Search

Showing posts with label ছফা. Show all posts
Showing posts with label ছফা. Show all posts

Saturday, March 27, 2010

মহামতি ছফার সঙ্গে একদিন...

আহমদ ছফাকে অনেক বলে-কয়ে, হাতে-পায়ে ধরে রাজি করিয়েছি অল্প সময়ের জন্য হলেও আমার এখানে আসার জন্য। মানুষটা রাগী গলায় বলেছিলেন, মিয়া, তুমি কী জোঁক, নাকি কচ্ছপ! একবার কামুড় দিয়া আর ছাড়ো না। তা এতো যে ঝুলাঝুলি করতাছো, তোমার ওইখানে দেখার আছেটা কী?
আমি চিঁ চিঁ করে বলেছিলাম, ইয়ে, বলার মত তেমন কিছুই নাই।
এইবার ছফা ভাইয়ের রাগ পানি হয়ে গেল, তোমার কথা শুইনা আমি খুশী হইছি। সবাই বড় গলায় হেন আছে তেন আছে বলে। আরে ব্যাটা, তোর হেন-তেন দেখার লাইগা আমার বয়াই গেছে। সবাই লাইন ধইরা যেইটা দেখে ওইটার সামনে আমি মুতিও না।

মানুষটা ঢুকেই বললেন, ওয়াল্লা, তুমি দেখি দুনিয়ার আবর্জনা জমায়া রাখছ? 'রণ-পা' দিয়া কি করো, ডাকাতি?
আমি ভয়ে ভয়ে বলি, ছফা ভাই, আপনে বললে ফেলে দেই?
ছফা ভাইয়ের চোখ চকচকে, আরে না না, আমার পছন্দ হইছে। এইটা কী বেয়ারিং-এর গাড়ি না?
জ্বী, তিন চাক্কার গাড়ি?
ওই, আমি কি তোমার মত চোকখে কম দেখি, ওই পুলা চাক্কা কয়টা এইটা আমি দেখতাছি না, আমার চোউক নাই? দেখো দেখি পুলার কান্ড, এইটার পেছনে দেখি আবার লেখা বি, এম, ডব্লিউ। খাইছে রে, আরে, এই পুলার দেখি মাতা-মুতা নষ্ট!
আমার হাত কামড়াতে ইচ্ছা করছে। এইটা আবার কেন লেখতে গেলাম! ছফা ভাইয়ের দেখি কিছুই চোখ এড়ায় না! কেন রে বাপু, পেছনে কি লেখা আছে এটা চোখে না-পড়লে কী চলছিল না, না?
ছফা ভাই বলেন, আরে এইটার দেখি আবার ব্রেকও আছে। তা, তোমার এই গাড়ি চলে?
জ্বী, ঠেলা দিলেই চলে।
আহ, ফড়ফড় করবা না তো! এইটা ঠেলা দিলে চলব নাতো কী 'ইগনেশন কি' ঘুরাইলে চলব, ফাজিল কোথাকার। আচ্ছা, বেশ-বেশ। আমি বসতাছি। তুমি পেছনে ধাক্কা লাগাও। শোনো, জোরে ধাক্কা দিয়া আমারে উল্টানোর চেষ্টা করবা না কিন্তু। খবরদার কয়া দিলাম, খবরদার। থাবড়াইয়া কিন্তু কানপট্টি ফাটায়া ফেলব..।
আমি গাড়ি ঠেলি। ছফা ভাই ব্রেক নামের হ্যান্ডেলটা ডানে-বায়ে ভালই ঘোরাচ্ছেন দেখি! মুখে আবার কেমন হুইহুই শব্দও করছেন। মানুষটার পাতলা হয়ে আসা লম্বা লম্বা এলোমেলো চুলগুলো বাতাসে উড়ছে। ও আল্লা, মানুষটা এমন শিশুর মত করছে কেন!


মানুষটার মেজাজ বুঝে কথা বলতে হচ্ছে। কাজটা কঠিন। আমার বাসার বৈঠকখানায় ঘরময় পাটি বিছানো। মানুষটা বসেছেন পা ছড়িয়ে, একটা পার নীচে ২টা কোল-বালিশ দিয়ে আয়েশ করে বসেছেন। একের পর এক সিগারেট টেনে ঘর অন্ধকার করে ফেলেছেন। টুকটাক কথা হচ্ছে।
জানতে চাইলেন, তুমি কি লেখালেখি লাইনে আছো?
আমি প্রায় শোনা যায় না এমন করে বলি, না, ইয়ে মানে, আমি ওয়েব সাইটে লেখার চেষ্টা করি। করি মানে কী-বোর্ড লইয়া কস্তাকস্তি-ধস্তাধস্তি করি।
ধুর, কলম দিয়া না-লেখলে এইটা কোন লেখা হইল! তা তোমার লেখা পড়ে-টড়ে নি কেউ?
পড়ে মানে, ইয়ে, আমি নিজে পড়ি। আমি নিজের কোনো লেখাই মিস দেই না,
কঠিন পাঠক। তাছাড়া কখনও দুই-একজনও পড়ে। পড়ে মানে গুগলে সার্চ দিলে আমার দু-একটা লেখা চইলা আসে। ইদানিং গুগলের ব্রেনে সমস্যা দেখা দিছে। ইয়ের দুধ...রগরগে শব্দ দিয়া সার্চ দিলেও আমার নিরীহ লেখাগুলা চইলা আসে।
ছফা ভাই হাসি গোপন করলেন। একটা সিগারেটের আগুন দিয়ে অন্যটা ধরিয়ে একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, লেখালেখি করা নিয়া তোমার মনে দাগ কাটছে এমন একটা ঘটনা কইতে পারবা?
জ্বী, পারব। রশীদ হায়দার বলেছিলেন, কলম ধরতে লাগে ১০ বছর, কাগজে কলম ছোঁয়াতে লাগে আরও ১০ বছর।
তোমার তো মিয়া, কাগজ-কলমের সাথে কোন সম্পর্কই নাই। তা তোমার কি ২০ বছর কি হইছে?
জ্বী না।
তাইলে তোমার লগে লেখা নিয়া কথা বইলা আরাম নাই। তুমি লেখালেখির খেলা থিক্যা বাদ।


