Search

Showing posts with label কর্নেল তাহের. Show all posts
Showing posts with label কর্নেল তাহের. Show all posts

Friday, August 29, 2014

‘আমাগো ল্যাকক-গবেষক’!

কর্নেল তাহেরকে নিয়ে মহিউদ্দিন আহমদের একটি লেখার (৭ নভেম্বরের সাত-সতেরো, প্রথম আলো, ঈদসংখ্যা ২০১৪) প্রেক্ষিতে, অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনের প্রতিক্রিয়ার (তাহেরকে নিয়ে কেন এই মিথ্যাচার? , প্রথম আলো ২১ আগস্ট ২০১৪) জবাবে মহিউদ্দিন আহমেদ আরেকটি লেখা লিখেন, প্রতিক্রিয়ার জবাব, (সত্যের মুখোমুখি হতে ভয় কেন? প্রথম আলো ২৫ আগস্ট ২০১৪)।

‘সত্যের মুখোমুখি হতে ভয় কেন?’
তাই তো-তাই তো, ‘ভয় নাই উরে ভয় নাই’! ওহো, ‘একালের যুধিষ্ঠির’ (তিনপান্ডবের জ্যেষ্ঠ পান্ডব) চলে এসেছেন যে! এখন আমাদের উপায় কী গো- গোবর খেয়ে প্রায়শ্চিত্ত করতে হপে?। মহিউদ্দিন আহমদ এই লেখায় লিখেছেন: “...আমার পান্ডুলিপির অল্প কিছু অংশ প্রথম আলো ছেপেছে এবং এটা আরও কিছু পত্রিকায় উদ্ধৃত হয়েছে। কেউ কেউ আমাকে জানিয়েছেন তথ্যগত কিছু ত্রুটি আছে। আমি এতে উপকৃত হয়েছি এবং আমার পান্ডুলিপি পরিমার্জন করেছি কিছু কিছু জায়গায়।...

ইতিপূর্বে ‘থ্রি-মরদুদ’[১] লেখাটায় আমি লিখেছিলাম, প্রথম আলো কেবল অল্প কিছু অংশই ছাপেনি অতি অসভ্য একটা কান্ডও করেছে। অসম্ভব বিতর্কিত এই লেখাটায় তথ্যসূত্র না-দিয়ে লিখেছে,‘স্থানাভাবে তথ্যসূত্র দেওয়া হলো না’। অথচ ‘ঈদসংখ্যা’ নামের ৫১২ পৃষ্ঠার এই জিনিসে আবর্জনার কিন্তু অভাব নেই। এখানে ‘কেতুপাত সাদে পাদাং’ নামের খাবারের রেসিপিও আছে। এদের ভাব দেখে মনে হচ্ছে এই ‘...পাদাং’খাবারটা না-খেলে পাঠক কোলা-ব্যাঙের ন্যায় পশ্চাদদেশ দেখিয়ে প্রথম আলো আপিসে বেদম লাফাবে!

মহিউদ্দিন আহমদ জাঁক করে এটাও লিখেছেন,“...অধ্যাপক হোসেন (আনোয়ার হোসেন) অনেকগুলো বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। আমি দেখলাম, তথ্যসূত্র অনুযায়ী আমার উল্লেখ করা সব কথাই মোটামুটি অভ্রান্ত।...
মহিউদ্দিন আহমদ ইনিয়েবিনিয়ে অনেক বিষয় টেনে নিয়ে এসেছেন অথচ আনোয়ার হোসেনের প্রশ্নগুলো একেক করে যুক্তি খন্ডন করার ধারেকাছে দিয়েও যাননি! যে নঈমের মুখ দিয়ে ভয়ংকর কথাটা বলিয়ে নিয়েছেন সেই নঈমকে নিয়ে একটি শব্দও নেই! আর মহিউদ্দিন স্যার যে বলছেন, “...তথ্যগত কিছু ত্রুটি আছে। আমি এতে উপকৃত হয়েছি এবং আমার পান্ডুলিপি পরিমার্জন করেছি কিছু কিছু জায়গায়।...” উপকৃত হয়েছেন?

বাহ, বেশ তো! গবেষক সাহেব ইচ্ছা হলো ব্যস, বলা নেই কওয়া নেই ‘লিকে’ দিলেন, ওমুক বলেছে তাহের ওয়েবের তার ধরে ঝুলাঝুলি করতেন। ‘ঝুল-ঝুল ঝুলুনি...’ আর যায় কোথায় আমরাও স্বীকার গেলুম তাহের কেবল তার ধরে ঝুলাঝুলিই করতেন না কঠিন ‘তারবাজিও’ করতেন। ফাঁকতালে কেউ যদি বলে বসে ওসময় তো ওয়েবের তারের খুটিই পোঁতা হয়নি তখন আমাদের গবেষক সাহেব সেই অংশটুকুর পরিমার্জনা করে আমাদেরকে মার্জনা করবেন।
স্যারের ভাষায় বলতে হয়, ‘...লেখক-গবেষককে এ ক্ষেত্রে একটা ঝুঁকি নিতে হয়...’। সেই ঝুঁকিটাই নিয়েছেন আমাদের ‘কাবিল ল্যাকক-গবেষক’ মহোদয়। এই লেখার অন্যত্র মহিউদ্দিন আহমদ লিখছেন: “...শুধু একটি বিষয়ে আমি নিশ্চিত হতে পারিনি। আমি লিখেছিলাম, শপথ গ্রহন অনুষ্ঠানে তাহের উপস্থিত ছিলেন।...

যাক, একালের যুধিষ্ঠির মহাশয়ের মনে তাহলে খানিকটা ধন্ধও কাজ করছে! ভাল-ভাল! তিনি আরও লিখেছেন, “...আমার লেখার ভগ্নাংশ ছাপা হয়েছে। ...পাঠক আরও অনেক কিছুই জানতে পারবেন, ভাবনাচিন্তার খোরাক পাবেন, যখন বইটি আলোর মুখ দেখবে।...” বাপু রে, তা আর বলতে! শেষ পর্যন্ত লেজটা আর লুকিয়ে রাখা গেল না, না?

পাঠকের ভাবনাচিন্তার জন্য দেখছি আপনি বড়ো কাতর হয়ে আছেন, হে। বাপু, ‘টেনশন লেনেকা নেহি’, প্রথম আলোর মত উঁচুমার্গের বেনিয়া থাকতে আপনাকে মার্কেটিং নিয়ে মাথা ঘামাতে হবে না। আহা, নির্লজ্জের মত মুখিয়ে থাকার আদৌ প্রয়োজন ছিল না। রাম-রাম, এতো চিন্তা করলে আপনার ‘গভেষণা’ ব্যহ্ত হবে না বুঝি! আপনি বরং এই সব ছাইপাশ ইয়ে খুলে লিখতে থাকুন,“...তাহের আক্ষেপ করে নঈমকে বললেন, ওরা বড় রকমের একটা ভুল করেছে। শেখ মুজিবকে কবর দিতে অ্যালাও করা ঠিক হয়নি। এখন তো সেখানে মাজার হবে। উচিত ছিল লাশটা বঙ্গোপসাগরে ফেলে দেওয়া।..."
আপনার বইয়ের ছাপা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নিঃশেষিত হবে এবং প্রথম আলোর বর্ষসেরা বইয়ের সিড়িগুলো বেয়ে তরতর করে আপনাআপনি এই বইটা যে বছরের সেরা বইয়ের মুকুট ছিনিয়ে নেবে এতে অন্তত আমার কোনও সন্দেহ নেই।

আমার সাফ কথা। অনেকে যেমন কাউকে কাউকে দেবতার পর্যায়ে নিয়ে যান। আমি কোনও প্রকারেই এদেরকে দেবতা বলে স্বীকার করি না। যেমনটাএটাও মনে করি না তাহেরের বেলায়ও। তাঁর কোনও মতাদর্শ, ভাবনা ভুল প্রমাণিত হতেই পারে। তাহরের করা কোনও অন্যায় নিয়ে আলোচনা অবশ্যই হবে। তাহের কাউকে অপছন্দ করতেই পারেন কারও প্রতি তাঁর বিস্তর ক্ষোভ থাকতেই পারে কিন্তু ...উচিত ছিল লাশটা বঙ্গোপসাগরে ফেলে দেওয়া..., এমন হিংস্র, নৃশংস কথা তাহেরের মত মানুষ বলবেন এটা অবিশ্বাস্য, অকল্পনীয়।
তাহেরের প্রতি করা অভূতপূর্ব অন্যায়, তাঁর মত কল্পনার অতীত সাহস, মুক্তিযুদ্ধে অবিস্মরণীয় অবদান- এমন মানুষ এদেশে খুঁজে পাওয়া বিরল। এই মানুষটাকে নিয়ে মহিউদ্দিন গং এখন যেটা করছেন সেটা অন্যায়, স্রেফ একটা অন্যায়। কুৎসিত অন্ধকার ভুবনের অমানুষের কাজ।

