Search

Monday, August 31, 2009

খোদেজা: ৫

নিশি বেরিয়ে দেখল ছেলেটা গুটিশুটি মেরে শুয়ে আছে। কেমন গোল হয়ে শুয়েছে। ছেলেটা অদ্ভুত। এর শোয়ার খাট আছে কিন্তু এর নাকি মাটিতে শুয়েই আরাম। আচ্ছা, সোহাগের ভাল নামটা যেন কি? কখনও সম্ভবত জিজ্ঞেস করা হয়নি। সোহাগের সঙ্গে নিশির কথা হয় খুব কম। নিশির মন ভাল থাকলে অবশ্য আলাদা কথা, তখন নিশি নিজ থেকেই একগাদা কথা বলে।

নিশিকে সোহাগের ঘুম ভাঙ্গাতে বেগ পেতে হলো। সোহাগ নিশিকে দেখে চোখ মেলল, ধড়মড় করে উঠে বসল।

আফা, রাগ কইরেন না, বইয়া বইয়া ঘুমাই গেছিলাম। অক্ষণই কাম শ্যাষ কইরা ফালামু।

কাজ নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না, ইচ্ছা করলে ঘুমা। ঘুমাবি?

না গো আফা, আর ঘুমাইতে ইচ্ছা করতাছে না।

নিশি ঝোকের মাথায় বলে বসল, বাড়িতে যাবি রে, সোহাগ?

সোহাগ চোখ বড় বড় করে বলল, হেছা আফা। আল্লার কিরা, মিছা কইতাছেন না।

নিশির বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে ঘোর কেটে গেল। বাড়িতে সোহাগকে নিয়ে যাবেটা কে? জাবীরকে বললে ও ঠিক ঝাঁঝিয়ে উঠবে: তোমার কোন কান্ডজ্ঞান নাই নাকি!

নিশি হয়তো জটিলতা এড়াবার জন্য বলবে: আহা, একটা কথা বলেছি, না করলে না করবে, এ নিয়ে হইচই করার তো কিছু নাই! ছেলেটা কতদিন হলো বাড়িতে যায় না। ও খুব মন খারাপ করে থাকে।

হইচই-হইচই। হোয়াট ডু য়্যু মীন বাই হইচই! একটা কথা বুঝে, না বুঝে বলে আমার মাথায় একটা বোঝা চাপিয়ে দিলে। এমনিতেই আমার যন্ত্রণার শেষ নাই।

তখন নিশির কষ্টের নিঃশ্বাস ফেলা ব্যতীত আর কোন উপায় থাকবে না। নিশি প্রায়শ ভাবে, আচ্ছা এই মানুষটার সঙ্গে ও ঝুলে আছে কিভাবে? মানুষটাকে ছেড়ে যাবে ভাবলেই বুকের গহীন থেকে অজানা এক কষ্ট পাক খেয়ে উঠে কেন? এই জটিল প্রশ্নের উত্তর নিশির কি কোন দিনই জানা হবে না? নিশির কি এ দ্বিধা থেকে কোন মুক্তি নেই।

নিশির বিব্রত ভঙ্গি, সোহাগ, দেখব তোর ভাইজানের সঙ্গে কথা বলে।

সোহাগ মিইয়ে যায়। খানিকক্ষণ কি যেন আনমনে ভেবে বলে, আফা, আমি এখলা এখলা চইলা যামু, কুনু সমস্যা হইব না। রাস্তাই আমারে টাইন্যা লয়া যাইব।

নিশি আঁতকে উঠে, যাহ, কি বলিস, মাথা খারাপ, তুই একলা একলা যাবি কেমন করে।

কুনু সমুস্যা হইব না, আফা। চোক্কের নিমিষে যামু গা।

নিশি আলগা গাম্ভীর্য এনে বলল, এমন পাগলামির কথা আর যেন না শুনি, আমি তোর ভাইজানের সঙ্গে কথা বলব। সে কোন একটা ব্যবস্থা করবে। হ্যা রে, সোহাগ, তোর লেখাপড়া কোদ্দুর হল?

সোহাগের অক্ষরপরিচয় আগে থেকেই ছিল। নিশি কোন কোন দিন ওকে নিয়ে পড়ত। একদিন বই-খাতা এনে দিল, ক-দিন সোহাগ পালিয়ে পালিয়ে থাকল। নিরূপায় হয়ে একসময় ভাঙ্গ ভাঙ্গা বানান করে পড়া শুরু করল। বিচিত্র সব ছড়া লেখা শুরু করল।


পালকি চলে, রবিন্দ্রনার ঠকুর

"পালকি চলে

পালকি চলে

গান তরে

আগুন জলে

ছদু গায়ে

আদুল গায়ে

জাচে তারা

রদি সারে।

মনা মদু

চখ মদু..."।


আরেকদিন লিখল:

"ফালাইননা খারাপ

ফালাইননা বানর

ফালাইননা দুষ্টামি করে

ফালাইননাকে লাতি মারব

ফালাইননাকে ঠাওয়া মেরে ফেলে দিব

ফালাইননা একটা মেতর, সে গু সাপ করে"।


নিশি হাসি গোপন করে বলেছিল: সোহাগ, ফালাইন্যা কে রে?

সোহাগ কোন উত্তর দেয়নি। মুখ নিচু করে কেবল হেসেছিল। ফালাইন্যা কি ওর প্রিয় বন্ধুর নাম? নিশি নাছোড়বান্দা: বল না সোহাগ, ফালাইন্যা কি তোর প্রিয় বন্ধু?

সোহাগ বলেছিল: ফ্রিয় কি, আফা?

ধুত, ফ্রিয় না, প্রিয়।

সোহাগের মুখ নিচু হতে হতে গিয়ে হাঁটুতে ঠেকত, হ।

ফালাইন্যা আবার কি নাম রে?

বুঝেন নাই আফা, ফালাইননার মাইনে হইল গিয়া যারে সবাই ফালাইয়া দেয়।

কি বলিস, বুঝিয়ে বল।

হের আগে হের ভাই ভইন হক্কলে মইরা যাইত তো। এর লিগ্যা হের নাম রাখছিল ফালাইননা।

রাখলে কি হয়?

অমা, জানেন না বুজি, ফালাইননা হইল ফালাইননা, হেরে তো আজরাইলও নেয় না। আজরাইল না নিলে মরব কেমনে? আফা, আফনে দেহি কুছতা জানেন না।

এক্ষণ সোহাগ মুখ দিয়ে বিচিত্র শব্দ করে ছাদের টিকটিকি তাড়াবার চেষ্টা করছে। বিচিত্র শব্দটা করতে করতেই বলল, আফা-আফা গো, দেখছেন নি, এইডা কেমুন লাফলালাফলি-ঝাপলাঝাপলি করতাছে?

নিশি অনেক কষ্টে হাসি গোপন করল, সোহাগ, এতদিন এখানে থেকেও তুই ভাষাটা বদলাতে পারলি না!

সোহাগ মুখ ভরে হাসল, আফা, আপনেগো কথা কইয়া শান্তি নাই। ফাপড় লাগে।

সোহাগ, তোকে যে ছড়াগুলো শিখিয়েছিলাম, মনে আছে না, নাকি ভুলে গেছিস?

সোহাগের এই পরীক্ষা টাইপের বিষয়গুলো ভাল লাগে না। সে কথা ঘুরাবার জন্য বলল, আফা, আমাগো গেরাম দেশের একটা ছড়া কই?

বল।

"আতা গাছের মাথা নাই

মাথার মইদ্যে চুল নাই

চুলের মইদ্যে উকুন নাই

উকুনের মরন নাই

মরলে কিন্তু বাছন নাই"।


নিশির এবার হাসি চাপা সম্ভব হলো না।

আফা, সোন্দর না?

হুঁ, সুন্দর। কিন্তু তুই দেখি দুনিয়ার সব আজগুবি কথা বলিস।

সোহাগের মন খারাপ হয়ে গেল। সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে আপা তার কথা খুব একটা পছন্দ করেনি। আপা এমন করলে তার বুকটা ফাঁকা হয়ে যায়!

নেড়া বেলতলায় কেন বারবার যায়?

কেউ কেউ জানতে চান, আচ্ছা, অমুক সাইটে লেখা ছেড়ে দিলেন কেন?

