Search

Sunday, November 17, 2013

অতুলনীয় ভাল লাগা...

কিছু-কিছু ভাল লাগা আছে যার সঙ্গে কীসের তুলনা চলে এটা আমি জানি না। মনটা কী কেবল অন্য রকম হয়! আহা, ভাল লাগার ফেনায় যে মাখামাখি হয়ে থাকা- কেবল মনে হয় এমন ফেনায় কেবল গা ভাসিয়ে থাকা।

রিকশাচালক লিটনকে নিয়ে একটা লেখা লিখেছিলাম, যিনি ৫০ হাজার টাকা পেয়েও টাকার মালিকের কাছে ঠিক-ঠিক ফেরত দিয়েছিলেন। [১]
ওই মানুষটার একটা স্বপ্ন ছিল, নিজস্ব একটা সেলুনের। আমি ওই লেখায় লিখেছিলাম, ‘...লিটন মিয়া কেবল আমাদেরকে স্বপ্নই দেখান না নিজেও স্বপ্ন দেখেন, নিজের একটা সেলুনের স্বপ্ন। লিটন মিয়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আমিই-বা কেন এই স্বপ্নটা দেখতে পারব না যে, কোনো-না-কোনো একজন হৃদয়বান মানুষ ঠিকই এগিয়ে এসেছেন লিটন মিয়ার স্বপ্ন পূরণে। লিটন মিয়ার একটা নিজস্ব সেলুন, একটা অদেখা স্বপ্ন...’!
ওই লেখার মন্তব্যের এক জায়গায় এটাও লিখেছিলাম, ‘...স্বার্থপর আমি, আমি তো এখন আর লিটন মিয়ার স্বপ্ন নিয়ে কাতর না। আমি আছি আমার স্বপ্ন নিয়ে। আহ, সেই অদেখা স্বপ্ন! লিটন মিয়ার একটা সেলুন হয়েছে। আমি সেই সেলুনে বসে চুল কাটছি। লিটন মিয়া আমার কানের কাছে অনবরত কীসব যেন বকে যাচ্ছেন। লিটন মিয়ার বিজবিজ করে বলা কথাগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যাচ্ছে! আহা, আমার চোখে যে রাজ্যের ঘুম!...”

অবশেষে লিটনের মিয়ার একটা সেলুন হচ্ছে! একজন ঠিকই এগিয়ে এসেছেন! যে মানুষটা একজন নামহীন- কারণ নাম প্রকাশে তাঁর তীব্র অনীহা।
লিটনের সেলুনের কাজ আজ থেকে শুরু হলো। যে দোকান-ঘরটা সেলুনের জন্য তিনি পছন্দ করেছেন সেই দোকান-ঘরের মালিকের সঙ্গে দোকানের জামানত এবং ভাড়ার বিষয়টা চুড়ান্ত হলো। এখন বাকী থাকছে দোকান সাজানোর কাজ। সেটাও সহসাই শেষ হবে এমনটাই আশা করছি।

খবরের খোঁজে পত্রিকায় এই সেলুন হওয়ার ঘোষণাটা আমরা এবারই দিয়ে দিয়েছি [২]। আশা করছি, পরের সংখ্যয় এই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দিতে পারব...। 



সহায়ক সূত্র:
১. লিটন, স্যালুট...: http://www.ali-mahmed.com/2013/10/blog-post_7.html
২. খবরের খোঁজে: http://www.khoborer-khoje.com/2013/11/blog-post_15.html   

Wednesday, November 13, 2013

অপেক্ষা!

গতকালের লেখাটার পর [১] ইনবক্সে আলাদা করে অনেকে জানতে চেয়েছেন, ‘ওল্ড হোম’ সম্বন্ধে। কেউ-কেউ সদাশয় কিছু কথাও বলেছেন...।
অন্যত্র এটা নিয়ে বলেছি তবুও একটু বলি এই বিষয়ে। আজ থেকে ৫ বছর আগে ‘ওল্ড হোম’ করার চিন্তাটা এসেছিল মাথায়। ওসময় কিছু টাকাও ছিল আমার হাতে। কিন্তু ছোট্ট একটা ‘ওল্ড হোম’ চালাতে প্রতি মাসে যে টাকা লাগে ওই হিসাবে অন্তত দু-তিন বছরের টাকা হাতে না-নিয়ে এটা আমি শুরু করতে চাইনি।
আমার যুক্তিটা ছিল এমন, তীব্র আবেগ নিয়ে শুরু করলাম কিন্তু কয়েক মাস চলার পর টাকার অভাবে এটা বন্ধ করে দিতে হলো। তখন? কিছু মানুষকে স্বপ্ন দেখিয়ে আবারও দুঃস্বপ্নের মাঝে ঠেলে দেয়া। এ তো অন্যায়, মহা অন্যায়!
‘ওল্ড হোম’ করাটা যতটা সহজ মনে হয় আমার কাছে কিন্তু ততোটা না। নিয়মিত টাকার যোগানটা মূখ্য একটা বিষয় তো বটেই তাছাড়া লোকের ব্যাকআপটাও জরুরি। একটা উদাহরণ দেই। ধরা যাক, আমি একটা হোম চালাই। আমি মারা গেলাম- তো, হোম কী বন্ধ হয়ে যাবে? না- বিকল্প একজনকে অবশ্যই থাকতে হবে যে নিমিষেই আমার জায়গায় চলে আসবে।

যাই হোক, পরে সাদিক আলম বললেন, চলেন, আমরা আপাতত একটা স্কুল করি- পরে টাকা হলে নাহয় ‘ওল্ড হোম’ করা যাবে। পরামর্শটা আমার মনে ধরল। তো স্কুল শুরু করা হলো। প্রথম স্কুলটা খোলা হয়েছিল মেথরপট্টিতে, পরেরটা অন্ধপল্লীতে, এর পরেরটা স্টেশনে। যাক, সে ভিন্ন প্রসঙ্গ...।

