Search

Sunday, July 14, 2013

হাম্বল রিকোয়েস্ট!

প্রথমেই আমি আগাম ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি, কেউ যেন ভুলেও আমার এই ভাবনা-বক্তব্যকে অহংকার টাইপের কিছু মনে না-করেন! আমার মনে হয়েছে, আমার এই ভাবনার পেছনে যুক্তি আছে আর যেটা আমার কাছে যুক্তিযুক্ত মনে হবে সেটা আমি করবই।

আমি ফেসবুকের সঙ্গে যুক্ত হয়েছি ২০০৭ সালে (অবশ্য নিয়মিত হয়েছি মাস তিনেক হবে, সে ভিন্ন প্রসঙ্গ)। তো ফেসবুকে মানেই বন্ধু-বন্ধু খেলা, বন্ধুতালিকা।
সেই ২০০৭ সাল থেকে অনেক পুরনো বন্ধু আছেন। কিন্তু এই ২০১৩ সালে এসেও বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করলাম, এদের অনেকের সঙ্গেই কখনই কোনো মন্তব্য চালাচালি, ফোনে কথা, সরাসরি দেখা হয়নি! নিদেনপক্ষে ভার্চুয়াল একটা সংযোগও হয়নি!

তা, এখানে, আমার বন্ধুতালিকায়, এরা  কী করছেন! বছরের-পর-বছর ধরে ঝিম মেরে আছেন কেন? আরে বাপু, আমি তো কোনো বিখ্যাত 'ফেসবুকার' নই যে আপনার বন্ধুতালিকায় আমি থাকলে ঝলমলে মুখে অন্যদের বলতে পারবেন: উই মা, জানিস, আমার ইয়েতে না ইয়ে আছে!
বছরের-পর-বছর ধরে এই ঝিম মেরে থাকা মানুষগুলো আমার কাছে স্রেফ একটা মৃত মানুষ! মৃত মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব দূরের কথা, কথা বলেও আরাম পাই না কারণ এরা আমার ভাষা বোঝে না।

আমার বন্ধুতালিকায় এই সমস্ত লাশ থাকার চেয়ে অল্পবয়সি সেই ছেলেটিকেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় যে অবলীলায় আমাকে জিজ্ঞেস করতে পারে, 'ভাই, এই ছফা মানুষটি কে ছিলেন'? একে অতি আনন্দের সঙ্গে উত্তর দিতে আমার কোনো ক্লান্তি নাই, 'তিনি (ছফা) কেবল এই দেশের প্রথিতযশা একজন লেখকই ছিলেন না, ছিলেন অসাধারণ একজন মানুষও'।
এমনিতে প্রায়শ এই প্রজন্মের জানার তীব্র আগ্রহ আমাকে মুগ্ধ করে!

তো, ঝিম মেরে থাকা এই সমস্ত লাশদের উদ্দেশ্য বলছি, আপনি আমার বন্ধু, এই সব রসিকতার আমার প্রয়োজন নাই। (আর যেখানে বন্ধুর সংখ্যা অধিক হলে ব্যাটা জুকারবার্গ যখন 'ট্যকাটুকা' দেয় না তাহলে এই পন্ডশ্রম অর্থহীন!) সেই সব ঝিম মেরে থাকা স্যারেরা, এখনই আপনাদের গাট্টি-বোঁচকা গোল করেন এবং আমার এখান থেকে সম্মানের সঙ্গে বিদায় হন, আমাকে দয়া করে আপনার বন্ধুতালিকা থেকে ছাঁটাই করে।

লাশের গন্ধ আমার সহ্য হয় না তাই এরপর লাশ নামের এরকম কাউকে দেখলেই সোজা ভাগাড়...। 

1971: খুন, সাদি মহম্মদের ২৫ জন স্বজন!

সাদি মহম্মদ বলছেন, ১৯৭১ সালে কেমন করে তাঁর ২৫ জন স্বজনকে খুন করা হয়েছিল...। 
আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা বোঝার জন্য এই একটা ভিডিও ক্লিপ দেখাই যথেষ্ঠ! আহারে-আহারে, এমন নিতল কষ্ট নিয়ে একটা মানুষ বেঁচে থাকে কেমন করে! এই প্রজন্মের ক-জন এই সমস্ত বেদনার কথা জানে এতে আমার ঘোর সন্দেহ আছে! বে-চা-রা অ-ভা-গা প্র-জ-ন্ম...! 

 * ভিডিও ক্লিপটির জন্য চ্যানেল আইয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা। এবং সেই অজানা মানুষটি যিনি প্রথম আপলোড করেছিলেন। অনেক হাত ঘুরে এটা আমার কাছে এসেছে বিধায়, তাই নামটা এখানে দিতে পারলাম না বলে, অনিচ্ছাকৃত এই অপরাধের কারণে দুঃখ প্রকাশ করি।
...
আপডেট: ২০২৪, মার্চ ১৩
আমরা অভিমান করে কাউকে কখনও-কখনও বলি, মাতৃগর্ভেই এঁর মৃত্যু শ্রেয় ছিল যেমনটা সাদি মহম্মদের বেলায় যে ১৯৭১ সালেই তাঁর মৃত্যু হলে তাঁকে বুকভরা বেদনা নিয়ে এমন করে বিদায় নিতে হত না! আহারে-আহারে! এই দেশের সেরা সন্তানেরা খাটের নীচে ভাঙ্গা তানপুরার মত পড়ে থাকে আর শুভ্র দেবের মত অতি চালবাজ প্রিন্স মাহমুদকে জাঁক করে বলে, 'ও তো আমাদের লেবেলের না'। 
ভিডিও ঋণ: সময় টেলিভিশন
 
এ সত্য, সাদি মহাম্মদের মত মানুষেরা পদকের জন্য বসে থাকেন না, নির্মলেন্দু গুণের মত বেহায়াপনাও করেন না কিন্তু তাই বলে কী খানিকটা অভিমানও হতে পারে না! তাই বলে কী তাঁর পরিবারের অনেকখানি কষ্ট থাকতে পারে না? আমাদের মত সাধারণ মানুষেরা লজ্জিত হই, নিরন্তর লজ্জিত হই- ক্রমশ নগ্ন হয়ে পড়ি আর 'অতি ন্যাকাপড়া-জানা' অসাধারণ মানুষেরা এই সব প্রসব করেন। তাদের প্রসব বেদনার প্রতি আমার সমবেদনা!

 

Saturday, July 13, 2013

ইটিভি: এক অপদার্থ, ফাজিলের নাম!

গতকাল সকাল সাড়ে ১১টায় ইটিভিতে আমি যে স্কুলের সঙ্গে যুক্ত, 'আমাদের ইশকুল' [০, ১,২,৩], যেখানে সুবিধাবন্চিত শিশুরা বিনে-পয়সায় পড়তে পারে। সে স্কুলটা নিয়ে একটা প্রতিবেদন দেখানো হয়েছে- দেখে আমি হাঁ! আজ আবার সাড়ে ১১টায় এটা পুণঃপ্রচার হওয়ার কথা ছিল। অতি উত্তম!

এই প্রতিবেদন দেখে আমরা অনেক কিছুই জানলাম কিন্তু কেবল জানা হলো না এই 'আমাদের ইশকুলটা' চলছে কেমন করে, কারা চালায় নাকি এটা চাকা লাগিয়ে নিজে-নিজে চলে! এরা কেবল দয়া করে জানালেন, ব্যক্তি উদ্যেগে স্কুলটা চলছে। এই 'ব্যক্তিউদ্যোগ' জিনিসটা কী, আলকাতরা টাইপের কিছু?
ইটিভি নামের এই চু...(সংযমের মাস বলে চুতিয়া শব্দটা বলতে চাচ্ছি না)। একটা স্কুল চালাতে মাস্টারের বেতন দিতে হয়, স্কুল ঘরের ভাড়া দিতে হয়, শিক্ষার উপকরণ কেনা লাগে- এটার কোনো চাকা নেই যে আপনাআপনি গড়াতে থাকবে!

ইটিভির প্রতিবেদন দেখে মনে হয়েছে, এই স্কুলটা আগে নদীগর্ভে তলিয়ে ছিল, পানি সরে যাওয়ার পর চর জেগে উঠার মত এটাও গজিয়েছে। বা ইটিভি যারা চালান তারা বালকবেলায় এক সকালে আবিষ্কার করলেন তাদের ইয়েতে হালকা গোঁফ গজিয়েছে, এই টাইপ আর কী!
খানিক পূর্বে একজন আবার আমাকে নসিহত করলেন: আরে মিয়া, টিভিতে দেখাইছে এইটাই তো বেশি।
মানুষটা খুব একটা ভুল বলেননি আমাদের দেশে টিভি ক্যামেরা দেখলে পারলে লোকজনেরা প্যান্টও খুলে দেন।
মিডিয়া বলে কথা!

আমাদের দেশের মিডিয়া নিয়ে আমার স্মৃতি সুখকর না কারণ এরা পারে না এমন কোনো কাজ নেই। এক পত্রিকার একটা সাক্ষাৎকারের কথা খানিকটা বলি, আমি যা বলেছি তার অনেকটাই এরা ফেলে দিল। সে নাহয় মেনে নেওয়া গেল কিন্তু নতুন কিছু বাতচিত লাগিয়ে দিল- যা আমি বলিনি! যেমন ছোটবেলা থেকে আমার নাকি স্বপ্ন ছিল দেশ-বিদেশে আমার অনেক পাঠক থাকবে। শ্লা, আমি কী রাজনীতিবিদ নাকি যে ছোটবেলা থেকে স্বপ্ন দেখে-দেখে ইয়ে বাঁধিয়ে বসব?

যদি এমনটা হতো আমাকে না-জানিয়ে ইটিভি এই প্রতিবেদনটা তৈরী করেছে তাহলে আমার বলার কিছু ছিল না। যেমনটা হয়েছিল 'দিগন্ত টিভি'র বেলায়। আমার সঙ্গে যোগাযোগ করার পর আমি সাফ না করে দিয়েছিলাম কারণ 'দিগন্ত টিভি' নিয়ে আমার নীতিগত সমস্যা আছে। এখন এরা যদি আমাকে না-জানিয়ে এই স্কুলের উপর প্রতিবেদন প্রস্তুত করে থাকে তাহলে আমার তো করার কিছু নাই। কী দেখালো, না দেখালো- কী বলল, না বলল তাতে আমার কী!
কিন্তু এবার ইটিভির এই অনুরোধের ছোট ঢেঁকি ওরফে 'বুম' গিলতে হয়েছিল।

পূর্বের তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে প্রথমে গররাজি হলেও অনেক কথা চালাচালির পর ইটিভির কথায় আমি রাজী হয়েছিলাম। এরা যেটা আমাকে বোঝাবার চেষ্টা করছিলেন এটা দেখালে নাকি লোকজনেরা উদ্বুদ্ধ হবে, হেনতেন...।
আমি মনে মনে বলেছিলাম, আরে, রাখো মিয়া, লোকজনের আর 'খায়া-দায়া' কাজ নাই। লোকজনের কাজ হচ্ছে, ঘটা করে জানতে চাওয়া স্কুল চলছে কিনা, ব্যস দায়িত্ব শেষ!

তো, ইটিভি কয়েক দিন লাগিয়ে এই প্রতিবেদন তৈরী করল। যে শিক্ষক এই স্কুলে পড়ায় তাকে বলা দেওয়া হয়েছিল এদেরকে সব ধরনের সহযোগীতা করার জন্য। প্রয়োজনীয় সমস্ত তথ্য এদেরকে দেওয়া হয়েছে, বারবার। এই গোটা প্রক্রিয়া আমার যথেষ্ঠ বিরক্তি উদ্রেক করেছে কারণ ওই সময় জরুরি একটা বিষয় নিয়ে আমি খুব ঝামেলায় ছিলাম।

যাই হোক, এই স্কুলটার স্বপ্নদ্রষ্টাদের একজন 'সাদিক আলম'-ও। আমরা আসলে চেয়েছিলাম একটা বৃদ্ধাশ্রম করার জন্য যেখানে বয়স্ক লোকজন এবং নিরাশ্রয় শিশুরাও থাকবে। কিন্তু টাকার জন্য এটা করা সম্ভব হচ্ছিল না তখন আমরা ঠিক করলাম স্কুল করব। সে প্রায় বছর-চারেক আগের কথা।
এটা আমার জন্য অনেকখানি বিব্রতকর, কষ্টের; পূর্বে মিডিয়ার লোকজনেরা বিচিত্র কারণে কেবল আমার নামটাই দিয়েই দায় সেরেছে। এবার এটা আমি এদেরকে পইপই করে বলে দিয়েছিলাম, আমার নামটা বাদ যাক তবুও যেন এবার এই ভুলটা যেন না-হয়!
কিন্তু সব উধাও, প্রতিবেদনে কিসসু নাই। চরে একটা স্কুল গজিয়েছে, চাকায় ভর দিয়ে নিজে নিজে চলে এই টাইপ...।

তা, এরা এমনটা কেন করল? আসলে এটা এক ধরনের কুৎসিত ফাজলামি! লোকজনের প্রতি এক ধরনের অবজ্ঞা- ক্ষমতার দম্ভ! এরা এটা বিলক্ষণ জানে, এদের বিরুদ্ধে কেউ টুঁশব্দও করবে না। আর অনুষ্ঠান অন-এয়ার হয়েছে এতেই তো লোকজন পশ্চাদদেশে তিন চাপড় মেরে উল্লাস করবে, ক্ষোভ প্রকাশ করার আর ইচ্ছা কোথায়...।

তো, যে প্রতিবেদক এই প্রতিবেদনের জন্য এসেছিলেন তাকে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, এই ফাজলামির মানে কীঁ! তিনি আমাকে জানালেন, তিনি ঠিকই সব গুছিয়ে পাঠিয়েছেন কিন্তু ইটিভির অফিস থেকে কী হয়েছে এটা তার জানা নাই। তিনি নিজেও এই বিষয়ে বিভ্রান্ত! তার সীমিত ক্ষমতা এটা আমি বুঝি তাই আমি বললাম, অফিসে আপনি এটা জানিয়ে দেবেন ইটিভির অপদার্থ কর্মকান্ড নিয়ে আমি বিরক্ত, ক্রদ্ধ। আমার বিরক্তির কারণে ইটিভির মত একটা অতি ক্ষমতাধর প্রতিষ্ঠান গুরুত্ব দেবে না কিন্তু পরবর্তী অন্তত আপনি নিরাপদ থাকবেন...।

সহায়ক সূত্র:
০. আমাদের ইশকুল: http://tinyurl.com/39egrtn
১. আমাদের ইশকুল, এক: http://tinyurl.com/3xpuov5
২. আমাদের ইশকুল, দুই: http://tinyurl.com/2fs9j4p
৩. আমাদের ইশকুল, তিন: http://tinyurl.com/327aky3

Friday, July 12, 2013

চোর-চোট্টা, মাথায় মারব গাট্টা!

'একালের দেবী তসলিমা নাসরিন', নামে একটা লেখা আছে আমার। http://www.ali-mahmed.com/2012/08/blog-post.html এই লেখাটা হুবহু যে কেবল কপি করা হয়েছে এমনই না। যেটা করা হয়েছে এটা স্রেফ চুরি। এরা একটা চোর! চোরের আস্তানাটা এখানে: http://www.newsagency24.com/component/content/article/30-sahitot/16619-2013-07-09-08-18-09

অথচ আমি আমার সাইটে স্পষ্ট বাংলায় লিখে রেখেছি, "আমার লিখিত অনুমতি ব্যতীত (www.ali-mahmed.com)-এর কোনো লেখা কোথাও প্রকাশ করা যাবে না।"
এরা অনুমতি দূরের কথা, পুরো লেখাটাই হুবহু কপি করেছে, দাঁড়ি-কমাসহ। কেবল বাদ পড়েছে আমার নামটা। কাজটা ইচ্ছাকৃত। এদের ভাবটা হচ্ছে এমন, এটা এরা নিজেরাই লিখেছে!

কাজটা হয়েছে চুতিয়ারও অধম! চুতিয়ারও অধমদের কী বলা হয় আমি জানি না তবে আপাতত 'কুতিয়া' দিয়ে কাজ চালিয়ে নিচ্ছি।
লেখকের নামের জায়গায় এরা লিখেছে, "নিউজ এজেন্সি টোয়েন্টিফোর ডেস্ক, ঢাকা"। এদের স্টাইল আছে আবার! ঘটা করে লিখেছে, বাংলাদেশ সময় : ১০৫৯ ঘন্টা, জুন ০৯,২০১৩, জাফ/সম্পাদনায়: টিই, নিউজরুম এডিটর। অনেক 'ছুমছাম' এদের, হিজিবিজি-হিজিবিজি!

ওয়াল্লা, এই newsagency24.com সাইটটার আবার একজন এডিটরও আছে দেখছি, Editor: Jahid Ikbal । এই ব্যাটা কোন চোরের ইশকুল থেকে ন্যাকাপড়া করেছে, কে জানে! এই তো দেখি আবার 'আংরাজিতে' নিজের নামও লিখতে পারে! 'শিকখিত' আছে ব্যাটা, কিন্তু এ তো দেখি গরুচোরেরও অধম...!

Saturday, July 6, 2013

যাত্রার প্রিন্স!

কপালের ফের, আমি যেটাতেই এখন হাত দেই তা কেমন-কেমন করে যেন ভন্ডুল হয়ে যায়, গণেশ উল্টে যায়! সুধিন্দ্রনাথের কবিতা ধার করে বলতে হয়, '...অকস্মাৎ স্বপ্ন গেল টুটি, দেখিনু সরমে চাহি...'।
কী গভীর আগ্রহ নিয়েই না আমাদের দেশের এই প্রিন্সের কথা লিখলাম, 'একজন প্রিন্স, মুসা বিন শমসের!':
https://www.facebook.com/ali.mahmed1971/posts/10151504510607335

এরপর জনে-জনে বলে বেড়িয়েছি আমাদের দেশেও প্রিন্স আছে, বাহে। দেশ-বিদেশের লোকজনেরা চোখ বড়-বড় করে অপার বিস্ময়ে স্বীকার যেতে বাধ্য হয়েছিলেন, সমীহের চোখে তাকিয়েছেন। কেন-কেন-কেন, কেন এমনটা হয়? এখন চিঁ চিঁ ব্যতীত আমার গলার স্বর বের হবে কেমন করে! এই পোড়া দেশে যাও একজন প্রিন্স পাওয়া গেল এখন দেখা যাচ্ছে আরেক কাহিনী!

