Search

Tuesday, May 27, 2008

হ্যালো ভীতিবী, হালে ব্যাট-টিভি...

অতীতে একবার এক ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় এক বংগালের জুতার কালেকশন দেখিয়েছিল। আমি দেখে যারপর নাই মগ্ন হয়ে মুগধ(!)
ওই ইলেকট্রনিক মিডিয়ার নাম তখন দিয়েছিলাম 'ভীতিবী'।
আফসোস, বঙ্গালদেশের এক পদ্যখার্তুম(!) সাহিত্যিক থিমটা ছিনতাই করে আমাকে উল্টো চোর বানিয়ে ফেলেছিলেন। হইচই করায় সবাই আমার নির্বুদ্ধিতা নিয়ে বেজায় হাসাহাসি করেছিলেন। মিয়া, যে দেশে পুকুর চুরি হয়ে যায় আর তুমি কিনা একটা শব্দের থিম নিয়ে...; তোমার সাহসও বলিহারি যা হোক। কুতায়(!) পদ্যখার্তুম(!), আর কোথায় তুমি? ৩ টাকা দামের কলমবাজ! বটে রে! ছ্যা...।

যাই হোক, এরপর ওই ইলেকট্রনিক মিডিয়ার নাম আমি বদলে বদলে আজ থেকে এর নাম দিলুম ব্যাট-টিভি। তো ওই ব্যাট-টিভির ওই মহান কাজটা (ঘটা করে জুতা দেখানো) আমাকে নতুন করে ভাবাচ্ছে। জুতাওয়ালা ওই বংগালের কাহিনি নতুন করে জানার পর...।

ওয়াল্লা, ওই বংগাল সম্বন্ধে আপনাদের বলিনি বুঝি? এক পত্রিকায় তার জীবন কাহিনি পড়ে ভম্বহত(!) হছিলুম আমি। হা বিতং না করে অল্প করে মূল বিষয়গুলো বলি:
মানুষটার নাম মুসা বিন শমেশর।
১. তার সম্পদের মূল্য ধারণা করা হয় ৩ বিলিয়নের বেশি।
২. মাঝে মাঝে তিনি তার ব্যক্তিগত জেট বিমান তার হাই প্রোফাইলের বন্ধুদের ধার দেন।
৩. টনি ব্লেয়ারকে ৫ মিলিয়ন পাউন্ড চাঁদা দিতে গিয়ে আলোচনায় আসেন।
৪. তিনি এক স্যুট কখনও দ্বিতীয়বার গায়ে দেন না, প্রতিটি স্যুটের মূল্য ৫ থেকে ৬ হাজার পাউন্ড। এমন স্যুট তার হাজার তিনেক। পোশাকের জন্য বছরে খরচ ৫ কোটি টাকা।
৫. এই লোক গ্রীসের ৭ তারা হোটেল কিনে নেয়ার পর, ওই দেশের পত্রিকায় ফলাও করে লেখা হয: মুসা কি গ্রীস কিনে নিচ্ছেন?
৬. লন্ডনে তার রয়েছে রোলস রয়েস।
৭. তার গুলশানের প্রাসাদোপম ভবনের আসবাবপত্র ইটালি থেকে আমদানি করা এবং প্রতি ৬ মাস অন্তর পরিবর্তন করা হয়। ওই ভবনে তার সেবার জন্য এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকে ৫০ জন মানব, যারা সব সময় ডিনার জ্যাকেট পরে থাকে।
৮. এই অতি সুদর্শন মানুষটার জন্য ডায়ানা নাকি পাগল ছিলেন। (তবে মুসার ছবি দেখে আমার মনে হয়েছে, মানুষটার মুখের ইয়া বড় যে আঁচিলটা আছে, ডায়ানা সম্ভবত এটার জন্যই পাগল ছিলেন। মহিলাগণ পাগল হলে আঁচিল তার কি কাজে লাগে এটা অবশ্য আমি জানি না। তবে আজিজ নামে আমার যে বন্ধু আছে তার ড্রাইভারের সৌন্দর্যের কাছে মুসা মিয়া নস্যি।)


আপনারা নিশ্চই আঁচ করতে পেরেছেন বংগালদেশের শীর্ষ আয়করদাতার নাম মুসা বিন শমশের। সরি চ্যাপ, আমার হাতে শীর্ষ করদাতার যে লিস্ট আছে এতে অন্তত ২৫ জনের মধ্যে মুসার মিয়ার নাম নাই!

তো, আমার কথিত ব্যাট-টিভি এই মুসার মিয়ার জুতার কালেকশন দেখিয়েছিল। অনেকটা সময় লাগিয়ে...। আচ্ছা, আমার ছেঁড়া চটিটা কী ক্ষণিকের জন্য ব্যাট-টিভি দেখাবে? টাকা যা লাগে দেব নে।


যদিও এখন আপাদমস্তক দেনায় ডুবে আছি (আমার পরিচিত বুদ্ধিমান মানুষদের জন্য উপদেশ, আমার কাছ থেকে এখন শত-হস্ত দূরে থাকেন। আশা করছি, বুদ্ধিমানের জন্য ইশারাই কাফি)- তবু, তবুও মৃত্যুর আগে আমার বড় সাধ, ব্যাট-টিভি একবার আমার অতিশয় পুরনো ছেঁড়া চটিটা দেখাক (অবশ্য চটিটার যা অবস্থা, কোন বিচার-আচারে কাউকে এই চটি দিয়ে মারতে চাইলে সে ক্ষুব্ধ হয়ে বলবে, আমাকে জুতায় গু লাগায় পিটান কিন্তু এই চটি দিয়া না।)

তবুও সাধ, দেখাক না ক্ষণিকের জন্য। যা টাকা লাগে ক্যাশে পেমেন্ট করব। প্রয়োজনে কিছুই বিক্রি করার না থাকলে আত্মা বিক্রি করে দেব শয়তানের কাছে। শয়তানের নামে কসম!
আজ (১৪.১০.০৯) জানলাম, লাটভিয়া ঋণদাতা সংস্থা কনটোরা লোকজনের আত্মা বন্ধকী হিসাবে রেখে বিরাট অংকের ঋণ দেয়! (রিপলি'স)।
গুড-গুড! তবুও দেখাক ব্যাট টিভি ছেঁড়া চটিখানা। দুইটা না-হলেও অন্তত একখানা...বড়ো সাধ উড়াই কিছু ফানুস...।

*ছবিঋণ: ফানবিজ
**আফসোস, মসজিদ হইতে আমার চটি কে বা কাহারা চুরি করিয়া ফেলায় ইহার ছবিহ(!) দেয়া যাইতেছে না বলিয়া বড়ই পরিতাপ বোধ করিতেছি।
নিতান্ত বাধ্য হইয়া ইন্টারনেট থেকে 'ফানবিজ' হইতে ধার করিয়া চটির ছবি দিলুম। অবশ্য আমার ধারণা, এই চটি এখন এন্টিকের পর্যায়ে চলিয়া গিয়াছে।

Wednesday, February 27, 2008

রাহেলা: একটা বিস্ময়, একটা চাবুকের নাম!

কিছু অদেখা ক্ষত আছে যা দৃশ্যমান না বলে বাঁচোয়া! কিন্তু এড়াবার উপায় কী? রাহেলার চট করে মরে যাওয়ার কথা ছিল কিন্তু এই মানুষটা দিনের পর দিন বেঁচে ছিলেন সম্ভবত আমাদেরকে চাবকাবার জন্য। চাবুকের ক্ষত শুকিয়ে যাচ্ছিল ...!

আমাদের দেশে অসম্ভব শক্তিশালী মানুষের মেয়ে শাজনীন হত্যা মামলা ঝুলে থাকে বছরের পর বছর। হতদরিদ্র রাহেলার মামলার গতি কী হবে তা সহজেই অনুমেয়! আইনের হাত খুব লম্বা শুনতে ভালই লাগে কিন্তু আইনের পা পেছনে এও সত্য। সম্প্রতী নিজস্ব কাজে কোর্টের কিছু কাজ-কারবার দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। বিস্তারিত না বলে অল্পই বলি, আইনর লোকদের আইনের প্রতি কতটা শ্রদ্ধা বলা মুশকিল। সুপ্রীম কোর্টের বারে দেখেছি আইনজীবীরা ধুমসে সিগারেট টানেন, এতে কোন বিকার আছে বলে মনে হয়নি। জাজ সাহেব রায় দিয়েছেন কিন্তু সপ্তাহের পর সপ্তাহ সই করেননি। এই রায়ের আদৌ মূল্য কী?

২০০৪-এ রাহেলার বিষয়টা যখন জেনেছিলাম, তখন আমি হতবাক হয়ে ভাবছিলাম, ওই মানুষটার বাঁচার কী তীব্র আকুতি: ‘আমি মরি নাই, আমারে বাঁচান’! কেমন করে সম্ভব একজন মানুষের পক্ষে এই অল্প কটা শব্দ উচ্চারণ করা? যে মানুষটার শরীরে পচন ধরেছে। স্পাইনাল কর্ড এবং দু-পায়ের রগ কাটা, শুধু কন্ঠনালীর মাধ্যমে শরীরের সঙ্গে মাথা ঝুলে আছে। শরীরের ক্ষতঅংশে অজস্র পিপড়া বাসা বেধেছে এবং কাটা অংশ থেকে রক্ত পড়তে পড়তে পুরো শরীর ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। মানুষটাকে এ গ্রহের চরম শারীরীক নির্যাতন করে নর নামের যে নরপশুরা তাকে জঙ্গলাকীর্ণ নির্জন স্থানে এই অবস্থায় ফেলে গিয়েছিল, দু-দিন পর তার আবার ফিরে আসে এবং জীবিত দেখে ক্ষতস্থানে এসিড ঢেলে দিয়েছিল।

রাহেলা, হতভাগা এই মানুষটা রোদ-বৃষ্টির মধ্যে ৩দিন এই অবস্থায় টিকে ছিলেন। হায় রে জীবন, এই নষ্ট গ্রহে বেঁচে থাকার কী আপ্রাণ চেষ্টা! পরে তাঁকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তখন তিনি স্পষ্ট করে বলেছিলেন, দুর্বৃত্ত লিটন, দেলোয়ারের নাম। টানা ২৩দিন মৃত্যুকে তুড়ি মেরে একসময় হাল ছেড়ে দেন, আরেকটা কুৎসিত ভোরের অপেক্ষা না করে মারার যান। এসবই পুরনো তথ্য, অনেকেরই জানা।

রাহেলার মা তাঁর কষ্ট শেয়ার করেছিলেন এভাবে: ‘তারা চিকিৎসার খরচ চালাতে পারছেন না। সরকারী হাসপাতাল হলেও ওষুধ কিনতে হয় বাইরে থেকে’। রাহেলার স্বামী হাসান মিয়া (সূত্র: প্রথম আলো), চাঁন মিয়া (সূত্র: ফয়সল নোই। আমার ধারণা এই তথ্যটাই সঠিক)।

তো রাহেলার স্বামী জানিয়েছিলেন: ‘অর্থাভাবে চিকিৎসার খরচ যোগাতে পারছি না’। আহ-হা, আমাদের দেশের মানব দরদীরা তখন কোথায় ছিলেন! বিভিন্ন নারী সংগঠন ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ডে বিক্ষোভ মিছিল করেছিলেন। বেশ যা হোক।

আজ ভাবি, আমিই বা কোথায় ছিলাম? আরে, আমার তখন সময় কোথায়! বইমেলা সামনে, চেষ্টা করিয়া যদি একটাখানা কিতাব বাহির করা যায়, ছাতাফাতা লেখা নিয়ে ভারী ব্যস্ত। বিষয়টা এখানেই শেষ হলে বেশ হতো। কিন্তু...।

একজন খুব ঝামেলা করছিল, আমাকে গরু খোঁজা খুঁজছিল। প্রচলিত ভাবনায় মানুষটা তেলিবেলি টাইপের। যে মানুষটা আমাকে কালঘাম ঝরিয়ে খুঁজছিল সচরাচর এইসব মানুষদের কাছ থেকে আমার মত মানুষ যথেষ্ট গা বাঁচিয়ে চলি, দু-চার পাতা বেশি শিখে ফেলেছি যে! মানুষটাকে দেখতাম ফুটপাতে বসে ছাতা, তালা সারাই করতে। কিন্তু একটা বিষয় আমাকে অবাক করত, তিনি পাশের দোকান থেকে পত্রিকা নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তেন অথচ আমি পত্রিকায় কখনও কখনও চোখ বুলিয়ে সারা।
তিনি আমার কাছে এসেছেন ওই দিনের পত্রিকা পড়ে, রাহেলার চিকিৎসার অর্থ সংকট, তাই কিছু টাকা দিতে চান। পালা কেটে (গ্রাম্য ব্যাংক, বাঁশের মধ্যে টাকা জমানো হয়) টাকা নিয়ে এসেছেন। কিভাবে টাকা পাঠানো যেতে পারে এই পরামর্শ করতে। টাকার অংকটাও কম না, প্রায় ৪০০০ টাকার মত।


পাগল, আমার সময় কই,কাজ-অকাজে বেলা বয়ে যায় যে! বললেই ঢাকা যাওয়া যায় নাকি? নাছোড়বান্দা মানুষটা আর নিরুপায় আমি, টাকাটা না নিয়ে আমার উপায় কী! আমার এক বন্ধুকে ফোন করে বললাম, সমপরিমাণ টাকা রাহেলার মার হাতে পৌঁছে দিতে। সাপ্তাহিক ছুটিতে বাড়িতে আসলে দিয়ে দেয়া হবে। তার মুখেই শোনা, রাহেলার মা টাকাটা পেয়ে নাকি খুব কেঁদেছিলেন! বারবার জানতে চাইছিলেন প্রেরকের নাম। কিন্তু মানুষটার নাম প্রকাশে যে বড় অনীহা, তা বেশ! কিন্তু ওই মানুষটা আমাকে যে জুতা মেরেছিলেন, জুতায় আবর্জনা লাগিয়ে, এই কষ্টটা কাকে বলি!

*ছবি সূত্র: ইন্টারনেট

Thursday, February 14, 2008

ভালবাসা দিবসে:

তবুও এই কুতুয়া গ্রহটাকে ভালবাসি...।

Thursday, January 31, 2008

Wednesday, January 30, 2008

বংগাল দেখো দানবীর কাহাকে বলে...

আমরা ২ টাকা দান করে ২০০ হাত লম্বা ঢোল বাজাই- আপ্রাণ চেষ্টা থাকে জাঁক করে এটা প্রমাণ করতে আমরা কত্তো বলো(!) দানশীল। ঘটা করে ফটোসেশন করাটাও খুব জরুরী- কই হাত, কই মাথা!

আমাদের কাছ থেকে ত্রাণ নিয়ে আমাদেরকেই দেয়, তবুও এদের এই সমন্বয়কারীর কাজটাকে আমি সাধুবাদ জানাই। কিন্তু বাহে, ঢোলটা যে ফাটিয়ে ফেললে হে!
......................
প্রথম আলো কেন পড়ি? আজ এ প্রশ্নটা মাথায় কেবল ঘুরপাক খায়। অন্যতম কারণ এটা হতে পারে, হয়তো চুতিয়া পত্রিকার ভিড়ে এটা কম চুতিয়া পত্রিকা। আজ প্রথম আলো পত্রিকাটা তন্নতন্ন করে খুঁজেছি কিন্তু আমার কাংখিত খবরটা কোথাও নেই। খবরটা এই চুতিয়াদের কাছে সামান্য হলেও আমার কাছে অসামান্য।

গতকালই ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলিতে এসেছে খবরটা: একজন অজ্ঞাতনামা মানুষ এই দেশের মানুষদের জন্য দান করেছেন প্রায় ১০০০(এক হাজার) কোটি টাকা!!!
মাইন্ড ব্লোয়িং, জাস্ট মাইন্ড ব্লোয়িং বলতে পারলে আরাম পাওয়া যেত কিন্তু ফাঁকা হয়ে যাওয়া মাথায় এটা বলারই বা যো কই! হাবিজাবি, হিবিজিবি অনেক খবর আছে কিন্তু পেত্থম আলো(!)-তে এ খবরটা নাই! বেশি আলো দেখিয়ে ফেলার ফল সম্ভবত!

Sunday, January 20, 2008

লেখালেখি বনাম লেখালেখি ডট কম


আমার মত অখ্যাত লেখকদের(!) জন্য, লেখার মান বোঝার জন্য লেখালেখি(বই) এবং লেখালেখি ডট কমের তফাত আকাশপাতাল।

বই লেখার প্রতিক্রিয়া হচ্ছে অনেকটা গন্ডারকে কাতুকুতু দেয়ার মত।
উদাহরণ দেই: কনকপুরুষ নামে একটা উপন্যাস কাজীদা বের করেছিলেন ৯৫ সালে। এটা যে কারও কারও ভাল লেগেছিল, দু-এক জন এখনও মনে করে বসে আছেন এইসব বিষয়গুলো আমি জানতে পারি ২০০৭ সালে; তাও ওয়েব-সাইটের মাধ্যমে। এর কোন মানে হয়!