কিন্তু সেই টাকার যোগানও আর হলো না আর ওল্ড হোমও হলো না। অদেখা এই স্বপ্নটা স্বপ্নই থেকে গেল। আমি জানি, আমৃত্যু এই স্বপ্নটা তাড়া করবে। ভুলে যাই কিন্তু প্রায়শ এই না-করতে পারার বেদনাটা পাক খেয়ে উঠে। যখন ওই বয়স্ক মহিলাকে দেখেছিলাম, [২] তখন। এমন ঘটনাগুলোর যখন মুখোমুখি হই তখনই পুরনো ক্ষতগুলো দগদগে হয়ে উঠে।

আজ আবারও কষ্টটা ফিরে আসে। একটা মানুষকে প্রায়ই দেখতাম স্টেশনে শুয়ে থাকতে। আমার ধারণা ছিল মানুষটা অলস টাইপের তাই শুয়ে থাকেন। আমি একটা আস্ত নির্বোধ- আমার ধারণাটা ভুল ছিল। খোঁজ নিয়ে জানা গেল এই মানুষটা কয়েক মাস ধরেই এভাবে পড়ে আছেন। জানা গেল, অসুখ। অসুখটা কি এটা কেউ গুছিয়ে বলতে পারলেন না।

মানুষটার সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তাঁর ডান পাশটা অবশ- প্যরালাইসিস। মানুষটার মধ্যে আলাদা একটা মর্যাদা বোধ আমার চোখ এড়ায়নি! কারো সঙ্গে কথা বলতে তাঁর বিশেষ তেমন আগ্রহ নেই। কেউ দিলে খান, না-দিলে উপোস পড়ে থাকেন। আমি আমার সাধ্যমত এটা-সেটা বলে মানুষটাকে খানিক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করি। তিনি কথার ফাঁকে এমন কিছু ইংরাজি শব্দ বলছিলেন যাতে মনে হয় মানুষটা বেশ শিক্ষিত। আজ কেবল অল্পই জানা গেল। বাড়ি কোথাও বলতে চান না কিন্তু কথায় সিলেটের ভাষার টান। একবার কেবল বললেন, তাঁর ৩ ছেলে, ছেলেরা সবাই লন্ডনে থাকে- সন্তানের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলেই রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলেন: তাদের আমি ত্যাজ্য করছি।

আমি তাঁকে বলি, আপনার ছেলেদের কাছে ফিরে যেতে চান না? তাঁর উত্তর, না। আমি আবারও বলি, কিন্তু এভাবে... তাহলে আপনি...কীসের অপেক্ষায়...মানে আপনি...? তিনি স্পষ্ট করে বলেন, মৃত্যুর...।

১. https://www.facebook.com/ali.mahmed1971?ref=tn_tnmn
২. http://www.ali-mahmed.com/2010/05/blog-post_26.html

আলোর মশাল হাতে মানুষটা

ফি রোজ নিয়ম করে স্টেশনে যাওয়া এখন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। আমার কাজের অনেক উপকরণ পেয়ে যাই এখানে। অবশ্য ’আমার কাজ’ কথাটা খানিকটা ভুল বললাম, লোকজনের ভাষায়, অকাজ। অবশ্য আমি যে কাজের লোক এমনটা আমি নিজেও মনে করি না- অকাজের লোক হয়েই যে আমার আনন্দের শেষ নাই। আহা, এই দুনিয়ায় সবাই কাজের লোক হয়ে গেলে তো ভারী মুশকিল!

প্ল্যাটফরমে একজন বয়স্ক মহিলাকে পড়ে থাকতে দেখতাম। চারপাশে শত-শত মাছি ভনভন করছে, হাঁ করে থাকা মুখেও! কারণটা অনুমান করতে পেরেছিলাম, এই মানুষটার উঠে বাথরুমে যাওয়ার শক্তি ছিল না।
পূর্বে এমন দৃশ্য দেখিনি এমন না কিন্তু তবুও এই দৃশ্য আমাকে বড়ো অপরাধী করে দেয়। সে সময় মাথায় সব জট পাকিয়ে যায়। তখন নিজের মাথার উপর ছাদটাকে একজন স্বার্থপর মানুষের ছাদ মনে হয়। নিজেকে স্রেফ একটা পোকা মনে হয়। ছোট্ট একটা ওল্ড হোম করতে কোটি-কোটি টাকা লাগে না। অথচ একটা ওল্ড হোম করার স্বপ্ন দেখে দেখেই এই জীবনটা পার করে দেব- একদা অবসান হবে অর্থহীন এ জীবনের...!

এই মানুষটার যে তীব্র শ্বাসকষ্ট এটা একটা ছোট্ট বাচ্চা দেখলেও বুঝবে। এই বয়স্ক মানুষটার সঙ্গেও কেউ নাই যে হাসপাতালে ভর্তি করার চেষ্টা করা হবে। এর পূর্বে একজনকে হাসপাতালে ভর্তি করে বিস্তর ঝামেলার মুখোমুখি হয়েছিলাম যার রেশ এখনও কাটেনি! জনে-জনে আমাকে জবাবদিহি করতে হয়েছিল।
যাই হোক, একজন ডাক্তারকে বলেকয়ে শ্বাসকষ্টের ওষুধের ব্যবস্থা করা গেল। কিন্তু এমন অবস্থার একজন মানুষকে ওষুধ, ভাতের ব্যবস্থা করে দিলে, নিয়ম করে খাওয়াবেটা কে? একজন দয়ার্দ্র মহিলাকে পাওয়া গেল যিনি পরম মমতায় এই মানুষটাকে ওষুধ খাওয়াতেন, ভাত মুখে তুলে খাইয়ে দিতেন। এই ব্যবস্থার পর খানিকটা হাঁফ ছেড়ে বাঁচা গিয়েছিল।


যথারীতি কাল গেছি স্টেশনে। যে জায়গাটায় ওই বয়স্ক মহিলাটি পড়ে থাকতেন সেই জায়গাটা শূন্য! এর আগের দিন একজন চালবাজ হকারের মুখে শুনেছিলাম, এই মানুষটাকে নাকি শ্রীমঙ্গলের ট্রেনে তুলে দেয়ার শলা করা হচ্ছে। আমি রাগি গলায় বলেছিলাম, এঁর তো পরিবারের কেউ আছে এমনটা শুনিনি, তা শ্রীমঙ্গলে এর দায়িত্ব কে নেবে, তুমি?
তো, আমার মনে হলো কেউ ট্রেনে তুলে দায় সেরেছে। কিন্তু খানিক দূরেই দেখলাম একটা মানুষের শরীর, মুখসহ ঢাকা। আমার বুকটা ধক করে উঠে! অন্য একজন মহিলাকে বললাম, মুখের চাদরটা সরান তো। আমার অনুমান নির্ভূল। এটা সেই মহিলাই! মরে গেছেন, নিজেকে এবং আমাদের সবাইকে বাঁচিয়ে দিয়ে।

