না করবে তারা বাংলাদেশ-বিরোধী!"
জোকস এপার্ট, ৭১-এ যারা রাজাকারদের সার্টিফিকেট বিলি করত এরা এখন দেশপ্রেমিকের সনদ বিলি করে!

এখন ৭১ নিয়ে কথা বলাটা এরা যে কেবল অপরাধ মনে করে না সদর্পে 'বাংলাদেশ বিরোধী' আখ্যা দেয়, এদের এই দুঃসাহসের উৎস কি? 
আমাদের বড় অহংকারের জায়গা—একজন বীর বিক্রম, একজন কর্নেল অলি যখন ২০২৬-এ এসে 'ইয়েতে ভাসা গা ঘিনঘিনে একজন পোকামানব' হয়ে যান:

 
সূত্র:
১. সাদী মহাম্মদhttp://www.ali-mahmed.com/2013/07/1971.html
২. মশিহুর রহমানhttp://www.ali-mahmed.com/2009/10/blog-post_06.html
৩. সুরুয মিয়াhttp://www.ali-mahmed.com/2007/06/blog-post_28.html
৪. উক্য চিংhttp://www.ali-mahmed.com/2007/06/blog-post_8752.html
৫. ভাগিরথীhttp://www.ali-mahmed.com/2007/06/blog-post_6057.html
৬. প্রিনছা খেঁhttp://www.ali-mahmed.com/2009/01/blog-post_27.html
৭. রীনা: http://www.ali-mahmed.com/2007/06/blog-post_7644.html
৮. দুলা মিয়াhttp://www.ali-mahmed.com/2009/04/blog-post_08.html
৯. মুক্তিযুদ্ধে, একজন ঠেলাওয়ালাhttp://www.ali-mahmed.com/2009/04/blog-post_18.html 
১০. মুক্তিযুদ্ধে  সুইপার: http://www.ali-mahmed.com/2007/06/blog-post_8807.html
১১. নাইব উদ্দিন আহমেদhttp://www.ali-mahmed.com/2007/06/blog-post_2292.html
১২.  একজন ট্যাংকমানবhttps://www.ali-mahmed.com/2010/03/blog-post_03.html  
১৩. ফাদার মারিনো রিগনhttp://www.ali-mahmed.com/2009/01/blog-post_7597.html
১৪. শুয়োর চড়ানো একজন বীরপ্রতীক...:  https://www.ali-mahmed.com/2013/07/blog-post_1.html?m=1
১৫. লালুhttp://www.ali-mahmed.com/2009/01/blog-post.html

Wednesday, December 17, 2014

আমাদের ইশকুল- আমাদের মুক্তিযুদ্ধ- আমাদের মুক্তিযোদ্ধা।

পথশিশু সংগঠনের সঙ্গে জড়িত একজনের সঙ্গে আমার কথা হচ্ছিল। কথাপ্রসঙ্গে তিনি জানতে চাইলেন স্কুলে (আমাদের ইশকুল) আমি পড়াবার জন্য কোন পদ্ধতি অনুসরণ করি। তিনি এটাও জানালেন তারা ‘ইব্রাহিম মেথড’ (দুর্বল স্মৃতি থেকে লিখছি ইব্রাহিম নামটা ভুল হওয়ারা সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না) অনুসরণ করেন।
আমি সলাজে বললাম, আমি তো কোন পদ্ধতি অনুসরণ করি না। ধারণা করি, তিনি তাচ্ছিল্যের হাসি গোপন করেছিলেন।

যে শিক্ষক এই স্কুলে পড়ান তাকে আমি আগেভাগেই বলে দিয়েছিলাম, এই বাচ্চাদেরকে প্রচলিত পদ্ধতিতে আমি পড়াতে চাই না। স্কুলে আধ-ঘন্টা এরা বিভিন্ন খেলা খেলবে এরপর আধ-ঘন্টা পড়া। পড়ার সময়টা আমি খুব বেশি সময় রাখতে চাইনি। কারণ তাহলে এরা মনোযোগ ধরে রাখতে পারবে না।
স্টেশনের অধিকাংশ বাচ্চাকে আমি হাতের তালুর মত চিনি- আমি জানি কে আজ দুপুরে খেয়ে আসেনি, কে ড্যান্ডিতে আসক্ত! অভুক্ত, স্বপ্নহীন বাচ্চাদের মনোযোগ ধরে রাখা কতোটা কঠিন এটা আমি বিলক্ষণ বুঝতে পারি।

একদিন এদেরকে বাংলা পড়ানো হয় তো অন্যদিন ইংরাজি। একদিন কেবল গল্প। শিক্ষামূলক কিছু গল্পের সঙ্গে ছোট্ট একটা গল্প আমি এদেরকে শিখিয়েছি। বড়ো সহজ-সরল একটা গল্প:
এক দেশে এক রাজা ছিল। রাজার ছেলে রাজকুমার। রাজকুমার খুব দুষ্ট ছিল। সে চুরি করত, মিথ্যা কথা বলত। মা-বাবার কথা শুনত না। স্কুলের যেত না। আল্লাহ একদিন তাকে শাস্তি দিলেন। তার গায়ের রঙ কালো হতে থাকত। কালো হতে হতে সে একদিন কাক হয়ে গেল। সে আর মানুষ হতে পারল না। 
গল্পের যে জায়গাটায় কাকের কথা আসে তখন বাচ্চারা কা-কা করে চিৎকার জুড়ে দেয়। এ বলার অপেক্ষা রাখে না এই গল্পটা এদের শেখাবার পেছনে আমার বিশেষ উদ্দেশ্য আছে। 

ওহ, একদিন ধর্ম পড়ানো হয়। একজন স্কুল দেখতে এসে আমাকে নাহক কথা শুনিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি শ্লেষভরা কন্ঠে বলছিলেন, 'মিয়া, তুমি তো বিশেষ ধর্মকর্ম পালন করো না তাহলে আরবি পড়াবার ব্যবস্থা রেখেছো কেন'?
আমি বিরক্ত হয়ে বলেছিলাম, 'আরবি না, একদিন ধর্ম পড়াবার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এখানে মুসলমান ব্যতীত অন্য কোন ধর্মের শিশু নাই থাকলে সে ধর্ম পড়াবারও ব্যবস্থা থাকত'।
ওরে শ্লা...শোনো কথা, এই গ্রহের সবচেয়ে বড়ো নির্বোধ আমি [১]- আমি স্মোক করি বলে কী এদেরকেও স্মোক করা শেখাব!

তো, একদিন থাকে আঁকাআঁকি। আমি দেখেছি বাচ্চাদের সবচেয়ে বেশি উৎসাহ আঁকাআঁকিতে। ওদিন স্কুলে উপস্থিতির হারও থাকে বেশি। আঁকাআঁকির কোনও নির্দিষ্ট বিষয় নেই। যার যেটা খুশি আঁকে। স্কুলে আমি উপস্থিত থাকলে বলি, ভূতের ছবি আঁকো। বাচ্চারা ভূতের ছবি আঁকে। বাচ্চারা অবলীলায় হাস্যকর ভূতের ছবি আঁকে। কারণ একদিন এদেরকে বলে দিয়েছিলাম, ভূত বলে কিছু নেই।

এখানকার শিশুরা হাবিজাবি অনেক কিছুর সঙ্গে এটাও জানে পৃথিবী গোল, তিন ভাগ পানি এক ভাগ মাটি। পৃথিবী স্থির না, কেমন করে দিন-রাত হয়। এরা এটাও জানে কলার খোসার ভেতরের পিচ্ছিল অংশ দিয়ে জুতা চমৎকার পরিষ্কার হয়, চকচক করে। কলার খোসার ভেতরের পিচ্ছিল অংশ দিয়ে নিমিষেই দাঁতও পরিষ্কার, ঝকঝক হয়।

স্কুলে মাস্টার মশাইয়ের জন্য আমার তৈরি করা একটা তালিকা আছে। এই তালিকা ধরে-ধরে এদেরকে শেখানো হয়। পড়ান মাস্টার সাহেব- কিন্তু প্রায় প্রতিদিনই হুটহাট করে আমি হাজির হয়ে যাই। অল্প সময়ে হাবিজাবি বলে আমি উধাও।
দু-দিন পূর্বে মাস্টার মশাই পড়াচ্ছেন মুক্তিযুদ্ধ, বিজয় দিবস নিয়ে। আমাদের কাছে শুনতে যত সহজ মনে হোক বিষয়টা এদের কাছে অতি কঠিন। যে বাচ্চাগুলো তীব্র শীতে ঘুমায় স্টেশনে অধিকাংশ সময় অভুক্ত থাকে এদের কাছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়টা খুব একটা বোধগম্য বিষয় এটা আমি বিশ্বাস করি না। তো, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়টা বোঝাতে গিয়ে মাস্টার মশাইকে দেখলাম শীতেও গলদঘর্ম হতে। শিক্ষক-ছাত্র কাউকে দোষ দেওয়া চলে না।