লেখালেখি ডট কম বলতে আমি বোঝাচ্ছি ওয়েব-সাইটে লেখালেখি। প্রতিক্রিয়া বোঝার জন্য কখনও ৫ মিনিটও লাগে না।
২০০৬-এ সামহোয়্যার-এর খোজ পাই সম্ভবত প্রথম আলোতে। শুভ নামে লেখালেখির শুরু। প্রথমদিকে তো বিষয় খুঁজে পেতাম না। কপি-পেস্টই ভরসা। পরে সতর্কতার সংগে নিজের কিছু লেখা দিতে শুরু করলাম। ধরা পড়লে সমস্যা, হয় স্বীকার করতে হত শুভ’র পেছনের মানুষটা আমি নইলে সোজা বাংলায় চোর। আমি ব্যতীত অন্য কেউ যে আমার বই পড়ে না এর প্রমাণ পেলাম, তেমন কেউ ধরতে পারলেন না। সাবলীল গতিতে লেখা দিতে থাকলাম। কেউ কেউ ধরে ফেললেও চেপে গিয়েছিলেন বলে ধন্যবাদার্হ।

যাই হোক, সে এক সোনালি সময়। কী অপার আনেন্দেই না কেটেছে সময়টা। বাংলা টাইপ করতে পারতাম না। অক্ষরগুলো আমার কাছ থেকে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াত তবুও অপার আনন্দে শব্দের পর শব্দ টাইপ করে গেছি, কখন ভোর হয়ে গেছে বলতেও পারিনি।
পরে ওখানকার অনেক পোস্ট নিয়ে শুভ’র ব্লগিং বের হল। ওখানে আর লেখালেখি হল না।

ওখানে লেখালেখি করার আর আগ্রহ ছিল না, সুর কেটে গিয়েছিল। কারণ অনেক। শুভ নামের পেছনের মানুষটা সামনে চলে এলো। অবশ্য ওই মানুষটা এসে গেল বলে তেমন কোন তারতম্যের কিছু নেই- দুইই অখ্যাত, উনিশ আর বিশ! তবুও পুরনো বন্ধুদের কারণে যাওয়া।
কালেভদ্রে এখনও।

ওখানে শিখেছি অনেক। আমার লেখালেখি যে ছাতাফাতা এটা অনেকের লেখা দেখে অবলীলায় বুঝতে পারতাম, এদের লেখার হাতকে এখনও ঈর্ষা করি।
পেয়েছিও অনেক। মমতায় বাড়ানো সব হাত। কোন শালা তাকায় মমতায় বাড়ানো নোখের দিকে! ওখানকার অনেকের সংগে এখনও যোগাযোগ আছে, অনেকের সংগে নাই।

তো, ওখানের অনেক কিছুর সংগে মানিয়ে নিতে আমায় বেগ পেতে হচ্ছিল। জায়গাটা ছিল বাংলাদেশের প্রতিবিম্ব-আয়না! কী নেই? ঈর্ষা, অহংকার, লম্বা লম্বা বাতচিত, অহেতুক ঠ্যাং ধরে টানাটানি। অন্যকে অসম্মান করার তীব্র ব্যাকুলতা। জায়গাটা যেহেতু লাইভ সেহেতু এখানে যারা লেখেন তারা থাকেন পুরোপুরি অরক্ষিত। কিন্তু আমরা ভুলে যাই ফ্রি স্টাইল কুস্তিতেও কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়। একজন বেশ্যাকেও যে তার প্রাপ্য সম্মান দিতে হয় এটা আমরা আর কবে শিখব!

যেটা বলছিলাম, এই ইন্টারায়্যাকশন- আমার উপর চাপ পড়ত। অনেকের কাছে বিষয়টা হাস্যকর মনে হলেও এই চাপ কখনও কখনও আমি নিতে পারতাম না। কী আর করা, একজন দুর্বল মানুষের দুর্বল ভাবনা!

ওখানে থাকতে থাকতেই শুনছিলাম আরেকটা সাইট দাঁড়াচ্ছে। এখানকারই কিছু মেধাবী মানুষ নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। খোদার কসম, ওখানে যাওয়ার কোন গোপন ইচ্ছা আমার ছিল না। নিরিবিলিতে দু-কলম লেখার চেষ্টা করতেই আমার আনন্দ। কিন্তু এখানকার বেশ কিছু পরিচিত মুখ এবং আবেগীয় কিছু কারণে গেলাম। অবশ্যই এটা ভুল সিদ্ধান্ত ছিল।

অরি আল্লা, ওখানে গিয়ে দেখি ব্রাক্ষণ, শূদ্রের খেলা। ওখানে কেবল ব্রাক্ষণরাই থাকবেন অন্যরা খেলা থেকে বাদ। ব্রাক্ষণদের মাঝে আমি ভারী বিব্রত হচ্ছিলাম। কারণ, উচুমার্গের বা উচু কোন বিষয়ের সংগে আজও খাপ খাওয়াতে পারিনি। এমনিতে আমার উচু-ভীতি আছে, উচু কমোডেও।

মূল প্রসংগ থেকে সরে এসেছি, শূদ্রের দলে এমন অনেককে ফেলা হলো যারা আমার প্রিয় মানুষ। অসহায় আমি, কেমন করে এদের চোখে চোখ রাখি!
তখন আমি এখান থেকে পালাতে উদগ্রীব।
ভাজা মরিচ পড়ল গিয়ে ল্যাটকা খিচুরিতে- অজান্তেই সুযোগ এসে গেল। ওখানে একজন আমাকে রাজাকার ভাবাপন্ন বলে ফতোয়া দিলে, আমি মন্তব্য করলাম, "শুভ রাজাকার ভাবাপন্ন এই কথাটা ঠিক না, সে আস্ত একটা রাজাকার। তার কর্মকান্ডের বর্ণনা পাবেন তার লেখা ‘আমি রাজাকার বলছি’ বইয়ে"।
হা হা হা। মন্তব্যটা করে খুব মজা পেয়েছিলাম। মানুষটা আমার মন্তব্যর রসিকতাটা ধরতে পারেননি!

কিছু সহৃদয় মানুষ আমার প্রতি অযাচিত মমতার কারণে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলেন। সত্যি বলি, আমি লজ্জায় লাল-নীল হয়ে যাচ্ছিলাম, ভারী বিব্রত হচ্ছিলাম। আমাকে নিয়ে এই হইচই ভাল লাগছিল না। পরে ওখানে আর ফিরে যেতে চাচ্ছিলাম না। কেননা অন্যদের উপর আমাকে নিয়ে অহেতুক চাপ পড়ত। হায়রে মায়া, হায় মমতা! ফিরে না গিয়ে উপায় ছিল না।

এরিমধ্যে আমি খুব বড় একটা বিপর্যয়ের মধ্যে পড়লাম। সব কেমন এলোমেলো হয়ে গেল। অস্বাভাবিক জীবন-যাপন করি। আর লেখা-টেখা!
তো, এখানকার প্রধান উদ্যেক্তা যিনি, তাকে একটা মেইল করলাম। প্রধান উদ্দেশ্য ছিল আবারও ভুল বোঝাবুঝির হাত থেকে রেহাই পাওয়া। কাতর হয়ে লিখেছিলাম, আমার সমস্যার কারণে এখন আর লেখা হয়ে উঠছে না, আপাতত ওই সাইটটাতেও লেখা হয়ে উঠবে না। বিষয়টা যেন বিবেচনা করা হয়, অন্য কোন অর্থ করা না হয়।
তিনি ফিরতি মেইল করলেন, কোন সমস্যা নাই।

হা ঈশ্বর, কেন কেন কেন? ঠিক ঠিক জবাব চাই! আমার বেলায়ই কেন এমন হয়? ড্রেন রাস্তার মাঝখানে চলে আসবে কেন? একান্তে একটু হাঁটতেও পারব না বুঝি, হুট করে ড্রেনে পড়ব কেন? নাকি আমাকে অমানুষ বলে তোমার ভ্রম হয়!

ওই সময়টাতে মেইল-টেইল চেক করার অবকাশ আর কই। বেশ সময় পর একদিন মেইল চেক করে দেখি জ্বলজ্বল করছে, আপনাকে এই সাইটে ব্লক করা হইয়াছে।
কেন? তার অবশ্য কোন ব্যাখ্যা নাই; কত ‘লম্বর’ আইন ভেংগেছি তারও কোন উল্লেখ নাই।

ওখানকার সতীর্থ কয়েকজনকে জানালে তারা জানালেন, এইটা কিছু না, টেকনিক্যাল সমস্যা- এইটা ওই সাইটের বাগ নাকি ‘বাঘ’। ‘বাঘ’ হলে ভালু(!)- কুনু সমস্যা নাই।

কিন্তু লগ-ইন করতে গিয়ে ব্যাটা সব ফাঁস করে দিল। সত্যি সত্যি ব্লক।
ওই প্রধান উদ্যেক্তাকে বিষয়টা জানার জন্য মেইল করলাম। দিন যায, মাস, বছর- আজও সেই মেইলের উত্তর আসিনিএটা আমার মানতে মন সায় দেয় না। একজন মানুষের কাছ থেকে মানুষের মত আচরণ আশা করাটা দোষের হবে কেন? এই ভব্যতা শেখাবার অভব্য দায়িত্ব আমায় নিতে হবে কেন!
তবে এ-ও হতে পারে যিনি মেইল পেয়েছেন তিনি ঠিক করেছেন হাতে-হাতে আমাকে এর উত্তর দেবেন। হেঁটে রওয়ানা দিয়েছেন, সময় লাগতেই পারে, কী আর করা; অপেক্ষা করা ব্যতীত!

ব্লক করায় এখানে লিখতে না পেরে হাপুষ নয়নে কান্না করার কোন আবশ্যকতা আমার ছিল না, বরং ভারমুক্ত লাগছিল। কিন্তু...। একটা কিন্তু রয়েই যায়, দু:সময়ে নাকি ছোট ছোট আঘাত সহ্যাতিত মনে হয়- তুচ্ছসব বেদনা তখন বুকে বড় বাজে।

Friday, January 18, 2008

একজন দু:স্বপ্নের ফেরিওয়ালা...

একজন মানুষ কেমন করে স্বপ্নের ফেরিওয়ালা থেকে দু:স্বপ্নের ফেরিওয়ালা হয়ে পড়ে? সাধে কী?
গত বছরের মাঝামাঝি মুখোমখি হলাম সীমাহীন বিপর্যয়ের! ঝপ করে চোখের সামনে নেমে এলো একগাদা বাজে ক্ষণ- চোখের মনি মাখামাখি হয়ে গেল নিকষ কালিতে!
বড় ধরনের আর্থিক বিপর্যয়। এমন সমস্যা অনেকটা গোপন অসুখের মত, চট করে কাউকে বলা যায় না। বললে কেউ না আবার ভেবে বসেন: এইরে, এই বুঝি কোন হেল্প চাইবে!
টানেলের শেষ মাথায় কোন আলো নাই, অল্প আলোও শুষে নেয় অন্ধকার। আমি বিমর্ষ মুখে ঘুরে বেড়াই। পৃথিবীর যাবতীয় কিছুই অর্থহীন মনে হয়। কেমন বদলে যেতে থাকলাম। আগে ফান করে নিজেকে পোকামানব বলতাম- সত্যি সত্যিই পোকামানব বনে গেলাম।
সামনে বই-মেলা, ডেড লাইন পেরিয়ে যাচ্ছে। আমি নিরাসক্ত ভংগিতে ভাবি, গোল্লায় যাক বই-মেলা। আমার ছাতাফাতা লেখার জন্য কে মুখিয়ে আছে, আবর্জনা সৃষ্টি না করলে আটকাচ্ছে কে!

মড়ার উপর খাড়ার ঘা, নাকি খাড়ার উপর মড়ার ঘা? বছরের শেষের দিকে বুলডজার চলে এসেছে আমার বাড়ি ভেংগে দিতে। ব্রিটিশ আমলে এটা নাকি রেলওয়ের জায়গা ছিল- এই দীর্ঘ বছর পর এরা এক্ষণ আবিষ্কার করেছে জায়গাটা তাদের! ব্রিটিশ আমলে নাকি কারা কারা ভুল করে গেছে। বেশ যাহোক, এই জের আমাকে বইতে হবে কেন? তর্কের খাতিরে মেনে নিলাম নাহয় কিন্তু ভাংতে হবে কেন?
বুলডজারের সামনে কলম বড় হাস্যকর একটা ঢাল, আমার মত কলমবাজের এই কলম ছাড়া আছেই বা কী! আমার অবস্থাটা দাড়াল পিংপং বলের মত- এখান থেকে ওখানে, ওখান থেকে এখানে। যেসব মানুষদের কাছ থেকে শত-হাত দূরে থেকেছি তাদের জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা দাড়িয়ে থাকি। দু-কলম লেখার চেষ্টা করি বলে প্রথম শ্রেণীর একজন কর্মকর্তা আমাকে শেখান সাহিত্য কি। আমি শিখি- সময় আমাকে শেখায়। ইনি নাকি সময়ের অভাবে সাহিত্য প্রসব করতে পারছেন না- নইলে এই দেশে হাংগামা করে ফেলতেন!
পিংপং বলের গতির সংগে যোগ হয় টাকা চালাচালি। আমাদের এই কর্মকর্তা কাম নব্য সাহিত্যিক অভব্যর মত অন্যায্য টাকা নেন, এতে তার কোন লাজ নাই, আমারো। আমি একজন পোকামানব নির্বিকারচিত্তে টাকা দেই...ভয়ে নিজের চোখের দিকে তাকাই না।

হাইকোর্টের শরণাপন্ন হয়ে রিটের আবেদন করলে হাইকোর্ট নিষেধাজ্ঞা দেন কিন্তু এখানেও কাহিনীর শেষ নাই। আজ আর এটা নিয়ে বলতে ইচ্ছা করছে না- হয়তো অন্য কোন সময়।
তো, আমি ভোরে শীতে কাপতে কাপতে ঢাকা যাই- অপেক্ষায় থাকি ন্যায়ের জন্য। নিজের সংগে অভিমান কি না জানি না অভুক্ত থাকতেই ভাল লাগে। পা ছড়িয়ে বসে থাকি অভুক্ত, শ্রান্ত, বিষণ্ন, বিমর্ষ। পা ছড়িয়ে কাদতে পারলে বেশ হতো- পুরুষ মানুষদের নাকি কাদতে নাই, নিয়ম নাই। কাদলেও চট করে মুখ ঘুরিয়ে নিতে পারাই বড় কথা।
প্রকাশক ফোন করে বলেন, ভাল খবর, আপনার বইয়ের কাজ শেষ। আমি উদাস হয়ে বলি, বেশ! একদিন বললেন বইয়ের ব্যাক-কভারের জন্য কিছু লিখে মেইল করে দেন। আমি কেমন করে বলি মেইল দূরের কথা একটি বাক্য, শব্দও আমার মাথায় নাই।
একদা অবলীলায় বলতাম, আমি এ দেশ ছেড়ে কোথাও যেতে চাই না, পৃথিবীর সবচে সুন্দর দেশেও না। কিন্তু আজ পারলে এই দেশ, সম্ভব হলে এ গ্রহ ছেড়ে যেতে একপায়ে খাড়া- আজ নিজের প্রাণটা বড় তুচ্ছ মনে হয়...

Wednesday, January 16, 2008

খোদেজা: প্রাক-কথন...

আমি বিস্মিত হতেও ভুলে যাচ্ছি, অবশেষে লেখাটা শেষ করতে পারলাম! আমি নিশ্চিত ছিলাম লেখাটা আর শেষ হচ্ছে না। বইমেলায় এবার আর আমার বই বের হচ্ছে না। এই বিপুল আয়োজনে আমি নাই- পাঠককে স্পর্শ করতে পারব না, এই নিদারুণ কষ্টটা কাকে বলি! অথচ এই বছরের মাঝামাঝি খোদেজাকে নিয়ে খবরটা যখন পত্রিকায় পড়ি, তখনই ঠিক করে রেখেছিলাম, খোদেজাকে নিয়ে লিখব, লিখবই। অন্তত আপ্রাণ চেষ্টা করব। বইয়ের নামটাও ঠিক করা ছিল, খোদেজা।
এমনিতে আমি কখনও কোন লেখার ছাঁদ মাথায় রাখি না। ৩ টাকা দামের কলমবাজ, আমার এই ক্ষমতাটাই নাই আসলে। বিশ্বাস করি কলমের উপর (এখন কলম বললে ভুল বলা, হালের কীবোর্ড)। কলম যেমন টেনে নিয়ে যায়, আমি অসহায় দর্শক কেবল। এটা আমার কাছেও অবিশ্বাস্য মনে হয় কিন্তু বিষয়টা সত্য। কোথায় থেকে কি হয়ে যায় অমি জানি না! এটা সম্ভবত লেখালেখির মস্ত দুর্বলতা। তাই হয়তো আমার লেখা আর লেখা থাকে না। এ নিয়ে লম্বা লম্বা শ্বাস ফেলা ব্যতীত আজ আর কিছুই বলার নাই আমার।
কিন্তু ভবিতব্য কে জানে! পূর্বে যেটা হয়নি এবার সবগুলো একবারে ঘটতে শুরু করল। এক লাইনও লেখা হচ্ছিল না। লিখতে না পারা কষ্টটা কেমন? উম-ম, এমন কি, যেমন কিছু অসহ্য বেদনা সহ্য হয় না? প্রকৃত লেখকরা নাকি জাগতিক যাবতীয় বেদনাকে বদলদাবা করে লেখার পর লেখা লিখে যান। লেখক নই বলেই এখনও এই দুর্লভ গুণ করায়ত্ত করতে পারিনি।
অবশ্য আমি নিজেকে লেখক বলার দুঃসাহসই করি না। নিজেকে বলি লেখার, একজন রাজমিস্ত্রি যেমন একের পর এক ইট সাজিয়ে একটা কাঠামো গড়ে তোলেন, আমিও তেমনি একের পর এক শব্দের ইট সাজিয়ে একটা কাঠামো গড়ে তোলার অপচেষ্টা করি। সহৃদয় পাঠক যখন ছুঁয়ে দেন নড়বড়ে কাঠামোটাকে, আলোর ছটায় ঝলমল হয়ে উঠে- শিশুর কলরবে মুখরিত একটা পড়ো বাড়ি!
তো, শত চেষ্টা করেও খোদেজাকে নিয়ে লেখা আর হয়ে উঠে, ভাবনায় পরতের পর পরত একরাশ ধুলো জমে কেবল! আমার ব্যক্তিগত অসহনীয় জটিলতার কারণে সব কেমন এলোমেলো হয়ে চোখের সামনে ঝপ করে নেমে এলো একগাদা দুঃস্বপ্ন। একজন নিঃসঙ্গ শেরপা, ৬৫০ কোটি মানুষের মাঝে থেকেও একা। হা ঈশ্বর, কোথায় যাই, কার কাছে লুকাই?
প্রায়শ মনে হত এমন, এই বিশাল গ্রহের কোথাও কি এক চিলতে জায়গা নেই যেখানে আমি আত্মগোপন করতে পারি? কখনও তো নিজেকে মানুষ বলেই মনে হত না; যেন ভাঙ্গাচোরা-বাতিল একটা অবয়ব!
ওয়েব সাইটে লেখালেখি করার কারণে অনেকেরই সঙ্গেই যোগাযোগ হত। আমার যে দু-চারজন হৃদয়বান পাঠক আছেন এরা রাগারাগি করতেন, লিখতে তাড়া দিতেন। এঁদের কেমন করে বলি, লিখতে পারছি না! কিছু বেদনা আছে যা অন্যের সঙ্গে শেয়ার করা যায় না। অবশ্য কেউ কেউ কঠিন ভঙ্গিতেও বলতেন, তোমার আদিখ্যেতা দেখে বাঁচি না, তুমি ছাইপাশ না লিখলেই কী! আসলেই তো, কার কি দায় পড়েছে লেখার পেছনের মানুষটাকে নিয়ে ভাবার। এর ব্যত্যয় হবে কেন! আমি নির্বোধের মত বুঝতে না চাইলে কার কী আসে যায়!
লেখা গেল চুলায়। কই আমি আর কই লেখালেখি, মোরা দু-ভুবনের বাসিন্দা! লেখার ইচ্ছাটাই উবে গেল। হাল ছেড়ে দেয়া ভঙ্গি- কি হবে লিখে, কি হয় লিখে! ইত্যাদি ইত্যাদি।