সহায়ক সূত্র:
১. থ্রি মরদুদ: http://www.ali-mahmed.com/2014/08/blog-post_21.html

* এই লেখাটাই ফেসবুকে দেওয়ার পর Md Mustafizur Rahman মন্তব্য করেন: “আমি , কমুনিস্ট দেখতে পারি না , তাই প্রথম আলো সত্য হলে আমি খুশি হবো ।
আপনার ধারণা প্রথম আলো মিথ্যা, আর যুক্তি হচ্ছে, 'সশস্ত্র বাহিনীতে গণহত্যা' এই গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়: ...২৫ মার্চ ১৯৭১ সালে তাহের পাকিস্তানের কোয়েটার স্কুল অব ইনফ্রেন্ট্রি এন্ড টেকটিক্স-এ সিনিয়র টেকনিকেল কোরে অংশ নিচ্ছিলেন। ২৬ মার্চ সামরিক অফিসার ক্লাবে একজন পাঞ্জাবি অফিসার শেখ মুজিব সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করায় তাহের এর তীব্র প্রতিবাদ করলে তাকে বন্দি করা হয়।...’ সুন্দর যুক্তি । একবার যখন তাহের বংগবন্ধুর উপর খুশি তার মানে সারা জীবন খুশি।

আমার উত্তর: “আপনার ধারণা প্রথম আলো মিথ্যা , আর যুক্তি হচ্ছে...।“ না, দুইটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছিল তাহেরের চারিত্রিক দৃঢ়তা বোঝাবার জন্য যে তাহের চতুর তেলতেলে রাজনীতিবিদ ছিলেন না যে রয়েসয়ে বলবেন। এটাও লেখার সঙ্গে দেওয়া হয়েছিল প্রথম আলো উল্লেখ করেছে ‘স্থানাভাবে তথ্যসূত্র দেওয়া হলো না’। অথচ এমন একটা ভয়াবহ অভিযোগ তাঁর প্রতি উত্থাপন করা হয়েছে,“...উচিত ছিল লাশটা বঙ্গোপসাগরে ফেলে দেওয়া।..."- এই জায়গাটাই ছিল আমার লেখার মূল বিষয়। পরের লেখায় যেটা আমি বলেছি: তাহের কাউকে অপছন্দ করতেই পারেন কারও প্রতি তাঁর বিস্তর ক্ষোভ থাকতেই পারে কিন্তু ...উচিত ছিল লাশটা বঙ্গোপসাগরে ফেলে দেওয়া..., এমন হিংস্র, নৃশংস কথা তাহেরের মত মানুষ বলবেন এটা অবিশ্বাস্য, অকল্পনীয়। তহেরের মত অসমসাহসী, প্রথম সারির যোদ্ধার পক্ষে এমন একটা বক্তব্য দেওয়াটা কতটুকু বাস্তবসম্মত? তাও কোথাকার এক নঈমের বরাত দিয়ে। গোটা বিষয়টাই যথেষ্ঠ সন্দেহের উদ্রেক করে। আমি আশা করেছিলাম, মহিউদ্দিন আহমদ যথার্থ তথ্য-উপাত্ত দিয়ে বিষয়টা পরিষ্কার করবেন। কিন্তু তিনি সেপথ মাড়াননি!
আনোয়ার হোসেন যখন মহিউদ্দিনের এই লেখাটি নিয়ে তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। সেই প্রতিক্রিয়ার পর মহিউদ্দিন আহমদ আরেকটি প্রতিক্রিয়া লেখেন যেখানে তিনি এই প্রসঙ্গটি সুকৌশলে এড়িয়ে যান। যেটা আমাগো ল্যাকক, গবেষক লেখাটায় আমি উল্লেখ করেছি। মহিউদ্দিন আহমদ ইনিয়েবিনিয়ে অনেক বিষয় টেনে নিয়ে এসেছেন অথচ আনোয়ার হোসেনের প্রশ্নগুলো একেক করে যুক্তি খন্ডন করার ধারেকাছে দিয়েও যাননি! যে নঈমের মুখ দিয়ে ভয়ংকর কথাটা বলিয়ে নিয়েছেন সেই নঈমকে নিয়ে একটি শব্দও নেই"!

Thursday, August 21, 2014

'থ্রি মরদুদ'

প্রথম আলো নতুন একটা ডিম্ব প্রসব করেছে। আমি তাদের প্রসব বেদনার সীমাহীন কষ্টের প্রতি পূর্ণ মায়া প্রকাশ করছি। আহা, কী কষ্টই না হয়েছে এতোটা কাল পর এমন অতিকায় এক ডিম্ব প্রসব করতে। আহারে-আহারে!

প্রথম আলোর 'প্রথমা' নামের প্রকাশনায় গ্রন্থ বের করার নাম করে প্রথম আলোর ইনকিউবিটরে বসে-বসে যিনি নিরলস তা দিলেন তার নাম হচ্ছে মহিউদ্দিন আহমদ। তিনি আবার লেখক ও গবেষকও বটে। প্রসবের পূর্বেই যেমন আল্ট্রাসাউন্ডে ভ্রুণের একটা অবয়ব আমরা দেখে ফেলি তেমনি এই গ্রন্থ প্রকাশ হওয়ার পূর্বেই প্রথম আলোর ঈদ সংখ্যায় অবয়বটা-র একটা আকৃতি আমরা পেয়ে গেছি। এটা আবার কিছু পত্রিকা, ওয়েব পোর্টাল ফলাও করে রসিয়ে-রসিয়ে ছাপিয়েছেও।

লেখার কিছু অংশ এমন: "...১৭ই আগস্ট সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নঈম জাহাঙ্গীর নারায়ণগঞ্জে তাহেরের বাসায় যান পরিস্থিতি সম্পর্কে আঁচ করতে। ১৯৭১ সালে নঈম ১১ নম্বর সেক্টরে তাহেরের সহযোদ্ধা ছিলেন এবং প্রায়ই তার সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করতেন। তাহের আক্ষেপ করে নঈমকে বললেন, ওরা বড় রকমের একটা ভুল করেছে। শেখ মুজিবকে কবর দিতে অ্যালাও করা ঠিক হয়নি। এখন তো সেখানে মাজার হবে। উচিত ছিল লাশটা বঙ্গোপসাগরে ফেলে দেওয়া।..."

তাহেরকে নিয়ে ভালমন্দ যতটুকু পড়েছি কিন্তু কোথাও এমন বয়ান পাইনি। এখন জানতে পারছি কোথাকার কোন-এক নঈমকে নাকি তাহের চিবিয়ে চিবেয়ে এটা বলেছিলেন! এটা এখন প্রথম আলো গং বিস্তর গবেষণা করে ডিপ-ফ্রিজ থেকে বের করেছে। এমন একটা অতি স্পর্শকাতর লেখা লিখে প্রথম আলো আবার জাঁক করে লিখেছে, 'স্থানাভাবে তথসূত্র দেওয়া হলো না'। মরদুদ বলে কথা!

'সশস্ত্র বাহিনীতে গণহত্যা' এই গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়: "...২৫ মার্চ ১৯৭১ সালে তাহের পাকিস্তানের কোয়েটার স্কুল অব ইনফ্রেন্ট্রি এন্ড টেকটিক্স-এ সিনিয়র টেকনিকেল কোরে অংশ নিচ্ছিলেন। ২৬ মার্চ সামরিক অফিসার ক্লাবে একজন পাঞ্জাবি অফিসার শেখ মুজিব সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করায় তাহের এর তীব্র প্রতিবাদ করলে তাকে বন্দি করা হয়।..."

তাহের এমনই ছিলেন। কাউকে ছেড়ে কথা বলতেন না। এ সত্য, পরবর্তীতে কারও প্রতি তাঁর মনোভাব পরিবর্তন হতেই পারে কিন্তু তাহেরের মত মানুষ এমন মন্তব্য করবেন এটা অকল্পনীয়! তাঁর চরিত্রে সঙ্গে এটা মিশ খায় না। যদিও প্রেক্ষাপট ভিন্ন... (সিপাহী বিপ্লবের মামলায় এক বছর সশ্রম কারাভোগী) হাবিলদার মেজর আবদুল হাই মজুমদার (অব.) আনোয়ার কবীরের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, "...কর্নেল তাহেরসহ আমিও যখন ঢুকলাম (রেডিও স্টেশনে) তখন খন্দকার মোশতাক আহমদ তাহেরকে দেখে বসা থেকে দাঁড়িযে গেলেন। কর্নেল তাহের প্রশ্ন করলেন- কী লেখা হচ্ছে? আপনাকে এখানে কে আসতে দিল? আপনি কেন এসেছেন এখানে? খন্দকার মোশতাক বললেন- আমাকে সৈনিকেরা নিয়ে এসেছে। ...কর্নেল তাহের বললেন, ইউ আর গেট আউট।"

প্রথম আলো প্রডাকশন হাউজ থেকে দুম করে মহিউদ্দিন আহমদ নঈম জাহাঙ্গীরের বয়ানে যে ফিকশন প্রসব করে মরদামি দেখিয়েছে এর পেছনে সুদূরবর্তী কেরামতি আছে এতে অন্তত আমার কোনও সন্দেহ নেই। এই নিয়ে অবশ্য আমার কোনও দ্বিমত নাই যে মানুষটা যেহেতু আকাশলোকের বাসিন্দা ছিলেন না তাই কর্নেল তাহেরের ভাবনা, মতাদর্শ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হতেই পারে এতে দোষের কিছু নেই। কিন্তু এরা তিন মরদুদ মিলে যে কাজটা করেছে সেটা হচ্ছে এই প্রজন্মের কাছে ইচ্ছাকৃতভাবে তাহেরের মত অগ্নিপুরুষকে খাটো করার অপচেষ্টা। তিন মরদুদের পোকায় কিলবিল করা গলিত শবের পাশে দাঁড়িয়ে আমি বিড়বিড় করি, 'মার গিয়া মরদুদ, না ফাতেহা না দরুদ'!