সব কেমন এলোমেলো হয়ে যায়- কী করব এখন? এর পরের অংশটা যে অসম্ভব জটিল। এখন এখান থেকে অতি দ্রুত সরে পড়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ। কিন্তু আমার মস্তিষ্কের একটা অংশ হা হা করে হেসে বলছে: পালাবি কোথায়? বটে, বটে রে, তোকে কে বলল তুইও কোথাও-না-কোথাও এমন করে পড়ে থাকবি না, বেওয়ারিশ লাশ হয়ে।
আহা, বেচারা মস্তিষ্ককে কেমন করে বোঝাই আমার মত দু-পাতা ’ল্যাকাপড়া’ জানা মানুষদের এই সব ক্ষেত্রে চট করে সরে পড়ারই নিয়ম। আর কার সহায়তাই-বা চাইব? ওরাও যে আমার মতই ’ল্যাকাপড়া’ জানা মানুষ- ওরা যে আমার নির্বুদ্ধিতায় ভারী বিরক্ত হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই! হলোও তাই! আমার পরিচিত একজন পত্রিকা পড়ছিলেন, তাকে বলার পর তিনি মুখ না-তুলেই বললেন, আরে, এইটা তো জিআরপির দায়িত্ব।
দেখো দিকি কান্ড, জাতীয় ’পরতিকায়’ যে দেশ নিয়ে কত্তো বড়ো বড়ো সংবাদ- এই ছোট্ট সংবাদে মাথা ঘামাবার সময় কোথায় তার!
একজন সহৃদয় জিআরপি বললেন, আপনি এমনিতে কিছুই করতে পারবেন না। স্টেশন মাস্টার মেমো না-দিলে কেউ এই লাশ ছোঁবে না। কারণ নিয়মমাফিক কাজ শুরু করতে হবে, পোস্টমর্টেম হবে...। আমি স্টেশন মাস্টারের খোঁজে গেলাম, অফিসে পাওয়া গেল না। এখানে-ওখানে স্টেশন মাস্টারকে খুঁজছি...!
 

যেখানে মৃতদেহটা রাখা ওখানে ফিরে এসে আমি হতবাক-বাক্যহারা! একজন মানুষ কাফনের কাপড় এবং আনুসাঙ্গিক জিনিসপত্র বগলে চেপে ডোমের সঙ্গে বেদম হইচই করছেন: ’এক্ষণ গিয়া কবর খুঁড়বি, এক্ষণ, এই নে টেকা’।
মানুষটা পাগলের মত এদিক-ওদিক দৌড়াচ্ছেন। একবার একে ধরছেন, আরেকবার ওকে। মানুষটার কর্মকান্ড দেখছি, দু-চোখ ভরে।

এরিমধ্যে এই মানুষটাই মৃতদেহকে গোসল করাবার জন্য কিছু মহিলাকেও যোগাড় করে ফেলেছেন। মানুষটার অফুরন্ত প্রাণশক্তি- তাঁর গতির সঙ্গে তাল মেলাতে আমার ঘাম ছুটে যায়। মানুষটা ণিকের জন্যও স্থির থাকছেন না! পানি লাগবে, পর্দার জন্য কাপড় লাগবে সবই এই মানুষটার কণ্যাণে নিমিষেই হাজির হচ্ছে। কেবল চোখ দিয়ে দেখা ব্যতীত আমার কোনো কিছুই করার অবকাশ নেই।

যখন একটা পর্দা ঘিরে রেললাইনের পাশে শেষ গোসল করানো হচ্ছে ঠিক তখনই সেই লাইনেই একটা গাড়ি আসার সময় হয়ে গেছে। ভারী বিপদ! কিন্তু এই মানুষটার দেখি সবই নখদর্পণে, কিছুই চোখ এড়ায় না। মানুষটার আবার দৌড়, মাস্টারকে বলে, মাইকিং করে, গাড়ি আসার লাইনটা বদলে দিলেন। এই লাইনে গাড়ি না-এসে অন্য একটা খালি লাইনে আসবে।
আমি ঘোর লাগা চোখে কেবল দেখে যাই। এক ফাঁকে আমি মানুষটাকে বলি, ’আসেন, একটু চা খাই’। আসলে চা খাওয়াটা মূখ্য না, দু-মিনিটের জন্য হলেও এই মানুষটাকে কথা বলার জন্য পাওয়াটা আমার জন্য বড়ো জরুরি। কারণ আমার বোঝা প্রয়োজন এই মানুষটার সমস্যাটা কোথায়? ভিড়ের মাঝে অন্য রকম মানুষ দেখলে বিভ্রান্তি লাগে, অস্বস্তি হয়; নিজেকে বোকা-বোকা মনে হয়।


চা খেতে খেতে কথা হয়, হৃদয় খান নামের এই মানুষটার সঙ্গে। চার বছর ধরে তিনি স্টেশনের পাবলিক টয়লেট চালান অথচ আমি মানুষটাকে চিনি না। আহা, চিনব কেমন করে? আমি যে দু-পাতা ’ল্যাকাপড়া করা’ মানুষ!
এই বেচারি মহিলাকে কাটাছেঁড়া করে কী আর হবে তাই তিনি জিআরপির সেকেন্ড অফিসার মুখলেছুর রহমানকে বলেকয়ে রাজি করিয়েছেন পোস্টমর্টেম না-করেই যেন দাফনের ব্যবস্থা করা হয়। আরও কীসব যেন বলছিলেন আমি আসলে মনোযোগ দিয়ে তাঁর কথা শুনছিলাম না।
ক্ষণিকের জন্য আমি চোখ বন্ধ করে রেখেছিলাম। কেবল মনে হচ্ছিল, চারদিকে নিকষ অন্ধকার- আমি যে আমাকেই দেখতে পাচ্ছিলাম না! কেবল দৃশ্যমান হয় মশাল হাতে একটা মানুষ দাঁড়িয়ে। ভাগ্যিস, মশালের আলো ছিল নইলে চিনতেই পারতাম না যে মশাল হাতের মানুষটা, হৃদয় খান...।

