Search

Saturday, April 18, 2015

আবার আসিব ফিরে...।

এই অপারেশনে কারও মৃত্যু হয়েছে এমনটা শুনিনি। আমার বেলায় এটা ঘটলে সেটা হবে বিরল ঘটনা! অখ্যাত পত্রিকার ভেতরের পাতায় ‘বিরল ঘটনা’ হিসাবে খবরটা দু-চার লাইনে চলে আসাটা একেবারেই অলীক-অসাড় বলাটা সঠিক হবে না।

তবে এই অপারেশনে অন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাটাও তোপ দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া চলে না। অবশ্য এও সত্য, একজন লেখকের জন্য অন্ধ হয়ে যাওয়াটা মৃত্যুসম। তখন বাঁচা না-বাঁচা সমান...।

ছেঁড়া চাদর এবং ‘মনোনীত সদস্য’।

এ বছর বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘন্টার-পর-ঘন্টা ধরে যে ঘটনা ঘটল এটা নিয়ে গুছিয়ে লেখার ক্ষমতা আমার নাই। কেবল অল্প কথায় বলি, আমাদের দাঁড়াবার আর জায়গা রইল না।
হালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাটা হচ্ছে সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য। এখানে দিনদুপুরে চরম অশ্লীলতা করা যায়, সন্তানের সামনে মাকেও অপদস্ত করা যায় । চাপাতি দিয়ে কাউকে কুপিয়ে ফালা ফালা করা তো কোনও বিষয়ই না।

কালে কালে গালকাটা রমজান, পেটকাটা আবুল হবে এখানকার আসল কারিগর। এরা এদের চেলাচামুন্ডাদেরকে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে এখানে নিয়ে আসবে হাতেকলমে শিক্ষা দেওয়ার জন্য। লাউয়ের উপর ব্লেড চালিয়ে পকেটকাটা বিভাগের প্রধান পকেটমারের সর্দার বাইট্টা ছগিরও পিছিয়ে থাকবে না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সব এলাকাগুলো নাকি এমনিতেই নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা থাকে।সিসিটিভি নামের যে চোঙ্গাগুলো লাগানো থাকে এগুলো দিয়ে নাকি কাক-পক্ষীর গতিবিধি ধারণ করা হয়। বিশেষ-বিশেষ দিনে তো এই চাদর নাকি কয়েক স্তরের হয়ে যায়। 'এই চাদর দিয়ে মাথা ঢাকতে গিয়ে পেছনটা উদোম হয়ে যায়', এটা লিখতে পারলে আরাম পাওয়া যেত কিন্তু মাথা-পেছনটার (পাছা শব্দটা আমি এখানে লিখতে চাচ্ছি না) দোষ দেওয়াটা সমীচীন হবে না। দোষ বেচারা চাদরের। আহা, বেচারা চাদর- ছেঁড়া চাদর।

অনেকে আবার দোষ চাপাবার চেষ্টা করবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার-হাজার শিক্ষার্থীর যিনি পিতা, আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের প্রতি। এই পুরো নামটা ‘আ আ ম স’ এটা ভুলে গেছি তবে দুষ্ট ছেলেরা যেটা বলে সেটা বিচিত্র কারণে মনে আছে। এখানে এটা উল্লেখ করাটা অসমীচীন মনে করছি।)।
জনাব, আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের সাহেবের প্রতি কারও অঙ্গুলি নির্দেশ করার প্রতি আমি তীব্র প্রতিবাদ জানাই, নিন্দা জ্ঞাপন করি। কারণ জনাব আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক সাহেবের দোষ দেওয়াটাও দোষ হবে। ওরে অবুঝ, প্রক্টর সাহেব দাবা খেলায় ব্যস্ত থাকেন কিন্তু আরেফিন সাহেব কী অবসর? বেচারা আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক সাহেবের কতো-কতো কাজ! যেমনটা আমরা দেখেছি তেলের খনি [১] থেকে তৈল উত্তোলনে তাঁর ব্যস্ততা। এটা তো ছোট্ট একটা উদাহরণ, এমন কত্তো কত্তো কাজ তাঁর...।

১. তেলের খনি: http://www.ali-mahmed.com/2012/04/blog-post.html

Friday, April 17, 2015

মিডিয়া...!

কামারুজ্জামানের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হলো। এই বিষয়ে পুর্বের বলা অল্প কথাটাই আবারও বলি, "৪৪ বছর গেল নাকি ৪৪০ বছর তাতে কী আসে যায়- রক্তের দাগ মুছে ফেলা যায় না"। 
প্রায়শ এমনটা দেখি বা শুনি, অনেকের কাছে এর (যুদ্ধের অপরাধের জন্য বিচার) প্রয়োজনীয়তা তুচ্ছ কারণ এরা তাদের পরিবারের কাউকে হারাননি। কিন্তু এটা জিজ্ঞেস করুন ১৯৭১ সালে যারা তাঁদের স্বজন-প্রিয়মানুষকে হারিয়েছেন। সাদী মহাম্মদকে [১], প্রবীর শিকদারকে [২] যারা ১৯৭১ সালে তাদের স্বজনের প্রায় সবাইকে হারিয়েছিলেন। এরা কী করে ভুলে যাবেন তাদের দগদগে ক্ষত?

কিন্তু এই মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার পূর্বে মিডিয়াগুলো কারাগারের সামনের রাস্তা দখল করে যেটা করেছে সেটা দেখে মনে হচ্ছিল...একেকটা কাঁপা-কাঁপা গলায় এমনসব ভঙ্গিতে বলছিল মনে হচ্ছিল এখুনি এ নির্ঘাত মুর্চ্ছা যাবে। আবার থেমে থেমে ঘটা করে বলছিল, আমরা চার দিন ধরে অপেক্ষায় আছি...। ওরে, তোকে বলেছে কে চার দিন ধরে অপেক্ষা করতে? কেউ-কেউ আবার লাইভ অনুষ্ঠানও প্রচার করছিল। পারলে এরা ফাঁসির দৃশ্যটাই লাইভ দেখিয়ে দিত। একজন তো আবার একটা শিশুকে দেখিয়ে বলছে এই ফাঁসি দেখার জন্য এ-ও চলে এসেছে।

আমাদের দেশে এখন অবৈধ টাকা হলেই একটা চ্যানেলের মালিক হয়ে বসে থাকে। চ্যাংড়া-চ্যাংড়া ছেলে-মেয়েরা ‘বুম’ হাতে অধিকাংশ সময় যেটা করে এটাকে এক কথায় বলা চলে অসভ্যতা। কতশত যে এখন মিডিয়াকর্মী আল্লা জানে। এদের অনেক আচরণ অসভ্যতাকেও ছাড়িয়ে যায়। আমরা বিভিন্ন ঘটনায় এটা প্রত্যক্ষ করেছি, রানা প্লাজা, জিহাদের মৃত্যু এমন উদাহরণের শেষ নেই। তখন উদ্ধারকারী সংস্থাগুলোর কাজ করাটা অসম্ভব হয়ে পড়ে। চার দিন ধরে রাস্তা আটকে এখানে বসে থাকার আদৌ এর প্রয়োজনটা কী! এরা লাশবাহী গাড়ির পেছনে পেছনেও দৌড় লাগায়। এবার নাকি ১ কিলোমিটার পূর্বে এদের আটকে দেওয়া হয়েছে বলে জল কম ঘোলা হয়নি।

আহ, মিডিয়া! এখন অনলাইনেও মিডিয়া গিজগিজ করে। নমুনা! আরেক মিডিয়া 'প্রিয় ডট কম' [৩] একটা শিরোনাম করেছে, 'সর্বস্ব হারিয়ে লায়লা নাঈম কাঁদছেন'। ঘটনা পড়ে পাঠক ভাববে অন্য কিছু কিন্তু আসল ঘটনা হচ্ছে লায়লা নঈম নামের এই বিকারগ্রস্ত মহিলার ল্যাপটপ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে- এই মহিলা আবার ল্যাপটপটা পাঠককে দেখাচ্ছেন যেন ভাইরাস গিজগিজ করছে। এই মিডিয়া-এই মহিলা দুই বিকারগ্রস্ত।

কারও মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হবে। কারাকর্তৃপক্ষ ব্রিফিং দেবে আজ এতোটা সময়ে ওমুকের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়েছে, ব্যস। অনেকে বলবেন, এটা সাধারণ কোনও ঘটনা না, জনগণের এই নিয়ে বিপুল আগ্রহ ছিল বিধায় ইত্যাদি ইত্যাদি। যে দেশের জনগণ মাইক্রোফোন টেস্টিং ওয়ান-টু-থ্রি বললেই শতেক লোক জমে যায় সেই দেশে অবশ্য এটা বলা যেতেই পারে।

অবশ্য মিডিয়ার এতো কিছুর পরও অনেকের মধ্যে সংশয় কাজ করেছে কেন কামারুজ্জামানের মৃতদেহের মুখমন্ডল কোথাও দেখানো হলো না। এরা এটা বুঝতে চাইছেন নােএটা সত্য রাষ্ট্র নিরুপায় হয়ে কখনও-কখনও প্রাণহরণের মত অতি নিষ্ঠুর কাজটা করতে বাধ্য হয়- যে প্রাণ সৃষ্টি করার ক্ষমতা কারও নাই সেই প্রাণটা ছিনিয়ে নেয়। আইনের শাসনের কারণে কখনও-কখনও রাষ্ট্রের এই কাজটা না-করে উপায় থাকে না। কিন্তু এটাও মাথায় রাখাটা প্রয়োজন রাষ্ট্র ইচ্ছা করলেই মৃতদেহ নিয়ে যা-খুশি তা করতে পারে না। কিন্তু কেন, কেন এই সংশয়টা জনসাধারণের মধ্যে কাজ করে!

কারণ দেশটা বাংলাদেশ। এই দেশে আমরা প্রচুর নাটক দেখি- জজ মিয়ার নাটক, ছলিমুল্লার নাটক...। জনসাধারণের মধ্যে যেন সংশয় ঘুরপাক না-খায় এটা দেখার দায়িত্বও কিন্তু সরকারের উপর বর্তায়। তাই বিতর্ক এড়াবার জন্য যা-যা করণীয় যেমন প্রয়োজনে সরকারী মহফেজখানায় তথ্য-উপাত্তগুলো সংরক্ষণ করা ভবিষ্যতের জন্য। প্রয়োজনে ডিএনএ-এর নমুনাও রাখা যেতে পারে। তথ্য অধিকার আইনে কেউ জানতে চাইলে বিচারবিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে তার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।

যেমনটা যুদ্ধঅপরাধ-যুদ্ধাপরাধী নিয়ে সরকারের এই বিচার প্রক্রিয়া নিয়েও এই দেশের একটা অংশের মধ্যে সংশয় কাজ করে। এটার জন্যও সরকারের দায়টা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আমরা যদি জানতে চাই রাজাকার নুলা মুসার [৪] বিচারের কি হলো? সরকার এই উত্তর দেবে না। দেবে না বলেই আমাদের মধ্যে সংশয়টা ঘুরপাক খায়।

১. আমার বাবার কবরস্থান: http://www.ali-mahmed.com/2013/07/blog-post_4.html
২. ১৯৭১: খুন, সাদি মহাম্মদের ২৫ স্বজন: http://www.ali-mahmed.com/2013/07/1971.html
৩. প্রিয় ডট কম: http://www.ali-mahmed.com/2015/02/priyocom.html 
৪. নুলা মুসা: http://www.ali-mahmed.com/2014/12/blog-post_19.html

Thursday, April 9, 2015

পাজি-অসভ্য-ইতর-দানব-খুনি!