ছফা ভাই এবার বলেন, আমার ভাতিজা নূরুল আনোয়ার বলে তোমারে মেইল করছিল। তুমি বলে শুনলাম, আমারে নিয়া লেখা দিছ?
আমি গলা খাঁকাড়ি দিয়ে বলি, জ্বে, কয়েকটা লেখা লিখছিলাম। কষ্ট-মনন-দারিদ্রতা এবং ছফাপুরান লেখাটা লেখার সময় মেজাজ খুব খারাপ হইছিল, খুব খারাপ।
ছফা ভাইয়ের এবার খোশ মেজাজ, 'ওঙ্কার' পড়ছ?
জ্বী-অ, ফাটায়া ফেলছেন!
আমার করা অনুবাদ 'ফাউস্ট' পড়ছ?
জ্বী। বেশি ভাল লাগে নাই।
তুমি ছোট মাছের মাথা বেশি কইরা খাইবা।
ছফা ভাই, আমি মাছ তো তেমন খাই না।


একদম মিল্লা গেছে। এই লাইগাই তো তোমার ব্রেন নাই। ব্যা-এ-এ, তুমি আমার অনুবাদ ফাউস্ট বুঝলে ছাগলও বুঝব। তোমার লাগে বকবক কইরা খিদা লাগছে। কি খাওয়াইবা?
আমি ঝলমলে মুখে বলি, আপনের 'পুষ্প, বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরান' বইটা পইড়া মাথা আউলা-ঝাউলা হয়া যাওয়ার পর বাইগুন গাছ, টমেটো গাছ লাগাইছিলাম। বাইগুন গাছে একটা বাইগুন ধরছে। একটা লম্বা, একটা সাদা বাইগুন, গোল। আপনের জন্য একটা দিয়া ভর্তা, একটা দিয়া সালুন। দু-তিনটা টমেটোও ধরছে। একটা পাকছে, ওইটা দিয়া সালাদ হইব।

ছফা এবার মাথা ফেলে দিলেন।
আমি ছফা ভাইকে আশ্বস্ত করি, না-না, ছফা ভাই, আরও আইটেম আছে। যে কমলা গাছটার নাম দিছিলাম 'ছফাবৃক্ষ', ওইটায় কমলা ধরছে। খাওয়ার পর কমলা...।
ছফা ভাই হাত উঠিয়ে থামিয়ে দিলেন, তোমার এইসব খাওয়ার পর আমার এইখান থিক্যা যাওয়ার শক্তি আর থাকব না। তুমি বিদায় হও।
আমি হাসি গোপন করলাম। হি হি হি, আমাকে বলছেন আমারই বাসা থেকে...বিদায় হতে...হিহিহি।


*এই লেখাটা পুরোটাই বানানো কিন্তু এই লেখার ছত্রে ছত্রে আছে আহমদ ছফা নামের অসাধারণ মানুষটার প্রতি আমার অন্য ভুবনের ভালোবাসা।
ছফা, তুমি ঘুমাও।


সহায়ক সূত্র:
১. ছফাকে নিয়ে কিছু লেখা: http://tinyurl.com/4w8ggos
২. কষ্ট-মনন-দারিদ্রতা এবং ছফাপুরান  

Saturday, June 20, 2009

ছফা-বৃক্ষ: ২

এই মরিচ গাছটা কেমন করে এখানে হলো এ নিয়ে আমার বিস্ময়ের শেষ নাই। শ্যাওলাপড়া ইটের ফাঁকে কেমন করে গাছও হয়, তরতাজা হয়ে বেঁচেও উঠে! দেখো দিকি কান্ড, আবার ঢাউস-ঢাউস মরিচও ধরেছে।

ছফার স্পর্শ পেয়ে রাস্তায় পড়ে থাকা থ্যাতলানো বেগুন গাছ দিব্যি বেঁচে উঠে।
তাই আমি এর নাম দিয়েছি ছফা-বৃক্ষ। ইতিপূর্বে একটা কমলা গাছের নাম দিয়েছিলাম, ছফা-বৃক্ষতাই এটার নাম ছফা-বৃক্ষ: ২।

খাবার আগে হেলতে দুলতে যাই, একটা মরিচ পেড়ে নিয়ে আসি। সালুনসহ ধোঁয়াওঠা সাদা-সাদা ভাতের এককোনে চকচকে মরিচটা দেখেই মনটা ভালো হয়ে যায়। কচ করে কামড়, এরপর কচকচ-কচকচ। কী ঝাল রে বাবা- ছফার মতই ঝাল!

Friday, May 15, 2009

কষ্ট, মনন-দারিদ্রতা এবং ছফা পুরান

আহমদ ছফা নামের মানুষটা পাগল ছিলেন কিনা জানি না কিন্তু পাগল বানাবার কারখানা ছিলেন এটা আমি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি। কলমের শপথ, তিনি তাঁর পাগলামির অনেকখানি আমার মধ্যে সংক্রমিত করতে পেরেছেন। ভয়াবহ আকারে পেরেছেন! এই কান্ডটা ঘটেছে তাঁর 'পুষ্প, বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরান' পড়ে!

আমি কোথাও লিখেছিলাম, 'প্রকৃতি এবং প্রকৃতির সন্তানদের জন্য রয়েছে আমার প্রগাঢ় মমতা'। ছফার সম্মানে, তাঁর তীব্র আলো ছটায় ঝলসে, আজ আমি আমার এই কথাটা কেবল ফিরিয়েই নিচ্ছি না, আমার এই ভাবনাটাকে ধৃষ্টতাপূর্ণ মনে করছি।
আহমদ ছফার সঙ্গে কারও তুলনা হয়? ছফা একটা শিশু আপেল গাছের জন্য কলকাতা থেকে রাতারাতি উড়ে চলে এসেছিলেন। প্লেনের ফিরতি টিকেটের জন্য বাংলাদেশ বিমানের অফিসে কেবল মারামারি করতে বাকি রেখেছিলেন। আমি নিশ্চিত, তাঁকে ফেরার টিকেট না দিলে অফিসারের নাকে গদাম করে ঘুসিও বসিয়ে দিতেন!