আমি চিঁ চিঁ করে বলি, ইয়ে মানে লিখি তো, আমার সাইটে।

বিরক্তিভরা উত্তর, হুশ-হুশ, একটা লেখা আপনার সাইটে ক-জন পাঠক পড়ে। অমুক সাইটে যা তা লেখারও একশ পাঠক পাওয়া যায়।


এর উত্তরে আমার গুছিয়ে বলার কিছু থাকে না। সবটুকু বললে তিনি নির্ঘাত বলে বসবেন, ওরি...। অনলাইনে লেখালেখির অনেক হ্যাপা। আমি একজন দুর্বল মানুষ বলেই হয়তো বাড়তি চাপ নেয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এ নিয়ে অনেকের কী হাসি!

এমনিতেও একটা লেখা লিখে ভয়ে কাঠ হয়ে থাকি, ইশরে, কোথাও কোন ভুল হলো না তো? কেউ রে রে করে তেড়ে আসছে না তো?


আমার কেন যেন মনে হয়, গণ-সাইটে ব্লগার-লেখক থাকেন পুরোপুরি অরক্ষিত। যে কেউ যা খুশি বলে দিতে পারে। কোন অসঙ্গতি-ভুল পাওয়া গেলে ধরিয়ে দিলেই হয়- কেউ আমার ভুল ধরিয়ে দিলে এতে আমার কোন লাজ নাই, আছে কৃতজ্ঞতা। কিন্তু কোন বেকুব কাক একজনের মাথায় হাগু করে দিয়েছে তিনি সেই রাগ-ঝালটা ঝাড়বেন এখানে এসে এটা তো কোন কাজের কাজ না। এরা কেন যে ভুলে যান ফ্রি-ইস্টাইল কুস্তিতেও কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়- একজন বেশ্যারও কিছু অধিকার আছে। ইচ্ছা হলেই পাবলিক-প্লেসে 'ধুম মাচা দে ধুম মাচা দে, ধুম' গলা ছেড়ে গাওয়া যায় না।

হেথায় কখনও কখনও এমনটা মনে হয় কেউ কেউ লেখা পাঠ করে মাথা কিনে নিচ্ছেন। একজনকে পোস্ট দিয়ে এক ঠ্যাং-এ দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। নইলে মানুষটা চটে লাল হবেন, শ্লেষভরা কন্ঠে মন্তব্য করবেন, 'পোস্ট দিয়ে কোথায় উধাও হইল। আসলে বলার কিছু নাই তো, তাই ভাগছে'।


দূর-দূর। অন্য কোন সাইটের চেয়ে নিজের সাইটে লেখা ঢের আনন্দের। কোন বাড়তি চাপ নেই, নিজের মতো করে লিখে যাওয়া। কেউ না পড়লে মনিটরে ঠ্যাং তুলে পেট ভাসিয়ে নিজের লেখা নিজেই পড়া। নিজের লেখা নিজে পড়া যাবে না এমন কোন বে-আইন তো আর চালু নেই!

তদুপরি এটা আজও বুঝে উঠিনি, নেড়া বেলতলায় কেন বারবার যায় এটা নেড়া ভালো বলতে পারবে কিন্তু আমি কেন গেছি? লোভ-লোভ! মন্তব্যর লোভ নাকি স্পর্শের লোভ, কে জানে?

চুপিচুপি পুরনো সেই কথাটার চর্বিতচর্বণ করি, আমার কাছে একেকটা মন্তব্য যেন একেকটা স্পর্শ।

Sunday, August 30, 2009

এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি

এই দেশটা বড়ো বিচিত্র, ততোধিক বিচিত্র এখানকার লোকজন। প্রাণের মায়া তুচ্ছ করে-জান হাতে নিয়ে, ওভারব্রীজ ফাঁকা থাকলেও ঝড়ের গতিতে ছুটে চলা অসংখ্য গাড়ির মাঝখান দিয়ে সাপের মত এঁকেবেকে রাস্তা পার হবে। যে দেশের যে চল!

উপজেলা চেয়ারমেনের বেতন একজন কাঠমিস্ত্রির সমান। তিনি যে কেমন ন্যাতা হবেন তা আর বলতে! এই ন্যাতা জনসেবা করার জন্য মুখিয়ে থাকবেন! ইনি রিলিফের গম বেচবেন না তো কো বেচবে?
মুষ্টিমেয় লেখক ব্যতীত অন্যরা লেখালেখি করবেন বিনে পয়সায়, লেংটি পরে দেশ উদ্ধার করবেন। একজন লেখকের কখনই ইচ্ছা করবে না চকচকে কাপড় পরতে, কালেভদ্রে সুস্বাদু খাবার খেতে। কারণ এঁদের রেকটাম বলে কোন জিনিস নাই অতএব খাবার গ্রহনেরও কোন তাড়া নাই। কৌপিন পরে উবু হয়ে লিখে লিখে হাতি-ঘোড়া মারবেন!

মসজিদের ইমামের বেতন হবে মেথরের চেয়েও কম! কী অবলীলায় আমরা ওঁর কাছ থেকে আশা করি ইনি ধর্ম গুলে সরবত বানিয়ে আমাদের খাইয়ে দেবেন। আমরা চুকচুক করে সেই সরবত পান করে 'সর্গে' যাত্রা করব!
অধিকাংশ মসজিদ-মাদ্রাসাই, বিশেষ করে গ্রাম-মফঃস্বলে, অবৈধ-দখলকরা জায়গায় গড়ে উঠেছে। এই নিয়ে কারও সামান্যতমও বিকার নাই। গ্রাম-গঞ্জের অধিকাংশ মসজিদগুলোয় আস্ত রেললাইন দিয়ে ঢাউস আকৃতির যে চার-পাঁচটা মাইক লাগানো থাকে এই রেললাইনগুলো চুরির মাল! একজন আমাকে জানিয়েছিলেন, আই, ডব্লিউ (রেলের ছোট পদের একজন কর্মকর্তা) সাহেব নাকি এটা দিয়েছেন। যেন আই, ডব্লিউ সাহেবের বাপের জিনিস এটা! অনেক মসজিদেরই বিদ্যুৎ সংযোগ অবৈধ!

'ঘুষ নামের সুখ-পাখিটা' নামের একটা লেখা ছিল শুভ'র ব্লগিং-এ। ওখানে লিখেছিলাম:
"আচ্ছা, আপনারা বলতে পারবেন, এ দেশে সবচেয়ে বেশি ঘুষ চালাচালি হয় কখন? দুই ঈদের আগে! এক ঈদের আগে থাকে পাক্কা একমাস রমজান। তো, রামাদান-সিয়াম-সংযমের মাসে এই কান্ডটা দেদারসে হচ্ছে...। মোদ্দা কথা, রমজানে ঘুষ খাওয়ার প্রবণতা বেশি!"

হায়রে সংযম! এ মাসে নাকি শয়তানকে বেঁধে রাখা হয়। নমুনা দেখেই বুঝতে ক্লেশ পেতে হয় না। এটা লিখে তোপের মুখে পড়েছিলাম। ওয়েবসাইটে একজন তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলেন, 'আপনি নিজে রোজা রাখেন না বলে আপনার গা জ্বলে'।

এই হয়েছে এক যন্ত্রণা! লিখে আবার জনে জনে ব্যাখ্যা দাও। ব্যক্তিগত আচারগুলোর প্রমাণ হাজির করিতে হইবে, গলায় আচার পালনের সার্টিফিকেট ঝুলাইয়া রাস্তায় রাস্তায় ঘুরিতে হইবে! নিমের ডাল লইয়া মসজিদ, বাজার, টাট্টিখানায় দাঁত ঘসিতে ঘসিতে...মুখে নিজের থুথু মাখিতে মাখিতে দাঁত পাতলা করিয়া ফেলিতে হইবে। আমি যে 'কেতনা বাড়া- কত্তো বড়ো' ত্যাগবাজ এটা প্রমাণ করিতে হইবে না!