*তাহেরকে নিয়ে কিছু লেখা: https://www.facebook.com/723002334/posts/10151527427692335

Sunday, May 19, 2013

বিবিধ: তাহের এবং খালেদ মোশারফ।

'সশস্ত্রবাহিনীতে গণহত্যা' নামে একটি ডকুমেন্টারির কাজ করেছিলেন আনোয়ার কবির, যেটা গ্রন্থাকারেও প্রকাশিত হয়েছিল। ওই ডকুমেন্টারিতে তিনি অসংখ্য মানুষের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, সেসময় যারা পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। ওখানে হাবিলদার মেজর আবদুল হাই মজুদার (অব.)-এর একটি সাক্ষাৎকার আছে। তিনি সিপাহিবিদ্রোহের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। এই মামলায় তাঁর এক বছর সশ্রম কারাদন্ডও হয়েছিল। তাঁর সাক্ষাৎকারের অংশবিশেষ:
"আমরা কয়েকজন মিলে একটি সংগঠন 'বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা নামে' জাসদের গণবাহিনীর তৎকালীন ওই সংগঠনের সাথে ঐক্যবদ্ধ হই। এর ভেতর আমরা সবাই ছিলাম মুক্তিযোদ্ধা, এখানে অমুক্তিযোদ্ধা কেউ ছিল না। আমাদের সঙ্গে ছিলেন, এয়ারফোর্সের কর্পোরাল আলতাফ, কর্পোরাল মজিদ, কর্পোরাল শামসুল হক, আমাদের রেজিমেন্টের নায়েক সিদ্দিক, আর্মি হেডকোয়ার্টারে ছিলেন সুবেদার জালাল, সুবেদার মাহবুব, বেঙ্গল রেজিমেন্টে ছিলেন চান মিয়া, তারু মিয়া, সুবেদার মেজর শহীদ, সুবেদার নুরুল হক...।
...সিরাজুল আলম খানের নেতৃত্বে, উনি আমাদেরকে নির্দেশনা দিলেন, কিছু বই-পুস্তক দিলেন।...বিস্তারিত কর্মপন্থার নির্দেশনা উনিই দিতেন।
...১৫ অগস্টে জাতির জনককে হত্যা করা হয়। কার্যত দেশে কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। আমরা কোনোভাবেই এই হত্যাকান্ডকে মেনে নিতে পারিনি। ...সেনাবাহিনীর ভেতর যেভাবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছিল এটা দেখে আমরা কোনো ভাবেই মানতে পারছিলাম না।
...আমরা আমাদের নেতাকে চয়েজ করলাম, কর্নেল আবু তাহের বীর উত্তমকে।
...জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করা হয়েছে।
...আমরা সবাই বিচলিত হয়ে কর্নেল তাহেরকে বললাম, 'স্যার, আজকে রাতের ভেতর যদি আমরা জিয়াউর রহমানকে মুক্ত না-করি তাহলে স্যার আমরাও বাঁচব না, জিয়াউর রহমানও বাঁচবেন না, তার ফ্যামেলির একটি সদস্য বাঁচবে না। আপনিও বাঁচতে পারবেন না...।
..এক জরুরি বৈঠকে সিরাজুল আলম খান আসলেন। কর্নেল তাহের বললেন, 'যে-কোনো ভাবে জিয়াউর রহমানকে উদ্ধার করতে হবে। এবং এই সেনাবাহিনীকে বাঁচাতে হবে, দেশকে বাঁচাতে হবে'।
এই কথার পর সিরাজুল আলম খান প্রশ্ন করলেন, 'Who is Zia'?
তাহের বললেন, '(চিন্তার কিছু নেই) আমি যা বলব জিয়া তাই করবে'।
আমরা আলোচনায় বসে পড়ি। কে কি করব এই দায়িত্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করি। কিন্তু কিছুক্ষণেই মধ্যেই দেখলাম, সিরাজুল আলম খান রুমে নেই। আমরা ভাবলাম, তিনি বাথরুমে গেছেন। কিন্তু অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পরও দেখলাম তিনি কোথাও নেই। আমরা সিদ্ধান্ত নিতে না-পেরে হাসানুল হক ইনুকে দায়িত্ব দেওয়া হলো সিরাজুর রহমানের সঙ্গে এই বিষয়ে পাকাপোক্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য।
...জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করার পর তিনি কর্নেল তাহেরকে আলিঙ্গন করলেন। প্রাণ রক্ষা করার জন্য ধন্যবাদ দিলেন। কর্নেল তাহের আমাদেরকে দেখিয়ে বললেন, 'আমি যুদ্ধাহত, আমার একটি পা নেই, আমি কিই-বা করতে পারতাম। যা করেছে এরাই করেছে'।
এরপর জিয়াউর রহমান আমাদেরকে জড়িয়ে ধরলেন, হাত মেলালেন, চোখের পানি ফেললেন।
এরপর কর্নেল তাহের জিয়াকে বললেন, 'যা করেছে সৈনিকেরা করেছে, তারা কি বলে শোনেন'। আমরা 'বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার' পক্ষে ১১ জন আবারো একত্রিত হয়ে জিয়াউর রহমানের কাছে ১২ দফা দাবী উত্থাপন করলাম।
...অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলছি, ৭ নভেম্বর স্বাধীনতা যুদ্ধের 'কে' ফোর্সের অধিনায়ক খালেদ মোশারফ, কর্নেল হুদাসহ চারজন অফিসারকে হত্যা করা হয়। কর্নেল তাহের বা আমাদের 'বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা'র কোনো লোক এর সঙ্গে জড়িত নন। আমি হলফ করে বলতে পারি, আমাদের কোনো সদস্য ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশারফ, কর্নেল হুদা, কর্নেল হায়দারকে গুলি করেনি। সেদিন কর্নেল তাহের আমাদেরকে এরকম কোনো নির্দেশ প্রদান করেননি।
'বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার' পক্ষ থেকে যদি কেউ খালেদ মোশারফদেরকে হত্যা করে থাকত তাহলে অন্তত আমি জানতাম। কারণ, কর্নেল তাহেরের সঙ্গে যতবারই আমরা আলোচনায় বসেছি সবগুলোতেই আমি উপস্থিত ছিলাম। সবার পক্ষ থেকে নির্দেশের সবগুলো কাগজে আমি স্বক্ষর করেছিলাম।
খালেদ মোশারফদের হত্যা করেছে পাকিস্তান প্রত্যাগত সৈনিকেরা। আমি বিশ্বাস করি, কোনো মুক্তিযোদ্ধা খালেদ মোশারফকে হত্য করতে পারে না। কারণ একজন যোদ্ধা তার সহযোদ্ধাকে কেমন করে হত্যা করবে! যারা মেরেছে তারা দেশের বাইরে পালিয়ে যায়নি। তাদের গ্রেফতার করা হোক, বিচার করা হোক।..."‌
'বাংলাদেশ: আ লিগ্যাসি অভ ব্লাড' বইয়ে অ্যান্থনি ম্যাসকারেনহাস লিখেছেন:
"...সঙ্গে সঙ্গেই গোলযোগ ছড়িয়ে পড়ে। এর মাত্র কয়েক মিনিট পরেই ক্যাপ্টেন আসাদ আর ক্যাপ্টেন জলিল মিলে খালেদ মোশারফ, কর্নেল হুদা আর হায়দারকে কমান্ডিং অফিসারের কক্ষে গুলি করে হত্য করে...।"
অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন, যিনি এই মামলায় ১০ বছর সশ্রম কারাভোগী। তাঁর কথায়:
"...জাসদ নেতৃত্ব এই অভ্যূত্থানে তাহেরকে নেতৃত্ব দেয়ার অনুমতি দিয়েছিল এবং সব ধরনের সহায়তার আশ্বাসও। ...কিন্তু প্রয়োজনের সময় জাসদ সেই কাজটি করেনি।
...আরেকটি কাজ করেনি জাসদ সেটা হচ্ছে, এই অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন তাহের সুতরাং এটা প্রথম সুযোগেই বেতারও টেলিভিশনে প্রচার করা প্রয়োজন ছিল। এই কাজটি করলে এই অভ্যূত্থানের পরিণতি হতো অন্য রকম হত...।"

Saturday, May 18, 2013

লরেনন্স লিফশুলজের চোখে কর্নেল তাহেরের বিচারপর্ব

"...যখন আগের চারটি সরকার একের-পর-এক ক্ষমতায় এসেছিল অস্ত্রের বলে পূর্ববর্তি সরকারকে হটিয়ে। অধিকন্তু যে সমস্ত কর্মকর্তা খালেদ মোশারফের অভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছিলেন এবং সরকারি সংবাদপত্রে যাদেরকে 'ভারতের এজেন্ট' বলে তিরস্কার করা হয়েছিল, তাদের সবাইকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন, ব্রিগেডিয়ার শাফায়াত জামিল। যিনি জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করে রেখেছিলেন।
সুতরাং বিষয়টা দাঁড়ালো এমন, যেসব কর্মকর্তা ৩ নভেম্বর জিয়াবিরোধী অভ্যুত্থানের পেছনে ছিলেন তারা ছিলেন মুক্ত আর যেসব ব্যক্তি ৭ নভেম্বর সাধারণ অভ্যুত্থান ঘটিয়েছিলেন, যে ঘটনায় জিয়া মুক্ত হয়েছিলেন, তাঁরা বিচারে মৃত্যুদন্ডের মুখোমুখি!

