Saturday, August 22, 2026

তমিজ—বেতমিজ!

আমার পিশাচ এবং পিচাশ গুলিয়ে যায়! কিন্তু পিচাই নিয়ে সমস্যা নেই—সুন্দর পিচাইয়ের নাম কে না জানে! আমরা যেমন ছাগল-সাইকেল বেঁধে রাখি তেমনি সুন্দর পিচাই জেটপ্লেন বেঁধে রাখে—কখন কোথায় যাওয়া লাগে। তার মাথার দাম কত টাকা সে নাহয় বাদই দিলাম। কিন্তু, একটা কিন্তু থেকে যায়...!

পায়ের উপর পা তুলে বসা যাবে না এমন না কিন্তু জুতার নীচটা অডিয়েন্সের নাকের ডগায় তাক করে রাখা যাবে না। কেন? 'শো সাম রেসপেক্ট'—পাঠক আছে তো লেখক আছেন—অডিয়েন্স আছে বলে বিভিন্ন বিখ্যাতরা আছেন—শ্বাস আছে বলে আপনি আছেন।

এই যে আরেকটা। বেতমিজ!

ওয়েল, কেন এভাবে পা তুলে বসা যাবে না এর ব্যাখ্যা আমি পূর্বে দিয়েছি। নতুন-কোন ব্যাখ্যায় যাব না যে জুতার তলার গোবর দেখা যাবে এই আশংকায়। এটা বাজারে টিকবে না কারণ এরা যেসব দামী-দামী জুতা পরেন সেখানে গোবর লেগে থাকার অবকাশ কোথায়!
আমাদের আসিফ মাহমুদ ভূঁইয়াই নাকি ছাত্রবেলায় ১৫/২০ হাজার টাকার জুতা পরতেন: 
ওহ-হ, এটা বলতে ভুলে গেছি আসিফ মাহমুদ ভূঁইয়া কেবল হাঁটার সময় স্যান্ডেল পরতেন:

হালে আমরা ফাহাম আব্দুস সালামকে দেখলাম! তিনি আবার বি-রা-ট মটিভেশনাল স্পিকার! অনেক কিছু শেখান। কিন্তু কোথায় কীভাবে বসতে হয় সেটা নিজে শেখেননি!

এই যে আমাদের টর্চলাইট, আলোর মশাল জনাব, শাইখ সিরাজ। মিডিয়া টাইকুন।
তিনি যে মানুষটার সাক্ষাৎকার বা আলাপচারিতা করছেন তিনি, মনজুর হোসেন (মঞ্জুর শেখ নামেও পরিচিত)। তিনি একটা অসাধারণ কাজ করে ফেলেছেন। যে কালো-চাল দেশে চাষ হত না—বিদেশ থেকে আমদানি করা লাগত। দাম ১০০০ টাকা কেজি ছিল! সেই কালো চাল চাষ করে দামটা আমাদের হাতের নাগালে নিয়ে এসেছেন। আলাপচারিতার পুরো সময়টা শাইখ সিরাজ এই মানুষটা, মনজুর হোসেনকে তুমি-তুমি করে বলেছেন!

স্যার, শাইখ সিরাজ, মে আই আস্ক, হোয়াই? আপনি কোথাকার লাটসাহেব? চ্যানেল আইয়ে চাটুকারিতা করে-করে আপনারা একটা পর্যায়ে চলে গেছেন [] নইলে কে জানে ডান্ডা নিয়ে উত্তরা বা বসুন্ধরায় অন্য-কারো বাড়ী পাহারা দিতেন! মাশাল্লা, মুখ না লাগুক, আপনার স্বাস্থ্য ভাল। তেল-মাখানো একটা ডান্ডা নিয়ে বসলে...।
ওহ, ডিয়ার স্যার শাইখ সিরাজ, খালেদ মুহিউদ্দিনের ভাষায় 'অভয় দেন তো বলি', পুরো সময়টা আপনি বসে ছিলেন অথচ ওই মানুষটা দাঁড়িয়ে ছিলেন। কেন? প্লিজ, আপনি আবার এটা বলবেন না যে আপনার শরীরের মত পেছনটাও ভারী—তাহলে কিন্তু আপনার তকলিফ দেখে আমার এক চোখে পানি, এক চোখে জল চলে আসবে। আমি কেঁদে ফেলব...! 