যাগ গে, ধরে নিলাম, সরকারী চাকুরেরা বড়ই খারাপ লুক(!), দুষ্ট-পাজি। তা, ব্যবসায়ীরা কী? রমজান মাসে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যর দাম কেমন হয় এটা ভুক্তভোগীরা ভালো বলতে পারবেন। সৌদির মতো বর্বর দেশেও নাকি রমজানে দ্রব্যমূল্যর দাম স্থিতিশীল থাকে। রমজানে আমাদের দেশে দশ পার্সেন্ট নাকি একশ পার্সেন্ট, ঠিক কত মার্জিনে এরা ব্যবসা করবেন এটা ব্যবসায়ী মহোদয়গণ নিজেরাও বলতে পারেন না।
ধরলাম, ব্যবসায়ীরা চুর(!), তস্কর-হার্মাদ।

আম-জনতা, সাধারণ মানুষ? যে কৃষক সারা বছর চুক্তিতে ত্রিশ টাকা লিটার দুধ বিক্রি করেছেন তিনি রমজানে ধাম করে ষাট টাকা লিটার করে দেন। বাড়তি টাকা দিতে না চাইলে দুধ দেয়া বন্ধ, শিশু একফোঁটা দুধ খেতে পেল কি না পেল তাতে তার কী আসে যায়! তিনি কেন এমনটা করলেন, কোন কারণ নাই? সবাই দু-নম্বুরি করছে তার বুঝি ইচ্ছা করে না!

অথচ হাক মাওলা-হাক মাওলা, প্রতি শ্বাসে ধর্মীয় বাতচিত শুনে মনে হয়, এমন লক্ষীদেশ এই গ্রহে আর কোথাও নাই। বেহেশত নেমে এসেছে ধরায়, এই গ্রহে কোথাও বেহেশত থেকে থাকলে এ দেশ ব্যতীত আর কোথায়!

Saturday, August 29, 2009

ঠাকুর, তেরে দো হাত দে দে...

ঠাকুর, তেরে দো হাত দে দে... (ঠাকুর, তোর দুই হাত আমায় দিয়ে দে)। ‘শোলে’ মুভির বিখ্যাত সংলাপ! বালকবেলায় যখন এটা বড় পর্দায় দেখছিলাম, উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে গিয়েছিলাম। বুকে জগদ্দল পাথর। চোখে জল। আহা-আহা, ঠাকুরের হাত কী সত্যি সত্যি কেটে ফেলবে! ঠাকুর বেচারার কী হবে, খাবে কেমন করে? কী কষ্ট-কী কষ্ট!

কিন্তু এখন ভাবি, মানুষ হাত দিয়ে কী কেবল খায়-ই? কেউ কেউ লেখালেখিও করেন। আবার কেউ-বা, আমার মতো তিন টাকা দামের কলমবাজ লেখার চেষ্টাও করে। হায়, লেখার চেষ্টা...! এই চেষ্টাটা কত কাল ধরে চলবে?


আমি কম্পিউটার নামের যে বস্তুটায় এক আঙ্গুলে টাইপ করি, মানে করতাম, সেটার বাহারী নাম বটে ল্যাপটপ। পৃথুল- ‘গাবদা-গোবদা’ টাইপের, তিন কেজির উপরে ওজন, ১ ন্যানো সেকেন্ডের ব্যাকআপের জন্য কুখ্যাত, এই জিনিসটা নিশ্চিত ল্যাপটপ নামের কলঙ্ক। সম্ভবত এই পৃথিবীর তাবৎ ল্যাপটপ একে অনবরত অভিসপ্তাত বর্ষণ করে। জিনিসটার কোন বিকার নেই- এ চলে এর নিজের মত করে, গদাইলস্কর চালে।

যথারীতি আবারও বিগড়ে গেল। এইবার এই অবুঝকে কোন ভাবেই মানানো গেল না, বিগড়ে গেল তো গেলই। এই পোড়ার মফঃসলে সাইবার ক্যাফে দূরের কথা কাজ চালাবার মত একটা কম্পিউটারই খুজেঁ পাওয়া মুশকিল। যাদের আছে এরা খুলেও দেখেন না। আমার হাত গুটিয়ে বসে থাকা ব্যতীত কিই-বা করার ছিল? এমনিতে বোমা মারলেও লেখা বের হয় না কিন্তু্ এ সময়টাকে কী হাহাকার, আহারে, কত কিছু যে লেখার ছিল! যেমনটা চলে যাওয়া ট্রেন দেখলে মনে হয় আমার যেন কোথাও যাওয়ার ছিল কিন্তু ট্রেনে চেপে বসলে কেবলই মনে হয়, আমি তো কোথাও যেতে চাই না।

লিখতে না পেরে আমার তখন কেবলই মনে হচ্ছিল আমার যেন হাত থেকেও নেই।


ওদিন হঠাৎ একজন ফোনে জানতে চাইলেন, আচ্ছা, কলম দিয়ে লেখেন না কতদিন? মানুষটা ভালই চমকে দিতে পেরেছিলেন। তাই তো! লম্বা শ্বাসও ফেললাম, আমার মত কলমচির কলমে লেখার সুযোগ কই- পত্রিকার জন্য লেখা, নাতিন, সেই দিন আর নাই! ভরসা, ওয়েব সাইটে লেখা। কম্পিউটারে না-লিখে উপায় কী!


একজন আবার বলেই বসলেন, মিয়া, রঙ্গ করো, তোমার লেখা পড়ার জন্য কে মুখিয়ে বসে আছে। আরে কী মূশকিল, এটা কি আর আমার জানা নাই, বিলক্ষণ জানা আছে। কেউ পড়বে না বলে কি আমি নিজের লেখা নিজে পড়তে পারব না, আজিব! এমন কোন আইন চালু আছে?


যাই হোক, ল্যাপটপের ডাক্তাররাসব আবার আসন গেড়েছেন ঢাকায়। কী যন্ত্রণা, ল্যাপটপ বগলে চেপে ঢাকায়- এ্যাহ, বললেই হলো আর কী! এই হয়েছে এক যন্ত্রণা- গোটা বাংলাদেশ ঢাকার চারপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে। সমস্ত কিছু ঢাকাকেন্দ্রিক। আহ ঢাকা, দেশের ১৫ কোটি লোক সব্বাই ঢাকায় বসবাস করছে, এটা দেখব সেই দিন আর দূরে নাই। যারা এর ব্যতয় করবে, ঢাকায় হিজরত করবে না তাদের কপালে চটি-খড়গ!

শাহাদুজ্জামানের মত অল্প-কিছু মানুষ ঠিকই আঁচ করতে পারছেন ঢাকা কলাপস করবে। তাঁকে আন্তরিক সেলাম।

যেটা ওই পোস্টে লিখেছিলাম:

“কোন এক লেখায় আমি লিখেছিলাম, আমরা সব লাটিম বনবন করে ঘুরাচ্ছি ঢাকাকে কেন্দ্র করে! এটা দ্রুত বন্ধ করতে হবে। ঢাকার উপর থেকে যত দ্রুত সম্ভব চাপ কমানো অতি আবশ্যক। এখান থেকে সরাতে হবে ক্যান্টনমেন্ট, সরকারি যত আপিস। তারচেয়ে জরুরি হচ্ছে কল-কারখানাগুলো সরানো।
সরানো মানে নতুন করে হতে না দেয়া, সরিয়ে নিতে লোভ দেখানো। জোর করে তো এটা করা যাবে না। এ জন্য মোটা মাথা থেকে চিকন বুদ্ধি প্রসব করতে হবে, যারা রংপুর, খুলনায় শিল্প-প্রতিষ্ঠান করবেন তাদের জন্য থাকবে ট্যাক্সসহ অন্যান্য কর আদায়ের বেলায় বিরাট ছাড়। এবং রাষ্ট্রীয় বিশেষ সম্মান থাকবে এদের জন্য। আমার ধারণা, এরা প্রয়োজনে বায়ারকে হেলিকপ্টার ভাড়া করে উড়িয়ে নিয়ে যাবে।‍”

...ঢাকায় ঘন্টার পর ঘন্টা যানজটে গাড়িতে আটকে থাকার চেয়ে দু-চার ঘন্টার জন্য হেলিকপ্টারে চাপতে চাইবেন না এটা আমি বিশ্বাস করি না। আরেকটু আগ বাড়িয়ে যোগ করি, দেখা যাবে, ওই বায়ার হয়তো ফার্স্ট ক্লাসে লক্ষ মাইল প্লেনে ভ্রমণ করেছেন কিন্তু হেলিকপ্টারে চড়ার সৌভাগ্য কখনই হয়নি। যেটা হবে এই দেশে এসে। দেশে ফিরে বায়ার তাঁর পরিচিত লোকজনদের, জনে জনে বলে বেড়াবেন, হেই ম্যান, বুঝলা... গেসিলাম বেংলাডেসে, ইমাজিন, হেলিকাপ্টারে করিয়া ফ্যাক্টারিতে নিয়া গেল। বিলিভ মী, হোল হেলিকাপ্টার হামার জইন্যে...।

Sunday, August 9, 2009

হায় ঢাকা...