বেলা বয়ে যায়। ১৫ নভেম্বরের মধ্যে পান্ডুলিপি জমা দেয়ার কথা অথচ কিছুই লেখা হয়নি।
এর সঙ্গে যোগ হল, খোদেজার যন্ত্রণা। কেমন একটা ঘোরের মধ্যে থাকি। মনে হয় এমন, খোদেজা আমাকে তাড়া করে লেখার জন্য: এই মানু, আমাকে নিয়া লেখবা না। এই যাহ, বললেই হল আর কী! একে নিয়ে লেখার ক্ষমতা আমার কই! হায়, আমার দু-হাত ভরা খোদেজার দেয়া শিউলি, আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে টুপটুপ করে ঝরে যায় যে! খোদেজা মনে করিয়ে দেয় বলেই নিজেকে খানিকটা মানুষ-মানুষ বলে ভ্রম হয়, ফিরে দাঁড়াতে বড় সাধ জাগে!
আফসোস, খোদেজা ভুল মানুষকে বেছে নেয়। আমার মত আধা-নাগরিক একজন মানুষের কাছে খোদেজার জগতটা সম্পূর্ণ অপরিচিত, ভাসা ভাসা জেনে কেবল লেখার অপচেষ্টা করা।
বইয়ের নাম খোদেজা দেখে আমার এক প্রিয়মানুষ বিরক্তি প্রকাশ করলেন, জোর অনুরোধ নামটা বদলে দেয়ার জন্য। নামটা নাকি সস্তা উপন্যাসের মত হয়ে গেছে। হায়, খোদেজা নামটা, খোদেজাদের নিয়ে লিখলে বুঝি সস্তা উপন্যাস হয়ে যায়! আসলে আমাদের কাছে খোদেজারা বড় সস্তা!
যে কথাটা তখন বলতে পারিনি, আমি যেমন খোদেজার নিয়তি বদলে দিতে পারি না তেমনি খোদেজা নামটাও বদলাবার ক্ষমতা আমার নাই। এবং খোদেজাকেও নিয়ে লেখার ক্ষমতাটাও। তবুও নিজের চোখে তাকাতে চেষ্টাটা করা, সবিরাম... ।

Friday, January 11, 2008

খোদেজা।

খোদেজা।
সাত বছরের এই শিশুটির প্রতি করা হয়েছিল ওর জ্ঞানমতে অজানা চরম অন্যায়। অভাগীর জান্তব চিত্কার থামাবার জন্য মুখে গুজে দেয়া হয়েছিল মুঠো মুঠো বালু।
নর নামের ওই নরপশুরা খোদেজার জানাজায়ও অংশগ্রহন করেছিল!
প্রচলিত আইনে ওই নরপশুদের ফাসির আদেশ হয়েছিল- একদা ফাসিও কার্যকর হবে। কিন্তু তাদের ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা পশুটা এ গ্রহের সমস্ত আইনের ঊধ্বে।
পশুটার যাওয়ার জায়গার অভাব কী! তার কোন তাড়া নেই- অনাদিকাল ধরে অপেক্ষা করতে ক্লান্তি নেই। সময়ে শিকার বেছে নিতে বেগ পেতে হবে না...।

Friday, November 23, 2007

মিশন পসিবল বলে কোন শব্দ নেই...

`মিশন পসিবল'- বন্যা নিয়ে একটা লিখেছিলাম। আসলে মিশন পসিবলের স্বপ্ন দেখে আমার মত এমন একজন নপুংসক- যার স্বপ্ন দেখা ব্যতীত আর কিছুই করার নাই!

আজকাল নিজের জাগতিক যন্ত্রণার সংগে যোগ হয় অনাকাংখিত যন্ত্রণা। মস্তিষ্কে সব কেমন জট পাকিয়ে যায়- কে জানে, জট পাকাতে পাকাতেই কী মানুষ উম্মাদ হয়ে যায়! আফসোস, মস্তিষ্কের কিছু স্মৃতি টান মেরে ফেলে দেয়া যেত যদি! হয় না এমন, না!

এই সরকারের কাজ অনেকখানি গোছানো কিন্তু মিশন পসিবলের স্বপ্ন কই! সিডরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কই!

এবার নাগরিক, আধা-নাগরিক লোকজনের মাঝে কষ্টের ছাপটা বেশি। অনুমান করি, বিভিন্ন মিডিয়ার লোকজনের অবদান আছে এতে- নিরলস পরিশ্রম করে বিভিন্ন রিপোর্ট করেছেন এরা। গভীর কৃতজ্ঞতা আমাদের।

হায় সিডর, একটা ঝড়। দেশের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া একটা ঝড় লন্ডভন্ড করে দিল সব। এ দেশের অভাগা মানুষরা বন্যার পর যখন মাত্র উঠে দাড়াচ্ছিল, ঠিক তখনই। পত্রিকা পড়তে এখন ইচ্ছা করে না। আজকাল বাড়তি চাপ নিতে পারি না- বড় ভংকুর হয়ে গেছি।

কী পড়ব?
পরিবারের সবাই মরে গেছে, একজন বেচে আছে। কার কাছে এই প্রশ্ন করব সে কেন বেচে আছে?
যে মা মিছামিছি ডেগ বসিয়ে রেখেছেন নিবানো চুলায়- তার সন্তানকে প্রবোধ দেয়ার জন্য, রান্না হচ্ছে, খাবার মিলবে। এই মিথ্যাচারের জন্য এই মাকে কোন আইনে বিচার করা হবে, কোন আইনে?
যে শিশুটির জানাজা পড়ছে অল্প কজন লেংটিপড়া মানুষ। লেংটি পড়ে জানাজা পড়ার ধর্মীয় নিয়ম আছে কী? এই নিয়মের ব্যত্যয় করায়, এই মানুষদের ধর্মীয় অনুশাসন ভংগ করার জন্য সহীহ হাদিস-জয়ীফ হাদিসের কেতাবটা খোলা হবে না বুঝি?
৫টা বিস্কুট ত্রাণ নেয়ার জন্য উঠেছে শত কাতর হাত- এই নিবোর্ধ আচরণের জন্য কী এদের কোন শাস্তি হবে না?

প্রথম আলোকে দেখছি ত্রাণভর্তি জাহাজ নিয়ে বেরিয়ে পড়তে। কার মাথা থেকে এই আইডিয়া বেরিয়েছে জানি না কিন্তু আমি ওই আইডিয়াবাজ মানুষটাকে স্যালুট করি! এক্ষণ এটার বড় প্রয়োজন।

ত্রাণ আসছে, ত্রাণ আসবে- জীবন্মৃত মানুষদের এতে কী কাজ!
আমাদের কারাবন্দী রাজনীতিবিদরা ছটফট করছেন, কেন তাদের ত্রাণ বিতরণ করতে দেয়া হচ্ছে না। কারামুক্ত থাকতে দেখেছি এরা নিজেরাই নিজেদের সামলাতে পারেন না- সামলাতে চারপাশে লোক না হলে চলে না। এরা নাকি দেবেন ত্রাণ- বছরের সেরা রসিকতা বটে!

ফি বছর আমরা এমনসব দৃশ্য আমরা দেখেই যাব। কলমের কালি খরচ করার তো এখন রীতি নাই, হালের কী বোর্ড টেপাটেপি করে আমার মত সস্তা কলমবাজ ছাতাফাতা একটা লেখা লেখার চেষ্টা করা। তারপর যথারীতি ভুলে যাওয়া, আগামী একটা বিপযর্য়ের জন্য অপেক্ষা...।
*এই লেখাটার বক্তব্য বোঝার জন্য মিশন পসিবল লেখাটিতে চোখ বুলানো আবশ্যক।

Wednesday, November 21, 2007

সঞ্জীব চৌধুরী, একজন লেখক বানাবার মেশিন!

সঞ্জীব চৌধুরী।

সঞ্জীব চৌধুরীকে কেউ বলেন গায়ক, কেউ বলেন লেখক, কেউ বা বলেন পত্রিকার বিভাগীয় সম্পাদক—আমি বলি, লেখক বানাবার মেশিন!
এঁরা নিজেরা কতটা লেখালেখি করেন, লেখার মান কেমন এসব কুতর্কে আমি যাবো না। অল্প কথায় বলব, আমাদের দেশে এমন লেখক বানাবার মেশিনের বড়ো প্রয়োজন। আফসোস, এদেশে লেখক বানাবার মেশিনের বড্ডো আকাল!

আপনাদের অনেকের হয়তো মনে আছে, এ দেশে টানা ২২ দিন পরিবহন ধর্মঘট ছিল। সব ধরনের মুভমেন্ট বন্ধ! কল্পনা করুন, এক দুই দিন না, ২২ দিন! মধ্যে শুধু একদিন, ২৬ শে মার্চ ধর্মঘটের আওতার বাইরে ছিল। রপ্তানীযোগ্য চিংড়ি পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল, গার্মেন্টেসের মেশিনে এক ইঞ্চি সুতা খরচ হয়নি, একের-পর-এক রপ্তানীর অর্ডার বাতিল হলো। গোটা দেশ অচল! দেশের বুদ্ধিজীবী, লেখক কেউ টুঁ-শব্দও করছেন না, গণতন্ত্রের জন্য এর নাকি প্রয়োজন আছে। হায় গণতন্ত্র, হায়!

এ দেশের সেরা সন্তানরা হাঁ করে আকাশেরপানে তাকিয়ে ছিলেন, যেন বৃষ্টির মতো সমাধান ঝরে পড়বে! আর আমার মতো নপুংসকের তো করার কিছু ছিল না। তিন টাকা দামের কলমবাজ, এই-ই তো লোটাকম্বল!

`পরিবহন ধর্মঘট' নামে একটা লেখা লিখে 'ভোরের কাগজ'-এ পাঠিয়েছিলাম। তখন প্রথম আলোর জন্ম হয়নি। সম্পাদক মতিউর রহমান। ভোরের কাগজে কী-এক বিচিত্র কারণে এই লেখাটা ছাপা হয়েছিল তা জানি না। অনুমান করি, এর পেছনে নিশ্চিত সঞ্জীব চৌধুরীর হাত ছিল, নইলে মুক্তচিন্তার দৈনিক আমার মতো অগাবগার লেখা ছাপাবে কেন!
তখনও আমি মানুষটাকে চিনি না।

ক-দিন বাদে কোন এক কাজে ওই পত্রিকা অফিসে গিয়েছিলাম, সম্ভবত কারও খোঁজে! কোত্থেকে এসেছি শুনে আড্ডা ছেড়ে ঝাকড়া চুলের, টিংটিং টাইপের হাসিমুখের যে মানুষটা এগিয়ে এলেন, তিনিই সঞ্জীব চৌধুরী। সঞ্জীব দা।

তিনি এগিয়ে এসে হাসিমুখে বললেন, 'আচ্ছা, আপনিই কি ওই লেখাটা পাঠিয়েছিলেন? আরে, বসেন-বসেন। বেশ আড্ডা দেয়া যাবে'।
আমি মনে মনে বললাম, বাহ, বেশ তো, আমি দেখি বেশ আড্ডাবাজ টাইপের লোক! আমার মত একজন লোক যার সঙ্গে নিজের মানুষরাই অল্পক্ষণেই বিরক্ত হয়ে উঠে অথচ এই মানুষটা আমার সঙ্গে আড্ডা দেয়ার জন্য মুখিয়ে আছেন।
মানুষটা চা-সিগারেট আনালেন। আমি চুকচুক করে চা খাই, আয়েস করে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ি। অ্যাসট্রে নাই। সিগারেটের ছাই কোথায় ফেলব বললে তিনি হা-হা করে হেসে বললেন, গোটা ফ্লোরটাই অ্যাসট্রে। ফেলুন, যেখানে খুশি।

এরপর তিনি বললেন, 'এ ধরনের লেখা আরো লেখেন, আমি ছাপাবো'।
আমি বিনীতভাবে বলেছিলাম, 'আসলে আমি তো ঠিক এ ধরনের লেখা লিখি না, আমি অপন্যাস লেখার অপচেষ্টা করছি'।
তিনি টেবিলে আঙ্গুল ঠুকে বললেন, 'আপনি আপনার মতো করে যে প্রসঙ্গ নিয়ে ভালো লাগে তাই লেখেন, সমস্যা নাই'।
আমার এই স্বাধীনতাটা ভাল লাগল। পরে কখনই তিনি বিষয় নির্দিষ্ট করে দিতেন না এবং লেখা কাটাছেঁড়া করতেন না। কদাচিৎ কোন প্রসঙ্গ গুরুতর সমস্যা মনে হলে অমায়িক ভঙ্গিতে বলতেন: আচ্ছা এই জায়গাটায় কি এভাবে করা যায়? মানুষটার এইসব সহৃদয়তার কথা আমি ভুলব না।

পরেও যখন বিভিন্ন সময় গিয়েছি, কখনো শত ব্যস্ততায়ও আমি তাঁকে বিরক্ত হতে দেখিনি, সদা হাস্যময়। এই লেখা দেখছেন, এই গুনগুন করে গান গাইছেন, এই টেবিলে তবলা ঠুকছেন।
আমাকে যেটা আকৃষ্ট করত, তাঁর মধ্যে ভান জিনিসটার বড়ো অভাব; সহজিয়া একটা ভাব! অনেক সময় তুমুল আড্ডা ছেড়ে উঠে এসেছেন আমাকে সময় দেয়ার জন্য, অফিসের আঁতেল টাইপের অন্যদের কপালের ভাঁজ উপেক্ষা করে। আমি সলাজে বিব্রত হতাম।
আসলে ঢাকার নাগরিক মানুষদের আমার মত মফঃস্বলের মানুষদের প্রতি দারুণ অবজ্ঞা, সম্ভবত ভক করে আমার শরীর থেকে সরষে তেলের গন্ধ বের হত! এদের দোষ দেই না, এঁরা কী মননশীল মানুষ একেকজন, কপাকপ সাহিত্য চিবিয়ে খান! হাঁটেন পা ফাঁক করে। 

`একালের রুপকথা' নামে ওখানে প্রায় টানা দেড় বছর লিখলাম। উপভোগ্য একটা সময়—বিচিত্রসব বিষয় নিয়ে ফি হপ্তায় লেখা। কিন্তু একবার, সঞ্জীব চৌধুরী নামের মানুষটা লজ্জায় নুয়ে পড়েছিলেন।
হয়েছিল এমন, এই দেড় বছরে সব লেখাই ছাপা হলো কেবল একটা লেখা আটকে দেয়া হলো। 'শিশু কাঠগড়ায় দাড়াও' নামের একটি লেখা। লেখাটার মূল উপজীব্য ছিল, ১৪ দিন বয়সী এক শিশুকে নিয়ে! শিশুটির জানাজা পড়া নিয়ে সমস্যা হয়েছিল, তার বাবা নামাজ পড়েন না এই অজুহাতে।
ঘটনাটা আমার নিজের চোখে দেখা। এটা নিয়েই লেখাটা লিখেছিলাম। সব লেখা ছাপা হলো কেবল হলো না এটা!

সঞ্জীব চৌধুরী নামের মানুষটা অসম্ভব বিব্রত হয়ে বলেছিলেন, 'আপনার লেখাটা ধর্মীয় অনুভূতিকে আঘাত করে বলে লেখাটা ছাপানো যাচ্ছে না। সম্পাদকের আপত্তি আছে'।
আমি রাগ গোপন করে বলেছিলাম, 'এটা কি আপনিও বিশ্বাস করেন'?
তিনি কাতর হয়ে বললেন, 'না-না। আমি আপ্রাণ চেষ্টা করেছি মতি ভাইকে বোঝাতে, লাভ হয়নি। কিন্তু তাতে কী আসে যায়! আপনি সম্পাদকের সংগে দেখা করে একটু কথা বলেন'।

মতি ভাই নামের সম্পাদক মানুষটার সংগে দেখা করা বা কথা বলার আমার কোনো ইচ্ছাই ছিল না। আমি এ দেশের এমন কোন 'কলমচী-কলমবাজ' না যে পাঠকরা হাঁ করে বসে থাকেন আমার লেখা পড়ার জন্য। যেন এই সর্বনাশ থেকে বাঁচার জন্য সম্পাদকের সংগে দহরম-মহরম থাকাটা আবশ্যক! আমি সঞ্জীবদাকে কঠিন কিছু কথা বলার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলাম, তাহলে 'ইনকিলাব পত্রিকা' কী দোষ করল! কিন্তু সঞ্জীবদার বিমর্ষ মুখ দেখে কথাগুলো বলা হলো না। আমি মানুষটাকে বইয়ের খোলা পাতার মতো পড়তে পারছিলাম। চাকরির শেকলে বাঁধা একজন প্রবলপুরুষ!