সূত্র:
১. একজন তেলতেলে ফরিদুর রেজা সাগরhttps://www.ali-mahmed.com/2026/05/blog-post_264.html?m=1





Friday, August 21, 2026

কতদিন একটা জানোয়ার দেখি না!

সাবেক মন্ত্রী দিপু মনির স্বামী মারা গেছেন। তার মেয়ে মাকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়ার আবেদন নিয়ে পাগলের মত এদিক-ওদিক ছুটে বেড়াচ্ছেন।

একজন মানুষ একটা সংখ্যা না—গোটা একটা পরিবার জড়িয়ে থাকে। দুম করে গোটা পরিবার অস্থির হয়ে বিপদে পড়ে যায়।  
আজকাল সাংবাদিক-টিকটকার-রিলসওয়ালা সব এখন গুলিয়ে গেছে!
হাড়ের পেছনে কুকুর যেমন দৌড়ে বেড়ায় এরাও অবিকল তাই করছে। একজন তো সমস্ত ভব্যতা ছাড়িয়ে গেছে, এমনকি জানোয়ারকেও...!



Thursday, August 20, 2026

পরাজয়: প্রকৃতি-মানব-মানবসভ্যতা!

লেখক: Asad Abdullah (https://www.facebook.com/share/1BdDSm4diL/)

"এই ছবির সাবজেক্ট আমি না। আমি এখানে প্রেডিকেট। সাবজেক্ট হলো আমার পেছনের তিনজন ভাই, ভাবি, আপা।

লেক জর্জে আমরা পৌঁছানোর মিনিট পাঁচেক পরেই তাঁরা এসে হাজির। গাড়িটা থামল একদম বাংলা সিনেমার কায়দায়। ভাই ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষলেন, প্রায় আমার গা ঘেঁষে। খানিকটা ধুলো উড়ল। যেন সেই ধুলায় বিরক্ত হয়েই টায়ারের আশপাশ থেকে বিশুদ্ধ বাতাসটুকু কোথায় যেন পালিয়ে গেল। তার জায়গা দখল করে নিল পোড়া টায়ারের গন্ধ।

ভাই নেমেই ওয়াক থু করে থুতু ফেললেন। আল্লাহ আমাকে ঠিক কী শাস্তি দিতে চেয়েছিলেন জানি না, কিন্তু আমি ঠিক সেই মুহূর্তেই ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে ছিলাম, যখন তিনি ওয়াক থু করলেন। এমন একটা জায়গায় এসে, এমন একটা লেকের সামনে দাঁড়িয়ে কারো থুতু ফেলতে ইচ্ছা করতে পারে, নিজের চর্মচক্ষে না দেখলে জীবনেও বিশ্বাস করতাম না।

তারপর তিনজন মিলে খুব উঁচু গলায় কোনো এক অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলা শুরু করলেন। এতক্ষণ আমার কানে বাতাসের ঝিরঝির শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ ছিল না। এখন ইচ্ছা না করলেও তাঁদের 'সুমধুর কণ্ঠস্বর'(!) কানে সিসার মতো ঢুকতে লাগল।

আল্লাহ যখন আমাদের ডিজাইন করেছিলেন, তখন একটা জায়গায় তিনি ইচ্ছা করেই একটা ত্রুটি রেখে দিয়েছেন। আহা, তিনি আমাদের চোখ বন্ধ করার ব্যবস্থা রেখেছেন, কিন্তু কান বন্ধ করার কোনো উপায় রাখেননি। তিনি তখন হয়তো খেয়াল করেননি, পৃথিবীতে কোথাও-কোথাও, কখনো-কখনো, কারো-কারো, কোনো-কোনো সময় কান বন্ধ করার ইচ্ছা জাগতে পারে। হে আল্লাহ, হে মাবুদ, তুমি যখন হিউম্যান V2.0 বানাবে, তখন এই ফিচারটা দয়া করে যোগ করে দিও। এটা আসাদ আব্দুল্লাহ'র হাম্বল রিকোয়েস্ট!