আমি অন্য পথ ধরলাম। এদেরকে বললাম, দেখো, স্বাধীনতা মানে হচ্ছে, অনেকটা নিজের বাড়ি আর পরের বাড়ির মত। তুমি তোমার নিজের বাড়িতে যা খুশি করতে পারবে কিন্তু পরের বাড়িতে পারবে না। যেমন ধরো, তোমাদের অনেকেই স্টেশনে থাকো। সরকারি লোকজন যখন খুশি তোমাদেরকে এখান থেকে সরিয়ে দিতে পারবে কিন্তু নিজের বাড়িতে কেউ তোমাকে কিচ্ছু বলতে পারবে না। আলাপচারিতায় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রসঙ্গ আসল কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা সম্বন্ধে কোন প্রকারেই এদেরকে ভাল করে বোঝানো গেল না।

পরের দিন। স্কুলের বাচ্চারা খেলছে। একজন খর্বাকৃতি মানুষ আসলেন বগলে একটা ছোট্ট ব্যাগ নিয়ে। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন কান পরিষ্কার করব কি না। আমি বিরক্ত। তাচ্ছিল্যের হাসি হাসতে গিয়ে জমে গেলাম। মানুষটার বুকে ছোট্ট একটা ব্যাজ- আমার বোঝার বাকী রইল না মানুষটা একজন মুক্তিযোদ্ধা। আমি সটান দাঁড়িয়ে গেলাম। বাচ্চাদেরকে বললাম, 'সবাই দাঁড়াও। আমাদের মাঝে একজন মুক্তিযোদ্ধা আছেন। একজন মুক্তিযোদ্ধা দাঁড়িয়ে থাকলে আমরা বসে থাকতে পারি না। যিনি অস্ত্র হাতে প্রাণ বাজি রেখে যুদ্ধ করেছিলেন বলেই আমরা একটা পতাকা পেয়েছি, একটা দেশ পেয়েছি। আমাদের মা যে ভাষায় কথা বলেন আমরা সেই ভাষায় অনায়াসে কথা বলতে পারি'। তোমরা মুক্তিযোদ্ধা সম্বন্ধে জানতে চেয়েছিলে। ইনি একজন মুক্তিযোদ্ধা।
স্কুল থেকে বেরিয়ে আলি আহমেদ নামের এই মানুষটার সঙ্গে কথা হয়। খালেদ মোশারফের নেতৃত্বে যখন তিনি যুদ্ধে ছিলেন তখন তাঁর বয়স মাত্র ১৯! যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার পূর্বে মোজাহিদ ছিলেন। তাঁর এলাকা ছিল সালদানদী, কসবা। ছোটখাটো এই মানুষটাই অবলীলায় গুলি ছুড়েছেন ২০ রাউন্ডের এসএলআর দিয়ে। যুদ্ধে তিনি ভয়ংকর রকমের আহত হন। আর্টিলারি শেল দিয়ে সমস্ত শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়। এখনও তিনি বহন করে চলেছেন শরীরে শুকিয়ে যাওয়া ক্ষত। মানুষটাকে নিয়ে অন্য একদিন বিশদ লেখা ইচ্ছা রইল। তাঁর তাড়া, আমারও।

কিন্তু আমি বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করেছি, বাচ্চাদের সঙ্গে ছবি তোলার জন্য অনুরোধ করলে তিনি বারবার সংকোচের সঙ্গে এড়িয়ে যেতে চাইলেন। না-কামানো দাঁড়িভরা মুখটা নেড়ে নেড়ে বলছিলেন, 'আরে না, কী বলেন, আমি কেন'!
আমার অনুরোধ ফেলতে না-পেরে বড়ো সংকোচ নিয়ে দাঁড়ালেন।

আমাদের মুক্তিযোদ্ধা, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিনতাই হয়ে গেছে সেই কবেই, দলবাজির বৃত্তে ঘুরপাক খেয়ে। তাই কী, এঁর মতো মুক্তিযোদ্ধা তুচ্ছ সম্মান পেয়ে বিদায় নেওয়ার সময় তাঁর চোখ ভরে আসে...!

সহায়ক সূত্র:
১. নিবোর্ধ মানুষ: http://www.ali-mahmed.com/2014/12/blog-post_7.html 

ম্টেশনে বাচ্চা আর কয়জন পড়বে এটা ভেবে ছোট্ট একটা কামরা ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এই অনুমান ভুল ছিল। এমনিতে সবাই একই দিনে উপস্থিত থাকে না কিন্তু তারপরও জায়গার সংকুলান হয় না। এর উপর যেদিন আঁকাআঁকি থাকে সেদিন আমরা বিপদে পড়ে যাই কারণ তখন অতিরিক্ত জায়গার প্রয়োজন হয়। তখন আমাদের দাঁড়াবার জায়গা থাকে না। তবুও সুখ রে সুখ...!
  

Friday, October 24, 2014

রক্তের দাগ শুকিয়ে যায়, মুছে যায় না।

গতকাল গোলাম আযমের মৃত্যু হয়েছে। অনেকের মধ্যে এক ধরনের হাহাকার কাজ করেছিল, কেন তার মৃত্যুদন্ড হয়নি। আদালত বয়সের কারণে তাকে মৃত্যুদন্ড না-দিয়ে ৯০ বছরের কারাদন্ড দেন। এই রায় নিয়ে আমার নিজেরও অমত আছে। যদি এমন হত তার কৃত অপরাধগুলো মৃত্যুদন্ড পাওয়ার উপযুক্ত না তাহলে বিষয়টা ভিন্ন ছিল। কিন্তু এখানে তার বয়সটা বিবেচ্য হয়েছে। এমনিতে আমাদের দেশে একজন বয়স্ক মানুষ মৃত্যুদন্ড পাওয়ার মত জঘণ্য অপরাধ করলেও তিনি কী পার পেয়ে যাবেন? এটাই যদি আইনের কথা হয় তাহলে তো আর কথা চলে না।

গোলাম আযম অপরাধী হিসাবে দন্ডিত হওয়ার পর ১১০০ দিন কারাগারের পরিবর্তে হাসপাতালে কাটিয়েছেন। তিনি এমন কী অসুখে ভুগছিলেন যে তাকে ১১০০ দিনই হাসপাতালে রাখতে হলো? অন্য কয়েদির বেলায়ও কী এমনটাই ঘটে বা ঘটবে? উত্তরটা না-হয়ে থাকলে এখানে আইনের প্রয়োগে তারতম্য হয়েছে এমনটাই প্রতীয়মান হয়। এও এক ধরনের অন্যায়। আইনের প্রতি অশ্রদ্ধা! এমন ব্যবস্থা একটা জাতির জন্য বাজে একটা উদাহরণ হিসাবে রয়ে গেল। 

অবশ্য গোলাম আযম মৃত্যুবরণ করেছেন একজন অপরাধী হিসাবে এটাও কিন্তু কম না। আমি যেটা বারবার বলি, রক্তের দাগ মুছে ফেলা যায় না। এটাও একটা স্বস্তির কারণ মৃত্যুর পূর্বেই গোলাম আজম নিরপরাধ রূপে পার পেয়ে যাননি। এটাও কিন্তু কম পাওয়া না। আমি এটাকে একটা বিজয় হিসাবেই দেখি।

আজ ২০১৪ সালে এসে যেটা অতি সহজ মনে হয়, পূর্বে এতোটা সহজ কিন্তু ছিল না। ২০০৫-৬ সালের কথা বলি। তখন আমরা যারা ওয়েব সাইটে লেখালেখি করতাম তাদের কাছে বিষয়টা অতি দুরূহ ছিল। এক সময় তো দেখতে দেখতে কৃষিমন্ত্রী পরে শিল্পমন্ত্রী মতিউর নিজামীর গাড়িতে পতপত করে উড়তে শুরু করে আমাদের জাতীয় পতাকা! এদিকে তখন ওয়েবে এই সংক্রান্ত তেমন কোনও তথ্যই নেই। বিশেষ করে বাংলায়। হাতের নাগালে উল্লেখযোগ্য বই-পুস্তকও নেই। যাও আছে আগুনদাম, থাকলেও এর-ওর কাছে ছাড়া-ছাড়া ভাবে। যার কাছে যেটা আছে সেটা নিয়েই অনেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে লেখা শুরু করলেন।

তখন বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের দলিল আমার মত সাধারণ মানুষদের কাছে সহজলভ্য ছিল না। একটা লাইব্রেরিতে পাওয়া গেল জরাজীর্ণ অবস্থায়, পাতাগুলো ঝুরঝুরে! আমার মনে আছে, বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের দলিল তখন ১৫০০০ হাজার পৃষ্ঠা ফটোকপি করেছিলাম। যেটা আমার কাছে এখনও আছে। তো, শুরু হলো ওখান থেকে এবং বিভিন্ন পেপার কাটিং স্ক্যান করে কপি-পেস্ট। লেখার-পর-লেখা।

সবাই যখন ঘুমুতে যায় আমি তখন বগলে করে একগাদা ফটোকপি নিয়ে আমার অফিসের কম্পিউটারের সামনে বসি। আহ, আমার সেই ‘জুতাখাওয়া’ কম্পিউটার (সেই কম্পিউটারকে কতবার চটি দিয়ে পিটিয়েছি তার ইয়াত্তা নাই, তবুও লাভ হয়নি!)! অথচ তখন লেখালেখির জন্য ৩৮৬ মেশিনকে ৪৮৬ মেশিনে আপগ্রেড করেছি কারণ ৩৮৬ মেশিনটা কেমন দুর্ধর্ষ ছিল খানিকটা বলি, ওটার হার্ড ডিস্ক ছিল ১০০ মেগাবাইটের! তাছাড়া ইন্টারনেট কানেকশনও অফিসে। টিএনটির ডায়াল-আপ লাইন। ধীর গতি কাহাকে বলে কত প্রকার ও কি কি! কখনও কম্পিউটার ঘুমিয়ে পড়ে কখনও-বা আমি।

কখন যে ভোর হয় তার হিসাব কে রাখে! কালে কালে হয়ে গেলাম ‘নিশাচর ড্রাকুলা’। প্রায়শ আমার মা ক্ষেপে গিয়ে বলতেন, ‘তুই আমার বাড়ি থিক্যা বাইর হ’। ভদ্রমহিলার হাজবেন্ডের বাড়ি বের করে দিলে তাঁকে খুব একটা দোষ দেওয়া যায় না। তাই আমি সুবোধ বালকের মত মাথা নেড়ে বলতাম, আচ্ছা, আর রাত হবে না। কীসের কী, তিনি ঘুমিয়ে পড়ামাত্র আমি যথারীতি যেই কে সেই! ‘নিশাচর ড্রাকুলা’!

