Search

Monday, June 30, 2008

শাসক!



















বাংগুরাদেশের এক শাসক। এই শাসক সাহেব ছিলেন যিনি বৃষ্টি নামাতে পারতেন!
আজকের কাগজ:  ০৫.০৫.১৯৯১

আবার তিনি খুবই পীর ভক্ত ছিলেন। তিনি আটরশির পীরের দরবারেই গেছেন ১০০ বার, ফল কি পেয়েছেন তা তিনিই ভাল বলতে পারবেন!

একসময় মনের দুঃখে খানিকটা 'পাগলা পানি' খাওয়া শুরু করলেন। আটরশিকে বাদ দিয়ে দশরশি নামের একজন পীরের কাছে যাতায়ত শুরু করলেন। দশরশির পায়ে আছড়ে পড়লেন।

শাসক: বাবা, মনে শান্তি নাই!
দশরশি: থাকব কেমনে, তোরে আটরশি খাইছে! বেটা, তুই কি পিসাব খায়া আইছস, পিসাবের গন্ধ পাইতাছি!
শাসক: বাবা, পিসাব না একটু পাগলা পানি দিয়া কুলি করছিলাম।
৬০ বোতল হুইস্কি। আজকের কাগজ: ০২.০৭.১৯৯১

হইছে কি বাবা, সকালে তো ওঠছি দেরীতে। চোখে জানি কি সমস্যা হইছে রাতে খালি ব্লু  দেখি! সবই নীল, ছবিও নীল—ব্লু ফিল্ম! হা হা হা, কী তামশা ছবিও ব্লু  হয়া যায়, বুঝছেন!
অসংখ্য ব্লু-ফিল্ম উদ্ধার: কাগজ, ১৮.০৭.১৯৯১
তো, রাতে ঘুমাইতে ঘুমাইতে দেরী হয়া গেল। সকালে তো ওঠছি দেরীতে, তাড়াহুড়া কইরা রুটি খাইতে গিয়া গলায় আটকায়া গেছিল। কী করি-কী করি, পাগলা পানি দিয়া একটু, হে হে হে।
দশরশি: বেটারে, বুজছি-বুজছি, আর কইতে হইব না, ইতা কইরা কুনু লাভ নাই! তুই ইয়ের মধ্যে মান্ডার তেল মালিশ করিস, ফল পাইবি। মান্ডার তেল না-পাইলে তুই তো গিলাপ চড়াইতে সৌদি যাস ওইখান থিক্যা ষাণ্ডা নিয়া আসিস। ইনশাল্লাহ, তোর পুলাপাইন হইব।

শাসক: বাবা, আচানক কথা, আপনি জানেন না? আমার এক ছেলে আছে (দ্বিতীয়টির কথা তিনি বেমালুম চেপে গিয়েছিলেন)।
দশরশি (দাড়িতে হাত বুলিয়ে অমায়িক হাসলেন) : নারে, বেটা, তোর কুনু পোলাপাইন নাই।

শাসক: বাবা, এইটা কি কন! ইয়ে মানে আসলে...আসলে আপনার কাছে গোপন করছিলাম, আমার একটা না, দুইটা ছেলে।
দশরশি: ওইটা তুই ভাবতাছস, আসলে তোর কুনু সন্তানই নাই! কারণ...!

* লেখাটা 'শুভ'র ব্লগিং' বই থেকে।
* সদয় অবগতি: এই পোস্টের সঙ্গে ভুল ছবি, ভুল খবর চলে গেছে বলে অমায়িক দুঃখ প্রকাশ করি। ছবি, খবর সরাবার বাটন খুঁজে পাচ্ছি না বলে আবারও দুঃখ প্রকাশ করি!