বিচার চলাকালে পুরো মাসে এ মামলাসংক্রান্ত অথবা বিচার নিয়ে রিপোর্ট করার চেষ্টা করার কারণে আমাকে বাংলাদেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল এমন একটা খবরও এই দেশের পত্র-পত্রিকায় দেখা যায়নি! অথচ প্রত্যেক সম্পাদক ভাল করেই জানতেন কারাগারের প্রাচীরের ভেতর কী হচ্ছে!

তাহের একদমই চাননি প্রেসিডেন্টের কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করতে [*] কিন্তু তাঁর আইনজীবীরা রাষ্ট্রপতি সায়েমের কাছে প্রাণদন্ড রদ করার  জন্য আবেদন করেন। রাষ্ট্রপতি সায়েম এই আবেদনে কর্ণপাত করলেন না। এ অভূতপূর্ব, তাহেরের দন্ডাদেশ দেওয়ার ২৪ ঘন্টার মধ্যে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার সিদ্ধান্ত দেন।
অথচ এই রাষ্ট্রপতি সায়েম যখন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ছিলেন তখন তিনি পূর্ণচন্দ্র মন্ডলের বিরুদ্ধে মামলায় অভিযুক্তকে দেওয়া এক মৃত্যুদন্ডাদেশ রহিত করেন।
ওই মামলায় (পূর্ণচন্দ্র মন্ডল) বিচারপতি সায়েম তার জাজমেন্টে লেখেন:
"'...প্রাণদন্ডাদেশ অপরাধে অভিযুক্ত একজন বন্দির আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য শেষ মুহূর্তে একজন আইনজীবী নিয়োগ রিমেমবেরান্স ম্যানুয়ালের ১২ অনুচ্ছেদের ধারাই কেবল লঙ্ঘন করে না। ওই অনুচ্ছেদের বিস্তৃত ধারাগুলোর পেছনের উদ্দেশ্যও বাধাগ্রস্ত করে'।
অথচ তাহের তাঁর বিচারকাজ শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত কোনো আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়ার সুযোগই পাননি!
(২০০৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া লরেনন্স লিফশুলজের বক্তব্য থেকে)

লরেনন্স লিফশুলজ হাইকোর্টে তাঁর হলফনামা দাখিল করে লিখেছিলেন:
"...ওই দিন কারাগারে একমাত্র নিরেপেক্ষ প্রত্যক্ষদর্শী হিসাবে আমি বিশ্বাস করি, এটা আমার দায়িত্ব সবাইকে জানানো, আমি কী দেখেছি এবং ঘটনাগুলো কীভাবে ঘটেছে।
৩০ বছরের বেশি সময় ধরে আমি এই ডাকটির জন্য অপেক্ষা করে থেকেছি। হাইকোর্টের সামনে দাঁড়ানোর সুয়োগকে আমি জীবনের অন্যতম সম্মানজনক ঘটনা হিসাবে মনে করি।
...তখন আমি জেনারেল জিয়ার সাক্ষাৎকার নেওয়ার চেষ্টা করি।...কিন্তু আমাকে সাক্ষাৎকার গ্রহণের অনুমতি দেননি জেনারেল জিয়া।...বরং আমাকে এই দেশ থেকে বের করে দিয়েছিলেন।
...নির্মোহ ভাবে আমি বিশ্বাস করি, বিচার শুরুর আগেই এ রায় নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল। ...বিচারের আগেই জিয়া তাহেরকে ফাঁসি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
...তাহের ওই ট্রাইব্যুনালে দাঁড়িয়ে তাঁর শেষ ভাষণে যা বলেছিলেন তা যদি পরের দিন খবরের কাগজে প্রকাশিত হতো, তাহলে জনগণের মধ্যে তাহেরের পক্ষে ভয়ানক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতো। (কিন্তু কোথাও এটা প্রকাশিত হয়নি!)
আমার দৃষ্টিতে, এখনই সময় রাষ্ট্র ও বিচার বিভাগের, প্রকাশ্যে এ ঘোষণা দেওয়া যে আবু তাহেরের বিচার ভুল ছিল এবং তার মৃত্যুদন্ডও ভুল ছিল।"

লরেন্স লিফশুলজ যে হলফনামা হাইকোর্টে দাখিল করেছিলেন, সেখানে তিনি লিখেছিলেন:
"...তাঁর (মঞ্জুর) আশঙ্কা ছিল, তাহেরকে বিচারের মুখোমুখি করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করবেন জিয়া। মঞ্জুর এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া অন্য সামরিক কর্মকর্তারা জিয়াকে এ ধরনের পদক্ষেপ (তাহেরের বিচার) থেকে বিরত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু জুনের শুরুতে মঞ্জুর অনিশ্চিত হয়ে পড়েন, তিনি এই বিচার-প্রক্রিয়া থামাতে পারবেন কি না। কারণ সেনাবাহিনীতে তখন মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির বিপুল প্রভাব।...

মঞ্জুর আমাকে (লিফশুলজ) জানাতে চেয়েছেন, তিনি ওই বিচার ঠেকাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু স্পষ্টতই সেটি করার কোনো ক্ষমতা তাঁর ছিল না। যদিও তিনি ওই সময় নেতৃত্বের দিক থেকে তৃতীয় শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা ছিলেন। তাহেরের বিচার নিয়ে তাঁর অবস্থান তাঁকে সামরিক বাহিনীতে চিহ্নিত করে ফেলেছিল ওই সব ব্যক্তির কাছে, যারা তাহেরের মৃত্যু চেয়েছিলেন।...। 
হায় লিফশুলজ, আপনি ৩০ বছর ধরে আপনার এই স্বপ্নকে লালন করেছেন। অথচ আমরা কী বিস্মৃতপরায়ণ জাতি, ৩০ দিনেই সব ভুলে যাই!

তাহেরের বেলায় প্রত্যেকটা জায়গায়ই আইন ভঙ্গ করা হয়েছিল। মেজর জিয়াউদ্দিন, যিনি সেসময় বিচারে অভিযুক্ত হয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন:
"...যেদিন তাহেরকে ফাঁসি দেয়া হয় সেদিন রাতের বেলায় বিডিআর অস্ত্র নিয়ে জেলখানায় ঢুকে পড়ল। এটা আন্তর্জাতিক জেল আইনের বিরোধী! জেলখানার ভেতর কোনো সশস্ত্র পাহারা ঢুকতে পারবে না। কেবল ঢুকলই না, প্রত্যেকটা সেলের সামনে একজন করে অটোমেটিক রাইফেলধারী সিপাহি দাঁড়িয়ে গেল। পুরো জেলখানা তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিল...।"
তখন জেলখানায় আটক ছিলেন অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন। তাঁর বক্তব্য:
"...জেনারেল মীর শওকত একদিন কারাগারের ভেতরে এসে পরীক্ষা করে গেলেন ফাঁসির দড়ি, ফাঁসির মঞ্চ ঠিকঠাক আছে নাকি! এটা বলার অপেক্ষা রাখে না এটি কোনো ভাবেই মীর শওকতের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। কিন্তু তারপরও সেনাবাহিনীর উর্ধ্বতন যারা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তারা তখন মরিয়া হয়ে গিয়েছিলেন কত দ্রুত তাহেরকে এই পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেয়া যায়।..."
আমার নিজস্ব মত, জেনারেল মীর শওকতের এই আচরণ অস্বাভাবিক! এটা কোনো প্রকারেই একজন মুক্তিযোদ্ধা দূরের কথা; একজন যোদ্ধা, একজন সাধারণ মানুষের সুস্থ আচরণ হতে পারে না! এখানে এসে এই মানুষটা জেনারেল মীর শওকতকে আমার পোকা-পোকা মনে হয়...।
আর আমার কাছে তো এমনটা মনে হচ্ছে, তখন জেলখানা বলে বা জেল-কোড বলে কোনো জিনিস বাংলাদেশে ছিল না! যা খুশি, যার যখন খুশি এখানে আসছেন-যাচ্ছেন। যেনো জেলখানা- এটা একটা খেলার জায়গা বা এদের বাপের তালুক!
 