সেই সময় খুব চালু একটা প্রতিরোধ ছিল। গোলাম আজমকে যে আপনারা অপরাধী বলছেন প্রমাণ কি, কেউ কি দেখেছে? তখন ২০০৬ সালে আমার অনেক লেখার একটা ছিল, ‘গোলাম আযমের চোখে, মুক্তিযুদ্ধ’ [১]
সেখানে উল্লেখ করা হয়েছিল গোলাম আযম ১৯৭১ সালে বলেছিলেন, “...বাংলাদেশ নামের কিছু হলে আমি আত্মহত্যা করবো...”
নিয়তির এ এক চরম পরিহাস, সেই গোলাম আযমকে মৃত্যুবরণ করতে হলো বংলাদেশে! এবং তিনি কখনই তার কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা করেননি বা এই দেশের কাছে ক্ষমা চাননি। তাতে কিছুই যায় আসে না। রক্তের দাগ শুকিয়ে যায় কিন্তু মুছে যায় না। তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন এটা সত্য কিন্তু তিনি যে একজন অপরাধী ছিলেন এটা রাবার দিয়ে ঘসে মুছে ফেলা যাবে না।

১. http://www.ali-mahmed.com/2007/06/blog-post_29.html

Monday, September 8, 2014

মুক্তিযুদ্ধে এক দুর্ধর্ষ কলম-যোদ্ধা এবং জেনোসাইড।

১৯৭১ সাল। পাকিস্তানি আর্মি যখন এই দেশের লোকজনকে মেরে সাফ করে দিচ্ছে তখন বহির্দেশে এই সম্বন্ধে তেমন-কেউ বিশেষ কিছুই জানে না। সামরিক জান্তা জানার কোনও উপায়ই রাখেনি! ঠিক তখনই একজন মানুষ এগিয়ে এলেন। অ্যান্টনি মানকারেনহাস। 

এই মানুষটা সম্বন্ধে আমরা প্রখ্যাত সাহিত্যিক শওকত ওসমানের কাছ থেকে শুনি। শওকত ওসমান তখন নিয়মিত দিনলিপি লিখতেন। তাঁর সঙ্গে মাসকারেনহাসের সশরীরে দেখা হওয়ার পর তিনি ২৪ জানুয়ারি ১৯৭২ সালের দিনলিপিতে লিখেছিলেন: “...বারো দিন ছিলেন টনি সাহেব একদা পূর্ব পাকিস্তানে। সামরিক কর্তৃপক্ষের অতিথি। ফলে ওদের কার্যকলাপ, মানসিক গতিবিধি অনেক কিছু নিরীক্ষণের সুযোগ পান তিনি। ...টনি মাসকারেনহাস করাচি ফিরে এলেন। সেদিন রাতে ডিনার খাওয়ার পর ছেলেমেয়ে, স্ত্রীদের নিজের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে বসলেন। কখন ভোর হয়ে গেছে কারও খেয়াল নেই। সাংবাদিক নিজের চোখে অসহায় নিরপরাধ মানুষের মৃত্যু দেখেছেন। বাইরের জগৎকে এ কথা জানাতে না পারলে তাঁর মনে আর শান্তি নেই। 

...কিন্তু সব সময় বিবেকের আদেশ পালন করা যায়? ...টনি মাসকারেহাসের সমস্যা কম নয়। প্রথমত বাইরের জগতে এই কাহিনি পাঠানোর উপায় তো নেই। দ্বিতীয়ত, তিনি বিদেশে গিয়ে এসব ফাঁস করতে পারেন। কিন্তু তা অত সহজ নয়। আরও সমস্যা স্ত্রী-পুত্র নিয়ে যদি একদম করাচি ছেড়ে চলে যেতে পারেন, তখন সব সহজ হয়ে আসে। কিন্তু আটচল্লিশ বছর বয়সে দুই লাখ টাকা দামের বাড়ি ফেলে একদম অন্ধকারে ঝাঁপ দেওয়া কি অত সহজ? 
...স্বাস্থ্যের অজুহাতে মাসকারেনহাসের পরিবার একদিন ইংল্যান্ড অভিমুখে রওয়ানা হয়ে গেল। পেছনে পড়ে রইলেন গৃহকর্তা। পাছে কেউ সন্দেহ করে, তাই ঘরের একটা জিনিসও গৃহিণী এদিক-ওদিক বেচাকেনার পাল্লায় ফেলেননি। (দুই লাখ টাকা দামের) গোটা বাড়ি তো পড়ে রইলই। 
 ...একদিন তিনিও ইংল্যান্ড পৌঁছালেন। পাকিস্তানের সীমান্ত পেরিয়ে তিনি বোমা ছুঁড়লেন...।” 

এর পর তো ইতিহাস। ১৩ জুন সানডে টাইমসে অসম্ভব গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হলো, ‘Genocide-জেনোসাইড’। যেন একটা আগ্নেয়গিরির মুখ খুলে গেল। সমস্ত বিশ্বকে ঝাঁকিয়ে দিল, কাঁপিয়ে দিল। এরপর একের-পর-এক অমানুষিক নির্যাতনের প্রতিবেদন ছাপা হতে লাগল টামস, নিউজউইক এবং বিশ্বের বিভিন্ন অতি প্রভাবশালী পত্রিকায়।

পরবর্তীতে এই অ্যান্টনি মাসকারেনহাস অসাধারণ এক বই লিখেছিলেন, ‘Bangladesh A Legacy of Blood. যে বইটির ভূমিকায় তিনি লিখেছিলেন, “This is a true story;
…It is based on my close personal knowledge of the main protagonists; on more than 120 separate interviews with the men and women involved in the dramatic events; and on official archives and documents which I had the privilege to inspect personally.
…I make no apology for it. The people must know the truth about their leaders; and may we all take lesson from their mistakes.

Saturday, September 6, 2014

Homar sometimes nods

এ কে খন্দকারের ‘১৯৭১: ভেতরে বাইরে’ বইটি নিয়ে ধুন্ধুমার কান্ড চলছে। বইয়ের কিছু সংখ্যায় আগুন দেওয়া হয়েছে। কেউ কেউ বইটির লেখককে ডেকে কঠিন জিজ্ঞাসাবাদের কথাও বলছেন। বইটি নিষেধাজ্ঞার জোর বক্তব্যও কারও কারও। অনেকে আগ বাড়িয়ে এই জোরালো দাবীও তুলছেন এ কে খন্দকারকে রাষ্টদ্রোহিতার অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
ভাগ্যিস, এখন পর্যন্ত এ কে খন্দকারকে কেউ রাজাকার বলে বসেননি। তবে আইএসএসের চর বানিয়ে দিয়েছেন। এবং ওখান থেকে কত টাকা পেয়েছেন তা খতিয়ে দেখার জন্যও বলা হচ্ছে!
এতো দিন জানতাম আন্ডার কাভার এজেন্টরা সর্ব শক্তি ব্যয় করেন নিজেকে লুকিয়ে রাখতে এখন দেখছি এ কে খন্দকারের মত আন্ডার কাভার এজেন্ট বিস্তর হইচই করে বলছেন, ‘মুঝে পাকড়ো, মুঝে পাকড়ো...’!