এটা মিথ্যা না, একদা আমারও ছিল প্রকৃতি এবং তার সন্তানদের জন্য খানিকটা ভালবাসা। নিজস্ব কষ্ট, জাগতিক জটিলতায়, কোথায় উবে গেল সেইসব ভালবাসা। চকচকে চোখ অথচ সবই কেমন ধুসর।
একদা গাছ কিনতাম পাগলের মত। মানুষে ঠাসাঠাসি রেলের বগিতে দু-পা ফেলার জায়গা নেই অথচ আমি ঠিকই দু-হাতে গাছভর্তি ব্যাগ নিয়ে একপায়ে দাঁড়িয়ে থেকেছি ঘন্টার পর ঘন্টা। গাছগুলো দৃষ্টিনন্দন ছিল বটে কিন্তু অকাজের। কাঠের গাছ লাগালে আজ লাখ-লাখ টাকায় বিক্রি করতে পারতাম।
আমার লাগানো গাছগুলো কয়টা মরে গেল, কোনটায় পানি দেয়া হলো না তার খোঁজ কে রাখে। ভাবখানা এমন, বাঁচতে পারলে বাঁচো, নইলে মরে যাও, বাপ, আমার কী দায় পড়েছে।

তাঁর 'পুষ্প, বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরান' বইটা পড়ে আমার মাথা এলোমেলো হয়ে গেল। একজন মানুষের পক্ষে কেমন করে সম্ভব প্রকৃতি-তার সন্তানদের প্রতি এমন অতীন্দ্রিয় ভালবাসা লালন করা।
অনেকদিন পর আমি আমার লাগানো গাছগুলোর পাশে এসে দাঁড়ালাম। প্রত্যেকটা গাছের গোড়ার মাটি পাথরের মত শক্ত। আমার বুক ভেঙ্গে আসছিল, আহারে, বেচারা, শ্বাস নিতে পারছে না। আমার কী কাতর, কী হাহাকার করা ভঙ্গি।
দারুচিনি গাছটায় কেমন লালচে পাতা মেলেছে। কমলা গাছে ছোট-ছোট কমলা ধরেছে, গাছটা ফুলে ফুলে ছেয়ে আছে। কমলা গাছটার ফুলের কী তীব্র গন্ধ! আমি গাছটাকে বললাম, যাও, আজ থেকে তোমার নাম দিলাম ছফাবৃক্ষ

বিকেলে একজন একমুঠো ফুল এনে আমার কাছে মেলে ধরে বললেন, দেখেন কী ঘ্রাণ! আমি নিমিষেই চিনে ফেললাম, এটা কমলা গাছটার-ছফাবৃক্ষের ফুল। ভ্রুণ-হত্যার মত আমি ওই খুনি মানুষটা দিকে তীব্র আক্রেশে তাকিয়ে রইলাম। কসম আমার লেখালেখির, মানুষটা কাছে আমি বিভিন্ন ভাবে ঋণী না হলে তাকে স্রেফ খুন করে ফেলতাম।

আমি ছুটে গিয়ে কমলা গাছটার কাছে দাঁড়ালাম, বিড়বিড় করে বললাম, ছফাবৃক্ষ, তোমার কাছে আমি নতজানু হয়ে ক্ষমা চাই। তোমার শেকড় মাটিতে, ছফারও। ছফা নামের মানুষটাকে বলো, মনে কষ্ট পুষে না রাখতে।

আমার ওই পোস্টটা দ্বৈতসত্তা-জিনতত্ত্ব, আমার সৃষ্ট জামি চরিত্রটি যখন মৃতপ্রায় কাকের বাচ্চাটাকে বাঁচাবার আপ্রাণ চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে চোখের জলে ভাসতে থাকে। ওইটা তো অন্য কেউ না, আমার ভেতরের শিশুটা। খুনি জামিও কেউ না, আমার ভেতরের পশুটা। ভেতরের শিশু এবং পশুটার হরদম মারামারি লেগেই আছে, ফাঁক পেলেই একজন অন্যজনকে ছাড়িয়ে যায়।

তাঁর 'পুষ্প, বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরান' বইটা পড়ে আমার বুকের ভেতর থেকে হাহাকার বেরিয়ে আসছিল, কেন এই মানুষটা নোবেল পাবেন না? কেন, পাবেন না, কেন! কেবল এই একটা বই-ই যথেষ্ঠ ছিল নোবেল কমিটির লোকজনদের প্রভাবিত করার জন্য।
আর্নস্ট হেমিংওয়েকে ১৯৫৪ সালে যখন নোবেল দেয়া হয় তখন নোবেল কমিটি সাহিত্যে তার অবদান সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেন, 'His vigorous art and the influence of his style on the literary art of our times as manifested in his book "The Old Man and the Sea"...'

"The Old Man and the Sea" তাদের অসম্ভব প্রভাবিত করেছিল এটা সহজেই অনুমেয়। আমাদেরকেও প্রভাবিত করে, আমাকেও। যখন মনে হয় হাল ছেড়ে দেই তখন বুড়ো সান্তিয়াগো কোত্থেকে অজানা সাহস নিয়ে আসে।

আমি নোবেল কমিটির প্রতি করুণা বোধ করি, এদের 'পুষ্প, বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরান' পড়ার সৌভাগ্য হয়নি! কতিপয় বই নামের গ্রন্থ আছে যার কোন অনুবাদ চলে না। 'পুষ্প, বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরান' এমন একটা গ্রন্থ। এমনিতেও অনুবাদক মানেই বিশ্বাসঘাতক- এ্যাদুত্তোর এ্যাদিতর।

আমাদের দেশটা দরিদ্র। তারচেয়ে দরিদ্র আমরা মননে। তাই ছফার মত মানুষকে অবহেলায় সমাহিত করা হয়। এতে ছফার কিছুই যায় আসে না। তিনি হয়তো তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বলতেন, আমি বুদ্ধিজীবীদের ইয়েতে মুতিও না। কিন্তু দরিদ্র থেকে হতদরিদ্র হয়ে গেল আমরা, শূণ্যমনন! পাতক থেকে মহাপাতক!