অনেকের কাছে ধর্মটা হচ্ছে কাঁচের বাসন। হাত থেকে ফসকে গেল তো ভেঙ্গে খানখান হয়ে গেল। লেখার উত্তর লেখা দিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা এদের নাই তাই এরা ঝাঁপিয়ে পড়েন চাপাতি নিয়ে। যারা ধর্মের নামে আইন নিজ হাতে তুলে নিচ্ছেন, প্রকাশ্যে রাস্তায় চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে মানবদেহ ফালা ফালা করছেন তাদেরকে দ্রুত আদালতে বিচার করাটা আবশ্যক। এরা খুনি- খুনির প্রতি প্রচলিত আইন যে আচরণ করে থাকে সেই আইনই এদের বেলায়ও প্রযোজ্য হবে। রাষ্ট্র কখনও নিজ হাতে কাউকে আইন তুলে নিতে দিতে পারে না। প্রচলিত আইন যদি তাকে মৃত্যুদন্ড প্রদান করে তাও অতি দ্রুত কার্যকর করাটাও জরুরি। এই নিয়ে কোনও প্রকারের দ্বিমত নাই। একটি বিষবৃক্ষ নির্মূল হলো। সবাই সুখে শান্তিতে বসবাস করতে লাগল।

এখান পর্যন্ত লেখাটা বড়ই সরল এবার খানিকটা গরল কথা বলি। কখনও বিষবৃক্ষ গাছ আপনাআপনি হয় কখনও বা কেউ সযতনে পরিচর্যা করে লাগায়। সুদীপ্ত সুজয়-এর বদৌলতে আমার এটা দেখার দুর্ভাগ্য হয়েছে। কতিপয় ইতরবিশেষ একটা ইভেন্ট চালু করেছে। ইভেন্টটির নাম, ‘নবীজির উদ্দেশ্যে খোলা চিঠি সপ্তাহ’। শিরোনাম দেখে অনেকে আপ্লুত হবেন, বাহ, নবীজীর প্রতি কী তমিজ! কিন্তু আসল ঘটনা তা না। এই ইভেন্ট খুলে অতি কুৎসিতসব কথাবার্তা, ততোধিক কুৎসিত গালাগালি করা হচ্ছে। কোনও তথ্য-উপাত্তের বালাই নাই, কোনও যুক্তি নাই!

এই তাহলে জ্ঞানের চর্চা, মুক্তমনের চর্চা? মুক্ত মানে অবাধ, স্বাধীন যা-খুশি বলার অধিকার? কারও মৃত্যুশয্যায় তাকে নিয়ে রঙ্গ করার অধিকার- কোনও ভাবগম্ভীর পরিবেশে, জরুরি আলোচনায় ‘ধুমমাচা দে’ গান গাওয়ার অধিকার? তাহলে এই সমস্ত অসভ্যদের জন্য সভ্যতার সংজ্ঞা নতুন করে লিখতে হবে। এদেরকে কারা-কারা মুক্তমনা বললেন এ নিয়ে আমার কাতরতা নাই কারণ আমার কাছে এরা স্রেফ ‘ইতরবিশেষ তথাকথিত মুক্তমনা’।
বেচারা ভলতেয়ার, "I do not agree with what you have to say, but I'll defend to the death your right to say it." এটা বলেও তিনি এদের কাছে মুক্তমনা হতে পারলেন না।

তো, এরা যদি ভেবে থাকে আমরা এই সব ইতরবিশেষ মুক্তমনাদের এই সমস্ত কর্মকান্ডের জন্য ‘শাবাসি’ দেব তাহলে ভুল করবেন। আমরা চাইব এই সব ইতরদেরকেও যত দ্রুত সম্ভব আইনের আওতায় নিয়ে আসতে। কারণ এরা দানব বানাবার মেশিন! এরা ঠান্ডা মাথায় একটা খেলা খেলছে। ভযংকর এক খেলা। কোটি-কোটি মানুষের বিশ্বাস-আবেগকে পদদলিত করার খেলা! এরাই তারা, যারা রামুতে বৌদ্ধমূর্তি গুঁড়িয়ে লুঙ্গির কাছা মেরে নাচের মুদ্রায় দাঁড়িয়ে ছিল।

আচ্ছা, এবার অন্য প্রসঙ্গ। কারও প্রিয়মানুষকে, কারও মাকে নিয়ে কেউ কুৎসিত কথা বললে তার প্রতিক্রিয়াটা কেমন হবে? এখানে যে জেনেভা কনেভনশন কপচানো পন্ডশ্রম এটা ওই মার সন্তানটাকে কে বোঝাবে! এটা জেনেও যে আইন কিন্তু তাকে, তার আবেগকে ক্ষমা করবে না এবং ঠিকই তার প্রাণটাকেও নষ্ট করে ফেলবে, তারপরও। তখন সে একটা খুনি! কিন্তু তার মত ছাপোষা একজন মানুষ, মানুষ থেকে খুনিতে রূপান্তর; ফ্রানজ কাফকার ‘মেটামরফোসিস’- গ্রেগর সামসার আরশোলায় রূপান্তরকেও হার মানায়।
এ যেন অকল্পনীয় রূপান্তর! কিন্তু এই রূপান্তরের পেছনে যুক্তি কী! কেন সে তার মৃত মার জন্য হিংস্র কুকুরের ন্যায় লড়বে? পুরনো ক-খানা হাড়ে এমন কী আছে যা তাকে লড়াই চালিয়ে যেতে বাধ্য করবে! হয় মরবে নয়তো মেরে ফেলবে। কেন? আসলে এর কোনও উত্তর হয় না। কিন্তু তাকে খুনি বানাবার এই দুঃসাধ্য কর্মকান্ডটা করল কারা?

ওরাই, যারা ভয়ংকর দানব- খুনি বানাবার একেকটা চলমান মেশিন। এই দানবরা নাস্তিক কি আস্তিক, এটা মূখ্য বিষয় না, বিষয়টা হচ্ছে এরা অপরাধি। নাস্তিক হওয়াটা কোনও শাস্তিযোগ্য অপরাধ না এবং কে নাস্তিক হবেন এটা তার নিজস্ব বিবেচনা। কিন্ত এই সব ইতরামি অবশ্যই শাস্তিযোগ্য অপরাধ । অতি শীঘ্রই এই ইতরদেরকে আইনের আওতায় নিয়ে আসাটা আবশ্যক। সেটা কোনও ধর্মের ব্যক্তিত্বকে নিয়ে করুক বা অন্য কাউকে। ‘রামজীর উদ্দেশ্যে খোলা চিঠি সপ্তাহ’ নিয়ে ইভেন্ট চালু করলেও আমার বক্তব্য হুবহু একই থাকবে। “তপস্যা করার অপরাধে রামচন্দ্র খড়গ দিয়ে ‘শম্বুক’ নামক এক শূদ্র তাপসের শিরোচ্ছেদ করেন” (শম্বুক শূদ্র হওয়ার অপরাধে) -বাল্মীকির রামায়ন। এটা বললে আমি ধৈর্য ধরে শুনব কারণ এর পেছনে তথ্য আছে কিন্তু রামকে নিয়ে ইতরতা করলে আমি ধৈর্যহারা হবো।

মুক্তমনার আভিধানিক অর্থ কি এটা নিয়ে অভিধানে-অভিধানে চালাচালি-খোজাখুঁজি-খোলাখুলি চলতে থাকুক। আমি আমার সাধারণ জ্ঞানে বুঝি, জ্ঞান হচ্ছে সরলরেখা আর জ্ঞানহীনতা হচ্ছে বৃত্ত। মুক্তমনের লোকজনেরা কোনও বৃত্তে আটকে থাকবেন না- কেবল এগিয়ে যাবেন। তাঁর হাঁটার রাস্তায় কাকের কর্কশ রব যেমন থাকবে তেমনি সুকন্ঠী পাখির সুরেলা বোলও। হাস যেমন ঘোলা জল থেকে তার খাবার পানিটা বের করে নেয় তেমনি তিনিও সমস্ত অন্ধকার থেকে আলোকে বের করে নিয়ে আসবেন।

আমি পূর্বেও বিভিন্ন লেখায় স্পষ্ট করে বলেছি, আমি কোনও বিশেষ ধর্মের অবমাননা বুঝি না আমি বুঝি সমস্ত ধর্মের অবমাননা। মধ্যরাতে ওয়াজের নামে আট-দশটা চোঙ্গা লাগিয়ে যখন হিন্দু ধর্মের ব্যক্তিত্বদের মুন্ডুপাত করা হয় তখন সেটাও ধর্মের অবমাননা। আরজ আলী মাতুব্বর ঘোর নাস্তিক ছিলেন। বিভিন্ন ধর্মের বিপক্ষে প্রচুর লেখা রেখে গেছেন কিন্তু তাঁর লেখাগুলোর মধ্যে কেউ এটা দেখাতে পারবেন না যে তিনি কোনও ধর্ম নিয়ে কুৎসিত কথা বলেছেন বা গালাগালি করেছেন অথবা অযথা ছোট করার চেষ্টা করেছেন। যেটাই বলেছেন তার যুক্তি দিয়ে বলেছেন কারও আপত্তি থাকলে যুক্তি খন্ডন করুক তাতে কোনও সমস্যা নাই।

গোল্ডা মায়ারের চমৎকার একটা কথা আছে, ‘নিজ হাতে হত্যা করা এবং হত্যা করার নির্দেশ দেওয়ার মধ্যে খুব একটা পার্থক্য নাই’। আমি এর সঙ্গে যোগ করি, হত্যা করা বা হত্যা করার জন্য প্ররোচিত করার মধ্যেও খুব একটা তফাত নাই।

Thursday, April 2, 2015

রাজার মুরগি, বুশ এবং নাড়িছেঁড়া এক গল্প!

রাজার মুরগির বিষয়টা আগে বলি। রাজামশাই যখন ভ্রমণে মুরগি খাওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন তখন তার পেয়াদা বাহাদুররা সাত গ্রাম তছনছ করে মুরগির ব্যবস্থা করে।
আমাদের জুনিয়ার বুশ আরেক কামেল মানুষ। তাকে মেঝে উঁচু করার কথা বললে সে অল্প সময়েই এটা করে দেবে। সব মেরে সাফ করে কবর বানিয়ে।
এই মানুষটার চোখের জল শুকিয়ে গেছে কারণ আজ সাত দিন তার একমাত্র সন্তানের খোঁজ নেই। যেদেশে নামকরা লোকজনেরা উধাও হয়ে যায় সেদেশে স্টেশনে যার বাসস্থান এমন একজন মানুষের সন্তান উধাও হয়ে যাওয়াটা বিচিত্র কিছু না। এই মানুষটার নাম আমি জানি না। সবাই বলে জান্নাতের মা, আমিও বলি জান্নাতের মা।
বাঁদিকের মেয়েটা জান্নাত। গতবছর পহেলা বৌশাখে তোলা। দানে পাওয়া ঢলঢলে এই পোশাকেই তার আনন্দের শেষ নেই।
তার মেয়ে জান্নাত ‘আমাদের ইশকুল’ নামের স্কুলটায় বছরখানেক ধরে পড়ে। স্টেশনের কাছটায় এই স্কুলটায় প্রতিদিন নিয়ম করে আসে ছেলেপেলেরা আসে এই সংখ্যা খুবই কম। জান্নাতও মাঝেমধ্যে আসত না কারণ ও একটা বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করত। ওখান খেকে যে খাবার পাওয়া যেত এতে মা-মেয়ের হওয়ার কথা না কিন্তু হয়ে যেত নিশ্চয়ই। এদের পেটপুরে খেতে হবে এই দিব্যি কে দিয়েছে।
তো এই কারণে জান্নাতের কখনও-কখনও স্কুলে আসা হতো না। কিন্তু ঝাড়া ছয় দিন অনুপস্থিত থাকার পর আমি স্কুলের মাস্টারকে জিজ্ঞেস করলে সে জান্নাত বিষয়ে কোনও তথ্য দিতে পারল না।

আজ জান্নাতের মার কাছে যেটা শুনলাম তাতে কিছুই স্পষ্ট হলো না। পুলিশ নাকি জান্নাতকে ধরে নিয়ে গেছে। কোথায়? জান্নাতের মা জানে না! আশেপাশের অন্যরাও তেমন সদুত্তর দিতে পারল না। ১০/১২ বছরের ফুটফুটে একটা মেয়েকে পুলিশ কেন ধরে নিয়ে যাবে? রেলওয়ে পুলিশের এক এস,আই আমাকে যেটা বলল এটা শুনে আমি জীবনে এতো হতবাক কমই হয়েছি। সরকারী একটা সংস্থার (সামাজিক প্রতিবন্ধী প্রশিক্ষণ এবং পুনর্বাসন কেন্দ্র) লোকজনেরা ভাসমান কিছু পতিতাতে ধরে নিয়ে গেছে। এদের মধ্যে জান্নাতও ছিল। একপ্রসঙ্গে এ আমাকে জোর দিয়ে এটাও বলেছে, জান্নাত...। হা ঈশ্বর! এই অপদার্থ এই সব কী বলছে!
অবশ্য জিআরপি ওসি যথেষ্ঠ সহায়তা করলেন। এখানে কাজের তথ্যগুলো পাওয়া গেল।