এরিমধ্যে এই পত্রিকার ইন-হাউজে কি কি যেন ভজকট হল,  কেউ-কেউ কি-কি যেন কলকাঠিতে ঘুটা দিচ্ছিলেন। সঞ্জীব চৌধুরী আর ওই পাতার দায়িত্বে নাই। পরে এই পত্রিকা তাঁকে ছাড়তে হয়েছিল। সত্যটা হচ্ছে কিছু চালবাজ মানুষ চাল করে এই পত্রিকা থেকে তাঁকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। সেইসব চালবাজ মানুষরাই আজ বেশ্যার মত নগ্ন ভঙ্গিতে, নিজেদের বইয়ের বিজ্ঞাপন নিজেরাই দেন, প্রথম মুদ্রণ শ্যাষ দ্বিতীয় মুদ্রণ চলিতেছে এইসব নিজেই লিখে দেন। 

আমারও আর ওখানে লিখতে ইচ্ছা করল না, চালবাজদের সংগে তাল মেলাতে পারছিলাম না। এক চোট্টা-চালবাজ তো এই পত্রিকাতেই আমার একটা লেখার থিম অন্য নামে আমার অনুমতি ছাড়াই ছাপিয়ে দিলেন। আজ ওই চালবাজের নাম বললে অনেকে রে-রে করে তেড়ে আসবেন। ওই অন্ধকার দিক নিয়ে এখন আর বলতে ইচ্ছা করছে না।

তবে বারবার যেটা বলতে ইচ্ছা করছে, সঞ্জীব চৌধুরী, এদেশে আপনার মত লেখক বানাবার মেশিনের বড্ডো আকাল! কাজটা আপনি ঠিক করলেন না! দুম করে মরে গিয়ে এভাবে চলে যাওয়া কোন কাজের কাজ হলো না!

সহায়ক সূত্র:
১. পরিবহন ধর্মঘট: http://www.ali-mahmed.com/2010/09/blog-post_02.html 

Monday, August 6, 2007

খুন করা আর ১৪৯ টুকরা করা- যোজন তফাত

Rangs ভবন ভেংগে ফেলা হচ্ছে। এ নিয়ে আমার বলার কিছু নাই। অবৈধ হলে ভেংগে ফেলা হবে, এ নিয়ে দ্বিমতের কী আছে! কিন্তু বাংলাদেশে সব অবৈধ স্থাপনা ভেংগে ফেলার কোমরের জোর কী আছে? পাকিস্তানে অনেকগুলো অবৈধ মসজিদ ভেংগে ফেলা হয়েছে, তথাকথিত মুসলিম দেশে! বাংলাদেশে কী এমন উদাহরণ সৃষ্টি করা সম্ভব? গণতন্ত্র- বড্ডো গুরুপাক! যাই হোক, কুতর্কে যাই না।

তো, উচ্চ আদালতের নির্দেশ মেনে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, বেশ!
কিন্তু আদালতের রায় বের হতে দেরি হয়নি, কপিও প্রতিপক্ষকে হাতে পাওয়ার সময় দেয়া হয়নি, বৃহস্পতিবার (০৩.০৮.০৭) বিকেলে এই রায় হওয়ার পরই বিকেলেই রাজউক-এর পক্ষ থেকে মাইকিং করে ৮ ঘন্টার নোটিশ দিয়ে বলা হয়েছে, ১৬টি তলার খালি করে দেয়ার জন্য। অনুমান করি, এই হিংস্র প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য এরা আগেভাগেই সমস্ত প্রস্ততি নিয়ে রেখেছিলেন।
রাত ১২টার পরই বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয় সব ধরনের সুবিধা- গ্যাস, বিদ্যুত ইত্যাদি। বন্ধ হয়ে যায় লিফট। কেবলমাত্র ১টি সিড়ি দিয়ে সব কিছু নামাবার চেষ্টা করা হয়।
আমি খানিকক্ষণ চোখ বন্ধ করে ভাবার চেষ্টা করছি, কী অসহনীয়, অবণর্নীয় অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল।

পরেরদিন শুক্রবার, অফিসিয়াল ছুটি শুক্র, শনি- তবুও ৮ ঘন্টার নোটিশ না দিয়ে সোমবার থেকে ভাংগা হলে কি ইস্রাফিল শিংগায় ফু দিতেন!
ভবনের এই তলাগুলোতে ছিল ব্যাংক, মোবাইল অপারেটরদের স্থাপনা, সুইচরুম। যে সুইচগুলো তাক্ষণিকভাবে সরিয়ে নেয়ায়, সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে সাধারণ মানুষদের। যারা এই ভবনের অবৈধ কাযর্ক্রমের সংগে মোটেই সম্পৃক্ত নন। সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে হাজার হাজার নিরপরাধ সাধারণ মানুষকে। শুনতে পাই, এটা ভেংগে ফেলার জন্য নাকি ১ কোটি টাকা খরচ করা হবে। ইশ, আজ সমস্ত সরকারী কর্মকর্তরা সাধু হয়ে গেছেন।

আমি শিউরে উঠি, ঠান্ডা মাথায় কেমন করে এই বিপুল জিনিসপত্র সরিয়ে নেয়ার জন্য মাত্র ৮ ঘন্টা সময় দেয়া হয়েছে, একটা সভ্য দেশে এই অসভ্য কান্ড কেমন করে সম্ভব!
আমার কাছে বিষয়টা মনে হয়েছে এমন, আইনের প্রয়োজনে একটা মানুষকে প্রাণ নস্ট করার সিদ্ধান্ত দেয়া হয়েছিল কিন্তু খুব ঠান্ডা মাথায় রসিয়ে রসিয়ে একটা মানুষকে কুপিয়ে ১৪৯ টুকরা করা হয়েছে।
(সত্যি সত্যি একজন মানুষকে ১৪৯ টুকরা করার ঘটনা এই দেশেই ঘটেছে। যে মানুষটা এই কান্ডটা করেছিল সেই মানুষটা ধরা পড়েছিল কি না আমি জানি না। ওই মানুষটাকে নিয়ে আমাদের দেশের মনোবিদরা মাথা ঘামিয়েছিলেন কিনা এও জানি না, যে কোন পযার্য়ে গেলে একজন মানুষ এমনটা করতে পারে! ওই মানুষটার মধ্যে খুব বড় ধরণের সমস্যা আছে যার আদ্যপান্ত জানাটা আমাদের জন্য খুব জরুরী ছিল। আমি নিশ্চিত, এ নিয়ে কোন কাজ হয়নি, আমাদের এতো সময় কোথায়!)
তো, ওই ভয়ংকর মানুষটার সমস্যা কী আমাদের অনেকের মাঝেই ছড়িয়ে গেছে? ওই মানুষটাকে নিয়ে মাথা না ঘামাবার পাপ কি আমরা বহন করছি?
আমি আমার সবর্স্ব বাজি রাখতে আগ্রহী, পৃথিবীর চৌকস বাহিনীকেও যদি লাগিয়ে দেয়া হয় এই সময়ের মধ্যে এই ভবন খালি করার জন্য, এরা ব্যর্থ হবে।

আমি খানিকটা বুঝি, আমার ভাড়ার অফিস ভেংগে দেয়া হয়েছিল। পুরো ২৪ ঘন্টা সময় পেয়েছিলাম, তারপরও সব কিছু সরিয়ে আনতে পারিনি। হারিয়ে গিয়েছিল, আমার তিলতিল করে জমানো মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্র, জরুরী কাগজ। নতুন করে এই বিষয়ে বলে বিরক্তি বাড়াবার অপচেষ্টা করি না। ওই পোস্টের লিংক দিয়ে দিচ্ছি:কফিনের শক্ত পেরেকটা

তো, কে জানে, Rangs অফিসের ড্রয়ারে ছিল কারও প্রিয়মানুষ, মার চিঠি, যেটা হারিয়ে যাবে অবলীলায়। এই চিঠির কীই বা মূল্য!
কারণ, আমরা এটা শিখেছি, বস্তি ভেংগে। দুম করে বস্তি ভেংগে দিলাম, খুব উল্লসিত হলাম, ঢাকা ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করলাম ভেবে।
ভাল, যে গার্মেন্টস কর্মীরা এই দেশের চাকা ঘুরাচ্ছেন, এরা তো ১৫০০-১৮০০ টাকায় বেতনে গুলশানে থাকবেন, কি বলেন?
যে গার্মেন্টস কর্মী, বাবা-মা, শিশুটিকে রেখে কাজে গিয়েছিলেন, তাদের যে শিশুটি হারিয়ে গেল, ওই শিশুটিকে কি পাওয়া গিয়েছিল? আমরা জানি না, কেননা, এটা আমাদের জানার প্রয়োজন নাই। তো, মানবসন্তান হারিয়ে যায় আর একটা চিঠির কথা বলে লাভ আছে, বালখিল্য কথা!

ওয়েল, এতক্ষণ অন্ধকার জগত নিয়ে খুব হাতি-ঘোড়া মারা হল, এবার আলোকিত ভুবন নিয়ে খানিকটা আলোচনা করা যাক। এখানে কিন্ত অনেক আলোর খেলা- খেয়াল রাখবেন, চোখ যেন ঝলসে না যায়!
এই প্রসংগ নিয়ে সবাধির্ক প্রচারিত দৈনিক (এদের দাবীমতে) প্রথম আলো (০৫.০৮.০৭)সম্পাদকীয় লেখে। অনুমান করি, এই প্রধান সম্পাদকীয় সম্পাদক সাহেবই লিখেছেন। শিরোনাম হচ্ছে: `Rangs ভবন, চুড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি সংযোগ সড়ক।'
ভেতরে বিতং করে হাবিজাবি আরও অনেক কিছু লেখা কিন্তু এমন একটা অমানবিক বিষয় নিয়ে কোথাও আলোচনা নেই। এমন একটা অসভ্য কান্ড এই সভ্য দেশে ঘটে গেল, এটা আমাদের আলোকিত মহোদয়দের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়নি! কেন হয়নি, এ নিয়ে সম্ভবত তর্ক করার অবকাশ নেই। ইনারা সম্ভবত এইসব তুচ্ছ বিষয় নিয়ে মাথা ঘামাতে আগ্রহী নন।
জ্ঞানী মানুষরা হয়তো বা এমনই হন। খামাখা আমাদের মতো ঈর্ষাম্বিত মানুষরা বলি, এইসব জ্ঞানপাপীরা আছেন বলেই না আমরা এমন অসভ্য কান্ড আরও দেখার জন্য মানষিক ভাবে তৈরি হই। জয়তু, জ্ঞানপাপীরা, আমাদের মতো অগাবগাদের সালাম গ্রহন করুন এবং বেচে বর্তে থাকুন। আমীন- সুম্মা আমীন!

Friday, July 6, 2007

মুক্তিযুদ্ধ এবং গোলাম আযম

“৯ ফেব্রুয়ারী ১৯৭২ এক সরকারী ঘোষণায় অধুনালুপ্ত কতিপয় রাজনৈতিক দলের ১৫ জন নেতাকে ফেরার (পলাতক) ঘোষণা করে তাদেরকে ২২শে ফেব্রুয়ারীর মধ্যে স্ব স্ব এলাকার মহকুমা ম্যাজিষ্ট্রেটের নিকট হাজির হওয়ার নির্দেশ দেয় হয়। যাদের বিরুদ্ধে এই ঘোষণা দেয়া হলো তারা হলেন...
এর মধ্যে অধ্যাপক গোলাম আযম [১] ছিলেন ১২ নম্বরে।

ঘোষণায় বলা হয়েছে, এসব ব্যক্তিদের এবং সাবেক গভর্নর ডাঃ মালেকের মন্ত্রীসভার তিনজন সদস্যের নামে যে সব স্থাবর বিষয় সম্পত্তি আছে তা এবং তাদের বেনামী বিষয় সম্পত্তি ক্রোক করে নেয়া হয়েছে।”
(দৈনিক বাংলা/ ১০ফেব্রুয়ারী, ১৯৭২)

“সরকারী অপর এক নোটিফিকেশনে বলা হয়ঃ
বাংলাদেশ সরকার ৩৯ ব্যক্তিকে বাংলাদেশে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘোষণা করেছেন। এই ৩৯ ব্যক্তি বাংলাদেশে নাগরিকত্ব পাবে না। ১৯৭২ সালের বাংলাদেশ নাগরিকত্ব আদেশের (অস্থায়ী বিধান) তিন নম্বর ধারাবলে এই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

নোটিফিকেশনে এর কারণ হিসাবে বলা হয়েছেঃ
এসব ব্যক্তি বাংলাদেশ মুক্তির আগে থেকে বিদেশে অবস্থান করছিলেন। এদের আচরণ বাংলাদেশের নাগরিকত্ব লাভের উপযুক্ত বলে বিবেচিত হতে পারে না এবং এরা পাকিস্তানেই অবস্থান করছেন।
বাংলাদেশে নাগরিকত্ব লাভের অযোগ্য ব্যক্তিরা হলেনঃ সর্বজনাব...। এদের মধ্যে গোলাম আযম হলেন ৮ নম্বর।”
(দৈনিক বাংলা/ ২২ এপ্রিল, ১৯৭৩)

“সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হলেও সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল ১৮ ধরনের অপরাধী ক্ষমা পাবেন না।
(১) ১২১. বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানো অথবা চালানোর চেষ্টা।
(২) ১২১ ক. বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানোর ষড়যন্ত্র।
(৩) ১২৪ ক. রাষ্ট্রদ্রোহিতা।
(৪) ৩০২. হত্যা ।
(৫) ৩০৪. হত্যার চেষ্টা।
(৬) ৩৬৩. অপরহণ
(৭) ৩৬৪. হত্যার উদ্দেশ্যে অপহরণ।
(৮) ৩৬৫. আটক রাখার উদ্দেশ্যে অপহরণ ।
(৯) ৩৬৮. অপহৃত ব্যক্তিকে আটক বা গুম রাখা ।
(১০) ৩৭৬. ধর্ষণ।
(১১) ৩৯২. দস্যুবৃত্তি ।
(১২) ৩৯৪. দস্যুবৃত্তিকালে আঘাত ।
(১৩) ৩৯৫. ডাকাতি ।
(১৪) ৩৯৬. খুন সহ ডাকাতি ।
(১৫) ৩৯৭. হত্যা অথবা মারাত্মক আঘাতসহ দস্যুবৃত্তি অথবা ডাকাতি ।
(১৬) ৪৩৫. আগুন বা বিস্ফোরক দ্রব্যের সাহায্যে ক্ষতিসাধন ।
(১৭) ৪৩৬. বাড়ীঘর ধ্বংসের উদ্দেশ্যে আগুন অথবা বিস্ফোরক দ্রব্যর ব্যবহার ।
(১৮) ফৌজদারী দন্ডবিধির ৪৩৬ আগুন অথবা বিস্ফোরক দ্রব্যের সাহায্যে কোন জলযানের ক্ষতিসাধন অথবা এসব কাজে উৎসাহদান।
*১৮ নম্বরের অনেকগুলো উপধারা আছে।

...এবং অভিযুক্ত শান্তি বাহিনীর নেতারা ক্ষমা পাবেন না।”
(দৈনিক বাংলা/ ১৭ মে, ১৯৭৩)

গোলাম আযম তার মায়ের অসুস্থতার অজুহাতে সাময়িকভাবে (৩ মাসের ভিসায়) বাংলাদেশে আসেন এবং আর ফিরে না গিয়ে অবৈধভাবে রাজনৈতিক তত্পরতায় লিপ্ত হন।

গোলাম আযমের নাগরিকত্ব প্রার্থনা:
১৯৭৬ সালে জিয়া সরকার কর্তৃক অনাকাঙ্খিত ব্যক্তিদের নাগরিকত্ব পুনর্বহাল করা সম্পর্কে বিবেচনার আশ্বাস পেয়ে সকলেই দরখাস্ত করেন। অনেকেই বিশেষ বিবেচনায় নাগরিকত্ব ফিরে পান কিন্ত গোলাম আযমের বিষয়টি ঝুলে থাকে।

১৯৮৮ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত উপ-প্রধানমন্ত্রী অধ্যাপক এম এ মতিন আজ জাতীয় সংসদে নিম্নোক্ত বিবৃতি প্রদান করেনঃ
"ধন্যবাদ মানননীয় স্পীকার,
...জনাব, গোলাম আযম ১৯৭১ সালের ২১শে নভেম্বর পাকিস্তানে গমন করেন।
...বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে তত্কালীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের ১৮-৪-৭৩ তারিখে (নং ৪০০/বহিঃ ৩) জারীকৃত একটি প্রজ্ঞাপন বলে তার বাংলাদেশে নাগরিকত্ব বাতিল ঘোষণা কর হয় এবং তাকে বাংলাদেশের নাগরিকত্বের অযোগ্য বলে চিহ্নিত করা হয়।
ইংরাজী ১৯৭৬ সনে তিনি লন্ডন থেকে তার নাগরিকত্ব ফিরে পাওয়ার জন্য স্বারাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিকট আবেদন করেন। উক্ত আবেদন নাকচ করা হয় এবং এ ব্যাপারে তাকে জানিয়েও দেয়া হয়।
১৯৭৮ সনের ১১ জুলাই জনাব গোলাম আযম পাকিস্তানী পাসপোর্টে বাংলাদেশের (৩ মাসের) ভিসা নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন এবং তখন থেকেই তিনি এ দেশে অবস্থান করছেন।
...মাননীয় স্পীকার, আমি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে এই পর্যায়ে এই মহান সংসদকে জানাতে চাই বর্তমানেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে তাকে নাগরিকত্ব ফেরত দেয়ার কোন ইচ্ছা বা সিদ্ধান্ত কিছুই নাই।”
(জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অধ্যাপক এম এ মতিনের বিবৃতি) 


এত প্রমাণ থাকার পরও একজন মানুষ নাগরিকত্ব পায় কেমন করে? কাউকে নাগরিকত্ব দিলে তিনি নাগরিক সুযোগ-সুবিধা পাবেন এ আর বিচিত্র কী! প্রফেসর ইউনুস এবং গোলাম আযমের মধ্যে মুলত কোন তফাত নাই, দু-জনই এদেশের নাগরিক! দেশের প্রচলিত সমস্ত সুযোগ-সুবিধা এঁদের দিতে রাষ্ট্র বাধ্য। আসলে মুক্তিযুদ্ধের আবেগ হয়ে গেছে এখন একটি বিক্রয়যোগ্য পণ্য [২]

