Search

Monday, August 31, 2026

বিকাশ—রক্তচোষা এক জোঁকের নাম!

লেখক: Irfan sheikh

"বিকাশ আপনার কাছ থেকে তিন জায়গায় অর্থ উপার্জন করে। 

১. আপনার আমানত অন্য কাউকে ঋণ দিয়ে সেই সুদ থেকে আয়।

২. ক্যাশ আউটের ক্ষেত্রে ১.৮৫% চার্জ কেটে নেয়।

৩. প্রতিবার সেন্ড মানি করলে সেখান থেকে চার্জ কেটে আয় করে।

এর বাইরে রেমিটেন্স, মুদ্রা বিনিময়, পেমেন্ট, ফোন রিচার্জ, ডোনেশন, রিটেইল ইত্যাদি ক্ষেত্র থেকে বিকাশের আয় হয়। তবে সে আলাপে আর না গেলাম।

প্রধান ৩ উপার্জন মাধ্যমের ৩ নম্বরটা খেয়াল করুন। একটা টাকা যতবার হাত বদল হবে, ততবার ১০ টাকা কেটে নিবে বিকাশ। ধরুন, ১০০ টাকা ক্যাশ ইন করে পরে আপনার মাকে পাঠালেন। সে পাবে ৯০ টাকা। আপনার মা সেই টাকা তার বুয়াকে পাঠালে, বুয়া পাবে ৮০ টাকা। বুয়া এটা ক্যাশ কাউট করলে ফাইনালি পাবে ৭৮.৫২ টাকা।

হাত বদল আরও বেশি হলে বুয়া ৫০-৬০ টাকা পেতো। 

এখানে থিওরিটিকালি টাকাটা ৩ বার হাত বদল হয়েছে। কিন্তু প্র্যাকটিকালি টাকাটা হাত বদল হয়নি। বিকাশের সার্ভারের অভ্যন্তরীণ সিস্টেমে জাস্ট দুয়েকটা কোড এদিক সেদিক হয়েছে। আপনার একাউন্ট থেকে ইলেক্ট্রিক মানির কোড নিয়ে সে আপনার মায়ের একাউন্টে সমন্বয় করেছে। পরে বুয়ার একাউন্টে করেছে। 


আপনি যে টাকাটা ব্র্যাক ব্যাংকের [] বিকাশকে দিয়েছেন, সেটা আদতে কোনদিন ট্রান্সফার হয়নি, ওটা ব্র্যাক ব্যাংকেই রক্ষিত আছে। কেবল ক্যাশ আউটের সময়ই টাকাটা সত্যিকার অর্থে ট্রান্সফার হয়।

ক্যাশ আউট বাদে সেন্ড মানির যে লেনদেন, এটাকে বলে 'পিটুপি ট্রানজ্যাকশন'। ভারতে ১ লাখ রুপি পর্যন্ত এই পিটুপি লেনদেন ফ্রি। মিয়ানমারে পুরোপুরি ফ্রি। থাইল্যান্ডে ৫০০০ বাথ মানে ১৩০০০ টাকা পর্যন্ত ফ্রি। ভিয়েতনামে সম্পূর্ণ ফ্রি। বিকাশে ফ্রি না। প্রতিবারে ১০ টাকা।

ডাকাতিটা এখানেই শেষ হলে পারতো। হয়নি। এর চেয়ে ভয়াবহ একটা কাজ করেছে বিকাশ। 

আগে পিটুপি লেনদেনে টাকার পরিমাণ কম হলে বিকাশ কম টাকা চার্জ করতো। টাকার পরিমাণ বেশি হলে, শতকরা হিসাব করে বেশি টাকা চার্জ করতো। অর্থাৎ ২০০ টাকায় চার্জ কম। ৫০০০ টাকায় চার্জ বেশি। 

কিন্তু এখন আর সেটা করে না। সবার জন্য এক রেট। ১০০ টাকা লেনদেন করলেও ১০ টাকা। ৪০ হাজার টাকা লেনদেন করলেও ১০ টাকা। এর মাধ্যমে বিকাশ বলতে চাচ্ছে, দ্যাখেন আমরা শত-শত টাকা চার্জ করছি না। যত বড় এমাউন্টই পাঠান, মাত্র ১০ টাকার বিনিময়ে আপনার টাকা আমরা পৌঁছে দিবো।

কিন্তু আপনি শেষ কবে ৪০ হাজার টাকা বিকাশে লেনদেন করেছেন? ১০ হাজার টাকার উপরে বাঙলাদেশের সাধারণ মানুষ ও অফিসগুলো বিকাশে লেনদেন করে না, পলিসির কারণে করতে পারে না। 

বিকাশ মূলত ছোট-ছোট লেনদেনের অ্যাপ। সাধারণ মানুষ, গার্মেন্টস কর্মী, ছাত্র, কৃষক একে অন্যকে ২০০ টাকা, ৪০০ টাকা এভাবে পাঠায়। রিকশায় ভাংতি না-থাকলে বিকাশে দেয়। রাইড শেয়ারিং অ্যাপে ভাড়া দেয়। সব রকম ভাংতির সংকটে বিকাশ ব্যবহার করে। সেলামি, বখশিশ, চটজলদি যে কোন ২০০-৫০০ টাকা পাঠাতে দেশের মানুষের একমাত্র একচেটিয়া সম্বল হলো বিকাশ। আর এই প্রতিটা ট্র্যানজেকশনে বিকাশ নেয় ১০ টাকা।

রিকশাওয়ালাকে ৭০ টাকা ভাড়া দিলেও ১০ টাকা। সেলামিতে ২০০ টাকা দিলেও ১০ টাকা। 'দোস্ত একটু আটকে গেছি, ২০০ টাকা সেন্ড মানি কর', এই ক্ষেত্রেও ১০ টাকা! 

বিকাশের এই ইউনিভার্সাল রেইটের ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালনারেবল হলো গরীব মানুষ। যেহেতু প্রতিদিন ৪-৫টা লেনদেনে মাত্র ৫০ টাকা ব্যয় হচ্ছে, সে খেয়াল করে না। কিন্তু ক্যাশ আউট চার্জ বাদ দিয়েই সারা দেশের নিম্নমধ্যবিত্ত ৫ জনের একটি পরিবার মাসে ১৫০০ টাকা বিকাশকে দিচ্ছে। এটা সেই পরিবারের বিদ্যুৎ বিলের চেয়ে বেশি!