ঢাকায় আমার যে অল্প ক’জন বন্ধু বান্ধব আছে, এরা যতোক্ষণ পর্যন্ত স্বীকার না যান, যে আমাকে স্টেশন থেকে নিয়ে যাবেন, ততোক্ষণ পর্যন্ত আমি ঢাকামুখো হওয়ার কথা কল্পনাও করি না! কাউকে পটাতে পারলে আমার আনন্দ দেখে কে, একেবারে হাত পা ঝাড়া! এদের পিছু পিছু আরামসে ঘুরে বেড়াই... আহ, কি যে শান্তি লাগে! ছোটবেলায় বাবার আঙ্গুল ধরে ঘুরে বেড়ানোর মজা পাই!

ঢাকায় গেলে আমার মনে হয় কোটি-কোটি পিপড়া কি এক কাজে-অকাজে সর্বদা ছুটে বেড়াচ্ছে। অনেকের হাসিতে মনিটরের পর্দা কেঁপে উঠবে, জানি কিন্তু এটাই সত্য; আমার কেবল মনে হয়, এই রে, হারিয়ে গেলাম বুঝি!
তার উপর লোকেশন মনে না থাকার বিষয়ে আমি অতি কুখ্যাত!

লেখালেখির কাজে আজিজ সুপার মার্কেটে আমাকে প্রায়ই যেতে হতো, এখনো যেতে হয়। যার কাছে যেতাম তাঁর অফিস ছিল দোতলায়, যদিও ওঠার জন্য অনেকগুলো সিড়ি আছে কিন্তু মনে রাখার জন্য সব সময় আমি একই সিড়ি ব্যবহার করতাম। সমস্য হতো ওয়াশরুম বা বাথরুমে গেলে, ওই ফ্লোরেই কিন্তু একটু দূরে। এখানকার সব রুমগুলো প্রায় এক রকম হওয়ায়, ফিরে এসে আমি ঠিক চিনতে পারতাম না। পরে ভয়ে আর ওয়াশ রুমে যেতে চাইতাম না।

এখানে প্রুফ দেখার জন্য অনেকক্ষণ থাকা হয়, কাঁহাতক আর ব্লাডারের সঙ্গে যুদ্ধ করা যায়! পরে একটা বুদ্ধি বের করলাম, বাথরুম থেকে ফিরে এসে যে সিড়ি পেতাম সোজা নীচে নেমে যেতাম। তারপর সেই আমার অতি পরিচিত সিড়ি দিয়ে শিষ বাজাতে বাজাতে ফিরে আসতাম। একদিন ধরা খেয়ে গেলাম।
যার কাছে যাই, প্রকাশক, তিনি সিড়ি বেয়ে উঠার সময় আমার পথ আগলে দাঁড়ালেন, বললেন, বিষয়টা কি, গেলেন বাথরুমে, আসলেন নীচে দিয়ে!
আমি কথা ঘুরাবার জন্য বললাম, ইয়ে, মানে, নীচে একটা ইয়ে কেনার ছিল আর কি!
তিনি গলা ফাটিয়ে হেসে বললেন, চালবাজি করেন আমার সঙ্গে, এই নিয়ে আজ আপনাকে তিন দিন এই কান্ড করতে দেখলাম!

লজ্জায় আমার মাথা কাটা যায়, ওই মানুষটার আর বুঝতে বাকী রইল না যে আমার স্মরণশক্তি গোল্ডফিশের সমান। কী লজ্জা-কী লজ্জা, সহৃদয় মানুষটা পরে অবশ্য আমার সঙ্গে অফিসের কাউকে দিয়ে দিতেন! আমি একজনের পিছু পিছু বাথরুমে যাচ্ছি, লজ্জার একশেষ! অনেক বলে-কয়ে আগের নিয়মটাই চালু রাখলাম।
এই সহৃদয় মানুষটা বিদায় দেয়ার সময় নীচ পর্যন্ত কেবল এগিয়েই দিতেন না, রিকশাও ঠিক করে দিতেন। প্রথমেই নিশ্চিত হয়ে নিতেন, রিকশাওয়ালা কমলাপুর স্টেশন ঠিক ঠিক চেনে কিনা! লেখার জগতের এই মানুষটার এ ঋণ আমি শোধ করতে পারবো না। 

তবে প্রত্যেকবার কঠিন হুমকিও দিতেন, কে বলে আপনাকে ঢাকা আসতে, নেক্সট টাইমে যেন আপনাকে ঢাকায় যেন আর না দেখি!

ঢাকায় আমার থাকার কোন জায়গা নাই অথচ বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন নেই যে এমন না
(আমি ঠিক জানি না, মনে হয় এমন, শহুরে লোকজনকে বিব্রত করা ঠিক হবে না) তবুও কেন জানি না কোথাও থাকা হয় না। অথচ অনেক যন্ত্রণা করে রাতের ট্রেনে সারা রাত কাবার করে ফিরেছি, পরের দিন ফেরা যাবে না এমন কোন দিব্যি কেউ দেয়নি, তবুও। কখনও সারারাত কমলাপুর স্টেশনে কাটিয়েছি, আমি নিশ্চিত মশারা সবগুলো দাঁত বের করে বলেছে, এমন গাধামানবকেই তো আমরা খুঁজছিলুম...। মশককুলের মধ্যে নিশ্চই এটা রটিয়ে দেয়া হয়েছিল, এমন ভালোমানুষের ছা আজকাল কোথায়! জানি না এইসব নিয়ে মশক মহোদয়গণ কোন সাহিত্য-ফাহিত্য রচনা করেছিলেন কিনা কিন্তু আমার যে ভারী লোকসান হয়েছে এমনও না।
এখানেই আমি পেয়েছি 'খোদেজা' উপন্যাসের একটা চরিত্র সোহাগকে। এর সঙ্গে পরিচয় না হলে আমি জানতেই পারতাম না এইসব অভাগা শিশুদের অধিকাংশই ড্যান্ডি নামের নেশায় আসক্ত।
এখানেই আমি দেখেছি, চাকরির ইন্টারভিউ দিতে আসা শিক্ষিত ছেলেগুলো কেমন করে পত্রিকা বিছিয়ে দিব্যি রাত পার করে দেয়।
তবে মানুষ হিসাবে নিজেকে বড় দীন-হীনও মনে হতো। কী অল্প ক্ষমতা নিয়েই না এসেছি! এই দেশে কী এমন কেউ নাই? এদের জন্য স্টেশনের কাছে একটা ডর্ম খুলবে? যেখানে প্রায় বিনামূল্যে এইসব শিক্ষিত ছেলে-মেয়েগুলো থাকতে পারবে। জটিলতার তো কিছু নাই। যারা চাকরির ইন্টাভিউর কার্ড দেখাতে পারবে তাঁরাই থাকবেন। দস্তরমতো নাম-ঠিকানা, সই-টিপসই যা যা প্রয়োজন রাখা হলো, একটা সফটওয়্যার বানিয়ে ডাটাগুলো রেখে দিলেই হয়। চাকরি পেয়ে পরে এরা সাধ্যমত পরিশোধ করবে। কেউ করবেন, কেউ করবেন না; তাতে কী আসে যায়?
আফসোস, কী একটা চুতিয়া জীবন নিয়েই এসেছি! শালার জীবন, কুতুয়া জীবন, আমি জুতা মারি এমন জীবনের!