আমাদের সমস্ত দান, অদানে-অব্রাক্ষণে। এরশাদের মত কবির কবিতা (যা দিয়ে আমি আমার বাচ্চার গু-ও পরিষ্কার করব না) পৃথিবীর অনেকগুলো ভাষায় অনুদিত হয়েছিল। ছফার 'পুষ্প, বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরান' কয়টা ভাষায় অনূদিত হয়েছিল? কেবল বাংলা ভাষায়!
তবে আমি এটাও দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করি, 'পুষ্প, বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরান' অনুবাদ হলেও লাভ হতো না। অন্য ভাষার লোকজন এর দশ ভাগও বুঝত কিনা এতে আমার ঘোর সন্দেহ। ওই যে বললাম, 'এ্যাদুত্তোর এ্যাদিতর'।

হুমায়ুন আজাদের বলেছিলেন, "রবীন্দ্রনাথের পর সম্ভবত এরশাদের লেখাই বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তার কবিতা নামের এইসব আবর্জনার প্রশংসা শুরু করলেন কতিপয় দালাল- কবি...।"
এই দালাল কবিদের লেখা দিয়ে ভরে থাকে আমাদের সাহিত্য পাতাগুলো। এরা কী লম্বা লম্বা বাতচিতই না করেন দেশ নিয়ে দেশের মানুষ নিয়ে! এই আমাদের তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা ওইসব এরশাদের কবিতা নিয়ে কী আহা-উহু না করেছেন। তাদের কীসব অতিশয়োক্তি প্রকাশ, লজ্জায় মাথা কাটা যায়। বেশ্যা তাঁর দেহ বিক্রি করেন ক্ষিধার জ্বালায়, অধিকাংশ বুদ্ধিজীবী তার বুদ্ধি বিক্রি করেন লোভের জ্বালায়। আমাদের দেশের অধিকাংশ বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে বেশ্যার তেমন পার্থক্য নাই।

এই দেশে একটা ডকুমেন্টরি বানালেও দেখবেন, কত ভাবে দেশকে ছোট করা যায় তার প্রাণান্তকর চেষ্টা। যেন বন্যা, মাদ্রাসা, অভাব এসব ব্যতীত আর দেখাবার কিছু নেই।
প্রবাসে এক বাঙ্গালি মহিলা জুতা কেনবার জন্য এ দোকান-ও দোকান ছুটে বেড়াচ্ছিলেন, ঠিক পছন্দসই জুতাটা চোখে লাগছিল না। তার এই অস্থিরতা দেখে একজন সেলস-গার্ল বলল, 'তোমার সমস্যাটা কী, জুতা নিয়ে তুমি
এত চুজি কেন? তোমাদের দেশের মহিলারা তো জুতাই পায়ে দেয় না'!
আমার ওই সেলস-গার্লকে চাবকাতে ইচ্ছা করে না, এই দেশের তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের পশ্চাদদেশে গদাম করে লাথি মারতে সুতীব্র ইচ্ছা জাগে। কারণ, এরা পৃথিবীর কাছে আমাদের দেশটাকে এভাবেই তুলে ধরেন- খালি পায়ের মহিলারা, অপুষ্ট শরীরে ততোধিক অপুষ্ট দু-চারটা শিশুসহ। টাকা কামাবার ধান্দায় এরা পারলে মাকেও বিক্রি করে দেবেন, অবলীলায়।

যেন আমাদের অহংকার করার কোন কোন ঘটনাই নাই। যেন আমাদের ছফা নেই! আবার এরাই ঘটা করে বলেন, আমাদের দেশে ভাল লেখা কোথায়? তো, পাশের দেশ ভারত থেকে আমদানী করো। ভারতের দেবতা-দাদা-লেখকরা যখন এদেশে এসে দেশউদ্ধার করতেন তখন আমাদের দেশের প্রায় সমস্ত লেখক তাঁদের সামনে মাখনের মত গলে যেতেন; একা ছফাই দাঁড়াতেন মহীরুহ হয়ে। তাঁর সামনে তাসের মত উড়ে যেত মেরুদন্ডহীন বুদ্ধিজীবীরা। অবশ্য আমাদের দেশের এইসব মস্তিষ্ক-পায়ু একাকার হয়ে যাওয়া মানুষদের কাছ থেকে খুব একটা আশা করাটাও বোকামি বৈকি। এমনিতেও এইসব বুদ্ধিজীবী নামের প্রাণীদের বুদ্ধির খেলা দেখলে মনে হয়, অতিদর্পে হতা লঙ্কা! হায় বুদ্ধিজীবী, বেড়ো নাকো ঝড়ে পড়ে যাবে।


*ছবিঋণ: খান ব্রাদার্সের প্রকাশিত আট খণ্ডে পূর্ণাঙ্গ আহমদ ছফা রচনাবলী, দ্বিতীয় খণ্ড থেকে নেয়া।

Sunday, April 26, 2009

ছফা, একজন অন্য ভুবনের মানুষ!

ছফা নামের মানুষটাকে অর্থ-বিত্ত, পদ, পুরস্কার কিছুই দিয়ে আটকে রাখা যায়নি। আমাদের দেশের যে কোন লেখককে বাংলা একাডেমির পুরস্কার দেয়ার কথা বললে তিনি নিজ শরীর থেকে খানিকটা চামড়া খুলে দিতে পিছ পা হবেন বলে তো আমার মনে হয় না।

ছফাই ব্যতিক্রম! তিনি কারও তদ্বিরের জোরে তাঁকে যেন বাংলা একাডেমির পুরস্কার দেয়া না হয় এ জন্য কম ধুন্ধুমার কান্ড করেননি।

তৎকালিন বাংলা একাডেমির মহা-পরিচালককে ফোন করে বলেছিলেন, "...আমাকে নির্বাচিত করার যোগ্যতা যেদিন হবে সেদিন আমি পুরস্কার এমনি পেয়ে যাব। কারও তদ্বিরে নয়। হুমায়ূন (হুমায়ূন আহমেদ) যদি তদ্বিরের মাধ্যমে (আমার জন্য) পুরস্কার আদায় করতে সক্ষম হয় তো, আমি বলছি, উক্ত পুরস্কার আপনার মাথায় ভাঙব।"

হুমায়ূন আহমেদকে এ জন্য হাতজোড় করে ক্ষমা পর্যন্ত চাইতে হয়েছিল।
ছফার মৃত্যুর পর হুমায়ূন আহমেদ ভোরের কাগজে লিখেছিলেন, "...ছফা ভাই আমাকে ডেকে পাঠালেন এবং কঠিন গলায় বললেন, আপনার কি ধারণা, পুরস্কার (বাংলা একাডেমির পুরস্কার প্রসঙ্গে) প্রতি আমার কোন মোহ আছে?
আমি বললাম, না।
তাহলে কেন আমার জন্য নানান জনের কাছে সুপারিশ করে আমাকে ছোট করলেন। আমার কোনো ব্যাপারে আপনি কখনই কারও কাছে সুপারিশ করবেন না।
(আমি বললাম) জ্বি আচ্ছা, করব না।
আপনি হাত জোড় করে আমার কাছে ক্ষমা চান।
আমি হাত জোড় করে ক্ষমা চাইলাম।"