Wednesday, November 6, 2013

ধন্যবাদ শফিক রেহমান, আপনার পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য


“...১৭ ও ১৮ জুলাই ২০১০-এ নিউ ইয়র্কে আমেরিকা-বাংলাদেশ-কানাডা কনভেনশন (সংক্ষেপে এবিসি কনভেনশন):
'প্রথমেই আমি এবিসি কনভেনশনের আয়োজকদের ধন্যবাদ জানাতে চাই এই রকম একটি বিরাট আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বাংলাদেশের এক নেড়িকুকুরকে নিমন্ত্রণ করার জন্য। থ্যাংক ইউ। ঘেউ ঘেউ।...।" -শফিক রেহমান



বিশ্বের বিখ্যাত-আলোচিত-ক্ল্যাসিক, মুভি, গান, বই, লেখা সম্বন্ধে যারা খোঁজ রাখেন তাদের অন্যতম শফিক রেহমান। যার রস বোধ তীব্র, প্রখর, অতুলনীয়...।
এ দেশে যে অল্প ক-জন আছেন, লেখক বানাবার মেশিন—তাঁদের মধ্যে অন্যতম, শফিক রেহমান! এমন একটা মানুষ নিজেকে ‘নেড়ি কুত্তা’ বলে দাবী করলেই মেনে নেয়াটা কতটা যৌক্তিক হয় এ প্রশ্নটা থেকেই যায়?
অবশ্য এও সত্য, এই মানুষটাই যখন যাযাদিন সাপ্তাহিকে ভিনসেন্ট পিউরিফিকেশনের নামে তিনি অতি কুৎসিত রসিকতা করতেন [১] তখন মানুষটার রুচিবোধ নিয়ে ঘোর সন্দেহ দেখা দিত। রসিকতা যখন একটা সীমা ছাড়িয়ে যায় তখন সেটা হয়ে উঠে নিতান্তই অরুচিকর, অন্যায়!
এখানে অবশ্য তার জোকার-মার্কা পোশাকের আলোচনায় গেলাম না কারণ কখনও তিনি যদি দু-পায়ে দু-রঙের মোজা পরেন তাহলে আটকাচ্ছে কে! বা কিছু পোশাকে তাকে যে বুড়া শকুনের মতো দেখায় সেটাও এখানে বলাটা জরুরি না।  

যাই হোক, দৈনিক নয়া দিগন্তে (১ নভেম্বর ২০১৩) শফিক রেহমান ‘১০ ওভারে হাসিনা-খালেদার টেলিম্যাচের ধারাবিবরণী’ নামে দু-পৃষ্ঠাব্যাপি দীর্ঘ এক লেখা লিখেছেন।
হাসিনা-খালেদার টেলিফোন সংলাপ নিয়ে টান-টান উত্তেজনায় ছিল সমগ্র দেশ। তবে পত্রিকায় তাঁদের যে আলাপচারিতা পড়লাম এই বিষয়ে আমার নিজস্ব মত হচ্ছে, কার পাল্লা ভারী-হালকা সেই প্রসঙ্গে আমি যাব না। আমার কাছে যেটা মনে হয়েছে, এই দুজন বছরের-পর-বছর ধরে এই দেশটার অতি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন বিধায় তাঁদের উপস্থাপনা, কথার ধাঁচ, সহিষ্ণুতা, প্রজ্ঞার উল্লেখযোগ্য তেমন কিছুই চোখে পড়েনি বরং অর্থহীন-খেলো বিষয় নিয়ে অধিকাংশ মূল্যবান সময়ের অপচয় হয়েছে। যেসব নিয়ে লেখাটা আমার কাছে কেবল শব্দের অপচয়!

কিন্তু শফিক রেহমান লিখেছেন, দু-হাতে, দু-পৃষ্ঠায়! এই নিয়ে আমার গাত্রদাহ হওয়ার কারণ ছিল না কিন্তু যে হরতাল নিয়ে বারবার এখানে প্রসঙ্গ এসেছে সেটা নিয়ে তিনি টুঁশব্দও করেননি! আহ, হরতাল! বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল তখন আওয়ামীলীগ শত-শত হরতাল দিয়েছে কিন্তু বিএনপি এক সেকেন্ড আগেও ক্ষমতা ছাড়েনি। এবার বিএনপিও যখন হরতালের-পর-হরতাল দিয়েছে আওয়ামীলীগও ক্ষমতা থেকে সরে আসেনি! তাহলে এই হরতাল, এই অসংখ্য প্রাণহানি, এই বিপুল অর্থের অপচয় কী ফল বয়ে আনল?
এই শফিক রেহমানই আমাকে চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন, ‘...যাযাদি (ওরফে শফিক রেহমান) সবসময়ই হরতালের বিরুদ্ধে ছিল এবং আছে...’ [২]।
অথচ এখানে এসে গণেশ উল্টে গেল! তখন শফিক রেহমানের কাছে হরতাল হয়ে গেল করতাল! রেহমানের রহমতে খাদ্য গ্রহণ এবং বর্জন-মুখ একাকার হয়ে যায়...।

এবার তার লেখার মূল প্রসঙ্গ, ওই লেখায় তিনি কেবল একজনেরই দোষ খুঁজে পেয়েছেন—পাশাপাশি অন্যজনের কোনো দোষই খুঁজে পাননি! এবং শফিক রেহমানের কেবল একজনেরই এই যে দোষ খুঁজে পাওয়া এবং অন্যজনকে মহান বানাবার অতি হাস্যকর ভঙ্গি এতোটাই স্থুল যে এ নিয়ে আলোচনা করাটাও পন্ডশ্রম। দলের প্রতি ‘দলবাজিরও’একটা সীমা থাকে- এই মানুষটা সেটাও অবলীলায় ছাড়িয়ে গেছেন।