আমার স্পষ্ট অভিমত, রাষ্ট্রপতি সায়েম, ট্রাইব্যুনালের প্রধান বিচারক কর্নেল ইউসুফ হায়দার (যিনি একজন রাজাকারও ছিলেন), জেনারেল মীর শওকত বা অন্য যারা এই খুনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তাদের প্রত্যেককে খুনের অভিযোগে খুনি অভিযুক্ত করাটাই ন্যায়, জাস্টিস। মৃত্যুর পরও খুনি চিহ্নিত করতে হবে...।

*আইনজীবীরা বলেছিলেন, তাহেরের আপিল করার সুযোগ নেই। একটিমাত্র পথ খোলা আছে সেটা হচ্ছে, রাষ্ট্রপতি জাস্টিস সায়েমের কাছে মার্সিপিটিশন প্রাণভিক্ষার আবেদন করা। তাহের সঙ্গে-সঙ্গে তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেছিলেন,
'জিয়াউর রহমানকে আমি ক্ষমতায় বসিয়েছি। (সে) একজন মীরজাফর ছিল ব্রিটিশ আমলে (একজন) আর এই হচ্ছে দ্বিতীয় মীরজাফর, জিয়াউর রহমান! তার কাছে আমি প্রাণভিক্ষা চাইব? কিংবা তার ক্রীড়ানক প্রেসিডেন্টের কাছে, প্রশ্নই আসে না'।
তাহের প্রাণভিক্ষা চাইলেন না।

**"...সামরিক আদালতে বিচারের ঘটনা এবং এর প্রেক্ষাপট খতিয়ে দেখার জন্য আদালত সরকারকে একটি তদন্ত কমিটি গঠনেরও নির্দেশ দিয়েছে।...[১]"
এই নির্দেশের গতি কী!


*** Faruk Abdullah চমৎকার এক পর্যবেক্ষণ করেছেন:
"...আর একটা জিনিস স্মরণ রাখাটা খুব জরুরি, মিলেটারি একাডেমিগুলোতে মূলত যে শিক্ষা দেয়া হতো, অর্থাৎ পাকিস্তান মিলেটারি একাডেমিতে। তাঁদের অনেকের মধ্যো 'উগ্র ভারত বিদ্বেষ' শিক্ষাটা, যেটা পরবর্তীকালে শত্রুর শত্রু, পাকিস্তানমুখি করেছিল...।

সহায়ক সূত্র:
১. হাইকোর্টের রায়:
http://www.bbc.co.uk/bengali/news/2011/03/110322_mk_taher_verdict.shtml

Friday, May 17, 2013

লং লিভ মাই কান্ট্রিম্যান: তাহের

এটাই ছিল তাহেরের শেষ কথা। এরপরই তার স্বরযন্ত্র ভেঙ্গে দেয়া হয়। এই অগ্নিপুরুষকে ১৯৭৬ সালের ২১ জুলাই ভোরে যখন ফাঁসি দেয়া হয়, ফাঁসির মঞ্চে রশিতে ঝোলার ৩০ সেকেন্ড আগে ঠিক এই কথাটাই তাহের উচ্চারণ করে গিয়েছিলেন।
তাহেরের গোপন বিচারের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা নিয়ে রিট আবেদনে হাইকোর্টে তৎকালীন ম্যাজিষ্ট্রেট খন্দকার ফজলুল রহমান, যিনি তাহেরের ফাঁসির সময় উপস্থিত ছিলেন; তিনি এই তথ্যটি জানান।

তিনি আরও বলেন, "...ওই সময় তাহের একটি কবিতা এবং ২টি সিগারেট পাইপ আমার হাতে দিয়ে বলেন, তাঁর বড় ভাইয়ের কাছে পৌঁছে দিতে। তাহের আমাকে আরও বলেছিলেন, 'দেখেন, (ফাঁসির) রশি ঠিক আছে কি না, ভ্যাসলিন দেওয়া হয়েছে কি না'।
ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যাওয়ার সময় তাহের বললেন, 'আমি মাস্ক পরব না'। (যে কালো কাপড়ে দিয়ে মুখ ঢেকে দেয়া হয়)
আমি বলি, 'আইনে আছে মাস্ক পরে যেতে হয়'। ..."

'লং লিভ মাই কান্ট্রিম্যান', মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও তাহের দেশ, দেশের মানুষের কথা ভোলেননি! আমার একটা কথা আমি লেখায় প্রায়শ ব্যবহার করি, 'মৃত্যু এসে গা ছুঁয়ে বলে, পাগল তোকে ছুঁয়ে দিলাম'। তাহেরের বেলায় হবে উল্টোটা। তিনি মৃত্যুর গা ছুঁয়ে হা হা করে হাসেন। এমন একজন মানুষের মুখোমুখি হয়ে মৃত্যু কী খানিকটা বিমর্ষ, কুন্ঠিত-লজ্জিত হয়, কে জানে!

তাহেরের স্ত্রী মিসেস লুৎফা তাহের বলেছিলেন:
"...তাহেরের সঙ্গে দেখা করতে গেছি। জেলখানায় থাকাকালীন এত মজার মজার ঘটনা আমাদের বলল। ...আমরাও হাসতে হাসতে বিদায় নিলাম। আমরা চিন্তাই করতে পারিনি আজকে রাতেই ফাঁসি হবে। (পরে জেনেছি আজকে রাতেই যে ফাঁসি হবে এটা তাহের জানত)
...জেলখানা থেকে টেলিফোন আসল লাশ নেয়ার জন্য। আমরা বললাম, ঢাকায় কবর দেব। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় বলল, না। তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আমার শাশুড়ি অনেক ঝগড়া করলেন। কিছুতেই তারা ঢাকায় কবর দিতে দেবে না।

অবশেষে সিদ্ধান্ত হলো তাহেরের কাজলা গ্রামে লাশ হেলিকপ্টারে করে নিয়ে যাওয়া হবে। হেলিকপ্টারে উঠে এই প্রথম আমি তাহেরের লাশ দেখলাম। আমি চেয়ে চেয়ে দেখলাম, একজন শীর্ষস্থানীয় মুক্তিযোদ্ধার আজ এই পরিণতি! জেলখানার একটা ছেঁড়া চাদর দিয়ে তাঁর শরীর ঢাকা। তাঁর পা ও মাথা বের হয়ে আছে! তাহেরের মাথার চুল উড়ছে!
তাহেরের মা চিৎকার করে বললেন, 'আমার ছেলের জন্য একটা কফিনও হলো না'।...।"

কথিত আছে, নিষ্ঠুর আইয়ুব খান একবার তার সৈন্য-সামন্ত নিয়ে যাচ্ছিলেন। পেছনে পেছনে একটি বেসরকারী লাশবাহী গাড়ি আসছিল কিন্তু আইয়ুব খানের গাড়িকে অতিক্রম করার সাহস পাচ্ছিল না। আইয়ুব খান বিষয়টি লক্ষ করলেন এবং খোঁজ নিয়ে যখন জানলেন এই গাড়িতে লাশ আছে, তখন তিনি নিজের গাড়ি থামালেন, লাশবাহী গাড়িকে আগে যেতে বললেন এবং স্যালুট করলেন।

কেবল যে তাহেরের সঙ্গে ঘোরতর অন্যায় করা হয়েছিল তাই না, তাহের নামের লাশের প্রতিও চরম অবজ্ঞা দেখানো হয়েছিল। আমরা ভুলে যাই কিন্তু ইতিহাস ভোলে না। প্রকৃতির শোধ বলে একটা কথা আছে। হিস্ট্রি রিপিট...।


* আইয়ুব খানের বিষয়টা সম্বন্ধে আমার খানিক সংশয় ছিল কারণ এটা আমি শুনেছিলাম এক আর্মি অফিসারের মুখ থেকে। কেবল শুনেই তো লিখে দেওয়া যায় না। তাই আমি লিখেছিলাম, 'কথিত আছে'।
কিন্তু এই বিষয়ে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন Abdullah Al Imran
"তবে মোটামুটি বছর ছয় কি সাত আগে 'ছুটির দিনে' ম্যাগাজিনের কাভার স্টোরি করা হয়েছিল 'আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম'-কে নিয়ে। আমার স্পষ্ট মনে আছে সেখানে একেবারে শুরুর লাইনটাই ছিল এটা। আইয়ুব খান যে লাশের গাড়িটাকে স্যালুট করেছিলেন সেটা ছিল আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামের লাশ বহনকারী ঘোড়ার গাড়ি। লাশটা থেকে নাকি পঁচা দুর্গন্ধ ও বের হচ্ছিল...।" Abdullah Al Imran


Wednesday, May 15, 2013

কর্নেল তাহেরের নিধনপর্ব

আমাদের মুক্তিযুদ্ধে কর্নেল তাহেরের পাটা কেটে ফেলতে হয়, না-কেটে উপায় ছিল না কারণ পচন সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে যাচ্ছিল।
এমন একজন অকুতোভয় শারীরিক অসুবিধাসম্পন্ন মানুষকে, একজন দুর্ধর্ষ মুক্তিযোদ্ধাকে, একটা স্বপ্নকে, সামরিক আদালতে (জেলখানার ভেতরেই যে আদালত) বিচারের প্রহসনের (যে আইনে কর্নেল তাহেরের মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল অথচ ওই অপরাধে আইনের বিধানে কোন মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিধান ছিল না।) নামে ফট করে মেরে ফেলা আমাদের দেশেই সম্ভব।
 
আসলে ভীরু, কাপুরুষদের এটা করা ব্যতীত উপায় ছিল না। তাহেরকে বাঁচিয়ে রাখাটা ছিল কাপুরুষদের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। আফসোস, এই দেশ তার সেরা সন্তানদের কখনই ধরে রাখতে পারে না- অভাগা এক দেশ!
যে খন্দকার মোশতাকের সঙ্গে তিন বাহিনীর প্রধান তেলেতলে ভাষায় কথা বলতেন সেই মোশতাকের দিকে ক্রাচ তুলে রেডিও স্টেশনে কর্নেল তাহের বলেছিলেন:
'আপনি এখানে কেন...গেট আউট'।
এই হচ্ছেন তাহের!
 