বাঙলাদেশে বহু প্রতিষ্ঠান আছে যারা মধ্যবিত্ত আর উচ্চ মধ্যবিত্তদের লুট করে। যেমন উবার অথবা লালা মুভ। 

কিন্তু বিকাশের সিস্টেম তৈরিই হয়েছে ২০০-৪০০ লেনদেন করা গরীব মানুষকে নিপীড়ন করতে। একদম গরীব মানুষকে টার্গেট করে তারা এই সিস্টেম ডেভলপ করেছে। এই মুহূর্তে এর চাইতে গরীব বিধ্বংসী কোন ঐতিহাসিক পণ্য বা সেবা মনে পড়ছে না।

৩৫০ এমপির মধ্যে একটা প্রাণী নাই যে এটা নিয়ে সংসদে অর্থমন্ত্রীকে প্রশ্ন করবে। তাদের সবার রাজনীতি জনবিচ্ছিন্ন। তাদের রাজনীতি শুধু অর্থহীন জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় পরিচয় আর সংবিধান নিয়ে।

একদা ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকে দেখেছিলাম, রাষ্ট্রীয় মূলনীতি সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার হবে নাকি গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ আর ধর্মনিরপেক্ষতা হবে তা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো কামড়াকামড়ি করছে। 

আমি প্রচন্ড বিতৃষ্ণা নিয়ে বের হয়ে গেলাম। আমার বের হওয়াতে কিচ্ছু যায় আসে না। কিন্তু এটলিস্ট আমি জেনে গেছিলাম, এরা আমাদের লোক না। এরা আমাদের রাজনীতিটা করে না।"

লেখক: Irfan sheikh

(https://www.facebook.com/share/1EHfX5nqXn/ ) 

সূত্র:

১. ব্র্যাক ব্যাংক, লাশ-বানিজ্য-পদক:  https://www.ali-mahmed.com/2010/04/blog-post_23.html?m=1

Sunday, August 30, 2026

আহারে জীবন, প্রবাস-জীবন!

লেখক: বিল্লাল হোসাইন (https://www.facebook.com/share/1BhrxyBktX/ ) 

"গত সপ্তাহের বুধবার রাতে টোকিওর 'ওয়াসেদা ইউনিভার্সিটি' থেকে সেমিনার শেষ করে ডরমেটরিতে ফিরছি। সেমিনার শেষে ক্যাম্পাস দেখতে দেখতে একটু লেট হয়ে গেছে, আবার 'সেইবু লাইন-এর ট্রেন লেট করায় আরো লেট হয়ে গেছে। 'নাকানো' স্টেশনে ট্রেন চেঞ্জ করতে হবে। রাত প্রায় ১১টা বাজে, সকাল সাড়ে ১০টার পর আর কিছু খাওয়ার সুযোগ হয়নি!

তাই ট্রেন চেঞ্জ না-করে স্টেশন থেকে বের হলাম। স্টেশনের সামনেই একটা 'লসন কনভেনি' স্টোর আছে, উদ্দেশ্য হলো একটা 'টুনা অনিগিরি' আর একটা বাটারবন কিনে খেয়ে তারপর আবার স্টেশনে এসে 'জেআর চুও লাইন-এর ট্রেন ধরে 'কুনিতাচি' আসব। তাই স্টেশন থেকে বের হয়ে লসনে গেলাম। স্টেশনের সামনের রাস্তায় কাজ চলছে, ড্রিলিংয়ের কাজ। তাই অনেকটুকু জায়গা হলুদ ব্যারিকেড দেওয়া। একটু চেপে চুপে লসনের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।

কনভেনি স্টোরে ঢোকার আগে স্মোকিং জোন দেখে ভাবলাম একটা সিগারেট ধরাই, সারাদিন সিগারেটও খেতে পারিনি। ৩টা সেমিনার করতে হয়েছে! সিগারেট ধরাতেই দেখি আমাদের মতই গায়ের রঙের একজন এসে কনভেনি স্টোরের দেয়ালে হেলান দিয়ে মাটিতে বসে পড়েছেন। গায়ে কনস্ট্রাকশন কোম্পানির ইউনিফর্ম। দেখেই বুঝলাম ওই রাস্তায় যে কাজ হচ্ছে তিনি সেখানে কাজ করছেন। এখন ২০ মিনিটের 'কিউকেই' মানে বিশ্রাম দিয়েছে। তাই এখানে এসেছেন, আর হাতে একটা সাদা পলিথিন। আমি আর নজর দিইনি।

কিন্তু মিনিট দুই পরেই স্পষ্ট বাংলা কথা শুনতে পেলাম, আর বুঝলাম বাংলাদেশি। তারপর আবার ভাইকে বলতে শুনলাম,

তোমরা সন্ধ্যায় কী নাস্তা করছো? বাবুরে কী খাওয়াইছো?

অপর পাশ থেকে কী বলল তা তো শোনা যায় না, কিন্তু এই পাশ থেকে আবার শুনলাম,

পিজ্জা কোথা থেকে আনছো?

তার কথা শুনে বুঝলাম তার পরিবার সন্ধ্যার নাস্তায় পিজ্জা খেয়েছে। আর খাবেই বা না কেন? আহা, বাবুর বাবা যে জাপানে থাকে!