এই মানুষটার 'গ্রে মেটার' ক্রমশ 'ইয়েলো মেটার'-এ পরিণত হয়! ইয়েলো মেটারে মাখামাখি হয়ে পড়ে থাকা শফিক রেহমানের মত অসম্ভব প্রতিভাবান মানুষটাকে দেখে আমার মন সত্যি সত্যি বিষাদে ভরে উঠে।
বিষাদের সঙ্গে এও বলি, তার অদৃশ্য লেজ দৃশ্যমান হয়! তার নিজের সম্বন্ধে তার জোরালো দাবী (ঘেউ-ঘেউ) নিয়ে যে সন্দেহটা আমার মনে ছিল সেই সন্দেহের অবসান ঘটাবার জন্য একটা ধন্যবাদ অবশ্য শফিক রেহমান (https://www.facebook.com/ShafikRehmanPresents) পাওনা হন...।

*সেকালের পন্ডিত এবং একালের বুদ্ধিজীবী, মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। এরাই শাসনের চোখ, কান! কিন্তু এরা যখন অনাবশ্যক লেজ নাড়াতে শুরু করেন তখন সেই শাসক হন অন্ধ এবং বধির। ফল যা হওয়ার তাই হয়।
আর সেই মানুষটা শফিক রেহমান নাকি গাফফার চৌধুরী তাতে কী আসে যায়!
"সুজীবং অহিরিকেন কাকসূরেন ধংসিনা,
পকখন্দিনা পগবভেন সঙকিলিটঠেন জীবিতং।"(ধম্মপদ, মলবগগো: ১০, ২৪৪)
বাংলাটা হচ্ছে, যে খাদ্যসংগ্রহে নির্লজ্জ কাকের ন্যায় ধূর্ত, পরের অনিষ্টকারী, দুঃসাহসী, প্রগলভ এবং কলঙ্কিত জীবন-যাপন করে; তার পক্ষে জীবিকা নির্বাহ অতি সহজ।

শফিক রেহমান নিজেকে নেড়িকুকুর হিসাবে দাবী না-করে ‘ধূর্ত কাক’ হিসাবে দাবী করলেই সমীচীন হতো কারণ এই বুদ্ধবাণীর সঙ্গে অনেকাংশেই এই বুদ্ধিজীবীর মিল আছে। কেউ-কেউ বিক্রি হন ক্ষুধার জ্বালায় কিন্তু রেহমানদের মত মানুষ বিক্রি হন কুৎসিত কালো লকলকে জিবের কারণে- অতি লোভের ক্ষিধা, কেবল চোখের ক্ষিধা...।
  
সহায়ক সূত্র:

Monday, November 4, 2013

আমার ছায়া আমায় ছাড়িয়ে যায়!


আমি রেল-স্টেশনে যে স্কুলটা চালাতাম, ওটায় শিক্ষার্থীরা যে কেবল বিনে-পয়সার পড়ার সুযোগ পেত এমনটাই না এরা এখানে চেপে রাখা শ্বাস ফেলতে পারত। ওটার ছাত্র-ছাত্রী ছিল ওরাই যাদের কারো-কারো বাবা-মা নেই, যাদের অধিকাংশই স্টেশনে পানি বিক্রি করত এবং রাতে ঘুমাত ওভারব্রিজে।
ওই স্কুলটার শিক্ষক ছিলেন তাহমিনা- যিনি এই দস্যু, বিচ্ছু বাহিনীর সমস্ত আবদার হাসিমুখে সহ্য করতেন! আমার দেখা সেরা শিক্ষকদের একজন!
আমি যতগুলো স্কুলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছি এর মধ্যে এই স্কুলটার জন্য আমার ছিল আলাদা একটা টান, এখানটার পরিবেশ খুব উপভোগ করতাম। কারণ এটার কল্যাণে আমি অনেক কিছু জানতে পেরেছিলাম, শিখতে পেরেছিলাম। আমার মুখস্ত ছিল কোন বাচ্চাটা কোন দিন খায়নি, কোন বাচ্চাটা ড্যান্ডিতে-নেশায় আসক্ত!

তো, রেলের জায়গায় উদীচীর একটা অফিস অব্যবহৃত পড়ে ছিল। ওখানে অসংখ্য মাকড়সা তাদের সমস্ত পরিবার-পরিজন নিয়ে বসবাস করছিল। ওটাকে সাফসুতরো করে ওটাতেই স্কুলের কাজ শুরু করা হয়েছিল। এই বদান্যতার জন্য উদীচীর লোকজনের প্রতি আজও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। কিন্তু...। কিন্তু, এক সময় এরা বড়ো যন্ত্রণা দেয়া শুরু করলেন। এদেরই এক কর্তা হুটহাট করে মিটিং-এর নামে স্কুলের বাচ্চাদেরকে যখন-তখন বের করে দিতেন। সেদিনের জন্য স্কুলের সমস্ত কার্যক্রম পন্ড! লেখাপড়ার সুরটাই কেটে যেত...।

আমি বিকল্প একটা জায়গা খুঁজছিলাম অথচ রেলওয়ের কতো জায়গা অব্যবহৃত পড়ে ছিল, লোকজন অবলীলায় দখল করে নিচ্ছিল কিন্তু স্কুলের জন্য এক চিলতে জায়গারও ব্যবস্থা হচ্ছিল না। এমন না, বাইরে ভাড়ার কোনো ঘর পাওয়া যেত না কিন্তু এটা আমি বিলক্ষণ জানতাম, বাইরে স্কুলের জন্য ঘর পাওয়া যাবে কিন্তু স্টেশনের এই সমস্ত বাচ্চাদেরকে আর পাওয়া যাবে না- ওদেরকে ওখানে নেয়া সম্ভব হবে না। কারণ এরা স্টেশন ছেড়ে ওখানে যেতে চাইবে না।

পরবর্তীতে আমার অনুমান সত্য হয়েছিল। তিতিবিরক্ত হয়ে আমি যখন এখান থেকে স্কুলটা সরিয়ে অন্যত্র নিয়ে গিয়েছিলাম