হাবিলদার মেজর আবদুল হাই মজুমদার (অব.), যিনি সিপাহি বিদ্রোহে এক বছর সশ্রম কারাভোগী। তাঁর বর্ণনা থেকে:
"...নিজের ব্যাটিলিয়নে এসে দেখি জিয়াউর রহমান পুরো ব্রিগেড ফল-ইন করালেন। জিয়াইর রহমান ৮ নভেম্বর দুপুর ১২টায় ফার্স্ট বেঙ্গল গ্রাউন্ডের পূর্বদিকে একটা স্টেজে উঠলেন। সেখানে তিনি বললেন, '...আমি সৈনিক, আমি রাজনীতি বুঝি না। ৯০ দিনের মধ্যে জনগণের ক্ষমতা জনগণকে ফিরিয়ে দেব...'।
জিয়াউর রহমান সেখানে কোরান শরীফের উপর হাত রেখে শপথও করেছিলেন। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে ধড়পাকড় শুরু হয়ে গেল...।"
তাহেরকে যেভাবে ফাঁসি দেয়া হয় প্রকারন্তরে এ খুনেরই নামান্তর। রাষ্ট্রের সমস্ত শক্তি ব্যয় করা হয়েছিল এই খুনকে বৈধতা দেয়ার জন্য।
"যে ট্রাইব্যুনালে তাহেরের বিচার হয়েছিল ওটার প্রধান বিচারক ছিলেন কর্নেল ইউসুফ হায়দার। তিনি ছিলেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একজন কোলাবরেটর। জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিশেষ সখ্যতাই ছিল এই বিচারকাজের জন্য নিযুক্ত হওয়ার তার একমাত্র যোগ্যতা! যখন এই ট্রাইব্যুনাল তাহেরের ফাঁসির আদেশ শোনায় তখন অন্যরা সবাই স্তম্ভিত, চিৎকার করে কাঁদছেন কিন্তু তাহের হাসছিলেন...।"
(মেজর জিয়াউদ্দিন আহমেদ (অব.) মামলায় ১২ বছর সশ্রম কারাভোগী)
এই প্রধান বিচারকের (যিনি একজন কর্নেল মাত্র) মেজর জলিল  প্রথম দিনই বলেছিলেন: 'You are a colonel or Dummy'? (আদালতের ৯ ধারাতে বলা আছে, এই আদালতের যিনি চেয়ারম্যান থাকবেন তার যোগ্যতা হতে হবে ন্যূনতম হাইকোর্টের একজন বিচারকের সমান)।
 
মামলা চলাকালীন সময়ে তাহের, জিয়াউর রহমান প্রসঙ্গে যখন বলেন, "There is only one example of such treachery in our history and that is of MIRJAFAR". কোর্ট একথা লিপিবদ্ধ করতে অস্বীকার করলে তাহের বিচারককে উদ্দেশ্য করে বলেন, 'I have seen many small people in my life but never one smaller than you.
 
১৭ জুলাই বিকেলবেলা মামলার রায় হয় আর ২১ জুলাই তাহেরের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। মাত্র ২৪ ঘন্টার মধ্যে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি সায়েম মৃত্যুদন্ড অনুমোদনের কাগজে সই করেন। এমন উদাহরণ আর নেই!
"...যেসব কর্মকর্তা ৩ নভেম্বর জিয়া বিরোধী অভ্যুত্থানের পেছনে ছিলেন, তারা ছিলেন মুক্ত। আর যেসব ব্যক্তি ৭ নভেম্বর সাধারণ অভ্যূত্থান ঘটিয়েছিল, যে ঘটনায় জিয়া মুক্তি পেয়েছিলেন তারা বিচারে মৃত্যুদন্ডের সম্মুখীন।" (লরেন্স লিফশুলৎস)
বলার আর অপেক্ষা রাখে না সব কলকাঠিই নাড়ছিলেন জিয়াউর রহমান। যে জিয়াউর রহমানকে তাহের প্রাণে বাঁচিয়ে ছিলেন। জিয়া এর প্রতিদান এমন করেই দিয়েছিলেন!
 
কর্নেল তাহেরকে গ্রেফতার করার মাত্র ৭ দিনের মাথায় ছোট-ছোট তিন বাচ্চাকে সহ তাহেরের স্ত্রী লুৎফা তাহেরকে তাঁদের নারায়নগঞ্জ অফিসের বাসাটি ছেড়ে দিতে বলা হয়। তাহেরের কোনো পেনশন ছিল না, টাকা-পয়সাও রেখে যাননি। লুৎফা তাহের দিনের-পর-দিন কেবল সন্তানদের আলুভর্তা খাইয়ে বড় করেছেন মোহাম্মদপুরের আজম রোডের স্যাঁতস্যাঁতে দু-কামরার একটি বাড়িতে। 

তাহেরের ডেথ ওয়ারেন্ট ইস্যু করার মাত্র ৩ দিনের মাথায় তাহেরের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। অথচ জেল কোড অনুযায়ী ডেথ ওয়ারেন্ট ইস্যুর ২১ দিন আগে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার বিধান নেই! জেল কোডে স্পষ্ট বলা আছে, "The date of the execution not less than 21 days, or more than 28 days."
আসলে এটা ছিল স্রেফ একটা খুন! কর্নেল তাহেরকে খুন করা হয়েছিল। এবং এই খুন করার ধরন, নমুনা দেখে আমি বিস্মিত হই! গা বাঁচিয়ে কী চমৎকার ভঙ্গিতেই না খুন করা যায়! অনর্থক আমরা সিরিয়াল কিলার রসু খাঁকে দোষ দেই!

তাহেরের বিচার প্রসঙ্গে প্রখ্যাত এডভোকেট গাজিউল হক ক্ষোভে ফেটে পড়েছিলেন:
"...কিলিং, এটা একটা কিলিং হলো। ...মৃত্যুর ক্ষণ, তারিখ ঠিক করে একটা লোককে জবাই করা হলো...।"
একজন কথিত জল্লাদ জনাব মোঃ সিরাজউদ্দিনের সাক্ষৎকার নেয়া হয়েছিল, মিনার মাহমুদের বিচিন্তা পত্রিকায়:
"প্রশ্ন: ফাঁসির মঞ্চের কোনও ব্যক্তির আচরণ কি আপনার হৃদয় ছুঁয়ে গেছে? যদি যায়, তবে সেই ব্যক্তিটি কে?
জল্লাদ সিরাজউদ্দিন: কর্নেল তাহের। ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়াইয়া তিনি সহজভাবে কথা বলেছেন। একটা বিপ্লবী কবিতা পইড়া শোনাইছেন ('...জন্মেছি, মৃত্যুকে পরাজিত করব বলে/ করেই গেলাম...' এই কবিতাটি লিখেছিলেন মেজর জিয়াউদ্দিন)। আশ্চর্য! তিনি নিজের হাতে যমটুপি পরছেন। নিজেই ফাঁসির দড়ি নিজের গলায় লাগাইছেন। আমার মনে হয় ফাঁসির মঞ্চে এমন সাহস দুনিয়ার আর কেউ দেখাইতে পারে নাই।"
৪২ মিনিট লেগেছিল তাহের নামের অগ্নিপুরুষের মৃত্যু হতে! ৪২ মিনিট ধরে ফাঁসির দড়িটা কাঁপছিল। জেলার, ডাক্তার উপস্থিত অন্যরা পর্যন্ত কেঁদে ফেলেছিলেন।

এডভোকেট জেড আই খান পান্না, সেসময় একই কারাগারে বন্দি ছিলেন। তাঁর জবানিতে:
"...এই বিচারকার্যের আইনজীবীদের শপথ করানো হয়েছিল বিচারকার্য সম্পর্কে তারা বাইরে মুখ খুলতে পারবেন না। এবং বিচারকার্য সমাধা হয়েছিল জেলখানার ভেতরে। এমন উদাহরণ পৃথিবীর কোথাও নেই।
...জেলের যে ডাক্তার ছিলেন তাহেরের ফাঁসির পূর্বে ব্লাডপ্রেশার মেপে দেখেন, প্রেশার একেবারেই নরমাল। ডাক্তার  প্রথমে ভেবেছিলেন তার কোথাও ভুল হচ্ছে, তখন কর্নেল তাহের সেই ডাক্তারকে হেসে বলেছিলেন, 'ডাক্তার, আমি একজন যোদ্ধা, একজন মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালেই আমার মৃত্যু হয়ে গেছে। তুমি আমার রক্তে কোনো ধরনের অ্যাবনর্মালিটি পাবে না...'।"
আমার কখনো কখনো সন্দেহ হয় তাহের নামের মানুষটা আসলে মানুষ ছিলেন কিনা, নাকি ছিলেন হয়তো-বা একটা রোবট! কারণ মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে অনেক বড়-বড় বীরপুরুষও কাবু হয়ে পড়েন বাহ্যজ্ঞান লোপ পায় অথচ তিনি কেবল অবিচলই থাকেননি, মৃত্যুকে নিয়ে রসিকতাও করেছেন।
অথচ এই মানুষটাই তাঁর স্ত্রীর কাছে চিঠি লেখেন, 'আমার আদরের লুৎফা...'। বা একটুখানি স্পর্শের জন্য স্ত্রীকে লেখা এই মানুষটারই কী হাহাকারভরা চিঠি, '...তোমার স্পর্শ, তোমার মৃদু পরশ শান্ত করুক আমাকে...'।