সহৃদয় @Shahadat Hossain যখন এই কেন্দ্রে (সামাজিক প্রতিবন্ধী প্রশিক্ষণ এবং পুনর্বাসন কেন্দ্র) যান তখন এরা পতিতাদের ধরে এনেছেন এটা অস্বীকার করেন। চমৎকার-চমৎকারসব কথা বলেন। সাহাদাতের কাছে শুনে আমি নিজেও মুগ্ধ (!)।
অথচ আমি দেখছি এখানে এরা লিখেছে: “...পারিবারিক বন্ধন ও সামাজিক মূল্যবোধ থেকে নানাহ কারণে বঞ্চিত হয়ে অসামাজিক তথা দেহ ব্যবসার মত ঘৃণ্য কাজে লিপ্ত রয়েছে।...
আচ্ছা, সেই তো দেখছি ঘুরেফিরে দেহ ব্যবসা! আরও লেখা আছে, "...এখানে আসন সংখ্যা ১০০ জন হলেও বর্তমান নিবাসীর সংখ্যা ১৬ জন। বাকী ৮৪টি আসন শূন্য থাকায়..."
ওরে, এই তাহলে ঘটনা! শূন্য স্থান পূরণ করো, শূন্য আসন...। আর পারিবারিক বন্ধনের কথা যে বলা হচ্ছে এই জান্নাত মেয়েটির পারিবারিক বন্ধন আছে কী নেই এই বিতর্কে নাহয় গেলাম না কিন্তু একজন মার কাছ থেকে তার সন্তানকে পাইক-পেয়াদা দিয়ে জোর করে ধরে নিয়ে আটকে রেখে কী দেশ উদ্ধার করবেন আপনারা? এই ছয় দিন ধরে মা জানত না তার সন্তান কোথায় -সন্তান জানত না তার মার খোঁজ! এই ক-দিনে মা-মেয়ের চোখ গড়িয়ে কত জল ভেসে গেছে তার খোঁজ রাখার আদৌ প্রয়োজন কী আমাদের!
এখন এরা বলছে, বেশ, জান্নাতকে ধরে এনে নিবন্ধন করে ফেলা হয়েছে তাই একে এখন এখান থেকে নিয়ে যেতে চাইলে তার অভিভাবকের এই-এই কাগজ লাগবে। এই-এই কাগজ যেমন জন্মনিবন্ধন পৌর মেয়রের সনদ ইত্যাদি ইত্যাদি লাগবে। এই ইত্যাদি এবং ইত্যাদি কাগজপত্র জান্নাতের বা জান্নাতের মার কখনও ছিল না ভবিষ্যতে হওয়ার সম্ভাবনাও অতি ক্ষীণ। অতএব...। জান্নাতের এখন কেবল জান্নাতে(!) যাওয়ার অপেক্ষা। তা কেন রে বাপু, ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় মা-র খোঁজের, কাগজের প্রয়োজন হয় না, এখন কেন?

রাজার মুরগি খাওয়ার গল্পটা শুরুতে বলেছিলাম এই কারণেই বা বুশ...। সরকারের সদিচ্ছা অতি উত্তম কিন্তু তার বাহিনী সেই মুরগিখাওয়া লাঠিয়াল বাহিনীর মতই...। বিস্তর সহায়তা করেছেন, Shahadat Hossain এবং Masuk Hridoy । তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা।
...
আপডেট: ৫ এপ্রিল, ২০১৫

সরকারের উদ্যোগটা কিন্তু চমৎকার কিন্তু লোকজনের কাজ করার ভঙ্গিটায় ঝামেলা আছে! জান্নাতকে নিয়ে আসতে সময় লাগবে। জান্নাতকে ওখানেই রেখে দেওয়া যায় কিনা এটাও ভাবা হচ্ছে...
আপাতত যে কাজটা করা গেছে- আজ জান্নাতের সঙ্গে জান্নাতের মার দেখা করার ব্যবস্থা করা হয়েছে।  




গত বছর জান্নাতকে নিয়ে লেখাটা:

Sunday, March 29, 2015

LES MISERABLES: ?!

সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত চিঠিটা নাকি লিখেছিলেন ভিক্টর হুগো। তাঁর 'লা মিজারেবল' বইটা প্রকাশ হওয়ার পর তিনি প্রকাশককে চিঠি লেখেন। জানার বিষয় বইটা কেমন চলছে বা কাটতি কেমন। চিঠিতে কেবল লেখা ছিল, ?। ব্যস, এই একটা প্রশ্নবোধক চিহ্নই।
প্রকাশকও কম যান না, হুগোর প্রকাশক বলে কথা। তিনি উত্তরে লিখলেন, ! এই-ই। অর্থাৎ বইটার কাটতি বিস্ময়কর।

যাই হোক, জাঁ ভাঁলজা চরিত্রটি হুগোর অমর এক সৃষ্টি। কিন্তু আমাকে কম টানে না ফাদার মিরিয়েল নামের চরিত্রটি। পানির মতো টলটলে এক বাউল! জেল থেকে ছাড়া পেয়ে জাঁ ভাঁলজাকে যখন কেউই খাবার-আশ্রয় দিচ্ছিল না তখন তিনি এসে হাজির হন এই ফাদারের কাছে। হড়বড় করে ফাদারাকে নিজ সম্বন্ধে একগাদা কথা বলতে থাকেন:
See here. My name is Jean Valjean. I am a convict from the galleys. I have passed nineteen years in the galleys. I was liberated four days ago, and am on my way to Pontarlier, which is my destination. I have been walking for four days since I left Toulon. I have travelled a dozen leagues to-day on foot. This evening, when I arrived in these parts, I went to an inn, and they turned me out, because of my yellow passport, which I had shown at the town-hall. I had to do it. I went to an inn. They said to me, `Be off,' at both places. No one would take me. I went to the prison; the jailer would not admit me. I went into a dog's kennel; the dog bit me and chased me off, as though he had been a man.” (p 88)
তখন বিশপ ছোট্ট করে তাঁর সহকারীকে বলেন, জাঁ ভাঁলজার রাতে থাকার ব্যবস্থা করার জন্য।

জাঁ ভাঁলজা ভাবলেন বিশপ সম্ভবত তার কথা বুঝতে পারেননি। তিনি আবারও শুরু করলেন:
The man advanced three paces, and approached the lamp which was on the table. "Stop," he resumed, as though he had not quite understood; "that's not it. Did you hear? I am a galley-slave; a convict. I come from the galleys." He drew from his pocket a large sheet of yellow paper, which he unfolded. "Here's my passport. Yellow, as you see. This serves to expel me from every place where I go. Will you read it? I know how to read. I learned in the galleys. There is a school there for those who choose to learn. Hold, this is what they put on this passport: `Jean Valjean, discharged convict, native of'--that is nothing to you--`has been nineteen years in the galleys: five years for house-breaking and burglary; fourteen years for having attempted to escape on four occasions. He is a very dangerous man.' There! Every one has cast me out. Are you willing to receive me? Is this an inn? Will you give me something to eat and a bed? Have you a stable?

বিশপের আবারও ছোট্ট করে উত্তর: "Madame Magloire," said the Bishop, "you will put white sheets on the bed in the alcove." ... The Bishop turned to the man. "Sit down, sir, and warm yourself. We are going to sup in a few moments, and your bed will be prepared while you are supping." (p 88)

পরদিন সকালে বিশপের সহকারী মাদাম ম্যাগলোয়ের উর্ধশ্বাসে ছুটে এসে বাগানে গাছের পরিচর্যারত বিশপকে বলেন জাঁ ভাঁলজা সমস্ত দামী জিনিস চুরি করে ভেগেছে।
The next morning at sunrise Monseigneur Bienvenu was strolling in his garden. Madame Magloire ran up to him in utter consternation. "Monseigneur, Monseigneur!" she exclaimed, "does your Grace know where the basket of silver is?"
"Yes," replied the Bishop.
"Jesus the Lord be blessed!" she resumed; "I did not know what had become of it."
The Bishop had just picked up the basket in a flower-bed. He presented it to Madame Magloire.
"Here it is."
"Well!" said she. "Nothing in it! And the silver?"
"Ah," returned the Bishop, "so it is the silver which troubles you? I don't know where it is."
"Great, good God! It is stolen! That man who was here last night has stolen it." (p 108)

এই জায়গায় এসে বিশপ নিজেই নিজেকে ছাড়িয়ে যান:
...The Bishop had just bent down, and was sighing as he examined a plant of cochlearia des Guillons, which the basket had broken as it fell across the bed”... (p 108)

জাগতিক জটিলতা পেছনে ফেলে প্রকৃতির সন্তান কেমন করে প্রকৃতির কাছে ফেরত চলে যেতে পারে তার অসাধারণ একটা উদাহরণ। বিশপের কাছে তখন পায়ের চাপে নুইয়েপড়া ফুলের চারা ঠিক করাটা সবচেয়ে জরুরি।
(যেটা ছফার মধ্যেও দেখে চমকে উঠেছিলাম। ছফা তখন জরুরি একটা কাজে ভারত গেছেন। তাঁর কেন যেন মনে হলো তাঁর লাগানো আপেলের চারাটার বিপদ, ভয়াবহ বিপদ! ছফা তাঁর লাগানো আপেলের চারার জন্য কেবল ভারত থেকে উড়েই দেশে চলে আসেননি প্লেনের টিকেট পেতে দেরি হচ্ছিল বলে অফিসারের নাকে গদাম করে ঘুসি মারাটা কেবল বাকী রেখেছিলেন।)

জাঁ ভাঁলজা মালসমেত পুলিশের কাছে ধরা পড়ার পর বিশপ মিথ্যা বলে ভাঁলজাকে বাঁচিয়ে দেন ঠিকই কিন্তু বিশপ ভাঁলজাকে এমনিতেই ছেড়ে দেন না। শয়তানের কাছ থেকে কিনে নেন ভাঁলজার আত্মা।
Jean Valjean, my brother, you no longer belong to evil, but to good. It is your soul that I buy from you; I withdraw it from black thoughts and the spirit of perdition, and I give it to God.” (p 110)

ভিক্টর হুগো বইটার শেষে ভাঁলজার মৃত্যুটা দেখিয়েছেন এমন করে:
He was dead. The night was starless and extremely dark. No doubt, in the gloom, some immense angel stood erect with wings outspread, awaiting that soul.” (p 722)

Friday, March 27, 2015

দুপেয়ে পশু!

রাজুকে আমি চিনি তা বছর দুয়েক হবে [১]। এর মার মাথা এলোমেলো, বাপ নেই। প্রায়ই দেখা হয়। এর বিভিন্ন আবদার থাকে। আমার সঙ্গে এর কোনও প্রকারের সংকোচ নেই, যা বলে সোজাসাপটা। কখনও-কখনও আবার আমাকে টাকা নিতেও সাধাসাধি করে, ‘টেকা নিবা? টেকা লাগবে আমারে বলবা’, বলেই দশ-বিশ টাকা এগিয়ে দেয়।

বিভিন্ন ছল করে একে স্কুলে আটকে রাখার চেষ্টা করা হয়। কখনও কখনও মেজাজ খারাপ থাকলে বলবে, ‘আমি খেলুম কিন্তুক পড়ুম না’। যে বাচ্চাদেরকে ছেলেটি পড়ায় তাকে বলা আছে, কাউকে পড়ার জন্য চাপাচাপি না-করতে, বিশেষ করে রাজুকে তো একেবারেই না। কারণ তাইলে আর এদের টিকিটিরও দেখা মিলবে না।
এমনিতে এই স্টেশনের চাঅলা-পানঅলা-হকার সবাই ‘রাজু মস্তান’ নামেই একে চেনে, আমরাও। রাজু দেখা হলে এটা বলবেই, ‘তুমি আমার নাম জানো, আমার নাম কিন্তুক রাজু মস্তান’।

মধ্যে এর সমস্ত গা খোস-পাচড়ায় ভরে গিয়েছিল, তাকানো যায় না এমন।দিনের-পর-দিন গোসল না-করার ফল। ডা. সুমন ভূঁইয়া নামের সহৃদয় মানুষটা এর চিকিৎসা করেছিলেন। মানুষটার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। রাজুর মত, যার পায়ে সর্ষে তার চিকিৎসা করাটা যে কত জটিল এটা বোঝানো মুশকিল। তার উপর সেই রোগ যদি হয় চর্মরোগ!