দৈনিক জনকন্ঠ, প্রথম পৃষ্ঠায় এটা ছাপায় ২৪ মার্চ, ২০০১ সালে। ওখান থেকে খানিকটা এখানে তুলে দেই:
"ফরিদপুর শহরের গোয়ালচামট এলাকার মেয়ে কমলা ঘোষ। সবে বিয়ে হয়েছে তার। বাবার বাড়িতে বেড়াতে এসে আটকা পড়ে যান কমলা! একদিন পাকিস্তানি মেজর কোরায়শী ও তিন জন সৈন্যসহ কমলাদের বাড়িতে আসে নুলা মুসা। এরপর যা হওয়ার তাই হয়, পাকিস্তানি সৈন্যরা চরম শারিরীক নির্যাতন করে কমলাকে।
...পরে কমলার স্বামী কমলাকে আর কখনই ঘরে ফিরিয়ে নেয়নি।

...ফরিদপুর শহরের মহিম স্কুলের সঙ্গে এক ধর্মশালা দেখাশোনা করতেন কেষ্টমন্ডল। কেষ্টমন্ডলের চার মেয়ে: ননী, বেলী, সোহাগী ও লতা। নুলা মুসার তত্ত্বাবধানে এই বেলী ও ননী মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় পাকিস্তানি সৈন্যদের মনোরঞ্জনে বাধ্য হয়েছিলেন। পরে এই চার বোন এবং তাদের মা-র ঠাঁই হয়েছিল ফরিদপুরের পতিতাপল্লীতে।
...কেবল ননী, বেলীই নয় পাকিস্তানি সেনাদের হাতে অর্ধশতাধিক বাঙালি মা-বোনের সন্ভ্রম লুটের প্রধান নায়ক এই নুলা মুসা।

এখন তার নাম ড. মুসা বিন শমশের হলেও সার্টিফিকেটের নাম এডিএম মুসা। কিন্তু একটা হাত খানিকটা বিকলাঙ্গ থাকায় তার ব্যাপক পরিচিতি ছিল, 'নুলা মুসা' হিসাবেই। নিজেকে ডক্টর বলে দাবী করলেও, ১৯৬৮ সালে ঈশান স্কুল থেকে এসএসসি পাশ করে রাজেন্দ্র কলেজে ভর্তি হয়েছিল মুসা। ১৯৮৬ সালে মুসার নামের আগে ডক্টর যুক্ত হলেও উচ্চ-মাধ্যমিক পাসের কোনো প্রমাণ মেলেনি কোথাও!

অভিযোগ আছে, একাত্তরের ২১ এপ্রিল পাকিস্তানি সৈন্যদের ফরিদপুরে ঢোকার ব্যাপারে মানচিত্র এবং পথনির্দেশনা দিয়ে সহযোগিতা করেছে এই মুসা। মেজর আকরাম কোরায়শীর সঙ্গে মুসার গভীর ঘনিষ্ঠতা ছিল! ফরিদপুরে পাকিস্তানি সৈন্য ঢোকার পরদিনই (একাত্তরের ২২ এপ্রিল) ফরিদপুর সার্কিট হাউজে মুসা এবং মেজর কোরায়শীকে খুবই অন্তরঙ্গ পরিবেশে দেখেন, মুক্তিযোদ্ধা একেএম আবু ইউসুফ সিদ্দিক পাখী।
একাত্তরে মুসা ছিল ফরিদপুরের এক মূর্তিমান আতঙ্ক। তার প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সহায়তায় পাকিস্তানি সেনারা অসংখ্য মানুষকে হত্যা, নারী নির্যাতন একং লুটতরাজ করেছে।
ফরিদপুরের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারসহ শহরের সমস্ত শহীদ মিনার মুসা পাকিস্তানি সেনাদের সহায়তায় ভেঙ্গে ফেলে!

মেজর কোরায়শীসহ অনেক পাকিস্তানি সেনা-সদস্যের অবাধ যাতায়াত ছিল মুসার বাড়িতে। মুসার পিতা তথাকথিত পীর শমসের মোল্লা পাকিস্তানি সেনাদের মনোবল বাড়াতে তাদের গায়ে ফুঁ দিত আর বলত, 'ইন্ডিয়া পাকিস্তান বন যায়েগা'।


দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ডিসেম্বরেই মুসা মুক্তিযোদ্ধাদের ভয়ে ফরিদপুর থেকে পালিয়ে চলে যায় পাবনায়। সেখানে বড় ভাইয়ের শ্যালিকাকে বিয়ে করে ঢাকা-চট্টগ্রামে ছুটাছুটি করে। ঢাকার এক অবাঙ্গালিকে পাকিস্তানে পাঠাবার নাম করে তাঁর সহায়সম্পত্তি আত্মসাতের মাধ্যমে একপর্যায়ে ঢাকায় 'শাহবাজ ইন্টারন্যাশনাল' নামে আদম ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলে। এরপর বিদেশে লোক পাঠাবার নাম করে উত্তরবঙ্গের কয়েকশ' লোকের কাছ থেকে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে বিদেশে উধাও হয়ে যায়। বছর তিনেক পর ঢাকায় ফিরে 'ড্যাটকো' নামের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলে আবারও শুরু করে আদম ব্যবসা! এরশাদ আমলে শুরু হয় তার উত্থান। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি মুসাকে...।"

*দৈনিক জনকন্ঠে এই প্রতিবেদন ছাপাবার পর প্রতিবাদ দূরের কথা এই প্রতিবেদনটি তৈরীর সময় বারবার তার সঙ্গে যোগাযোগের সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল এমনটাই দাবী এই পত্রিকার।

দৈনিক জনকন্ঠ, (প্রথম পৃষ্ঠা) ২৪ মার্চ, ২০০১

রক্তের দাগ...।

আমি এক লেখায় লিখেছিলাম, ৭১, ৮১, ৯১, ২০০১, ২০১১ সালে কে খুন, অপরাধ করেছে এখানে সালটা মূখ্য না, আলোচ্য বিষয় হচ্ছে সেই অপরাধীকে আইনের আওতায় এনে প্রচলিত আইনে শাস্তি দেওয়া হয়েছে কি না?

এক নব্য মুক্তিযোদ্ধা এটা নিয়ে অনেক 'ত্যানা' জড়ালেন। আমি নাকি বিচার চাই না বলেই ৭৫-এর কথা উল্লেখ করিনি! শোনো কথা, এদের ব্রেন কী সময়ে-সময়ে ড্রেন হয়ে যায়!
এখানে লম্বা একটা সময় বোঝাবার জন্য ১০ বছর পরপর একটা টাইম-ফ্রেম দাঁড় করানো হয়েছিল। সময়টা এখন ২০২১ হলে, ২০২১-ও এখানে চলে আসত। দাঁড়াত এমন: ৭১, ৮১, ৯১, ২০০১, ২০১১, ২০২১...।

এদিকে আবার অন্য এক মুক্তিযোদ্ধা গবেষক ওই নব্য মুক্তিযোদ্ধার সেই লেখার 'ত্যানা' ধরে অনেক টানাটানি করলেন- একবার জড়ালেন, একবার খুললেন, আবার জড়ালেন...। তাদের দলবল কেউ-কেউ সেই লেখায় পঞ্চতারকাও প্রদান করলেন। কেউ-বা আবার দাঁত কেলিয়ে হায়েনার হাসিও উপহার দিলেন!
আমি আর কী করব! আমার মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যে অল্প জ্ঞান, ওটার উপর ভরসা করে আর বাহাসে গেলাম না। তাছাড়া এদের যে অনেক অলৌকিক ক্ষমতা! নিমিষেই এরা মানুষকে ছাগলে, ছাগলকে মানুষে রূপান্তরিত করার বিচিত্র ক্ষমতা রাখেন!

যাই হোক, জার্মানিতে কোনো শিশুর নাম 'হিটলার' রাখা আইনত শাস্তিযোগ্য অপরাধ। নাৎসি বাহিনী যে ওখানেই কেবল নিষিদ্ধ তাই না, পৃথিবীর যেখানেই নাৎসি বাহিনীর সঙ্গে সম্পৃক্ত কোনো মানুষকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে তাকে ধরে এনে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। কারণ সে অপরাধী- কত বছর পূর্বে অপরাধ করেছিল এটা এখানে জরুরি বিষয় না। অপরাধ করেছে, শাস্তি পাবে- এই নিয়ে কারো বাড়তি কোনো কথা নাই।

অথচ আমাদের দেশে ৭১-এ খুন করে দিব্যি যে এরা ঘুরে বেড়িয়েছে এমনই না, কালে-কালে এদের গাড়িতে পতপত করে আমাদের পতাকাও উড়েছে। আফসোস, আমাদের দেশে এখনও পাকিস্তানের পতাকা নিয়ে মিছিল হয়, বড়ো বিচিত্র এ দেশ!
কখনও এরা বলে, ক্ষমা করা তো হয়ে গেছে। যদিও আমরা জানি সবাইকে ক্ষমা করা হয়নি। তারপরও যে কথাটা থেকে যায়, কে কাকে ক্ষমা করার অধিকার রাখে?

এমনিতে এরা কথায় কথায় ইসলাম ধর্মের বুলি কপচায় কিন্তু ইসলাম ধর্মে নরহত্যা বিষয়ে কোথায় ছাড় দেওয়া হয়েছে, এ নিয়ে টুঁ-শব্দও করে না!
"...কেউ অন্যায়ভাবে নিহত হলে তার উত্তরাধিকারীকে আমি প্রতিশোধ গ্রহনের অধিকার দিয়েছি...। (১৭ সুরা বনি-ইসরাইলঃ ৩৩)
"নরহত্যার ব্যাপারে তোমাদের জন্য বদলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে...।" (২ সুরা বাকারাঃ ১৭৮-১৭৯)
মোদ্দা কথা, যাকে খুন করা হলো তার উত্তরাধিকারীর উপরই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে এই সিদ্ধান্তটা, কোনো রাজা-বাদশার উপর না।

১৯৭১ সালে সাদি মহাম্মদের পরিবারের ২৫ জন মানুষকে খুন করা হয়েছিল। যার বর্ণনা তিনি চ্যানেল আইয়ের একটা অনুষ্ঠানে বলেছিলেন। কেমন করে একেক করে তাঁর স্বজনদের জবাই করা হয়েছে, কোপানো হয়েছে। কেমন করে বাবাকে ফেলে তিনি পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন...। এই সমস্ত তীব্র কষ্টের কথা তিনি বুকে পাথর বেঁধে বলে গেছেন...।
ইচ্ছা ছিল এই লেখাটার সঙ্গে ওই ভিডিও ফুটেজটা এখানে জুড়ে দেওয়ার কিন্তু এটা কোনো কারণে আপলোড করতে পারছি না । এমন একটা ফুটেজ দেখার জন্য যে বুকের সাহস প্রয়োজন তা আমার নাই। আমি পুরোটা দেখতে পারিনি, এ বর্ণনাতীত!

হতাশায় আমরা নাহয় সব দেখেশুনে মুখ ফস্কে বলে বসি, ওই সব পুরনো জিনিস নিয়ে আর কত...। কিন্তু খুনের বিচার না-হলে আইন কোন কাজের? আইন তো কোনো খুনেরই বৈধতা দেয় না। ৭১ সালের খুন আমরা বিস্মৃত হলে ২০১৩ সালের খুন কী দোষ করল?
আর একজন সাদি মহাম্মদ কেমন করে বিস্মৃত হবেন তাঁর সেই অন্য ভুবনের কষ্ট! তিনি ব্যতীত কার এই ক্ষমতা আছে তাঁর স্বজনের খুনিকে ক্ষমা করার?

আমি যেটা মনে করি, ৪২ বছর গেল নাকি ৪২০ বছর তাতে কী- রক্তের দাগ মুছে ফেলা যায় না...।

Thursday, July 4, 2013

বাংলাদেশ শুধুই আমার বাবার কবরস্থান!

একজন প্রবীর সিকদার। তাঁর কাছ থেকে আমরা শুনি মুক্তিযুদ্ধের সময়কার কথা:
"বাবার পিঠে একশ' ঘামাচি মেরে দিলে পাওয়া যেত একটা ফুটবল। বড় কাকাকে দেড়শ' ঘামাচি ফোটানোর শব্দ শুনিয়ে পেতাম ক্রিকেট ব্যট-বল।
...পেছন ফিরে তাকালে মনে হয়, ওগুলো বুঝি গতকালের গল্প, আনন্দঘন স্মৃতি।

৮মে, ১৯৭১। সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেল। রাজাকাররা কুপিয়ে-পিটিয়ে খুন করল বড় কাকাকে। রামদায়ের কোপে মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতেও বড় কাকা আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, 'দেশ ঠিকই স্বাধীন হবে। কিন্তু তোকে লেখাপড়া শিখিয়ে যেতে পারলাম না'।
 

আমার শার্ট রক্তে ভিজে গিয়েছিল বড় কাকার তাজা রক্তে। ওই সময়েই রাজাকারদের হাতে খুন হয়েছিলেন, ছোটকাকা, মামাসহ আমার আরো ১৩ স্বজন। অসহায় ও বোবার মতো সেদিন আমাকে ওই হত্যাযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করতে হয়েছিল।
ওই রক্তভেজা শার্ট না-শুকাতেই খবর পেয়েছিলাম, ওরা বাবা আর দাদুকে ধরে নিয়ে গেছে। পরে বড়কাকার রক্তমাখা আমার শার্টটা মা কোথায় রেখেছেন তা যেমন জানা হয়নি, তেমনি আর জানা হয়নি ওরা আমার বাবা-দাদুকে কোথায় কিভাবে হত্যা করেছে?

...মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়টা নিজেদের ভিটেবাড়ি থেকে বিতাড়িত হয়ে ফরিদপুরেরই বিভিন্ন গ্রামে যাযাবরের মত জীবন কাটিয়েছি। খাদ্য আর নিরাপত্তার খোঁজে বাড়ি থেকে বাড়ি, গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরেছি।
 

পাক-রাজাকারদের ধাওয়ার মুখে পাড়ি দিয়েছি মাঠের পর মাঠ, বিলের পর বিল, নদীর পর নদী। চোখে পড়েছে কুকুরে-শুকুনে খাওয়া অজস্র লাশ। বাবা যেদিন হারিয়ে যান সেদিন তার পরনে ছিল নীল লুঙ্গি। ওই অজস্র লাশের কোনোটির সঙ্গেই নীল লুঙ্গি না-থাকায় চিহ্নিত করতে পারিনি বাবার লাশ। তবে ওই সময়ের ছোট্ট মনে এটুকু বুঝেছি, ওই লাশগুলোর কোনো একটির মতই দেশের কোথাও না কোথাও পড়ে আছে আমার বাবার লাশ।

...আর এভবেই কখন যেন পুরো বাংলাদেশ হয়ে উঠেছে আমার বাবার কবরস্থান। যেখানেই যাই সেখানেই এখন আমি শুধু আমার বাবার লাশের গন্ধ পাই; কেননা ওই মাটিতেই মিশে আছেন আমার বাবা। দেশ জুড়ে যতো মানুষ দেখি সকলকেই মনে হয় আমার পরম আত্মীয়; ওরা কিংবা ওদের কোনো স্বজন, নিশ্চয়ই একাত্তরে সৎকার করেছিলেন আমার বাবার লাশের।

...একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে লেখালেখির অপরাধে ঘাতকের বোমা-গুলিতে উড়ে গেছে আমার একটি পা, চাপাদির কোপে স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা হারিয়েছে আমার একটি হাত। অবশ্য এসব নিয়ে আমার ক্ষোভ-যন্ত্রণা নেই।
 

...অস্থির যন্ত্রণায় লীন গয়ে ভাবতাম, কেন যে ওরা একাত্তরে 'ঘামাচি মারার শর্তে ফুটবল' দেওয়া বাবাকে আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গেল? আমার সেই বাবা ডাকা, না ডাকার অসুস্থতা কেটেছে আমার ছেলের জন্মের পর। এখন আমি ছেলেকেই 'বাবা' ডাকি, ছেলের ভেতরেই একাত্তরে হারানো বাবার অস্তিত্ব খুঁজে পাই। এরই মধ্যে ছেলেকে বলেও দিয়েছি, 'তোমার চারপাশে যতো বড় বাংলাদেশ তার পুরোটাই তোমারই দাদুর কবরস্থান; কখনোই যেন দাদুর কবরস্থানের অমর্যাদা না হয়...।"

*একাত্তরের রাজাকারদের নিয়ে লেখার অপরাধে প্রবীর সিকদারকে গুলি করা হয়েছিল, বোমা মারা হয়েছিল। তাঁর শরীরে এখনও অসংখ্য স্প্লিন্টার, উড়ে গেছে ডান পা- এখন ক্রাচে ভর দিয়ে হাঁটেন।
চাপাতি দিয়ে কোপানোও হয়েছিল তাঁকে, বাম হাত প্রায় অকেজো।
তবুও এই মানুষটা বিন্দুমাত্র মনোবল হারাননি। আমি এখনও তাঁর সঙ্গে কথা বললে মনে বড়ো জোর পাই...।

**প্রবীর সিকদারের চমৎকার একটা বই আছে, 'আমি শালা রাজাকার'। এই বইটা থেকে খানিকটা তুলে দেই:
 
"...চারটা পায়ে একটা কুত্তা
আমার আছে দুই
আর দুইটা পা থাকতো যদি
আমিও কুকুর হই।"

...
"নিজামি আর মুজাহিদের
গাড়ি চলে উড়ে
লাল সবুজের ওই পতাকা
কাঁদে কিন্তু ওড়ে।"
 

Wednesday, July 3, 2013

লিমনের এক পা-র বিরুদ্ধে লড়ছে গোটা দেশ!

ছবি ঋণ: দৈনিক সমকাল, ২ জুলাই ২০১৩
ভাগ্যিস, র‌্যাব লিমনের একটা পা রেখে দিয়েছিল নইলে কী হতো এটা ভেবে আমি শিউরে উঠি। লিমনের এইটা পা নিয়েই সমগ্র দেশের আতংকের শেষ নেই দুই পা থাকলে আমার এই প্রিয় দেশটার কী হাল হতো এটা ভেবে শিউরে উঠি!