যাই হোক, ঘটনায় ফেরা যাক। তাঁরা মহা উৎসাহে বিভিন্ন পোজে ছবি তোলা শুরু করলেন। আগে ভাবি একা অজুত-নিজুত ছবি তুললেন। কিন্তু ভাই যেই ফ্রেমে ঢুকলেন, ভাবি সঙ্গে সঙ্গে কড়া গলায় মনে করিয়ে দিলেন যে ভাই গাড়ি থেকে ক্যাপ নিয়ে আসেননি। ফলে ছবিতে ভাইয়ের মাথার যে অঞ্চলটা একটু অনুর্বর, সেটা দেখা যাবে।

ভাই সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞাসা করলেন, 'কোনটা আনুম, নীলটা নাকি সাদাটা'?

ভাবি বললেন, 'সাদাটাই লইয়া আইয়েন, আসমানে দেখেন না ক্যামন কালা-কালা মেঘ জমছে'।

ভাই তা-ই করলেন। এবার ছবি তোলার পালা। ভাই ফ্রেমে, আমিও তুমুল আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছি, নাটকের বাকি অংশ দেখার অপেক্ষায়। ভাই ক্যামেরার দিকে হিরো লুক দিলেন। কিন্তু ভাবি কড়া গলায় বললেন, 'আরে ক্যামেরার দিকে না, আঁর দিকে চাও, রুমান্টিক একটা লুক দেও'।

ভাই তা-ই করলেন।

ওদিকে আপা ছবি তুলতে-তুলতে একটু অস্থির। সম্ভবত এই পজিশনে বিশ-পঁচিশটা ছবি তিনি এর মধ্যেই তুলে ফেলেছেন। এবার তিনি তাগাদা দিলেন, একই আঞ্চলিক ভাষায়: 'তোঁরার হইলে অক্করে আঁর ছবিডা তুইলা দে'।

কিন্তু ভাবির খায়েশ তখনো মেটেনি। ভাইকে নিয়ে তিনি এবার নতুন পোজে শুরু করলেন। আমি তুমুল উত্তেজিত। মনে হলো ছবির ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছে গেছি। অপেক্ষা করছি এটা ভেবে, দেখি, এটা হলিউডের সিনেমা হবে (যেখানে দুই ঠোঁট এক হয়), নাকি বাংলা সিনেমা হবে (যেখানে কাহিনী হওয়ার আগেই সামনে একটা ফুল চলে আসে!)।

কিন্তু হলো পর্বতের মূষিক প্রসব। আপা নিজেই রাগ করে এবার নিজের সেলফি তোলা শুরু করলেন। একটু পরে দেখি ভাবিও সেলফি তুলছেন। ভাই বেচারার জন্য খারাপই লাগল। তাঁকে দেখতে অনেকটা ওই স্তন্যপায়ী প্রাণীর তিন নম্বর বাচ্চার মতো লাগছিল!

ভেবে দেখলাম, আমি এখানে এসেছিলাম লেক দেখতে। লেক দেখা হলো, তার সাথে বিনা টিকিটে, বিনা অ্যাডে, বিনা সাবস্ক্রিপশনে একটা আস্ত বাংলা নাটক দেখে ফেললাম। এই যুগে ফ্রি জিনিস পাওয়া বড় মুশকিল।