**এই স্কেচ নামের জিনিসটা অন্য কিছু না, মনের অজান্তে কাগজে আঁকাজোঁকাকে সম্ভবত ‘ডুডল’ বলে- এটাকে সম্ভবত ডুডল বলা চলে। একদা কাঠ-পেন্সিলে ঘসাঘসির ফল।


সহায়ক সূত্র:
১. গোলাম আযম: http://www.ali-mahmed.com/2007/06/blog-post_29.html
২. বিক্রয়যোগ্য পণ্য: http://www.ali-mahmed.com/2009/10/blog-post_07.html
* মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অন্যান্য লেখা: http://tinyurl.com/37wksnh


শুধু একবার আমার মাথায় হাত রেখে দিলে

মাহবুব ভাই। 

হয়তো অন্যদের চোখে আপনি খুব সাধারণ (!) একজন মানুষ।
কিন্তু, আমার কাছে...! এমনিতে আমার যে বছরে জন্ম সে বছরে আপনি এয়ারফোর্সে জয়েন করেন। আপনার সময়কার কৃতি একজন ফুটবলার, আজাদ স্পোর্টিংয়ে জাতীয় দলে খেলে আপনি মাঠ কাঁপিয়েছেন। 
আমার জীবনে যতো সব সু বা ভাল প্রত্যেকটার সঙ্গে আপনার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোন-না-কোনও একটা সংযোগ আছেই! আমি বারবার গর্তে পড়েছি, আপনি আমাকে টেনে তুলেছেন। আমার প্রতি অপার্থিব মমতা দেখাতে গিয়ে আপনি অন্যায় করেছেন আপনার পরিবারের প্রতি, নিজের প্রতি। 

আমার মরে যেতে ইচ্ছা করে, যখন ভাবি আপনি এই বয়সেও প্রবাসে পড়ে থাকতে হয়! কয়েকটা নোংরা কাগজের জন্য আপনাকে দেশে আনতে পারি না। অথচ দেখেন, আমি যখন ধোঁয়া ওঠা গরম-গরম ভাত খাই, নিজের বিছানায় গড়াগড়ি খাই, প্রিয় মানুষদের সঙ্গে ঝগড়া করি—তখন, আপনি প্রবাসে একাকী, নিঃসঙ্গ।
আমার বুঝি ইচ্ছে করে না, আপনাকে ঈদে এক চামচ সেমাই খাওয়াই...। 

প্রায়শ ভাবি, আপনার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা আসলে কি, কেমন? পিতা- পুত্রের, বড়ো ভাইয়ের, বন্ধুত্বের? আমি কনফিউজড, বিভ্রান্ত! এমনিতে আপনার সামনে ধুমসে সিগারেট খাই, যা তা রসিকতা করি—এডাল্ট জোকস কোন ছার!

এই আমি যে টুকটাক লেখালেখি করেছি এর পেছনেও আপনার অবদানই প্রবল। ভুলে গেছেন বুঝি, কানের পাশে সেই যে অনবরত ঘেনঘেন করতেন, 'কিছু একটা লেখেন'—'কিছু একটা লেখেন'।  আপনার যন্ত্রণায় এক সময় লিখতে শুরু করলাম। অথচ, আপনি কখনও আমার লেখার এক লাইনও পড়ে দেখেছেন বলে আমার ঘোর সন্দেহ আছে! অনেক লেখা আপনাকে আমি উৎসর্গও করেছি! এসবে কি আসলেই আপনার কিছু যায় আসে?

কিন্তু... কী একটা জীবনে আপনি আমাকে আটকে দিলেন! কী ক্ষতিটাই না করে দিলেন—আমার জীবনটা এলোমেলো হয়ে গেল! আমার প্রিয় মানুষ হাসপাতালে অথচ আমি আমার লেখার বানান সংশোধন করছি! আহা, উপায় ছিল না যে তখন। বইমেলায় বই বেরুবে, প্রকাশকের তাড়া—দ্য শো মাস্ট গো অন!

ছি, এটা একটা জীবন হলো! অথচ এই সুতীব্র বেদনার কথাগুলো আমার সেই সময়কার লেখাগুলো যিনি পড়বেন, তাঁরা কখনোই জানবেন না, আসলে তাঁর জানার প্রয়োজনও নেই!
মজার ব্যাপার হচ্ছে, ওই লেখাগুলো ছিল 'ফানি টাইপ' লেখা। পরে অনেকেই বলেছেন, আপনি যে একটা ভাঁড়, এতে অন্তত আমাদের আর কোন সন্দেহ নাই।
হাসপাতালে ভর্তি ওই প্রিয় মানুষটার সঙ্গে চোখ মেলাবার ক্ষমতা আমার কই? অথচ তিনি রাগারাগি করলে ভাল হতো। বড়ো-বড়ো চোখের নির্বাক সেই ভঙ্গি আমি ষ্পষ্ট পড়তে পারছিলাম, আমার প্রাণের চেয়ে তোমার লেখালেখি বড়ো হলো কোন যুক্তিতে...!

ইশ্বর, ওই সময় নিরুপায় আমি, যখন বানানগুলো সংশোধন করছিলাম, আমার চোখের জলে অক্ষরগুলো ঝাপসা হয়ে আসছিল। এটা বললেও আজ আর কেউ বিশ্বাস করতে চাইবে না...।

যাই হোক, সেই যে আপনি আমার ঘাড়ে লেখালেখির সিন্দবাদের ভূতটাকে আয়েশ করে বসিয়ে আলগোছে সরে পড়েছিলেন, এই সিন্দবাদের ভূতটাকে আমি তীব্র অনীহায়, অনিচ্ছায় দিনের-পর-দিন বয়ে বেড়াচ্ছি। কতোবার চেষ্টা করেছি লেখালেখির এই ভূতটাকে ঝেড়ে ফেলতে। মাহবুব ভাই, আপনি আমার বড় ক্ষতি করে দিলেন, জীবনটাকে এলোমেলো করে দিলেন।
তবুও আমাকে যদি অপশন দেয়া হয়, আমি কি এই গ্রহের সবচে পবিত্র স্থান স্পর্শ করতে চাইবো, নাকি আপনাকে...?

মাহবুব ভাই, দ্বিতীয়বার চিন্তা না-করে আমি আপনাকে স্পর্শ করার সুযোগ বেছে নেব, বারবার।
এ কেবল আমার বিশ্বাস না, আমি জানি, আপনি শুধু একবার আমার মাথায় হাত রেখে দিলে, আমি পরম নিশ্চিন্তে মরতে পারবো, আই বেট...।

* এটা মৃত্যুর (**) কিছু দিন পূর্বের ছবি:
**মৃত্যু'র আড়ালে কেউ-কেউ খোলস বদলান মাত্র...!

Thursday, July 5, 2007

কেন অন্য রকম?

আজকের এই দিনটা কি খানিকটা অন্য রকম···? আজকের এই দিনটা কি খানিকটা অন্য রকম···?
একই শব্দ বারবার আউড়ে যাওয়া তো ভাল কাজ নয়- পাগলের কাজকারবার। আচ্ছা, এটা কি মনোবিদদের আগ্রহের বিষয়? কে জানে, হবে হয়তো বা!
আচ্ছা, ওই মানুষটা কি প্রভাব ফেলেছে কোনো ভাবে? যে মানুষটা বারবার আউড়ে যাচ্ছিল, ‘গন্দম খায়া জোলাপ নাইমা গেছে’। সামান্য একজন হকার টাইপের মানুষের মুখে, আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ অথচ তখন মনে হচ্ছিল, উঁচুমার্গের কথা। কোনভাবে কি এটা মস্তিষ্কে প্রবল ছাপ ফেলেছে?


আজকের এই দিনটা কি খানিকটা অন্য রকম···?
কই, যথারীতি সূর্যের উদয় হয়েছে, অস্তও গেছে- এমন দিনে তো বিশেষ কোন বিশেষত্ব নাই!

আজকের এই দিনটা কি খানিকটা অন্য রকম···?

মনে হয় না এমন, ঝাঁ ঝাঁ রোদ্দুরে হনহনিয়ে হেঁটে গেলে বেশ হতো? কই, রোদ্দুরে হাঁটা তো আমোদময় কিছু নয়!

আজকের এই দিনটা কি খানিকটা অন্য রকম···?

হয় কী ভ্রম, গাছের পাতাগুলো কী চকচকে, না? কই, শীতে তো পাতা নিষ্প্রভ, ধুসর; হায়, গেল-গেল পাতাটা যে ঝরে!

আজকের এই দিনটা কি খানিকটা অন্য রকম···?

যে আজ কোথাও যাওয়া যাবে না? আহা, যেতে তো হবে কোথাও না কোথাও- নইলে শেকড় বেরিয়ে যাবে যে!

আজকের এই দিনটা কি খানিকটা অন্য রকম···?

জীবনের কাছ থেকে আজ কোথাও পালানো যাবে না? হায়, দুর্বল একজন মানুষের না-পালিয়ে তো বাঁচার উপায় নেই!

আজকের এই দিনটা কি খানিকটা অন্য রকম···?

শীতার্তের জন্য সুর্য কি নেমে আসবে আধ হাত? পাগল, সুর্য বেচারার কী দায় পড়েছে! আরশের নীচ থেকে উকি না-মারলে নিভে যাবে যে!

আজকের এই দিনটা কি খানিকটা অন্য রকম···?

চরম শত্রুকেও ভালবাসতে ইচ্ছা করবে? ধ্যাত, তাই কি হয় কখনো- একটাই মাত্র জীবন যে! জীবনটাকে বটি দিয়ে চাক চাক করবে কে!

আজকের এই দিনটা কি খানিকটা অন্য রকম···?

হয়তো, হয়তো না···

(৩১·০১·০৭/ ১২.০১/ এলোমেলো ভাবনা।)

সত্যের মত পাজি আর নাই

আমার স্পষ্ট মনে আছে, তখন হুমায়ূন আহমেদের তুমুল জনপ্রিয় এইসব দিনরাত্রি দেখাচ্ছিল। হুমায়ূন আহমেদ এক সাক্ষাৎকারে বললেন, আমার একটা কালার টিভি দরকার- এই টাকা হয়ে গেলেই...।
মোদ্দা কথা, ধারাবাহিকটা লিখছেন কালার টিভির প্রয়োজনে। এটা পড়ে নিমিষেই আমার বুকটা ফাঁকা হয়ে গেল। কেবল মনে হচ্ছিল, মানুষটা কী মানুষ, না পিশাচ!
আজ বুঝি লেখকদের কেবল কপকপ করে জ্যোৎস্না খেয়েই দিন যায় না। এবং লেখকদের কোন অধিকার নাই তার প্রিয় মানুষদের সামান্য সাধ-আহ্লাদগুলোর জলাঞ্জলি দেয়ার।

আজ তাই আমার জানতে বাকি নাই লেখকের তুচ্ছ চাওয়া-পাওয়ার কথাটা চলে এলে একজন পাঠক কেমনটা বোধ করেন। লেখকের ধপধপে ইমেজে ছোপ ছোপ দাগ পড়ে যায়। মনে হয় মানুষটা কী লালচি-লোভী!
কি বলেন বাহে, হয় না, হয়?

আমাদের দেশে লেখকদের তার পাওনা-প্রাপ্যটুকু দেয়ার মনোভাব এখনও গড়ে উঠেনি। এমনকি ন্যূনতম সম্মানও। কোন পত্রিকায় লিখলে পত্রিকাওয়ালাদের ভাবখানা এমন, বাহে, এখানে যে লিখতে দিচ্ছি এই তো ঢের।
এটা আমরা মনে রাখার চেষ্টা করি না, কখনও পত্রিকার কারণে একজন লেখক দাঁড়িয়ে যান, তেমনি একটি পত্রিকাও লেখককে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে যায়।

সালটা ৯২/ ৯৩। আমি তখন লিখছিলাম, এক্ষণ বাংলাদেশের সর্বাধিক প্রচারিত (এদের দাবীমতে) একটি দৈনিকে। ‘একালের রূপকথা’ নামে লিখেছিলাম প্রায় দেড় বছর। ফি হপ্তা, প্রতি সপ্তাতে ১টা করে লেখা। প্রত্যেক লেখার জন্য পেতাম ৫০ টাকা করে। মাসে কত হতো, ২০০?
মজার ব্যাপার হচ্ছে টাকাটা আমাকে পাঠিয়ে দিলেই হয়। উহুঁ, সশরীরে নেয়ে আসতে হবে। হায়রে সশরীর! বডিটাকে ঢাকা পর্যন্ত নেয়াটা কী কম ঝক্কির, কম খরুচে ব্যাপার! তো, দুই তিন মাসের টাকা জমিয়ে গেলাম।
আবার সুকঠিন নিয়ম ছিল, মাসের ২১ তারিখ থেকে ২৪ তারিখে যেতে হবে। ২০ তারিখে গেলেও হবে না, আবার ২৫ আরিখ গেলেও হবে না। তো, গেলাম নির্দিষ্ট তারিখেই। হায়, তখন যদি বলা হয় ফান্ড নাই, কেমন লাগে? কি জানি কার কার কাছে ভাল লাগে—আমার নিজেকে ভিক্ষুক-ভিক্ষুক মনে হত!

আমার একবার মেজাজ খুব খারাপ হলো, রাগে গা জ্বলে যাচ্ছিল। আহা, ফকিরের আবার রাগ!
ওই পত্রিকার জন্যই, এই পত্রিকাকে নয়েই আবার একটা লেখা লিখলাম, ‘সহনশীল প্রাণী’ নামে। পত্রিকাওয়ালারা খুব রাগ করলেন। বিভাগীয় সম্পাদক বললেন, এইটা কি লিখেছেন? সম্পাদক সাহেব খুব রাগ করেছেন।
বিভাগীয় সম্পাদক নামের মানুষটাকে আমি পছন্দ করতাম, কথা হত খোলাখুলি। আমি বললাম, যা লিখেছি তা কি অসত্য?
বিভাগীয় সম্পাদক মিনমিন করে বললেন, তা না, কিন্তু ভাইরে সব সত্য কি আমরা বলতে পারি! আর আপনি এইসব লিখলে আপনার লেখা কি আর ছাপা হবে? ক্ষতিটা কার হবে, আপনার হবে না? তাছাড়া আপনার সমস্যাটা কি, আপনি কী টাকার জন্য চাল কিনতে পারছেন না?

আমি মনে মনে বললাম, আমার ক্ষতি হবে, কচু- আমার মতো অগাবগা না লেখলে ঘেঁচু হবে! মুখে বললাম, চাল কেনার কথা আসছে কোত্থেকে- এটা তো আলোচ্য বিষয় না! আমার প্রাপ্যটা দেয়া হবে না কেন? আচ্ছা, আপনি কি এটা বলবেন আমায়, একজন ফটো সাংবাদিক জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছবি উঠান অথচ আপনারা তাঁর নামটা পর্যন্ত দেন না; পত্রিকার নাম দেন কেন, এর কোন উত্তর আপনাদের কাছে নাই। আছে?

সুখের বিষয়, দীর্ঘ ১ মাস পর লেখাটা ছাপা হয়েছিল। ওই সময়কার তীব্র আনন্দ আমার স্মৃতিতে এখনও স্পষ্ট। কেবল মনে হচ্ছিল মফঃস্বলের অখ্যাত একজন অলেখকের বিশাল এক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিজয়।
একালের প্রলাপ থেকে ‘সহনশীল প্রাণী’ লেখাটি এখানে যোগ করছি।

"সহনশীল প্রাণী...
ভূত অপ্রার্থিব গলায় বলল, ‘এই আবর্জনা লেখক, তোকে মৃত্যুদণ্ড দিলাম। ফাঁসি-টাসি না, জাস্ট একটানে মুণ্ডুটা ছিঁড়ে ফেলব।’
একজন লেখক অখ্যাত কুখ্যাত পরের কথা, কী সীমাহীন তার ক্ষমতা। ইচ্ছে হলেই একটা চরিত্র সৃষ্টি করে হাসান, কাঁদান, বিষন্ন বোধ করলে মেরে ফেলেন। কাল্পনিক সৃষ্টির মিছে স্রষ্টার এ সম্বোধন ভালো না লাগারই কথা।

লেখক রাগ চেপে বলল, ‘ভাই ভূত, আপনি সভ্য না অসভ্য দেশের ভূত?’
ভূত দাঁতে দাঁত ঘষে বলল, ‘পেটা গাইল্যা ফালামু (এটার অর্থ হবে সম্ভবত এরকম, অমানুষিক শক্তি প্রয়োগে নাড়ী ভুঁড়ি ভর্তা করে ফেলা হবে)। রাস্কেল, ইউ নো, আমার গায়ে নীল রক্ত বইছে।’

লেখক: আ বেগ য়্যু’ পার্ডন স্যার। নীল রক্ত আপনি দেখি অতি সভ্য ভূত! তা আপনি স্যার একটু ভুল বললেন এখন আপনার ধমনীতে নীল রক্ত দূরের কথা, লাল-সবুজ-সাদা কোনো রক্তই এক ফোঁটা বইছে না।
ভূত (জাঁক করে): ইয়েস, সভ্য দেশের অতি সভ্য ভূত আমি।
লেখক: সভ্য দেশে মৃত্যুদণ্ড উঠিয়ে দেয়া হয়েছে অথচ আপনি দিচ্ছেন, এটা কি ঠিক হচ্ছে? তুই-তোকারি করছেন এটাই বা কেমন!
অতি সভ্য ভূত: তুই-তাই না করলে ভূতদের বাজার পড়ে যায়। তাছাড়া মানুষ নামধারী অমানুষদের বিচার করে মেরে ফেলতে হবে না, আশ্চর্য! পৃথিবীটাকে চমৎকার বানাতে গিয়ে মানুষকে নিষ্ঠুর হতে হয় যে।