ঘটনার সময় লিমনের বয়স ছিল, ১৪ বছর! আমাদের দেশের আইন অনুযায়ী লিমনকে শিশু বলা হবে। Sailent features of the children act of 1974, Section 2 (F)-এ বলা হচ্ছে, "A child means a person under 16 years of age..."।
একটা শিশু এই দেশটাকে কাঁপিয়ে দিল!

আমার লেখালেখির শপথ, লিমনের সঙ্গে কোনো দিন দেখা হলে তার অবশিষ্ট ওই একটা পা ধরে সালাম করব। এমন একজন অসম্ভব শক্তিশালী মানুষকে এই সম্মান না-দেখিয়ে উপায় কীঁ! যার বিরুদ্ধে লড়ছে গোটা রাষ্ট্র, রাষ্ট্রযন্ত্রের সমস্ত শক্তি।
আমরা এই যে উষ্মা প্রকাশ করতাম, আমাদের ট্যাক্সের টাকায় প্রতিরক্ষাখাতে ১৪ হাজার কোটি টাকা কেন খরচ করা হবে? ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ হলে তো আমরা হাতাহাতি যুদ্ধ করব, তাহলে অস্ত্র কেন রে, বাপু! আজ বুঝি এর মর্তবা! আরে, অন্তত যে অস্ত্রগুলো কেনা হবে এগুলো তো কাজে  লাগবে, নাকি? এই যেমন, এখন সব অস্ত্র তাক করে আটকাতে হবে লিমন নামের এক দানবকে। অথচ ছবিতে [*] আমরা দেখতে পাচ্ছি, দানবটা কাঁদছে, কেন?

পত্রিকার খবর হচ্ছে, অস্ত্র মামলায় লিমনের বিরুদ্ধে অভিযোগ (আদালতের ভাষায় 'চার্জ') গঠন করা হয়েছে।
কাঁদতে কাঁদতে লিমন বলেন, "...র‌্যাব আমাকে নির্মম নির্যাতন করে (পা-ও হারাতে হয়েছে) উল্টো দুটি মামলায় আসামি করে হয়রানি করছে।
পুলিশের কাছ থেকেও ন্যায়বিচার পাইনি। আজ নিম্ন আদালতেও ন্যায়বিচার পেলাম না...।"

আইনের চোখে কেবল অপরাধিই না, পলাতক একজনকে প্রেসিডেন্ট সাহেব ক্ষমা করে দেন কারণ সেই অপরাধি হচ্ছে আমাদের সাজেদা চৌধুরির ছেলে। ফাঁসির আদেশ হওয়া এমন একজন মানুষকেও রাষ্ট্রপতি ক্ষমা করেন কারণ সেই বিপ্লবের বাপ ক্ষমতামীন দলের লক্ষীপুরের তাহের।
অথচ এই দেশের সমস্ত মানুষ জানেন, লিমন নিরপরাধ তবুও একজন রাষ্ট্রপতিও লিমনকে ক্ষমা করেন না!

এটা আমার নিজস্ব মত। আমি মনে করি, কিছু মৃত্যু খুব জরুরি হয়ে পড়ে যেমন লিমনের মৃত্যুটা! র‌্যাবের হাতে গুলি খাওয়ার পরই লিমনের মরে যাওয়াটাই সমীচীন ছিল বলে আমি মনে করি। কারণ লিমন বেঁচে থেকে যে কাজটা করছেন এটা কেবল অন্যায়ই না, ভয়ংকর অন্যায়। ১৬ কোটি মানুষকে নগ্ন করে দেওয়ার চেষ্টা- কাজটা মোটেও ঠিক না...।

কোথায় যাই কার কাছে যাই, একেক করে নিবে যাচ্ছে সব আলো...।
"...জনশূণ্য রঙ্গালয়ে নিবে গেছে সমস্ত দেওটি,
নিস্তব্ধ সকল যন্ত্র, মঞ্চপরে যবনিকা ঢাকা" (সুধীন্দ্রনাথ)

Monday, July 1, 2013

মুক্তিযুদ্ধে, একজন শুয়োর-চড়ানো 'বীর প্রতীক'!

হাজারি লাল তরফদার
হাজারি লাল তরফদার। হাজারি লালের পেশা 'কাওরা' (যারা শুয়োর চড়ান)। তিনি নিম্নবর্ণের মানুষ। মানিকের ভাষায়, 'ছোটলোকের মধ্যে ছোটলোক'! কিন্তু এই মানুষটা আমাদের মুক্তিযুদ্ধে অসম সাহসের সঙ্গে লড়ে গেছেন। আমাদের নায়ক!

সুনীলের ৭০ বছরের জেল!

প্রিয় সুনীল, তুমি ওপারের রথে বসে,
পুনর্জন্মের স্বপ্ন দেখতে যেও না
এ বড় ভয়ংকর স্বপ্ন...

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি' নামে তাঁর একটা কবিতা আছে:
"প্রিয় ইন্দিরা, তুমি বিমানের জানলায় বসে,
গুজরাটের বন্যা দেখতে যেও না
এ বড় ভয়ঙ্কর খেলা...
তোমার শুকনো ঠোঁট কতদিন সেখানে চুম্বনের দাগ পড়েনি,...
ইন্দিরা, তখন সেই বন্যার দৃশ্য দেখেও একদিন তোমার মুখ ফস্কে
বেরিয়ে যেতে পারে, বাঃ কী সুন্দর...!"

এই কবিতাটি এখানে আবারও দেয়ার কারণ হচ্ছে, তখন ইন্দিরা গান্ধী ক্ষমতায়। বিপুল ক্ষমতা ইন্দিরার। কিন্তু এই কবিতার কারণে ইন্দিরা সুনীলের প্রতি একটা শব্দ উচ্চারণ করারও স্পর্ধা দেখিয়েছেন বলে আমার জানা নাই...। সুনীল মরে বেঁচে গেছেন এই কথা বলা চলে না কারণ হিন্দু ধর্মে পুনর্জন্ম বলে একটা বিষয় আছে। কে জানে, সুনীল কোথায় পুনরুদ্ভূত হবেন! তবে সুনীল পরের জন্মে এই দেশে জন্ম না-নিলেই ভাল করবেন কারণ...?

ভাগ্যিস, সুনীল বাংলাদেশে জন্মাননি (****)! তাহলে লেখার কারণে তাঁর ৭০ বছরের জেল হয়ে যেত।

*একবার প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, অহেতুক ইংরাজি শব্দ লেখব না কিন্তু আফসোস, প্রতিজ্ঞা রাখতে পারিনি! আজ আরেকটা প্রতিজ্ঞা করি, ভুলেও 'হায়েনা' শব্দটা লেখব না...! হে প্রভু, আমাকে আমার প্রতিজ্ঞা পালনের শক্তি দাও। আমিন!

**আমার সুহৃদ, প্রিয় মানুষেরা আমার লেখালেখি নিয়ে বড়ই উদ্বিগ্ন থাকেন। এদেরকে এটা আমি বোঝাতে পারি না, যে-দেশে প্রধানমন্ত্রীর প্রাণের নিরাপত্তা চেয়ে থানায় জিডি করতে হয় সেই দেশে আমার মত 'তিন টাকা দামের কলমবাজের' জন্য উদ্বিগ্ন হওয়াটা হাস্যকর, অতি হাস্যকর!

সেইসব সুহৃদদের নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নাই! কিন্তু কিছু পাঠকও যখন তাঁদের উদ্বিগ্নতা আলাদা করে জানান তখন খানিকটা হতবুদ্ধি হয়ে যাই। এই অসহ্য ভালবাসা সহ্য হয় না!
এমনই একজনকে আমি লিখেছিলাম, কোথাও-না কোথাও, কেউ-না-কেউ, কখনও-না-কখনও আমার জন্য, বুকের ভেতর থেকে পাক খেয়ে ওঠা তাঁদের শুভেচ্ছাই আমার রক্ষাকবচ, বর্ম...।

***লেখালেখির উপর যে , অন্যায়, অনায্য ভার চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে এর সহজ বুদ্ধি হলো, 'হেই বেইবি, ওয়ানা...' এই টাইপের লেখালেখি করা। তারচেয়ে সহজ বুদ্ধি হলো, লেখালেখি ছেড়ে দেওয়া! কিন্তু আমি যে দু-কলম লেখার চেষ্টা ব্যতীত আর কিছুই পারি না যে, ছাই!
এমনিতে 'লেখালেখির ভূত' নামের রাস্কেলটাকে খুঁজছি। পেলেই হয়, 'এক্কেবারে প্যাটা গেলে ফেলব'। অবশ্য এই কাজটা কেমন করে করা হয় এই সম্বন্ধে আমার ভাল ধারণা নাই। সম্ভবত অমানুষিক শক্তি প্রয়োগে পেটের নাড়িভুঁড়ি ভর্তা করে ফেলা হয়। যাই হোক, আগে ব্যাটাকে তো হাতের নাগালে পাই...।

এ সত্য সুনীলের জন্ম বাংলাদেশেই, অবিভক্ত ভারতে। কিন্তু...কিন্তু এদেশের কোনো কিছুরই তো তাঁকে স্পর্শ করার যো ছিল নেই...।
সুনীল আপাদমস্তক একজন ভারতীয় ছিলেন, মৃত্যুর আগ-পর্যন্ত। এঁরা অবলীলায় বিস্মৃত হন, এঁদের আদি শেকড়ের কথা। এঁদের অধিকাংশেরই শেকড়ের জন্য ন্যূনতম আবেগ, ভালবাসাও আমরা দেখতে পাই না। আমাদের দেশে যখন আসেন তখন কেউ জামাইবাবু, কেউ দাদাবাবু বনে যান কিন্তু যেই মাত্র ভারতে পা রাখেন তখন পা থেকে মাথা পর্যন্ত আগ্রাসী ভারতের একজন যোগ্য প্রতিনিধি। যাই হোক, সে ভিন্ন প্রসঙ্গ...।

আমার লেখার ফাঁকটা আমি স্বীকার করি, "...ভাগ্যিস, সুনীল বাংলাদেশে জন্মাননি...! তবে এও সবিনয়ে বলি, এই লেখায় আসলে সুনীলের জন্মটা রূপক অর্থে বলা, যেমনটা ৭০ বছরের জেল!

(একবার এক আমলা কবিতাটা ইন্দিরাকে শুনিয়েছিলেন। পুরোটা শুনে হেসে ইন্দিরা একটা শব্দ বলেছিলেন, 'Stupid'. এটা সুনীল তাঁর এক বইয়ে উল্লেখ করেছিলেন)

Thursday, June 27, 2013

গালি এবং...!

অনেকে আমার কাছে বিভিন্ন সময়ে জানতে চেয়েছেন পরে আমি আর কম্যুনিটি ব্লগগুলোতে লিখিনি কেন? আসলে কয়েকটাই কারণ ছিল, আমি কারও নিয়ন্ত্রণে থাকতে পছন্দ করতাম না। কেউ আমার মাথার উপর বনবন করে ছড়ি চালাবে এটাও আমার পছন্দ ছিল না।
দ্বিতীয়টা দলবাজি। এই জিনিসটা আমার দু-চোখের বিষ! কেন রে বাপ, রাজনীতি করলে করো না, মানা করছে কে! কিন্ত রাজনীতি করতে গিয়ে কেবল রাজনীতিই বোঝো, মানুষ বোঝো না? কালে কালে এরা অবলীলায় বন্ধুর পিঠে ছুঁরি মারতে পারে, দলের জন্য। হাসতে হাসতে চাপাতি দিয়ে ফালা ফালা করে ফেলতে পারে!
তো, দলছুট আমার জন্য বড়ো মুশকিল হয়ে যেত...।

আরেকটা বিষয়ে অনেকের সঙ্গে আমার মতের মিল ছিল না সেটা হচ্ছে, গালি দেওয়ার অধিকার! কেউ-কেউ তো গালির অভিধানও চালু করে দিয়েছিলেন!
অনেকে কেবল যে একে অন্যকে গালি দিতেন এমনই না, বাপ-মা তুলেও অবলীলায় গালাগালি করতেন। এই বিষয়ে আমার সাফ কথা, কেউ সামনাসামনি আমার মাকে নিয়ে কুৎসিত কথা বললে সে স্রেফ খুন হয়ে যাবে। আর শক্তিতে না-কুলালে আমি নিজে খুন হয়ে যাব। যদিও আমার মা এখন আর বেঁচে নেই কিন্তু তারপরও মৃত এই মহিলার জন্য আমি হিংস্র পশুর ন্যায় লড়ব। এখানে যুক্তির আমি গুষ্টি কিলাই। জঙ্গলে চলে কেবল জঙ্গলের আইন, এখানে নাই আইন, নাই ফাইন!

আফসোস, আমি যেটা এখনও বোঝাতে পারলাম না, প্রত্যেকটা জায়গার নিজস্ব একটা ভাষা আছে। স্যুট না-খুলে যেমন বাথরুমের কাজ সারা যায় না তেমনি জন্মদিনের পোশাকেও বাইরে ঘুরে বেড়ানো চলে না।
এ গ্রহের অনেক দেশে অবশ্য দিগম্বর থাকার অধিকার নিয়েও দিব্যি বাতচিত-কর্মকান্ড চলে। সেটা তাদের অভিরুচি কিন্তু আমার যেটা মনে হয়, গায়ে সুতাটাও না-থাকলে এ গ্রহের সবচেয়ে সুন্দর মেয়েটির সঙ্গে জরিনার আদৌ পার্থক্য কী!
বিশেষ মুহূর্তের ব্যাপারটা একপাশে সরিয়ে রাখলে, মানুষ বিশেষ বাড়তি যে অংশটা বহন করে ওটা উম্মুক্ত থাকলে এটায় কাকও ঠোকর দেবে কিনা এ নিয়ে আমার ঘোর সন্দেহ আছে!
প্রকৃতি আলো-ছায়ার কাজ রেখেছে বলেই দিন-রাতের ব্যাপারটা আছে নইলে সবই ফকফকা হতো- রহস্য বলে আর কিছুই থাকত না।

যাই হোক, যেটা বলছিলাম, 'ধুম মাচাদে' গানটা গাওয়া দোষের না কিন্তু কেউ পাবলিক প্লেসে টেবিলে উঠে ধুম মাচাদে শুরু করলে তো বড়ো মুশকিল! এখন কেউ যদি মনে করেন পাবলিক প্লেসে তিনি সেটাই করবেন, যেটা নিজের বাড়িতে করেন না। সেই অসুস্থ মানুষটার জন্য করুণা করতেও আমার করুণা হয় এটা বলা ব্যতীত আর কীই-বা বলার থাকে!

এখন আবার নতুন একটা চল শুরু হয়েছে সাংসদ হলে সংসদ ভবনে গালাগালির বন্যা বইয়ে দেওয়া যাবে। তখন আবার অন্য সাংসদরা টেবিল চাপড়ে উৎসাহও দেবেন। সেটা আবার মিডিয়ায় ঘটা করে আমাদেরকে গেলানোও হবে। এখন বুঝতে পারি, কেন সংসদ ভবনের পূর্বে পবিত্র শব্দটা যুক্ত করার প্রয়োজন দেখা দেয়।

গালি মানুষ কখন দেয়? অধিকাংশেরই বেলায়, যখন রাগ হয়, চরম রাগ, তখন। এখন কথা হচ্ছে আমার কি রাগ হয় না, গালি দিতে ইচ্ছা করে না? হয়, করে তো!
আমিও গেরাম-টাওনের পোলা, সাংসদ বইলা...।

Saturday, June 22, 2013

ব্যাং-ব্যাং, বুম-ম!

আমি বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করলাম, আমার অনেকগুলো পোস্ট উধাও। ওই পোস্টগুলোর প্রায় সবগুলোই মুক্তিযুদ্ধসংক্রান্ত। আসলে ওই সময়টায় এই বিষয়গুলোর উপরই লিখছিলাম।

এমনটা হতে পারে নির্দিষ্ট একটা টাইমলাইনটা দেখাচ্ছে না বা বাগ হতে পারে যার জন্য দায়ী ব্যাটা জুকারবার্গ। এমনটা হলে কিছু করার নাই কারণ ব্যাটা জুকার মাগনা লিখতে দিচ্ছে, একে গাল দেই কেমন করে!

কিন্তু আমি বোঝার চেষ্টা করছি, আসলে এর জন্য দায়ী কে? জুকার, না 'হুকার'?
হ্যাকারকে আমি আদর করে 'হুকার' ডাকি। তবে আমার এখনও বিশ্বাস, এটা জুকারের কান্ড!
 

আমার এক ফেসবুকবন্ধুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, 'মিয়া, বিষয় কী'।
ও যেটা বলল, জুকারের বিবাহের পর থেকেই নাকি সমস্যার-পর-সমস্যা হচ্ছে!
রসিকতাটা আমার খু্ব পছন্দ হয়েছিল। আজকালের পোলাপানরা রসিক আছে, বড়ই রসিক! এরা সব কিছুতেই আমাদেরকে ছাড়িয়ে যায়।

এমনিতেও এই ব্যাটা জুকারকে আমার ভ্যাবলা টাইপের মনে হয়। শুনে অনেকে রে রে করে তেড়ে আসবেন। এই বিষয়ে আমার সাফ কথা, একদা এক টিকটিকি একটা ডিম পেড়েছিল। কোনো এক বিচিত্র কারণে সেই ডিম ফুটে ডায়নোসর বেরিয়েছে। সেই ডায়নোসর ক্রমশ পৃথুল হচ্ছে!

আমার বিশ্বাস, সমস্যাটা ফেসবুকেরই কারণ এদের অনেক ধরনের ঝামেলা আছে। ওদিন একজন বলছিলেন, আপনি তো দেখি সারাদিনই অনলাইনে থাকেন। শোনো কথা, আমি না-হয় কাজের কোনো লোক না কিন্তু তাই বলে অকাজের অভাব কী আমার যে, আমি সব ফেলে সারাদিন-রাত ফেসবুকে পড়ে থাকব, কোন দুঃখে!