মওলানা ভাসানী কর্তৃক স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান ঘোষণা

“...মহান নেতা মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী গতকাল শুক্রবার ঢাকার পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত এক বিশাল জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে সার্বভৌম পূর্ব পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মরণপণ সংগ্রামের দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা করিয়াছেন। 
এই জনসভায় ভাষণ দানকালে তিনি জনগণকে সকল ভীরুতা-জড়তা ত্যাগ করে উক্ত সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়ার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানান।

মাওলানা ভাসানী বলেন, ‘সার্বভৌম পূর্ব পাকিস্তানের এই দাবী আইনসঙ্গত- এই সংগ্রামও আইনসঙ্গত। এটি নিছক হুমকির বা চাপ সৃষ্টির আন্দোলন নয়; স্বাধীন সার্বভৌম পূর্ব পাকিস্তানের এই সংগ্রামের প্রতি এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার শান্তিকামী ও মুক্তিকামী জনগণের পূর্ণ নৈতিক সমর্থন থাকবে।’

এই প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সংগ্রাম জীবন-মরণের সংগ্রাম। পূর্ব পাকিস্তানের ১৪ লক্ষ মানুষ সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে প্রাণ দিয়েছে। আমাদের সংগ্রামের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ করা হলে আরও ১৫/২০ লাখ লোক জীবন দিয়ে হয় অভীষ্ট সিদ্ধ করবে, না হয় মৃত্যু বরণ করবো।’

মওলানা বলেন, ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান বন্ধ করার জন্য কোন সৈন্য দেওয়া হয় নাই। স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান বললে যদি সৈন্য নিয়োগ করা হয়, তাহলে বিরাট ষড়যন্ত্র রয়েছে বলে ধরে নেওয়া হবে।’

ইতিহাসের নজীরবিহীন প্রাকৃতিক ধ্বংসলীলায় বিধ্বস্ত পূর্ব বাংলায় লক্ষ লক্ষ মৃতদেহের উপরে দাঁড়িয়ে যারা নির্বচনী প্রচারণার জন্য কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে চলেছে তাদের সম্পর্ক-এ মওলানা ভাসানী বলেন, ‘তাঁদের ব্যাপারে আমি কিছুই বলতে চাই না, তারা নিজেরোই বলুন যে তারা জনতার শত্রু না মিত্র।’

‘পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা সংগ্রামে’ শরিক হওয়ার জন্য আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবের প্রতি আহ্বান জানিয়ে নব্বই বছরের বৃদ্ধ জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী বলেন, ‘মুজিব, তুমি স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান সংগ্রামে যোগ দাও। যদি আমেরিকা ও ইয়াহিয়ার স্বার্থ-এ কাজ কর তাহলে আওয়ামী লীগের কবর ’৭০ সালে অনিবার্য। ...।'

এই প্রসঙ্গে মওলানা ভাসানী আরও বলেন, ‘যারা বলে নির্বাচনে শতকরা একশটি আসনে জয়ী হয়ে প্রমাণ করবে জনতা তাদের পেছনে রয়েছে তাদের সঙ্গে আমাদের মতের মিল নেই। দক্ষিণ ভিয়েতনামে দেশপ্রেমিক গেরিলারা যখন লড়াই করেছে তখনও সংগ্রামের মুখে নির্বাচন হয়েছে। কিন্তু তার দ্বারা একথা প্রমাণ হয়নি যে নির্বাচনে বিজয়ীরা জনগণের বন্ধু। বরং তারা সাম্রাজ্যবাদ ও স্বৈরাচারের তল্পীবাহক।’

মওলানা ভাসানী বলেন, ‘শুধু শ্লোগানে সংগ্রাম হয় না। হয় মরে যাব, নয়তো সার্বভৌমত্ব পাব এই কি আপনারা চান? বিবেকের কাছে জিজ্ঞেস করুন। যদি কোরবানী দিতে প্রস্তুত থাকেন তবে হাত তুলুন।’
জনতা মুহুমূহু শ্লোগানের সাথে হাত তোলেন। মওলানা ভাসানী তখন নিজেই শ্লোগান দেন, নারায়ে ‌'তকবীর-আল্লাহু আকবর’ ‘স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান-জিন্দাবাদ’। 

সঙ্গে সঙ্গে লক্ষ লক্ষ কণ্ঠ থেকে তাদের প্রিয় নেতার শ্লোগান প্রতিধ্বনি ভেসে আসে।...’।"

(সূত্র: বাংলাদেশ স্বাধীনতা যুদ্ধ, দলিলপত্র দ্বিতীয় খন্ড)

*আমাদেরকে এটা প্রতি পদে পদে শেখানো হয়, দেশের সেরা সন্তানদেরদের কত প্রকারে নিচু-অসম্মান করা যায়। অতি উঁচু শ্রেণীর (এদের দাবী মোতাবেক) প্রিন্ট মিডিয়া মওলানা ভাসানীর মৃত্যুবার্ষিকীর খবরটা ছাপিয়েছে বিজ্ঞপ্তি আকারে। এই লজ্জা লুকাই কেমন করে আসলে কাপড় পরলেই মানুষ হটেনড জাতি থেকে সভ্য জাতি হয়ে যায় না!


সহায়ক সূত্র
১. প্রথম আলো: http://www.ali-mahmed.com/2009/11/blog-post_17.html

**হুবহু-অবিকল, প্রতিটা অক্ষর আবু জুবায়ের নামের একজন, একটা ওয়েবসাইটে কপি-পেস্ট করে দিয়েছেন।
যেখানে প্রথম আলোর মত পত্রিকা ওয়েবসাইট থেকে একটা লেখা নিয়ে 'ওয়েবসাইট অবলম্বনে' লিখে দায় সারে সেখানে এই মানুষটাকে কী আর বলব! তবে সোর্স উল্লেখ করলে আকাশ ভেঙ্গে পড়ত বলে আমার মনে হয় না। এ অন্যায়!

গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি, গরীব মানুষ নামের নিক, ব্লগারের প্রতি যিনি এই বিষয়টা উল্লেখ করায় আমারও জানা হলো।

Wednesday, August 5, 2009

আমরা দুধ বিক্রি করে শুটকি খাওয়া জাতি

বকুল আক্তার (দুলা মিয়ার সেই মেয়ে)



মুক্তিযোদ্ধা দুলা মিয়াকে (link)নিয়ে একটা লেখা লিখেছিলাম।
এই অসমসাহসী বে-সামরিক মানুষটার সাহস দেখে সামরিক লোকজনরা পর্যন্ত হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলেন। এমনকি সাবেক সেনাপ্রধান শফিউল্লাহ পর্যন্ত!
যুদ্ধে এই মানুষটার নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে গিয়েছিল। গামছা দিয়ে বেঁধে গুলির পর গুলি চালিয়েছেন, পিছ-পা হননি।

একজন মানুষের এমন সাহস রগরগে মুভিকেও হার মানায়! অথচ আমাদের দেশে নাকি ভাল স্ক্রিপ্টের অভাব! মানুষটা যুদ্ধে গিয়েছিলেন তাঁর ছোট্ট মেয়েটির তাগিদে। পরবর্তীতে এই মেয়েটির সম্বন্ধে কোথাও কোন তথ্য পাইনি। কিন্তু খুব ইচ্ছা করছিল মেয়েটির সম্বন্ধে জানার। সেই ছোট্ট মেয়েটি এখন কেমন আছেন- কেমনই বা আছেন দুলা মিয়া নামের সিংহবলোকনন্যায় মানুষটা?