আহমদ ছফা মোহাম্মদ আমীনকে কথা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, "একাডেমি জানে, পুরস্কার আমি কাউন্সিলরদের মাথায় এবং সভাপতির মুখে ছুঁড়ে দিয়ে বলব, তোমরা যা সম্মানের ভাবো, তা আমার কাছে আধুলি। ভিক্ষুকের কাছে আধুলির মূল্য অনেক বেশি, আমি আধুলি না, গোলাপ চাই...।"

বাংলা একাডেমি নিয়ে ছফার তীব্র ক্ষোভ ছিল। আমি তাঁর ক্ষোভকে যথার্থ মনে করি। বাংলা একাডেমির প্রতি তাঁর মন্তব্যে খানিকটা আঁচ করা যাবে। "বাংলা একাডেমিতে মযহারুল ইসলামের মত কুখ্যাত লোক পর্যন্ত ডাইরেক্টর জেনারেল হয়ে গেল। আমরা কলকাতায় থাকাকালে (মুক্তিযুদ্ধের সময়) একটি পত্রিকায় তার অপকর্মের প্রতিবাদ করেছিলাম। দেশে এসে দেখি তিনি বাংলা একাডেমির ডাইরেক্টর জেনারেল, ওয়াল্লা!"

আমি ছফার ক্ষোভকে যথার্থ মনে করি। বাংলা একাডেমি অভিধান এবং কিছু গ্রন্থ প্রকাশ করা ব্যতীত এই সুদীর্ঘ বছরে কাজের কাজ কিছুই করেননি এঁরা। অবশ্য ফি-বছর বইমেলার আয়োজন ব্যতীত।
একেকজন চলমান জ্ঞানের ভান্ড! কাত করলেই গড়িয়ে যাবে।
একবার 'উত্তারাধিকার' নামে বাংলা একাডেমির ত্রৈমাসিক পত্রিকাটি যোগাড় করার জন্য ঢাকা যেতে হল। এই নিয়ে একজন উপ-পরিচালককে বিনীত ভঙ্গিতে বলেছিলাম, 'আপনার দেশব্যাপি এটা বিক্রি করার ব্যবস্থা করলে আমরা যারা ঢাকায় থাকি না, তাদের সুবিধা হয়।'
তিনি বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন, 'এটা তো সবার জন্য না। যার দরকার হবে সে এখানে এসে যোগাড় করবে।'
অথচ আমি দেখেছি, একাডেমির গুদামে হাজার হাজার কপি অবহেলায় পড়ে আছে, উলু খাচ্ছে। পাঠক হিসাবে উলু, মন্দ না!'

বাংলা একাডেমি আয়োজিত বইমেলার উদ্বোধন করেন সরকার প্রধান। কেন করেন? এটা আমার মোটা-মাথায় ঢোকে না। একজন প্রবীন বিশিষ্ট সাহিত্যিক করলে, কী হয়?
তো, এই বিষয়ে গত হাসিনার সরকার আমলে, বাংলা একাডেমির মহা-পরিচালকের দৃষ্টি আকর্ষন করা হলে তিনি পত্রিকাটিকে উত্তর দিয়েছিলেন, "তিনি একজন বিশিষ্ট সাহিত্যিক এই কারণে তিনি উদ্বোধন করছেন।"
এমন জ্ঞানের ভান্ড একাডেমির মহা-পরিচালক হলে, এই একাডেমির যোগ্যতা সহজেই অনুমেয়।

রাজনীতিবিদদের কথা নাহয় বাদ দিলাম। এবারের কেয়ার-টেকার সরকার বাহাদুর কী করেছেন? ফখরুদ্দিন সাহেব লম্বা একটা পাঞ্জাবি লাগিয়ে বইমেলা উদ্বোধন করেছেন। অথচ তাঁর একটা চমৎকার সুযোগ ছিল, একটা অসাধারণ উদাহরণ সৃষ্টি করা।

ছফা তার সমস্ত জীবনে নিজের জন্য কারও কাছে কিছু চাননি কিন্তু কারও উপকার হবে এমনটা মনে করলে কাতরতা দেখাতে, নিজেকে ছোট করতে কার্পণ্য করতেন না। কিন্তু তাকে দিয়ে কোন অনায্য কাজ করানো যেত না। যে মোহাম্মদ আমীন ১১ বছর ছফার সহচর্যে ছিলেন। একই সঙ্গে একই বাড়ি থেকেছেন, খেয়েছেন। সেই মোহাম্মদ আমীন বলেন, 'আমি জানতাম, হাসনাত আবদুল হাইয়ের সঙ্গে আহমদ ছফার ভাল জানা-শোনা আছে। হাসনাত সাহেব তখন ভূমি সচিব'।
"আহমদ ছফাকে বললাম, আমাকে ঢাকা জেলার কোন থানায় পোস্টিং দিতে আপনার বন্ধু হাসনাত স্যারকে একটু বলুন না।
আহমদ ছফা ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, নো, দিস উজ ব্যাড প্র্যাকটিস। তুমি আমলা হয়ে গেছ, আসল আমলা। বুঝতে পারছ কি, তুমি যে আমার কাছ থেকে দূরে সরে গেলে?
প্রচন্ড লজ্জা পেলেও আমি হাল ছেড়ে দিলাম না। ঢাকা কিংবা আশেপাশে আমার থাকা প্রয়োজন, নেসেসিটি নোজ নো ল।
আমি বললাম, আপনি তো অনেকের জন্য সুপারিশ করেন।
ছফা বললেন, যাদের জন্য সুপারিশ করি তাদের কষ্ট আমার লজ্জা পাওয়ার কষ্ট থেকে বেশি থাকে। তোমার জন্য সুপারিশ না করলে তোমার যে কষ্ট হবে, করলে আমার তার চেয়ে অধিক কষ্ট হবে। কারণ তোমার চাহিদাটা অত্যাবশ্যক না, জৌলুশ মাত্র। আর আমি যাদের জন্য করি তাদেরটা অত্যাবশ্যক।"

পশ্চিম বাংলার সাহিত্যর পাশে বাংলাদেশের সাহিত্যকে মাথা উঁচু করে দাড় করানোর প্রয়াসীদের মধ্যে আহমদ ছফা প্রথম! ১৯৯৪ সালে বুকে পোস্টার ঝুলিয়ে বাংলাদেশে আনন্দ বাজারের বই আমদানির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন।
স্বাধীনতাউত্তর বাংলাদেশে আসা কলকাতার বুদ্ধিজীবীদের নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছিলেন। যেখানে সবাই কলকাতার বুদ্ধিজীবীদের পায়ে তাদের কলম সমর্পন করেছিলেন।

এই হচ্ছেন ছফা!

*বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে বড় বাক্য ছফার। শিল্পী সুলতানকে বর্ণনা করতে গিয়ে প্রায় আধ-পৃষ্ঠা ব্যাপি দীর্ঘ বাক্যটি রচনা করেছিলেন। বাক্যটা খুঁজছি। কোথাও পাচ্ছি না।
 

**ছবিঋণ: নাসির আলী মামুন।

Saturday, April 25, 2009

মুক্তিযুদ্ধে, একজন আহমদ ছফা।

বাংলাদেশের প্রথম পত্রিকা কোনটি?
বাংলাদেশের প্রথম পত্রিকা 'প্রতিরোধ'। এই পত্রিকার প্রকাশক, সম্পাদক, প্রচারক ছিলেন আহমদ ছফা।

আহমদ ছফার জবানিতে শুনুন, "শেখ সাহেবের রেসকোর্স মিটিং-এ বিক্রির জন্য আমরা কয়েকজন পত্রিকাটি বার করেছিলাম।...
পত্রিকার একটি কপি আহমদ শরীফের হাতে দিয়েছিলাম। পাওয়ামাত্র চোখ বুলিয়ে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন। আমাকে জড়িয়ে ধরে ড. শরীফ বলেছিলেন, 'আমার এখন মনে হচ্ছে, আমি এখন পাকিস্তানে না, স্বাধীন বাংলাদেশে আছি। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে গেছে। তুমি, তুমিই স্বাধীনতার বরপুত্র, নায়কের জন্মদাতা, প্রতিরোধ তার মাধ্যম'।

ড. শরীফ পত্রিকার বিনিময়ে তার পকেটে যত টাকা ছিল সব আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। গুণে দেখেছিলাম, ৯৮ টাকা। সেই সময়ের ৯৮ টাকা, ভাবা যায়!
...প্রতিরোধ পত্রিকাটির বিক্রি ছিল অবিশ্বাস্য! পত্রিকাটি বিক্রি করে খরচ বাদ দিয়ে লভ্য দশ হাজার টাকা যুদ্ধ প্রস্তুতি সহায়তা তহবিলে প্রদানের জন্য ফরহাদ মাযহারের হাতে তুলে দিয়েছিলাম। বেচারা এখন লম্বা লম্বা বুলি ছাড়ে, কিন্তু ঐদিন টাকাগুলো কোথায় কিভাবে হাওয়া করে দিয়েছিল, সে হিসাব আমাকে এখনও দেয়নি।

১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম লেখক সংঘ করে স্বাধীনতার প্রয়োজনীয়তাকে যখন সাহিত্য সংস্কৃতিতে অঙ্গীভূত করার পরিকল্পনায় আমরা মেতে উঠেছিলাম তখন শামসুর রাহমান আমাদেরকে দেশদ্রোহী বলে গালি দিয়েছিলেন।

বাংলা সাহিত্যের বিপ্লব, গৌতম বুদ্ধের ভাষা বিপ্লব। গৌতম বুদ্ধকে আমি ভাষা বিপ্লবী বলি। তিনিই বাংলা ভাষার প্রথম ভাষা সৈনিক। পালি ভাষায় ত্রিপটক রচনা করে তিনি সংস্কৃত ভাষার গ্রাস হতে সদ্যজাত ভাষা বাংলাকে রক্ষা করেছিলেন। নইলে বাংলা বলে কোন ভাষা আমরা পেতাম না। এরপর বায়ান্ন সাল আসল...।"

তথ্য উৎস: "আহমদ ছফার চোখে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী", মোহাম্মদ আমীন। পৃষ্ঠা নং: ১৯-২০
...
ছফার মৃত্যুর পর মন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক সিটি কর্পোরেশনকে নিষেধ করে দিয়েছিলেন, যাতে ছফাকে বুদ্ধিজীবী গোরস্থানে দাফনের অনুমতি না দেয়া হয়।
মুক্তিযোদ্ধা সংসদের চেয়ারম্যান আহাদ চৌধুরী বলেছিলেন, 'আহমদ ছফা কে? তিনি কি মুক্তিযোদ্ধা? কোন সেক্টরের যোদ্ধা ছিলেন'?

হায় নির্বোধ, হায় গোডিমওয়ালা বালক! এই বালককে কে বোঝাবে, সব যুদ্ধ স্টেনগান দিয়ে হয় না! একেজনের যুদ্ধ করার ভঙ্গি একেক রকম।

হারুনুর রশীদ আহাদ চৌধুরীকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছিলেন, 'আহমদ ছফাকে না চেনা অজ্ঞতা, ইতরামি, না ক্রইম? আমি আপনার কাছ থেকে এর উত্তর প্রত্যাশা করি'। 
তৎকালিন শাসকদের ছফার প্রতি তীব্র রোষ ছিল কী এইজন্য?

ছফাকে বুদ্ধিজীবী গোরস্থানে দাফন করা যায়নি। এই নিয়ে বুদ্ধিজীবী মহলে তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি।
অথচ ছফার জীবিত অবস্থায় কোন বুদ্ধিজীবীকে এমন অপমান করলে হুমায়ূন আহমেদের পরিবারের উচ্ছেদের মত আরেকটি ঘটনা না ঘটিয়ে ছাড়তেন না। মৃতের খাটিয়া ধরে বলতেন, শহীদ বুদ্ধিজীবীকে যথাস্থানে সমাহিত করতে হবে, নইলে আমিও তার সাথে কবরে যাব। আমাকেও খাটিয়ায় তোল।

কর্নেল তাহেরকে যখন ফাঁসির আদেশ দেয়া হল, ভয়ে সবাই চুপ, কারও মুখে রা নেই। মনে হয় যেন এটাই হওয়া উচিৎ ছিল। একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলেন ছফা। তিনি তাহেরের ফাঁসির আদেশ রদ করার সপক্ষে জনমত সংগ্রহ ও সরকারকে চাপ দিতে বুদ্ধিজীবীদের স্বাক্ষর সংগ্রহ করতে বেরিয়েছিলেন।