Sunday, June 29, 2008

নব্য মুক্তিযোদ্ধা বনাম নব্য রাজাকার।

মুক্তিযুদ্ধ হচ্ছে হৃদপিন্ড- সবিরাম না, অবিরাম ধুকধুক করবে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আবেগ থাকাটা অতীব জরুরি কিন্তু এই আবেগ যখন বাড়াবাড়ির পর্যায়ে চলে যায় তখন আবেগে ছাপাছাপি মস্তিষ্ক যুক্তিহীন হয়ে পড়ে। ক্রমশ মস্তিষ্ক এবং ...দ্বারের তফাত কমে আসে। তখন ওই মানুষটা পরিণত হয় গলাবাজ, গালিবাজ একটা মানুষে, তখন তার লেবেল কোন পর্যায়ে নেমে আসে এটা থাকে তার বোধগম্যের বাইরে। অনেকটা বাহ্যজ্ঞানলুপ্ত একটা ফার্নিচার।

ওয়েব-সাইটে এই বিষয়টার ছাপ প্রবল। ‘বাংলার ওয়েবাকাশ রাখিব রাজাকারমুক্ত’। অনেককে দেখেছি, পড়াশোনার প্রয়োজন নাই, জেনে না জেনে অযথা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লাফালাফি। ছাদে মাথা ঠুকে যাওয়ার দশা!
এমনিতে কারও যদি এমন মনে হয়, মাঠ কাঁপাবার সহজ উপায় হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ এবং ইসলাম ধর্ম তাইলে বলার কিছুই নাই।
কিন্তু গোলাম আজম যে এ দেশের নাগরিক, মান্যবর আপনারা এটা কি ভুলে যান? বাহ্যদৃষ্টিতে নাগরিক অধিকারে ড, ইউনুস আর গো আজমের মধ্যে তফাতটা কী? সরকার দু-জনেরই নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে বাধ্য।

অকাট্য প্রমাণ থাকার পরও আজ পর্যন্ত একজন গোলাম আজমকে (Link) যুদ্ধাপরাধি বলে ১দিনের জন্য শাস্তি দেয়া যায়নি। কেন যায়নি? সামান্য মুরগি চুরি করলে এর জন্য শাস্তি পেতে হয় অথচ ভয়াবহসব অন্যায় করেও একজন মানুষ পার পেয়ে যায় কেমন করে? তখন বিচারের বাণী কার কাছে কাঁদে? বিচিত্র এ দেশ, প্রমাণ থাকার পরও একজন অন্যায় করে পার পেয়ে যায়, এই দেশের জন্য যার বিন্দুমাত্র দরদ-আবেগ নাই তাইলে এই দেশের নাগরিক হওয়ার এত লালচ কেন? কেন আপনি, আপনারা এই দেশ আঁকড়ে পড়ে থাকতে চাইছেন? গো আজমের এই দেশের প্রতি অন্যায় বক্তব্যগুলো (Link) ৩৭ বছর কেন ৩৭০ বছরেও মুছে ফেলা যাবে না- রক্তের দাগ মুছে ফেলা যায় না।


এমনিতে প্রবাসিরা আরও এককাঠি সরেস। স্যাররা বৈদেশে বসে যেসব ওহী নাজিল করেন তা অতুলনীয়। ব্যাটল-ফিল্ডে থাকা আর নিরাপদ দূরত্বে বসে যুদ্ধের ছবি দেখায় যে যোজন তফাত তা এদের কে বোঝাবে! দেশ থেকে হাজার হাজার মাইলে দূরে থেকে ধর্ম নিয়ে লম্বা লম্বা বাতচিত করা সহজ বটে। আহা, এই লম্বা বাতচিত পাড়ার কোন মসজিদে জুম্মার নামাজে করে দেখুন না, সযতনে রাখা আপনাদের ২টা বলস জায়গায় আছে কিনা, পুনরায় নিশ্চিত হওয়ার আবশ্যকতা দেখা দেবে?
আপনারা অবলীলায় বলতে পারেন বটে রাজাকার ভাবাপন্ন কারও ছায়া মাড়াব না। আফসোস, আমাদের সে উপায় নেই। ট্রেন ছাড়ার পূর্বে যাত্রীদের লিস্ট চেক করা সম্ভব হয়ে উঠে না, যে যাত্রীদের মধ্যে কেউ রাজাকার ভাবাপন্ন আছে কি না?