লেখক: স্যার, আপনি বোঝাতে চাচ্ছেন মৃত্যুদণ্ড দিয়ে ত্রাস সৃষ্টি করা। সৌদির মতো কিছু বর্বর দেশ অবশ্য এ বিষয়ে বহু এগিয়ে আছে। এরা স্টেডিয়ামের মতো বিশাল জায়গায় উন্মুক্ত শিরচ্ছেদের ব্যবস্থা করে। রেডিও টেলির্ভিশনে আগাম ঘোষণা দিয়ে টেলির্ভিশনে ঘটা করে দেখানো হয়। অবশ্য এরা দয়ার সাগর ঘোষণা করে দেয়, শিশু এবং অসুস্থ লোকজনকে যেন এ অনুষ্ঠান দেখতে না দেয়া হয়। দলে দলে লোকজন শিরচ্ছেদ দেখে। অপার আনন্দ লাভ করে।
অ. স. ভূত: ভালোই তো, অপরাধীদের জন্যে উদাহরণ সৃষ্টি হবে।

লেখক: ‘অপরাধীর পায়ের চেয়ে আইনের হাত লম্বা’ এটা অন্যভাবেও বোঝানো যায়। ভারতে অসংখ্য প্রাণ হরণকারী একজন ডাকাতকে ধরার জন্যে এক হাজার সামরিক, আধা-সামরিক কর্মচারী নিয়োগ করা হয়েছে। একে ধরতে গিয়ে এ পর্যন্ত পঁচিশ কোটি রুপী খরচ হয়েছে। ডাকাতের মাথার দাম ধরা হয়েছে চল্লিশ লাখ রুপী। একে আটকে মেরে ফেললে কি হবে? মৃত্যুর পর সবাই আনন্দ-বেদনার ঊর্ধ্বে? হেনরী শ্যারিয়ারের ‘প্যাপিলন’-এর প্যাপীকে ‘আইলস ডু স্যালুট’-এর নির্জন সেলে যে রকম আটকে রাখা হয়েছিল ওরকম অন্ধকূপে চরম অপরাধীদের আজীবন আটকে রাখা উচিত। মাঝে মধ্যে এদের সাক্ষাৎকার নিয়ে ফলাও করে জানানো যেতে পারে। প্যাপীলনের মতো এদেরও সময় থেমে যাবে মনে হবে এ কষ্ট পৃথিবীর কষ্ট না ।

অ. স. ভূত: দরিদ্র দেশগুলোর টাকা কই, ফটাফট মেরে ফেললেই তো সুবিধা?
লেখক: যে মানুষ তার মতো কাউকে সৃষ্টি করতে পারে না সে কোন অধিকারে একটা প্রাণ নষ্ট করবে। এসব থাক, এখন বলেন, আমাকে কেন মৃত্যুদণ্ড দিলেন।

অ. স. ভূত: তুই না কি আমাদের নিয়ে যা-তা লিখিস, লোকজন হাসি-ঠাট্টা করে। জন নামের একজন ভূতকে বলেছিস ‘রাম ছাগল ভূত’। এসব কি, অন্তত ‘জন ছাগল ভূত’ বললেও তো হতো। এসব ছাই ভস্ম লিখে মাল কামিয়ে লাল হচ্ছিস।
লেখক (বেদনাহত হয়ে): স্যার-স্যার, এমন কুৎসিত ভঙ্গিতে বলবেন না। লাল-নীল জানি না এরকম একটা লেখা লিখে পাই পঞ্চাশ টাকা।
অ. স. ভূত: পঞ্চাশ টাকা দিয়ে কি করিস?
লেখক: এটা তো সম্মানী এ দিয়ে আবার কি করবো, বাঁধিয়ে রাখি। এটা সম্মানী তো তাই বিশেষ দিনে গিয়ে নিয়ে আসতে হয়। লেখককে সৌজন্য কপি দেয়ার নিয়ম নাই বিধায় ‘অসৌজন্য কপি’ কিনে নিজের লেখা নিজেই পড়ি।
এরা অন্য ভুবন থেকে এসে আলো দেখান- এতো আলো দেখিয়ে ফেলেন, আলোর ছটায় নিরূপায় হয়ে জানালা বন্ধ রাখতে হয়। প্রিয় মানুষদের ন্যূনতম সাধ-আহ্লাদের জলাঞ্জলি দিয়ে, ভরপেট খাবার খেতে, চকচকে পোশাক পরতে এদের কখনোই ইচ্ছা করে না- নিয়ম নেই। লেখক থাকবেন অপরিচ্ছন্ন, চুলে পাখি না হোক অন্তত তেলাপোকা ডিম দেবে, মদ্যপান করে ল্যাম্পপোস্ট রাস্তার মাঝখানে কেন এ নিয়ে তুমুল ঝগড়া করবেন, বড় বড় নোখ দিয়ে বেশ্যাকে খামচাবেন। এরা কপাকপ জ্যোৎস্না খান, সরষে তেলের মতো গায়ে জ্যোৎস্না মাখেন, জ্যোৎস্না রাত না হলে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে চান না।

তবে হ্যাঁ, পাঠকের ভালোবাসার কথা যদি বলেন, তখন পৃথিবীর সব বেদনা তুচ্ছ মনে হয়। তখন মনে হয় জীবনটা এত ছোট কেন!"

Monday, July 2, 2007

লেজার গান দিয়ে পাখি শিকার!

যমুনা গুপের চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম বাবুলের মাতা আলহাজ জমিলা খাতুনের ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি···রাজেউন)। যুগান্তর, ০৩·০৫·০৬
প্রত্যেকটা মৃত্যুই কষ্টের, আমরা বাবুল সাহেবের মা’র রূহের মাগফেরাত কামনা করি।

এই খবরটা বাবুল সাহেব তার নিজ পত্রিকা যুগান্তরে বিশাল করে প্রথম পৃষ্ঠায় দুই কলামে ছবিসহ ছাপান। শোভন হতো যদি এ খবরটা অন্য পত্রিকা এভাবে ফলাও করে ছাপাত। এটা করে তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করলেন। কারণ পত্রিকাটি ছাপিয়ে তিনি নিজে, একা একা বাসায় বসে দু-পা উপরে তুলে পড়লে সমস্যা ছিল না। কিন্ত পড়েন পাঠক। পাঠকের বাবুল সাহেবের মা’র মৃত্যুর চেয়ে অন্য জরুরী খবরের প্রয়োজন বেশী।

এটিএন বাংলা নামের ইলেকট্রনিক মিডিয়ার চেয়ারম্যান সাহেবের বউ নাকি বিরাট মহিলা গাতক (রিমেম্বার, ঘাতক না)। তো এই মহিলা গাতকের গান ননস্টপ এটিএন পর্দায় দেখাচ্ছেই! এর শেষ নেই, তাও আবার কয়টা জানি দেশের অসংখ্য লোকেশনে চিত্রায়িত! 'মন মানে না' গানটা হয়ে গেছে, শরম মানে না!

হুমায়ূন আহমেদ শাওনকে বিয়ে করার কারণ হিসাবে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, 'শাওনের গান শুনে আমি মুগ্ধ'।
অতি উত্তম, গান ভাল জিনিস। মন উৎফুল্ল রাখে। মুশকিল হচ্ছে, গানকে বিবাহ করার সিস্টেম এখনও চালু হয়নি!

তা এটিএন বাংলার চেয়ারম্যান সাহেব এবং হুমায়ূন সাহেব আপনার এতো যন্ত্রণা না করে গান রেকর্ড করার যন্ত্র দিয়ে আপনাদের বিবি সাহেবাদের গান রেকর্ড করে রাত দিন শোনেন না, এ নিয়ে তো কারো কোন দ্বিমত নাই। আপনারাও বেঁচে যেতেন আমরাও বেঁচে যেতাম!

ড· মুহম্মদ জাফর ইকবাল একটি অনুষ্ঠানে বিচারক হতে অসম্মত হন কারণ তাঁর সন্তানরা সেই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহন করেছিল। বড় মাপের মানুষদের কাছে আমরা তো এমনটাই আশা করব! কিন্তু বাবুল, হুমায়ূন সাহেবা বুঝতে চান না, এসব কান্ড অভব্যতার পর্যায়ে পড়ে। লেজার গান দিয়ে পাখি শিকার!

কনক পুরুষ: ১


(আমার ইচ্ছা ছিল চালবাজি করার জন্য। অনেক পুরনো উপন্যাস ছিল এটা। আমার ধারণা ছিল, এটা ধারাবাহিকভাবে পোস্ট করব। আফসোস, ধরা খেয়ে গেলাম। হা ঈশ্বর, এমন মানুষও আছেন। ‘কনক পুরুষ’ উপন্যাসটার কথা এখনও মনে রেখেছেন!
যাই হোক, এই পোস্টটা আমি উৎসর্গ করছি মোসতাকিম রাহী এবং তাঁর মেজদা মোরসালিনকে। কেন?
লেখকরা গল্প বলেন, এই তাঁদের কাজ। আমার মতো অগাবগা লেখকও লেখকদের অনুকরণ করে চেষ্টা করেন গল্প বলতে।
কিন্তু মোসতাকিম রাহী এবং তাঁর মেজদা মোরসালিন গল্প সৃষ্টি করেন, উপাদান যোগান। আমার মতো মানুষকে বিভ্রান্ত, হতবাক করে দেন তাঁদের ভালবাসায়-মমতায়...)।

 ...
"জয় যথাসম্ভব নিঃশব্দে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে, সশব্দে নিঃশ্বাস ফেলে বলল, উফ-ফ, কি ধকলটাই না গেল আজ!
ঘুরে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে গেল। মেয়েটা বড় বড় চোখ মেলে তাকিয়ে আছে সেই চোখে আছে রাজ্যের ভয়। এর মানে কী! আজ ওর বাসর রাত। বিয়েটা হঠাৎ করেই হয়ে গেল। এর আগে মা বেশ কয়েকটা মেয়ে দেখে কোন না কোন খুঁত খুঁজে বের করেছেন।

এ বিয়েতেও মা গররাজি ছিলেন। জয়ের এককথা, এ বিয়ে না হলে আর বিয়ে করব না। কাঁহাতক আর সহ্য করা যায়! তাছাড়া এ মেয়েকে দেখতে গিয়ে সব কেমন ওলটপালট হয়ে গেল, চোখের দৃষ্টিতে এমন কিছু একটা ছিল ওর সব কেমন জট পাকিয়ে গেল।
ফুলের তীব্র গন্ধে ওর কেমন দমবন্ধ ভাব হচ্ছে। ফ্যানের রেগুলেটর এক থেকে পাঁচে নিয়ে এল। চরম বিরক্তি নিয়ে গা থেকে আচকানটা খুলল। এসব পরার কোন মানে হয়, নিজেকে কেমন ক্লাউন ক্লাউন মনে হচ্ছিল!

আড়চোখে তাকিয়ে বিস্ময়ের সীমা রইল না। মেয়েটা কেমন বিবর্ণ হয়ে গেছে, ভয়ে মনে হচ্ছে চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসবে! এসব কী, ও বাঘ না ভালুক! যথেষ্ট দূরত্ব রেখে খাটে বসে কোমল গলায় বলল, ইভা এমন করছ কেন, কি হয়েছে!
ইভা চোখের জলে ভাসতে ভাসতে বলল, আপনার পায়ে পড়ি, আমাকে ছোঁবেন না। ইভা সত্যি সত্যি জয়ের পা ধরতে গেল।
জয় বিদ্যুৎগতিতে সরে যেতে গিয়ে মশারীর একটা স্ট্যান্ড ফেলে দিল। মশারীর স্ট্যান্ডটা একপাশে দাঁড় করাতে করাতে ভাবছে , আরে, এ এমন রকম করছে কেন!
জয় সামলে নিয়ে হাসিমুখে বলল, নিষেধ করে তুমিই দেখি আমাকে ছুঁয়ে ফেলছ, শান্ত হও, আমি তোমার গায়ে হাত দেব না। কি বিশ্বাস হচ্ছে না? ইভার গা ভয়ে কাঁপছে। খুব ইচ্ছা করছে কথাগুলো বিশ্বাস করতে- বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলায় দুলছে?
জয় হাঁই চেপে বলল, তোমার নিশ্চই ঘুম পাচ্ছে, শুয়ে পড়ো। আমার মনে হয় আমি অন্য ঘরে শুলে তুমি আরামে ঘুমাতে পারতে। কিন্তু সেটা ঠিক হবে না, এ নিয়ে ভারী গোলমাল হবে। সবাই তোমাকেই দুষবে। তুমি খাটে শোও, আমি শোফায় শুচ্ছি। প্লিজ আমার উপর বিশ্বাস রাখো। কি রাখা যায় বিশ্বাস?

ইভা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে কৃতজ্ঞ চোখে তাকাল। নতুন জীবনের শুরুটা তো ভালই মনে হচ্ছে- সামনে কি আছে কে জানে! সব কথা জানলে এরা কি অনর্থই না করবে! আচ্ছা, তাইলে কি এরা সমস্ত সম্পর্ক চুকিয়ে ফেলবে?
জয় সোফায় একটা বালিশ আর কোল বালিশ ফেলল। ওর এই একটা বদভ্যাস। কিছু আঁকড়ে না শুলে ঘুম হয় না। সিগারেট ধরিয়ে অপ্রসন্ন হয়ে বলল, সরি, তোমার কথা মনে ছিল না, সিগারেটের ধোঁয়ায় নিশ্চই তোমার সমস্যা হচ্ছে। ইয়ে, জাস্ট এক টান দিয়ে নিবিয়ে ফেলব, প্রমিজ। মনে মনে ভাবছে, ধ্যাত, নিজের ঘরে আরাম করে সিগারেট টানা না গেলে বেঁচে থেকে সুখ কী!

ইভা হাসি গোপন করে শংকিত চোখে তাকিয়ে আছে, এর এক টানের নমুনা ভয়াবহ। ভাব দেখে মনে হচ্ছে এক টানে পুরো সিগারেটটা শেষ করে ফেলবে। চোখ কেমন বড়ো হয়ে গেছে! জয় তাড়াহুড়ো করে অ্যাশট্রেতে সিগারেট নিভিয়ে খকখক করে কাশতে লাগল। অসতর্কতায় পানি খেতে গিয়ে টেবিলের কিনারায় রাখা কাঁচের জগ ফেলে দিয়েছে। কাঁচ ভাঙ্গার শব্দ সুনসান রাতে কানে তালা লাগার উপক্রম। ইভার কেমন মায়া হচ্ছে, আহা, বেচারা ধীরে-সুস্থে শেষ করলে কি হত। ও তো আর নিষেধ করেনি।

মা দমাদম দরজা পেটাচ্ছেন। খোকা-খোকা, কি হইল, দরজা খোল।জয় লাফিয়ে দরজা খোলার চেষ্টায় পায়ে জড়িয়ে গেছে আচকানটা, আচকানসহ পা টেনে টেনে হাঁটতে চেষ্টা করছে- ঘন ঘন পা ঝাঁকিয়ে ছাড়াবার চেষ্টা করছে। একহাতে হেলমেটের মতো ধরে রেখেছে বিয়ের পাগড়ি, অন্য হাতে ছিটকিনি খোলার আপ্রাণ চেষ্টা। অনেক কসরৎ করে অবশেষে আটকে যাওয়া দরজাটা খুলতে পারল। ইভার মজা লাগছে মানুষটা উদ্ভটসব কান্ড দেখে!

জয় বিব্রত ভঙ্গিতে বলল, তুমিও মা, এমন করে কেউ দরজা পেটায়! জয়ের মা ভেতরে না ঢুকে, দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আগুন গলায় বললেন, থাপড়াইয়া কানপট্টি ফাটায়া ফেলব। গোটা ফ্লাটের লোক জেগে গেছে। অপদার্থ, হইছেটা কী! তোর পায়ে এইটা কি, ব্যান্ডেজ! অরি আল্লা, পাও কাটছে!
জয়ের লাজুক ভঙ্গি, কিছু না মা, পানির জগ ভেঙ্গেছে। জয়ের মা হাহাকার করে উঠলেন, কাঁচ দিয়ে পা কেটেছিস?
আরে না মা, তুমিও! আর এইসব কি কথা, আচকানটা তোমার কাছে ব্যান্ডেজ মনে হচ্ছে, আশ্চর্য।

জয়ের মা এইবার কাশি দিয়ে ঘরে ঢুকে চোখে বুলিয়ে ধোঁয়া দেখে আঁচ করে নিলেন। তীব্র কন্ঠে বললেন, এই বান্দর, অন্য একজন মানুষ ঘরে আছে সেই খেয়াল নাই। আবার নতুন জগটাও ভেঙ্গে ফেলেছিস দেখি! জয় বিব্রত হল, সরি মা।
জয়ের মা এইবার ইভার দিকে ফিরে বললেন, ইভা মা, তুমি একটু কানে আঙ্গুল দাও তো। এই বান্দরটার সাথে আমি বান্দরের ভাষায় একটু কথা বলি। না-না, সত্যি সত্যি কানে আঙ্গুল দাও।

ইভা বিভ্রান্ত হয়ে কানে আঙ্গুল দিয়ে মা-ছেলের কান্ডকারখানা দেখছে। আল্লা জানে, সামনের দিনগুলো কেমন যাবে জয়ের মা কাঁচের টুকরোগুলো কুড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় ইভাকে কোমল গলায় বলে গেলেন, ইভা মা, ওর দিকে একটু খেয়াল রেখ, মাঝেমাঝে ওর শ্বাসকষ্টের মত হয়।
জয়ের মা বেরিয়ে গেলে জয় মাথা নীচু করে হাসল। ইভা, মার কথায় কিছু মনে করো না। দেখবে, তোমার সঙ্গে ভাব হতে সময় লাগবে না।


জয়ের দু-চোখ ঘুমে জড়িয়ে আসছে। সোফায় লম্বা হলো। কিছুটা সময় চশমা পরেই নাক বরাবর ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল, উসখুস করে চশমা সোফার হাতলে ঝুলিয়ে দিল। ঘুমে তলিয়ে যেতে যেতে ভাবল, এই মেয়েটি তাইলে সারা জীবন এখানে থাকবে। ওর, ওর পরিবারের সঙ্গে মানিয়ে নেবে! আজন্ম পরিবেশ ছেড়ে সম্পূর্ণ নতুন এ পরিবেশে মানিয়ে চলতে হবে। আগে হয়তো সকাল দশটা পর্যন্ত ঘুমাত। এখন এ পরিবারের সকাল ছ-টায় হলে ওকেও কি ছ-টায় উঠতে হবে?"... 