যাই হোক, ক-দিন ধরে রাজু উধাও। এর সঙ্গের ছেলেমেয়েদেরকে জিজ্ঞেস করে হদিস পাওয়া গেল না। কেবল এটুকুই জানা গেল ওমুক ট্রেনে একে উঠতে দেখা গেছে। রাজু
যখন ফিরে এলো একে দেখে একজন পাষন্ডও বিচলিত হবে, আমি কোন ছার! এর বাঁ দিকের কাঁধের কাছটায় হাড় নড়ে গেছে। এক্স-রে করে দেখা গেল ডান হাতটার কব্জিও ভাঙ্গা (ছবিটায় একটু ভাল করে লক্ষ করলে বোঝা যাবে ডার হাতের কব্জিটা ফুলে আছে )। ডান হাতটাও প্লাস্টার করে ফেললে এর খাওয়ার গতি কী হবে? আপাতত একে কোনও প্রকারেই রাজি করানো গেল না।

এর গুছিয়ে বলার মত বয়স এখনও হয়নি। তবুও এই অবস্থার কারণ ভাসা ভাসা যেটা জানা গেল কেউ একজন একে নিষ্ঠুর ভঙ্গিতে পিটিয়েছে। কেন, এটা জানতে চাইলে অষ্পষ্ট করে যেটা বলল কারও ব্যাগ ধরে এ নাকি টানাটানি করেছিল। এর গায়ে আমি কিছু ফোসকাও দেখেছি। অনুমান করি, এগুলো সিগারেটের ছ্যাকা। আমার ধারণা এ হয়তো খাবারের লোভে কারও ব্যাগে হাত দিলেও দিতে পারে তবে ব্যাগ নিয়ে যাবে এর পেছনে শক্ত যুক্তি নেই কারণ ব্যাগ নিয়ে গিয়ে কেমন করে ওটা দিয়ে পয়সা পাওয়া যায় এই বুদ্ধি এর এখনও হয়নি।

সমরেশের একটা লেখা আছে এমন: “...মানুষ এবং জন্তুর মূল পার্থক্য হলো, জন্তু চিরকাল জন্তুই থেকে যায়। দু’হাজার বছর আগে একটা গরু যেভাবে ঘাস খেত, দিন কাটাত, আজো সে সেভাবেই ঘাস খায়, দিন কাটায়। কিন্তু মানুষ প্রতিদিন যে জ্ঞান অর্জন করে সেটা সে তার সন্তানের জন্য রেখে দেয়। যে যেখান থেকে শেষ করছে তার সন্তান সেখান থেকে শুরু করে...।
মানুষের সঞ্চিত জ্ঞানই সভ্যতার মূল স্তম্ভ। আমরা আসলেই কী সভ্য হয়েছি? ভাগ্যিস, আমাদের পেটের ভেতরের একপেট আবর্জনা ঢেকে থাকে বিভিন্ন প্রকারের চামড়া দিয়ে আর বাকীটা আমরা ঢেকে রাখি বিভিন্ন আদলের চকচকে কাপড় মুড়িয়ে। নইলে কী ভয়াবহ কান্ডই না হতো তাহলে একপেট আবর্জনা উম্মুক্ত হয়ে যেত। পশু এবং মানুষকে আলাদা করাটা মুশকিল হয়ে পড়ত।

পশু ভাগ্যবান তাকে কাউকে বয়ে বেড়াতে হয় না। মানুষকে সর্বদা কাঁধে করে বয়ে বেড়াতে হয় গা ঘিনঘিনে এক পশুকে। পশু বেচারার কষ্টের শেষ নেই কারণ সে ইচ্ছে করলেই মানুষ হতে পারে না কিন্তু মানুষের যে বাড়তি সুবিধাটুকু সে ইচ্ছা করলেই চট করে পশু হয়ে যেতে পারে। নিমিষেই দু-পা থেকে চার পায়ে রূপান্তর...।

সহায়ক সূত্র:
১. জননী: http://www.ali-mahmed.com/2013/11/blog-post_23.html

Thursday, March 26, 2015

দুঃসাহস!

মাত্র এক মাস হলো। যে লেখাটা দিয়েছিলাম আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংককে নিয়ে, আস্পর্ধা [১]! ২১শে ফেব্রুয়ারি, আমাদের শোকের সময়ে এরা পতাকা লাগিয়েছিল আনন্দের পতাকা।
আজ ২৬শে মার্চে আমার অনেকখানি কৌতুহল ছিল এরা এবার কীসের পতাকা লাগাবে, শোকের? ওয়াল্লা, আজ তো দেখি পতাকার কোনও পাত্তাই নেই! ২৬শে মার্চে একটা ব্যাংক পতাকাই লাগাবে না এ তো চিন্তারও অতীত!

আচ্ছা এদের সমস্যাটা কী! ইসলামের ঢালের আড়ালে এরা নাহয় ইসলামমনস্ক হলো, বেশ কিন্তু ইসলাম ধর্মে কোথায় এটা বলা আছে নিজদেশের প্রতি, দেশমার প্রতি, পতাকা-আবেগের প্রতি তাচ্ছিল্য করতে হবে?
আসলে এরা যেটা করছে এটা স্রেফ মন্দসাহস, দুঃসাহস, চরম দুঃসাহস...।

সূত্র:
১. আস্পর্ধা: http://www.ali-mahmed.com/2015/02/blog-post_21.html

Monday, March 23, 2015

অভিজিৎ—একটি খুন, অতঃপর: দুই।

কেউ ছুঁরি দিয়ে আপেল কেটে খায় কেউ সেই ছুঁরি দিয়েই কারও চোখ উপড়ে ফেলে! তেমনই কেউ দেখে খাবার হিসাবে আপেলকে অন্য কেউ দেখে আপেলের সৌন্দর্য। যার-যার দৃষ্টিভঙ্গি-বিবেচনা।
চাপাতির কোপে পিচের সঙ্গে লেপ্টে ছিল অভিজিতের যে মগজ, আমি দেখি সেই মগজের পরতে পরতে লুকিয়ে ছিল অজস্র জ্ঞান—বিনষ্ট হলো সেই জ্ঞানের উৎস। কী অপচয়, কী নিদারুণ অপচয়!

আমার বই পাওয়ার উৎস রকমারী ডট কমের সঙ্গে ঝামেলা হওয়ার পর বিকট সমস্যায় পড়ে গেলাম। সহৃদয় চিন্ময় ভট্টাচার্য উদ্ধার করলেন। তিনি নিয়ে এলেন অভিজিতের ‘অবিশ্বাসের দর্শন’ বইটি।
এই বইটাতেও আমি দেখেছি অসংখ্য তথ্যের সূত্র ব্যবহার করতে। অসম্ভব প্ররিশ্রমী একটা কাজ নিঃসন্দেহে, অসংখ্য তথ্য-উপাত্ত একটা জায়গায় জড়ো করাটা প্রায় অসম্ভব একটা কাজ। আমি এটাও লক্ষ করেছি রায়হান আবীরের সঙ্গে তিনি যে বইটি লিখেছেন এখানে তাঁর নিজস্ব মত খুবই অল্প। বইটার শুরুতেই যে তথ্য তা চামকে দেয়, অন্তত আমাকে। এখান থেকে মাত্র ২টা তথ্য উল্লেখ করি:
"১. 'নেমাটোমর্ফ হেয়ারওয়ার্ম' নামে এক ফিতাকৃমি সদৃশ প্যারাসাইট ঘাসফড়িং-এর মস্তিষ্কে সংক্রমিত করে ফেললে ঘাস ফড়িং পানিতে ঝাঁপিয়ে আত্মহত্যা করে, যার ফলে হেয়ারওয়ার্মের প্রজননে সুবিধা হয়। অর্থাৎ নিজের প্রজনননের সুবিধার পেতে হেয়ারওয়ার্ম বেচারা ঘাস ফড়িংকে আত্মহত্যায় পরিচালিত করে।..."


২. "ল্যাংসেট ফ্লুক নামে এক ধরনের প্যারাসাইটের সংক্রমণের ফলে পিঁপড়া কেবল ঘাস বা পাথরের গা বেয়ে উঠানামা করে। কারণ এই প্যারাসাইট বংশবৃদ্ধি করতে পারে শুধুমাত্র তখনই যখন কোনো গরু বা ছাগল একে (পিঁপড়াসহ প্যারাসাইটকে) ঘাসের সঙ্গে চিবিয়ে খেয়ে ফেলে। ফলে প্যারাসাইট নিরাপদে সেই গরুর পেটে গিয়ে বংশবৃদ্ধি করতে পারে।"

এই তথ্যগুলো কিন্তু অভিজিতের মনগড়া না, এটা তিনি নিয়েছেন, Deniel C. Dennett-এর Breaking the Spell…বইটি থেকে। এমন অজস্র তথ্য! এখন আমার মত যারা সাধারণ পাঠক তাদের পক্ষে Deniel C. Dennett লেখকের বই যোগাড় করে এই তথ্যগুলো জানাটা কঠিন হয়ে পড়ে। অভিজিতের মত লোকজনেরা সেই কঠিন কাজটা সহজ করে দেন।

আমি হতবাক হয়েছি এটা দেখে অভিজিৎ রায়কে নৃশংস ভাবে হত্যা করার পর অনেক শিক্ষিত(!) মানুষকে দেখেছি তার এই হত্যাকান্ডকে বৈধতা দিতে, তিনি ধর্মের প্রতি বিষ উগরে দিতেন এই যুক্তিতে। আজব! 

অভিজিৎ রায় বিভিন্ন ধর্ম নিয়ে লিখতেন যেখানে তথ্য-উপাত্ত দেওয়া থাকত। তদুপরি কারও আপত্তি থাকলে লেখার উত্তর লেখা দিয়ে দিলে সমস্যা কোথায় ছিল! আর লেখার শক্তিতে ভরসা না-থাকলে বাংলাদেশের প্রচলিত আইনের মাধ্যমে প্রতিকার চাইলেন না কেন? কলমের উত্তর কী কলম-আইনের মাধ্যমে না-গিয়ে চাপাতির মাধ্যমে!

মানুষের মধ্যে যেমন ভাল-মন্দ আছে তেমনি লেখায়ও। ভাল লেখা-মন্দ লেখা। আমরা মন্দ মানুষকে যেমন এড়িয়ে চলি তেমনি মন্দ লেখাও পরিত্যাজ্য। পাতার-পর-পাতা পড়ে ফেললেই যেমন একজন সাহিত্যিক হওয়া যায় না তেমনি সব লেখাও লেখা হয়ে উঠে না। মানুষের কল্যাণের জন্য যে লেখা না তা কখনও ভাল লেখা হতে পারে না।
এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ সাহিত্যের অধ্যাপক মোরদেচাই কেদার। ডিজঅর্ডারে ভোগা এই মানুষটা একটা উম্মাদ। উম্মাদের কথার গুরুত্ব দেওয়ার কিছু নাই।
"যুদ্ধ অনেক হয়েছে, এবার ধর্ষণ যুদ্ধ শরু করতে হবে। গাজার ঘরে-ঘরে ঢুকে এদের নারীদের ধর্ষণ করতে হবে। মা-বোন-স্ত্রী-কন্যা কেউ যেন বাদ না যায়।"
-জেরুজালেম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্যের অধ্যাপক মোরদেচাই কেদার।

মানুষের মৃত্যুর পর তার কি হবে এই ভয়-ই ধর্মগুলোর প্রধান হাতিয়ার। অনেকের জন্য তখন এর বাইরে যাওয়ার ধর্মীয় নির্দেশ-সুযোগ-ইচ্ছা থাকে না। আমি এক লেখায় লিখেছিলাম,
প্রধান ধর্মগুলোর জোর দাবি তাঁর ধর্মই সেরা! তাঁর ধর্মেই মুক্তি...। অন্য ধর্মে নরকবাস! বেচারা মানবের হয়েছে নাভিশ্বাস...” [১]
কেবল এটুকুই না, ভয়ংকর ব্যাপারটা হচ্ছে, কিছু-কিছু ধর্মে নিজ ধর্ম ত্যাগ করলে হত্যা করার নির্দেশও দেওয়া আছে!

বিভিন্ন ধর্মে এমন অনেক ঘটনার অলৌকিক বর্ণনা আছে যার আদৌ কোনও ব্যাখ্যা নেই। তখন সেই ধর্মের অনুসারীগণ অসহায় বোধ করেন। তার এই অসহায়ত্ব নিয়ে সবিরাম খোঁচাখুঁচি করাটা অর্থহীন।

এ থেকেও উদ্ধারকর্তার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় স্বয়ং ধর্ম। চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস রাখার উপরই জোর দেওয়া হয় যে সবই তার ইচ্ছা- প্রশ্ন করার অবকাশ নেই।
এই বৃত্তের বাইরে একদল মানুষ আছেন যারা কোনও ধর্মেই বিশ্বাস রাখেন না, সৃষ্টিকর্তার প্রতিও অবিশ্বাসী। যাদেরকে প্রচলিত অর্থে আমরা নাস্তিক বলি।
এখন কে আস্তিক হবেন বা কে নাস্তিক এটা তো তার নিজের সিদ্ধান্ত। এখানে অন্যদের কী কাজ! ভয় দেখিয়ে আস্তিক বানাবার অপচেষ্টা কেন! এটা তো ভয়ংকর, যে মানুষটার সৃষ্টিকর্তার উপর বিশ্বাস নেই , ভয় নেই সেই মানুষটা ভয় পাচ্ছে তারই মত তুচ্ছ মানুষকে। ওই তুচ্ছ মানুষটা কী সৃষ্টিকর্তার চেয়েও বড়ো!