আজ যারা বুদ্ধিজীবীর ছাল গায়ে দিয়ে ঘুরে বেড়ান তাদের মধ্যে খুব কম মানুষই আছেন, যিনি ছফার দ্বারা কোন না কোন ভাবে উপকৃত হননি।
আসলে ছফা এই দেশে আগেভাগেই জন্ম নিয়েছিলেন। তাঁর আসার কথা ছিল আরও অনেক কাল বাদে...।

তাঁর অনূদিত 'ফাউস্ট' থেকে ক-লাইন যোগ করি:

"খোদাতালা: অধিক বলার আছে?
নালিশ সে তো তোমার সত্তার অংশ
কিছুই তোমার চোখে ঠেকেনি সুন্দর?
মেফিস্ট: না-হে প্রভু, সত্য কহি
তোমার এ দুনিয়াটা অতিশয় খল
সেখানে মানুষ গেলে
এতো বেশি পাপে ডোবে
শয়তানও বিরক্ত হয় চাতুরি খেলাতে
পাপপুণ্য বোধহীন পামর মানুষ।"

*ছবি এবং আংশিক তথ্যঋণ: মোহাম্মদ আমীন।

Friday, June 29, 2007

আহমদ ছফা, দুম করে মরে গেলেন যে!

আহমেদ ছফাকে আমার মনে হয়, চলমান একটা জ্ঞানের ভান্ডার। তাঁর পরিচয় নির্দিষ্ট গন্ডিতে নিয়ে আসা বাতুলতা মাত্র। এই মানুষটাকে বাংলাদেশের এবং কলকাতার বুদ্ধিজীবীরা যমের মতো ভয় করতেন। তিনি কাউকে ছাড় দিয়ে কথা বলতেন না! শেখ মুজিবর রহমানের বিশাল অফার তিনি অবলীলায় ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। পাশাপাশি মানুষটা ছিলেন ভারী অহংকারী। কিন্তু ছফা নোবেল পুরষ্কার পেলেন না কেন- এ ক্ষোভ কার কাছে বলি?

এর চেয়ে অনেক কম অহংকারী মানুষকে আমি বিভিন্ন লেখায় তুলাধোনা করেছি। এ কারণে অনেকেই আমার প্রতি রুষ্ট হন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, আমার মতো অখ্যাত কলমচীর এই অধিকার নাই। আমি স্বীকার করি, আমার যোগ্যতা নাই- কিন্ত আমি ‘ধুনকর’ এর ভূমিকা থেকে পিছপা হইনি।

কিন্ত, ছফার বেলায় তাঁর অহংকার ছাপিয়ে আমার চোখ জলে ছাপাছাপি হয়ে যায়। এই ঘটনাটা যখন আমি পড়ি, আমার চোখের পানি আটকাতে পারিনি। গলা ছেড়ে আমার বলতে ইচ্ছা করছিল, আহমেদ ছফা, আপনি কেন মরে গেলেন? এ ভাবে দুম করে মরে যাওয়াটা কি কাজের একটা কাজ হলো! তাঁর অজস্র কান্ড থেকে একটা তুলে দিচ্ছি: 

(উপাত্তটা নেয়া হয়েছে: আহমদ ছফার চোখে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী/ মোহাম্মদ আমীন।)

“স্বাধীনতা যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর হুমায়ূন আহমেদ তাঁর মায়ের সাথে বাবর রোডের একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে উঠেছিলেন। বাংলাদেশ সরকার শহীদ পরিবারের সম্মানার্থে হুমায়ূন আহমেদের মায়ের নামে ওই পরিত্যক্ত বাড়িটি বরাদ্দ করেছিলেন। কিন্ত অল্প কয়েক দিন পর গভীর রাতে রী বাহিনীর একটি সশস্ত্র দল হুমায়ূন পরিবারকে বাড়ি থেকে বের করে দরোজায় তালা লাগিয়ে দেয়। চারিদিকে ঘোর অন্ধকার, কোথায় যাবেন তাঁরা?
সকাল হল, কেউ নেই, কেউ আসার কোনো আশা নেই। চর্তুদিকে গিজগিজ করছে রক্ষী বাহিনী। কার বুকে এত পাটা যে এগিয়ে আসবে। আহমদ ছফা এসে হাজির। ছফার হাতে একটি টিন, কেরোসিনে ভর্তি, কাঁধে মোটা চাদর। এ নিয়ে আমীন এবং ছফার কথোপথন:

মোহাম্মদ আমীন: আপনি কি হুমায়ূনের কাছে একাই গিয়েছিলেন?
আহমদ ছফা: হাঁ, একাই। তবে হাতে একটা কন্টেনার ছিল, তাতে পাঁচ লিটার কেরোসিন, কিনেছিলাম।
আমীন: কেরোসিন কেন?
ছফা: জ্বলব এবং জ্বালাবো বলে।
আমীন: কাকে?
ছফা: নিজেকে এবং গণভবনকে। আমি হুমায়ূনকে বললাম, হুমায়ূন আমার সাথে রিক্সায় উঠুন, আমরা গণভবন যাব। একটি রিনাউন শহীদ পরিবারকে বাড়ি হতে উচ্ছেদ করে জ্ঞানীর কলমের চেয়েও পবিত্র রক্তকে অবমাননা করা হয়েছে। অপমান করা হয়েছে স্বাধীনতা ও জাতির আত্মদানের গৌরবমন্ডিত ঐশ্বর্যকে। আমি কেরোসিনঢেলে আত্মহুতি দেবার সংকল্পে উম্মাদ হয়ে উঠেছিলাম সে দিন।

আমীন: কেন?
ছফা: যে দেশের সরকার স্বাধীনতায় জীবন বিসর্জনকারী একজন প্যাট্রিয়ট পরিবারকে বাসা হতে গভীর রাতে উচ্ছেদ করে দেয়ার মত জঘন্য ঘটনা ঘটাতে পারে সে দেশে আর যাই থাকুক, আমি নেই। এমন ঘৃণ্য দেশে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়া অনেক ভাল, অনেক। তো, আমি হুমায়ূনকে বললাম, আপনি তাড়াতাড়ি রিক্সায় উঠুন।