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন এ কে খন্দকার উপ -সেনাপ্রধান ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের অনেক তথ্য-উপাত্ত তাঁর জানা, যুদ্ধটাকে তিনি দেখেছেন অনেক কাছ থেকে। তাই তিনি মুক্তিযুদ্ধসংক্রান্ত কোনও বক্তব্য যখন দেবেন তখন সেটাকে খাটো করে দেখার কোনও অবকাশ নাই। এবং কোনও প্রকাশনী যখন এমন একজন মানুষের বই প্রকাশ করবে তখন অতি গুরুত্বের সঙ্গেই যে করবে এতেও সন্দেহের কোন অবকাশ নাই। ‘প্রথমা প্রকাশনী’ সেটা করেনি বলেই মনে হচ্ছে। বিশেষ করে ভাষণের শেষ অংশে ‘জয় পাকিস্তান’ যোগ থাকাটা। কারণ এর পক্ষে জোরালো কোনও তথ্য-উপাত্ত নেই বলেই অনুমিত হচ্ছে। এই প্রকাশনীর চেলা-চামুন্ডাদের এটা অজানা থাকাটা অবিশ্বাস্য যে অকাট্য তথ্য-উপাত্ত ব্যতীত এটা ছাপা হলে এই নিয়ে কেউ-ই রা কাড়বে না!
প্রথমা প্রকাশনী যে কারখানার সেই কর্পোরেট হাউজটি সম্ভবত এটাই চাচ্ছিল বইটি বিতর্কিত হোক। আমার ধারণা এই কর্পোরেট হাউজটি আলকাতরা বিক্রিতে নামলেও লোকজন সানন্দে সেই আলকাতরাও লাইন ধরে পয়সা দিয়ে ক্রয় করবে।

বইটির প্রকাশনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, “...কিন্তু উনি (লেখক) একটা সমালোচনার দৃষ্টিতে দেখেছেন এবং বলেছেন বঙ্গবন্ধু তাঁর বক্তব্য শেষ করেছেন জয় পাকিস্তান বলে। এটা তথ্যের প্রশ্ন। ১৯৯৮ সালে বিচারপতি হাবিবুর রহমান ...লিখেছিলেন, সেখানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ যেভাবে উদ্ধৃত, সেখানে জয় বাংলা জয় পাকিস্তান আছে।...আমার মনে হয় এখানে এ কে খন্দকার জয় বাংলা, জয় পাকিস্তান দুটো কথা রাখলেই ভাল হতো।“
এর অর্থ কী! আনিসুজ্জামান কী প্রকারান্তরে এটা মেনে নিচ্ছেন? তাঁর গাত্রদাহ কী এটাই তিনি জয় বাংলার সঙ্গে জয় পাকিস্তান রাখলেন না?

যাই হোক, এই প্রশ্নটা করা অবান্তর হবে না এ কে খন্দকার এতোটা বছর সবগুলো আঙ্গুল ঘিয়ে ডুবিয়ে রেখে এখন তালাশে বেরিয়েছেন ঘিয়ের উৎস গরুটার খোঁজে? আর এ কে খন্দকার তার লেখায় যে সমস্ত তথ্য-উপাত্ত দিয়েছেন তা প্রমাণ করার দায়িত্ব তারই উপর বর্তায়।
হয় তিনি অকাট্য প্রমাণ দিয়ে আমাদেরকে, এই প্রজন্মকে ঋণী করবেন নইলে সোজা আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবেন। এই প্রজন্ম আপন বাপকে ছাড়ে না তিনি কোন ছার? কেউ এটা বিস্মৃত না-হলেই ভাল করবেন যে সেই দিন আর নাই। তথাকথিত ঝুলেপড়া সাদা গোঁফ, ঝুলেপড়া ইয়ের বুদ্ধিজীবীরা ফরমায়েসী বুদ্ধি দেবেন আর এই প্রজন্ম হাঁ করে গিলবে! যেখানে যেখানে পথ রুদ্ধ হয় এই প্রজন্ম কলম তুলে নেয় অনায়াস ভঙ্গিতে।

এমনিতে আমরা এ প্রজন্ম বড়ো অভাগা। দলবাজ লোকজনেরা আমাদেরকে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রকৃত ইতিহাস জানতে দেয়নি। যে যেভাবে পেরেছে এই প্রজন্মকে বোকা বানাবার চেষ্টা করেছে! কিন্তু এই প্রজন্মের উপর আমার নিজের আস্থা অগাধ। এরা ঠিকই তথ্যের মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে প্রকৃত ইতিহাস বের করে নিয়ে আসছে আমাদের পরের প্রজন্মের জন্য। 

বিচিত্র এই দেশের প্রায় সবই বিচিত্র। এখানে আমরা কাউকে-কাউকে দেবতার পর্যায়ে নিয়ে যাই। শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করবার জন্য হাজার বছরের নীচে আমরা নামতেই পারি না! Homar sometimes nods- দেবতারাও ভুল করে কিন্তু এঁরা ভুল করেন না। এ বিচিত্র, বড়ো বিচিত্র...।

Thursday, September 4, 2014

পাপ!

আলতাফ মাহমুদ। অনেক পরিচয়ে সমৃদ্ধ। আলাদা করে যার পরিচয় দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। এই ভাষা সৈনিক ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ গানটির সুরকার হিসাবেই অমর হয়ে থাকবেন।
১৯৭১ সালের ৩০ আগস্ট এই মানুষটি হারিয়ে যান। পাকিস্তানি বাহিনী চোখ বেঁধে তাঁকে উঠিয়ে নিয়ে যায়। তাঁর উপর অমানুষিক নির্যাতন করা হয় কিন্তু সেই নির্যাতন কেমনতরো ছিল তা কী আমরা জানি? অন্যদের কথা জানি না কিন্তু আমার জানা ছিল না। নির্যাতনের একপর্যায়ে তাঁকে ফুটন্ত পানিতে সেদ্ধ করা হয়েছিল। এরপরই তাঁর মৃত্যু হয়।

আহ, চোখ বন্ধ করে আমি কেবল খানিকটা আঁচ করার চেষ্টা করছি। আলতাফ মাহমুদের মস্তিষ্ক কতক্ষণ ধরে সচল ছিল? টগবগ করে ফুটতে থাকা পানিতে হাড়-মাংস সেদ্ধ হচ্ছে- এই অন্য ভুবনের সহ্যাতীত কষ্ট কতটা সময় ধরে এই মানুষটা সহ্য করেছেন। শারিরীক কষ্টের একপর্যায়ে নাকি মানুষ চেতনা হারিয়ে ফেলে- তখন কী কষ্টটা খানিকটা লাঘব হয়? জানি না, জানি না আমি। এই নিয়ে আমি আর ভাবতে চাই না। আমার মস্তিষ্ক নিরাপদ দূরত্বে থেকেও এই সহ্যাতীত বেদনার ভার নিতে চাচ্ছে না।

প্রখ্যাত সাহিত্যিক শওকত ওসমান নিয়ম করে দিনলিপি লিখতেন। ১৯ জানুয়ারি ১৯৭২ সালের তাঁর দিনলিপির পাতায় তিনি লিখেছেন: “...সুরকার আলতাফ মাহমুদের মৃত্যুর আরেকটা সুলুক পাওয়া গেল। ক্যান্টনমেন্টের ডাক্তার এই তথ্য যুগিয়েছেন। তাঁর উপর অকথ্য শারিরীক নির্যাতন চালায় জালেমেরা বেশ কয়েক দিন ধরে। পরে গরম পানিতে সিদ্ধ করে তাঁকে মারা হয়।...” 

আলতাফ মাহমুদ ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহন করেছিলেন। তাঁর বাসা মুক্তিযোদ্ধাদের আস্তানা ছিল। তাঁকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পূর্বে উঠোনে চাপা দেওয়া বড়ো ট্যাংকে স্টেনগান, গুলি এবং অন্যান্য অস্ত্র পাওয়া গিয়েছিল। যা তাঁর জন্য কাল হয়েছিল। শওকত ওসমান খানিকটা অন্য মতও ব্যক্ত করেন যার সঙ্গে আমিও একমত। শওকত ওসমান দিনলিপিতে লিখেছিলেন: “...কিন্তু যারা অমন ঝুঁকির মুখে আলতাফ মাহমুদকে ঠেলে দিয়েছিল তারা ভাল কাজ করেনি। প্রতিভা তো বছর বছর জন্মায় না। ওরা এ কথা মনে রাখলে এই অপূরণীয় ক্ষতির হাত থেকে বাংলাদেশ মুক্ত থাকত।...” 

আমি অতীতে বারবার বলে এসেছি পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আদৌ সেনাবাহিনী ছিল না, এরা ছিল সাইকোপ্যাথ। এদেরকে যোদ্ধা বলতে আমি নারাজ। যুদ্ধের প্রয়োজনে বা তর্কের খাতিরে ধরে নেই অপ্রয়োজনেও কাউকে মেরে ফেলা এক কথা কিন্তু এরা যে ভঙ্গিতে খুনগুলো করেছে তা কখনই মানুষের আচরণ হতে পারে না। হালে আমরা প্রযুত্তির কল্যাণে পৃথিবী জুড়ে নৃশংসতার যে সমস্ত নমুনা দেখে হতভম্ব হই, বাকরুদ্ধ হই, থরথর করে কাঁপি; ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কর্মকান্ড দেখার সুযোগ থাকলে অনায়াসে বুঝতে পারতাম এখনকার নৃশংসতাকেও তা অনায়াসে ছাড়িয়ে যেত। পাকিস্তানিরা যা করেছে এ স্রেফ পাপ। বলা হয়ে থাকে পাপ বাপকেও ছাড়ে না। কে জানে হয়তো সেই পাপের মাসুলই দিচ্ছে এরা...।

Saturday, July 12, 2014

রওশন আরা...