 
বা তাঁর এমন ছবি দেখে খানিকটা সংশয় কেটে যায়:
তাহেরের আপন বোন সালেহাও এই কারাগারেই বন্দি ছিলেন। তাহেরের ফাঁসির রায় হওয়ার পর তাহের লিখেছিলেন:
"বোন সালেহা হঠাৎ করে টয়লেটে গিয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। আমি সালেহাকে ডেকে এনে বললাম, 'তোমার কাছ থেকে এমন দুর্বলতা কখনই আশা করি না'।
সালেহা সামলে নিয়ে বলল, 'ভাইজান, আমি কাঁদি নাই। এই দেখো, আমি হাসছি'।
হাসিকান্নায় আমার এই বোনটি অপূর্ব। জেলখানার এই বিচারকক্ষে এসে এই প্রথম তার সাথে আমার দেখা। এই বোনটিকে আমার ভীষণ ভাল লাগে। কোন জাতি এর মত বোন সৃষ্টি করতে পারে?।"

(এটাই ছিল পরিবারকে লেখা কর্নেল তাহেরের শেষ চিঠি)
*মানুষ দেবতা না, সে ভুল করতেই পারে। তাহেরের ভুল বা মতাদর্শ নিয়ে আলোচনা, হতেই পারে। আমার কাছে সেটা এই লেখায় গুরুত্বপূর্ণ না, সেটা ভিন্ন, ভিন্ন তর্কের বিষয়। কিন্তু কর্নেল তাহের নামের আগুনমানুষটাকে স্পর্শ করার ক্ষমতা আমাদের নেই!
 
কর্নেল তাহেরের যে বিষয়টা আমাকে প্রচন্ড আলোড়িত করে সেটা হচ্ছে তাঁকে খুন করার ভঙ্গিটা! এমন না কেউ ফট করে গুলি করে মেরে ফেলল। ঠান্ডা মাথায় খুন- রসিয়ে রসিয়ে খুন; এটা কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব না, সম্ভব কেবল দানবের পক্ষে।
এবং এই খুনটা করার জন্য রাষ্ট্রযন্ত্রের যত ধরনের শক্তি আছে সবই প্রয়োগ করা হয়েছিল। তারচেয়েও যেটা আরও ভয়ংকর সেটা হচ্ছে, সত্যটা ইরেজার দিয়ে মুছে ফেরার চেষ্টা করা হয়েছিল। যথারীতি হিস্ট্রি রিপিট...। এবং খুনের দাগ মুছে ফেলা যায় না। সময় এখানে কোনো বিষয় না।
 

আর আমি এই প্রজন্মের প্রতি অসম্ভব মুগ্ধ এই কারণে, এরা বাপকে ছাড়ে না, খুনি কোন ছার!  

Saturday, January 10, 2009

কর্নেল তাহের, তোমাকে কি স্পর্শ করতে পারি?


(২১.০৭.০৮ প্রথম আলো তন্ন তন্ন করে খুঁজেও তাহের সম্বন্ধে একটা শব্দও পাইনি বলে খানিকটা ধন্ধে আছি, সত্যিই কী এই দিনটিই তাঁর মৃত্যু দিবস ছিল? নাকি মুক্তচিন্তার দৈনিক দামি স্পেস নষ্ট করেনি! তাই যদি হয়, জয়তু মুক্তচিন্তা- বেঁচেবর্তে থাকো, ক্ষণে ক্ষণে মুক্তচিন্তা প্রসব করো! আমি বলি কি, চুতিয়ার খাতায় নাম লেখাও! )

আমি অবশ্য তাঁর মৃত্যুর দিনকে মৃত্যু দিবস বলে মনে করি না। আজ এই অগ্নিপুরুষের কেবল খোলস বদলাবার দিন। আসলে এমন অগ্নিপুরুষকে মেরে ফেলা যায় না, কারও সাধ্য নাই, যমেরও।
... ... ...
এমসি কলেজে পড়ার সময় বন্ধুদের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একটা আর্মস স্ট্রাগল করার জন্য তিনি মিলিটারি ট্রেনিং নিতে আর্মিতে ভর্তি হবেন। ঠিক-ঠিক আর্মিতে জয়েন করলেন।
কমান্ডো মেজর আনোয়ার হোসেন (অব:) লিখেছিলেন এই অগ্নিপুরুষকে নিয়ে:
‌'১৯৬৭ সাল। আমি পাকিস্তানে ট্রেনিং নিচ্ছি। ওসময় পরিচয় কর্নেল (তৎকালীন মেজর) আবু তাহেরের সঙ্গে। কথাবার্তা হচ্ছিল বাংলায়:
কর্নেল তাহের: বাঙালী কমান্ডো তুমি?
আনোয়ার: ইয়েস স্যার।
কর্নেল তাহের: আমার খুব আনন্দ হচ্ছে তুমি কমান্ডো হচ্ছো, কিন্তু ভুলবে না, পরাধীন দেশ স্বাধীন করতে হবে।
আনোয়ার : স্যার, পরাধীন, পাকিস্তান তো স্বাধীন দেশ! কিসের কথা বলছেন বুঝতে পারছি না!
ক. তাহের (রাগী স্বরে): গোল্লায় যাক পাকিস্তান। তুমি একজন বাঙালী কমান্ডো, বুঝতে পারছ না কোন দেশ স্বাধীন করতে হবে?'
আনোয়ার স্তম্ভিত হলেন।
১৯৬৭ সালে বাঙালী নেতাদের মুখেও দেশ স্বাধীন করার কথা শোনা যেত না। অথচ একজন সৈনিক হয়ে কী দুর্দান্ত বিশ্বাস নিয়েই না উচ্চারণ করলেন।

একটা স্বপ্ন- জান্তব, অদেখা স্বপ্ন! এই স্বপ্ন কেবল অল্প ক-জন মানুষই দেখতে পায়, তাহের তাঁদের একজন।

কমান্ডো তাহেরের অসমসাহসিকতার বর্ণনা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। অতি সাহসী মানুষরাও তাঁর অতুল সাহসের কথা স্মরণ করে
এখনও শিউরে ওঠেন। নবীন কমান্ডোরা দূর থেকে তাহের নামের মানুষটাকে দেখে ফিসফিস করত, 'লুক, জেন্টলম্যান, দিস ইজ তাহের, আ লিজেন্ট ইন দ্য হিস্ট্রি অভ কামান্ডো ট্রেনিং। ...আ ম্যান ক্যান নট বী আ তাহের। হী ইজ আ সুপার, এক্সেপশনাল'।
তাঁর সার্টিফিকেটে লেখা ছিল, তিনি পৃথিবীর যে কোন দেশের, যে কোন সেনাবাহিনীর সঙ্গে, যে কোন অবস্থায়, অনায়াসে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে সক্ষম।

১৯৭১ সাল। রক্তাক্ত রণাংগন। তিনি প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে পাকিস্তান আর্মি থেকে পালিয়ে আসেন। অমিত সাহস নিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। একটাই স্বপ্ন, সিংহাবলোকন ন্যায় তাহেরের, স্বাধীন দেশ।
পাক কমান্ডাররা তাহের সম্বন্ধে তাদের সৈনিকদের হুশিয়ার করে দিত, 'ইয়াংম্যান, বী আ্যওয়ার অভ তাহের। হী ইজ আ ভলকানো, আ হানড্রেড পার্সেন্ট এক্সামপল, প্রফেশনাল। সো সেভ ইয়্যুর স্কীন'।

তাহেরের বাঁ পায়ে গুলি লেগে গেল, রক্ত ঝরছে বিরামহীন। চেষ্টা করেও থামাননো যাচ্ছে না। তাঁকে উদ্ধার করতে ভারতীয় বাহিনীর সদস্যরা দ্রুত হেলিকপ্টার নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌছল।
উদ্ধারকারি মিত্র বাহিনীর অফিসারকে তাহের হা হা করে হাসতে হাসতে বললেন: 'এরা কী যুদ্ধ করবে, এরা আমার মাথায়ই গুলি লাগাতে পারেনি। বাংলাদেশ স্বাধীন হবেই, এরা আটকাতে পারবে না, এদের এই ক্ষমতাই নাই'।