*পরের পর্ব: http://www.ali-mahmed.com/2010/08/blog-post_17.html

আমার আনন্দ বেদনার অপকিচ্ছাঃ ৩

লেখালেখির জগতে আমার দেখা অল্প ক’জন অসাধারণ মানুষদের একজন, কাজী আনোয়ার হোসেন। মাসুক নানার(!) সৃষ্টা এ দেশে বইয়ের জগতে বিপ্লব নিয়ে আসা একজন মানুষ! 

শেখ আবদুল হাকিমের উপর আমি খুব বিরক্ত হয়েছিলাম। সেই যে বললেন ঢাকা আসলে যোগাযোগ করবেন, অনেক যন্ত্রণা করে একবার ঢাকা গেলাম। গিয়ে শুনলাম, উনি প্রত্যেকদিন অফিসে আসেন না। বারটা ঠিক মনে নাই, সম্ভবত এ রকম ছিল, তিনি শনি এবং মঙ্গলবারে অফিসে বসেন।

আমার খুব অস্থির লাগছিল, মেজাজ খারাপ হচ্ছিল! হায়, আবর্জনা লেখকের মেজাজ, পক্ষীর বিষ্টা! কেন রে বাবা, কোন বারে বসেন, এটা আমাকে আগে বললে আপনি কি ক্রমশ বড়োমাপের মানুষ থেকে ছোটমাপের মানুষের দিকে ধাবিত হতেন?
আমার মতো আবর্জনা লেখকের এইসব রাগ মানায় না, কিন্তু আমরা কি সব সময় মস্তিষ্ক দিয়ে বিচার করি, বিশেষ করে আমার মতো দুর্বল মানুষ! প্রস্থান করার পর আর ওমুখো হইনি! পরে আর এই ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার দেখা হয়নি।

কি জানি কেন এটা করেছিলাম, এই স্ক্রিপ্টটাই (কনক পুরুষ) বাই পোস্টে কাজী আনোয়ার হোসেনকে পাঠিয়েছিলাম। ক’দিন পর তিনি আমাকে একটা চিঠি লিখলেন, চিঠিতে তিনি কিছু সদাশয় মন্তব্য করেছিলেন। আমার ধারণা, এমন মন্তব্য তিনি অহরহই করে থাকেন। কিন্তু তখন আমার মনে হয়েছিল, মৃত্যুর পরও এঁরা অমর হয়ে থাকবেন, এ কারণে, এঁরা লেখক বানাবার মেশিন। এঁরা আমাদেরকে স্বপ্ন দেখান, আলোর ভূবনের!
চিঠিতে আরো লেখা ছিল, ঢাকা আসলে দেখা করবেন। আপনার মতো...একজন লেখকের সঙ্গে দেখা হলে সুখি হবো।
হা ঈশ্বর, এও আমাকে বিশ্বাস করতে হবে, আমার মতো তিন টাকা দামের একজন কলমবাজের জন্যে তিনি কাজকাম ফেলে দেখা করার জন্যে মুখিয়ে আছেন... ওই যে বললাম, এঁরা স্বপ্ন দেখান!

ফোন করলে তিনি বললেন, আপনি কি বিকালে আসতে পারেন, সকালে তো খুব ঝামেলা থাকে, বেশীক্ষণ কথা বলতে পারবো না?
আমি মনে মনে বলি, এটা একটা কথা হলো, বিকাল কেন, রাত বারোটা হলে আমার অসুবিধা কি!

আমি আগেভাগেই পৌঁছে গেলাম, যদি দেরী হয়ে যায়।
অফিসের চৌবাচ্চায় কি-সব মাছ; ধুর ব্যাটা মাছ, তোদের সার্কাস দেখে কে! অফিসে এন্ট্রির ঝামেলা শেষ হলে আমাকে বলা হলো তিনি এখন মেডিটেশন করছেন, নির্দিষ্ট সময়ে দেখা করবেন।

এই ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা করা খুব জটিল। একজন বডিগার্ডের মতো মানুষ আমাকে তাঁর রুমে এগিয়ে দিয়ে আসলেন। একপাশের পুরোটা দেয়াল জুড়ে বিশাল এক্যুরিয়াম, নাম না জানা সব মাছ, ভদ্রলোকের দেখি মাছের ভারী শখ!
জিন্সের প্যান্টপরা সপ্রতিভ এই মানুষটার যে দিকটা আমাকে সবচেয়ে মুগ্ধ করেছিল, অখ্যাত কুখ্যাত পরের কথা কিন্তু একজন মানুষের সঙ্গে অন্য একজন মানুষের যেমনটা আচরণ হওয়া উচিৎ, তাঁর আচরণে এর একরত্তি কমতি নেই!
এমন একজন লেখক, যার লেখা পড়ে কতো রাত নির্ঘুম কাটিয়েছি। কতো দুঃসময়ই না পার করেছি অথচ তিনি আমার মতো আবর্জনা লেখকের সঙ্গে এমন আচরণ করছিলেন যেন উল্টো আমি তাঁকে সাক্ষাত দিয়ে কৃতার্থ করছি! আহারে, লেখা ছাপা না হলেই বা কী আসে যায়!


সবই ঠিক ছিল কিন্তু ফেরার সময় গুলিয়ে ফেললাম কারণ তখন বডিগার্ডের মত কেউ ছিল না। কাজীদার অন্য রুমে ঢুকে পড়ে ওঁদের বিব্রত হওয়ার চেয়ে নিজে বিব্রত হয়েছিলাম বেশী। কী লজ্জা-কী লজ্জা! 


* কাজীদা, একজন লেখক বানাবার মেশিন: http://www.ali-mahmed.com/2009/10/blog-post_13.html

Friday, June 29, 2007

গণতন্ত্র- বড্ডো গুরুপাক!

­গণতন্ত্র ভাল জিনিস নিঃসন্দেহে, ভারী স্বাদু! সমস্যাটা হচ্ছে, স্টমাক ঘি-মাখন হজম করার শক্তি রাখে কি না? দীর্ঘ অনেক কটা বছর ধরে গণতন্ত্রের অর্থ দাড়িয়েছে ক্রমাগত নিয়ম করে হরতাল। এটা নাকি অতীব জরুরি। হরতাল ব্যতীত গণতন্ত্র নাকি নিঃশ্বাস নিতে পারে না। শাসক দল ৫ বছর শাসন করে। বিরোধী দল দিনের পর দিন হরতাল নামের হরতালের চাবুকটা সাঁই সাঁই করে চালাতে থাকে। কিন্তু শাসক দলকে ১ সেকেন্ড আগেও হঠাতে পারে না। নমুনা দেখে মনে হয়, এটা কেয়ামতের আগ পযর্ন্ত চলতে থাকবে।

কী সীমাহীন লুটপাট। ৩ কোটি টাকার গাড়ি যিনি হাঁকান তিনি কিন্তু এ দেশের সবচেয়ে বেশি করদাতা নন!
দেশের সবচেয়ে বেশি করদাতা, তিনি হলেন সাধারণ ব্যবসায়ী মি. অসিত সাহা। একজন আমলা কোটি কোটি টাকা খরচ করে এম. পি হন, ওনার নাকি দেশ সেবা না করলে চলছে না। এ দেশে নাকি ঘুসের টাকা পেলে কাঠের পুতুলও হাঁ করে। সততা নামের জিনিসটা ক্রমান্বয়ে জাদুঘরে স্থানান্তরিত হচ্ছিল। রাবারের মতো প্রসারিত হচ্ছিল ধর্মবাজরা।

একটা পরিবর্তন না এসে উপায় ছিল কি আদৌ? অনেককেই দেখি মুখ অন্ধকার করে রাখেন। তাঁরা নিবাচির্ত সরকার ব্যতীত অন্য কিছু মেনে নিতে চান না। মেনে নেয়াটা তীব্র কষ্টের, এতে আমার কোন অমত নাই। আমি একমত, এটা মেনে নেয়া কঠিন। কিন্তু বিকল্পটা কি, বলেন? ঘুরেফিরে তো ওই গুটিকয়েক দলই এই দেশ শাসন করবে। এরা তো দেশটাকে ১০০ বছর পিছিয়ে দিয়েছে। দিচ্ছে।

বলা হচ্ছে, এরা (কেয়ারটেকার সরকার) যে অল্প সময়ের জন্য এসেছেন এই সময়ে নির্বাচন নিয়ে মাথা না-ঘামিয়ে অন্য কিছুর চিন্তা করার অবকাশ নাই। আমার কাছে মনে হয় এমন, তাদের কাছ থেকে যেন আমরা আশা করি; গরু কিনে, ঘাস খাইয়ে, গরুর কাছ থেকে দুধ কালেক্ট করে, গরুর দুধ জ্বাল দিয়ে, দুধটা খাইয়ে দেবেন, দুধের সর দিয়ে তাদের মুখে লেপে ত্বকের জৌলুশ বৃদ্ধি করবেন। ব্যস। চক্রাকারে এই কাজটা চলতেই থাকবে। আমি তো দেখছি, এই অল্প কয় জন মানুষ দেশটা তো ভালই চালান। এখন যাদের ধরা হচ্ছে বা চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে, এদের টিকিটিও স্পর্শ করার সাধ্য কার ছিল? তবে এদের মধ্যে আমলা গামলাদের খুব একটা দেখছি না। এরা সবাই এখন সাধু হয়ে গেছেন!

আমার চোখে দেখা একটা ঘটনা এখানে শেয়ার করি। যে এডিএম সাহেব অবৈধ স্থাপনা ভেঙ্গে দিচ্ছেন, অনেকটা গায়ের জোরে, তিনি সাধারণ একজন জেলের কাছ থেকেও ঘুস খেয়েছিলেন। এখন তার কী দবদবা!

আল্লা মালুম, এখনই এই ভাঙ্গাভাঙ্গি করার আইডিয়াটা কার মাথা থেকে বেরিয়েছে? আমি মনে করি, যাদের মাথা থেকে এটা বেরিয়েছে, এরা তাঁদের নিজেদের কফিনে পেরেক ঠুকলেন।
আমাদের জায়গা বড়ো অপ্রতুল, এটা করা প্রয়োজন ছিল অনেক পরে। সব বিগ শটদের কাবু করে, দেশের অধিকাংশ টাকা অন্যায় করে যে সব অল্প মানুষরা দখল করে রেখেছেন, সে সব সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে, এবং দ্রুত শ্রম বাজার সৃষ্টি করে। তারপর সরকার যদি বলতেন, প্রিয় দেশবাসী, আমরা আমাদের কাজ করেছি এবার আপনারা আমাদের জন্য কিছু কাজ করুন। দখলকারীরা সরকারী জায়গা ছেড়ে দিন। আমার মনে হয় গরীব দেশবাসীরা তখন হাসিমুখেই এই নির্দেশ মেনে নিতে বাধ্য হতেন।

ছলিম মিয়ার টং, বস্তী যে ভেঙ্গে দেয়া হচ্ছে, এর শেষ কোথায়! এরা কি আসলেই এর পরিণাম জানেন? এইসব ডিসিশন মেকারদের পেছনে থাকা প্রয়োজন ছিল মানবিক একজন মানুষের। যিনি একজন মানবিক মানুষের পাশাপাশি একজন মনোবিদও বটে। একেকটা পেশার লোকজনদের জন্য ভাবতে হবে একেক রকম করে। অসংখ্য পেশা থেকে একটার কথা বলি: আমরা খুব আমোদ পাই যখন শুনি বস্তি উচ্ছেদ করা হলো। একটা কাজের কাজ হলো যা হোক। শহরটা বড় সাফ সুতরো হলো।
বিশ্বাস করেন, আমি গার্মেন্টস কর্মীদের পায়ের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকি। এরা যখন হেঁটে যান, আমার কেবল মনে হয় এই দ্রুত হেঁটে যাওয়া পা আমাদের দেশটাকে সচল রাখার পেছনে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। আমাদের স্যারদের যে বাবুগিরি এতে এঁদের অবদান যে কী প্রবল এটা আপনারা আমার চেয়ে ভাল জানেন। এরা থাকবেনটা কোথায়, ফ্ল্যাটে? কয় টাকাই বা এঁদের বেতন? এঁদের ঘরটা ভেঙ্গে দিয়ে উল্লসিত হওয়ার অবকাশ কোথায়? ফিরে এসে যখন কেউ ওই ভেঙ্গে দেয়া বস্তীতে তাঁর প্রিয় মানুষ খুঁজে পাবেন না, যে শিশু সন্তানটি হারিয়ে গেল! এ অন্যায়ের দায় কে নেবে? যেটা করা প্রয়োজন ছিল: সমস্ত দেশে শ্রম বাজার সৃষ্টি হয়, এই ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলো ছড়িয়ে দেয়া। নিয়ম করে দেয়া, যারা এই ধরনের প্রতিষ্ঠান করবে তাদেরকে আবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে, বাধ্যতামুলক। যে টাকা এঁরা বস্তীতে থাকার জন্য দিতেন এমন একটা অংক এদের থাকার জন্য নেয়া।

বাংলাদেশের লোকসংখ্যা কত এখন? অথচ ঢাকায় সম্ভবত দেড় কোটি! আমরা সব লাটিমকে বনবন করে ঘুরাচ্ছি ঢাকাকে কেন্দ্র করে, এটা ক্রমশ বন্ধ করতে হবে। যারা রংপুর, খুলনায় শিল্প প্রতিষ্ঠান বসাবেন তাদের জন্য ট্যাক্সসহ অন্যান্য কর আদায়ের বেলায় ছাড় দেয়া হলে অনেকেই আগ্রহী হবেন বলেই আমার ধারণা। এবং রাষ্ট্রীয় বিশেষ সম্মান থাকুন এদের জন্য, কত উপায়েই না এঁদের সম্মান জানানো যেতে পারে। বাহে, আইডিয়া কেউ চাইলে গাদাগাদা আইডিয়া দেয়া যাবে নে।

আসলে এই দেশের জন্য টাকা কোন সমস্যা না। বিদেশী লালমুখোদের কাছে শিঁরদাড়া বাঁকা করে কাতর হাত বাড়াবার কোন প্রয়োজনই নেই। আর আমরা এটাও জানি, জানার আর বাকি নাই এরা ১০০ টাকা দিলে ২০০টা উপদেশ দেয়। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে এদের কাছ থেকেই হেনতেন কত কিছু কিনতে আমাদেরকে বাধ্য করে। দেখুন না, হাজার হাজার কোটি টাকার রেমিটেন্স যে সব প্রবাসীরা দেশটায় পাঠাচ্ছেন। আমরা এদেরকে কি সম্মান দিচ্ছি, কচু! এদের ভোট দেয়ার অধিকারই নাই। চোরচোট্টা ভোট দিতে পারবে, এঁরা পারবেন না! প্রবাসী অনেকেই দেশে ইনভেস্ট করার জন্য মুখিয়ে আছেন, শুধু প্রয়োজন সদিচ্ছার।

যে ভদ্রলোক সবচেয়ে বেশি টাকা ট্যাক্স দেবেন তাঁদের জন্য আমরা কি করি, ঘেচু! আমার সাধ্য থাকলে তাঁকে গার্ড অভ অনার দিতাম। তাঁকে গার্ড অভ অর্ডার দেয়ার প্রস্তাব শুনে কি আপনারা ঠা ঠা করে হাসছেন? বেশ, যখন ফিফার ব্লটারকে আমাদের দেশে গার্ড অভ অনার দেয়া হলো, তখন আমরা বড়ো আমোদ পাই, না? কোন দেশ দেয়নি, ব্লটারকে দিলাম, আমরা দিয়ে দেখিয়ে দিলাম! যেন ব্লটারের ব্লাডার আমরা গার্ড অভ অনার দিয়ে দিয়ে ফাটিয়ে ফেলব! ­দেশের ট্যাক্স যদি যথার্থ ভাবে আদায় করা হয়, ভিক্ষা করতে হবে না, আমি নিশ্চিত।

অনেক হাজী সাহেবকে দেখেছি, যাকাত দেন কিন্তু ট্যাক্স দেন না। কিছুটা ভয়ে, অনেকটা অসচেতনার কারণে। যাকাতের মতোই ট্যাক্স হচ্ছে সরকারী যাকাত। একজন কখনোই নিজেকে ভালমানুষ বলে দাবী করতে পারেন না, ট্যাক্স না দিলে। সরকার এই ট্যাক্সের টাকায় রাস্তা করেন, হাসপাতাল গড়েন। ওই রাস্তায় চোর হাঁটে, সাধুও হাঁটে। চুতিয়ারা বলে, এই রাস্তা ওমুক মন্ত্রী বাহাদুর করেছেন, তমুক হাসপাতাল তমুক মন্ত্রী- যেন এই মন্ত্রী টন্ত্রীদের বাপের তালুক বিক্রির টাকা। যদি এখুনি আমার মতো সাধারন মানুষের জরুরী নিরাময়ের প্রয়োজন হলে, আমি কোথায় ছুটব, অ্যাপোলো হাসপাতালে? বিলের ধাক্কায় মৃত্যু এগিয়ে আসবে গলাগলি করার জন্য। আরও কতো ভাবে টাকার উপায় করা যায়।

আমাদের মাথাপিছু জাতীয় ঋণ কতো? অনুমান করি হাজার দশেক টাকা। আচ্ছা, আমাকে সরকার সার্টিফিকেট দিতে পারবেন, 'আলী মাহমেদ, জাতীয় ঋনমুক্ত ব্যক্তি'? তাহলে আমি টাকাটা দিয়ে দিতে চাই। কেন আমি ঋণের বোঝা বয়ে বেড়াব? আমার মতো হয়তো আরও পাগল পাওয়া যাবে।
কোরবানীর সময় দেশে কতো টাকার কোরবানী হয়? অনুমান করি নিদেনপক্ষে ৫ হাজার কোটি টাকা। বেশ, অপশন রাখুন, যিনি কোরবানীর নিয়ত করেছেন তিনি ইচ্ছা করলে দেশের জাতীয় ফান্ডে টাকাটা জমা দেবেন। তাঁকে সমুহ টাকা বুঝে রসিদ দেয়া হবে। যিনি মনে করবেন পশুর গলায় ছুরি না চালানো পর্যন্ত ধর্ম টিকে থাকবে না তিনি ধর্ম পালন করুন না, কে তাকে বাঁধা দিচ্ছে।
কিন্তু, একটা কঠিন কিন্তু রয়ে যায়। আমরা সাধারণ মানুষরা চাইব আমাদের প্রতিটা পয়সার পাই পাই হিসাব যেন থাকে। নইলে যা হবে, এক কাপ চায়ে দুই কাপ চিনি!