দুলা মিয়া বলেছিলেন, তিনি কুমিল্লার শালদানদিতে থাকেন। কিন্তু শালদানদি তো বিশাল এলাকা এবং পাহাড়ি অঞ্চল। কোথায়-কোথায় খুঁজব? তবুও বেরিয়ে পড়ি।
শালদানদির কেউ কিচ্ছু জানে না এই মানুষটা সম্বন্ধে। ‘অষ্টজঙ্গল’ নামের একটা জায়গায় গিয়ে পৌঁছি। নামের মতই জায়গা, ঝোপ-জঙ্গলের অভাব নাই! একজন মসজিদ রং করছিলেন, তিনি চিনতে পারলেন, 'আরে ওই ভটলা (মোটা) মানুষটা'।
মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে অপমানসূচক কোন মন্তব্যে এখন আর অবাক হই না। তবুও এখন এই কথাটা বুকে ধক করে লাগে, চোখ ভিজে আসে। এমন একজন মানুষের এমন পরিচিতি, তাঁর প্রতি এই অশ্রদ্ধা- হা ঈশ্বর! এলাকার লোকজনরা জানেই না এই মানুষটা দেশের জন্য কী করেছেন! কেন এদের জানানো হয়নি, এই দায় অবশ্যই আমাদের উপর বর্তায়। 
অনেক চেষ্টায় তাঁর কবর নামের যে স্থান খুঁজে বের করি, নামফলক দূরের কথা কোন সামান্য চিহৃও নাই। এটা এবং জঙ্গলের মধ্যে কোন পার্থক্য নাই। অথচ পাশেই কোন এক অখ্যাত ফকিরের সমাধি দস্তরমতো টিন-ছনের ঘর বানিয়ে লালশালু দিয়ে মুড়িয়ে রাখা হয়েছে। ভাগ্যিস, মখমল দিয়ে যে মুড়িয়ে রাখা হয়নি!
যে দেশের যে দস্তুর- এতে অবাক হওয়ার কিছু নাই। আমরা দুধ বিক্রি করে শুটকি খাওয়া জাতি, আমাদের আচরণে এর ব্যত্যয় হবে কেন? আমরা অসভ্য না হলে এমন একজন অগ্নিপুরুষকে এমন অবহেলায় ফেলে রাখব কেন? আর কেনই বা এক অখ্যাত ফকিরের সমাধি মাথায় তুলে রাখব! এখন (১৬ ডিসেম্বর, ২০০৯) এই ফকিরের সমাধি পাকা করা হচ্ছে, ক্রমশ জৌলুশপূর্ণ হবে। 

কিন্তু তাঁর সেই ছোট্ট মেয়ের খোঁজ কেউ দিতে পারে না। কেউ বলল, এরা এখান থেকে তল্পিতল্পা গুটিয়ে ঢাকায় চলে গেছে। ভাগ্যক্রমে খোঁজ পাওয়া যায়, তিনি নাকি বেড়াতে এসেছেন। অবশেষে সেই মেয়েটির মুখোমুখি হওয়া। বকুল আক্তার নামের সেই ছোট্ট মেয়েটি আজ আর ছোট্ট নাই, অকালে বুড়িয়ে গেছেন। যুদ্ধের সময়কার কোন স্মৃতিই আজ আর তাঁর মনে নাই। তাতে কিছুই যায় আসে না- আমাদের তো মনে আছে। এও কী কম পাওয়া?
কিন্তু বারবার ঘুরেফিরে যে কথাটা বলছিলেন:
'আমার কোন টাকা-পয়সার দরকার নাই। আমার বাপেরে একটা খেতাব দিল না ক্যান? তাইনে কী দেশের লাইগা যুদ্ধ করে নাই'?
আমি আকাশপানে তাকিয়ে থাকি- একজন নপুংসক আর কী-ই বা করতে পারে...। আমার কাছে অসংখ্য প্রশ্নের মতো এটারও কোন উত্তর নাই! কতশত প্রশ্ন, এর উত্তর কে দেবে?
বীরশ্রেষ্ঠদের মধ্যে একজনও সিভিলিয়ান নাই, কেন?
একজন কমান্ডো মুক্তিযোদ্ধা ঠেলা চালান, কেন? 
আমি অতি সামান্য মানুষ হয়েও দুলা মিয়ার সেই ছোট্ট মেয়েটির খোঁজ এত বছর পরও বের করতে পারলে, এই দেশের দুর্ধর্ষ মিডিয়া ভাইয়ারা বেসুমার টাকা, হাতি-ঘোড়া থাকার পরও দুলা মিয়াকে খুজে বের করতে পারলেন না, কেন?
যে জজ সাহেব, পাকিস্তান আর্মির হাতে তার প্রতিবেশীর ফুটফুটে মেয়েকে তুলে দিয়েছিল সেই জজ সাহেবের খোঁজ আজ-অবধি বের করতে পারলেন না, কেন? একজন মুক্তিযোদ্ধা আত্মহত্যা করার জন্য ১৬ ডিসেম্বর বেছে নেন, কেন? তাঁর লাশ ১২ ঘন্টা গাছে ঝুলে থাকবে, কেন? 
বীরাঙ্গনা রিনার এইসব প্রশ্নের উত্তর কে দেবে, ওই মানুষটা আজ কোথায়? আমরা জানি না, কেন?
আসলে কালে-কালে মুক্তিযুদ্ধের আবেগে এখন একটি পণ্য!

(এখানে বীরপ্রতীক আলমগীর সাত্তারের বক্তব্যটা প্রাসঙ্গিক বিধায় তুলে দিচ্ছি:
'...খেতাব দেয়ার সময় কেন এত কার্পণ্য করা হল? খেতাবপ্রাপ্তদের বেলায় সামরিক বাহিনীর সদস্যদের সংখ্যাই বেশী এবং এটাই স্বাভাবিক। কারণ সামরিক বাহিনীর সদস্য যারা পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে ছিলেন, তাদের প্রশিক্ষণ ছিল পর্যাপ্ত। এরপরও আমি বলব, বেসামরিক মুক্তিযোদ্ধারাই খেতাব পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বেশী। খেতাবপ্রাপ্তির ব্যাপারে সুপারিশ করার মত যাঁরা উচ্চপদে আসীন ছিলেন, তাদের অবহেলার কারণেই হয়েছে এমনটা।
...তবে ব্যতিক্রমি সেনানায়ক ছিলেন মুক্তিবাহিনীর ডেপুটি চীফ অভ স্টাফ এয়ার ভাইস মার্শাল এ কে খন্দকার। তার মত উদার যদি অন্য সেক্টর কমান্ডাররা হতেন, তাহলে অবশ্যই খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা অনেক বেশী হত। অনেক সেক্টর কমান্ডারই মনে হয় বুঝতে পারেনি যে, স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ বারবার হয় না...।')
সহায়ক সূত্র:
tml

*আমাকে সঙ্গ দেয়ার জন্য গভীর কৃতজ্ঞতা জানাই: দুলাল ঘোষ, সোহরাব হোসেনকে।

**ঋণ: 'দুধ বিক্রি করে শুটকি খাওয়া জাতি' এই বাক্যটা বলেছিলেন মাহাবুব আহমাদ। বাক্যটা ঠিক তাঁরও না, তাঁর বাবার। তিনি তাঁর বাবার মুখে শুনেছিলেন।