কেউ-কেউ তো এখনও সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগে বাস করেন। দৈনিক পত্রিকা-খবর-খেলার সঙ্গে কোনও যোগ নাই। এরা অবলীলায় ইসরাইলের দূতাবাস ঘেরাও করার কর্মসূচীও দিয়ে ফেলেন। এটা জানার প্রয়োজন বোধ করেন না ইসরাইলের সঙ্গে আমাদের দেশের কুটনৈতিক সম্পর্ক নাই তাই তাদের দূতাবাস থাকার প্রশ্নই উঠে না। ঘেরাও করাটা হাস্যকর, অতি হাস্যকর।
এরাএমনসব বই পড়বেন [২] যার সূত্রের কোনও বালাই নেই। এক লেখায় আমি লিখেছিলাম এদেরকে পরিপূর্ণ শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। এই দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষদের বঞ্চিত, দূরে রেখে..., 
...ওখানে কেবল ধর্মই শেখানো হবে না। কম্পিউটারও থাকবে। এরা ইন্টারনেট ব্যবহার করবে- এরা নিজেরাই জানবে ধর্ম নিয়ে যেমন কুৎসিত কথা বলা হয় তেমনি চমৎকার কথাও লেখা হয়। এরা চোখ বড় বড় করে মাল্টিমিডিয়ায় মুক্তিযুদ্ধের অসাধারণ সব বীরত্বের প্রামাণ্যচিত্র দেখবে। লাইব্রেরিতে শিক্ষামূলক বই...।[৩]
কিন্তু এখন, কেবল এদের কথা বলেই দায় সারার উপায় নেই। এখন অতি শিক্ষিত ছেলেপেলেরাও চলে আসছে। আমার এক আত্মীয়, বুয়েটে পড়াশোনা করে এমন একজনের ফেসবুকের লেখা দেখে আমি চমকে উঠেছিলাম। সে লিখেছিল, ‘এই দেশে কোনও নাস্তিক থাকতে পারবে না’।

কেন একজন নাস্তিক এই দেশে থাকতে পারবে না! যুক্তি কি? আমি অন্য একটি লেখায় লিখেছিলাম: “...কথাটা রবিদাদার,
‘I love my God because he gives me the freedom to deny him.’ 
বাপুরে, এই ক্ষমতাটাও তো তাঁরই দেওয়া নইলে তো এই গ্রহে অবিশ্বাসী বা অন্য ধর্মের কেউ থাকত না [৪]! ...” তাহলে তুমি কে হে, সলিমুল্লা?
এখন সব কিছুকে ছাড়িয়ে যায় এই ভয়াবহ খবরগুলো। আইএস-এর (ইসলামি স্টেট) মত খুনি-দানবদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার জন্য শিক্ষিত ছেলে-মেয়েরা ওখানে উড়ে যাচ্ছে। হালে যোগ দিতে গেল ইউকে থেকে মেডিকেলের ছাত্ররাও! গা হিম করে দেওয়ার মত এই ঘটনাগুলো।

একটা সময় তো পরিস্থিতি এমন উদ্ভট ভয়ংকর ছিল, ব্লগার মানেই নাস্তিক [৫]আজও নাস্তিক এবং ধর্মের কটাক্ষকারীর মধ্যে ফারাকটা অনেকের কাছেই পরিষ্কার না। পূর্বেই বলেছি কে নাস্তিক হবেন, কে হবেন না এটা তার এখতিয়ার। এখানে অন্যদের কোনও বক্তব্য থাকার কথা না।
তবে কোনও ধর্ম নিয়ে অশালীন, কুৎসিত কথা বলার আমি ঘোর বিরোধী। আরজ আলী মাতুব্বর কেবল ঘোর নাস্তিকই ছিলেন না এই বিষয়ে প্রচুর লেখাও লিখে গেছেন, ধর্মের বিপক্ষে অসংখ্য যুক্তি দিয়েছেন কিন্তু কোথাও তিনি কোনও ধর্ম নিয়ে কুৎসিত কথা বলেছেন এমনটা অন্তত আমার জানা নাই। যেমনটা অভিজিতের বেলায়ও খাটে।

একদল আছেন যারা ধর্ম নিয়ে অতি নোংরা, অতি কুৎসিত কথা বলেন। এমন অনেকেই আছেন যাদের ১০০টা লেখার মধ্যে দেখা যাবে ৯৯টাই ধর্মসংক্রান্ত অতি জঘন্য কথা লেখা। এরা এই কাজটা করেন ইচ্ছাকৃত। এই শিক্ষিত মানুষগুলো কেন এমনটা করেন? কারও কাছে একটা নিরেট পাথর ঈশ্বরতুল্য, অন্য একজনের কি কাজ এটায় লাথি দিতে। এই গ্রহে কী লাথি মারার পাথরের অভাব পড়েছে!
এরা নাস্তিক কিনা সেটা জরুরি না কিন্তু এরা নাস্তিক নামের আড়ালে একেকজন চলমান মুক্তমনা(!)। অন্যের মত-বিশ্বাস-আবেগকে পদদলিত করে কেমন করে মুক্তমনা হওয়া যায় এটা আমার বোধগম্য হয় না! এমন ধর্মীয় আচারও আছে সৎকারের নামে মৃতদেহ টুকরো-টুকরো করে শকুনকে দিয়ে খাইয়ে দেওয়া হয়। এখন কি ওই ধর্মের অনুসারীর মৃতদেহে লাথি মারতে হবে?
আমার দৃষ্টিতে এরা একেকটা ইতরবিশেষ।

আহ, ধর্মের অবমাননা! আমাদের প্রধানমন্ত্রী যখন বলেন, 'ইসলাম ধর্মের অবমাননা সহ্য করা হবে না...'। অথচ ১৬ কোটি মানুষের প্রতিনিধি হিসাবে প্রধানমন্ত্রীর এটা বলাটাই সমীচীন ছিল যে কোনও ধর্মেরই অবমাননা সহ্য করা হবে না [৬]

অনেক ধর্মীয় শিক্ষক ওয়াজের নামে গভীর রাত পর্যন্ত ৮/১০টা চোঙ্গা লাগিয়ে অন্য ধর্মগুলোকে উদ্দেশ্য করে যে সমস্ত উগ্র বক্তব্য দেন তাতে কী ধর্মের অবমানননা হয় না? এই ভিডিওটা দেখলে খানিকটা অনুমান করা যাবে অন্যের ধর্মের প্রতি কেমন অবজ্ঞা-তাচ্ছিল্য-হুমকি প্রদর্শন করা হয়। এই মানুষটা কি অন্য ধর্মের অবমাননার নামে অন্যায় করছেন না? কেন এই মানুষটাকে আইনের আওতায় আনা হবে না?

রানা প্লাজায় যখন একের-পর-এক লাশ উদ্ধার হচ্ছিল তখন মাওলানা মাঈনুদ্দিন রুহী বলেছিলেন: 
'আল্লাহর গজবে’ ভবনটি ধসে পড়ে’।"
কী অমানবিক, হিংস্র কথা!

লেখার শুরুতে বলেছিলাম, আস্তিক আস্তিকের মত, নাস্তিক নাস্তিকের মত থাকলে কোনও সমস্যা ছিল না কিন্তু একদল ধর্মের ঢাল ব্যবহার করে ঝাঁপিয়ে পড়েন নাস্তিকের উপর। নিজের মতের সঙ্গে না-মিললে ইচ্ছা হলেই যে-কাউকে ট্যাগ লাগিয়ে দেন নাস্তিকের [৮]
কখনওবা চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে বিনষ্ট করেন প্রাণ, যে প্রাণ ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতাটুকুও তার নাই। 

নাগাল্যান্ডে ধর্ষণের অভিযোগে ফরিদ নামের যে যুবককে কারগার ভেঙ্গে নগ্ন করে সমস্ত শহর প্রদক্ষিণ করিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলল জনতা অথচ পরে জানা গেল ফরিদ নামের ওই মানুষটা নির্দোষ। এখন ওই খুনিরা কী করবে, ফরিদের প্রাণ ফিরিয়ে দেবে? 

অভিজিতের খুনিদের যদি কখনও এমনটা মনে হয় মানুষটাকে মেরে ফেলাটা ভুল ছিল তখন এরা কী করবেন অভিজিৎকে ফিরিয়ে দেবেন?
এদিকে আবার অন্যদল নাস্তিকের ঢাল ব্যবহার করে অতি কুৎসিত কথার ঝাঁপি খুলে ঝাঁপ দেন আস্তিকের উপর। এই সব 'নাস্তিক মিলিট্যান্ট'রা যদি ভেবে থাকেন আমরা তাদেরকে 'শাবাসি' দেব তাহলে ভুল ভাবছেন।

হাহ, মিলিয়ন-মিলিয়ন নক্ষত্রের মধ্যে (যাদের মধ্যে সূর্য একটা সাধারণ হলুদ নক্ষত্রমাত্র) সেই সূর্যের চেয়েও ১৩ লক্ষ গুণ ছোট এই পৃথিবীর ক্ষুদ্র একটা দেশের অতি ক্ষুদ্র একটা শহরে বসে আমরা কী অবলীলায়ই না জ্ঞান কপচাই। এই গ্রহটার সঙ্গে ৭০০ কোটি মানুষ লেপ্টে আছে অথচ একজন মানুষের শরীরেই ১০০ ট্রিলিয়ন ব্যকটেরিয়ার বাস! এই মহাবিশ্বের পাশে মানুষ নামের ৭০০কোটি সংখ্যাটা কী তুচ্ছ, কী হাস্যকরই না! ধর্ম ঘুরপাক খায় কেবল এই গ্রহের মানুষকেই ঘিরে।

মহাবিশ্বের সমস্ত রহস্য যখন সবাই জেনে বসে আছে আমি কেবল সলাজে বলি, আমি জানি না, কিচ্ছু জানি না [৯]...।

২৫.০৩.২০১৫
*একজনের প্রতি মুগ্ধতা, ভাল লাগার কারণে তার সব কিছুতেই একমত হতে হবে এমনটা আমি মনে করি না বিধায় এই লেখাটায় এটা যোগ করার প্রয়োজন বোধ করছি।
অভিজিৎ রায় তাঁর অবিশ্বাসের দর্শন বইটার (পৃষ্ঠা ৩০৯) শেষ অংশে বলছেন, ...ধর্মকারী নামে একটা সাইট আছে অন্তর্জালে। সাইটটির উদ্দেশ্য সম্বন্ধে বলা হয়েছে- ...এই ব্লগে ধর্মের যুক্তিযুক্ত সমালোচনা করা হবে, ধর্মকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হবে, অপদস্ত করা হবে, ব্যঙ্গ করা হবে...।

যদিও এখানে অভিজিৎ রায় অন্য একটি সাইটের বক্তব্যের অংশবিশেষ তুলে দিয়েছেন কিন্তু এতে যে তাঁর প্রচ্ছন্ন সম্মতি আছে এটা পরিষ্কার হয়। তাঁর এই মতের সঙ্গে আমি দ্বিমত পোষণ করি।
ধর্মের যুক্তিযুক্ত সমালোচনা করা হবে, ধর্মকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হবে এই নিয়ে আমার কোনও দ্বিমত নাই কিন্তু অপদস্ত করা হবে, ব্যঙ্গ করা হবে এই বিষয়ে আমার ঘোর আপত্তি আছে। কারণ একেকটা ধর্ম তার অনুসারীদের কাছে তার ধর্ম বিশ্বাস-আবেগের স্থান এটা নিয়ে আর যাই হোক ব্যঙ্গ, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা চলে না।

মোটা দাগে আবেগকে আমি ব্যাখ্যা করি এভাবে। কার মা কালো-কালো, চামড়া কোঁচকানো, গুছিয়ে কথা বলতে পারেন না-কথার খেই হারিয়ে ফেলেন...তাতে সেই মার সন্তানের কী আসে যায়। অন্যের কি অধিকার আছে কারও আলাভোলা মাকে নিয়ে ব্যঙ্গ করার? এমনটা হয়ে থাকলে এও এক অন্যায়  