এমনিতে কেউ কেউ রাজাকার, কাচ্চা-বাচ্চা রাজাকার, ছানাপোনা রাজাকারের প্রকাশ্যে কোতলে বদ্ধপরিকর। ৯২ সালে ইসলামী বিপ্লবী আন্দোলনের চেয়ারম্যান মওলানা শামসুল হক জেহাদী বলেছিলেন, "গোলাম আজমসহ ৩০ লাখ জামাত-শিবির কর্মীকে জনসমক্ষে কতল করতে হবে"(ভোরের কাগজ, ৩০/১১/৯২)।
এমন মানুষের হাতে এই দেশ পরিচালনার ভার থাকলে দেশের গতি কী হবে এটা ভেবে শিউরে উঠি! যেমন শিউরে উঠি বানরের হাতে ক্ষুর থাকলে!
বেশ-বেশ, তর্কের খাতিরে না-হয় মেনেই নিলাম। ওহে
নির্বোধ মহোদয়, এত বিপুল রক্ত কোথায়, কোন সাগরে ফেলা হবে তা ঠিক করেছেন কি? ৩০ লাখ মানুষকে হত্যার পর অন্তত ৩ কোটি মানুষ যে মারা যাবে মড়ক লেগে এতে সন্দেহ আছে কী! রাস্তায় হাঁটাহাঁটি তো আর বন্ধ রাখা যাবে না।
নব্য মুক্তিযোদ্ধা হওয়াটা মনে হয় একটা ফ্যাশানের পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। বিশেষ বিশেষ দিনে ঘটা করে অনুষ্ঠান করে চোখের জল নাকের জল মিশিয়ে ফেলা আর অহেতুক গলাবাজি-গালিবাজি করা। বাংলার ব্লগাকাশ রাখিব নব্য রাজাকারমুক্ত।

একজন দুর্ধর্ষ কমান্ডো ঠেলাগাড়ি চালান, এতে আমাদের কোন লাজ নাই, দায় নাই? হায়, কোথায় ১০বছরের মুক্তিযোদ্ধা লালু (Link) , কে রাখে তাঁর খোঁজ? ক-বছর পূর্বে জানা গেল তিনি মিরপুরে রাস্তায় একটা চা’র দোকান চালান। আজ তিনি বেঁচে থাকলে নিশ্চই এতদিনে উন্নতি হয়েছ, নির্ঘাত হাত পেতে ভিক্ষা করছেন।

আমরা বিস্মৃত হই ভাগীরথীর (Link) কথা। এদের নিয়ে জানার অবকাশ কই? আমরা তো বড় হয়েছি মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের অবদানের কথা জেনে। কে কোন তেলের ড্রামে উঠে কোন ঘোষণা দিয়েছেন, এইসব। বীরশ্রেষ্ঠদের মধ্যে একজনও সিভিলিয়ান নাই, কেন? এই প্রশ্ন রাজাকার হওয়ার ভয়ে কে উত্থাপন করবে?

আমাদের দেশে ক-টা শহীদ মিনার বা ক-টা কালভার্ট, সেতুর নামকরণ হয়েছে বীরাঙ্গনার নামে। বীরাঙ্গনা রিনা (Link) এই প্রজন্মের প্রতি প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে নিতলে হারিয়ে যাবেন, খোঁজ করার সময় কই আমাদের? সুরুজ মিয়া (Link) যে আমাদের মুখে জুতা মেরে চলে গেলেন। আমাদের গালে এই জুতার দাগ কী শুকিয়ে গেছে?