এরপর আরও মিনিট খানেক কথার শেষে সম্ভবত ভাইয়ের ওয়াইফ জিজ্ঞেস করছে, তুমি রাতে খেয়েছো কিনা বা কী খেয়েছো, বা এখন কী করো।

আমি তার বসার জায়গা থেকে ৩ ফুট দূরে হবো, কারণ এই কনভেনির সামনে সিগারেট খেলে আপনি হেটে হেটে খেতে পারবেন না, লম্বা গোলাকার সিগারেটের অ্যাশট্রে থাকে, ছাই সেখানেই ফেলতে হবে। তাই আমি বাধ্য হয়েই তার কথা শুনছি। যখন তাকে প্রশ্ন করা হলো, তখন তিনি ঠিক এইভাবে উত্তর দিলেন,

হ্যা, রাতে খাসির গোশত দিয়ে ভাত খেয়ে অফিসে এসেছি। এখন ডিউটি শুরু হবে। আর কল দিবো না। রুমে গিয়ে আবার কল দিবো,

বলে কল কেটে দিয়েছেন।

আমি এই টোকিওর রাস্তায় কোনো বাংলাদেশি দেখলে বা বুঝতে পারলে আগ বাড়িয়ে কথা না-বললেও তাকে সালাম দিই। ঠিক একইভাবে সিগারেটের ফিল্টারটা অ্যাশট্রেতে রেখে ওনাকে ক্রস করে যাওয়ার সময় সুন্দর করে সালাম দিয়ে চলে যাচ্ছিলাম। কিন্তু তিনি যেতে দিলেন না, তিনিও সুন্দর করেই ডাক দিয়ে বললেন,

ভাইয়ের বাড়ি কোথায়?

এমন কিছু জিজ্ঞেস করলে থামতেই হয়! আমি দাড়িয়ে গেলাম দেখে তিনি মাটি থেকে উঠে দাড়াতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু আমি জানি যারা কনস্ট্রাকশনে কাজ করে তাদের কষ্ট কেমন, এই ২০ মিনিট ছাড়া সে আর বসতেই পারবে না। তাই দ্রুত তাকে দাড়াতে না-দিয়ে আমিই গোড়ালিতে ভর করে নিচে বসে বললাম,

ভাই, চাঁদপুর। তবে জন্মের পর থেকেই চিটাগং-এ ছিলাম। 

এরপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এদিকে কী করি, আমি বললাম, ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি করছি।

আর এটা বলতে গিয়েই ওনার হাতে যে সাদা পলিথিনটা ছিল, তার দিকে তাকিয়েই আগের ফোন কলে তিনি যে মিথ্যা কথা বলেছেন, তা ধরতে ১০ সেকেন্ডও লাগেনি। তার সাদা পলিথিনে দুইটা কলা, দুইটা বিস্কুট, আর দুইটা সিদ্ধ ডিম। তিনি এগুলো নিয়ে এদিকে নাইট ডিউটি করতে এসেছেন। আর তার ওয়াইফকে বলেছেন, খাসির গোশত দিয়ে ভাত খেয়ে এসেছেন!


আমি সাদা পলিথিন থেকে চোখ তুলে ওনার মুখের দিকে তাকাতেই তিনি কাতর হয়ে বললেন,

ভাই, কুলাতে পারি না। এই মাসে ঘরে সব মিলাই ৫০,০০০ ইয়েন দিছি। তাও হয় না। আর রাতে ভাত খেয়ে কাজে আসলে কাজ করা যায় না, শরীর ছেড়ে দেয়।

তার কথা শুনে আমি হাসি। আমি বলি, এভাবে দিতে-দিতে কলিজা বিক্রি করে দিয়ে দিলেও কারও কোনো চাহিদা মিটবে না। আমি যতটুকু জানি, আপনাদের এই কাজ সব দিন থাকে না, আবার যখন থাকে তখন টানা থাকে। আপনি কতক্ষণ ধরে করতেছেন?

তিনি মুখটা খুবই মলিন করে বললেন, গতকাল নাইট ৬ ঘণ্টা, আজকে সকালে ৮ ঘণ্টা আর এখন নাইট ৮ ঘণ্টা করে সকালে রুমে যাবো। তার কথা শুনে আমি অবাক হয়ে বলি, 

মানে আপনি ২২ ঘণ্টা ধরে দাড়িয়ে! আপনি এতক্ষণ ভাতও খান নাই, আর কী সুন্দর ঘরে বলে দিলেন, খাসির গোশত দিয়ে ভাত খেয়েছেন! এমন করবেন না, দেশে যারা থাকে তারা ভুল ভাবে! অথচ ঘরেতো সন্ধ্যাতে হয় পিজ্জা হাট বা পিজ্জা বার্গ থেকে শত শত টাকা দিয়ে পিজ্জা খেয়েছে!

তিনি আর কিছুই বলেন না।

এরপর আমার কথা জিজ্ঞেস করলে আমি বলি, আমি যাবো কুনিতাচি, কিন্তু খিদা লাগায় এদিকে স্টেশন থেকে বের হয়েছি। এটা শোনার পর তিনি তার পলিথিন থেকে কলা আর ডিম বের করে আমাকে দেন। আমি তো তার এই খাবার খাবই না, কিন্তু তিনিও আমাকে না-খাইয়ে ছাড়বেন না। তখন বাজে মাত্র রাত ১১টা, ওনার ডিউটি চলবে সকাল ৬টা পর্যন্ত, তাই এই সামান্য খাবার থেকে খেতে চাইনি।

কিন্তু তিনি এমনভাবে চেপে ধরলেন, এমন মায়া দেখালেন, পরে মনে হলো না খেলে মনে কষ্ট পাবেন। তাই আমিও মাটিতে বসে কলা আর সিদ্ধ ডিম খেলাম। আর খাওয়ার আগে ভাইয়ের অনুমতি নিয়ে একটা ছবি তুললাম। পাশের বোতলে এটা একটা গ্রিন টি। তিনি সেখান থেকেও আমাকে অর্ধেক দিয়েছেন।

এরপর ওনার থেকে যখন বিদায় নিই, তখন আমি আবার লসন কনভেনিতে ঢুকে ওনার জন্য দুইটা অনিগিরি (ভাতের বলের ভেতরে মাছ দেওয়া থাকে), একটা বড় সাইজের বাটারবন ও একটা পোকারি সুইট (গরমে স্যালাইনের মত খায়) কিনে জোর করে দিয়ে আসি আর পুরোটা পথ ভাবতে থাকি, আমরা ঘরের মানুষদের টেনশন ছাড়া রাখার জন্য কত কিছুই না মিথ্যা বলি। কোথায় রাস্তার ফুটপাতে বসে কলা, ডিম আর বিস্কুট খাওয়া আর কোথায় খাসির মাংস দিয়ে ভাত খাওয়া! মনটাই খারাপ হয়ে গেছিলো।

এই লেখা বিদেশে যারা থাকে তাদের কষ্ট বা স্ট্রাগল বোঝানোর জন্য না, এই লেখা আমাদের প্রতি দেশের মানুষের সিম্প্যাথি অর্জনের জন্যও না। তাহলে প্রশ্ন আসতে পারে, এই ঘটনা নিয়ে এত বড় লেখা কেন?