দু-এক জন ব্যতীত তখন এখানকার কাউকে আর পাওয়া যায়নি। এই দুয়েক জনের মধ্যে অন্যতম ‘পলাশ’ নামের একটি ছেলে। যে গায়ে-গতরে অন্যদের চেয়ে আলাদা ছিল। (প্রথম ছবিটায় যার মাথা সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে!) কখনও-কখনও তাকে শিক্ষক হিসাবেও ভ্রম হতো। ছোট-ছোট বাচ্চাদের মাঝে পলাশকে বড়ো বেমানান দেখাত। আমি মাঝে-মাঝে তার জড়তা কাটাবার চেষ্টা করতাম, ’বুজঝ, পলাশ, ল্যাকাপড়ার কুনু বয়স নাই’।
পলাশ কথা খুব কমই বলত। মাথা দুলিয়ে তার সংক্ষিপ্ত উত্তর ছিল, জ্বে।

যাই হোক, এই পলাশ এই স্কুলে বেশ অনেক দিন পড়ল। তারপর একটা দোকানে বেচাবিক্রির কাজে লেগে গেল। সারা রাত দোকানদারি করে, সকালে ঘুম। একদিন স্টেশনে গেছি কি এক কাজে। পলাশকে দেখি ঘুম-ঘুম চোখে দোকান থেকে নেমে আসতে। এর টকটকে লাল চোখ দেখে আমার বুঝতে সমস্যা হয় না এ সারাটা রাত এক ফোঁটাও ঘুমায়নি!

এমনিতে প্রায়ই লক্ষ করতাম কিন্তু ভুলে যেতাম- রেলেরই করা, এই স্টেশনে পানির চমৎকার একটা ব্যবস্থা আছে, যেখানে অসংখ্য লোকজনকে হাত-মুখ ধুতে এমনকি পানি খেতেও দেখেছি। টাইলস লাগানো কিন্তু জায়গাটা ভারী নোংরা, অপরিচ্ছন্ন থাকে- খুব চোখে লাগে! আমি এমন কোনো ব্যক্তি না যে বললাম আর রেলের লোকজনেরা এটা সাফসুতরো করার আগ্রহ দেখাবে! নিরুপায় আমি, একজন কাউকে খুঁজছিলাম এটাকে ঘষেমেজে খানিকটা সাফ করার জন্য।
হাতের কাছে পলাশকে পেয়ে বললাম, ’যখন কাজ থাকব না, অবসর পাইলে এইটা একটু...’। পলাশ ছেলেটা স্বল্পভাষী, মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ’আইচ্ছা’।
কী আশ্চর্য, একটু পরই স্টেশনের কাজ শেষ করে আমি যখন ফিরে আসছি তখন চোখ বড় বড় করে দেখতে পাই সঙ্গে আরেকজনকে নিয়ে পলাশ মিয়া পূর্ণ উদ্যমে জায়গাটা ঘষাঘষি করে চকচকে করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে! ওর চোখে তখন ঘুমের লেশমাত্রও নেই! পেছন থেকে আমি যে কখন ওর ছবি তুলেছি এটা ও টেরটিও পায়নি...।

আমি প্রত্যেকটা বিষয় আমার নিজেকে দিয়ে বোঝার চেষ্টা করি। যেমন, আমি যখন লিখি তখন এটা মাথায় থাকে আমার লেখাটা যিনি পড়ছেন তার জায়গায় আমি হলে কেমন লেখা পড়তে চাইতাম? তেমনি আমি ভাবার চেষ্টা করি, পলাশের জায়গায় আমি হলে কি করতাম? সারা রাত না-ঘুমিয়ে এক্ষণই কী এই কাজটা করতাম? উত্তরটা অনেককে, এমনকি আমার নিজেকেও আহত করবে। আমি সলাজে স্বীকার যাই, না।
এখানেই পলাশ আমাকে অসম্ভব লজ্জিত করে অবলীলায় ছাড়িয়ে যায়!

আমি থাকব না, কিন্তু এই পলাশরা থেকে যাবে। আমার শবের চেয়ে তমোময় ছায়া হবে অনেক, অনেক দীর্ঘ...!

Tuesday, October 29, 2013

ওহে, কী তোমার পরিচয়...!

খুব ভালো একটা চাকরি পেয়েছি! জীব-বৈচিত্র নিয়ে কাজ-কারবার। বিছানায় লম্বা হয়ে শুয়ে টিকটিকি নিয়ে গবেষণা। হৃদয়ঘটিত জটিলতার পর [১] ডাক্তার সাহেব আমাকে এই চাকরিটা গছিয়ে দিয়েছেন। যেটার চালু নাম 'বেড-রেস্ট'।
অবশ্য বেড-রেস্টের একটা মানে বের করেছি আমি- বেড মানে বিছানাকে রেস্ট দেয়া। সোজা কথা, বিছানার উপর না-শুয়ে বিছানাকে যতটুকু সম্ভব কম কষ্ট দেয়া যায় আর কী। ভাগ্যিস, ‘লেঞ্জাওয়ালা’ ওরফে টিএনটি ফোনের বিশেষ চল নাই এখন, নইলে ঝামেলা হয়ে যেত। ডাক্তার সাহেব যখন জানতে চান, বেড-রেস্টে আছেন তো? বাস্তবে তখন আমি বাসার বাইরে। গলা একটুও না-কাঁপিয়ে অবলীলায় বলি, জ্বী, রেস্টে থাকব না মানে, বলেন কী!

যাই হোক, বৃহস্পতিবার, যে-দিন আমার সমস্যাটা হলো সেদিনই একজন খবর দিলেন হারিয়ে যাওয়া ওই মানুষটাকে নিয়ে যে লেখাটা লিখেছিলাম (সম্ভাব্য মৃত্যু!), [২] ওই মানুষটার ভাই নাকি আমাকে খুঁজছেন। নিরুপায় আমার উপায় ছিল না- হারিয়ে যাওয়া মানুষটার ওই ভাইটার সন্ধানে বের হয়েছিলাম যদিও মানুষটার ভাইটাকে আমি শেষ পর্যন্ত খুঁজে বের করতে পারিনি!

বুকে ব্যথা, ক্লান্তও লাগছিল খুব- তার উপর ব্লাডারে চাপ। মহা মুশকিল! কোথাও হয়তো বসে বিশ্রাম করা যাবে কিন্তু ব্লাডার হালকার বিষয়টা? আমাদের দেশে সবচেয়ে জরুরি বিষয়টার প্রতি আমাদের আছে সীমাহীন অসভ্য তাচ্ছিল্যতা। লোকজন কোটি টাকা খরচ করে একটা মার্কেট করবে কিন্তু একটা টয়লেট রাখবে না, রাখলেও তালা মেরে রাখবে। আজব এই দেশের লোকজন!