কিন্তু...একটা কিন্তু থেকেই যায়। বাই এনি চান্স, যদি, হুকার ভাইজানদের কেরামতি হয়ে থাকে- কারণ পোস্ট 'খাওয়া-খাওয়ির' একটা খেলা শুরু হয়েছিল!
খালি মাঠে কে কোন খেলা খেলবে এটা নিয়ে আমার আগ্রহ বাড়াবাড়ি রকম কম। কেবল আমার খেলায় কেউ ল্যাং না-মারলে অন্যদের খেলা নিয়ে উৎসাহ বোধ করি না।
কেবল সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা থেকে ধার করে বলি:
"...আমার খেলাটা, দোহাই
এখন থেকে আমাকেই খেলতে দিন।"
(ফড়েদের প্রতি)

তো, হুকার ভাইজান, 'খোদা-না-খাস্তা' যদি এমনটা হয়ে থাকে তাহলে আপনার
সঙ্গে আমার একটু বাতচিত করার খায়েশ হচ্ছে। সবিনয়ে বলি, আমাকে আটকাবার চেষ্টা করে লাভ নাই, ডিয়ার হুকার ভাইজান।

ফেসবুকের সমস্ত লেখাই আমার নিজস্ব ওয়েবসাইটে আছে। তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম, আপনি মিসাইল মেরে আমার নিজস্ব ওয়েবসাইটটাও উড়িয়ে দিলেন। বেশ-বেশ!

কিন্তু আবার দেখুন দিকি কান্ড, ওই লেখাগুলোই মুক্তিযুদ্ধের আলাদা একটা
সাইটেও আছে। আবারও তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম, ড্রোন হামলা চালিয়ে ওই সাইটও ধসিয়ে দিলেন। বাকাপ, হুকার ভাইজান, বাকাপ!

ব্যাপআপ কিন্তু রয়ে গেছে...!

তাছাড়া বুঝলেন, মুশকিল হয়ে গেল যে, মুক্তিযুদ্ধসংক্রান্ত ওই সমস্ত অধিকাংশ লেখাই যে আবার প্রিন্ট মিডিয়ায়ও আছে। এখন হুকার ভাইজান, আমার ওই বইগুলোর কী করবেন? বনফায়ার, আগুন ধরিয়ে দেবেন? তা দিলেন, ভাল-ভাল!

ভারী কুন্ঠিত হয়ে বলি, ওদিন একটা খসড়া হিসাব করে দেখলাম, এখন পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধসংক্রান্ত যে সমস্ত লেখা লিখে ফেলেছি; তা কয়েক লক্ষ শব্দ হবে।

এর মধ্যে থেকে কেবল একটি শব্দও যদি কোনো যুবকের মাথার করোটিতে গেঁথে গিয়ে থাকে, নিমিষেই আমার জায়গায় সেই যুবকটি চলে আসবে।

আর সে আমার মত ভঙ্কুর, লক্কর-ঝক্কড় হবে না, তার হাতে আমার মত মরচেধরা ভোঁতা হাস্যকর অস্ত্রও থাকবে না। তার কাছে থাকবে, ঝাঁ-চকচকে স্টেইনলেস স্টিলের তরবারি। যে তরবারি দিয়ে সে ছিন্নভিন্ন করে ফেলবে অন্ধকার, সমস্ত অপশক্তি।

ব্যাং-ব্যাং, বুম-ম! আমি তীব্র আগ্রহের সঙ্গে সেই মানুষটির অপেক্ষায় থাকব...।

Wednesday, June 19, 2013

ফাইভ হানড্রেড ডেইজ!

অনেকের হয়তো মনে আছে, ২০১২ সালের জানুয়ারি মাসের ২০ তারিখের পত্র-পত্রিকায় ছেয়ে গিয়েছিল। কাঁপছিল পত্রিকা ছাপাবার যন্ত্র, কাঁপছিল দেশও। কী, ঘটনা কী?! সরকার উৎখাতের চেষ্টা ব্যর্থ। কী সর্বনাশ-কী সর্বনাশ! গণতান্ত্রিক একটা সরকার উৎখাত করার অপচেষ্টা!

আমাদের পোষা বেড়াল আমাদেরকেই বলে, ম্যাও!

পূর্বে একটা লেখা দিয়েছিলাম [১] আমাদের রেলওয়ের জমি অধিগ্রহন করা নিয়ে। এরা প্রয়োজনের চেয়ে মাত্রাতিরিক্ত জমি অধিগ্রহন করার অপচেষ্টা করছে।

গতকালই গঙ্গাসাগর বাজারে এর প্রতিবাদে এক মানববন্ধন হয়। প্রায় সবার বক্তব্য অবিকল। রেল প্রয়োজনে জমি নিক কিন্তু অহেতুক স্থাপনাগলো নষ্ট  করে না। এদের এই সব উম্মাদসুলভ আচরণের কারণে ৯০০ বছর পুরনো মন্দিরও নষ্ট হবে!
এই গঙ্গাসাগরের আজ আর সেই দবদবা নেই কিন্তু এই গঙ্গাসাগরেই ছিল ত্রিপুরা মহারাজের কাচারিঘর। ত্রিপুরা মহারাজ এখানে অবকাশ যাপনও করতেন। এখনও এই স্থাপনাগুলোর কিছু-কিছু অংশ অবশিষ্ট আছে।

আজ যে আমাদের বেতনভুক্ত কর্মচারী, রেলওয়ের বড়-বড় লাট সাহেবরা এডিবির, ভারতের টাকার জোরে লম্বা-লম্বা বাতচিত করছেন, এই ব্যাটারা জানেও না যে রেলের জন্য এই সমস্ত জমি তাদের বাপ ত্রিপুরার মহারাজের দেয়া। পূর্বে যেটার নাম ছিল, 'আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে'।

এবং এখন যে গঙ্গাসাগরের জায়গার খু্ব প্রয়োজন হবে ভারতের সঙ্গে রেলসংযোগ স্থাপনের জন্য যে কারণে এরা বিনষ্ট করছে বাজার-হাট সব। অথচ গঙ্গাসাগর স্টেশনের পাশেই বিশাল এক দিঘী, 'গঙ্গাসাগর দিঘী'! ন্যূনতম সাড়ে ছয় লক্ষ স্কোয়ার ফিটের এই দিঘী অযথাই পড়ে আছে এবং এটা সরকারী জায়গা। এরা ইচ্ছা করলে বাজারটা বিনষ্ট না-করে এই দিঘী ভরাট করেও অনেকটা জায়গার ব্যবস্থা করতে পারে।
কিন্তু এরা এটা করবে না। শ্লা, এরা জাংক ফুড খাওয়া ফার্মের মুরগির বাচ্চা, এরা কী বুঝবে ঐতিহ্য কাকে বলে!

এডিবি নামের লালমুখো বাঁদর এবং ভারতের দাদারা নিজেদের দেশের স্খাপনাগুলো বুকে আগলে রাখবে। লোকজনকে দেখিয়ে দেখিয়ে পয়সা লুটবে।
ওহে, দাদারা, তোমাদের তাজমহল গুঁড়িয়ে দাও না দেখি হে, বাপু। এটা ভেঙ্গে একটা ওভারব্রীজ বানাও দিকি, শাঁ-শাঁ করে গাড়ি যাবে যেটা দেখে প্রয়োজনে আমরা মুত্র চেপেও হলেও বলব, ওয়াও, কী সোন্দর-কী সোন্দর! আর তাজমহল নামের এই সাদা ভবনটায় আছেটা কী, বা...?

আমরা জানি, রেল বলি, আর এডিবি, ভারত সবাই ক্ষমতাসীন দলের কাঁধে বন্দুক রেখে আমাদেরকে শিকার করবে। এতে কোনো সন্দেহ নাই, আমাদের ট্যাক্সের পয়সায় পোষা কর্মচারী, এরা আমাদের টাকায় কেনা অস্ত্রগুলো আমাদের বিরুদ্ধেই ব্যবহার করবে। ক্ষমতাসীন দলগুলো তাদের হলুদ দাঁত বের করে যখন বিজয়ের হাসি হাসবে তখন আমরা দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করব।
শেষ হাসিটা হাসব আমরাই, সবগুলো দাঁত বের করে। যার নমুনা আমরা দেখেছি, চারটা সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে। এ তো কেবল তবলার ঠুকঠাক, গান তো এখনও শুরু হয়নি...।
 

সহায়ক সূত্র:
১. ভাল দাম পেলে: http://tinyurl.com/ksu6jl4



*গঙ্গাসাগর, ছবি ঋণ: সাদিক মোহাম্মদ আলম  
**কালের কন্ঠ: http://www.kalerkantho.com/print_edition/index.php?view=details&type=gold&data=news&pub_no=1276&cat_id=1&menu_id=56&news_type_id=1&index=9#.Ub7VgthCLFw


***এরা ভেঙ্গে ফেলতে চাইছে চন্দনসার এলাকার তিন-তিনটি খাদ্য গুদাম ১০০ বছরের পুরনো ব্রিটিশ স্থাপনা। অথচ এখানে রয়েছে তিন-তিনটে লাইন! একটায় গাড়ি গেল, একটায় আসল, অন্যটায় শান্টিং করলেও এখানে তিনটে লাইনের বেশি প্রয়োজন থাকার প্রশ্নই আসে না কারণ এটা স্টেশন না যে এখানে চৌদ্দটা লাইনের প্রয়োজন হবে:

 

Monday, June 17, 2013

ভাল দাম পেলে...!

পূর্বেও লিখেছিলাম, আমি যে বাড়িটায় থাকি এটা ব্রিটিশদের করা। এই বুড়া বাড়িটার বয়স ১০০ ছুঁইছুঁই! অনেকে বলে বেড়ান, এটা ভূতের বাড়ি। বলুক, তাতে আমার কী! ভূত তার মত থাকে, আমি আমার মত থাকি, সমস্যা হয় না, চলে যায়...।

কিন্তু এটা অনেকে জানেন না যে বাড়িটা অভিশপ্ত। এ আটকে ফেলেছে আমাকে! সবার হাতে যখন একটা করে ক্যারিয়ার তখন আমার হাতে টিফিন-ক্যারিয়ার! এর পেছনে এই অভিশপ্ত বাড়িটা যে কলকাঠি নাড়েনি এটা বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি না! তবুও এই বাড়িটা আমি এই গ্রহের সবচেয়ে সুন্দর বাড়িটার সঙ্গেও অদলবদল করার গোপন কোনো ইচ্ছা পোষণ করি না!

অনেকের হয়তো মনে আছে মাত্র কয়েক কিলোমিটার রাস্তা ভারত করে দিয়েছিল বলে, পেছনে তিন চাপড় মেরে, আমরা আমাদের সমস্ত নদীতে বাঁধ দিয়ে রাস্তা করে দিয়েছিলাম যেন ভারত তার মালসামান নিয়ে যেতে পারে। লক্ষ-লক্ষ মানুষের বারোটা বাজিয়ে, জীব-বৈচিত্রের তেরোটা বাজিয়ে...! [১]
আমরা খুবই-ই অমায়িক গুখোর! আমরা অল্প কয়টা টাকা পেলে অবলীলায় মাকেও বিক্রি করে দেই- মার কিডনি, ফুসফুস, লিভার, সব-সব...।

হালে এডিবি এবং ভারত মিলে নতুন একটা ঢং শুরু করেছে। ডাবল রেললাইন হবে, এডিবি টাকা দেবে। আবার ভারতও টাকা দেবে আরেকটা রেললাইন বসাবার জন্য, ওটায় কেবল ভারতের গাড়িই চলবে। ভাবখানা এমন, যেই টাকা দেবে রেলবিভাগ একটা করে রেললাইন বসিয়ে দেবে!
শ্লা, আমার অনেক টাকা থাকলে রেলওয়েকে আরেকটা লাইন বসাবার জন্য টাকা দিতাম। একটা রেলগাড়ি নিয়ে সকাল-সকাল বাথরুম সারতে বেরিয়ে পড়তাম। অনেকের কাছে আইডিয়াটা ভাল নাও লাগতে পারে কিন্তু কী করা, শখ বলে কথা! টাকা নাই বলে শখ চেপে আছি আর কী...।

এখন আমাদের ধর্মবাপ এডিবি এবং আমাদের দাদাভাই ভারতের জন্য রেললাইন পাততে হবে এই দোহাই দিয়ে, বাংলাদেশ সরকার মাইলের-পর-মাইল জুড়ে, রেললাইনের দুপাশে শত-শত ফুট জায়গা অধিগ্রহন করার কাজ শুরু করেছে। এতে করে নিচিহ্ন হবে শত-শত বছর পুরনো হাট-বাজার, হাজার বছরের পুরনো মন্দির, শতবর্ষ পুরনো স্থাপনা।
বাট, হুজ কেয়ার...!

কেউ যদি আমাকে প্রশ্ন করেন, আপনি কী চান না চট্টগ্রাম-ঢাকা রেললাইন হোক, যাত্রার সময়টা কমে আসুক? অবশ্যই চাই, চাইব না কেন? কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, অনেক জায়গায় রেলের মূল লাইনের পাশেই আরও দুইটা লাইন থাকার পরও এরা শত-শত ফুট জায়গা নিচ্ছে যেটার আদৌ কোনো প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। অন্য পাশ দিয়ে আবার আরও একটা লাইন আছে...।
তো, এই তিনটা লাইন সংস্কার করে নিলেই নতুন করে আর লাইনের প্রয়োজনই হয় না অনেক জায়গায়।
কিন্তু এডিবি নামের আব্বা বলেছে, ব্যস। ভারত নামের দাদারা বলেছে, ব্যস, আর যায় কোথায়, পেতে দাও...। টাকার টাকা পাইলাম, রেললাইনের রেললাইনও পাইলাম...মজার বিষয়টা এখানে অহেতুক তাই আর উল্লেখ করলাম না।

তারপরও জনস্বার্থে আমরা আমাদের নিজস্ব জায়গা দিতে রাজি তবে অহেতুক না। রেলের দুপাশেই অন্তত ৩৫ থেকে শত ফুট রেলের নিজস্ব জায়গা আছে। যথার্থ  প্রয়োজন মনে করলে আমরা আমাদের ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি থেকে আরও না-হয় পঁচিশ-ত্রিশ ফুট জায়গা ছেড়ে দেব কিন্তু শত ফুট কেন!
এডিবি বলছে ব্রিটিশ আমলে এতো এতো জমি অধিগ্রহন করা হয়েছিল। ওরে ব্যাটা তস্কর, তোদের কাছে কী এই আঁক কষা নাই রে যে বিট্রিশ আমলে বাংলাদেশের এই আয়তনেই লোকসংখ্যা কত ছিল? তর্কের খাতিরে না-হয় ধরেই নিলুম, ধরেবেঁধে এক কোটি। এখন বাংলাদেশের লোকসংখ্যা কত রে? ন্যাকা, ব্যাটা তোমরা জানো না এটা, আমাদের এই দেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারে লোকসংখ্যার ঘণত্ব কত? সারা দেশে কেবল রেললাইন পাতলে লোকজন যাবেটা কোথায়, সাগরে? নাকি শ্লা তোমরা তোমাদের দেশে আমাদের দলে দলে যাওয়ার জন্য ভিসা দেবে?

এরা টাকার লোভ দেখায়। আমি এদের একজন উঁচুপদের কর্মকর্তাকে বলছিলাম, আপনারা যে বারবার বলছেন, ক্ষতিপূরণ দেবেন, নতুন করে সব করে দেবেন। আমার শতবর্ষের পুরনো ব্রিটিশদের স্থাপনা নষ্ট করে নতুন করে ঝা-চকচকে কী ছাতাফাতা বানিয়ে দেবেন আমাকে, বা...?
আরে, এরা তো হচ্ছে টবের গাছ, এরা কখনই বুঝবে না যে আমরা হচ্ছি, নারকেল গাছ! আমাদের শেকড় ছড়িয়ে থাকে অনেক দূরে। আমরা তো তোদের মত না রে, তোদের মত ফেলে দিয়ে আসি না...। আমরা বাপ-দাদাকে বুকে জাপটে ধরে আগলে ধরে রাখি বছরের-পর বছর ধরে...।


সহায়ক সূত্র:
১. তিতাস...: http://www.ali-mahmed.com/2011/12/blog-post_23.html
২. কালের কন্ঠ: http://www.kalerkantho.com/print_edition/index.php?view=details&type=gold&data=news&p-ub_no=1275&cat_id=1&menu_id=56&news_type_id=1&index=17#.Ub2ZqNhCLFw

Saturday, June 8, 2013

উঁচু তলার সাতকাহন: ২

আজকের অতিথি-লেখক, আবারও, EmOn SarWar 
এর পূর্বে তিনি লিখেছিলেন, উঁচু তলার সাতকাহন [১]। আজ লিখছেন:
"২০০০ এর প্রথম দশকের কোন এক নভেম্বর মাসের কথা। চাকুরির কারণে সৌদি আরব গেছি। দিন-বারোর এক রাষ্ট্রীয় সফরের প্রতিনিধি দলের লেজের আগার এক গোছা চুলের মত ঝুলে-ঝুলে নানা স্থানে যাচ্ছি। কেমন-কেমন করে যেনো পাঁচ তারকা হোটেল কিংবা রাজকীয় অতিথিশালায় থাকার সুযোগ হয়ে যাচ্ছিল।

সফরের প্রথম ভাগে মদিনায় থাকতে হয়েছিল বেশ কদিন। মদিনার পবিত্র মাটিতে প্লেন ল্যান্ড করার আগ মুহুর্ত পর্যন্ত মনে হচ্ছিল, মদিনার বাতাস গায়ে লাগার সঙ্গে-সঙ্গে স্বর্গীয় অনুভূতিতে মুহ্যমান হয়ে পড়ব। সন্ধ্যা ৭ টার দিকে যখন বিমানের দরোজা খুলে সবার আগে বেরুলাম, মুখে একটা গরম হাওয়ার ঝাপ্টা লাগলো শুধু। ভিআইপি টারমাক দিনের আলোর মত জ্বল জ্বল করছে! নিচে 'তাগিয়া-গুতরা' মাথায় বেশ কিছু সৌদি সরকারি লোক দাঁড়িয়ে আছে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য। সৌদি রাজকীয় প্রহরী বাহিনির লোকজনও আছে।

প্লেনের দরজায় লাগানো হয়েছে একটা খোলা লিফ্ট, অনেকটা শোরুমে গাড়ি উঠানো নামানোর জন্য যেগুলো ব্যবহার করা হয়, সেরকম। সৌদি আরবে নিয়োজিত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত বেশ স্মার্ট মানুষ, ঢাকার নবাব পরিবারের সদস্য। সারা জীবন কাটিয়েছেন মধ্যপ্রাচ্য আর রাশিয়ান ব্লকে কাজ করে। তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে খুব অল্প সময়ে প্রটোকল পর্ব শেষ করে আমাদের হোটেলের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করিয়ে দিলেন। মদিনার ওবেরয় ইন্টারন্যাশেনাল হোটেল। মসজিদে নববীর পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। রুমে যেয়ে কার্ডে রুমরেন্টের সুচী দেখে চোখ চড়ক গাছ! এখানে রুমের ভাড়া পজিশন ভেদে কম বেশী আছে।