রওশন আরাকে নিয়ে লেখাটায় যেটা লিখেছিলাম [১]:
...তখন রওশন আরাকে যে-প্রকারে বিকচ চৌধুরী বা আহমদ ছফা সৃষ্টি করেছিলেন এতে আমি দোষের কিছু দেখি নাযুদ্ধের বিভিন্ন কৌশল থাকে যোদ্ধা বা যুদ্ধের সঙ্গে জড়িত মানুষদের উদ্দীপ্ত করার জন্য এও এক কৌশল।...

সাব্বির হোসাইন রওশন আরাকে নিয়ে অসম্ভব পরিশ্রমী এক লেখা লিখেছেন [২] তাঁর এই উদ্যেগকে আমি সাধুবাদ জানাই। কিন্তু তাঁর মত, লেখার সঙ্গে আমি সবিনয়ে দ্বিমত পোষণ করি। আমি মনে করি, রওশন আরা চরিত্রটি একটি কাল্পনিক চরিত্র। যেটা আমি পূর্বেও বলেছি। এই প্রসঙ্গে অন্য একজনের লেখার জবাবে আমি তীব্র শ্লেষভরা উত্তর দিয়েছি কিন্তু সাব্বির হোসাইন-এর বিষয়টি ভিন্ন।
যদিও আমি তাঁর সঙ্গে একমত নই কিন্তু মানুষটার প্রতি আছে আমার ভাল লাগা কারণ তিনি কাজটা করেছেন সততার সঙ্গে।
যাই হোক, রওশন আরাকে নিয়ে তখন কেন এমনটা করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল? পূর্বেই বলেছি এটাকে আমি দোষের মনে করি না কারণ যুদ্ধের অনেক কৌশলের এটাও একটা। কখনও কখনও এরও তীব্র প্রয়োজন আছে।
যিনি ১৯৭১ সালে রওশন আরাকে নিয়ে প্রতিবেদনটা লিখে হইচই ফেলে দিয়েছিলেন সেই মানুষটা হচ্ছেন, বিকচ চৌধুরী। এবং রওশন আরা নামের এই চরিত্রটি সৃষ্টির পেছনে যে মানুষটির প্রচ্ছন্ন হাত ছিল তিনি হচ্ছেন আহমদ ছফা। আহমদ ছফার জবানিতে আবারও শুনি:
...আমরা যখন প্রবেশ করলাম রওশন আরার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে কলকাতার এক গুণী শিল্পী একটি গান পরিবেশন করছিলেন। গানের কথাগুলো ভারি সুন্দর। ভদ্রলোক তন্ময় হয়ে গাইছিলেন-
শহীদ লক্ষ ভাই ভগিনী শহীদ রোশেনারা
তোমরা তো সব প্রাণের আগুন চোখের ধ্রুবতারা
রোশেনারা বোনটি আমার কোন গাঁয়ে যে ছিল তোমর ঘর...

শিল্পীর কন্ঠে গানটি যেই শেষ হল, এই বীরাঙ্গনা তরুণীর স্মৃতির প্রতি অপার মমতায় উপস্থিত দর্শকের চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল।...
গানের পর কলকাতার সবচেয়ে খ্যাতিমান আবৃত্তিকার বিখ্যাত কবি এবং সমালোচক প্রমথনাথ বিশীর সুললিত ছন্দে লেখা একটি সুদীর্ঘ কবিতা আবৃত্তি করলেন।
তারপরে একজন মাঝবয়েসী মহিলা মঞ্চে এলেন। তিনি উপস্থিত শ্রোতাদের কাছে রওশন আরা সম্পর্কিত এপর্যন্ত যে সব সংবাদ তারা সংগ্রহ করতে পেরেছেন, একটি লিখিত বিবরণ পাঠ করলেন।
রওশন আরার বাড়ি রাজশাহী জেলার নাটোর। তার বাবা পেশায় একজন পুলিশ অফিসার। এবং সম্পর্কে সে ছিল শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মীয়া। পড়াশোনা করত ঢাকার ইডেন কলেজে। ...বগুড়া ক্যান্টনমেন্ট থেকে ট্যাঙ্ক নিয়ে পাকিস্তানি সৈন্যরা রাজশাহীর দিকে এগিয়ে আসছে।...(রওশন আরা) মাথার ওড়নাটা খুলে নিয়ে ভালো করে বুকের সঙ্গে তিনটা মাইন শক্ত করে বেঁধে নিল। ...তারপর প্রাণপন চীৎকারে জয় বাংলা ধ্বনি উচ্চারণ করে, সারা শরীর ট্যাঙ্কের তলায় ছুড়ে দিয়েছিল।

...এটুকু পাঠ করার পর হলের মধ্যে আহা উহু ধ্বনি শোনা যেতে থাকল। কোনো কোনো মহিলা উচ্চৈঃস্বরে রোদন করে উঠলেন।
...তারপর এলেন আরো এক মহিলা। তিনি এপর্যন্ত ভারতবর্ষের নারীসমাজ রওশন আরার আত্মদানে উদ্বুদ্ধ হয়ে কী কী কর্মসূচী গ্রহণ করেছে, তার একটা আনুষ্ঠানিক বিবরণ দাখিল করলেন। দিল্লিতে শ্রীমতি অরুণা আসফ আলির নেতৃত্বে একটি রওশন আরা ব্রিগেড গঠিত হয়েছে। তাঁরা পায়ে হেঁটে আগ্রা অবধি মার্চ করে গেছেন এবং বাংলাদেশের শরণার্থীদের জন্য সাড়ে পাঁচ লক্ষ টাকা সংগ্রহ করেছেন। পাটনায় রশন আরা বিগ্রেডের কর্মীরা নিজের হাতে বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য আড়াই হাজার উলের সুয়েটার বুনে দিয়েছে। এইভাবে এলাহাবাদ, বেনারস, জলন্ধর, অমৃতসর, মাদ্রাজ, দিল্লি রওশন আরা বিগ্রেড কর্মীদের কর্মসূচীর বর্ণনা দিলেন।...
...বাংলাদেশের জনগণের মুক্তিসংগ্রাম থেকে এইরকম রওশন আরার মতো বীরকন্যা যদি সত্যি সত্যি জন্ম নিত, তা হলে আমাদের সংগ্রামের অবস্থা কী দাঁড়াত মনে মনে কল্পনা করতে চেষ্টা করলাম।
(অলাতচক্র, পৃষ্ঠা নম্বর: ১৩১, ১৩২, ১৩৩)

সান জুর Art of war বইটি পড়ল খানিকটা আঁচ করা যায় যুদ্ধ কেবল ছেলেখেলা না- এখানে মস্তিষ্কের কারুকাজের খামতি নেই। তাই রওশন আরা নামের চরিত্রটিও মস্তিষ্কের এক অসাধারণ কারুকাজ সাড়ে পাঁচ লক্ষ টাকা সংগ্রহ বা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য আড়াই হাজার উলের সুয়েটার, ভাবা যায়!
তেমনি বলা চলে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের এম. আর. আখতার মুকুলের চরমপত্র নিয়ে। তাঁর চরমপত্র তখন কী অসাধারণ প্রভাবই না ফেলেছিল!
এম. আর. আখতার মুকুল ট্যাঙ্ক ধ্বংস করছেন, গানবোট ডোবাচ্ছেন, সৈন্যভর্তি ট্রেনসহ ব্রিজ উড়িয়ে দিচ্ছেন, সেনা ছাউনিতে ছাউনিতে ত্রাসের সঞ্চার করছেন। এ পর্যন্ত তিনি যত পাকিস্তানি সৈন্য খুন করেছেন, যত জখম করেছেন, যত ট্যাঙ্ক অচল করেছেন, যত কনভয় ধ্বংস করেছেন, সব মিলিয়ে যোগ করলে যে সংখ্যাটি দাঁড়াবে, তাতে করে একজনও পাকিস্তানি সৈন্য বাংলার মাটিতে থাকার কথা নয়। তার পরদিন সন্ধেবেলা আবার সৈন্য মারতে আসেন। আমরা অবাক হয়ে ভাবি এত সৈন্য তিনি কোথায় পান?
(অলাতচক্র, পৃষ্ঠা নম্বর: ১২৩)

১. রওশন আরা: বাস্তবকে ছাড়িয়ে যায় কল্পনা! : http://www.ali-mahmed.com/2014/06/blog-post_24.html

২. ব্যাখ্যাহীন দেশ্রপ্রেম ও রোশেনারা:  http://www.ali-mahmed.com/2014/07/blog-post.html       

Tuesday, June 24, 2014

রওশন আরা: বাস্তবকে ছাড়িয়ে যায় কল্পনা!