***দুলা মিয়ার একটা সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন এইচ এম. ইকবাল। ****Ripon Majumder আজই জানালেন, এইচ. এম. ইকবাল-এর সাক্ষাৎকারের এই লিংকটা কাজ করছে না (মানুষটার প্রতি কৃতজ্ঞতা, নইলে আমার জানাই হতো না)। বাস্তবেও দেখছি তাই- এটা তিনি যেখানে লিখেছেন সেখানকার সমস্যা! কারও লিংক ধরে পাঠক পড়বেন এটাই নিয়ম। কিন্তু এখানে এটা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক চেষ্টার পর এই লেখাটি উদ্ধার করা গেছে।
এই সাক্ষাৎকারটি এতোই গুরুত্বপূর্ণ যে এটাকে হারাতে দেয়া চলে না। জনাব, এইচ. এম. ইকবাল-এর কাছ থেকে অনুমতি নেয়ার কোনো উপায় আপাতত দেখছি না তাই নিরুপায় হয়ে এইচ. এম. ইকবাল-এর নেয়া এই সাক্ষাৎকারটা এখানে যোগ করছি এইচ. এম. ইকবাল-এর নেয়া এই সাক্ষাৎকার:
"নাম : দেলোয়ার হোসেন দুলা মিয়া
গ্রাম : অষ্টজঙ্গল
ডাক : সালদা নদী
ইউনিয়ন : বায়েক
থানা : কসবা
জেলা : ব্রাহ্মণবাড়িয়া
১৯৭১ সালে বয়স : ২৮/২৯
১৯৭১ সালে পেশা : মুজাহিদ বাহিনীর সদস্য
বর্তমান পেশা : অসুস্হ অবস্হায় পঙ্গুত্ব জীবন যাপন।
মুজাহিদ বাহিনীর সদস্য দেলোয়ার হোসেন দুলা মিয়া ছিলেন পাকিস্তানিদের ত্রাস। হরসপুর,মনতলা, মাধবপুর,জগদীশপুরসহ ২৭টি অপারেশনে অংশ নিয়ে প্রতিটিতেই সাফল্য অর্জন করেছেন তিনি। পাকিস্তানিদের গুলিতে দুলা মিয়ার নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে পড়লেও তিনি তাঁর মাথায় বাঁধা কালো কাপড় দিয়ে কোনো রকমে পেট বেঁধে একাই একটি মাত্র হালকা মেশিনগান দিয়ে পাক অগ্রযাত্রা স্তব্ধ করে দিয়েছিলেন।
প্র: ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাত্রে পাকবাহিনীর হামলার পর আপনি কি করলেন? 
উ: ২৫শে মার্চ দিবাগত রাত্রে পাকবাহিনী ঢাকার রাজারবাগ,কুমিল্লা পুলিশ লাইন ইত্যাদি স্হানে আক্রমণ করে। আমরা কিন্তু পরদিন ঘুম থেকে উঠে কিছুই জানতে পারি নাই। সকাল বেলা যখন আমরা সালদা নদী স্টেশনে বসে আমি তখন দেখলাম দুইজন পুলিশ কাপড় গায়ে নাই শুধু হাফপ্যান্ট পরা আসতেছে। তখন জিজ্ঞাসা করলাম ভাই আপনারা কারা? উত্তর দিল ভাই আমরা পুলিশ। কুমিল্লা পুলিশ লাইন থাইকা ভাইগা আসছি। আমাদের পুলিশ লাইনে কোনো লোক আছে বইলা মনে হয় না। ওরা শেষ হইয়া গেছে। আমাদের উপর আক্রমণ করেছে। তখন আমরা নিকটস্থ সালদা নদী ই.পি.আর ক্যাম্পে যাইয়া বাঙালি যারা ছিলেন তাদের কাছে বললাম যে এখন আর বসে থাকার সময় নাই। এখন কাজ প্রয়োজন। তখন তারা বলল যে আমাদেরকে সহযোগিতা করেন।
এইখানে তিনজন অবাঙালি সৈন্য ছিল। আমরা তাদেরকে মেরে ফেলি। তৎকালিন ইপিআরের কোম্পানি কমান্ডার ছিলেন সুবেদার আতাউর রহমান চৌধুরী। উনার বাড়ি ছিল সিলেট। উনার নেতৃত্বে তখন আমরা বড়জোলা হয়ে মতিনগর দিয়া ইন্ডিয়াতে উঠি। ওখান থেইকা ট্রাকযোগে আমরা তেলিয়াপাড়া চলে যাই। মেজর সফিউল্লাহ সাব তখন ২য় বেঙ্গলের কমান্ডার। আমরা ৭/৮ জন উনার সাথে যোগ দেই। ঐখানে যাইয়া আমরা সেকেন্ড বেঙ্গলের সাথে জড়িত হইয়া যাই। সেখান থেকেই আমরা লড়াই শুরু করি।
তারপরে আমরা চলে যাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া। এরপর ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে চলে যাই আশুগঞ্জ,আশুগঞ্জ থেকে চলে যাই লালপুর বাজার। সেখানে যাইয়া আমরা পাঞ্জাবিদের একটি লঞ্চ ধ্বংস করি। তারপরে আমাদের উপর বিমান অ্যাটাক হয়। সারাদিন বিমান অ্যাটাক হওয়ার পর সন্ধ্যাবেলা আমরা আবার ফিরে আসি। আইসা আবার আমরা মাধবপুর ডিফেন্সে চইলা যাই।

প্র: ১৯৭১ সালে আপনি আক্রান্ত হয়েছিলেন কি?
উ: ১৯৭১ সালের জুন অথবা জুলাই মাসের মধ্যেই আমি হরসপুর এবং মনতলার মাঝামাঝি ডেলটা কোম্পানিতে ছিলাম। আমার কোম্পানি কমান্ডার ছিলেন লে: হেলাল মোরশেদ। হরসপুর রেলস্টেশনের পশ্চিম দিকে একটি বাজার আছে। সেই বাজার থেকে আমরা গেছিলাম পাকবাহিনীর যে ঘাঁটি ছিল সেখানে আক্রমণ করার জন্য। আমরা যাওয়ার আগেই রাজাকার যাইয়া ওদেরকে খবর দিল যে মুক্তিবাহিনীরা আসতেছে আক্রমণ করবে। এখবর আমরা জানি না। তখন তারা যেখানে ছিল সেখান থেকে দূরে সরে যায়। ঐখানে তাদেরকে আমরা আর পাই নাই। রাতারাতি পাকিস্তানিরা আমাদের পিছন দিকে হরসপুর স্টেশনের দুইদিকে,হরসপুর মনতলার মাঝামাঝি দিয়ে এডভান্স হইর এক কোম্পানি,অন্যদিকে হরসপুর এবং মুকুন্দপুরের মাঝামাঝি দিয়েও এক কোম্পানি এডভান্স হয়ে গেল।
ভোর রাত্রে যখন আমরা লক্ষ্য করলাম যে আমাদের উপর হয়তো কাউন্টার অ্যাটাক হইতে পারে তখন আমরা পিছু হটে আসি। তখন আমি আমার কোম্পানির ডান দিকে ছিলাম। যখন রায়গঞ্জে পৌঁছি তখন আমার হাতে ছিল একটা হালকা মেশিনগান। আমি মেশিনগান নিয়া ঐখানে এক ঝোঁপের ভিতর বসে থাকি।
এমন সময় দেখি পাকবাহিনী আমার ১০০ গজের মধ্যে আইসা পড়ছে। তখন আমি ভাবলাম যে এখন যদি আমি গুলি না কইরা চলে যাই তাইলে আমার কোম্পানিটা পুরা উড়ে যাবে। তখন মনে করি যে আমি মরে যাই তবু কোম্পানি বেঁচে থাক। তখন আমি ফার্স্ট ফায়ার করি। আমার ফায়ারের সাথে সাথে যারা আমার সামনে ছিল ৭/৮ জন তারা সব শেষ হয়ে গেছে। তখন ঐখান থেইকা তারা গোলাগুলি আরম্ভ করলো। দুই ঘন্টার মতো গোলাগুলি চলে। আমার কোম্পানি গোলাগুলির আওয়াজ শুনে একটু বাম সাইডে যাইয়া ইন্ডিয়ার দিকে চলে যায়।
পাক সৈন্যরা আমাকে তখন তিনদিক থেকে ঘেরাও করে ফেলে। ঘেরাও করে তারা আমাকে ধরার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে। আল্লারই হুকুম আমারও জান বন্ধ হয় নাই। ধরতে পারে নাই। তখন আমার বাম সাইড থেইকা গুলি আইসা আমার পেটে লাগে। পেটের নাড়িভুড়ি বেশ খানিকটা বেরিয়ে যায়। তখন তো আমার মাথায় একটি কালো কাপড় ছিল। সে কাপড় দিয়ে পেটটা বেঁধে ফেলি। তারপর গুলি চালাতে থাকি একা। তারা আর এগুতে পারে নাই এবং পিছু হটে যায়। তখন সকাল অনুমান সাড়ে ৮টার সময় আমার মনে হয় সেক্টর কমান্ডার মেজর সফিউল্লাহ সাহেব নিজেই গাড়ি নিয়া আসেন এবং বললেন যে,
'এইখানে ফায়ার করেছে কে? মোরশেদ, তোমার কোম্পানিতে কে নাই'?
তিনি বললেন, 'দুলা মিয়া নাই'।
তখন আমাকে খোঁজার জন্য সফিউল্লাহ সাহেব লোক পাঠায়। এসব আমি পরে শুনছি। তখন উনি সহকারে আসেন। আইসা উনি আমার পাশে দাঁড়ান। তাঁকে দেখেই আমার শরীরটা দুর্বল হয়ে যায়। তখন আমাকে নিয়ে যায় এবং চিকিৎসার ব্যবস্হা করে।

প্র: আপনি কেন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করলেন?
উ: আমি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি এই জন্য যে আমরা বাঙালি,আমরা যুগে যুগে বাঙালি। কিন্তু কোনদিনও আমরা বাঙালিরা ক্ষমতায় বসতে পারি নাই। আমরা বাঙালি জাতি হিসাবে পৃথিবীতে বেঁচে থাকবো এবং বাঙালি হিসাবে সারাবিশ্বে আমরা প্রতিষ্ঠিত হব এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যারা আসবে তারা যেন স্বাধীন বাঙালি জাতি হিসাবে পরিচিত হইতে পারে এবং স্বাধীন জাতির পতাকা তুলে তারা দাঁড়াইতে পারে সেইজন্য আমরা যুদ্ধ করেছি।