তিনজন মানুষ একসঙ্গে পৃথিবীর এত সুন্দর একটা জায়গায় এলো, শেষে তিনজনই যে যার ফোনের ভেতর একা-একা ঢুকে গেল। বেচারা লেক জর্জ, চুপচাপ তাকিয়ে রইল, হাজার বছর ধরে যেভাবে তাকিয়ে আছে। আজকাল কেউ আর ওভাবে ফিরেও লেকটার দিকে তাকায় না। সে সেজেগুজে বসে থাকে অথচ তার সামনে দাঁড়িয়ে সবাই নিজের নিজের মুখ দেখছে ফোনের স্ক্রিনে। এই গ্রহের অসম্ভব সব সুন্দরের একই গতি। এখন আর কেউ খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে দেখার প্রয়োজন বোধ করে না—ফট করে একটা ছবি তুলে ফেললেই হয়! দেখা শেষ!

এই একবিংশ শতাব্দীতে সবচেয়ে অবহেলিত জিনিস সম্ভবত প্রকৃতি নিজেই। সে যতই সুন্দর, অপরূপ  হোক, একটা ফ্রন্ট ক্যামেরা, সেল-ফোন ক্যামেরার সামনে সে পরাজিত হয়। আসলে পরাজয় হয় মানব, মানবসভ্যতার! 

গ্রিক মিথের সেই নার্সিসাসের কথা মনে পড়ল। ছেলেটা পানিতে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে এমন প্রেমে পড়েছিল যে, সেখান থেকে আর নড়তে পারেনি, শেষে ওখানেই মরে গিয়েছিল। আজকাল আমরা সবাই একটু-একটু নার্সিসাস। তফাত শুধু এই, নার্সিসাসের অন্তত একটা লেক লাগত। আমাদের কিছুই লাগে না, পকেটে একটা ফ্রন্ট ক্যামেরা-দেল ক্যামেরা থাকলেই চলে।"

— লেখক: Asad Abdullah (https://www.facebook.com/share/1BdDSm4diL/)

Wednesday, August 12, 2026

আমাদের একজন সিদ্দিক মাহমুদুর রহমান!

"আমার নাম সিদ্দিক মাহমুদুর রহমান। আমার বয়স ৮১ বছর এবং আমি রাজধানী ঢাকার একটি ছোট অ্যাপার্টমেন্টে একা থাকি।

আমি অনেকগুলো চাকুরী করেছি, ওষুধ কোম্পানী, হাসপাতাল, সংবাদপত্র, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট  কোম্পানী, বাইশ বছর আগে অবসর নেওয়ার পর থেকে আমার জীবন ক্রমশ নীরব হয়ে উঠতে লাগলো শুরু। ২০০৯ সালে আমাদের একমাত্র সন্তান ক্যান্সারে মারা গেল। সারা বাড়িতে আমি আর আমার স্ত্রী! স্ত্রী এমনিতেই শান্ত-চুপচাপ, সমস্ত জীবনে কথা বলতো কম! সন্তান চলে যাওয়ার পর ও আরও চুপ হয়ে গেল। নামাজ-রোজা করতো, কোরআন পড়তো আর নিঃশব্দে কাঁদতো। দু'জনে সকালে নিয়ম মতো নাস্তা করতাম, দুপুরে আর রাতে নিয়ম মেনে খাবার খেতাম। পরের দিন একই নিয়ম!  আমার স্ত্রী এক সময় অসুস্থ হয়য়ে পড়লো। ওষুধ খেতো না, নিয়ম মানতো না। অবশেষে সে নিঃশব্দেই চলে গেল!

প্রথমে আমি ভেবেছিলাম: 'অবশেষে, নিজের জন্য কিছু সময়...'।

আমি কল্পনা করেছিলাম যে আমি শান্তভাবে বাজার করবো, রাঁধবো, খাবো! কিছু কাজ করবো যা আমি সবসময় করতে চেয়েছিলাম।

কিন্তু দিন-দিন, এই নীরবতা আমার পরিচিত সব ক্লান্তিকেও ছাপিয়ে যেতে লাগল।

গোটা শহরে আমার অনেক আত্মীয়-স্বজন, কিন্তু কেউ  আমার খোঁজ নেয় না! ওদের নিজেদের পরিবার, নিজেদের দায়িত্ব, নিজেদের জীবন নিয়ে ব্যস্ত। আমি সেটা বুঝি।

মাঝে-মাঝে আমার মনে হয় ওরা সবাই আমাকে ভুলে গেছে। একবার আমি আমার এক বন্ধুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম:

তোমরা কেন চাও না আমি তোমাদের আড্ডায় আসি …'?