উত্তর হলো, এই লেখা হলো তাদের জন্য, যারা নিজের ঘর, পরিবার, সমাজ, দেশ ছেড়ে বিদেশে থাকেন। আপনারা অবশ্যই কষ্ট করবেন, পরিশ্রম করবেন, আয় করবেন, নিজের ঘরে টাকা পাঠাবেন। কিন্তু কখনোই এমন মিথ্যা বলবেন না। যদি শুকনা পাউরুটি খেয়ে থাকেন, তাহলে ঘরে তাই বলবেন। এতটুকু সত্য না বললে কী হয় জানেন?

ঘরে লোকজনের আপনার ওপর অন্যায় আবদার বাড়ে। বিদেশে কাজ করতে এসেছেন, পড়তে এসেছেন, তার মানে এটা না আপনি এদিকে কোটি-কোটি টাকা ইনকাম করেন। আপনি যদি এমন মিথ্যা বলতে থাকেন, তাহলে আপনি সেই প্রত্যাশার চাপ সামলাতে এমন রাতের বেলা শুকনা বিস্কুট, কলা আর সিদ্ধ ডিম খেয়ে থাকবেন।

মনে রাখবেন, মাস শেষে বেতন পেয়েই তা মুঠ করে দেশে পাঠিয়ে দিবেন না, নিজের ওপর জুলুম করবেন না। আগে নিজের পেটকে দেন, নিজের রুহকে দেন, ভালো খাবার খান। তাহলেই আপনি ভালো থাকবেন ও ভালো করে কাজ করে টাকা আয় করে অন্য সবার মুখে হাসি ফুটাতে পারবেন।

ভালো থাকুন, আপনারা। দুধে ভাতে থাকতে না পারলেও অন্তত ভরা পেটে থাকুন।"

লেখক: বিল্লাল হোসাইনটোকিও, জাপান২৯.৮.২৬

Wednesday, August 26, 2026

গান মানুষকে সভ্য করে, জেমসকে না...!

সে কবেকার কথা! জেমসের তখন বয়স কম। মাতাল অবস্থায় মঞ্চে উঠেছিলেন! এই কারণে দর্শকের কাছে ক্ষমাও চেয়েছিলেন। আমরা এপ্রিসিয়েট করেছিলাম।
অডিয়েন্সে—দর্শকের কাছে যে স্থির থাকতে পারে না তাকে আমি 'অস্থির তেলাপোকা' মনে করি। তেলাপোকাকে কমোডে মানায় অন্যত্র না, স্টেজে তো কদাপি না!
যাই হোক, রামের যেমন সুমতি হয়েছিল আমরা জেমসের সুমতি নিয়েও আশাবাদী ছিলাম!

হালে, জেমস গান গাইতে গিয়েছিলেন রোমে। এরা থাকার হোটেলের যে অবস্থা করে রেখেছিলেন তাতে লজ্জায় মাথা কাটা যায়—মনে হচ্ছিল এটা পশুর-হোটেল! অথচ একটা পশু, বেড়ালও তার ময়লা চোখের নিমিষে লুকিয়ে ফেলে। এমনিতেই দেশের বাইরে বাংলাদেশীদের যে সুনাম আপনি জেমস এই দেশের আইকন হিসাবে 'রুচির-দুর্ভিক্ষ-রকেটে' বারুদ ভরলেন।




আচ্ছা, যে প্রকারেই হোক ঘটনা ঘটে গেছে।
দুঃখপ্রকাশ দূরের কথা জেমস এই পশুসুলভ নোংরামির পক্ষে সাফাই গাইছেন।
ইয়াং পোলাপানরা এটা করেছে...এইটা কোন বিষয় না...জরিমানার ২০০ ডলার নট আ বিগ ডিল... হেন-তেন!
কী দুঃসাহস আপনার, আবার বলছেন, যাদের হাতে একটা মোবাইল আছে তারা লেখুক...!

আ-হা, ইয়াং পোলাপান হওয়া খুব মজা দেখছি। একদা এরা সুইমিংপুলে মুত্র-বিসর্জন করবে আপনি বোতলে করে জমিয়ে তাদের বিরাট কর্মকান্ড আমাদের দেখাবেন। বলা যায় না, আপনি আপনার অর্জিত মেডেলের পাশে সাজিয়েও রাখতে পারেন।
শোনেন, জাপানে একবার আপনার মত লোকজন সুইমিংপুলে 'পি' ওরফে মূত্র-বিসর্জন করেছিল পরবর্তীতে আর কোন হোটেল তাকে থাকার জায়গা দেয়নি! তার পাসপোর্টে একটা নোট দিয়ে দিয়েছিল।
ওহো, আপনাদের মত লোকজনকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য এরা কেমন কেরামতি করে তার খানিকটা নমুনা:

আপনার ইয়াং পোলাপান কখনো-বা বাচ্চা মেয়েকে নির্যাতন করবে আপনি 'ছেনেহের' চোখে দেখবেন। আহা জাতীয় বাবা যে আপনি! রসিয়ে-রসিয়ে আমাদের কাছে গল্প করবেন! ওহো, ইয়াং হওয়ার অনেক সুবিধা, তাই না? চট করে নোংরা পশু হয়ে যাওয়া যায়...!


Monday, August 24, 2026

যাহা বলিব সত্য বলিব।

 






Saturday, August 22, 2026

তমিজ—বেতমিজ!

