Search

Sunday, November 1, 2026

একজন তোফাজ্জল এবং এক টুকরো কাপড়!

আমরা, যখন যে সরকার থাকে তাকে গালি দেই! এ সত্য অধিকাংশ সময়ই এরা গালি খাওয়ারই কাজ করেন। সরকার-এ বা ক্ষমতায় গেলে এদের মাথা এলোমেলো হয়ে যায়! 

কিন্তু আমরা নিজেরা কী! আপাদমস্তক অমানুষ, এই কাতারে আমি নিজেও!

তোফাজ্জল হোসেনকে মনে আছে আপনাদের? আহা, তাঁকে ভুললে হবে না তো! হাসিখুশি একটা ছেলে—সে হতে পারত আপনার-আমার সন্তান!

দেখেন, কেমন একটা বেকুবের বেকুব—একটা শিশু-বাচ্চার মত সালামের ভঙ্গি করে! পাগলু একটা!

কোন-এক মেয়ের চক্করে এর মানসিক ভুবন এলোমেলো হয়ে যায়। আমাদের এই দেশের মত দেশ এই পৃথিবীতে আর নাই—বড় বিচিত্র এই দেশ! এখানে মানসিক ভারসাম্যহীন একটা মানুষকে আমরা অবলীলায় পাগল আখ্যায়িত করি এবং এদের সঙ্গে আমরা যে-আচরণ করি পৃথিবীর কোথাও এমন অমানবিক আচরণ করে না। (আমাদের বাপ-দাদা-পরদাদার দেশ ভারত/পাকিস্তানকে গোণায় ধরছি না)! আলোর মশাল একজন লেখকও ফট করে এদেরকে পাগল বলে দেন...!

যাই হোক, তোফাজ্জল মানসিক ভাবে অসুস্থ ছিলেন। বাড়ি থেকে প্রায়ই উধাও হয়ে যেতেন—এদিক-সেদিক ঘোরাঘুরি করতেন। একদা...!

তিনি অন্যমনষ্ক ভঙ্গিতে হাঁটতে-হাঁটতে ঢুকে পড়েন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে। আমাদের গর্বের জায়গা—প্রাচ্যের অক্সফোর্ড! যেখানে, এই সমস্ত জায়গায় আমাদের সন্তানদেরকে পাঠাই উচ্চশিক্ষা নিতে। মানুষ হতে...! 

আমরা, বাবাদের, আমাদের তো বড়-বড় ডিগ্রি নেই—আমরা যে মানুষ হতে পারিনি, গো! এখন জান্তব স্বপ্ন আমাদের—আহা, আমাদের সন্তানেরা বড় ডিগ্রি নিয়ে মস্ত মানুষ হবে। তাই খেয়ে, না-খেয়ে কত অমর্যাদা সহ্য করে আমরা বাবারা, আমাদের সন্তানদের এই সমস্ত বড়-বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠাই। 'খোদা-না-খাস্তা', কোন-একদিন সেই মানুষ বানাবার কারখানায় আমাদের যাওয়া হলে; আমাদের গায়ের কাদামাটির গন্ধ লুকিয়ে হাঁটতে-হাঁটতে কাঁপি! আহা, আমরা যা হতে পারিনি আমাদের সন্তানরা তা হয়ে দেখিয়ে দেবে—একেবারে তাক লাগিয়ে দেবে!

এই আপনার-আমার, আমাদের সন্তানেরা তোফাজ্জলকে চোর সন্দেহে স্ট্যাম্প দিয়ে পেটাতে থাকে, পেটাতে থাকে; একের-পর-এক! ডাইনিংয়ের অখাদ্য খেয়েও কী প্রাণশক্তি এদের গায়ে!

এই পেটানোটাকে এরা শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যায়। তোফাজ্জল নামের একজনকে পেটাতে ২৮ জন যুক্ত হয়! রিপিট ২৮ জন! একজনকে পেটাতে ২৮ জন! আহা, এমন চাঁদরাত বছরে কয়টা আসে?

এরা কারা, কোত্থেকে আসে? আহা, এরা যে আমাদেরই লোক...!  

এটা এরা রপ্ত করেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে যুক্ত হয়ে। দল-নেতার প্রতি আনুগত্য এদেরকে শিখিয়েছে কেমন করে ভাই-সহপাঠির প্রতি চরম নির্মমতা দেখানো যায়। চোখের পলক না-ফেলে মেরে ফেলা যায়!

এদের আবার দয়ার শরীর—এরা তোফাজ্জলকে ভাত খেতে দেয়। হায় ভাত-হায় পেট-হায় পেটের আগুন! 

একজন মানসিক অসুস্থ, চরম নির্যাতিত মানুষও বোঝে সালুন-মাখা সাদা-সাদা ভাত! ভাতে ধোঁয়া উঠে না, লাশের মত ঠান্ডা—তাতে কী আসে যায়? আহারে, আহারে জীবন! এই মানুষটা যদি জানত, যদি জানত এটাই তার শেষ খাবার—লাস্ট সাপার!
আমরা এই ভিডিও-ক্লিপে দেখতে পাই তোফাজ্জল যখন খাচ্ছিল তাঁর শেষ খাবার—আশেপাশের লোকজনেরা কী স্বাভাবিক, কী উল্লসিত! 

খাওয়ার পর তাঁকে আবার পেটানো শুরু হয়। ৪ ঘন্টা লাগিয়ে তাঁকে পেটানো হয়েছিল।
তাঁর বোনের ভাষায় একটা সাপকেও এভাবে কেউ পেটায় না!

এই ২৮ জনের মধ্যে অধিকাংশই পলাতক! আহারে-আহারে, তোফাজ্জলের বিষয়টা যদি সামনে না-আসত তাহলে এই ২৮ জনের মধ্যে অনেকে আগামীর এসপি-ডিসি-মানবতাকর্মী হতেন। বা কেউ বাইরে থেকে আরও বড় ডিগ্রি নিয়ে এসে এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়াতেন। কে জানে, হয়তো মানবতা নিয়ে পড়াতেন! 

জানেন, এই তোফাজ্জলের উপর আমার না খুব রাগ হয়—রাগে গা জ্বলে যায়! ভাবুন দেখি, এই একজন তোফাজ্জল কতগুলো শিক্ষিত ছেলের ক্যারিয়ার নষ্ট করে দিল! ইশ-শ, আমাদের মত যাদের ক্যারিয়ার নাই তারা এর মূল্য বুঝবে বুঝি!
এই তোফাজ্জল নামের মানুষটা আমাদের লজ্জাস্থান ঢাকার জন্য এক টুকরো কাপড়ও রাখেনি! এটা একটা কথা! হুমায়ূন আহমেদের ভাষায় বলি, পাগল তো—কাপড় নিয়ে সোজা দৌড় দিয়েছে!

আমি প্রায়শ ভাবি, পরম করুণাময় এই দেশে আলো-বাতাস-বৃষ্টি কেন দেন, কী কারণ? না-দিলে আমরা তাঁকে পরম করুণাময় বলব না, কেবল এই কারণে?

দূর-দূর, আসলে এঁদের, এই মানুষগুলোর কী গতি হবে কেবল এই কারণে পরম করুণাময়  তাঁর করুণার সবগুলো দরোজা খুলে রাখেন...!  

WhatsApp