এবার আসি নব্য রাজাকারদের কথায়। কেউ মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কোন প্রশ্ন তুলল বা খানিকটা সন্দেহ পোষণ করল, ব্যস আর যায় কোথায়! তাকে অবলীলায় রাজাকার ঘোষণা দিয়ে গায়ে রাজাকারের তকমা এঁটে দেয়া হলো। খেলা থেকে বাদ।
ইশশ, অতীতে যেন আমরা এই প্রজন্মের জন্য মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মালকোচা মেরে দুর্দান্ত কাজ করেছি আর কী! বিভিন্ন সময়ে, ক্ষমতাবাজদের কল্যাণে মুক্তিযুদ্ধের অকাট্য সত্যের অবিরাম ধর্ষণ ব্যতীত আর দিয়েছি কী!

আর এই প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে পড়বে কি ঘন্টা! মাশাল্লাহ, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক বইগুলোর যে লাগামছাড়া মূল্য! শালার দেশ, মদের জন্য ছাড় আছে কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের বইয়ের জন্য কোন ছাড় নাই! বলিহারি আমাদের বুদ্ধির ঢেঁকিরা, কাউকে দেখলাম না মুক্তিযুদ্ধের বইয়ের দাম কমাবার জন্য আদাজল খেয়ে লাগতে।
টাকার বস্তায় শুয়ে থাকা মান্যবর হুমায়ূন আহমেদ, তিনি প্রকাশককে যদি বলেন চিনি (পদ্ধতিটা আমি বলব না, যার দায় সে খুজেঁ নিক) কালেক্ট করার জন্য তার পেছন পেছন পট নিয়ে ঘুরতে, অনেক প্রকাশক বিমলানন্দে রাজি হবেন। মহিষের দুধের দইয়ের ভাঁড় নিয়ে হাজির হতে পারলে, খানিকটা কষ্ট করে ছেঁকে চিনি বের করতে পারবেন না, এও কি বিশ্বাসযোগ্য?
তো, এই হুমায়ূন আহমেদেরও মুক্তিযুদ্ধের একটা বইয়ের দাম ছিল ৪০০ টাকা। এই প্রজন্মের অনেকের পক্ষে (ঘুষখোর, দু-নম্বরির সন্তান ব্যতীত) চট করে ৪০০ টাকা দিয়ে একটা বই কেনার কথা ভাবা যায়! অথচ এই বই নিয়ে হুমায়ূন আহমেদের কী কান্না- চোখের জলে ভেসে যায় কপাল! হায়, গায়ে যে তার লোভের ছাল!

যাক গে, যা বলছিলাম, ইচ্ছা হল দুম করে কাউকে রাজাকার বলে দিলাম। ওহে নব্য মুক্তিযোদ্ধা , ওদের রাজাকার না বলে রাজাকার ভাবাপন্ন বলুন, নইলে নব্য রাজাকার বলুন। এই প্রজম্মের রাজাকার হওয়ার সুযোগ কই- বয়সে কুলাবে না!

পাশাপাশি জামাত-ই-ইসলামির যে উদাত্ত আহ্বান, আহা, গলা কী সুললিত-মধুর! জামাত ফ্রি-ফাও দিচ্ছে ধর্মের চিনির প্রলেপ। এদের খপ্পরে না পড়ে উপায় কী- কিই বা বয়স এদের? মগজ ধোলাই করার আদর্শ সময়।
পাশাপাশি আমরা কঠিন হাতে এদের দূরে ঠেলে দিচ্ছি। রোপণ করছি একেকটা বিষবৃক্ষ। তাকে শেখানো হয়েছে, স্বাধীনতা যুদ্ধ একটা গন্ডগোল, তখন গুটিকয়েক লোক, বিধর্মীর মৃত্যু হয়েছিল।
হাবিজাবি প্রশ্ন তার মাথায় ঘুরপাক খাবে এ তো বিচিত্র কিছু না। কোন ফোরামে এই খটকা নিয়ে আলাপ সে করতেই পারে, রে রে করে তেড়ে আসার কোন কারণ দেখি না। আমাদের করণীয় হচ্ছে সঠিক তথ্য দিয়ে তার ধোলাইকৃত মগজে আঁচড় কাটা। আমরা নব্য মুক্তিযোদ্ধাদের এত সময় কই!
একমাত্র একজন নিষ্ঠুর, নির্বোধই একজন ড্রাগ এডিক্টকে দূরে সরিয়ে দেবে, তাকে চিকিত্সা করাবার বা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করবে না।