আমার পিশাচ এবং পিচাশ গুলিয়ে যায়! কিন্তু পিচাই নিয়ে সমস্যা নেই—সুন্দর পিচাইয়ের নাম কে না জানে! আমরা যেমন ছাগল-সাইকেল বেঁধে রাখি তেমনি সুন্দর পিচাই জেটপ্লেন বেঁধে রাখে—কখন কোথায় যাওয়া লাগে। তার মাথার দাম কত টাকা সে নাহয় বাদই দিলাম। কিন্তু, একটা কিন্তু থেকে যায়...!

পায়ের উপর পা তুলে বসা যাবে না এমন না কিন্তু জুতার নীচটা অডিয়েন্সের নাকের ডগায় তাক করে রাখা যাবে না। কেন? 'শো সাম রেসপেক্ট'—পাঠক আছে তো লেখক আছেন—অডিয়েন্স আছে বলে বিভিন্ন বিখ্যাতরা আছেন—শ্বাস আছে বলে আপনি আছেন।

এই যে আরেকটা। বেতমিজ!

ওয়েল, কেন এভাবে পা তুলে বসা যাবে না এর ব্যাখ্যা আমি পূর্বে দিয়েছি। নতুন-কোন ব্যাখ্যায় যাব না যে জুতার তলার গোবর দেখা যাবে এই আশংকায়। এটা বাজারে টিকবে না কারণ এরা যেসব দামী-দামী জুতা পরেন সেখানে গোবর লেগে থাকার অবকাশ কোথায়!
আমাদের আসিফ মাহমুদ ভূঁইয়াই নাকি ছাত্রবেলায় ১৫/২০ হাজার টাকার জুতা পরতেন। এখন মনে হয় লাখ ছাড়িয়ে যায়: 

আমার বাপ মারা গেছে ৮৩ সালে। এটা তার ওই সময়কার জুতা, মোকাসিন।
কিন্তু আমরা কলেজ গেছি কাপড়ের জুতা পরে। সেই জুতায় সাদা চক দিয়ে রঙ করতে হত! 

ওহ-হ, এটা বলতে ভুলে গেছি আসিফ মাহমুদ ভূঁইয়া কেবল হাঁটার সময় স্যান্ডেল পরতেন:

হালে আমরা ফাহাম আব্দুস সালামকে দেখলাম! তিনি আবার বি-রা-ট মটিভেশনাল স্পিকার! অনেক কিছু শেখান।
'মাদা...' গালি কী অবলীলায় দেওয়া যায় সেটাও শেখান! কিন্তু কোথায় কীভাবে বসতে হয় সেটা নিজে শেখেননি! 
ডিয়ার, ফাহাম, পদাধিকার বলে বাংলাদেশে ১ নং ব্যক্তির সামনে এভাবে বসার ধৃষ্টতা দেখান কেমন করে! আপনি তার মেয়ের জামাই নাকি ঘরজামাই সেটা তো আমাদের জেনে কাজ নাই!
ভাগ্যিস, প্রেসিডেন্ট হননি তাহলে বাপ বসে থাকলেও দু' পা দুই জায়গায় থাকত।

এই যে আমাদের টর্চলাইট, আলোর মশাল জনাব, শাইখ সিরাজ। মিডিয়া টাইকুন।
তিনি যে মানুষটার সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন বা আলাপচারিতা করছেন তিনি, মনজুর হোসেন (মঞ্জুর শেখ নামেও পরিচিত)। তিনি একটা অসাধারণ কাজ করে ফেলেছেন।

যে কালো-চাল দেশে চাষ হত না—বিদেশ থেকে আমদানি করা লাগত। দাম ১০০০ টাকা কেজি ছিল! সেই কালো চাল চাষ করে দামটা আমাদের হাতের নাগালে নিয়ে এসেছেন। আলাপচারিতার পুরো সময়টা শাইখ সিরাজ এই মানুষটা, মনজুর হোসেনকে তুমি-তুমি করে বলেছেন!

স্যার, শাইখ সিরাজ, মে আই আস্ক, হোয়াই? আপনি কোথাকার লাটসাহেব? নাকি এই মানুষটা কৃষিকাজ করেন বলে এই বেতমিজি করেছেন? চ্যানেল আইয়ে চাটুকারিতা করে-করে আপনারা একটা পর্যায়ে চলে গেছেন [] নইলে কে জানে ডান্ডা নিয়ে উত্তরা বা বসুন্ধরায় অন্য-কারো বাড়ী পাহারা দিতেন! মাশাল্লা, মুখ না লাগুক, আপনার স্বাস্থ্য ভাল। তেল-মাখানো একটা ডান্ডা নিয়ে বসলে...।
ওহ, ডিয়ার স্যার শাইখ সিরাজ, খালেদ মুহিউদ্দিনের ভাষায় 'অভয় দেন তো বলি', পুরো সময়টা আপনি বসে ছিলেন অথচ ওই মানুষটা দাঁড়িয়ে ছিলেন। কেন? প্লিজ, আপনি আবার এটা বলবেন না যে আপনার শরীরের মত পেছনটাও ভারী—তাহলে কিন্তু আপনার তকলিফ দেখে আমার এক চোখে পানি, এক চোখে জল চলে আসবে। আমি কিন্তু, আমি কিন্তু কেঁদে ফেলব...! 

সূত্র:
১. একজন তেলতেলে ফরিদুর রেজা সাগরhttps://www.ali-mahmed.com/2026/05/blog-post_264.html?m=1





Friday, August 21, 2026

কতদিন একটা জানোয়ার দেখি না!

সাবেক মন্ত্রী দিপু মনির স্বামী মারা গেছেন। তার মেয়ে মাকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়ার আবেদন নিয়ে পাগলের মত এদিক-ওদিক ছুটে বেড়াচ্ছেন।

একজন মানুষ একটা সংখ্যা না—গোটা একটা পরিবার জড়িয়ে থাকে। দুম করে গোটা পরিবার অস্থির হয়ে বিপদে পড়ে যায়।  
আজকাল সাংবাদিক-টিকটকার-রিলসওয়ালা সব এখন গুলিয়ে গেছে!
হাড়ের পেছনে কুকুর যেমন দৌড়ে বেড়ায় এরাও অবিকল তাই করছে। একজন তো সমস্ত ভব্যতা ছাড়িয়ে গেছে, এমনকি জানোয়ারকেও...!