ঠিক তখনই আমার মনে পড়ল, এনসিসি ব্যাংকে ‘টয়লেট জোন’ নামে একটা কিছু দেখেছিলাম। এই ব্যাংকে আমার একটা একাউন্টও আছে। হাজার খানেক টাকা থাকার কথা কারণ এরচেয়ে কম টাকা থাকলে ব্যাংক গ্রাহক হিসাবে ব্যাংকিং-ব্যাংকিং খেলা থেকে বাদ দিয়ে দেয়।
ওয়াল্লা, সেন্ট্রাল এসি এই ব্যাংকের টয়লেট জোনে ঢুকে তো আমার অমায়িক বিভ্রান্তি! একটা টয়লেট ‘ভিআইপি’ একটা টয়লেট, ‘জেনারেল’। মুত্র বিসর্জন দিতে এসে একি বিপদ! কোনটায় যাই? নাহয় চোরের মত ভিআইপিটায় ঢুকলুম, বেশ। কিন্তু কাজ সেরে জিপার লাগাতে লাগাতে বের হয়ে যদি দেখি দারোয়ান বাবাজি বন্দুক তাক করে রেখেছেন, তাহলে উপায়? আবার যদি ওদিকে সব অফিসাররা সার বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকেন, তখন? দেখা গেল, এরা কামানের গোলার মত একের-পর-এক প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছেন: ঘটনা কী, আপনি কোন সাহসে নিজেকে ভিআইপি মনে করলেন আর ফট করে ভিআইপি টয়লেটে ঢুকে পড়লেন?
যাক বাবা, রিস্ক নিয়ে লাভ নেই। কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে হৃদয়ঘটিত জটিলতার কারণে কোনো একটা ভজকট হয়ে গেলে? একবার মরলে তো আর বাঁচব না! তার উপর জিপার খোলা অবস্থায় আমার লাশ আবিষ্কার হওয়াটা ভালো দেখায় না।

তো, কাজ শেষ করে আমি একজন অফিসারকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনারা আমাদের মত জেনারেল পাবলিকের জিনিস বিসর্জনে না-হয় আস্থা রাখতে পারেন না, বেশ-বেশ! তা, আপনারা ’স্টাফ’ এবং ’ক্লায়েন্ট’ নামে টয়লেট আলাদা করে ফেললেই পারতেন, এতে তো কোনো সমস্যা ছিল না কিন্তু আপনারা যে ’ভিআইপি’, ’জেনারেল’ নামে টয়লেট ভাগ করে রেখেছেন! আচ্ছা, আপনাদের ভিআইপি হওয়ার জন্য কি কি যোগ্যতা লাগে, বলুন তো? মানে, যার ডিপোজিট কোটি টাকার উপরে তিনি ভিআইপি, নাকি যে ৬ ফুটের উপর লম্বা সেই মানুষটা’?

অবশ্য আমি ভিআইপি টয়লেট ব্যবহার করলে যে দোষ হবে না এটাতে তিনি সদয় সম্মতি জানালেন। জীবনে এই প্রথম মূত্রসংক্রান্ত কেরামতিতে নিজেকে ভিআইপি ভাবতে গিয়ে আমার বিপি না-আবার বেড়ে যায় এটা নিয়েও খানিকটা চিন্তিত ছিলাম। তবে বিষাদের সঙ্গে বলি, তিনি এর ভাল কোনো সদুত্তর দিতে পারলেন না, ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শও দিলেন|

কী সর্বনাশ, মূত্র বিসর্জন দিতে এসে এ কোন বিপদে পড়লাম যে জনে-জনে এটা নিয়ে আলোচনা করতে হবে! ফিযুল কারো সঙ্গে বাতচিত না-করে ইয়ের সঙ্গেই খানিক বাতচিত করাটাই সমীচীন মনে করলাম, ওহে ..., কী তোমার পরিচয়...!

সহায়ক সূত্র:
১. হৃদয়ঘটিত...: http://www.ali-mahmed.com/2013/10/blog-post_26.html
২. সম্ভাব্য মৃত্যু!: http://www.ali-mahmed.com/2013/10/blog-post_16.html

Saturday, October 26, 2013

হৃদয়ঘটিত জটিলতা এবং এক ঝাঁক কাক!


গতকাল খানিকটা ঝামেলা হয়ে গেল। আমার বুকের বাম পাশে ব্যথা! লোকজনের গ্যাস্ট্রিক-ফ্যাস্ট্রিকের কারণে এমন ব্যথা হরহামেশাই হয়ে থাকে- এটা নিয়ে গা করার তেমন কিছু থাকে না। কিন্তু আমি জানতাম এটা গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা না। কারণ নিজের উপর নিজেই আমি ক্ষেপে গেলে নিজেকেই শাস্তি দেই। শাস্তিপর্বটা মাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। একটু আগেই সেই পর্বটা যখন সমাপ্ত হলো তখন আমি শ্বাস ফেলতে পারছিলাম না। হার্ট বাবাজি বাদ্য বাজিয়ে কূল পাচ্ছিল না। এমনিতে শরীরের উপর মাত্রাতিরিক্ত অত্যাচার হচ্ছিল তার উপর ওভার-টাইম করার কারণে ব্যাটা সম্ভবত ক্ষেপে গেল। এরপর থেকেই ব্যথাটা...।
যাই হোক, রামের যেমন সুমতি হয়েছিল আমারও তেমনি সুমতি হলো। আমি খানিকটা আঁচ করতে পারছিলাম বলেই একটা ইসিজি করালাম। এখানকার হাসপাতালে গিয়ে, ভাল ইসিজি বোঝেন এমন একজন ডাক্তারকে খুঁজে বের করলাম।

ডাক্তার সুমন নামের এই ডাক্তার যখন মনোযোগ সহকারে আমার ইসিজিটা পর্যবেক্ষণ করছিলেন তখন সামনে বসা একজন মানুষ একের-পর-এক ছাপানো কাগজ ডাক্তারের দিকে এগিয়ে দিচ্ছিলেন এবং তোতাপাখির মত কীসব বিড়বিড় করে অনবরত বকে যাচ্ছিলেন। আমার বুঝতে সমস্যা হয় না মানুষটা কোনো একটা ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধি।