ও শান্ত ঠান্ডা ভাবে উত্তর দিয়েছিল:

'তুমি সবসময়ই ঝামেলা করো, তীর্যক কথা বলো, সবার ভুলগুলো ধরিয়ে দাও! তোমার স্বভাবটাই এমন…'!

আমি চুপ করে গেলাম। বার্তাটা স্পষ্ট ছিল: এখানে তোমার আর কোনো জায়গা নেই।

আমার সব দিনই একরকম: আমি সকালে উঠে বাথরুম সারি, নামাজ পড়ি, নাস্তা বানাই, বাজার করতে যাই, শুধু নিজের জন্যই রান্না করি। বাড়িতে মানুষের কণ্ঠস্বর শুনতে ইচ্ছে করলে টিভি চালু রেখে দিই।

প্রথমে আমি ভেবেছিলাম এটা হয়তো সাময়িক। তারপর অদ্ভুত কিছু উপসর্গ দেখা দিল: মাথা ঘোরা, গ্যাস্ট্রিক, অস্থিরতা, নির্ঘুম রাত।

আমি ডাক্তার দেখিয়েছি। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলেন। শরীরের সব ঠিক আছে।

তারপর ওদের একজন আমাকে বললেন: 'সিদ্দিক সাহেব! আপনার কোন বড় অসুস্থতা নেই। আপনি নিঃসঙ্গতায় ভুগছেন'।

আর এই বাক্যটাই যে কোনো রোগ নির্ণয়ের চেয়ে আমাকে বেশি ব্যথিত করল। কারণ নিঃসঙ্গতার কোনো ওষুধ নেই।

আমি বাইরে কোথাও যাই না! পার্কে না, সভায় না, গানের, নাটকের অনুষ্ঠানে না।  বাইরে সবাই যার যার কাজে-অকাজে ব্যাস্ত! সবাই তাড়াহুড়ো করছে। সবাই ছুটছে যাচ্ছে। আর আমি... আমি এখানেই থেকে যাই।

আমি প্রায়ই নিজেকে জিজ্ঞেস করি: আমি কি কিছু ভুল করেছি? আমি আমার সমস্ত জীবন সকলের জন্য সময় দিয়েছি, সকলের কাজ করে দিয়েছি, আমার জীবনের অনেক দিন, মাস, বছর উৎসর্গ করেছি। অথচ আজ আমি একা!

আমি কারও কোন সহানুভূতি চাইছি না কিন্তু আমি কি সত্যিই একজন খারাপ মানুষ ছিলাম? নাকি এটাই আধুনিক জীবনের ছন্দ, যেখানে একজন বৃদ্ধের কোনো জায়গা নেই?

কেউ কেউ আমাকে বলে, 'একজন সঙ্গী খুঁজে নাও, ইন্টারনেট ব্যবহার করে দেখো'।

কিন্তু আমি পারি না। আমি বিশ্বাস করি না। এত বছর একা থাকার পর, আমার নতুন করে শুরু করার শক্তি নেই। আর আমার স্বাস্থ্যও আর আগের মতো নেই।

আমি আর কাজ করতে পারি না। ক্রমে শক্তিহীন হয়ে পড়ছি! এখন শুধু নীরবতা। আমি কখনো কোনো বড় কিছু আশা করি না।... " 

...