Thursday, August 20, 2026

পরাজয়: প্রকৃতি-মানব-মানবসভ্যতা!

লেখক: Asad Abdullah (https://www.facebook.com/share/1BdDSm4diL/)

"এই ছবির সাবজেক্ট আমি না। আমি এখানে প্রেডিকেট। সাবজেক্ট হলো আমার পেছনের তিনজন ভাই, ভাবি, আপা।

লেক জর্জে আমরা পৌঁছানোর মিনিট পাঁচেক পরেই তাঁরা এসে হাজির। গাড়িটা থামল একদম বাংলা সিনেমার কায়দায়। ভাই ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষলেন, প্রায় আমার গা ঘেঁষে। খানিকটা ধুলো উড়ল। যেন সেই ধুলায় বিরক্ত হয়েই টায়ারের আশপাশ থেকে বিশুদ্ধ বাতাসটুকু কোথায় যেন পালিয়ে গেল। তার জায়গা দখল করে নিল পোড়া টায়ারের গন্ধ।

ভাই নেমেই ওয়াক থু করে থুতু ফেললেন। আল্লাহ আমাকে ঠিক কী শাস্তি দিতে চেয়েছিলেন জানি না, কিন্তু আমি ঠিক সেই মুহূর্তেই ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে ছিলাম, যখন তিনি ওয়াক থু করলেন। এমন একটা জায়গায় এসে, এমন একটা লেকের সামনে দাঁড়িয়ে কারো থুতু ফেলতে ইচ্ছা করতে পারে, নিজের চর্মচক্ষে না দেখলে জীবনেও বিশ্বাস করতাম না।

তারপর তিনজন মিলে খুব উঁচু গলায় কোনো এক অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলা শুরু করলেন। এতক্ষণ আমার কানে বাতাসের ঝিরঝির শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ ছিল না। এখন ইচ্ছা না করলেও তাঁদের 'সুমধুর কণ্ঠস্বর'(!) কানে সিসার মতো ঢুকতে লাগল।

আল্লাহ যখন আমাদের ডিজাইন করেছিলেন, তখন একটা জায়গায় তিনি ইচ্ছা করেই একটা ত্রুটি রেখে দিয়েছেন। আহা, তিনি আমাদের চোখ বন্ধ করার ব্যবস্থা রেখেছেন, কিন্তু কান বন্ধ করার কোনো উপায় রাখেননি। তিনি তখন হয়তো খেয়াল করেননি, পৃথিবীতে কোথাও-কোথাও, কখনো-কখনো, কারো-কারো, কোনো-কোনো সময় কান বন্ধ করার ইচ্ছা জাগতে পারে। হে আল্লাহ, হে মাবুদ, তুমি যখন হিউম্যান V2.0 বানাবে, তখন এই ফিচারটা দয়া করে যোগ করে দিও। এটা আসাদ আব্দুল্লাহ'র হাম্বল রিকোয়েস্ট!

যাই হোক, ঘটনায় ফেরা যাক। তাঁরা মহা উৎসাহে বিভিন্ন পোজে ছবি তোলা শুরু করলেন। আগে ভাবি একা অজুত-নিজুত ছবি তুললেন। কিন্তু ভাই যেই ফ্রেমে ঢুকলেন, ভাবি সঙ্গে সঙ্গে কড়া গলায় মনে করিয়ে দিলেন যে ভাই গাড়ি থেকে ক্যাপ নিয়ে আসেননি। ফলে ছবিতে ভাইয়ের মাথার যে অঞ্চলটা একটু অনুর্বর, সেটা দেখা যাবে।

ভাই সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞাসা করলেন, 'কোনটা আনুম, নীলটা নাকি সাদাটা'?

ভাবি বললেন, 'সাদাটাই লইয়া আইয়েন, আসমানে দেখেন না ক্যামন কালা-কালা মেঘ জমছে'।

ভাই তা-ই করলেন। এবার ছবি তোলার পালা। ভাই ফ্রেমে, আমিও তুমুল আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছি, নাটকের বাকি অংশ দেখার অপেক্ষায়। ভাই ক্যামেরার দিকে হিরো লুক দিলেন। কিন্তু ভাবি কড়া গলায় বললেন, 'আরে ক্যামেরার দিকে না, আঁর দিকে চাও, রুমান্টিক একটা লুক দেও'।

ভাই তা-ই করলেন।

ওদিকে আপা ছবি তুলতে-তুলতে একটু অস্থির। সম্ভবত এই পজিশনে বিশ-পঁচিশটা ছবি তিনি এর মধ্যেই তুলে ফেলেছেন। এবার তিনি তাগাদা দিলেন, একই আঞ্চলিক ভাষায়: 'তোঁরার হইলে অক্করে আঁর ছবিডা তুইলা দে'।

কিন্তু ভাবির খায়েশ তখনো মেটেনি। ভাইকে নিয়ে তিনি এবার নতুন পোজে শুরু করলেন। আমি তুমুল উত্তেজিত। মনে হলো ছবির ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছে গেছি। অপেক্ষা করছি এটা ভেবে, দেখি, এটা হলিউডের সিনেমা হবে (যেখানে দুই ঠোঁট এক হয়), নাকি বাংলা সিনেমা হবে (যেখানে কাহিনী হওয়ার আগেই সামনে একটা ফুল চলে আসে!)।

কিন্তু হলো পর্বতের মূষিক প্রসব। আপা নিজেই রাগ করে এবার নিজের সেলফি তোলা শুরু করলেন। একটু পরে দেখি ভাবিও সেলফি তুলছেন। ভাই বেচারার জন্য খারাপই লাগল। তাঁকে দেখতে অনেকটা ওই স্তন্যপায়ী প্রাণীর তিন নম্বর বাচ্চার মতো লাগছিল!