এমনিতে একটা শিশু সারাটা দিন বকে মরে কিন্তু কেউ যখন বলে, বাবু, এটা বলো তো। বাবু চুপ। মুখে রা নেই!
আমার অবস্থাটাও তেমনই। মন বসে গেলে আমি তর তর করে লিখে যেতে পারি কিন্তু যেই-মাত্র কেউ বলল, এটা নিয়েেএকটু লেখেন তো। ব্যস, কলম হালের কী-বোর্ড চিবিয়ে ফেললেও একটা অক্ষরও বের হয় না, দুম করে কামান দেগে দিলেও! কী আর করা, এই গুণ আমার নেই! তাই বলে তো আর বেচারা আমাকে ইলেকট্রিক পোলে ঝুলিয়ে দেওয়া চলে না। এই নিয়ে অনেকে অহেতুক আমার উপর রাগ করে থাকেন।

এখানে ব্যতিক্রম হলো। এমন একজন অনুরোধ করেছিলেন যিনি হচ্ছেন সেই মানুষ- আমাকে এই গ্রহে যে অল্প কিছু মানুষ বিচিত্র কারণে পছন্দ করে তিনি তাদের একজন। তাছাড়া বিষয়টা আমাকে অসম্ভব আগ্রহীও করে তুলেছিল।

তিনি যে প্রসঙ্গটা বলেছিলেন। ১৯৭১ সালে রওশন আরা নামের একজন বুকে মাইন বেঁধে পাকিস্তানি ট্যাংক উড়িয়ে দিয়েছিলেন। সঙ্গে নিজেও নিশ্চিহ্ণ হয় যান।
এই বিষয়ে আমার কিছুই জানা ছিল না। খোঁজ করতে গিয়ে যে তথ্যগুলো পেলাম, দৈনিক সমকাল [] এবং  বিভিন্ন পত্রিকা এবং ওয়েবসাইটের কল্যাণে তা এমন:
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ছাত্রী রওশন আরা তাঁর বয়স তখন ছিল ১৭। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বুকে মাইন বেঁধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন পাকিস্তানি ট্যাংকের সামনে। মৃত্যু হয়েছিল ১৯ জন পাকিস্তানি আর্মির। মুজিব ব্যাটরির পাশাপাশি আরেকটি ব্যাটরির নাম রাখা হয়েছিল রওশন আরা ব্যাটরি। রওশন আরার এই আত্মত্যাগের পর তখন এপার-ওপার বাংলার বিখ্যাত কবিরা কবিতাও লিখেছিলেন, রোশেনারা, একটি মেয়ের মৃত্যু
জন্মযুদ্ধ নামের ওয়েবসাই‌টে বাড়তি কিছু তথ্য পেলাম। যেমন: বেছে-বেছে সেদিন রওশন আরা সবুজ শাড়ি পরেছিলেন (মনে হচ্ছে একটা রগরগে ফিকশন পড়ছি!) আবার তাঁর মৃত্যুর পর রক্তমাখা সবুজ শাড়িটা ট্যাংকের ব্যারেলে আটকে থাকে। সেটা আবার কারও কারও চোখে বাংলাদেশের পতাকাও হয়ে যায়! []

কিন্তু রওশন আরাকে নিয়ে আহমদ ছফা অলাতচক্রে লিখেছিলেন:
"...তারপর থেকে ভারতের পত্র পত্রিকাসমুহ রওশন আরাকে নিয়ে উঠে পড়ে লেগেছে। ...পত্র পত্রিকার প্রচার একটু থিতিয়ে এলেই রওশন আরাকে নিয়ে কবি মশায়েরা কবিতা লিখতে এলেন। ...কিন্তু আমি বা বিকচ (বিকচ চৌধুরী) ইচ্ছা করলেই রওশন আরাকে আবার নিরস্তিত্ব করতে পারিনে। আমরা যদি হলফ করেও বলি, না ঘটনাটি সত্য নয় রওশন আরা বলে কেউ নেই। সবটাই আমাদের কল্পনা- লোকজন আমাদেরকে পাকিস্তানি স্পাই আখ্যা দিয়ে ফাঁসিতে ঝোলাবার জন্য ছুটে আসবে।...(অলাতচক্র। পৃষ্ঠা নং: ১৩৫)
...তোমার (বিকচ চৌধুরী) গল্প সেই শর্তগুলো পূরণ করেনি। ধরো নাম নির্বাচনের বিষয়টি। তুমি বলেছ ফুলজান। এই নামটি একেবারেই চলতে পারে না।...সুতরাং একটা যুতসই নাম দাও, যাতে শুনলে মানুষের মনে একটা সম্ভ্রমের ভাব জাগবে। রওশন আরা নামটি মন্দ কী!...।(অলাতচক্র। পৃষ্ঠা নং: ১৩৪)
যাই হোক, বিকচ চৌধুরীই রওশন আরাকে নিয়ে তৎকালীন পত্রিকায় প্রতিবেদনটি লিখেছিলেন। যেটা ছাপা হওয়ার পর প্রচন্ড আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। সেই বিকচ চৌধুরীর কাছ থেকে আমরা একটু শুনি:
...একদিন আমার একটি ছোট্ট সংবাদ কাহিনী চারদিকে রীতিমতো আলোড়ন সৃষ্টি করল। ঢাকায় ১৭ বছরের এক অসম সাহসী মেয়ে বুকে মাইন বেঁধে পাক ট্যাংক বাহিনীর ১৯ জন খান সেনাকে খতম করে দিয়েছেন। ...দিকে-দিকে গঠিত হয় রওশন আরা ব্রিগেড। আজ ইতিহাসের নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে স্বীকার করতে দ্বিধা নেই রনাঙ্গনের প্রচার কৌশলের অন্যান্য অনেক সংবাদ কাহিনীর মতো রওশন আরার কাহিনীও ছিল প্রতীকী। রওশন আরা নামটি বাংলাদেশের বন্ধু আহমদ ছফার দেওয়া।
(সূত্র: ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ রাইটার্স ফাউন্ডেশন এর সভাপতি ড. আবুল আজাদকে লেখা চিঠি।)

তখন... রওশন আরাকে যে-প্রকারে বিকচ চৌধুরী বা আহমদ ছফা সৃষ্টি করেছিলেন এতে আমি দোষের কিছু দেখি না। যুদ্ধের বিভিন্ন কৌশল থাকে। যোদ্ধা বা যুদ্ধের সঙ্গে জড়িত মানুষদের উদ্দীপ্ত করার জন্য এও এক কৌশল।
কিন্তু এখন...। রওশন আরাকে নিয়ে অনেকের লেখা পড়ে মনে হচ্ছিল এরা নিজেরা অকুস্থলে উপস্থিত ছিলেন। ফেনিয়ে ফাঁপিয়ে যেভাবে লিখেছেন সত্য যে কেমন করে ফিকশন হয়ে যায় তার এক চমৎকার উদাহরণ। এরা ভুলে যান মুক্তিযুদ্ধ ফিকশন না। এখানে বানিয়ে-বানিয়ে লেখার কোনও প্রকারের সুযোগ নাই।
তাছাড়া এটা অনিচ্ছাকৃত ভুল হলে মার্জনা করা চলে কিন্ত এখন জন্মযুদ্ধের গবেষকের ইচ্ছাকৃত ভাবে সত্যকে আড়াল করাটা অন্যায়। এক প্রকারের গুরুতর অপরাধ! মুক্তিযুদ্ধে ফিকশনের কোনও স্থান নেই!
...
এবেলা বিকচ চৌধুরীর ঋণ কৃতজ্ঞচিত্তে স্বীকার করি। দুলাল ঘোষের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ের কিছু দুর্লভ পত্রিকা এবং বিভিন্ন কাগজপত্র পেয়েছিলাম। যার কিছু অংশ বিভিন্ন সময়ে লেখায় দিয়েছিলাম।
বিকচ চৌধুরীর সঙ্গে আমার দেখা করার কথা ছিল। আফসোস, যাব-যাব করেও যাওয়া হয়নি আমার। আমার পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল আর ভিসার জন্য অমানুষের মত, অমর্যাদার সঙ্গে দূতাবাসে দাঁড়াতে আমার ইচ্ছা করে না। পূর্বে দু-বার আমার ভারত যাওয়া পড়ে। অভিজ্ঞতা বড়ই তিক্ত। ভারতসহ বিভিন্ন দূতাবাসগুলো একটা কাজ নিয়ম করে করে। সেটা হচ্ছে, অতিথির কাছে প্রথমেই নিজের দেশকে নগ্ন করে দেওয়া। ফট করে ল্যাংটা হয়ে যাওয়া। সেটা ভারত হোক বা জার্মানি, আচরণ একই।  এ এক চরম অসভ্যতা!
হাতের নাগালে স্ক্যানার নাই। সেল ফোনই ভরসা। ১৯৭১ সালে বাংলার মুখ নামের পত্রিকাটি থেকে বিকচ চৌধুরীকে লেখা চিঠি। মুজিবনগর থেকে বের হওয়া এই পত্রিকাটির তখন দাম ছিল পঁচিশ পয়সা!   

এরা লিখেছে, ...ঢাকার রওশন আরার বুকে মাইন বেঁধে হানাদার বাহিনীর ট্যাংকের সামনে ঝাঁপিয়ে পড়া ...
এরা আবার এক কাঠি সরেস। এরা বিকচ চৌধুরীকে বানিয়ে দেয় বিকাশ চৌধুরী!

Friday, June 13, 2014

একালের যোদ্ধা (!)