হুমায়ূন বললেন, কোথায় যাব?
আমি বললাম (ছফা): গনভবনে যাব। নিজের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেব। একটি শহীদ পরিবারের প্রতি যে অপমান করা হয়েছে- তার প্রতিবাদে এ কাজটা করব। আত্মহুতি।
হুমায়ূন: কি বলছেন ছফা ভাই?
ছফা: কথা বলে সময় নষ্ট করবেন না। উঠে আসুন। সঙ্গে ভারী চাদরও নিয়ে এসেছি। আপনি আমার গায়ে ভালোমত চাদরটা জড়িয়ে দেবেন। যেন আগুনটা ঠিকমত লাগে।

আহমদ ছফার গায়ে আগুন লাগিয়ে আত্মহুতি দেয়ার সংবাদ দাবানলের মত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। সবাই আস্তে আস্তে জড়ো হতে লাগলেন। বন্ধুরা ছফাকে বুঝাতে চেষ্টা করলেন। কিন্ত ছফা অনঢ়, তিনি আত্মহুতি দেবেনই। অন্য কেউ হলে ভাবা যেত আত্মহুতি নয়, কেবল হুমকি, কথার কথা। কিন্ত সবাই জানে ছফা অন্য রকম, সিদ্ধান্ত যখন নিয়েছেন প্রতিকার না পাওয়া পর্যন্ত একচুলও এদিক সেদিক করবেন না, যাই হোক কিংবা যাই ঘটুক।
কবি সিন্দাকার আবু জাফর ব্যস্ত হয়ে ছফার কাছে এলেন। জোর গলায় বললেন, আমি ব্যবস্থা করছি। কথা দিচ্ছি, এই শহীদ পরিবারের জন্য থাকার একটা ব্যবস্থা করব। তুমি কেরোসিন টিন আমার বাসায় দিয়ে এসো।
ছফা বললেন, হুমায়ূন পরিবারকে আবার সস্থানে তুলে না দেয়া পর্যন্ত আমি আমার সিদ্ধান্ত পাল্টাবো না এবং আপনার হাতে সময় মাত্র ১ ঘন্টা।

পরিশেষ: ছফার জবানীতে শুনুন:
মুজিব সরকার হুমায়ূন আহমেদের পরিবারকে পুনরায় উচ্ছেদকৃত বাসায় তুলে দিতে বাধ্য হয়েছিল। অন্তত আমি এই একটি ব্যপারে শেখ মুজিবের প্রতি কৃতজ্ঞ। তিনি আমাকে মরে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন।

ছফার খেসারত!

ছফার জবানীতে শুনুন: (এটা ছফার নিজস্ব মত):
"শেখ মুজিবর রহমান প্রথমে আমাকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, রাষ্ট্রদূত হওয়ার জন্য। কিন্ত তিনি যখন বললেন, শর্ত আছে।
আমি (ছফা) বলেছিলাম, শর্ত ছফার জন্য নয়, আপনি অন্য কাউকে দেখুন।

শেখ মুজিবর রহমান আমার উপর প্রচন্ড রুষ্ট হয়েছিলেন। কিন্ত জেলে দেয়ার সাহস পাননি। পরে শেখ মুজিবর রহমান আমাকে অনুরোধ করেছিলেন, শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা হওয়ার জন্য জন্য।
আমি (ছফা): বলেছিলাম সম্ভব নয়। আমাকে ধারণ করার মতো শক্তি আপনার সরকার বা আপনার প্রশাসনের নেই।
এরপর আবুল ফজলকে এই অফার দিলে তিনি আনন্দের সঙ্গে রাজি হন। আবুল ফজল শেখ সাহেবের কেনা গোলাম হয়ে যান। উপদেষ্টা হওয়ার পর শেখ সাহেবকে খুশী করা ছাড়া তাঁর আর কোন পথ অবশিষ্ট ছিল না।

এরপর আমীন জানতে চান: আচ্ছা, আপনি শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু বলেন না কেন?
ছফা: আমি তোমার বাবাকে বাবা ডাকতে যাব কোন দুঃখে? তোমার বাবাকে পৃথিবীর সমস্ত লোক বাবা ডাকলেও আমি ডাকবো না, তাঁকে অনেকে জাতির পিতা বলে থাকেন, আমি বলি না, একই কারণ। মুক্তিযুদ্ধ আমার মা।

আমীন: তা হলে পিতা কে?
ছফা: সময়। সময়ের দাবি এবং পাকিস্তানীদের কার্যকলাপ। ৪৭ এর পর হতে দেশের উদরে জন্ম যন্ত্রণা শুরু হয়েছে, যা ১৯৭১ এর মার্চে প্রসব বেদনায় প্রদীপ্ত হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটিয়েছে।"
 

*লেখাটা নেয়া হয়েছে 'আহমদ ছফার চোখে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী', লেখক: মোহাম্মদ আমীন থেকে। মোহাম্মদ আমীন দীর্ঘ ১১ বছর ছফার সহচর্যে ছিলেন। অনেক ক-টা বছর একই বাড়িতে ছফার সঙ্গে থাকতেন।)

**ছফার ঠোঁটকাটা স্বভাবের জন্য অনেক দাম দিতে হয়েছিল। তাঁকে বড় অবহেলায় দাফন করা হয়েছিল!
অনুমান করলে দোষ হবে না, এতে তাঁর কিছুই যায় আসেনি। ভাগ্যিস, তিনি বেঁচে নেই, নইলে ঠোঁট গোল করে বলতেন, বুদ্ধিজীবীদের...-এ আমি মুতিও না! হায়, আমরা এ প্রজন্ম জানিই না বাংলাদেশের প্রথম পত্রিকা বের করেছিলেন আহমদ ছফা!
বাংলা একাডেমির পুরষ্কার পাওয়ার জন্য যেখানে লেখকদের লালা ঝরে পা ভিজে যায় সেখানে তাঁকে যেন পুরস্কারটা না-দেয়া হয় এই নিয়ে হইচই বাঁধিয়ে দিয়েছিলেন!
আফসোস, ছফার মত মানুষ যে দেশে জন্মান সেই দেশ ধন্য হয়, নাকি মানুষটা, এটা বলা মুশকিল! উন্নত দেশে জন্মালে তিনি যে নোবেল পেতেন এতে আমার কোন সন্দেহ নাই!