পরবর্তীতে এই তাহেরই বাংলার সাধারণ হাজার-হাজার কৃষকদের ট্রেনিং দিয়ে একেকজনকে দুর্ধর্ষ যোদ্ধারূপে গড়ে তুলেছিলেন। এই বিষয়টা অন্য কারও মাথায় খেলেনি। পরবর্তীতে দেখা গেছে, এই কৃষক-মজুর এঁরা একজন সৈনিকের চেয়ে অনেক ভালো করেছেন। কারণ এঁদের বুকে ছিল একরাশ দুর্দান্ত রাগ- চোখের সামনে এদেঁর কারও প্রিয়মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল, কাউকে শারীরিককভাবে অপমান করা হয়েছিল, ধর্ষণ করা হয়েছিল।
... ... ...
এ অভাবনীয়, অভূতপূর্ব! তাহের এমন পিতা-মাতার সন্তান যারা তাঁদের ৭ পুত্র এবং ২ কন্যাকে মুক্তিযুদ্ধে পাঠিয়েছিলেন। এদের মধ্যে কর্নেল তাহের বীর উত্তম, তাঁর ভাই আবু ইউসুফ বীর বিক্রম, শাখাওয়াত হোসেন, ওয়ারেসাত হোসেন বীর প্রতীক।
হায় তাহের, হায়- তোমাকে ধারণ করার ক্ষমতা আমাদের কখ-খনো হবে না! এমন একজন অকুতোভয় মানুষকে, একটা স্বপ্নকে, সামরিক আদালতে বিচারের প্রহসনের নামে ফট করে মেরে ফেলা আমাদের দেশেই সম্ভব। আসলে ভীরু, কাপুরুষদের এটা করা ব্যতীত উপায় ছিল না। তাহেরকে বাঁচিয়ে রাখার উপায় ছিল না। আফসোস, এই দেশ তার সেরা সন্তানদের কখনই ধরে রাখতে পারে না- অভাগা দেশ!
এ স্রেফ খুন! কর্নেল তাহেরকে খুন করা হয়েছিল। এবং এই খুন করার ধরন, নমুনা দেখে আমি বিস্মিত হই- গা বাঁচিয়ে কী চমৎকার ভঙ্গিতেই না খুন করা যায়! অনর্থক রসু খাঁকে আমরা দোষ দেই!

তাঁকে যেভাবে ফাঁসি দেয়া হয় প্রকারন্তরে এ খুনেরই নামান্তর। তাঁর ডেথ ওয়ারেন্ট ইস্যু করার মাত্র ৩ দিনের মাথায় ফাঁসি কার্যকর করা হয়। অথচ জেল কোড অনুযায়ী ডেথ ওয়ারেন্ট ইস্যুর ২১ দিন আগে বা ২৮ দিন পরে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার বিধান নাই।

একজন কথিত জল্লাদ জনাব মোঃ সিরাজউদ্দিনের সাক্ষৎকার নেয়া হয়েছিল, মিনার মাহমুদের বিচিন্তা পত্রিকায়:
"প্রশ্ন: ফাঁসির মঞ্চের কোনও ব্যক্তির আচরণ কি আপনার হৃদয় ছুঁয়ে গেছে? যদি যায়, তবে সেই ব্যক্তিটি কে?
জল্লাদ সিরাজউদ্দিন: কর্ণেল তাহের। ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়াইয়া তিনি সহজভাবে কথা বলেছেন। একটা বিপ্লবী কবিতা পইড়া শোনাইছেন (জন্মেছি মৃত্যুকে পরাজিত করব বলে...)। আশ্চর্য! তিনি নিজের হাতে যমটুপি পরছেন। নিজেই ফাঁসির দড়ি নিজের গলায় লাগাইছেন। আমার মনে হয় ফাঁসির মঞ্চে এমন সাহস দুনিয়ার আর কেউ দেখাইতে পারে নাই।"

কাজলা গ্রামে, অযত্মে অবহেলায় শুয়ে থাকেন এই অগ্নিপুরুষ।
এ প্রজন্ম তাহেরকে কি কিছুই দিতে পারেনি, কি জানি! কিন্তু যখন দুর্বিনীত রাগী যুবকের উদ্ধত মাথা নুয়ে বুক ছুঁয়ে যায়, চোখ ভরে আসে জলে। চট করে মুখ ঘুরিয়ে নিলেই হয় কিন্তু এ লজ্জা মুছে ফেলার চেষ্টা করে না সে। জলভরা চোখে তাহেরের অদেখা স্বপ্ন তাঁকে ছুঁয়ে যায়। অস্ফুটে বলে, কমরেড, আমরা কী তোমায় স্পর্শ করতে পারি?
এ-ও কি কম পাওয়া, কিছুই না?

তাহেরের মত মানুষকে মেরে ফেলা যায় না, এঁরা খোলস বদলান কেবল। একটা স্বপ্নকে খুন করা যায় না, স্বপ্ন ফিরে আসে বারবার।
বাংলার এমন দামাল সন্তান বারবার ফিরে আসে এই ধান-শালিকের দেশে, মার কাছে। দুঃখি মা-টা হাহাকার নিয়ে অপেক্ষায় থাকেন, কবে ফিরবে তার প্রিয় সন্তান...।

Friday, June 29, 2007

মুক্তিযুদ্ধে, তাহের- স্যালুট ম্যান

তখনকার পাকিস্তান আর্মির এক বিস্ময়কর কমান্ডো মেজর আবু তাহের। স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে, তিনি পাকিস্তান থেকে পালিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন।

বাংলা একাডেমীর দলিলপত্রের সূত্রমতে, লেঃ কর্নেল (অবঃ) আবু তাহের বলেন: জুলাই মাসের ২৫ তারিখ বাংলাদেশের পথে ভারতে রওয়ানা হই। আমার সঙ্গে ছিলেন মেজর জিয়াউদ্দিন, ক্যাপ্টেন পাটোয়ারী, মেজর মঞ্ছুর ও তার স্ত্রী ছেলেমেয়ে এবং ব্যাটম্যান।
২৭শে জুলাই দিল্লী এবং আগস্ট মাসের মাসের প্রথম সপ্তাহে মুজিবনগর পৌঁছাই। আগস্ট মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল এম, এ, জি ওসমানী আমাকে ১১ নং সেক্টরের দায়িত্ব দেন।


১৫ আগস্ট আমি মাত্র ১৫০জন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে সন্ধ্যার দিকে কামালপুরে পাক আর্মির শক্ত ঘাটি আক্রমণ করি। আমাদের অস্ত্র বলতে তখন ছিল কেবলমাত্র কয়েকটা এল এম জি, রাইফেল এবং কিছু স্টেনগান! যুদ্ধ চলে ২ ঘন্টা। আমাদের আক্রমণে পাক আর্মির ১৫/১৬ জন নিহত হয়, আর আমাদের মুক্তিযোদ্ধা আহত হয় ১৫ জন।

১১ নং সেক্টরের কমান্ড এবং দায়িত্ব পাওয়ার পর আমি লক্ষ করলাম, মুক্তিযোদ্ধারা বিশৃঙ্খল এবং বিপর্যস্ত , হতাশ। আমি দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামের জন্য বাহিনীকে পুনর্গঠিত করা শুরু করলাম। সম্মুখসমর বাদ দিয়ে গেরিলা পদ্ধতিতে আক্রমণ চালাবার নির্দেশ দিলাম।

সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আমার সেক্টরে প্রায় ২০ হাজারের মত মুক্তিযোদ্ধা কাজ করছিলেন। …এখানে একটি মুক্তিবাহিনী ট্রেনিং ক্যাম্প খুলি এবং ট্রেনিং দেয়া শুরু করি। নভেম্বর মাস পর্যন্ত সবার হাতে অস্ত্র না গেলেও ১০ হাজারের মতো মুক্তিযোদ্ধা প্রশিকক্ষণপ্রাপ্ত হয়েছিলেন।

…আমার হেডকোয়ার্টারে কেবলমাত্র সাধারণ কৃষকদের নিয়ে আলাদা ট্রেনিং ক্যাম্প খুলি। এইসব সাধারণ কৃষক পরবর্তীতে যুদ্ধেক্ষেত্রে যে কোন সামরিক ট্রেইন্ড সৈনিকের চাইতেও বেশী দক্ষতা প্রদর্শন করেছিলেন। এর কারণ সম্ভবত এই জন্য- ওইসব অধিকাংশ কৃষক ছিলেন পাক আর্মির দ্বারা অত্যাচারিত। তাঁরা পুড়ছিলেন প্রতিহিংসার আগুনে।

…১৩ নভেম্বর, ৫টি কোম্পানী নিয়ে ভোর ৩টায় কামালপুরে আমাদের তীব্র আক্রমনে পাকসেনাদের ১ জন মেজরসহ ২টি কোম্পানী আমরা পুরাপুরি নিচিহৃ করে দেই।
আমরা জয়ের আনন্দে অধীর। তখন সকাল ৯টা। গুলির আঘাতে আমি গুরুতররূপে আহত হই। আমার ১টি পা নষ্ট হয়ে যায় ।
আমার অনুপস্থিতিতে স্কোয়াড্রন লীডার হামিদুল্লাহ সেক্টরের দায়িত্ব হাতে নেন।
 

(সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ, ১০ম খন্ড, পৃষ্ঠা: ৬৪০-৬৫৭)

*কর্নেল তাহের সম্বন্ধে বিস্তারিত জানা যাবে এই সাইটে:
http://www.col-taher.com/

**তাহেরকে নিয়ে আরও কিছু লেখা। কর্ণেল তাহের তোমাকে কি স্পর্শ করতে পারি: http://www.ali-mahmed.com/2009/01/blog-post_8805.html 
WhatsApp