ওকালের মুক্তিযোদ্ধারা এখন বড়ো পানসে! যেমন এখন আমাদের আর মশিহুর রহমান [১] নামের মানুষটা অকল্পনীয় ত্যাগ মনে রাখার আদৌ প্রয়োজন নেই! কারণ গুটিকয়েক মানুষের অবদান বলে বলে আমাদের আর বলার সময় কোথায়! মুখে ফেনা তুলে মুখ ফেনায় ফেনায় একাকার...

এখন আবার চলে এসেছেন অনলাইন যোদ্ধারাওকালের মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করেছেন সামান্য অস্ত্র হাতে আর একালের যোদ্ধাদের প্রধান অস্ত্র অসামান্য কীবোর্ডআরেকটা অস্ত্র আছে, এই অন্য অস্ত্রটার কথা পরে বলছিতো, কী যুদ্ধ বেইবি, চোখে দেখা যায় না এমন- চোখ ঝলসে যায় বলে

এমন্ই এক নারী যোদ্ধার(!) কথা বলিলেখার হাত অতি কুৎসিততার এই ঘাটতি মিটে যেত তার চকচকে চামড়া দিয়ে। 

পাকিস্তানের মসজিদে বোমা ফাটলঅসংখ্য মৃত্যু। মসজিদ রক্তের স্রোতে ভেসে গেলআমার জানা মতে ওখানে শিশুও ছিলএই মহিলা মুক্তিযোদ্ধা(!) তখন এই অতি নিষ্ঠুর মৃত্যু নিয়ে বেজায় উল্লাস করলেনএই অসম্ভব হৃদয়হীন কাজটা তিনি কেন করলেনকারণ তিনি যে একালের মুক্তিযোদ্ধা! এরপর...আমি যখনই তার মুখপানে তাকাব তখন দেখব অসংখ্য শুঁয়োপোকা। কিলবিল করছে। গা হিম করা- শরীর কেবল শিউরে শিউরে উঠবেইচ্ছা করবে গলায় আঙ্গুল দিয়ে বমি করলে যেন খানিকটা আরাম পাওয়া যাবে

হালে অন্য একজনের একটা লেখা পড়লামকরাচি এয়ারপোর্টে অস্ত্রধারী জঙ্গিদের হামলায় ৩৭ জন নিহত হয়েছেন মানুষটা লিখে বেদম উল্লাস প্রকাশ করলেনতিনি কেন এমন নৃশংসতা দেখালেন? কারণ তিনিও যে একালের দুর্ধর্ষ মুক্তিযোদ্ধা!
অন্য অস্ত্রটার কথা এবার বলিএই সমস্ত যোদ্ধারা অধিকাংশই জেনারেল পদ মর্যাদার, হাজার-লাখ-কোটি এদের সিপাহিজেনারেল বললেন, যে তার বিরূদ্ধাচারণ করবে তার সম্মানে মুত্র বিসর্জন করলাম। চালু বাংলায় মুতে দিলাম। ব্যস, আর যায় কোথায়! সিপাহি সব মুত্র বিসর্জন করে বিরুদ্ধাচারণ করা শক্রদের ভাসিয়ে দিল। ভাগ্যিস, মুত্র লিটার ধরে বিক্রি হয় না।

আমাদের বাতিওয়ালা, লেখক জাফর ইকবালজাফর ইকবালের সম্মতিক্রমে তার নামে একটা পেজ খুলে আমদেরকে জানানো হলো, যে প্লেন পাকিস্তান হয়ে যায় সেই প্লেনে তিনি নাকি চড়েন নাকেন চড়েন না? কারণ তিনি ওকালের মুক্তিযোদ্ধা হতে পারেননি তাই তিনি একালের মুক্তিযোদ্ধা! তাই তিনি যুক্তিসঙ্গত কারণে তীব্র ঘৃণা কেবল পোষণই করেন না ছড়িয়েও দেনযতটুকু জানি পাকিস্তানি বল দিয়ে বিশ্বকাপ খেলা হচ্ছেএখন এই কারণে এই খেলা বর্জন করার আহ্বান আসবে কিনা বুঝতে পারছি না

কিন্তু যে আমেরিকা তখন পাকিস্তানকে আমাদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিতে পরোক্ষ মদদ দিয়েছিল, ক্ষুধার্ত আমাদের খাবার ফিরিয়ে নিয়েস্বাধীন দেশটাকে সীমাহীন বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিতে তিলমাত্র কার্পণ্য করেনি। অথচ সেই দেশে গিয়ে শিক্ষা গ্রহণ করতে, বসবাস করতে, আয়েশ করে ছুটি কাটাতে, সেই দেশের সঙ্গে ঘসাঘসি করতে আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবীদের কোনও সমস্যা নাই। এতে তারা বিমল আনন্দ বোধ করেন। বাপের বিরুদ্ধে এই সব কথা বলতেও এদের মধ্যে দ্বিধা কাজ করে।
তারা অবশ্য যুক্তি দেখাতে পারেন ১৯৭১ সালে আমেরিকা তো আর সরাসরি আমাদের স্বজনদেরকে খুন করেনি, নারীদের চরম অপমান করেনি ওহে বুদ্ধিজীবীগণ, আমি কি আপনাকে স্মরণ করিয়ে দেব গোল্ডা মায়ারের সেই বিখ্যাত উক্তি? “কাউকে নিজ হাতে হত্যা করা বা কাউকে হত্যার সিদ্ধান্ত দেওয়ার মধ্যে খুব একটা পার্থক্য নাই
গোল্ডা মায়ারকে গুল্লি মারেন। আমি যদি আপনাকে খুন করার জন্য খুনি ঠিক করি তাহলে আমাকে কী আইন ছেড়ে দেবে? নাকি এই প্রজন্ম ছেড়ে কথা বলবে। 

আমি পূর্বের অনেক লেখায় বারবার বলেছি, পাকিস্তানি সৈন্যরা যোদ্ধা ছিল না, ছিল সাইকোপ্যাথএরা যোদ্ধা নামের কলংক! ১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময় এরা যে-সমস্ত অন্যায় করেছে এদেরকে কাপুরুষ খুনি বললেও একবিন্দু অতিশয়োক্তি হবে নাএরা প্রার্থনারত মানুষের উপর হাসতে হাসতে গুলি চালিয়েছেদোলনার শিশুকে অকম্পিত হাতে গুলি-বেয়নেটের আগায় শিশুকে মগজ আটকে উল্লাস করেছেএদেশের মহিলাদেরকে কেবল চরম নির্যাতনই করেনি অনেক ক্ষেত্রে এদের আচরণ একটা পশুকেও ছাড়িয়ে গেছেএই সব নিয়ে কারও দ্বিমত থাকার কথা নাএই সত্যটা যিনি অস্বীকার করবেন তাকে সবিনয়ে বলি আপনার জন্য কাঁঠালপাতা না, আস্ত কাঁঠাল গাছ

পাকিস্তানি আর্মি এই চরম অন্যায়গুলো করর পেছনে কতিপয় জেনারেল এবং রাজনীতিবিদদের ইন্ধন ছিলতারপরও তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম পাকিস্তানের সবাই, এমন কি মায়ের গর্ভে থাকা শিশুটিও তখন সম্মতি জানিয়েছিল আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে, চরম অন্যায় করতে
কিন্তু পাকিস্তানের এই প্রজন্মের অসংখ্য শিশু আছে যারা ১৯৭১ সালের অনেক পরে জন্মেছে। বাংলাদেশের নামটিও শুনেনি বা তাদের পূর্বপুরুষরা কেমনতরো অন্যায় করেছিল এই সম্বন্ধে এদের বিন্দুমাত্র ধারণাও নেইআমাদের কদর্য উল্লাসের বলি তাহলে এরাও! বাহ!
পাকিস্তানি কারও মৃত্যুতে যখন তার স্বজন-মা আকাশ ফাটিয়ে কাঁদেন তখন পেট চেপে গা দুলিয়ে হাসি আসে, না? দানবের প্রতি দ্রোহ-ঘৃণা থাকাটা দোষের কিছু না কিন্তু দানবকে ছাড়িয়ে যাওয়াটা কোনও কাজের কাজ না

এবার খানিকটা অন্য প্রসঙ্গপাহাড়ে আমাদের সেনাবাহিনীর অনেক কর্মকান্ড তীব্র বিতর্কের, নিন্দনীয়, চরম অন্যায়এই সমস্ত কর্মকান্ড সেনাবাহিনী কী আমাদের মত নিয়ে করেছিল? এই কারণে এখন পাহাড়ের লোকজনরা যদি আমাদের সবাইকে কুৎসিত ঘৃণার চোখে দেখে বিষয়টা কেমন দাঁড়াবে, হে একালের মুক্তিযোদ্ধা...।

সহায়ক সূত্র:
১. মশিহুর রহমান: http://www.ali-mahmed.com/2009/10/blog-post_06.html