Friday, June 27, 2008

দলছুট, খাপছাড়া।

ছবিটা দেখে মন কেমন করে। সিড়িটার সোজা আকাশে উঠে যাওয়ার আজন্ম সাধ অথচ জানা নেই গন্তব্য, ফেরার পথও অজানা।

বিস্মৃত হয়ে যাওয়া ধুসর...যে অল্প ক্ষমতা নিয়ে এসেছিলাম, কাজে লাগাতে পারলাম না! আজ নিজেকে থুথু দিতে ইচ্ছা করে। অবশ্য নিজেকে নিজেই থুথু দেয়ার পদ্ধতি ক-জনার জানা?


স্বর্গ নরকের মাঝামাঝি জায়গাটার চমত্কার একটা নাম আছে, ভুলে গেছি। স্বর্গ নরকের মাঝামাঝি ঝুলে থাকাটা কোন কাজের কাজ না- এদের মত অভাগা আর কেউ নাই! এমন দলছুট, এমনই খাপছাড়া- না তেলে মেশে, না পানিতে। আমারও যে বড় ইচ্ছা করে ভিড়ের মাঝে হারিয়ে যেতে, বৃত্তের মাঝে অনবরত ঘুরপাক খেতে। কী হয় এমনটা করলে, আটকায় কে?


*ছবি স্বত্ব: সংরক্ষিত

দূর হ. বন্য সুন্দর...

আমার সাজানো বাগানটা কেমন করে ক্রমশ জঙ্গলে পরিণত হল জানাই হল না! রূপান্তরটা একদিনে নিশ্চয়ই হয়নি, সময় নিয়ে হয়েছে। হায় সময়- গড়িয়ে যাওয়া পানি!
 

এ তো হওয়ারই ছিল, বিচিত্র কিছু না। শুভ্র-সাদা থেকে ধুসর, ধুসর থেকে হলদেটে অবশেষে কালো, এইই নিয়তি। নিয়তিকে খন্ডায় কোন হার্মাদ- গোল হয়ে তামাশা দেখায় যে সুখ, এ সুখ সংগম ব্যতীত কোথায়!
 

এ গাছ আমি লাগাইনি কিন্তু দেখো দেকিনি কান্ড, আবার ঢং করে ফুলও ফুটেছে। ফুলের নামও বলিহারি। আমার স্মরণশক্তি যাচ্ছেতাই, সবার মত স্মৃতিশক্তিও আমার হাত ছেড়ে দিয়ে না থাকলে সম্ভবত এই ফুলের নাম 'বার্ডস অভ প্যারাডাইস'। বনবাদাড়ের ফুলের নামের কী নমুনা, কী রূপ!
দূর-দূর, নাম-রূপ, ছ্যা! দূর হ. বন্য সুন্দর...।



















 *ছবি স্বত্ব: সংরক্ষিত

Friday, June 20, 2008

একরত্মের আলাপ এবং আমার প্রলাপ।

কী কপাল, অন্য কারণে গুগলে সার্চ দিয়েছিলাম। লেখাটা পেয়ে গেলাম, আমাকে নিয়ে। এমন লেখা পড়লে কান-টান লাল হয়ে যায়। আমার মত পোকামানবকে মানুষমানব বানিয়ে দেয়ার চেষ্টা, মমতায় অন্ধ হলে যা হয় আর কী!
বছরখানেক আগে 'ত্রিরত্ম' একদা ঘুরতে ঘুরতে আমার এখানে এসেছিলেন। ‍‌"ত্রিরত্মের আখাবিহার"। এই নিয়ে এক রত্ম ইতিহাস লিখে ফেলেছেন [১] । অরি আল্লা, কেউ কেউ এত অল্পতে মুগ্ধ হয়!