'হারাম ফেসিং' (মানে মসজিদের দিকে মুখ করা) রুমের ভাড়া অন্য রুমগুলির চেয়ে প্রায় দুগুণ বেশী। থাইল্যান্ডের পাতায়ায় যেমন, সী ফেসিং রুমের ভাড়া বেশী হয়। আমাদের কক্সবাজারেও কি এমন কিনা জানা নেই। তবে এত দামী কামরা বরাদ্ধ হলেও, অবস্থান করার সময় খুবই কম। রাতে ২ ঘন্টার বেশী ঘুমানোর সময় নেই। দিনে রাতে নানা সময়ে সৌদি রয়্যাল গার্ডের সদস্যদের সাথে করিডোরে দাঁড়িয়ে পাহারা দেই। আমাদের ৪ জন ছাড়া ওরা কাউকেই বিশ্বাস করে না। যেই আসুক, খুব রুক্ষ ভাব-ভংগি করে অনেক্ষণ দাঁড় করিয়ে রাখে। প্রতিনিধি দলের সদস্যদেরও অনেক সময় ওদের হাতে হেনস্ত হতে হয়।

ওদের দলনেতা, মেজর আলি। ভাংগা-ভাংগা ইংরেজিতে কথা বলতে পারেন। গার্ডরা, কেউ এলেই আগে আমাদের ডেকে আনে। আমরা সম্মতি দিলে, মেজর আলির কাছ থেকে আদেশ নিয়ে তারপরেই হোটেলের এ অংশে কাউকে ঢুকতে দেয়। যাওয়ার পর দ্বিতীয় দিন বিকেলে হঠাৎ আমাদের কাছে খবর এলো, বাংলাদেশি রাজনৈতিক দলের সৌদি শাখার প্রধান তিন নেতাকে সৌদি পুলিশের কাছে দেওয়া হয়েছে। আমরা যেনো তাদের একটু ছাড়ানোর ব্যবস্থা করি। প্রতিনিধি দলের, 'কাঁচা-পাকা চুলের গোঁফধারি সদা-হাস্যময়', রাজনৈতিক সমন্বয়কারি, রাষ্ট্রদুতকে বলে সৌদি বিদেশ মন্ত্রণালয়ের মধ্যস্থতায় তাদের ছাড়ানোর ব্যবস্থা করলেন।

পরে জানতে পেরেছিলাম, ওই নেতারা আমাদের হোটেলের গেটে এসে নিজেদের দলের নিজেদের কলহের কারণে মারামারিতে লিপ্ত হয়েছিলেন। তাই সৌদি পুলিশ তাদের ধরে উত্তম-মধ্যম দিয়ে জেলে পুরে দেয়। সৌদি আরব গিয়ে দেখি, ওখানে আমাদের আগেই পৌছে গেছেন অনেক জাতীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। প্রায় সবাই সস্ত্রীক, আল্লাহ আর তাঁর রাসুলের কৃপা লাভের জন্য মহা উদ্যমে প্রতি ওয়াক্ত মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়েন। শুনেছি, থাইল্যান্ডে গেলে, উনারা কেউই স্ত্রীদের সাথে নিয়ে যান না। মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ে আল্লাহর প্রতি আনুগত্য প্রকাশে উনাদের যত আগ্রহ তার চেয়ে বেশি আগ্রহ আমাদের মধ্যমনির কাছে এক মুহুর্তের জন্য হলেও দেখা দেওয়া। ঢাকার 'দৌড় উদ্দিন', চট্টগ্রামের 'সোনা মিয়া চৌ' এদের মধ্যে সবচে বেশি সফল ছিলেন।

প্রতিদিন সময় কাটে নামাজ আর শপিং-এ। সারা রাত ক্কিয়াম আল লাইল এর নামাজ পড়ে, পরদিন আসর পর্যন্ত ছুটি। মাঝের দু ওয়াক্ত নামাজ, ফি আমানিল্লাহ । আসরের নামাজের আগে যখন দল বেঁধে মসজিদে ঢুকতাম, দূর থেকে 'হালকা গোলাপি' রঙ্গের ছড়াছড়িতে দেখে মনে হতে পারত, দুধ আর আলতার একটা নহর বয়ে যাচ্ছে। চার পাশে নানান দেশের সকল মানুষ দাড়িয়ে কৌতুহল নিয়ে তামাশা দেখত ।
ইফতারের প্রথম পর্ব হয় মসজিদে মাগরিবের নামাজের সময়, বাকিটা হোটেলে ফিরে। আমাদের ফ্লোরে স্পেশাল ব্যুফে লাগানো হয়েছিল। আমি যাই কিন্তু খুব একটা খেতে পারি না। লাবান আর পানি খেয়েই আমার পেট ভর্তি থাকে। কিন্তু দলের সব হোমরা-চোমরা সদস্যদের দেখে মনে হত, যেন ফাঁসির খানা খাচ্ছেন। এক্কেবারে 'Dog in the Menger' অবস্থা! জেনে, না জেনে সব কিছুই তাদের খেতে হবে। যা আছে তার আইটেম, সবই তাঁদের খাওয়া চাই।

আমরা শপিং-এ যাই। যাই মানে উনি যান- যথারীতি ওঁর সঙ্গে আমাদেরকেও যেতে হয়! উনি, উনার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সোনার গহনা, ঘরের পর্দ্দা, সুইস ঘড়ি, মাদার কেয়ারে বাচ্চাদের জিনিস, সব কিছুই দেখেন, কিন্তু কিছুই কেনেন না। আমার লজ্জা লাগে! চারদিকে এতো নিরাপত্তার লোকজনসহ কোনো দোকানে গেলে দোকানের অন্য ক্রেতারা বেরিয়ে যায়। দোকানের ম্যানেজার এসে খাতির যত্ন করে সব দেখান, দাম বলেন। কিন্তু এরপর কিছু না-কিনেই আমরা বেরিয়ে আসি।

প্রথম দিন খুব অবাক হচ্ছিলাম। পরে হোটেলে এসে দেখি, এক গৌরিসেন আছেন আমাদের দলে। যেসব জিনিস নাড়াচাড়া করা হয়েছিল, সবই উনি পরে গিয়ে কিনে নিয়ে আসেন। বুঝতে পারলাম, অপারেশন দু'পর্বে ভাগ করা। প্রথম পর্বে পর্যবেক্ষণ ও পছন্দ, দ্বিতীয় পর্বে ক্রয় ও ডেলিভারি।

আমি আরব ভুমিতে গিয়েও ভুদাই বনে গেলাম। তা এই গৌরি সেন নিঃসঙ্কোচে লুংগি-পাঞ্জাবি পড়ে পাঁচ তারা হোটেলে ঘুরে বেড়ান, শপিং করেন, খেতে যান। আমার সাথে বেশ খাতির হয়ে গেল উনার। একদিন, সোনালী ফ্রেমে বাধাই করা ক্কাবা শরীফের দরজার একটা মিনিয়েচার কপি এনে আমার হাতে দিয়ে বললেন, 'আব্বা, এটা রাখেন, আপনার জন্য নিয়া আসছি'।

এই হোটেলের অন্য এক ফ্লোরে থাকতেন পাকিস্তানের নির্বাসিত প্রধানমন্ত্রী নেওয়াজ শরীফ। আমার সঙ্গে দু'বার একই লিফ্টে সস্ত্রীক উঠানামা করেছেন। আমি প্রথমে চিনতে পারিনি! বিরলকেশ, মধ্য পঞ্চাশের মন খারাপ করা চেহারা। টাকের পেছন দিকটায় যেকটি চুল ছিল সব কাশবনের মত সাদা। আমি লিফ্টে উঠে নড করতেই বললেন, 'আপ বাংগালি হো'?
আমি বললাম, 'ইয়েস স্যার'।
উনি বললেন, 'ভেরি গুড'।
লবিতে নেমে উনি চলে গেলেন। পেছন থেকে কাবুলি সেলোয়ার-কামিজ পরা এক লোক এসে আমার কাঁধে হাত দিয়ে জিজ্ঞেস করল, 'আপ, মিঞা কি সাথ হো'?
পিঠে হাত দেওয়াতে মেজাজ খারাপ হয়ে গিয়েছিল। আমি চোখ গরম করে বললাম, 'who is mia and who the hell are you'? লোকটি আর কিছু না-বলে কেটে পড়ল।


পরে জানতে পেরেছিলাম, নেওয়াজ শরীফকে পাকিস্তানের লোকেরা মিঞা বলে ডাকে। আমাকে প্রশ্ন করা লোকটি হয়ত 'আই এস আই'-এর এজেন্ট ছিল। আজকাল টিভিতে দেখি, নেওয়াজ শরীফের মাথায় আর টাক নেই, চুলও সব কালো। ক্ষমতা আর টাকা সবই দিতে পারে! আবুল মনসুর আহমেদ একবার বলেছিলেন, টাকা দিয়ে আর যাই হোক কিন্তু টাক সারানো যায় না; তা না হলে খাজা নাজিমুদ্দিনের মাথায় টাক থাকতো না। আজ বেঁচে থাকলে উনি লজ্জা পেতেন।

এর কিছুদিন পর ঢাকায় পারভেজ মোশারফ সাহেবের সাথে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। সোনার গাঁ হোটেলের ৮ তলার করিডোরে দাঁড়িয়ে প্রায় দুমিনিট কথা বলেছিলেন তিনি। সেদিন নেওয়াজ শরীফ নির্বাসনে ছিলেন আর মোশারফ মহা দর্পে পাকিস্তান শাসন করেছেন। আজ পাশা পাল্টে গেছে। মোশারফ অপেক্ষায় আছেন, নেওয়াজ শরীফ হয়তো তাকে জেলে না-ঢুকিয়ে নির্বাসনে যাবার সুযোগ দেবেন...।"

সহায়ক সূত্র:
উঁচু তলার সাতকাহন...: http://www.ali-mahmed.com/2013/06/blog-post_7.html

Friday, June 7, 2013

উঁচু তলার সাতকাহন...

আজকের অতিথি লেখক, EmOn SarWar তিনি লিখছেন এমন এক অজানা বিষয় নিয়ে যা সচরাচর আমরা জানতে পাই না। EmOn SarWar-এর হাত ধরে আমরা ঘুরে আসি:
"আমার এই ছোট জীবনে নানান সময় অনেক বড় বড় মানুষের অতি ছোট খেদমতগার হিসাবে কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছিল।


২০০৩ সালের গোড়ার দিকের কথা। বাংলাদেশের ওয়ারেন্ট অফ প্রেসিডেন্সের এক নম্বর ব্যক্তিকে পাহারা দেওয়ার জন্য সব সময় উনার সঙ্গে থাকতে হতো। প্রতিদিন সকালে উনি উনার ৫৩ একর এলাকা জুড়ে থাকা বিশাল বাসস্থান তথা দপ্তরের ভিতরের রাস্তায় প্রায় ঘন্টা খানেক ধরে হাঁটতেন। আমাদেরকেও হাঁটতে হত তাঁর সঙ্গে। উনি মহামান্য হলেও উনার আচরণ কিংবা কথাবার্তা মোটেও মহানানুভব সুলভ ছিল না। প্রায়ই উনার কথাবার্তা আর অভিযোগ অনুযোগ আমাদের হাসি আর বিরক্তির খোরাক যোগাত।

একদিন ওনার শখ হল, গ্যারাজে গিয়ে উনার ব্যক্তিগত ডাবল ই হান্ড্রেড গাড়ীটি পরিদর্শন করবেন। বিশাল উঁচু দেওয়ালে ঘেরা কম্পাউন্ড, তার ভিতরের আবার বাউন্ডারি আর লোহার গেট দেওয়া গাড়ী রাখার স্থান। সেই সুরক্ষিত চার দেওয়ালের নিরাপত্তা বেষ্টনীর মাঝে কয়েক ডজন অতি দামি গাড়ীর সাথে একটা কুঠরিতে উনার ব্যক্তিগত গাড়িটি যত্ন সহকারে রাখা, বড় কভারে ঢাকা। কভার খোলা হল, নেকাবের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো রূপসী টয়োটা সেডান, সাদা রঙের। জানতে পারলাম, একজন খেদমতগার প্রতিদিনই গাড়িটিকে দলাই-মলাই করে, ইঞ্জিন স্টার্ট দিয়ে কিছুক্ষণ রক্ষণাবেক্ষণ করে।
হঠাৎ শুনি, ওঁর বিজ্ঞ মুখে দ্বিধাপুর্ণ প্রশ্ন, 'এইগুলি তো আমার গাড়ির চাক্কা না! মাত্র দুই বছর আগেই তো নতুন চাক্কা লাগাইলাম। এই গুলা তো পুরানা চাক্কা। আমরা মানুষ গরীব হইতে পারি কিন্তু আমাগো জিনিস থাকে ফিট্ফাট'।
কেউ সাহস করে বলতে পারলো না যে এই নিরাপত্তার বেড়াজাল ভেঙ্গে, আট-দশটি ভিন্ন-ভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার চোখ ফাঁকি দিয়ে কিংবা কম্প্রমাইজ করে, ওঁর এই টয়োটা গাড়ির চাকা কারো পক্ষে বদল করা কিংবা চুরি করা সম্ভব নয়। যাহোক উনি খুব রাগ করলেন এবং নিজের ও ভবনের নিরাপত্তা নিয়ে যারপর নাই সন্দেহ প্রকাশ করে ফিরে আসলেন।

অন্য আরেকদিনের কথা। সকাল বেলা বিরাট ঝামেলা, গাছে নাকি উনি গতকালও ৬১ টি আম গুনে রেখেছেন আজ সেটা হয়ে গেছে ৫৭ টা! উনার উক্তি, 'বেড়ায় যদি ক্ষেত খায়, তাইলে ক্যামনে কি'?
আমি মহা লজ্জা আর বিরক্তি নিয়ে আম্রপালি অনুসন্ধানের চেষ্টা করলাম, সবই বৃথা। ভবনের সেপ্টিক ট্যাঙ্ক অনুসন্ধানের মত কোন প্রযুক্তি তো আর আমার হাতে ছিল না।

একবার উনার নানা ধরনের পাখি পালনের শখ হল। বাসার ঠিক পেছনের উঠানে বিশালকায় পাখির খাঁচা বানানো হল কিন্তু ঠিক উনার মন মতন হচ্ছিল না। উনার প্রশ্ন, 'আমি একজন মহামান্য, আমার আদেশ যদি ঠিকমত পালন না হয় তাইলে ক্যামনে কি'?
যাহোক, যে ধরনের নকশার কথা উনি কি বোঝাতে চাইছিলেন বেচারা ইঞ্জিনিয়ার ঠিক বুঝতে পারছিলেন না। শেষে মহামান্যের ইচ্ছা মতন খাঁচা হল না তবে ইঞ্জিনিয়ারের কল্পনা থেকে বানানো খাঁচাতেই পক্ষি পালন শুরু হল।


বিশাল দীঘি গুলোতে রাজহাঁস ছাড়া হল। ওরা সাঁতরে বেড়াবে দীঘি জুড়ে। উনার ইচ্ছা, উনি যখন দীঘির পাশ দিয়ে হেঁটে যাবেন হাঁসরা কৃতজ্ঞতা ভরে প্যাঁক-প্যাঁক করে সাঁতরে বেড়াবে। কিন্তু হাঁসগুলোও মহা ত্যাঁদড়। ওই সময়টাতে কোনো মতেও তাদের পানিতে নামানো যেতো না।
কদিন পর হঠাৎ উনার মনে হলো, হাঁসের ডিম কোথায় যায়! পরদিন থেকে আদেশ হল, প্রতিদিন সকালে, উনার প্রাতঃভ্রমন কালে, হাঁসের দায়িত্বপ্রাপ্ত খেদমত্গার হাতে ডিমের টুকরি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। উনি ধরে এবং গুণে দেখবেন। যে আদেশ সে কাজ! সকাল বেলা এক বেচারা হাতে ডিমের টুকরি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। উনি যাবার সময় মহা আগ্রহে ধরে আর গুণে দেখেন। কিন্তু কদিন যেতে না যেতেই উনার মনে নতুন প্রশ্ন: আচ্ছা, ওই ব্যাটা কি প্রতিদিন আমারে একই ডিম দেখায়?
লে হালুয়া!

কোথা থেকে একবার কিছু ছোট-ছোট কার্পেট ডগ নিয়ে আসা হল। সে গুলোকে নিয়ে উনার, উনার স্ত্রী আর পুত্রবধুর মহা সোহাগ আর আদিখ্যেতা। সকালে হাঁটতে বেরুলে চার পাঁচটা কুকুর পায়ের চার পাশে ঘুর ঘুর করতে থাকে। মাঝে মাঝে ঘেউ-ঘেউ করে জুতা বা প্যান্টের কিনারায় নোখের আঁচড় কাটে। মহা জ্বালা হয়ে দা!ড়াল!


একদিন হাঁটার সময় হঠৎ পেছন থেকে ক্যাঁ-ক্যাঁ-ক্যাঁ শব্দ! তাকিয়ে দেখি একটা কুকুর লেজ গুটিয়ে রাস্তার এক পাশে দাঁড়িয়ে। মহামান্য ছুটে গেলেন কুকুরটির কাছে। মুখে অনেক আদর আর সোহাগ নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমার কি হইসে? তোমারে পা দিয়া মাড়ায়া দিসে? কে দিসে'?
আমি প্রমাদ গুনলাম মনে মনে, এই বুঝি কুকুরটা অভিমান ভরা চোখে একটা পা বাড়িয়ে আমাকে দেখিয়ে দেবে! যাক, সে যাত্রায় বেঁচে গিয়ে ছিলাম, কুত্তার হাত থেকে...।"

অটল ইমারত এবং...!