...
* ফেসবুকে এই লেখাটা শেয়ার করার পর নূর এলাহী শিবলী মন্তব্য করেন:
“...পাকিস্তানের উপর আমার প্রবল ঘৃণা প্রায় ছেলেমানুষির পর্যায়ে পৌঁছে গেছেআমি ১৯৭১ এর পর জেনে শুনে পাকিস্তানি জিনিষ ব্যাবহার করিনিবিদেশে যাবার যাবার সময় যে প্লেন পাকিস্তানের মাটি স্পর্শ করে কখনো সেই প্লেনে উঠি নিপাকিস্তানের ক্রিকেট খেয়ায় আমি কোন আনন্দ পাই না__ তবে এসব পুরোপুরি আমার নিজের ব্যাপারআমি তোমাদের এই কথাগুলি বলেছি কিন্তু কখনোই তোমাদের এগুলো করতে বলছি নাবুকের মাঝে ঘৃণা নিয়ে বড় হওয়া খুব কষ্টআমাদের প্রজন্ম বুকের মাঝে এই ঘৃণার কষ্ট নিয়ে বড় হচ্ছে__ আমাদের পরের প্রজন্মও ঠিক একই রকম কষ্ট নিয়ে বড় হোক সেটা আমি চাই না। 
আমি চাই তারা হোক উদার, তারা পুরো বিষয়টুকু বিবেচনা করুক সম্মান এবং ভালোবাসা দিয়েপাকিস্তান তাদের কাছে হোক পৃথিবীর অন্য দশটি দেশের মতো একটি দেশ পাকিস্তানের মানুষ হোক পৃথিবীর অন্য যে কোন মানুষের মতো একজন মানুষ।...
- মুহম্মদ জাফর ইকবাল (তোমাদের প্রশ্ন আমার উত্তর) 

ইউটিউবে মুক্তিযুদ্ধের উপর করা ডকুমেন্টারি গুলাতে পাকিস্তানিদের করা মন্তব্য দয়া করে দেখবেনবাংলাদেশের নারীদের সম্পর্কে তাদের মন্তব্য গুলাতে এবার চোখ বুললে আর উদার প্রজন্ম হওয়া যায় নাআপনার লেখা বলেই মন্তব্যটা করলাম আশা করি কিছু মনে করবেন না

আমার উত্তর:
...আপনার লেখা বলেই‌ মন্তব্যটা করলাম। আশা করি কিছু মনে করবেন না।

ভাগ্যিস, মন্তব্যটা করেছিলেন। নইলে আমার অনিচ্ছাকৃত ভুল ধরণার কথাটা জানাই হতো না। অতীতেও বলেছি, কেউ আমার ভুল ধরিয়ে দিলে আমি কৃতজ্ঞ হই। যেমনটা হচ্ছি আপনার বেলায়।

জাফর ইকবালের অন্য কিছু লেখা পড়ে তাঁর এই সংক্রান্ত পুরো ভাবনাটা আমার জানার সুযোগ হয়নি কারণ ওখানে এমন বিস্তারিত ছিল না। আর এই বইটা পড়া হয়নি সম্ভবত বাচ্চাদের বই বলে।



আমি যেখানে থাকি ওখানে একটা বই যাগাড় করাও বিস্তর ঝামেলার। অনেক যন্ত্রণা করে তাঁর লেখা বইটা যোগাড় করলাম। পড়লাম। মুগ্ধ হলাম! এই চমৎকার বইটা কেবল বাচ্চাদের জন্যই না, বড়দেরও পড়া উচিত।

কেবল যদি তাঁর এই লেখাটার কথাই বলি অসাধারণ করে লিখেছেন। তাঁর মত মানুষের কাছ থেকে তো আমরা এমনটাই আশা করব। কারণ তিনি কোন মত বিশ্বাস করেন এটার চেয়ে জরুরি হচ্ছে কোন মত দ্বারা তিনি অন্যকে প্রভাবিত করছেন। কারণ তাঁর প্রভাবিত করার ক্ষমতা (বিশেষ করে শিশুদেরকে) অভাবনীয়! এমন শক্তি সবার থাকে না, তাঁর আছে।

দেখুন, দানব মনুষের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে কী জানেন? সে তার দানবীয় শক্তির প্রয়োগ করে আশেপাশের মানুষকে দানব বানাবার চেষ্টা করে। এটা দানবের জয়, মানুষের পরাজয়! মানুষ হিসাবে আমার নিজেকে পরাজিত দেখতে ভাল লাগে না।
পাকিস্তানের কিছু বুদ্ধিজীবী ক্ষমা চেয়েছিলেন। কিন্তু আনুষ্ঠানিক ভাবে পাকিস্তান তার যুদ্ধকালীন নৃশংসতার জন্য কোনও প্রকার দুঃখ প্রকাশ দূরের কথা স্বীকারও করেনি। এটা এক চরম অসভ্যতা, বর্বরতা এতে কোনও দ্বিমত নেই। তাই বলে মসজিদে বোমা ফাটবে, মানুষ মরবে আর আমরা উল্লাস করে এদের পর্যায়ে নেমে আসব এটা তো হয় না। এটা এই দানবদের জয়, আমাদের পরাজয়।

আমার এই লেখায়...তিনি (জাফর ইকবাল) যুক্তিসঙ্গত কারণে তীব্র ঘৃণা কেবল পোষণই করেন না ছড়িয়েও দেন। এই বাক্যটার জন্য দুঃখ প্রকাশ করি। অন্তত এটা লিখলে জাফর ইকবালের প্রতি অন্যায় করা হয়। এতে করে তাঁর কি আসে যায় জানি না, তবে আমার আসে যায়...।

Sharifus Salekin Shahan লিখেছেন:
"Ali Bhai, untill and unless this Fuckistan is seeking justice for it's misdeeds, seeking apology to Bangladesh - I don't want to think whether my blind hatred is wrong or bringing me down !"
আমার উত্তর:
আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় কর্ণেল তাহের হাজার-হাজার কৃষক, মজুর, তাতী, জেলেদেরকে যুদ্ধের যে ট্রনিং দিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে অনেকেই কী করেছিলেন জানেন তো? এঁরা যে-কোনও চৌকশ সেনাবাহিনীর চেয়েও দুর্ধর্ষ যুদ্ধ করে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন! কেমন করে এটা সম্ভব হলো? চোখের সামনে এঁদের স্বজনদের নির্যাতন, মৃত্যু সর্বদা এঁদেরকে তাড়া করত। কর্ণেল তাহের এঁদের দ্রোহ-অদম্য ক্ষোভকে কেবল কাজে লাগিয়েছিলেন।

দেখুন, ১৯৭১ সালে যাদের স্বজন খুন হয়েছেন, শারীরিক চরম নির্যাতিত হয়েছেন তাঁরা কেমন করে তাঁদের বেদনার কথা বিস্মৃত হবেন? তাঁদের দগদগে ক্ষত ভুলে যেতে বলার স্পর্ধাই-বা আমার কোথায়!

কিন্তু...একটা কিন্তু রয়ে যায়। তাই বলে এখন একজন পাকিস্তানিকে পেলেই তো আর কুপিয়ে ফালা ফালা করে ফেলা যায় না। পাকিস্তানি মসজিদে বোমা ফাটলে উল্লাস করা যায় না। আচ্ছা আপনি একটা কথা বলেন, সব নাহয় বাদই দিলাম। প্রার্থনাস্থল হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা সেই জায়গায় কেউ কারও রক্তের স্রোত বইয়ে দিল (যাদের অধিকাংশই আমাদের ১৯৭১ সালের যুদ্ধের জন্য দায়ী নন ) আর আমরা হলুদ দাঁত বের করে হাসলাম, উল্লাস করলাম। তা কী হয়!

এই বিষয়টা কি আপনি লক্ষ করেছেন, বিচার নিয়ে দেশ যখন উত্তাল, শাহবাগে লক্ষ-লক্ষ মুষ্টিবদ্ধ প্রতিবাদী হাত। অথচ মাত্র কয়েক হাত দূরেই কিন্তু নাটের গুরু অপরাধি গোলাম আযম। এই মানুষগুলো চাইলেই কিন্তু গোলাম আযমকে পিঁপড়ার মত পিষে ফেলতে পারত।
কিন্তু পারা যায় না এমনটা, বুঝলেন। এই কয়েক হাতের মধ্যেই যে অসংখ্য অদৃশ্য শেকল ছড়ানো। এখন পর্যন্ত আমাদের অর্জিত জ্ঞানের শেকল, সভ্যতার শেকল, মানবতার শেকল...।
অনেক কষ্টে মানুষ হয়েছি আমরা- ইচ্ছা করলেই দানব হয়ে যেতে পারি না, বুঝলেন...।  

আমার সাফ কথা, এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই যে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান যুদ্ধ বহির্ভূত এমন অনেক কর্মকান্ড করেছিল যাকে কোনও প্রকারেই যুদ্ধের অংশ বলা চলে না। সরল করে বললে এ স্রেফ খুন, হিংস্রতা, বর্বরতা।
খুন তো খুনই সেটা কে করল কখন করল সেটা তো মূখ্য বিষয় না। যত দিন পর্যন্ত পাকিস্তান ক্ষমা না-চাইবে আমাদের ক্ষোভ প্রশমিত করার চেষ্টা না-করবে তত দিন পর্যন্ত আমাদের নায্য দাবী আমরা করেই যাব। এতে করে ৪৩ বছর গেল নাকি ৪৩০ বছর তাতে কিছুই যায় আসে  না। এই নিয়ে তো কোনও দ্বিমত নাই, অন্তত আমার...