মাত্র ৬ মাস আগে এই লেখার লেখক সিদ্দিক মাহমুদুর রহমান পরশুদিন মারা গেছেন আহসানিয়া মিশন ক্যান্সার হাসপাতালে। 

ডাক ব্যবস্থা নিয়ে তাঁর লেখালেখির শুরু ১৯৮৭ সালে। কয়েকজন বিদেশি বন্ধুর অনুরোধে তিনি মুক্তিযুদ্ধকালীন ডাকব্যবস্থা নিয়ে ইংরেজিতে একটি প্রবন্ধ লিখেন। এরপর ১৯৯১ সালে বাংলা একাডেমি থেকে তার একটি অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়।


এক সময় শখ ছিল ডাকটিকিট সংগ্রহ করার। মুক্তিযুদ্ধের পর বিদেশের গবেষকরা বাংলাদেশের ডাকব্যবস্থা সর্ম্পকে জানতে চায়। তখন সিদ্দিক তাদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতেন। এভাবে উত্তর দিতে গিয়ে তিনি অনেক কিছু জানতে পারেন। এদিকে সমানে বই প্রকাশ হতে থাকে। এক এক করে বাংলাদেশের ডাকব্যবস্থা, ডাকটিকিট, ধাতব ও কাগজি মুদ্রাব্যবস্থার ইতিহাস নিয়ে তার ৩০টি বই প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ ব্রিটেনের রয়েল এশিয়াটিক সোসাইটি তাকে উক্ত প্রতিষ্ঠানের ফেলো নির্বাচিত করে।

গেল ৩৭ বছরে বাংলাদেশের ডাকব্যবস্থা, ডাকটিকিট, ধাতব ও কাগজি মুদ্রা নিয়ে ৩০টি গবেষণা করেছেন। তার আগে দেশের ডাক ব্যবস্থা, ডাকটিকিট, আধুনিক ধাতব ও কাগজ মুদ্রার ইতিহাস নিয়ে এত বেশি গবেষণা আর কেউ করেছেন বলে জানা যায় না। 

তিন হাজারের বেশি বাংলাদেশি ডাকটিকিট সংগ্রহ করেছিলেন সিদ্দিক। তার কাছে ভারত, জার্মানির টিকিটও ছিল। কিন্তু যখন মাত্র ২৫ বছর বয়সে একমাত্র ছেলে ক্যানসারে মৃত্যুবরণ করে, সিদ্দিক এই শোকে এতটাই ভেঙে পড়েন যে জমানো শত শত ডাকটিবিকটের সংগ্রহ, খাম, চিঠি আগুনে পুড়িয়ে ফেলেন। এর আগে কিছু ডাক টিকিট বিক্রি করেছিলেন। ভাগনীর বিয়েতে গহনা ও বরের স্যুট ও ঘড়ি কেনার জন্য।

অসংখ্য গবেষণা করলেও ডাক, মুদ্রা ব্যবস্থা নিয়ে সিদ্দিকের সংবাদপত্রে প্রকাশিত লেখা তেমন নেই। না থাকার পেছনে তার এক বুক অভিমান রয়েছে। নব্বই দশকে যখন ডাকটিকিট নিয়ে লেখা দিতেন। সংবাদপত্রগুলো সেভাবে তা ছাপতো না। এ কারণে মন খারাপ করে আর কখনো কোনো সংবাদপত্রে তিনি লেখা পাঠাননি। ডাকব্যবস্থা ও ডাকটিকিট নিয়ে লেখা ছেপে তা মানুষদের মধ্যে বিলি করতেন। যাতে তারা এর গুরুত্ব বুঝতে পারে। 

তাঁর মৃত্যুর পরে তাঁকে নিয়ে কিছু লেখা দেখে ভদ্রলোকের ওয়ালে কিছু লেখা দেখলাম। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ডাকব্যবস্থা নিয়ে লেখালেখি শুরু করলেও চেতনা শিবিরের মানুষ ছিলেন না। বরং ইন্ডিয়ান আধিপত্যবাদের প্রবল বিরোধী ছিলেন। হয়তোবা সেজন্যই কি যথেষ্ট মনোযোগ পাননি?

* তথ্য সহায়তা: Imran Abdulla (https://www.facebook.com/share/18SfzdRw4u/ )