আমাদের দেশের ওষুধ কোম্পানিগুলো অনেক ডাক্তারদেরকে কি দেয় এই বেহুদা প্রশ্ন না-করে, কী দেয় না সেটা জিজ্ঞেস করলে ভাল হয়। নগদ টাকার সঙ্গে এমন কোনো জিনিস নেই যা ডাক্তার সাহেবরা পান না। টিভি-ফ্রিজ-এসি এসব তো পুরনো। এবারের কোরবানির ঈদে জবাই এবং মাংস কাটাকাটির জন্য ওষুধ কোম্পানিগুলো ছুঁরিও দিয়েছে! আমি জানি না ডাক্তার সাহেবদের আন্ডারওয়্যারও ওষুধ কোম্পানিগুলো দেয় কি না? দিলে, ওষুধ কোম্পানিগুলো কেমন করে ডাক্তার সাহেবদের সাইজ নির্ধিরণের জটিল কাজটা সম্পন্ন করে থাকে?
এরা কী পূর্বেই কোনো ফর্ম পূরণ করে? যেটায় লেখা থাকে, আপনার আন্ডারওয়্যারের সাইজ কতো? আচ্ছা, ওটায় কী ওষুধ কোম্পানির লোগো-টোগো থাকে নাকি। আহা, থাকলে লাভ কী! ডাক্তার সাহেবের ওই বিশেষ ভূষণ তো বিশেষ সময়ে, বিশেষ লোকজন ব্যতীত অন্য কেউ দেখতে পাচ্ছে না কারণ তিনি তো আর সুপারম্যান না যে প্যান্টের উপর আন্ডারওয়্যার পরবেন। আমরা আমরা দেখে পুলকিত হবো!

যাই হোক, আমি আমার বুকের ব্যথা উপেক্ষা করে শীতল গলায় ওই ওষুধ প্রতিনিধিকে বললাম, ‘আমি একটা জরুরি বিষয় নিয়ে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলছি, আমার কথা শেষ হোক এরপর আপনি আপনার এই সব হাবিজাবি কথা বলবেন’।
আমার অপার সৌভাগ্য যে ওই প্রতিনিধি এবং ডাক্তার সাহেবও এটা নিয়ে উচ্চবাচ্য করেননি! করলে ঝামেলা হয়ে যেত কারণটা আমার অসুস্থতা।
তো, ডাক্তার সাহেব ইসিজি দেখে যেটা বললেন, আমার হার্টের নীচের দিকে রক্ত প্রবাহিত হতে সমস্যা হচ্ছে। একজন কার্ডিওলজিস্টকে দেখাবার জন্য।

হার্ট নিয়ে নাড়াচাড়া করেন এমন একজন মানুষকে ফোনে বিস্তারিত বলামাত্র তিনি আমাকে বললেন, ‘আপনি অতি দ্রুত একটা ওষুধের দোকানে যান। নাইট্রোগ্লিসারিন জিহ্বার নিচে দু-বার স্প্রে করে এরপর আমার সঙ্গে ফোনে কথা বলেন তখন আমি আপনাকে আরও কিছু ওষুধের নাম বলব। আর আমি পৌঁছে আপনাকে দেখে ওষুধ দেব’।
এরপর যথারীতি চিকিৎসা শুরু হয়ে গেল- ওষুধ চলার পাশাপাশি আমাকে দু-সপ্তাহ বেড-রেস্টও দেয়া হয়েছে যদিও বেডের সঙ্গে আমার যোগাযোগ তেমন বিশেষ হচ্ছে না। আরে, আমার যে হাবিজাবি কতো অকাজ! তবে সাবধানে থাকছি কারণ এটা আমার বুঝতে সমস্যা হওয়ার কথা না যে হার্ট বাবাজি আমার জন্য একটা সংকেত দিয়েছে, পাগল, তোকে ছুঁয়ে দিলাম। শ্লা, তিনি ভারী একটা 'সংকেতবাজ' হয়েছেন!
যাগ গে, লেখা প্রসঙ্গে এই সব চলে এলো। আমি যেটা বলতে চেয়েছিলাম, কারো-কারো কাছে আমরা কী কেবল একটা সংখ্যা, একটা গিনিপিগ? ডাক্তার সুমনের কাছে আমি অশেষ কৃতজ্ঞ কারণ তাঁর পর্যবেক্ষণ সঠিক ছিল, কিন্তু...। এই ইসিজিটা পর্যবেক্ষণের সময় ডাক্তারের যে পূর্ণ মনোযোগ থাকা প্রয়োজন ছিল সেটায় ওষুধ কোম্পানির ওই প্রতিনিধি অনবরত ব্যঘাত ঘটিয়েই যাচ্ছিলেন- এটা এরা হরহামেশাই করে থাকেন। যেটায় সায় আছে এই ডাক্তারের এবং এই হাসপাতালের প্রধানেরও।
অথচ মনোযোগের কারণে ওই ডাক্তারের এই পর্যবেক্ষণ ভুল হলে আজ আমার এই লেখাটা লেখার কথা না। আমি লিখতাম না- কে জানে, তখন হয়তো কেউ-না-কেউ আমাকে নিয়ে শোকগাথা লিখতেন। লিখতেনই এটা বলছি না, হয়তো লিখতেন, আলী মাহমেদের জন্য এলিজি। তবে আমার সেটা আর পড়া হতো না, বেচারা আমি...!
*পোস্টের সঙ্গে এই ছবিটা বছর দুয়েক আগের। আমার মা তখন যে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন সেই হাসপাতালের নীচের দৃশ্য এটা। এখানে যে সমস্ত মোটর সাইকেল দেখা যাচ্ছে (ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকায় সবগুলোকে একই ফ্রেমে আনা সম্ভব হয়নি!) প্রায় সবগুলোই ওষুধ কোম্পানি।
যেন এক ঝাঁক কাক, আর এদের কাছে হাসপাতাল হচ্ছে একটা ভাগাড়...।   
WhatsApp