রানা প্লাজা ধসে যাওয়ার পর একজন রাজমিস্ত্রি আমার বাসায় এসেছেন। এই বয়স্ক মানুষটা অনেকটা সুফি টাইপের! কোনো এক বিচিত্র কারণে আমাকে পছন্দ করেন। তাঁর সুখ-দুঃখের কথা শেয়ার করেন।
ওদিন বলছিলেন, 'এই দেখেন, দেশে যে বিল্ডিং সব পইরা যাইতাছে এর কারণ হইল আমাগো লোভ। সব দুই নাম্বার জিনিস...'।
আমি খুব একটা আগ্রহ দিয়ে শুনি না কারণ এ তো আর নতুন কিছু না! কিন্তু তার পরের কথা আমাকে চমকে দেয়! তিনি বলছিলেন, 'আপনে কি এখনকার রড দেখছেন, প্যাচাইন্যা'?
আমি বললাম, 'জ্বী, এর পেছনে কারণও আছে। যতটুকু জানি, কোনো কিছু প্যাঁচানো থাকলে, এর সহনশক্তি বেড়ে যায়'।

তিনি বাবরি চুল দুলিয়ে বললেন, 'ভালই বলছেন কিন্তুক...। আপনে কি দেখছেন, এই সব রড বাড়ি করার আগে মানুষ দিনের-পর দিন বাইরে ফালায়া রাখে। রডে জং ধরে! আমরা যারা পুরানা মিস্ত্রি আছি হেরা শিরীষ কাগজ দিয়া রডের জং সাফ করি। কিন্তু প্যাচাইনা রডের কারণে রডের জং সাফ করা যায় না, যতই চেষ্টা করেন এইডা কিন্তু সম্ভব হইব না। আপনে যখন ঢালাই দিবেন তখন এই রডের জংয়ের কারণে সিমেন্ট ভাল কইরা আটকাইতে পারব না। বিল্ডিংডা দুর্বল হইয়া যাইব। একটা সময় ভাইঙ্গা পড়ব'।
তাঁর কথায় যথেষ্ট যুক্তি আছে মনে হয়েছে কিন্তু এই বিষয়ে তেমন জ্ঞান নাই আমার। আমার বন্ধুতালিকায় কোনো ইঞ্জিনিয়ার সাহেব থেকে থাকলে এই বিষয়ে জানালে সুখি হই।
...
কালকের (৫ জুন, ২০১৩) দৈনিক সমকালের খবর হচ্ছে, 'অপ্রীতিকর ঘটনায় বঙ্গবন্ধু সেতুর টোল অপারেটর গ্রেফতার'। শিরোনাম দিয়ে পাঠক কিছুই বুঝতে পারবে না। তবে সংবাদটা পড়লে জানা যাবে যেটা, "...সেতুর প্রধান প্রকৌশলী জানান, ...'সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতি এমআর হাসান ...বঙ্গবন্ধু সেতুর পূ্র্বপাড়ে তিনি দুটি গাড়ির টোল না দিয়ে সেতু পার হতে গেলে বিনা টোলে সেতু পারের সিগন্যাল পেয়ে টোল অপারেটর আসাদ আলী গাড়ি দুটির গতিরোধ করেন। বিচারপতির নির্দেশে সেতু পশ্চিম থানার পুলিশ আসাদকে আটক করে'।"
পরে আমরা জানতে পাই, দায়িত্বরত আসাদ আলীকে কারাগারে পাঠানো হয়।

এটা ছাপা হয়েছে সমকালের ১৯ পৃষ্ঠায়, সিঙ্গেল কলামে। সমকালের সম্পাদকের যথেষ্ট অভিজ্ঞতা এবং বয়স হয়েছে, এখন তাঁকে এটা শেখানোটা এক পন্ডশ্রম যে, কোন খবরের কতটা গুরুত্ব, কোন খবর কোন পাতায় ছাপা উচিত বা শিরোনামই কী হবে! আর পাঠক ৮০০ থেকে ১০০০ পয়সা দিয়ে পত্রিকার প্রথম পাতার ছাতাফাতা নিউজ পড়ার জন্য মুখিয়ে থাকে না।

যাই হোক, বিচারপতির এই সংবাদটার বিষয়ে কিছু প্রশ্ন আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। বিচারপতি এমআর হাসানের কী এটা জানা ছিল না যে, টোল না-দিয়ে সেতু পার হওয়া যায় না? একজন বিচারপতির এটা জানা নেই! 

এদিকে সুপ্রিমকোর্টের রেজিস্ট্রার সমকালকে বলেন, "...টোল আদায়কারীর আচরণগত কারণে তাকে কারাগারে যেতে হয়েছে..."।
ভাল, টোল আদায়কারীর আচরণে সমস্যা ছিল। মানুষটার শাস্তি পাওনা ছিল, বেশ। আমরা পূর্বে এমনটা দেখেছি, কোনো কারণে বিচারপতি ক্ষুব্ধ হলে সংশ্লিষ্ট মানুষটিকে বা সেই সংস্থার কর্ণধারকে কোর্টে ডেকে নেয়া হয়েছে। একটা ন্যূনতম ট্রায়াল হয়েছে, প্রয়োজনে শাস্তির ব্যবস্থাও হয়েছে। পূর্বে একজন ট্রাফিক পুলিশের আচরণের কারণে এবং একজন আইজির আচরণ-বক্তব্য সন্তোষজনক না-হওয়ার কারণে তাকে ২০০০ টাকা জরিমানাও করা হয়েছিল এবং দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী এই জরিমানার কারণে সেই আইজিকে চাকুরিও হারাতে হয়েছিল।

এই ক্ষেত্রেও অন্তত এমনটা হলেও আমরা সুখি হতাম। কিন্তু এই প্রশ্নটা থেকেই যায়, বিচারপতির এটা জানা নেই যে টোল দিতে হয়?
আমরা জানি, একজন বিচারপতির এক্সেস ক্ষমতা বিপুল। তিনি অনেক ধরনের ক্ষমতা প্রয়োগ করার ক্ষমতা রাখেন। কিন্তু, একটা কিন্তু রয়েই যায়! সুপ্রিমকোর্ট আমাদের শেষ ভরসাস্থল। এই অটল স্থাপনা আমাদের অহংকার। কিন্তু যখন কোনো কারণে আমাদের মত সাধারণ মানুষদের মনে বিন্দুমাত্র বিশ্বাসের ফাটল ধরে তখন আমরা আতঙ্কিত হই...।

Friday, May 31, 2013

এক নব্য মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাৎকার!

(এটা একটা কাল্পনিক সাক্ষাৎকার। জীবিত দূরের কথা, তোতলা লাশ বা গলিত শবের সঙ্গেও যার মিল খোঁজা বৃথা।)

গেলাম আমি, ওই ...নামধারীর সাক্ষাৎকার নিতে।
সেখানে তখন অন্য একজন একটা কেলাশ নিচ্ছিলেন। 'কমরেডস (গালি), ডান পা তোল (গালি), বাঁ পা তোল (গালি), এবার দু-পা তুলে ফেলো (বাপ-মা তুলে গালি)। আমি কেলাশের নমুনা দেখে যারপর নাই মুগ্ধ। মুখ দিয়ে অজান্তেই বেরিয়ে এলো, 'উই মা'।
লাফাংগা টাইপের ওই পোলাকে আমি বললাম, 'তোমার বাবাকে ডেকে দাও। ওঁর একটা সাক্ষাৎকার নেবো।'
চ্যাংড়া পোলা দুর্দান্ত রাগে লাফিয়ে উঠলো, 'ওই, মুখ সামলাইয়া কথা বইলেন, কারে কি কইতাছেন, আমিই সেই মুক্তিযোদ্ধা।'

আমি তো তো করে বললাম, 'সরি, অ আচ্ছা, আপনিই তাহলে সেই ব্যক্তি, নব্য মুক্তিযোদ্ধা। আমি বুঝতে পারিনি! আসলে আপনার বয়স দেখে ধন্ধে ছিলাম।'
চ্যাংড়া মুক্তিযোদ্ধা, 'বয়স দিয়া কি হইবো, যুদ্ধ করার জন্য বয়স কোনো বিষয় না। যে-কোনো বয়সেই যুদ্ধ করা যায়।'
আমি চোখ কপাল থেকে নামিয়ে বললাম, 'না মানে, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল তো, এটা ২০১৩। আপনার বয়সটা ঠিক মিস খাচ্ছে না।'
চ্যাংড়া মুক্তিযোদ্ধা, 'আরে কী মুসিবত, আপনে আমার বয়সের পেছনে লাগছেন ক্যান? আপনি কি ঘটক পক্ষিভাই? আমার বিবাহের জন্য আসছেন, যে বয়স নিয়া ফালাফালি করতাছেন। শোনেন, আমি ওই সময় 'ছুট্টু' ছিলাম, তাতে কী হইছে! এখন যুদ্ধ মাঠ-ঘাটে হয় না, অনলাইনে হয়।'
এটা বলেই তিনি তার এক চ্যালাকে বললেন, 'অমার পিঠটা চুলকায়া দে।'
চ্যালাকে পিঠ চুলকাতে দেখা গেল না কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ওই চ্যালা বলে উঠল, 'দেখেন না, ভাইয়ের পায়ের আংঙুলগুলো ক্ষয় হয়ে গেছে। কী-বোর্ডের উপর লাফিয়ে লাফিয়ে এই অবস্থা।'

আমার মাথা ঘুরছিল, 'বলেন কি, কীবোর্ডের উপর লাফিয়ে-লাফিয়ে তিনি অনলাইনে যুদ্ধ করেন?'
নব্য মুক্তিযোদ্ধা বিরক্ত, 'ইয়েস, আপনের কুনু অসুবিধা?'
আমি টলে উঠে বললাম, 'না, মানে দয়া করে বলবেন কি, ঠিক কি ভাবে যুদ্ধটা করেন, মানে আপনার পদ্ধতিটা...।'
নব্য মুক্তিযোদ্ধা বললেন, 'দেখেন, আমার সবচেয়ে বড়ো অস্ত্র হচ্ছে, "ছাগু"। এটা আমার আবিষ্কার, যাকে খুশি তাকে ছাগু বলে শুইয়ে দেই। ছাগু মানে জানেন তো? 'ছালায় গু'।'

আমি খানিক থমকে গেলাম, 'না, ছাগুর এই মানে আমি জানি না তবে ছালা আর বস্তা এক জিনিস বলেই মনে পড়ছে, গুন্টার গ্রাস একবার বলেছিলেন, 'নোবেল হচ্ছে এক বস্তা গু'।'
'গুন্টার গ্রাস, এ আবার কোন গুন্ডা, এ কী আমার দল করে?
'জ্বী না।'
'তাইলে বাদ। কুনু লুক আমার দল না-করলে হে খেলা থিক্যা বাদ।'

আমি এবার বললাম, 'আপনি সব সময় কেবল বিশেষ মানুষকেই নিয়ে লেখেন কিন্ত এ দেশ স্বাধীন করার পেছনে এমন অনেক আগুনপুরুষ আছেন যাদের নিয়ে লিখতে আপনাকে দেখা যায় না, কেন?'
তিনি বললেন, 'আরে, আপনি তো বড়ো যন্ত্রণা করেন! হুনেন, দেশের চাইতে, মানুষের চাইতে দল বড়ো। মানুষ থাকল কি থাকল না এইটা কোনো বিষয় না, দল থাকলেই হইল। তাই আমি একজন 'দলবাজ, ছলবাজ'। এইটা আমার লেখাতেও পাইবেন।'
আমি বললাম, 'এবার অন্য একটা বিষয়, আজ যে আপনার খুবই আপনজন তাকেই কাল আপনি নগ্ন করে দেন, এটা কেন?'
তিনি এবার খেপে গিয়ে বললেন, 'আরে মিয়া দেখেন নাই, আমেরিকা লাদেন সৃষ্টি করে। কিন্তু পুত্র যখন বাপের জুতা পায়ে গলায় তখন তারেই আমেরিকা মাইরা ফালায়। আমিও তাই করি, করছি, হে হে হে...।'

তিনি আর সময় দিতে পারলেন না কারণ তখন জোরেশোরে কেলাশ চলছে, কমরেডস, ডান পা...।

Friday, May 24, 2013

বোতল-ব্যবসা এবং...!

[এই লেখাটা এখানে আগেও পোস্ট করা হয়েছে কিন্তু এর সঙ্গে আরও কিছু বিষয় জুড়ে দিতে হচ্ছে]
আগাম সতর্কতা: (অতি সূক্ষ রুচির লোকজনেরা, রুচিবাগীশ, যারা অল্পতেই  গা দোলান বা মনিটেরের পর্দা নড়লেই যাদের গা গুলায় তারা লেখাটা না-পড়লেই ভাল করবেন।)

পত্রিকার একটা খবর ছিল এমন, "ঢাকায় ৫৫ লক্ষ মানুষের জন্য ৪৫টি পাবলিক টয়লেট"
আমি অংকে বড়ো কাঁচা! তবুও একটা আঁক কষি, আনুমানিক ১ লক্ষ মানুষের জন্য প্রায় ১টা টয়লেট। ঢাকায় আমি যদি মূত্র-বিসর্জনের গোপন ইচ্ছা নিয়ে লাইনে দাঁড়াই তাহলে ক-দিন পর উক্ত কর্ম সম্পাদন করিতে পারিব? যারা অংকে ভাল তারা যদি দয়া করে আমাকে এই হিসাবটা করে দিতেন তাহলে সুবিধে হতো। কারণ ঢাকায় একবার মুত্রবিসর্জন করার জন্য আমাকে ক-দিন ঢাকায় থাকতে হবে সেই মতে আমার গাট্টি-বোঁচকা গোছাতাম আর কী!

ঢাকার মানুষেরা মূত্র বিসর্জন দেন কোথায় এই নিয়ে গভীর চিন্তায় ছিলাম। কিন্তু সৈয়দ আবুল মকসুদের 'নরমূত্র' লেখাটা পড়ে খানিকটা ধারণা হয়েছিল ঢাকার লোকজনেরা কেমন বেতমিজ! উহারা নাকি প্রকাশ্যে রাস্তায় মূত্র বিসর্জন করে। রাম-রাম! ঢাকা শহরের 'লুকজন এতো 'খ্রাপ'! মকসুদ স্যারের শ্বেতশুভ্র বসনে 'নরমুত্র' লেগে গেলে উপায় আছে!
এ অন্যায়-এ অন্যায়! সৈয়দ আবুল মকসুদ স্যারের শ্বেতশুভ্র বসন বাঁচাতে গোটা ঢাকা শহর এই সাইনবোর্ড লাগিয়ে ভাসিয়ে দিতে হবে 'এখানে প্রস্রাব করিবেন না' নইলে যে ঢাকা শহর মূত্রে ভেসে যাবে! চুজ হেলথ অর টব্যাকো- এখন থেকে ঢাকায় ভাসবে হয় এমন সাইনবোর্ড যে 'এখানে মূত্রবিসর্জন করিবেন না'। সোজা কথা, ঢাকা ভাসবে এই সাইনবোর্ডে নইলে মূতে।

যাই হোক, অচিরেই ঢাকার লোকজন যদি বহুতল ভবনের ছাদে উঠে এই কর্ম করা শুরু করে দেন এতে অন্তত আমি অবাক হব না। ঢালিউডের বৃষ্টির একটা গতি হবে বটে কিন্তু মূত্রবৃষ্টিতে ভিজে এই সব দৃশ্য অবলোকন করে সূক্ষরূচির লোকজনের ব্লাডপ্রেসার বেড়ে গেলে এর দায় কার উপর বর্তাবে? নাহ, এ চলতে দেয়া যায় না। এর একটা উপায় বের না-করলে চলছে না আর।

ভাবছি... দেখো দিকি কান্ড, আজকাল আমার মত লোকজনেরা ভাবাও শুরু করে দিয়েছে! আচ্ছা, এই নিয়ে একটা ব্যবসা ফাঁদলে কেমন হয়? আরে না, পাবলিক টয়লেটের ব্যবসা না। লোকজন বেরুবার পর জিজ্ঞেস করতে হবে, ভাইজানের কি বড়োডা, না ছোডোটা? ওই ব্যাটা ফাঁকি দেতে চাইলে এই নিয়ে কিছু কায়দা-কানুন করে তাকে হাতেনাতে ধরতে হবে। ছ্যা-ছ্যাঁ!

চিন্তা করছে, এখন থেকে 'বঙ্গাল'-দের অভ্যাস খানিকটা বদলাবার চেষ্টা করতে হবে। এই যে এক হাতে বা বগলে পানির বোতল, এই 'কলচর'টা আর কদ্দিনের? ক-বছর হলো লোকজনেরা পানির বোতল নিয়ে ঘুরে বেড়ায়? আমরা তো চাপাকলের মুখে মুখ লাগিয়েই পানি খেয়ে-খেয়েই বড়ো হলুম। কিন্তু এখন হাতে একটা পানির বোতল না-থাকলে কেমন ফাঁকা-ফাঁকা, নিজেকে কেমন অরক্ষিত-অরক্ষিত মনে হয়! অহেতুক গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়!
কালে কালে এটা একটা ভাবও হয়ে গেছে বটে। কোনো গোলটেবিল, ত্রিকোনা টেবিলের আলোচনায় পানির বোতল না-থাকলে আলোচনা আর জমেই উঠে না! শ্লা, 'মাম' তো মিনিস্টারের পানি হিসাবে খ্যাতি পেল!

যাগগে, আমার প্ল্যানটা হচ্ছে, এক হাতে পানির বোতল নাহয় থাকল কিন্তু অন্য হাত তো মুক্ত। ওই হাতে আরেকটা খালি বোতল ধরিয়ে দিলে অসুবিধা কোথায়, বাপু! কারও সূক্ষ রূচি আহত হলে বোতলের রঙ কালো করে দিলুম নাহয়! মনে হয় না বাংলাদেশের আইনে আটকাবে। আরে বাহে, যেখানে নিষেধ থাকার পরও আমাদের মিনিস্টার সাহেবরা গাড়িতে কালো কাঁচ ব্যবহার করেন সেখানে 'নরমূত্রবোতল' কালো হলে পুলিশ লাঠি মেরে মাথা বা বোতল ফাটাবে এটা অন্তত আমি বিশ্বাস করি না। আর কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার পর পুলিশ 'নরমূত্রবোতল' বাজেয়াপ্ত করলে চাইলে তাদের সঙ্গে হুজ্জতে যাওয়ার প্রয়োজন কী, বাপু; 'নরমূত্রবোতল'-টা দিয়ে দিলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়।
যাই হোক, তাহলে আর মুত্র বিসর্জন নিয়ে বাড়তি কোনো চাপ নেই। ঢাকাবাসী গাড়িতে থাকুক বা খেলার মাঠে, পার্কে, ফেসবুকে মুত্র বিসর্জনে আটকাচ্ছে কে!