ভেবে দেখলাম, আমি এখানে এসেছিলাম লেক দেখতে। লেক দেখা হলো, তার সাথে বিনা টিকিটে, বিনা অ্যাডে, বিনা সাবস্ক্রিপশনে একটা আস্ত বাংলা নাটক দেখে ফেললাম। এই যুগে ফ্রি জিনিস পাওয়া বড় মুশকিল।

তিনজন মানুষ একসঙ্গে পৃথিবীর এত সুন্দর একটা জায়গায় এলো, শেষে তিনজনই যে যার ফোনের ভেতর একা-একা ঢুকে গেল। বেচারা লেক জর্জ, চুপচাপ তাকিয়ে রইল, হাজার বছর ধরে যেভাবে তাকিয়ে আছে। আজকাল কেউ আর ওভাবে ফিরেও লেকটার দিকে তাকায় না। সে সেজেগুজে বসে থাকে অথচ তার সামনে দাঁড়িয়ে সবাই নিজের নিজের মুখ দেখছে ফোনের স্ক্রিনে। এই গ্রহের অসম্ভব সব সুন্দরের একই গতি। এখন আর কেউ খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে দেখার প্রয়োজন বোধ করে না—ফট করে একটা ছবি তুলে ফেললেই হয়! দেখা শেষ!

এই একবিংশ শতাব্দীতে সবচেয়ে অবহেলিত জিনিস সম্ভবত প্রকৃতি নিজেই। সে যতই সুন্দর, অপরূপ  হোক, একটা ফ্রন্ট ক্যামেরা, সেল-ফোন ক্যামেরার সামনে সে পরাজিত হয়। আসলে পরাজয় হয় মানব, মানবসভ্যতার! 

গ্রিক মিথের সেই নার্সিসাসের কথা মনে পড়ল। ছেলেটা পানিতে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে এমন প্রেমে পড়েছিল যে, সেখান থেকে আর নড়তে পারেনি, শেষে ওখানেই মরে গিয়েছিল। আজকাল আমরা সবাই একটু-একটু নার্সিসাস। তফাত শুধু এই, নার্সিসাসের অন্তত একটা লেক লাগত। আমাদের কিছুই লাগে না, পকেটে একটা ফ্রন্ট ক্যামেরা-দেল ক্যামেরা থাকলেই চলে।"

— লেখক: Asad Abdullah (https://www.facebook.com/share/1BdDSm4diL/)

Wednesday, August 12, 2026

আমাদের একজন সিদ্দিক মাহমুদুর রহমান!

"আমার নাম সিদ্দিক মাহমুদুর রহমান। আমার বয়স ৮১ বছর এবং আমি রাজধানী ঢাকার একটি ছোট অ্যাপার্টমেন্টে একা থাকি।

আমি অনেকগুলো চাকুরী করেছি, ওষুধ কোম্পানী, হাসপাতাল, সংবাদপত্র, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট  কোম্পানী, বাইশ বছর আগে অবসর নেওয়ার পর থেকে আমার জীবন ক্রমশ নীরব হয়ে উঠতে লাগলো শুরু। ২০০৯ সালে আমাদের একমাত্র সন্তান ক্যান্সারে মারা গেল। সারা বাড়িতে আমি আর আমার স্ত্রী! স্ত্রী এমনিতেই শান্ত-চুপচাপ, সমস্ত জীবনে কথা বলতো কম! সন্তান চলে যাওয়ার পর ও আরও চুপ হয়ে গেল। নামাজ-রোজা করতো, কোরআন পড়তো আর নিঃশব্দে কাঁদতো। দু'জনে সকালে নিয়ম মতো নাস্তা করতাম, দুপুরে আর রাতে নিয়ম মেনে খাবার খেতাম। পরের দিন একই নিয়ম!  আমার স্ত্রী এক সময় অসুস্থ হয়য়ে পড়লো। ওষুধ খেতো না, নিয়ম মানতো না। অবশেষে সে নিঃশব্দেই চলে গেল!

প্রথমে আমি ভেবেছিলাম: 'অবশেষে, নিজের জন্য কিছু সময়...'।

আমি কল্পনা করেছিলাম যে আমি শান্তভাবে বাজার করবো, রাঁধবো, খাবো! কিছু কাজ করবো যা আমি সবসময় করতে চেয়েছিলাম।

কিন্তু দিন-দিন, এই নীরবতা আমার পরিচিত সব ক্লান্তিকেও ছাপিয়ে যেতে লাগল।

গোটা শহরে আমার অনেক আত্মীয়-স্বজন, কিন্তু কেউ  আমার খোঁজ নেয় না! ওদের নিজেদের পরিবার, নিজেদের দায়িত্ব, নিজেদের জীবন নিয়ে ব্যস্ত। আমি সেটা বুঝি।

মাঝে-মাঝে আমার মনে হয় ওরা সবাই আমাকে ভুলে গেছে। একবার আমি আমার এক বন্ধুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম:

তোমরা কেন চাও না আমি তোমাদের আড্ডায় আসি …'?

ও শান্ত ঠান্ডা ভাবে উত্তর দিয়েছিল:

'তুমি সবসময়ই ঝামেলা করো, তীর্যক কথা বলো, সবার ভুলগুলো ধরিয়ে দাও! তোমার স্বভাবটাই এমন…'!

আমি চুপ করে গেলাম। বার্তাটা স্পষ্ট ছিল: এখানে তোমার আর কোনো জায়গা নেই।

আমার সব দিনই একরকম: আমি সকালে উঠে বাথরুম সারি, নামাজ পড়ি, নাস্তা বানাই, বাজার করতে যাই, শুধু নিজের জন্যই রান্না করি। বাড়িতে মানুষের কণ্ঠস্বর শুনতে ইচ্ছে করলে টিভি চালু রেখে দিই।

প্রথমে আমি ভেবেছিলাম এটা হয়তো সাময়িক। তারপর অদ্ভুত কিছু উপসর্গ দেখা দিল: মাথা ঘোরা, গ্যাস্ট্রিক, অস্থিরতা, নির্ঘুম রাত।

আমি ডাক্তার দেখিয়েছি। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলেন। শরীরের সব ঠিক আছে।

তারপর ওদের একজন আমাকে বললেন: 'সিদ্দিক সাহেব! আপনার কোন বড় অসুস্থতা নেই। আপনি নিঃসঙ্গতায় ভুগছেন'।