**একটি খুন, অতঃপর: এক: http://www.ali-mahmed.com/2015/03/blog-post_20.html

সহায়ক সূত্র:
১. তাঁদের সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে: http://www.ali-mahmed.com/2009/04/blog-post_06.html
২. কল্পনাকেও ছাড়িয়ে: http://www.ali-mahmed.com/2014/06/blog-post_5.html
৩. চাবুক মেরে দুধে পানি মেশানো বন্ধ করা যায় না: http://www.ali-mahmed.com/2013/05/blog-post_7.html
৪. ...ফারাবী গং: http://www.ali-mahmed.com/2015/03/rokomaricom.html
৫. ব্লগিং-বোল্গিং, আস্তিক-নাস্তিক: http://www.ali-mahmed.com/2013/03/blog-post_15.html
৬. প্রধানমন্ত্রী: http://www.ali-mahmed.com/2013/04/blog-post_4.html
৭. মাওলানা রুহী...: http://www.ali-mahmed.com/2013/04/blog-post_4554.html
৮. নাস্তিক এবং...: http://www.ali-mahmed.com/2013/04/blog-post_9.html
৯. আমি কেউ না, আমি কিছু না: http://www.ali-mahmed.com/2009/05/blog-post_07.html

Friday, March 20, 2015

অভিজিৎ—একটি খুন, অতঃপর: এক।

(ছবি ঋণ: বাংলার চোখ)

অভিজিৎ রায়কে কোপানোর পর যেসব ছবি দেখেছি ওগুলোয় কেমন যেন একটা ফাঁক-ফাঁক মনে হচ্ছিল কি যেন থাকার কথা অথচ নেই। এই ছবিটায় সেই অভাব পূরণ হয়েছে। পুলিশকে দেখা যাচ্ছে।

অতি ঘৃণার সঙ্গে বলতে হচ্ছে তখনই অভিজিতের খুনিকে আটকাবার বিন্দুমাত্র চেষ্টা দূরের কথা তাঁকে উদ্ধার করার চেষ্টাও পুলিশ করেনি! এখানে কেবল দায়িত্ব না মানবতাও মাটিতে গড়াগড়ি খেয়েছে! কেবল তাই না অভিজিৎ এবং তাঁর স্ত্রীকে হাসপাতালেও পুলিশ নিয়ে যায়নি। জনসাধারণের মধ্যে থেকে একজন নিয়ে গিয়েছিলেন। এমনকি পুলিশ এই কাজে তাদের গাড়িও ব্যবহার করেনি, স্কুটারে করে অভিজিৎ এবং তাঁর স্ত্রী বন্যাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অথচ এমন আহত অবস্থায় একজন মানুষের জন্য প্রতিটি সেকেন্ড মূল্যবান।

আমি জানি না এমন চাপাতি কোপানো মুমূর্ষু একজন মানুষকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য পুলিশের প্রতি কোনও প্রকারের ‘উপরের নির্দেশের’ নিষেধাজ্ঞা আছে কি না? আমাদের দেশের আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো আসলেই তাদের কাজ সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল কিনা এটাও একটা প্রশ্ন। এদের অধিকাংশকেই এমনসব কাজে ব্যস্ত রাখা হয় যেটা আদৌ এদের কাজ না। এর উপর আছে ‘উপরের নির্দেশ’। এই উপরের নির্দেশ জিনিসটা কী এটা উপরওয়ালা ব্যতীত অন্য কেউ বলতে পারবে এমনটা ভরসা করি না।

অভিজিৎ রায়ের উপর গুরুতর হামলাটা এই দেশের ১৬ কোটি মানুষের জন্য ভাবনার বিষয় কারণ কেবল অতি সুরক্ষিত (এটার আবার গালভরা একটা নাম আছে, তিন স্তরবিশিষ্ট নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় দিনদুপুরেই না শত-শত মানুষের সামনেই ঘটেছে এই ঘটনাটা। এ অবিশ্বাস্য, এ অভূতপূর্ব!

ড. হুমায়ূন আজাদের বেলায় স্থান এক হলেও খানিকটা নিরিবিলি, আড়াল ছিল। অভিজিতের উপর এই হামলার পেছনে যারা আছে তাদের দূরদর্শিতার তারিফ না-করে উপায় নেই। এরা ঠিক-ঠিক জানে এই দেশের পালস। এরা এটা বিলক্ষণ জানে এই দেশের পুলিশ নীল ল্যাস্পপোস্টের মত দাঁড়িয়ে থাকবে। কিছু নপুংসক গোল হয়ে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে তামাশা দেখবে।
কেবল অভিজিৎকে উদ্ধারকারী ওই মানুষটাই ‘আলোকচিত্রী জীবন আহমেদ’ এই সহজ চিত্রটা খানিকটা ভন্ডুল করে দিয়েছেন। পুলিশ যে জীবন আহমেদকে খুনি বানিয়ে দেয়নি এটা জীবন আহমেদের অপার সৌভাগ্য।

এই দেশ এরপরও বসবাসের যোগ্য এমনটা কেবল এই দেশের ‘চামচ-শ্রেণীর’ বা চামার শ্রেণীর লোক ব্যতীত অন্য কারও পক্ষে দাবী করা সম্ভব না। এই ঘটনা আরও ভয়াবহ, ছোট্ট উদাহরণ:
ঘটনার সময় বইমেলার গেটে দায়িত্ব পালনকারী নীলক্ষেত ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই ওয়াহিদুজ্জামান মিডিয়াকে জানান:
তাকে নাকি এখনও (১২ মার্চ ২০১৫) জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কেউ ডাকেইনি! 
আহা, ডাকবে কেন? জবাবদিহিতা বলতে কোনও বিষয়ের চল তো আমাদের দেশে নাই। আছে কেবল গালভরা নাম, তিনস্তর, সাড়ে তিন স্তর...।

ওরে, তিনস্তর নিরাপত্তাই বটে! শোনো কথা! সম্ভবত চার স্তরবিশিষ্ট নিরাপত্তা ছিল না-বলে এসআই ওয়াহিদুজ্জামান ডাকা হয়নি! আশা করা যাচ্ছে, অচিরেই চার স্তরবিশিষ্ট নিরাপত্তা চালু হবে। তখন তিনস্তর নিরাপত্তার চাদরের বদলে চারস্তরের মোটা কাঁথায় ঢেকে দেওয়া হবে এবং অসংখ্য ক্লোজ-সার্কিট ক্যামেরাগুলো টোকাইদের মাঝে বিলি করে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হবে।

আমাদের চৌকশ গোয়েন্দা মহোদয়গণ বাঘের দুধের পায়েশ জনগণকে খাইয়ে দিতে পারেন এই তারাই এখন হাঁ করে আছেন ভিনদেশি গোয়েন্দাদের মুখ চেয়ে।

অভিজিতের প্রকৃত হত্যাকারী কে এটা যেহেতু আমরা এখনও জানি না তাই বলা মুশকিল কে এর পেছনে? এমনিতে তো আমরা বিভিন্ন নাটক দেখে অভ্যস্ত। ‘জজ মিয়া নাটক’ সগৌরবে মঞ্চস্থ হতে পারলে ‘আসামী মিয়া’ নামে আরেকটা নাটক মঞ্চস্ত হতে সমস্যা কোথায়!
পূর্বেই বলেছি অভিজিৎ রায় যুক্তি-সূত্র দিয়ে যে সমস্ত লেখা লিখে গেছেন... (অভিধানকেও কী চাপাতি দিয়ে কোপানো হবে) [১] সে তো নস্যি তারচেয়েও অনেক অনেক কুৎসিত, জঘন্য ভাষায় অহেতুক ধর্মকে আক্রমণ করার লোকের অভাব এই ব্লগস্ফিয়ারে নেই, তাহলে অভিজিৎই কেন? নাকি কেউ এই সুযোগের পুরো ফায়দাটা নিয়ে নিল? এর উত্তর সময়ের হাতেই না-হয় ছেড়ে দিলাম।

পুলিশের বিরুদ্ধে পরোক্ষ মৃত্যুর অভিযোগ কেন আনা হবে না এই নিয়ে কেবল হইচইই করা চলে- ফলাফল ‘আ বিগ জিরো’। দায়িত্ব অবহেলার জন্য এখন পর্যন্ত কোনও পুলিশ মহোদয়ের কেশাগ্রও এদিক-ওদিক হয়নি এদিকে আমাদের আইনমন্ত্রী মহোদয় যথারীতি হুংকার দিয়েছেন:
“কোনো অন্যায়কারী বিচার ব্যতীত যেতে পারে না। বাংলাদেশের কেউ মনে করতে পারবে না যে, সে আইনের উর্ধ্বে। সেই বাংলাদেশ আমরা গড়ে তুলব।” (http://m.bdnews24.com/bn/detail/bangladesh/940113)
ল ইজ কামিং, আইনমন্ত্রী ‘সেই বাংলাদেশ’ গড়ে তুলতে থাকুন আমরা অন্য প্রসঙ্গে যাই...।

*একটি খুন, অতঃপর, দুই: http://www.ali-mahmed.com/2015/03/blog-post_23.html

সূত্র: ১. ...ফারাবী গং: http://www.ali-mahmed.com/2015/03/rokomaricom.html

Thursday, March 19, 2015

হাঙ্গর!

গতকালের লেখাটা নিয়ে [১] কেউ-কেউ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। আমি বিব্রত হব এটা ভেবে একজন ইনবক্সে তার শ্লেষভরা বক্তব্য উগরে দিয়েছেন, ‘শুভ, আপনি দেখি ধান ভানতে শীবের গীত গাওয়া শুরু করে দিয়েছেন’!
আমার খুব একটা আহত হওয়ার কিছু ছিল না কারণ আমরা সেই শুরু থেকেই ব্লগস্ফিয়ারে লেখালেখি শুরু করেছি- এটা তিনি দাবী নিয়ে আমাকে লিখতেই পারেন।

যাই হোক, আমি লেখাটায় যেটা বলতে চেয়েছিলাম, এই প্রজন্ম তীব্র অসহিষ্ণু হওয়ার এটাও একটা কারণ যে ভারতের উপর তীব্র ক্ষোভ আছে ভারতের বিভিন্ন প্রকারের দাদাগিরি করার জন্য। ওরে, এদের যে আবার দাদা-দাদাগিরি বলে ফেললাম। প্রায়শ্চিত্ত করতে হয় যে- গোবর খেয়ে প্রায়শ্চিত্ত করব কিনা বুঝতে পারছি না।
অন্য এক লেখায় এদেরকে ‘দাদা’ বলায় একজন আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। তিনি চিবিয়ে চিবিয়ে বলেছিলেন, ‘আপনি সাম্প্রদায়িকতা উসকে দিচ্ছেন’। কী সর্বনাশ-কী সর্বনাশ! তাই ঠিক করেছি এখন থেকে এদেরকে দাদার বদলে হাঙ্গর বলব।

তো, গতকালের লেখাটায় এই প্রজন্মের ক্ষোভের কথা বলতে গিয়ে আমি হাঙ্গরের যৎসামান্য কর্মকান্ডই তুলে ধরেছিলাম। হাঙ্গর নৈতিক কর্মকান্ড করল নাকি অনৈতিক সেটা হাঙ্গরকে কে বোঝাতে যাবে! একজন শিক্ষকের বোঝাবার-শিক্ষাদানের জন্য যে পরিবেশ প্রয়োজন তা এখানে কোথায়! শিক্ষক বেচারার হাঙ্গরের পেটে শুয়ে শিক্ষাদান করাটা নিশ্চয়ই আরামপ্রদ কিছু না। আহা, ধর্মের বাণী শোনাতে চাচ্ছে বুঝি কেউ। বেশ-বেশ, ধর্মপুস্তক এবং তিনি দুজনেই পাশাপাশি থাকবেন কিন্তু স্থান ওই হাঙ্গরের পেট।

হাঙ্গর যখন খেলা করে সেটাও অতি ভীতিকর। তেমনি ভারত যখন খেলে সেখানে ভীতিকর না থাকলেও অন্তত অপ্রীতিকর কিছু একটা যে থাকবে, থাকবেই এ তো বিচিত্র কিছু না।এতে করে নির্দোষ-নির্মল খেলা কতটা গুয়ে মাখামাখি হবে এতে কী আসে যায়? যার খানিকটা নমুনা আজ আমরা দেখেছি।
ভারত-বাংলাদেশ ইনিংসে আম্পায়ার আলিম দার ও ইয়ান গৌল্ডের রুবেলের করা বলকে কোমরের উপর ছিল বলে নো-বল বলে রোহিতের আউটকে নাকচ করে দেওয়া। অথচ ছবিতে আমরা পরিষ্কার দেখছি বলটা কোমরের নীচেই ছিল।
সুরেশ রায়নার এলবিডব্লিউ ছাড়াও বাউন্ডারি সীমানায় শিখর ধাওয়ানের নেওয়া ক্যাচটিতে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যান মাহমুদুল্লাহকে আউট দেওয়া হয়। অথচ আমরা ছবিতে পরিষ্কার দেখছি শিখর ধাওয়ানের সীমানার দড়িতে কেবল পা-ই লাগেনি তার প্রায় সমস্ত শরীরই বাইরে।
(ভিডিও ঋণ: আহমাদ রনি। তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা)
গ্যালারিতেও যদি ভারতের জার্সি গায়ে কেউ বলটা লুফে নেয় সেটাও আউট দেওয়াটা নিশ্চয়ই অন্যায় হবে না। বাহে, ‘কাভি নেহি’ বলে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেবেন না- হাঙ্গরের সঙ্গে খেলায় সবই সম্ভব...।