আরেকটা জরুরি বিষয়। কেবল সরকারকে গালি দিয়ে লাভ নাই। আমরা নিজেরা কী! কলা খেয়ে রাস্তায় কলার খোসা ফেলি, বাড়ির সমস্ত আবর্জনা ফেলি। আবার এই আমরাই রাস্তা নোংরা কেন এই নিয়ে সরকার, মেয়রের ফরটিনথ জেনেরেশনের বাপ-বাপান্ত করি!
আমি বিস্মিত হয়ে লক্ষ করি, আমাদের দেশে কোটি টাকা খরচ করে ঝাঁ চকচকে একটা মার্কেট করবে কিন্তু একটা টয়লেট রাখবে না। খোদা-না-খাস্তা টয়লেট থাকলেও তা থাকবে তালাবদ্ধ।

এ আমার বড়ো দূর্ভাগ্য, ড্রেনটা রাস্তার মাঝখানে চলে আসে, বিনা নোটিশে। এই বিষয়ে আমার বেশ কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে। স্টেশনের ওয়েটিং রুমের ওয়শরুম যথারীতি তালাবদ্ধ। আমি অনেক যন্ত্রণা করে স্টেশন মাস্টারকে খুঁজে বের করলাম। বাড়িয়ে বলছি না, ঠিক এই বাক্যটাই বলেছিলাম, 'আপনার বাড়িতে চলেন, আমি পেসাব করব'।
তিনি চোখ লাল-টাল করলেন, তাতে আমার বয়েই গেছে। পরে যেটা বললেন, বদনা নাকি চুরি হয়ে যায়। শোনো কথা, একটা প্লাস্টিকের বদনা চুরি হয়ে যায় এই অজুহাতে টয়লেটে তালা সেরে রাখবেন!

একবার হলো কি, গ্রামে ঘুরছি। ব্লাডার খালি করা আবশ্যক। গেলাম এক মসজিদের এস্তেঞ্জাখানায়। কাজ সেরে ফিরে এসেই পড়লাম বাঘের মুখে! আমার জিন্স, লেবাস দেখে ইমাম সাহেব ভারী গলায় বললেন, 'আপনে কি ওখন নোয়াজ পরবেন'।
আমি অমায়িক ভঙ্গিকে বললাম, 'জ্বে না, আমি একজন মুসাফির মানুষ। এখনই চলে যাব'।
তিনি এবার বললেন, 'এইটা মুসুল্লিদের জন্য, সবার জন্য না'।
আমি শুরু করলাম, 'আচ্ছা হুজুর, আপনে কি জানেন, একবার এক বদু মসজিদের কোনায় বসে পেসাব করছিল। নবীজী তখন বয়ান করছিলেন। সাহাবিরা ক্ষেপে গেলেন, পারলে গলা কেটে ফেলেন। কিন্তু নবীজী পেসাবে বাঁধা না-দেওয়ার জন্য নিষেধ করলেন। পরে বদুকে বুঝিয়ে দিলেন। বদু তার ভুল বুঝতে পারল। পরে তিনি নিজেই সেই পেসাব পানি এনে পরিষ্কার করলেন।...তা নবীজী যেখানে এই রকম মায়া দেখিয়েছেন সেখানে আপনি এমন কঠিন আচরণ করছেন কেন। কাজটা কি ঠিক, হুজুর...'।

আরেকবার। এটা ঢাকার ঘটনা। নামকরা এক ফোন কোম্পানির সার্ভিসিং সেন্টার। 'পশ' একটা অফিস। ওয়ারেন্টি ছিল তাই আমার ফোন সার্ভিসিং করাতে এসেছি। আমি এদের জিজ্ঞেস করলাম, 'আমি একটু...'।
এরা বললেন, 'সরি স্যার, আমাদের এখানে তো ওয়শরুম নাই'।
আমি চিন্তা করলাম, এরা তো সারাদিনই অফিসে থাকে তাহলে ব্যাটারা যায় কোথায়? এটাই যখন জিজ্ঞেস করলাম তখন আমাকে জানালো, স্টাফদের জন্য আলাদা ওয়শরুম আছে।
এবার আমি অসহ্য, অদম্য রাগ সামলে অন্য প্রসঙ্গে চলে গেলাম। হঠাৎ করেই শান্ত গলায় বললাম, 'ইয়ে, আচ্ছা, আপনাদের ছাদে যাওয়া যায়'?
তিনি বিস্মিত হয়ে বললেন, 'যায় তো, এভাবে গেলেই যেতে পারবেন। কিন্তু কেন?
আমার সংক্ষিপ্ত উত্তর ছিল, 'মুতব'।

এই হচ্ছে আমার নিয়তি, এই 'মুতামুতি' নিয়ে একটা-না-একটা ঝামেলা বাঁধবেই, কপালের ফের। ... 
...
অন্যত্র এই লেখাটা দেওয়ার পর একজন রসিকতা করে মন্তব্য করলেন, মেয়েদের বেলায় কী হবে? এর উত্তরে আমি লিখেছিলাম:
"লেখাটা আসলে আমি লিখেছিলাম ফান করে। কিন্তু বিষয়টা আসলে ফানের না। এ এক অন্যায়, ভযাবহ অন্যায়- মানুষের শারীরিক কষ্ট! আমরা জাতি হিসাবে বড়ো অভাগা, এই সমস্ত ছোট-ছোট অথচ ভয়ানক বিষয়গুলোর সমাধান দূরের কথা, ভাবতেও চাই না।

আমার ধারণা, এই দেশের অধিকাংশ নারী ইউরিন ইনফেকশনে ভোগেন কেবল ওয়শরুমের স্বল্পতার কারণে। আমি ডাক্তার নই বলে বলতে পারছি না এই যে দিনের-পর-দিন, বছরের-পর-বছর, যুগের-পর যুগ ধরে ইউরিন ইনফেকশনে ভোগার কারণে একজন নারীর উপর কতটা প্রভাব ফেলে?
আমি এও অনুমান করি, ঝামেলা এড়াবার ভয়ে অনেক নারী পর্যাপ্ত পানিও পান করেন না! তাঁর কিডনি বা অন্যান্য উপসর্গের কারণে তার উপর এর কতটুকু প্রভাব পড়ে, এই নিয়ে ভাবার সময় কোথায় আমাদের! কারণ আমাদের সব ধরনের চেষ্টা থাকে কেমন করে এই জাতিকে একটা বিকলাঙ্গ জাতি হিসাবে পরিণত করা যায়...।"

Thursday, May 23, 2013

জিয়া-মঞ্জুর-এরশাদ

"...(জেনারেল মঞ্জুর ছিলেন গরম মেজাজের লোক! ১৯৭১ সাল। তখন তিনি একজন মেজর। তৎকালীন মেজর আবু তাহের এবং জিয়াউদ্দিনের সঙ্গে পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এসে ভারত যাচ্ছিলেন।)
...ভারতীয় সরকারের একজন অফিসার মঞ্জুর এবং সঙ্গীদের অভ্যর্থনা জানান এবং ট্রেনে তুলে দেন। ট্রেনে থালায় করে যে খাবার পরিবেশন করা হয় মজ্ঞুর সে খাবারের থালা হাতে নিয়ে চলন্ত ট্রেনের জানালা দিয়ে বাইরে ছুঁড়ে ফেলেন এবং তার চাহিদামত খাবার পরিবেশন করতে বাধ্য করেন। যে কারণে ট্রেনটির বিলম্বে যাত্রা করেছিল।..."
"...জেনারেলর শফিউল্লাহ শাফায়েত জামিলকে ফোন করলেন। কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে জেনারেল শফিউল্লাহ [*] জামিলকে জানান, 'শেখ মুজিব আর বেঁচে নেই'। এমনকী সেনাবাহিনীর প্রধান, শাফায়েত জামিলকে বিদ্রোহ দমনের নির্দেশটি পর্যন্ত দিলেন না!
...এরপর শাফায়েত জামিল, জেনারেল জিয়ার বাসায় হাজির হলেন। তিনি দেখলেন, জেনারেল জিয়া দাঁড়ি কামাচ্ছেন। জামিল জিয়াকে বললেন, 'স্যার প্রেসিডেন্ট ইজ ডেড। এখন আমার করণীয় কী'?
জিয়াকে তখন অত্যন্ত শান্ত দেখাচ্ছিল। তিনি উত্তর দিলেন, 'প্রেসিডেন্ট যদি বেঁচে না-থাকেন, ভাইস প্রেসিডেন্ট তো আছেন...'।..."
"...চার নেতাকে জেলে গুলি করে মেরে ফেলা হয়। ১৯৭৫ সালের নভেম্বর। তিনজন সুপ্রিম কোর্টের জজকে নিয়ে একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়। কিন্তু জেনারেলর জিয়া তাঁর শাসনামলে এই তদন্ত কমিশনকে কাজ করতে দেননি, সুতরা এই কমিশনের কোনো অস্তিত্বই ছিল না। এই ঘটনাটি জেনারেল জিয়ার স্মৃতিকে কলঙ্কিত করে রাখবে।..."
(বাংলাদেশ: 'আ লিগেসি অভ ব্লাড'/ অ্যান্থনি মাসকারেনহাস)।

মেজর রেজাউল করিম চট্টগ্রামে সেনাবিদ্রোহ মামলার ১০ বছর সাজাভোগী। আনোয়ার কবির তাঁর এক সুদীর্ঘ সাক্ষাৎকার নেন। মেজর রেজাউল অকপটে বলেন:
"...আমি ঘুমাচ্ছিলাম। আমার রানার খুব ভোরে আমাকে জাগায়। ...কর্নেল মতিউর রহমান আমাকে বললেন, 'সার্কিট হাউজে জিয়াউর রহমানের ডেডবডি আছে। ডেডবডি পাহাড় এলাকায় নিয়ে যাবে। নিয়ে কোথাও কবর দিয়ে আসবে'।
আমি সরাসরি না বলে বললাম, 'স্যার, আমাকে অন্য কাজ দিন,। কর্নেল আমার উপর চটে গেলেন।
...(মঞ্জুরের নির্দেশে লে. কর্নেল মতি জিয়ার শরীর ঝাঁঝড়া করে ফেলেন) অফিস বারান্দায় মঞ্জুর পায়চারী করছিলেন। তিনি আমাকে দেখে বললেন, 'রাতের কিলিংয়ে তুমিও কি সার্কিট হাউজে গিয়েছিলে'?
আমি বললাম, 'না স্যার, আমি বাসায় ঘুমাচ্ছিলাম'।
তখন তিনি আমাকে বললেন, 'ওদের তো মাথা গরম, তোমার মাথা তাহলে ঠান্ডা আছে। এখন থেকে তুমি আমার চিফ সিকিউরিটির দায়িত্ব পালন করবে, ওকে'।
আমি বললাম, 'রাইট স্যার'।
এরপর আমি জেনারেল মজ্ঞুরের সব কাজ তদারকি শুরু করি। এক পর্যায়ে ঢাকা থেকে ফোন আসল, জেনারেল মঞ্জুর ফোনে কথা বললেন। জেনারেল মঞ্জুরকে বারবার অনুরোধ করা হচ্ছিল জেনারেল এরশাদের সঙ্গে কথা বলতে। কিন্তু মঞ্জুর বললেন, '...Bloody Ershad, i cannot talk to him. He is a thief, he is a corrupt person'.

শেষপর্যন্ত তিনি এরশাদের সঙ্গে কথা বলেননি। এটাই ছিল তার কফিনে শেষ পেরেক। কারণ এরশাদ এরপরই সরাসরি জিয়ার মৃত্যুর জন্য মঞ্জুরকে অভিযুক্ত করে সব ধরনের কলকাঠি নাড়া শুরু করলেন। টিভি-রেডিওতে বারবার ঘোষণা আসতে লাগল, চট্টগ্রামের সবাইকে বলা হলো বিদ্রোহী এবং যারা পক্ষ ত্যাগ করবে তাদেরকে ক্ষমা করা হবে এবং তাদেরকে কুমিল্লা ক্যান্টম্যান্টে যোগ দেওয়ার জন্য বলা হলো্।

...আমার (রেজাউল করিম) স্ত্রী বলল, 'চলো, আমরা কুমিল্লায় যাই। আমি তাকে বললাম, 'দেখো, আমি জিওসির নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছি। এটাই আমার ডিউটি। এই মুহূর্তে আমার পক্ষে যাওয়া সম্ভব না'। আমি স্ত্রী চিৎকার করে কাঁদতে লাগল। আমি তার হাত ছাড়িয়ে বাসা থেকে বের হয়ে এলাম।

...জেনারেল মঞ্জুর ক্যান্টনম্যান্ট ছেড়ে হাটহাজারির দিকে রওয়ানা দিলেন। পরে...বললেন, 'নো, আমি স্কেপ করব না। আমি সেরেন্ডার করব'।
আমাকে বললেন, 'রেজা, তুমি পালাও'।
আমি বললাম, 'স্যার, আমি তো আপনার নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছি। আপনি না-গেলে আমিও যাব না। আপনার সঙ্গে আমিও সেরেন্ডার করব'।
জেনারেল মঞ্জুর বললেন, 'Reza, Why you have surrender, my boy. ওরা তো আমাকে মেরে ফেলবে। তুমিও যদি সেরেন্ডার করো, (তুমিও মরবে) তাহলে আমার কথা দেশবাসীকে কে জানাবে'?
অমি বললাম, 'স্যার, ওরা আপনাকে মেরে ফেললে আমিও আপনার সাথে মরব, And I want to die with you. একথা বলার পরই তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। তখন তিনি সিগারেট খাচ্ছিলেন। আধ-খাওয়া সিগারেটটা আমার ঠোঁটে গুঁজে দিয়ে দিয়ে বললেন, 'ওহ, মাই কমরেড-মাই কমরেড। ইউ স্মোক দিস। ইউ আর মাই অনলি কমরেড'।

জেনারেলর মঞ্জুর আত্মসমর্পণ করেছিলেন পুলিশের কাছে এবং বারবার বলছিলেন তাঁকে যেন আর্মির হাতে তুলে না-দেওয়া হয়। "...মঞ্জুর আত্মসমর্পণ করেছিলেন একজন হাবিলদারের কাছে। এরপর তাঁকে ওসির রুমে নেওয়া হয়। সেখানে খাবার এনে বিভিন্ন অজুহাতে দেরি করিয়ে দেওয়া হয় যেন আর্মি চলে আসে। তখন থানায় চলে এসেছিলেন চট্টগ্রামের তৎকালীন ডিআইজি শাহজাহান।
যিনি পরবর্তীকালে সচিব হয়েছিলেন এবং ২০০১ সালে তত্ত্ববধায়ক সরকারের  উপদেষ্টা হয়েছিলেন।


এই মানুষটাকে (ডিআইজি শাহজাহান) মঞ্জুর বারবার বলছিলেন,
"আমি পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেছি। আমাকে আর্মির কাছে দেবেন না, I should get an opportunity to face the trail. আমি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে চাই। আমার অনেক কথা বলার আছে এবং সেটি বলব আমি। দেশবাসির জানা প্রয়োজন। আমাকে তাড়াতাড়ি সেফ কাস্টডিতে পাঠান। আমাকে জেলে পাঠান"।
ডিআইজি শাহজাহান বিভিন্ন ছল করে কালক্ষেপণ করেছিলেন এবং ঠিকই মঞ্জুরকে আর্মির হাতে তুলে দিয়েছিলেন।


...পরে আর্মি এসে জেনালের মঞ্জুর এবং আমাকে হাত, চোখ বেঁধে আলাদা আলাদা জায়গায় নিয়ে গেল। আমাকে যেখানে নিয়ে যাওয়া হলো সেখানে মেজর মুজিব আমার দায়িত্বে ছিলেন। তাঁর কাছে আমি মঞ্জুরের খবর জানতে চাইলে তিনি বললেন, 'গতরাতে আর্মি চিফের নির্দেশে তাঁকে গুলি করে মেরে ফেলা হয়েছে। তখন আর্মি চিফ হচ্ছেন এরশাদ'।"
... ... ...
* তৎকালীন ডিআইজি শাহজাহান নামের মানুষটাও একজন কাপুরুষ! আর [*] তৎকালীন সেনাপ্রধান, শফিউল্লাহ নামের কাপুরুষ ভেউভেউ করে কাঁদছিলেন। একজন সৈনিক হয়ে এখনও তিনি পেট চিরে আত্মহত্যা করেননি এটা দেখে আমি বিস্মিত হই! লজ্জায় মরে যাই!
আমার মনে হয়, আমাদের দেশে কাপুরুষদের জন্য একটা আলাদা গোরস্তান থাকাটাই সমীচীন। যেখানে আমরা ঘটা করে ধুতুরা ফুল দিতে যাব। সঙ্গে থাকবে এই প্রজন্ম, আমাদের ছেলেপুলে। তাঁদেরকে আমরা বলব, ব্যাটা, ওই দেখ, এখানে শুয়ে আছে সব কাপুরুষেরা...!