আর এই বাক্যটাই যে কোনো রোগ নির্ণয়ের চেয়ে আমাকে বেশি ব্যথিত করল। কারণ নিঃসঙ্গতার কোনো ওষুধ নেই।

আমি বাইরে কোথাও যাই না! পার্কে না, সভায় না, গানের, নাটকের অনুষ্ঠানে না।  বাইরে সবাই যার যার কাজে-অকাজে ব্যাস্ত! সবাই তাড়াহুড়ো করছে। সবাই ছুটছে যাচ্ছে। আর আমি... আমি এখানেই থেকে যাই।

আমি প্রায়ই নিজেকে জিজ্ঞেস করি: আমি কি কিছু ভুল করেছি? আমি আমার সমস্ত জীবন সকলের জন্য সময় দিয়েছি, সকলের কাজ করে দিয়েছি, আমার জীবনের অনেক দিন, মাস, বছর উৎসর্গ করেছি। অথচ আজ আমি একা!

আমি কারও কোন সহানুভূতি চাইছি না কিন্তু আমি কি সত্যিই একজন খারাপ মানুষ ছিলাম? নাকি এটাই আধুনিক জীবনের ছন্দ, যেখানে একজন বৃদ্ধের কোনো জায়গা নেই?

কেউ কেউ আমাকে বলে, 'একজন সঙ্গী খুঁজে নাও, ইন্টারনেট ব্যবহার করে দেখো'।

কিন্তু আমি পারি না। আমি বিশ্বাস করি না। এত বছর একা থাকার পর, আমার নতুন করে শুরু করার শক্তি নেই। আর আমার স্বাস্থ্যও আর আগের মতো নেই।

আমি আর কাজ করতে পারি না। ক্রমে শক্তিহীন হয়ে পড়ছি! এখন শুধু নীরবতা। আমি কখনো কোনো বড় কিছু আশা করি না।... " 

...

মাত্র ৬ মাস আগে এই লেখার লেখক সিদ্দিক মাহমুদুর রহমান পরশুদিন মারা গেছেন আহসানিয়া মিশন ক্যান্সার হাসপাতালে। 

ডাক ব্যবস্থা নিয়ে তাঁর লেখালেখির শুরু ১৯৮৭ সালে। কয়েকজন বিদেশি বন্ধুর অনুরোধে তিনি মুক্তিযুদ্ধকালীন ডাকব্যবস্থা নিয়ে ইংরেজিতে একটি প্রবন্ধ লিখেন। এরপর ১৯৯১ সালে বাংলা একাডেমি থেকে তার একটি অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়।


এক সময় শখ ছিল ডাকটিকিট সংগ্রহ করার। মুক্তিযুদ্ধের পর বিদেশের গবেষকরা বাংলাদেশের ডাকব্যবস্থা সর্ম্পকে জানতে চায়। তখন সিদ্দিক তাদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতেন। এভাবে উত্তর দিতে গিয়ে তিনি অনেক কিছু জানতে পারেন। এদিকে সমানে বই প্রকাশ হতে থাকে। এক এক করে বাংলাদেশের ডাকব্যবস্থা, ডাকটিকিট, ধাতব ও কাগজি মুদ্রাব্যবস্থার ইতিহাস নিয়ে তার ৩০টি বই প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ ব্রিটেনের রয়েল এশিয়াটিক সোসাইটি তাকে উক্ত প্রতিষ্ঠানের ফেলো নির্বাচিত করে।

গেল ৩৭ বছরে বাংলাদেশের ডাকব্যবস্থা, ডাকটিকিট, ধাতব ও কাগজি মুদ্রা নিয়ে ৩০টি গবেষণা করেছেন। তার আগে দেশের ডাক ব্যবস্থা, ডাকটিকিট, আধুনিক ধাতব ও কাগজ মুদ্রার ইতিহাস নিয়ে এত বেশি গবেষণা আর কেউ করেছেন বলে জানা যায় না। 

তিন হাজারের বেশি বাংলাদেশি ডাকটিকিট সংগ্রহ করেছিলেন সিদ্দিক। তার কাছে ভারত, জার্মানির টিকিটও ছিল। কিন্তু যখন মাত্র ২৫ বছর বয়সে একমাত্র ছেলে ক্যানসারে মৃত্যুবরণ করে, সিদ্দিক এই শোকে এতটাই ভেঙে পড়েন যে জমানো শত শত ডাকটিবিকটের সংগ্রহ, খাম, চিঠি আগুনে পুড়িয়ে ফেলেন। এর আগে কিছু ডাক টিকিট বিক্রি করেছিলেন। ভাগনীর বিয়েতে গহনা ও বরের স্যুট ও ঘড়ি কেনার জন্য।

অসংখ্য গবেষণা করলেও ডাক, মুদ্রা ব্যবস্থা নিয়ে সিদ্দিকের সংবাদপত্রে প্রকাশিত লেখা তেমন নেই। না থাকার পেছনে তার এক বুক অভিমান রয়েছে। নব্বই দশকে যখন ডাকটিকিট নিয়ে লেখা দিতেন। সংবাদপত্রগুলো সেভাবে তা ছাপতো না। এ কারণে মন খারাপ করে আর কখনো কোনো সংবাদপত্রে তিনি লেখা পাঠাননি। ডাকব্যবস্থা ও ডাকটিকিট নিয়ে লেখা ছেপে তা মানুষদের মধ্যে বিলি করতেন। যাতে তারা এর গুরুত্ব বুঝতে পারে। 

তাঁর মৃত্যুর পরে তাঁকে নিয়ে কিছু লেখা দেখে ভদ্রলোকের ওয়ালে কিছু লেখা দেখলাম। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ডাকব্যবস্থা নিয়ে লেখালেখি শুরু করলেও চেতনা শিবিরের মানুষ ছিলেন না। বরং ইন্ডিয়ান আধিপত্যবাদের প্রবল বিরোধী ছিলেন। হয়তোবা সেজন্যই কি যথেষ্ট মনোযোগ পাননি?

* তথ্য সহায়তা: Imran Abdulla (https://www.facebook.com/share/18SfzdRw4u/ ) 

WhatsApp