প্রফেসর ইউনূসকে আমার খোলা চিঠি

(প্রফেসর ইউনূসকে যে মেইলটা করেছি, হুবহু এখানে তুলে দিচ্ছি)।

জনাব, প্রফেসর ইউনূস:
সালাম। আপনি এ দেশের মানুষের কাছে খোলা চিঠি লিখে মতামত জানতে চেয়েছেন। এই যে মতামত জানতে চাওয়া, আপনার এই উদ্যোগকে সাধুবাদ দেই।

কিন্ত একটা বিষয় আমার বোধগম্য হচ্ছে না, এ দেশের কত ভাগ মানুষ আপনার কাছে তাঁদের মতামত নিয়ে পৌছতে পারবেন? একজন কৃষক, একজন রিকশা চালক, একজন দিনমজুর, একজন গার্মেন্টস কর্মী- এঁরা কিভাবে আপনার কাছে তাঁদের মতামত জানাবেন? এঁরাই তো এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ, না কি? এঁরাই তো এ দেশের চাকা ঘুরাচ্ছেন, অবিরাম।
যাই হোক, এটা আপনার সমস্যা, আমার না।

আমি আমার বক্তব্য বলি: প্রথমেই আপনার নোবেল প্রাপ্তির যথার্থতা তর্ক বিতকের বাইরে রাখি। তদুপরি আপনার নোবেল প্রাপ্তি বাংলাদেশকে পৃথিবীর কাছে আবার নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। সবুজ পাসপোর্টের প্রতি তাচ্ছিল্যের দৃষ্টি অনেকখানি নমনীয় করেছে। স্বাধীনতা পর এটা একটা অভূতপূর্ব ঘটনা।
আমি মনে করি, জনাব, শেখ মুজিবর রহমান যে ভুলটা করেছিলেন, আপনিও ওই ভুলটা করতে যাচ্ছেন। তিনি যদি সরকারি দায়িত্ব না নিতেন তাইলে এই দেশের প্রত্যেক বাড়িতে একটা করে তাঁর ছবি থাকত, সশ্রদ্ধায়।

যে ভুলটা সোনিয়া গান্ধি করেননি, শত চাপেও। এমন কি তাঁর জন্য আত্মহত্যা করারও নজির আছে- কিন্ত তিনি তাঁর সিদ্ধান্তে অটল থেকেছেন। সিদ্ধান্ত আপনার।

ভাল থাকবেন।

শুভেচ্ছান্তে
-আলী মাহমেদ

মি. অসিত সাহা- আমি দুঃখিত!


মি. অসিত কুমার সাহা- আপনি সেই মানুষদের একজন, যাকে আমার মতো মানুষ সেলাম ঠুকে। ২০০৪-২০০৫ অর্থবছরে আপনি সবচাইতে বেশী ট্যাক্স দিয়েছেন।

আমার সাধ্য থাকলে আপনাকে গার্ড অভ অনার দিতাম। সে উপায় তো আমার নেই।

শুভর ব্লগিং নামের আমার একটা বই আপনার উৎসর্গ করেছি।
অনেকেই জানতে চেয়েছেন, আপনার সঙ্গে আমার পরিচয় আছে কি না? বা আপনাকে এই বইটা পাঠাবার কোন ব্যবস্থা করা যায় কি না। আসলে আপনার মতো মানুষদের জন্য এর আদৌ প্রয়োজন আছে কি?
আপনার সঙ্গে পরিচয় থাকা অতীব সৌভাগ্য- কিন্ত না হলে এতে আপনার কিছু যায় আসে কী! কিন্ত আমার মতো সাধারণ মানুষ আপনাকে বই উৎসর্গ করে সম্মানিত হই- খানিকটা ভারমুক্ত হই।

আমি দুঃখ প্রকাশ করি, উৎসর্গে আপনার নামটা আমি ভুল করেছি অসিত কুমার সাহার জায়গায় হয়েছে অসিত কুমার পাল। এখন তো আর আমার এটা সংশোধন করার কোন উপায় নাই। এবং এও আশা নাই, বইটা রিপ্রিন্ট হবে আর আমি এ ভুল সংশোধন করতে পারব।
অতএব, হে প্রিয় মানুষ, তাই নতজানু হয়ে বলি, ক্ষমা করুন মোরে···।

অনুবাদ এবং মৌলিক সাহিত্য

আমি মনে করি, অনুবাদ হচ্ছে অন্যের সন্তানকে দুধে ভাতে বড়ো করা। অন্যের সন্তান দেবশিশু হোক তাতে আমার কি; আমার কালো, লিকলিকে, দুবলা সন্তানের সঙ্গে তার কিসের তুলনা, ছাই!
তাছাড়া অনুবাদক মানেই বিশ্বাসঘাতক- এ্যাদুত্তোর এ্যাদিতর। একটা অনুবাদ পড়ার আগে এই ব্যাপারটা আমরা মাথায় রাখি না, এটা কে অনুবাদ করছেন। তিনি অনুবাদ করার বিষয়ে কতটুকু যোগ্যতা রাখেন বা কতটা বিশ্বস্ত।

৯৫ সালে একজন অনুবাদকের সঙ্গে আমার এ বিষয়ে চিঠি চালাচালি হয়েছিল।
আমি তাকে যা লিখেছিলাম, 'আপনার অনুবাদ জ্যক ফিনের 'হারানো লোকগুলো' পড়লাম। আপনার লেখায় একটা আলাদা কাঠিন্য থাকায় আমার বুঝতে খানিকটা সমস্যা হয়েছে। আগে জ্যাক ফিনের এই গল্পটা আমার পড়া ছিল বিধায় বুঝতে সুবিধা হয়েছে। কাজি আনোয়ার হোসেন জ্যাক ফিনের 'অফ মিসিং পার্সন' অবলম্বনে লিখেছিলেন, অন্য কোনখানে। পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম।

আগেও যেটা বলেছি, আপনাকে আবারও বলি, অন্যের ছেলেকে গভীর মমতায় মানুষ করার অর্থ কী? যেখানে নিজের ছেলেকে নিয়ে মাথা ঘামাবার সীমাহীন সুযোগ রয়ে গেছে। আপনার অনুবাদ করা জ্যাক ফিনের লেখা পাঠকদের ভাল লাগল, ফিন ব্যাটা মরে গিয়েও নাম কামালো, তাতে আপনার কী!
আমার মতে, অনুবাদে আপনি আপনার মেধার অপচয় করছেন। এই আমার মত। বাকিটা আপনার বিবেচনা...।

আহমদ ছফা, দুম করে মরে গেলেন যে!

আহমেদ ছফাকে আমার মনে হয়, চলমান একটা জ্ঞানের ভান্ডার। তাঁর পরিচয় নির্দিষ্ট গন্ডিতে নিয়ে আসা বাতুলতা মাত্র। এই মানুষটাকে বাংলাদেশের এবং কলকাতার বুদ্ধিজীবীরা যমের মতো ভয় করতেন। তিনি কাউকে ছাড় দিয়ে কথা বলতেন না! শেখ মুজিবর রহমানের বিশাল অফার তিনি অবলীলায় ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। পাশাপাশি মানুষটা ছিলেন ভারী অহংকারী। কিন্তু ছফা নোবেল পুরষ্কার পেলেন না কেন- এ ক্ষোভ কার কাছে বলি?

এর চেয়ে অনেক কম অহংকারী মানুষকে আমি বিভিন্ন লেখায় তুলাধোনা করেছি। এ কারণে অনেকেই আমার প্রতি রুষ্ট হন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, আমার মতো অখ্যাত কলমচীর এই অধিকার নাই। আমি স্বীকার করি, আমার যোগ্যতা নাই- কিন্ত আমি ‘ধুনকর’ এর ভূমিকা থেকে পিছপা হইনি।

কিন্ত, ছফার বেলায় তাঁর অহংকার ছাপিয়ে আমার চোখ জলে ছাপাছাপি হয়ে যায়। এই ঘটনাটা যখন আমি পড়ি, আমার চোখের পানি আটকাতে পারিনি। গলা ছেড়ে আমার বলতে ইচ্ছা করছিল, আহমেদ ছফা, আপনি কেন মরে গেলেন? এ ভাবে দুম করে মরে যাওয়াটা কি কাজের একটা কাজ হলো! তাঁর অজস্র কান্ড থেকে একটা তুলে দিচ্ছি: 

(উপাত্তটা নেয়া হয়েছে: আহমদ ছফার চোখে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী/ মোহাম্মদ আমীন।)

“স্বাধীনতা যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর হুমায়ূন আহমেদ তাঁর মায়ের সাথে বাবর রোডের একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে উঠেছিলেন। বাংলাদেশ সরকার শহীদ পরিবারের সম্মানার্থে হুমায়ূন আহমেদের মায়ের নামে ওই পরিত্যক্ত বাড়িটি বরাদ্দ করেছিলেন। কিন্ত অল্প কয়েক দিন পর গভীর রাতে রী বাহিনীর একটি সশস্ত্র দল হুমায়ূন পরিবারকে বাড়ি থেকে বের করে দরোজায় তালা লাগিয়ে দেয়। চারিদিকে ঘোর অন্ধকার, কোথায় যাবেন তাঁরা?
সকাল হল, কেউ নেই, কেউ আসার কোনো আশা নেই। চর্তুদিকে গিজগিজ করছে রক্ষী বাহিনী। কার বুকে এত পাটা যে এগিয়ে আসবে। আহমদ ছফা এসে হাজির। ছফার হাতে একটি টিন, কেরোসিনে ভর্তি, কাঁধে মোটা চাদর। এ নিয়ে আমীন এবং ছফার কথোপথন:

মোহাম্মদ আমীন: আপনি কি হুমায়ূনের কাছে একাই গিয়েছিলেন?
আহমদ ছফা: হাঁ, একাই। তবে হাতে একটা কন্টেনার ছিল, তাতে পাঁচ লিটার কেরোসিন, কিনেছিলাম।
আমীন: কেরোসিন কেন?
ছফা: জ্বলব এবং জ্বালাবো বলে।
আমীন: কাকে?
ছফা: নিজেকে এবং গণভবনকে। আমি হুমায়ূনকে বললাম, হুমায়ূন আমার সাথে রিক্সায় উঠুন, আমরা গণভবন যাব। একটি রিনাউন শহীদ পরিবারকে বাড়ি হতে উচ্ছেদ করে জ্ঞানীর কলমের চেয়েও পবিত্র রক্তকে অবমাননা করা হয়েছে। অপমান করা হয়েছে স্বাধীনতা ও জাতির আত্মদানের গৌরবমন্ডিত ঐশ্বর্যকে। আমি কেরোসিনঢেলে আত্মহুতি দেবার সংকল্পে উম্মাদ হয়ে উঠেছিলাম সে দিন।

আমীন: কেন?
ছফা: যে দেশের সরকার স্বাধীনতায় জীবন বিসর্জনকারী একজন প্যাট্রিয়ট পরিবারকে বাসা হতে গভীর রাতে উচ্ছেদ করে দেয়ার মত জঘন্য ঘটনা ঘটাতে পারে সে দেশে আর যাই থাকুক, আমি নেই। এমন ঘৃণ্য দেশে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়া অনেক ভাল, অনেক। তো, আমি হুমায়ূনকে বললাম, আপনি তাড়াতাড়ি রিক্সায় উঠুন।

হুমায়ূন বললেন, কোথায় যাব?
আমি বললাম (ছফা): গনভবনে যাব। নিজের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেব। একটি শহীদ পরিবারের প্রতি যে অপমান করা হয়েছে- তার প্রতিবাদে এ কাজটা করব। আত্মহুতি।
হুমায়ূন: কি বলছেন ছফা ভাই?
ছফা: কথা বলে সময় নষ্ট করবেন না। উঠে আসুন। সঙ্গে ভারী চাদরও নিয়ে এসেছি। আপনি আমার গায়ে ভালোমত চাদরটা জড়িয়ে দেবেন। যেন আগুনটা ঠিকমত লাগে।

আহমদ ছফার গায়ে আগুন লাগিয়ে আত্মহুতি দেয়ার সংবাদ দাবানলের মত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। সবাই আস্তে আস্তে জড়ো হতে লাগলেন। বন্ধুরা ছফাকে বুঝাতে চেষ্টা করলেন। কিন্ত ছফা অনঢ়, তিনি আত্মহুতি দেবেনই। অন্য কেউ হলে ভাবা যেত আত্মহুতি নয়, কেবল হুমকি, কথার কথা। কিন্ত সবাই জানে ছফা অন্য রকম, সিদ্ধান্ত যখন নিয়েছেন প্রতিকার না পাওয়া পর্যন্ত একচুলও এদিক সেদিক করবেন না, যাই হোক কিংবা যাই ঘটুক।
কবি সিন্দাকার আবু জাফর ব্যস্ত হয়ে ছফার কাছে এলেন। জোর গলায় বললেন, আমি ব্যবস্থা করছি। কথা দিচ্ছি, এই শহীদ পরিবারের জন্য থাকার একটা ব্যবস্থা করব। তুমি কেরোসিন টিন আমার বাসায় দিয়ে এসো।
ছফা বললেন, হুমায়ূন পরিবারকে আবার সস্থানে তুলে না দেয়া পর্যন্ত আমি আমার সিদ্ধান্ত পাল্টাবো না এবং আপনার হাতে সময় মাত্র ১ ঘন্টা।

পরিশেষ: ছফার জবানীতে শুনুন:
মুজিব সরকার হুমায়ূন আহমেদের পরিবারকে পুনরায় উচ্ছেদকৃত বাসায় তুলে দিতে বাধ্য হয়েছিল। অন্তত আমি এই একটি ব্যপারে শেখ মুজিবের প্রতি কৃতজ্ঞ। তিনি আমাকে মরে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন।

ছফার খেসারত!

ছফার জবানীতে শুনুন: (এটা ছফার নিজস্ব মত):
"শেখ মুজিবর রহমান প্রথমে আমাকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, রাষ্ট্রদূত হওয়ার জন্য। কিন্ত তিনি যখন বললেন, শর্ত আছে।
আমি (ছফা) বলেছিলাম, শর্ত ছফার জন্য নয়, আপনি অন্য কাউকে দেখুন।

শেখ মুজিবর রহমান আমার উপর প্রচন্ড রুষ্ট হয়েছিলেন। কিন্ত জেলে দেয়ার সাহস পাননি। পরে শেখ মুজিবর রহমান আমাকে অনুরোধ করেছিলেন, শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা হওয়ার জন্য জন্য।
আমি (ছফা): বলেছিলাম সম্ভব নয়। আমাকে ধারণ করার মতো শক্তি আপনার সরকার বা আপনার প্রশাসনের নেই।
এরপর আবুল ফজলকে এই অফার দিলে তিনি আনন্দের সঙ্গে রাজি হন। আবুল ফজল শেখ সাহেবের কেনা গোলাম হয়ে যান। উপদেষ্টা হওয়ার পর শেখ সাহেবকে খুশী করা ছাড়া তাঁর আর কোন পথ অবশিষ্ট ছিল না।

এরপর আমীন জানতে চান: আচ্ছা, আপনি শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু বলেন না কেন?
ছফা: আমি তোমার বাবাকে বাবা ডাকতে যাব কোন দুঃখে? তোমার বাবাকে পৃথিবীর সমস্ত লোক বাবা ডাকলেও আমি ডাকবো না, তাঁকে অনেকে জাতির পিতা বলে থাকেন, আমি বলি না, একই কারণ। মুক্তিযুদ্ধ আমার মা।

আমীন: তা হলে পিতা কে?
ছফা: সময়। সময়ের দাবি এবং পাকিস্তানীদের কার্যকলাপ। ৪৭ এর পর হতে দেশের উদরে জন্ম যন্ত্রণা শুরু হয়েছে, যা ১৯৭১ এর মার্চে প্রসব বেদনায় প্রদীপ্ত হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটিয়েছে।"
 

*লেখাটা নেয়া হয়েছে 'আহমদ ছফার চোখে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী', লেখক: মোহাম্মদ আমীন থেকে। মোহাম্মদ আমীন দীর্ঘ ১১ বছর ছফার সহচর্যে ছিলেন। অনেক ক-টা বছর একই বাড়িতে ছফার সঙ্গে থাকতেন।)

**ছফার ঠোঁটকাটা স্বভাবের জন্য অনেক দাম দিতে হয়েছিল। তাঁকে বড় অবহেলায় দাফন করা হয়েছিল!
অনুমান করলে দোষ হবে না, এতে তাঁর কিছুই যায় আসেনি। ভাগ্যিস, তিনি বেঁচে নেই, নইলে ঠোঁট গোল করে বলতেন, বুদ্ধিজীবীদের...-এ আমি মুতিও না! হায়, আমরা এ প্রজন্ম জানিই না বাংলাদেশের প্রথম পত্রিকা বের করেছিলেন আহমদ ছফা!
বাংলা একাডেমির পুরষ্কার পাওয়ার জন্য যেখানে লেখকদের লালা ঝরে পা ভিজে যায় সেখানে তাঁকে যেন পুরস্কারটা না-দেয়া হয় এই নিয়ে হইচই বাঁধিয়ে দিয়েছিলেন!
আফসোস, ছফার মত মানুষ যে দেশে জন্মান সেই দেশ ধন্য হয়, নাকি মানুষটা, এটা বলা মুশকিল! উন্নত দেশে জন্মালে তিনি যে নোবেল পেতেন এতে আমার কোন সন্দেহ নাই!