 **ছবি সূত্র:তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পোস্টমর্টেমের রিপোর্টটা নেওয়া হয়েছে, 'বাংলাদেশ: আ লিগ্যাসি অভ ব্লাড' থেকে।

Sunday, May 19, 2013

বিবিধ: তাহের এবং খালেদ মোশারফ।

'সশস্ত্রবাহিনীতে গণহত্যা' নামে একটি ডকুমেন্টারির কাজ করেছিলেন আনোয়ার কবির, যেটা গ্রন্থাকারেও প্রকাশিত হয়েছিল। ওই ডকুমেন্টারিতে তিনি অসংখ্য মানুষের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, সেসময় যারা পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। ওখানে হাবিলদার মেজর আবদুল হাই মজুদার (অব.)-এর একটি সাক্ষাৎকার আছে। তিনি সিপাহিবিদ্রোহের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। এই মামলায় তাঁর এক বছর সশ্রম কারাদন্ডও হয়েছিল। তাঁর সাক্ষাৎকারের অংশবিশেষ:
"আমরা কয়েকজন মিলে একটি সংগঠন 'বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা নামে' জাসদের গণবাহিনীর তৎকালীন ওই সংগঠনের সাথে ঐক্যবদ্ধ হই। এর ভেতর আমরা সবাই ছিলাম মুক্তিযোদ্ধা, এখানে অমুক্তিযোদ্ধা কেউ ছিল না। আমাদের সঙ্গে ছিলেন, এয়ারফোর্সের কর্পোরাল আলতাফ, কর্পোরাল মজিদ, কর্পোরাল শামসুল হক, আমাদের রেজিমেন্টের নায়েক সিদ্দিক, আর্মি হেডকোয়ার্টারে ছিলেন সুবেদার জালাল, সুবেদার মাহবুব, বেঙ্গল রেজিমেন্টে ছিলেন চান মিয়া, তারু মিয়া, সুবেদার মেজর শহীদ, সুবেদার নুরুল হক...।
...সিরাজুল আলম খানের নেতৃত্বে, উনি আমাদেরকে নির্দেশনা দিলেন, কিছু বই-পুস্তক দিলেন।...বিস্তারিত কর্মপন্থার নির্দেশনা উনিই দিতেন।
...১৫ অগস্টে জাতির জনককে হত্যা করা হয়। কার্যত দেশে কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। আমরা কোনোভাবেই এই হত্যাকান্ডকে মেনে নিতে পারিনি। ...সেনাবাহিনীর ভেতর যেভাবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছিল এটা দেখে আমরা কোনো ভাবেই মানতে পারছিলাম না।
...আমরা আমাদের নেতাকে চয়েজ করলাম, কর্নেল আবু তাহের বীর উত্তমকে।
...জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করা হয়েছে।
...আমরা সবাই বিচলিত হয়ে কর্নেল তাহেরকে বললাম, 'স্যার, আজকে রাতের ভেতর যদি আমরা জিয়াউর রহমানকে মুক্ত না-করি তাহলে স্যার আমরাও বাঁচব না, জিয়াউর রহমানও বাঁচবেন না, তার ফ্যামেলির একটি সদস্য বাঁচবে না। আপনিও বাঁচতে পারবেন না...।
..এক জরুরি বৈঠকে সিরাজুল আলম খান আসলেন। কর্নেল তাহের বললেন, 'যে-কোনো ভাবে জিয়াউর রহমানকে উদ্ধার করতে হবে। এবং এই সেনাবাহিনীকে বাঁচাতে হবে, দেশকে বাঁচাতে হবে'।
এই কথার পর সিরাজুল আলম খান প্রশ্ন করলেন, 'Who is Zia'?
তাহের বললেন, '(চিন্তার কিছু নেই) আমি যা বলব জিয়া তাই করবে'।
আমরা আলোচনায় বসে পড়ি। কে কি করব এই দায়িত্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করি। কিন্তু কিছুক্ষণেই মধ্যেই দেখলাম, সিরাজুল আলম খান রুমে নেই। আমরা ভাবলাম, তিনি বাথরুমে গেছেন। কিন্তু অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পরও দেখলাম তিনি কোথাও নেই। আমরা সিদ্ধান্ত নিতে না-পেরে হাসানুল হক ইনুকে দায়িত্ব দেওয়া হলো সিরাজুর রহমানের সঙ্গে এই বিষয়ে পাকাপোক্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য।
...জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করার পর তিনি কর্নেল তাহেরকে আলিঙ্গন করলেন। প্রাণ রক্ষা করার জন্য ধন্যবাদ দিলেন। কর্নেল তাহের আমাদেরকে দেখিয়ে বললেন, 'আমি যুদ্ধাহত, আমার একটি পা নেই, আমি কিই-বা করতে পারতাম। যা করেছে এরাই করেছে'।
এরপর জিয়াউর রহমান আমাদেরকে জড়িয়ে ধরলেন, হাত মেলালেন, চোখের পানি ফেললেন।
এরপর কর্নেল তাহের জিয়াকে বললেন, 'যা করেছে সৈনিকেরা করেছে, তারা কি বলে শোনেন'। আমরা 'বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার' পক্ষে ১১ জন আবারো একত্রিত হয়ে জিয়াউর রহমানের কাছে ১২ দফা দাবী উত্থাপন করলাম।
...অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলছি, ৭ নভেম্বর স্বাধীনতা যুদ্ধের 'কে' ফোর্সের অধিনায়ক খালেদ মোশারফ, কর্নেল হুদাসহ চারজন অফিসারকে হত্যা করা হয়। কর্নেল তাহের বা আমাদের 'বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা'র কোনো লোক এর সঙ্গে জড়িত নন। আমি হলফ করে বলতে পারি, আমাদের কোনো সদস্য ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশারফ, কর্নেল হুদা, কর্নেল হায়দারকে গুলি করেনি। সেদিন কর্নেল তাহের আমাদেরকে এরকম কোনো নির্দেশ প্রদান করেননি।
'বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার' পক্ষ থেকে যদি কেউ খালেদ মোশারফদেরকে হত্যা করে থাকত তাহলে অন্তত আমি জানতাম। কারণ, কর্নেল তাহেরের সঙ্গে যতবারই আমরা আলোচনায় বসেছি সবগুলোতেই আমি উপস্থিত ছিলাম। সবার পক্ষ থেকে নির্দেশের সবগুলো কাগজে আমি স্বক্ষর করেছিলাম।
খালেদ মোশারফদের হত্যা করেছে পাকিস্তান প্রত্যাগত সৈনিকেরা। আমি বিশ্বাস করি, কোনো মুক্তিযোদ্ধা খালেদ মোশারফকে হত্য করতে পারে না। কারণ একজন যোদ্ধা তার সহযোদ্ধাকে কেমন করে হত্যা করবে! যারা মেরেছে তারা দেশের বাইরে পালিয়ে যায়নি। তাদের গ্রেফতার করা হোক, বিচার করা হোক।..."‌
'বাংলাদেশ: আ লিগ্যাসি অভ ব্লাড' বইয়ে অ্যান্থনি ম্যাসকারেনহাস লিখেছেন:
"...সঙ্গে সঙ্গেই গোলযোগ ছড়িয়ে পড়ে। এর মাত্র কয়েক মিনিট পরেই ক্যাপ্টেন আসাদ আর ক্যাপ্টেন জলিল মিলে খালেদ মোশারফ, কর্নেল হুদা আর হায়দারকে কমান্ডিং অফিসারের কক্ষে গুলি করে হত্য করে...।"
অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন, যিনি এই মামলায় ১০ বছর সশ্রম কারাভোগী। তাঁর কথায়:
"...জাসদ নেতৃত্ব এই অভ্যূত্থানে তাহেরকে নেতৃত্ব দেয়ার অনুমতি দিয়েছিল এবং সব ধরনের সহায়তার আশ্বাসও। ...কিন্তু প্রয়োজনের সময় জাসদ সেই কাজটি করেনি।
...আরেকটি কাজ করেনি জাসদ সেটা হচ্ছে, এই অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন তাহের সুতরাং এটা প্রথম সুযোগেই বেতারও টেলিভিশনে প্রচার করা প্রয়োজন ছিল। এই কাজটি করলে এই অভ্যূত্থানের পরিণতি হতো অন্য রকম হত...।"

Saturday, May 18, 2013

লরেনন্স লিফশুলজের চোখে কর্নেল তাহেরের বিচারপর্ব

"...যখন আগের চারটি সরকার একের-পর-এক ক্ষমতায় এসেছিল অস্ত্রের বলে পূর্ববর্তি সরকারকে হটিয়ে। অধিকন্তু যে সমস্ত কর্মকর্তা খালেদ মোশারফের অভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছিলেন এবং সরকারি সংবাদপত্রে যাদেরকে 'ভারতের এজেন্ট' বলে তিরস্কার করা হয়েছিল, তাদের সবাইকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন, ব্রিগেডিয়ার শাফায়াত জামিল। যিনি জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করে রেখেছিলেন।
সুতরাং বিষয়টা দাঁড়ালো এমন, যেসব কর্মকর্তা ৩ নভেম্বর জিয়াবিরোধী অভ্যুত্থানের পেছনে ছিলেন তারা ছিলেন মুক্ত আর যেসব ব্যক্তি ৭ নভেম্বর সাধারণ অভ্যুত্থান ঘটিয়েছিলেন, যে ঘটনায় জিয়া মুক্ত হয়েছিলেন, তাঁরা বিচারে মৃত্যুদন্ডের মুখোমুখি!

বিচার চলাকালে পুরো মাসে এ মামলাসংক্রান্ত অথবা বিচার নিয়ে রিপোর্ট করার চেষ্টা করার কারণে আমাকে বাংলাদেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল এমন একটা খবরও এই দেশের পত্র-পত্রিকায় দেখা যায়নি! অথচ প্রত্যেক সম্পাদক ভাল করেই জানতেন কারাগারের প্রাচীরের ভেতর কী হচ্ছে!

তাহের একদমই চাননি প্রেসিডেন্টের কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করতে [*] কিন্তু তাঁর আইনজীবীরা রাষ্ট্রপতি সায়েমের কাছে প্রাণদন্ড রদ করার  জন্য আবেদন করেন। রাষ্ট্রপতি সায়েম এই আবেদনে কর্ণপাত করলেন না। এ অভূতপূর্ব, তাহেরের দন্ডাদেশ দেওয়ার ২৪ ঘন্টার মধ্যে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার সিদ্ধান্ত দেন।
অথচ এই রাষ্ট্রপতি সায়েম যখন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ছিলেন তখন তিনি পূর্ণচন্দ্র মন্ডলের বিরুদ্ধে মামলায় অভিযুক্তকে দেওয়া এক মৃত্যুদন্ডাদেশ রহিত করেন।
ওই মামলায় (পূর্ণচন্দ্র মন্ডল) বিচারপতি সায়েম তার জাজমেন্টে লেখেন:
"'...প্রাণদন্ডাদেশ অপরাধে অভিযুক্ত একজন বন্দির আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য শেষ মুহূর্তে একজন আইনজীবী নিয়োগ রিমেমবেরান্স ম্যানুয়ালের ১২ অনুচ্ছেদের ধারাই কেবল লঙ্ঘন করে না। ওই অনুচ্ছেদের বিস্তৃত ধারাগুলোর পেছনের উদ্দেশ্যও বাধাগ্রস্ত করে'।
অথচ তাহের তাঁর বিচারকাজ শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত কোনো আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়ার সুযোগই পাননি!
(২০০৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া লরেনন্স লিফশুলজের বক্তব্য থেকে)

লরেনন্স লিফশুলজ হাইকোর্টে তাঁর হলফনামা দাখিল করে লিখেছিলেন:
"...ওই দিন কারাগারে একমাত্র নিরেপেক্ষ প্রত্যক্ষদর্শী হিসাবে আমি বিশ্বাস করি, এটা আমার দায়িত্ব সবাইকে জানানো, আমি কী দেখেছি এবং ঘটনাগুলো কীভাবে ঘটেছে।
৩০ বছরের বেশি সময় ধরে আমি এই ডাকটির জন্য অপেক্ষা করে থেকেছি। হাইকোর্টের সামনে দাঁড়ানোর সুয়োগকে আমি জীবনের অন্যতম সম্মানজনক ঘটনা হিসাবে মনে করি।
...তখন আমি জেনারেল জিয়ার সাক্ষাৎকার নেওয়ার চেষ্টা করি।...কিন্তু আমাকে সাক্ষাৎকার গ্রহণের অনুমতি দেননি জেনারেল জিয়া।...বরং আমাকে এই দেশ থেকে বের করে দিয়েছিলেন।
...নির্মোহ ভাবে আমি বিশ্বাস করি, বিচার শুরুর আগেই এ রায় নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল। ...বিচারের আগেই জিয়া তাহেরকে ফাঁসি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
...তাহের ওই ট্রাইব্যুনালে দাঁড়িয়ে তাঁর শেষ ভাষণে যা বলেছিলেন তা যদি পরের দিন খবরের কাগজে প্রকাশিত হতো, তাহলে জনগণের মধ্যে তাহেরের পক্ষে ভয়ানক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতো। (কিন্তু কোথাও এটা প্রকাশিত হয়নি!)
আমার দৃষ্টিতে, এখনই সময় রাষ্ট্র ও বিচার বিভাগের, প্রকাশ্যে এ ঘোষণা দেওয়া যে আবু তাহেরের বিচার ভুল ছিল এবং তার মৃত্যুদন্ডও ভুল ছিল।"

লরেন্স লিফশুলজ যে হলফনামা হাইকোর্টে দাখিল করেছিলেন, সেখানে তিনি লিখেছিলেন:
"...তাঁর (মঞ্জুর) আশঙ্কা ছিল, তাহেরকে বিচারের মুখোমুখি করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করবেন জিয়া। মঞ্জুর এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া অন্য সামরিক কর্মকর্তারা জিয়াকে এ ধরনের পদক্ষেপ (তাহেরের বিচার) থেকে বিরত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু জুনের শুরুতে মঞ্জুর অনিশ্চিত হয়ে পড়েন, তিনি এই বিচার-প্রক্রিয়া থামাতে পারবেন কি না। কারণ সেনাবাহিনীতে তখন মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির বিপুল প্রভাব।...

মঞ্জুর আমাকে (লিফশুলজ) জানাতে চেয়েছেন, তিনি ওই বিচার ঠেকাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু স্পষ্টতই সেটি করার কোনো ক্ষমতা তাঁর ছিল না। যদিও তিনি ওই সময় নেতৃত্বের দিক থেকে তৃতীয় শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা ছিলেন। তাহেরের বিচার নিয়ে তাঁর অবস্থান তাঁকে সামরিক বাহিনীতে চিহ্নিত করে ফেলেছিল ওই সব ব্যক্তির কাছে, যারা তাহেরের মৃত্যু চেয়েছিলেন।...। 
হায় লিফশুলজ, আপনি ৩০ বছর ধরে আপনার এই স্বপ্নকে লালন করেছেন। অথচ আমরা কী বিস্মৃতপরায়ণ জাতি, ৩০ দিনেই সব ভুলে যাই!

তাহেরের বেলায় প্রত্যেকটা জায়গায়ই আইন ভঙ্গ করা হয়েছিল। মেজর জিয়াউদ্দিন, যিনি সেসময় বিচারে অভিযুক্ত হয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন:
"...যেদিন তাহেরকে ফাঁসি দেয়া হয় সেদিন রাতের বেলায় বিডিআর অস্ত্র নিয়ে জেলখানায় ঢুকে পড়ল। এটা আন্তর্জাতিক জেল আইনের বিরোধী! জেলখানার ভেতর কোনো সশস্ত্র পাহারা ঢুকতে পারবে না। কেবল ঢুকলই না, প্রত্যেকটা সেলের সামনে একজন করে অটোমেটিক রাইফেলধারী সিপাহি দাঁড়িয়ে গেল। পুরো জেলখানা তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিল...।"
তখন জেলখানায় আটক ছিলেন অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন। তাঁর বক্তব্য:
"...জেনারেল মীর শওকত একদিন কারাগারের ভেতরে এসে পরীক্ষা করে গেলেন ফাঁসির দড়ি, ফাঁসির মঞ্চ ঠিকঠাক আছে নাকি! এটা বলার অপেক্ষা রাখে না এটি কোনো ভাবেই মীর শওকতের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। কিন্তু তারপরও সেনাবাহিনীর উর্ধ্বতন যারা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তারা তখন মরিয়া হয়ে গিয়েছিলেন কত দ্রুত তাহেরকে এই পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেয়া যায়।..."
আমার নিজস্ব মত, জেনারেল মীর শওকতের এই আচরণ অস্বাভাবিক! এটা কোনো প্রকারেই একজন মুক্তিযোদ্ধা দূরের কথা; একজন যোদ্ধা, একজন সাধারণ মানুষের সুস্থ আচরণ হতে পারে না! এখানে এসে এই মানুষটা জেনারেল মীর শওকতকে আমার পোকা-পোকা মনে হয়...।
আর আমার কাছে তো এমনটা মনে হচ্ছে, তখন জেলখানা বলে বা জেল-কোড বলে কোনো জিনিস বাংলাদেশে ছিল না! যা খুশি, যার যখন খুশি এখানে আসছেন-যাচ্ছেন। যেনো জেলখানা- এটা একটা খেলার জায়গা বা এদের বাপের তালুক!
 
আমার স্পষ্ট অভিমত, রাষ্ট্রপতি সায়েম, ট্রাইব্যুনালের প্রধান বিচারক কর্নেল ইউসুফ হায়দার (যিনি একজন রাজাকারও ছিলেন), জেনারেল মীর শওকত বা অন্য যারা এই খুনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তাদের প্রত্যেককে খুনের অভিযোগে খুনি অভিযুক্ত করাটাই ন্যায়, জাস্টিস। মৃত্যুর পরও খুনি চিহ্নিত করতে হবে...।

*আইনজীবীরা বলেছিলেন, তাহেরের আপিল করার সুযোগ নেই। একটিমাত্র পথ খোলা আছে সেটা হচ্ছে, রাষ্ট্রপতি জাস্টিস সায়েমের কাছে মার্সিপিটিশন প্রাণভিক্ষার আবেদন করা। তাহের সঙ্গে-সঙ্গে তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেছিলেন,
'জিয়াউর রহমানকে আমি ক্ষমতায় বসিয়েছি। (সে) একজন মীরজাফর ছিল ব্রিটিশ আমলে (একজন) আর এই হচ্ছে দ্বিতীয় মীরজাফর, জিয়াউর রহমান! তার কাছে আমি প্রাণভিক্ষা চাইব? কিংবা তার ক্রীড়ানক প্রেসিডেন্টের কাছে, প্রশ্নই আসে না'।
তাহের প্রাণভিক্ষা চাইলেন না।

**"...সামরিক আদালতে বিচারের ঘটনা এবং এর প্রেক্ষাপট খতিয়ে দেখার জন্য আদালত সরকারকে একটি তদন্ত কমিটি গঠনেরও নির্দেশ দিয়েছে।...[১]"
এই নির্দেশের গতি কী!


*** Faruk Abdullah চমৎকার এক পর্যবেক্ষণ করেছেন:
"...আর একটা জিনিস স্মরণ রাখাটা খুব জরুরি, মিলেটারি একাডেমিগুলোতে মূলত যে শিক্ষা দেয়া হতো, অর্থাৎ পাকিস্তান মিলেটারি একাডেমিতে। তাঁদের অনেকের মধ্যো 'উগ্র ভারত বিদ্বেষ' শিক্ষাটা, যেটা পরবর্তীকালে শত্রুর শত্রু, পাকিস্তানমুখি করেছিল...।

সহায়ক সূত্র:
১. হাইকোর্টের রায়:
http://www.bbc.co.uk/bengali/news/2011/03/110322_mk_taher_verdict.shtml
WhatsApp