সূত্র:
১. মওকা-সুযোগ-সুযোগসন্ধানী: http://www.ali-mahmed.com/2015/03/blog-post_18.html  

Wednesday, March 18, 2015

'মওকা'-সুযোগ-সুযোগসন্ধানী।

পেপসিকো ইন্ডিয়ার নামে অতি আপত্তিকর ভিডিও ‘মওকা’ নিয়ে আমাদের এই প্রজন্ম প্রচন্ড রকম ক্ষুব্ধ হয়েছে। যদিও পেপসিকো ইন্ডিয়া ক্ষমা চেয়েছে এবং দাবী করেছে এটা তাদের বিজ্ঞাপন না। প্রচন্ড আপত্তির মুখে ইউটিউবেও এই ভিডিওটি অপসারণ করেছে।

কিন্তু এরই মধ্যে এই প্রজন্ম যেটা করে দেখিয়েছে তা এক কথায় অভূতপূর্ব। স্যালুট। তাদের অনেক ভঙ্গির সঙ্গে আমাদের দেশের ঝুলেপড়া গোঁফ এবং ঝুলেপড়া ইয়ের বুদ্ধিজীবীরা বিভিন্ন নৈতিকতার আঁক কষবেন। এতে করে এই প্রজন্মের বয়েই গেছে! বিষয়টা অনেকটা এমন, কেউ কারও মাকে অশ্লীল ভাষায় গালি দিয়েছে, সামনের লোকটাকে স্রেফ খুন করে ফেলতে হবে- এখানে জেনেভা কনভেশনের কী কাজ?

১৯৭১-‘রিবার্থ’, এই দেশ স্বাধীন হওয়ার মাধ্যমে যে প্রজন্ম জন্ম নিয়েছে তার কাছে স্বাধীনতা মা-সম। তার মাকে কেউ অপমান করবে আর সে চেয়ে চেয়ে দেখবে এমনটা আশা করাটাই বোকামী। সেই দ্রোহ-ক্ষোভের তীব্রতা কাঁপিয়ে দেবে সমস্ত কিছু, দিয়েছেও। আমাদের নষ্ট রাজনীতিবিদদের জন্য এটা একটা আগাম সতর্কবার্তা। যারা এই প্রজন্মের পালস বুঝতে পারবে তারাই ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবে।

১৯৭১ সালে ভারতের যেটুকু অবদান তা অস্বীকার করে আমরা অরুচির পরিচয় দিতে চাই না। তবে আমাদের উপকার করার মাধ্যমে তাদের কতটুকু উপকার হলো সেটা না-হয় ভাবাভাবির লোকজনের জন্য তুলে রাখলাম। উপকার করেছে বলে আমরা কী আজীবন হাতের তালু ঘষতে ঘষতে রেখা মিটিয়ে দেব?

যাই হোক, আমি বারবার যেটা বলে আসছি আমার সবটুকু আস্থা এই প্রজন্মের উপরই। পারলে এরাই পারবে করে দেখিয়ে দিতে। যেমনটা মওকার ক্ষেত্রে হয়েছে। ভারতের মত পরাশক্তিকে নাকানি-চুবানি খাইয়ে দিয়েছে। ভারতের মত শক্তিশালী দেশের প্রতি আমরা কারা-কারা নতজানু এতে এদের পরোয়া নেই। এরা এদের লড়াইয়া চালিয়ে গেছে নিজের মত করে।
This is my land, no cowboy rides here. আমার নিজের ভুমিতে কোনও রাখালবালকে মাস্তানি করতে দেব না সে আমেরিকা হোক বা ভারত।

'মওকা'-সুযোগ একটা ওছিলামাত্র। এমনিতে ভারত যে চরম সুযোগসন্ধানী সে আর বলার অপেক্ষা রাখে না। অবশ্য মওকার বিষয়ে অনেকে এই প্রজন্মের প্রতিক্রিয়াকে সহনশীলতার অভাব রূপে দেখছেন। আসলে ‘মওকা’আমাদেরকে একটা মওকা বা সুযোগ এনে দিয়েছে। ভারতের প্রতি এই পুঞ্জিভূত ক্ষোভ কিন্তু একদিনের না। ভারতের বিভিন্ন তালেবর খেলাবিষয়ে বাংলাদেশকে জড়িয়ে অনবরত বিভিন্ন কটু কথা বলেই গেছেন। এর বাইরে ভারত বিভিন্ন সময়ে এই দেশের উপর যে সমস্ত অত্যাচার করেছে এই সমস্তই ঘটেছে এই প্রজন্মের চোখের সামনে।
আমাদের সুন্দরবন ধ্বংস করে এরা রামপাল বিদুৎকেন্দ্রের কাজ চালিয়েই গেছে [১]। এরা নিজেদের বিদুৎকেন্দ্রে জন্য তিতাস নদীকে প্রায় মেরেই ফেলেছিল [২]। ফেলানি নামের অসহায় এক মেয়েকে এরা গুলি করে যেভাবে ঝুলিয়ে রেখেছিল [৩] এই দৃশ্য এই প্রজন্ম বিস্মৃত হয়নি।

বিএসএফ নামের নেকড়েগুলো হাতের নাগালে পেলে এই দেশের লোকজনের শরীরে পেট্রল পুশ করেছে এমন উদাহরণও আছে বা হাত-পায়ের রগ কেটে নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছে। এরা কেমন করে আমাদের দেশের লোকজনকে অত্যাচার করে এই লেখার [৪] সঙ্গের স্টিল ছবিগুলো বা ভিডিওটি দেখলে অনুমান করা যাবে যে এরা কী পরিমাণ হিংস্র! হিংস্রতায় অবলীলায় এরা পশুকেও হারিয়ে দেবে। এমন উদাহরণের অভাব নেই।

ভারতের সুবিধার জন্য আলাদা রেললাইন লাগবে এদের এমন শত বায়ানাক্কার শেষ নেই [৫]। এরা শহরের সমস্ত বর্জ্য পাঠিয়ে দেয় আমাদের দেশে [৬]। কেবল তাই না আমাদের দেশে ফেনসিডিল দিয়ে এরা ভাসিয়ে দেয়, কেবল বাংলাদেশে পাঠাবার জন্য এরা সীমান্তে শত-শত ফেনসিডিলের কারখানা খুলে রেখেছে। ফেনসিডিলের মূল উপাদান 'কোডিন' কিন্তু এদের ফেনসিডিলে যা আছে তা স্রেফ বিষ! এরা কিন্তু নিজেরা ওই ফেনসিডিল ছুঁয়েও দেখে না। এদের মেয়াদ উত্তীর্ণ গুড়ো দুধ, জিরা আমাদের এখানে পাঠিয়ে দেয় আর ইলিশের প্রয়োজন হলে দিদি-দিদি বোল আমাদের কান ঝালাপালা করে দেয়।

আমরা কেবল একটা জায়গায় এদের থেকে পিছিয়ে আছি। এরা নিজেদের স্বার্থের জন্য, দেশের জন্য সবাই একাট্টা এখানে এদের কোনও আপোষ নেই কিন্তু আমরা দলবাজরা না-মানে-ইয়ে বলে অতি দ্রুত দু-ভাগ হয়ে যাই...।

সহায়ক সূত্র:
১. সুন্দরবন-রামপাল: ...!: http://www.ali-mahmed.com/2013/04/blog-post_23.html
২. তিতাস, বানরের পিঠা ভাগাভাগি: http://www.ali-mahmed.com/2011/12/blog-post_23.html
৩. ফেলানি: http://www.ali-mahmed.com/2011/01/blog-post_10.html
৪. বিএসএফ এক নেকড়ের নাম: http://www.ali-mahmed.com/2012/01/bsf.html
৫. ভাল দাম পেলে...: http://www.ali-mahmed.com/2013/06/blog-post_17.html
৬. দান...: http://www.ali-mahmed.com/2014/01/blog-post_14.html

Sunday, March 15, 2015

অদৃশ্যমানব এবং প্লেটোবাদ।

রগরগে একটা কল্পকাহিনী যেটায় একজন মানুষ অদৃশ্য হয়ে যেত- বিচিত্র কারণে যাকে কেউ আর দেখতে পায় না। কে জানত, সেই কল্পকাহিনী বাস্তবে রূপ নেবে তাও আমাদের মত অনুন্নত একটা দেশে!
হুটহাট করে এই দেশ থেকে লোকজনেরা অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। ইলিয়াস আলী অদৃশ্য হয়ে গেছেন। দিন-মাস-বছর গড়ায় এই মানুষটার আর কোনও হদিস মেলে না। আমার কল্পনাশক্তি দুর্বল নইলে হয়তো বলতে পারতাম ভিনগ্রহের কেউ তাঁকে উঠিয়ে নিয়ে গেছে। মাহমুদুর রহমান মান্নাও ১৯ ঘন্টা অদৃশ্য ছিলেন। হয়তো অদৃশ্য হওয়ার কৌশল ভাল রপ্ত করতে পারেননি তাই ১৯ ঘন্টা পর তাঁকে দৃশ্যমান হতে হলো।

এই তালিকা অনেক লম্বা। হালে এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আরেকটি নাম, সালাহউদ্দিন আহমেদ। অবশ্য তাঁর পরিবার-পরিজনের অভিযোগ ডিবির লোকজনেরা তাঁকে রাতের আধারে তুলে নিয়ে গেছে। কিন্তু চার দিন পরও কোনও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা সালাহউদ্দিনকে আটক করেছে এমনটা স্বীকার করেনি। বেশ, কিন্তু সালাহউদ্দিন এখন কোথায় আছেন এটা নিশ্চিত করার দায়িত্বটাও এদের উপরই বর্তায়।

অবশ্য মাহমুদুর রহমান মান্নার বেলায়ও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো ১৯ ঘন্টা পর্যন্ত জানত না যে তিনি কোথায় কিন্তু ১৯ ঘন্টা পর ঠিকই তাকে আটকের কথা স্বীকার করা হয়েছিল। এ সত্য, রাষ্ট চাইলে যে কাউকে আটক করতে পারে আইনের আওতায় থেকে। ন্যায়-অন্যায় সে ভিন্ন প্রসঙ্গ সেটা রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা কিন্তু রাষ্ট্র যেটা কখনও করতে পারে না সেটা হচ্ছে তার কোনও নাগরিক অদৃশ্য হয়ে গেলে তার হদিস দিতে ব্যর্থ হওয়া।

একজন মানুষ ভাল-মন্দ সেটাও আলোচনার ভিন্ন ক্ষেত্র। একজন মানুষ অদৃশ্য হয়ে গেছেন এটা তাঁর পরিবার-পরিজন-স্বজনের জন্য যে কতটা কষ্টের-উদ্বেগের-ভয়ংকর অভিজ্ঞতার তা কেবল ভুক্তভোগীরাই বুঝতে পারেন। এবং এই সময়টা যে কত দুঃসহ তা অন্যরা কেবল খানিকটা অনুমানই করতে পারবেন। সালাউদ্দিনের পরিবার-পরিজন-স্বজনের চেয়ে অসহায় এই মুহূর্তে আর কে হতে পারে? অথচ এই সালাহউদ্দিনের অদৃশ্য হয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে রাষ্ট্রের প্রধান কর্ণধার শেখ হাসিনা মিডিয়ায় প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন এভাবে:
...কয়েকদিন আগে খালেদা জিয়ার কার্যালয় থেকে ৮ বস্তা ময়লা-আবর্জনা বের করা হয়েছে। সবাই জানে, সালাউদ্দিন ওখান থেকেই বিবৃতি দিয়েছেন। আট বস্তা ময়লার সঙ্গে তাকেও কোথাও পাচার করে দিয়েছে কি না, সে জবাব খালেদা জিয়া দিতে পারবেন...। ” (বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১৫ মার্চ, ২০১৫)