প্র: যুদ্ধ চলাকালীন সময় আপনার কোনো মর্মান্তিক দুর্ঘটনার কথা মনে পড়ে কি?
উ: যুদ্ধ চলাকালে মর্মান্তিক দুর্ঘটনার কথা একটাই মনে পড়ে। আমার গুলি লাগছে সেটাও আমি মর্মান্তিক মনে করি না। আমার তৎকালীন সহকারী এক সৈনিক ছিল। তার নাম ছিল তাহের। তার বাড়ি হইল আমার বাড়ির পাশে মাদলা। তার বাবার নাম হইল আবদুল মজিদ। থানা কসবা। পোস্ট অফিস সালদানদী এবং জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়া। সে আমার সাথে ছিল।
আমার মাধবপুর থেকে আইসা জগদীশপুর আবার ডিফেন্স নেই। মাধবপুরে সকাল থেকে ১২টা পর্যন্ত লড়াই করার পর আমরা টিকতে পারি নাই। পাল্টা আক্রমণ করার মতো আর হাতিয়ার আমাদের কাছে ছিল না। তাই ১২টার সময় আমরা পিছন দিকে হটে আসি। আইসা আমরা জগদীশপুরে ডিফেন্স নেই। তখন সন্ধ্যাবেলা আমাদের এমুনেশন ছিল না। আমরা তাহেরকে এবং সেকেন্ড বেঙ্গলের ড্রাইভার গফুরকে ডেকে পাঠাইলাম যে তোমরা এমুনিশন এবং কিছু মর্টারের গোলা নিয়া আস। তখন তারা রাত্র প্রায় ১১ টার দিকে তেলিয়াপাড়া থেকে ৫০টা দুই ইঞ্চি মর্টারের গোলা এবং ৫০০০ রাউন্ড গুলি নিয়া আসতেছিল।
কিন্তু তেলিয়াপাড়া থেইকা মন্ত্ররা রোড হয়ে সুরমা গ্রামের হারুলিয়া সেতুর নিকটে আইসা গাড়িটা খুঁটির সাথে ধাক্কা লাইগা উল্টে যায়। উল্টে যাওয়ার পরে ড্রাইভার গফুর গাড়ি থেইকা লাফ দিয়ে পড়ে যায় এবং তাহের পড়ার সাথে সাথে তার একটা হাত গাড়ির নিচে চাপা পড়ে। তখন গফুর গ্রামবাসীর ডাক দিলে তারা বাতি নিয়া আসলো। সে বললো যে আপনারা গাড়ির কাছে আসবেন না। কেননা গাড়ির ট্যাঙ্কির পেট্রোল মাটিতে পড়ে গেছে। আপনারা বাতি দূরে রাখেন।
যেখানে গাড়িটা উল্টে পড়ছে সেদিকটা ছিল একটু তেরছা ঢালু। ঢালু জাগাতে পেট্রোল ভাইসা আইসা একটা নালা আছিল সেই নালা দিয়া পেট্রোলগুলা আসতাছে। এদিকে ঐ গ্রামের লোকগুলা ওখান থেইকা মনে করেন বিশ গজ দূরে ঐ নালার যে আইল ছিল সেই আইলের পাশে মশাল বাতিটা রাইখা আসতাছে। এই সময় পেট্রোল নিচ দিয়া যাচ্ছে। হঠাৎ ঐ পেট্রোলে আগুন লাইগা যায়। আগুন ধইরা যাবার সাথে সাথে ঐ পেট্রোল যেভানে যেদিক দিয়া আসছে সেই দিক দিয়া একদম গাড়ির কাছে চইলা গেছে। গাড়ির কাছে চইলা যাবার পর তখন গাড়িতে আগুন ধইরা যায়। তখন পাবলিক দূরে সরে যায়।
গাড়িটা আগুনে পুইড়া ছারখার হইয়া গেল এবং সেই সাথে তাহেরও মর্মান্তিকভাবে মারা গেল। তার হাত পাগুলা বাঁকা হইয়া একসাথে হইয়া গেছে। এই ধরনের ঘটনা পুরা নয় মাসের যুদ্ধে আমি দেখিনি। বহুত লাশ আমি টেনেছি। কিন্তু এই ধরনের ঘটনা আমি আর দেখিনি। আমি ২৭ টি অপারেশনে অংশ নিয়েছি প্রতিটিতে সাকসেসফুল হয়েছি।

প্র: তখন আপনার কমান্ডার কারা ছিলেন?
উ: আমার সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর সফিউল্লাহ সাহেব। তারপরে নাসিম সাহেব ছিলেন তারপর হেলাল মোরশেদ,সুবেদ আলী ভূঁইয়া,ক্যাপ্টেন মতিন উনি ছিলেন। এরপর ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম ছিলেন।

প্র: তখন মুক্তিবাহিনী সম্পর্কে জনগণের মনোভাব কি ছিল?
উ: তখন জনগণ মুক্তিবাহিনীর খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে যথেষ্ট সাহায্য করছে। স্বাধীনতার জন্য তারা আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। মুক্তিবাহিনী সম্পর্কে জনগণের মনোভাব খুবই ভাল ছিল।

প্র: আপনার গ্রাম বা এলাকায় কারা রাজাকার ছিল?
উ: আমার গ্রামে রাজাকার ছিল না। তবে মুসলিম লীগ এবং পাকিস্তানের সাপোর্টার কিছু ছিল। তারা তেমন একটা ক্ষতি করে নাই। তখন তাদের দ্বারা উপকারও হয়েছে। তারা অনেক লোককে বাঁচাইয়াও আনছে। যদিও রাজাকার শব্দটা খারাপ তবে সব লোক কিন্তু খারাপ কাজ করেনি।

প্র: যুদ্ধের শেষে গ্রামে ফিরে কি অবস্থা দেখলেন?
উ: ১৬ই ডিসেম্বরতো আমরা স্বাধীনতা পেলাম। ডিসেম্বরের ২৭/২৮ তারিখের দিকে সালদা নদী আসছি। আইসা তখন সালদা নদীর অবস্হা দেখলাম যে বাড়িঘর দরজা যা ছিল জ্বালাই পুড়াই ছারখার করছে। ব্রিজ যা ছিল সব ভাইংগা ফেলছে। মসজিদ, মন্দির সবগুলা তারা চুরমার করে দিয়েছে।

প্র: আপনার অস্ত্র কি করলেন?
উ: আমি তখন ব্রাহ্মণবাড়িয়া আসছি। আইয়া মতিন সাহেবের কোম্পানিতে ছিলাম। মতিন সাহেব ছিলেন এইখানে। তারপর হায়দার সাহেব ছিলেন ফোর বেঙ্গলে। হায়দার সাহেব তখন কুমিল্লার কোর্টবাড়িতে ১৩ বেঙ্গল রেজিমেন্ট তৈরি করেন। তখন উনি মতিন স্যারকে জানাইলেন যে এখান থেইকা এক কোম্পানি লোক আমাদের দিতে হবে। মতিন সাহেব বললেন যে তোমরা কোর্টবাড়ি চলে যাও। তখন আমরা এক কোম্পানি লোক কোর্টবাড়ি যাইয়া ১৩ বেঙ্গল খাড়া করাই। অস্ত্র আমাদের সাথেই ছিল। ১৩ বেঙ্গলে রইলাম আমরা।

প্র: যুদ্ধের শেষে আপনি কি করলেন?
উ: যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার পরে ১৩ বেঙ্গলে গেলাম। ১৩ বেঙ্গলে যাওয়ার পর কিছু দিন ঐখানে চাকরি করলাম। বৎসর দুয়েক করলাম। করার পরে আর ভাল লাগে না। আমার হাত-পা তো গুলিতে বিধ্বস্ত। তখন পিটি প্যারেড করতে, চলতে ফিরতে মনমানসিকতা তেমন ভালো ছিল না। তখন বাড়িতে চলে আসি।

সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর নাম : এইচ. এম. ইকবাল
সাক্ষাৎকার গ্রহণের তারিখ : ২৫ আগস্ট ১৯৯৬
ক্যাসেট নম্বর : কসবা ৪"
WhatsApp