একজন মানুষের অদৃশ্য হয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে এমন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করাটা অতি অমানবিক, নিষ্ঠুর একটা আচরণ। রাষ্ট্রের প্রধান কর্ণধার যখন এমন বক্তব্য রাখেন তখন একটি রাষ্ট্রের কাঠামো নড়বড়ে হয়ে পড়ে, সেই সঙ্গে দুলতে থাকে গোটা রাষ্ট্রটাই, ১৬ কোটি মানুষসহ! মাসের-পর-মাস অবরোধ-হরতালের নামে দেশ অচল। চড়চড় করে পুড়ে যাচ্ছে আমাদের চামড়া, আমাদের অতি আস্থার জায়গা আদালতের এজলাস। আমরা উদাসীন চোখে দেখছি। বার্ন-ইউনিট এখন আমাদের শুটিং করার চমৎকার জায়গা।
যে আমরা খানিকক্ষণ ট্রেনের বিলম্ব হলে অসহিষ্ণু হয়ে পড়তাম এখন সকালের ট্রেন রাতে গেলেও নির্বিকার। একের-পর-এক মানুষ অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে এসবই এখন আমাদের গা সওয়া- চলমান একেকজন যন্ত্রমানব। এই দেশে ক্রমশ বাড়ছে যন্ত্রমানবের সংখ্যা।

প্লেটো এমন এক রাষ্ট্রের কাঠামো তুলে ধরেছিলেন..., “... আমাদের ছেলেদের এমন শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হবে ...তাদের জীবনে এমন কোনও গল্প থাকবে না যেখানে ভালো মানুষেরা কাঁদে ও হাহাকার করে, এমনকি তাদের বন্ধুদের মৃতুতেও।
...’লিদিয়া’ ও ‘আয়োনিয়ার’ সুরগুলো নিষিদ্ধ করা হবে কারণ লিদিয়ার সুর দুঃখের এবং আয়োনিয়ার সুর প্রশান্তির। কেবল থাকবে ‘ডরিয়ান’ এবং ‘ফ্রিজিয়ান’ সুর যেগুলো সাহসিকতা এবং মিতাচারের সুর।
...বিকলাঙ্গ শিশু বা নিম্নমানের পিতামাতার সন্তানদের সরিয়ে নেওয়া হবে একটি রহস্যময় অজানা স্থানে...।

এই রহস্যময় স্থান বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া না-গেলেও এটা বোঝার জন্য প্লেটো হতে হয় না যে বিকলাঙ্গ শিশু বা নিম্নমানের পিতামাতার সন্তানরা স্রেফ অদৃশ্য হয়ে যাবে। সব নমুনা দেখে মনে হচ্ছে প্লেটোর সেই রাষ্ট্রে থাকবে কেবল যন্ত্রমানব!
প্লেটো আজ বেঁচে থাকলে বড়ই আনন্দিত হতেন এটা দেখে যে বাংলাদেশের মত অনুন্নত একটা রাষ্ট্র কেমন করে তাঁর স্বপ্নের রাষ্ট্র হয়ে উঠছে। রাষ্ট্রের সব অদ্ভুতুড়ে কর্মকান্ড, রাষ্ট্রের নাগরিকের অদৃশ্য হওয়ার মিছিলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে যন্ত্রমানবের সংখ্যা। কালে কালে এই রাষ্ট্রে থাকবে কেবল যন্ত্রমানব অন্যরা স্রেফ অদৃশ্য হয়ে যাবে।

Sunday, March 8, 2015

ভালোবাসা।

এই শব্দটা বহুল ব্যবহারে ব্যবহৃত। একে অপরের প্রতি, সন্তান, মানুষ, জন্তু-জানোয়ার, গ্রহের তাবৎ জিনিসপত্র মায় কারও কারও নিকট গোটা গ্রহটার প্রতিই। এইসবের প্রতি এই টান, আকর্ষণ হয়তোবা উপেক্ষা করা যায় কিন্তু একটা জায়গায় মানুষ বড়ো অসহায়।

খাবার! খাবারের প্রতি ভালোবাসা। পেট- হায়, পেট! এই খাবার-পেটের জন্যই মা তার সন্তানকে বিক্রি করে দেয়, বাবা তার সন্তানকে ফেলে দেয়। একপেট আগুন নিয়ে দেশ-ধর্ম-নৈতিকতা দূরের কথা এই গোটা গ্রহটাকেই উড়িয়ে দিলেই কী আসে যায়! এই-ই জগদ্বিধান। খাবারের এই অমোঘ টান উপেক্ষা করার ক্ষমতাটা মানুষকে দেওয়া হয়নি। বা সব মস্তিষ্ককে যদি এই নির্দেশ দেওয়া হত এই বর্জ্যগুলো অতি সুস্বাদু। ব্যস, কেল্লা ফতে! (এই জায়গায় কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে আমার মনে হচ্ছিল পেটের ভেতর যা আছে সেইসবই সূর্যের আলো না দেখে ছাড়বে না।)

এটা প্রকৃতির ইচ্ছা না সম্ভবত। পেটের এই সমস্যাটার সমাধান হয়ে গেলে কার দায় পড়েছে নড়াচড়া করার। এক জায়গায় ঝিম মেরে মাস-বছর ধরে পড়ে থাকলে আটকাত কে- শরীরে শ্যাওলা জমে জমে একেজন 'শ্যাওলাকুমার'! বা দূর থেকে বল্মীক বলে ভ্রম হতো।
না, আটকাত না কেউই, এ সত্য কিন্তু স্থির দেহের দেহঘড়ি অকালে থেমে যেত একেক করে। অর্গানগুলো অকেজো হতো অতি দ্রুত।

যাই হোক, এই মানুষগুলোকে দেখে এইসব চিন্তা আবারও মাথায় ঘুরপাক খায়। এদের অনেকেরই বাহ্যেজ্ঞান নাই। গায়ে কাপড় থাকল কি থাকল না, আপনজনকে চিনল কি চিনল না কে পরোয়া করে।
কিন্তু...। সেই তো খাবারের নিকট পরাভূত। ‘পাগলে টাকা চেনে’, বলে একটা কথা খুব প্রচলিত আছে ঘুরিয়ে বললে পাগলে খাবার চেনে, খাবারের প্রতি ভালবাসা...।

Saturday, March 7, 2015

“ভূতের মুখে রাম নাম”!

ওই লেখাটায় [১] আমি লিখেছিলাম:
...আমি দিব্যচক্ষুতে দেখতে পাচ্ছি, জনাব, জাকারিয়া স্বপন বিভিন্ন মঞ্চ আলো করে বসে আছেন। সেই আলোয় চকচক করছে তার পরনের পোশাক-আশাক। চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে হাঁ করে আছে এই প্রজন্ম। এরা অতি মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করছে জাকারিয়া স্বপনের মধুবাক্য! তিনি জলদগম্ভীর কন্ঠে বলে যাচ্ছেন বিভিন্ন নীতিবাক্যের কথা। তিনি আউড়ে যাচ্ছেন ওয়েবসংক্রান্ত বিভিন্ন ইথিকস নিয়ে, কপিরাইট নিয়ে...।

বাস্তবে এটা দেখতে খুব একটা সময় লাগেনি! মোস্তফা জব্বারকে নিয়ে আবারও পরিস্থিতি উত্তাল! জাকারিয়া স্বপন মোস্তফা জব্বারকে নিয়ে বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরেছেন তার লেখা সুবিশাল লেখাটায়। সেটা তিনি করতেই পারেন। খুব খেটেখুটে যে লেখাটা তিনি লিখেছেন এবং লেখাটা সুখপাঠ্যও বটে। কেউ-কেউ তাকে উকিল বলছেন আমি সেপথ মাড়াচ্ছি না। মোস্তফা জব্বরের পক্ষে যুক্তিগুলো শুনলে মন্দ হয় না কিন্তু সুখের বদলে আমার অসুখ বোধ হচ্ছে।
কারণ লেখাটা যে জাকারিয়া স্বপন লিখেছেন! ‘রিদমিক’ কেমন করে মোস্তফা জব্বারের বিজয়ের সঙ্গে মিলে যায়, প্যাটেন্ট-ট্যাটেন্ট, কপিরাইট এই সব নিয়ে। তার এই লেখাটা পড়ে আমি খ-বাষ্প, জমে গেছি কারণ তার মত একটা মানুষ কেমন করে বুক চিতিয়ে এমন একটা লেখা লিখে আমাদেরকে নসিহত দেন!

জাকারিয়া স্বপন নিজে কী করছেন। তিনি যে 'প্রিয় ডট কমের' কর্ণধার সেই প্রিয় ডট কমে প্রকাশ করছেন অন্যের লেখা হুবহু, দাঁড়ি-কমাসহ! কেবল অন্যের লেখা হুবহু ছাপিয়েই দিচ্ছেন না সূত্রটা পর্যন্ত উল্লেখ করছেন না। আমাদেরকে বোঝাবার চেষ্টা করছেন ওই লেখাগুলো তার নিজের। তিনি বা তার প্রতিনিধিরা বনবাদাড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন আর বাঘ-কুমির থেকে গা বাঁচিয়ে সেই সব দুর্ধর্ষ লেখা-প্রতিবেদন আমাদেরকে্উপহার দিচ্ছেন।
কিন্তু আমরা সবিস্ময়ে লক্ষ করেছি কিছু ছবিতে এপির ছাপও মারা। আমরা জানি, এপির মত আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে টাকা খরচ করে কিনতে হয়, আনুষ্ঠানিক চুক্তি থাকতে হয়।

এ সত্য, এই দেশের অধিকাংশ প্রিন্ট মিডিয়া একদা বিদেশী সংস্থার কনটেন্ট নিজেদের মত করে ছাপিয়ে দিত। সঙ্গে দয়া করে লিখে দিত, ‘ওযেব-সাইট অবলম্বনে’। এই নিয়ে বিস্তর হইচই হতো। পরে এদের অনেকেই সচেতন হয়েছে। এখন লেখার সোর্স উল্লেখ করেন। এও মন্দের ভাল যাক বাবা, অন্তত অন্যের ঋণ তো স্বীকার করানো গেল।

এও সত্য, অন্যের লেখা নিজের নামে ছাপিয়ে দেয় এমন অনেকেই আছে সেইসব আউলা-ঝাউলা, এলেবেলে সাইটগুলো নিয়ে আমরা খুব একটা মাথা ঘামাই না কিন্তু প্রিয় ডট কম যখন কাজটা করে তখন নড়েচড়ে না-বসে উপায় থাকে না।
আর জাকারিয়া স্বপন যেটা করছেন সচরাচর সেটাকে চুরি বলারই নিয়ম। কিন্তু তিনি যে ভঙ্গিতে দিনের-পর-দিন, মাসের-পর -মাস ধরে অন্যের লেখা নিজের বলে চালিয়ে দিচ্ছেন যেটাকে চুরি বলাটা অন্যায় হবে, স্রেফ ডাকাতি। কারণ দিনদুপুরে কেউ যখন অন্যের সম্পদ নিয়ে যায় তখন সেটাকে কোনও প্রকারেই চুরি বলাটা সমীচীন না।

জাকারিয়া স্বপনের ডাকাতি নিয়ে পূর্বে লিখেছিলাম [১, ২]। এমন অজস্র উদাহরণ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। সেইসব উল্লেখ করাটায় আলস্য বোধ করছি এবং সেটা হবে শব্দের অপচয়! জাকারিয় স্বপন যে লেখাটা লিখেছেন [৩] সেটায় তিনি উল্লেখ করেছেন,
...অভ্র/রিদ্মিকের উচিৎ ছিল নিজেদের মতো আগানো। এভাবে অনুমতি ছাড়া অন্যের কী-বোর্ড (যা নিয়ে এতো বিতর্ক হয়েছে) নিয়ে বিপ্লব ঘটানোর আগে আরো চিন্তা করার প্রয়োজন ছিল।...
... হয়তো বিজয় অন্য কোনও কি-বোর্ড থেকে কিছু সাহায্য নিয়েছে। কিন্তু সরকার তো বিজয়কে নিজস্ব একটি লে-আউট হিসেবে কপিরাইট দিয়েছে। আমরা কেন সেটাকে মানতে চাইছি না?...
যে মানুষটা নিজেই অন্যের কন্টেন্ট, লেখা-ছবি, তথ্য-উপাত্ত নিয়ে ডাকাতির ব্যবসা করছেন সেই মানুষটাই বলছেন কপিরাইটের কথা! কী শেখাচ্ছেন এই প্রজন্মকে? ভূতের মুখে...!

সূত্র:
১. priyo.com: ডিয়ার, তোমাকে কি ডাকাত বলতে পারি?: http://www.ali-mahmed.com/2015/02/priyocom.html
২. ডয়চে ভেলে বনাম প্রিয় ডট কম...: http://www.ali-mahmed.com/2015/02/blog-post_5.html 
৩. আবারো বিজয় বিতর্ক, কিছু প্রশ্ন-উত্তর: http://www.priyo.com/blog/2015/03/06/137233.html