দীর্ঘ সময় ধরে আমার ব্যক্তিগত কারণে ভারী বিমর্ষ থাকি, লেখাটা পড়ে অজান্তেই মন ভাল হয়ে গেল। দুম করে অনেকগুলো স্মৃতি ফিরে এল। আশ্চর্য, ১ বছর চলে গেছে, না? কি জানি, টেরটিও পাইনি। হায় সময়!
ওই লেখায় মন্তব্য ইচ্ছা করেই করিনি, এখানে করছি। ওই পোস্টে যেভাবে বাড়িয়ে লেখা হয়েছে, আমার লজ্জা করে না বুঝি!
তবে সবিনয়ে এও বলি, কিছু-কিছু বিষয় পাবলিক ফোরামে শেয়ার করা সমীচীন না। কিন্তু এতে আমি কিছু মনে করিনি কারণ এর পেছনে আছে মমতায় মাখামাখি হাত, মমতায় বাড়ানো হাতের নোখের দিকে তাকাতে নেই যে।

অসাধারণরা তীব্র আনন্দ উপভোগ করেন নিরাসক্ত ভঙ্গিতে, আমি অতি সাধারণ বলেই তুচ্ছসব আনন্দ-বেদনায় কাবু হই। যেমন মনটা কী তরলই হয়ে গিয়েছিল এই লেখাটা পড়ে! কেবলই কী ছাপার অক্ষরে নিজের নাম দেখার আনন্দ, নাকি নিজের সম্বন্ধে ভাল ভাল কথার লোভ? উঁহু...।
আজ আমার কঠিন সময়ে ঘোলাটে হয়ে আসা চোখটা কেমন ঝকঝকে হয়ে উঠে। মানুষের উপর, এমনকি নিজের উপর থেকে হারিয়ে ফেলা বিশ্বাস খানিকটা ফিরে আসে। এক্ষণ এই বাড়ানো হাতটাও কী কম?
তবে আজ একটা কঠিন সত্য বলি, আমরা বড্ডো নাগরিক, শখের বশে ফুল তো কিনি কিন্তু এই ফুলের উত্স বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করি না। চকচকে শার্ট গায়ে দেই কিন্তু বোতাম কয়টা বলতে পারি না, কেননা এর প্রয়োজন বোধ করি না, শার্ট গায়ে দেয়া নিয়ে কথা। আমরা লম্বা লম্বা বাতচিত করি, হাতি-ঘোড়া মারি কিন্ত হাতের রেখাটা ভাল করে চিনি না। ...। এই প্রসঙ্গ থাকুক...।

হ্যারি সেলডনের লেখার কিছু বিষয়ে অসঙ্গতি আছে! যেমন:
বাথরুমের দরোজায় গোআ'র ছবি ছিল না। বাথরুমের দরোজায় ছিল আমেরিকা এবং ব্রিটেনের ছোট্ট পতাকা আড়াআড়ি করে লাগানো। আমার কাছে যখন কেউ জানতে চাইত, খাস দেশি ভাষায় আপনার টাট্টিখানা বা লেট্রিন, বাথরুম বা বৈদেশের ভাষায় রেস্টরুম কোথায়? আমি হেলাফেলা ভঙ্গিতে বলতাম, আমেরিকা এবং ব্রিটেন যেখানে কুপরামর্শ করছে, ওটাই।
আমার এমন কু-ভাবনার উত্স কী? কোন নিতল থেকে উঠে আসে এমন অসভ্য কল্পনা? তাই মনে হয় বুঝি! প্যালেস্টাইনি সেই শিশুদের মুখ আমি এখনো বিস্মৃত হইনি। ফুটফুটে মেয়েটা মরে পড়ে আছে বাতিল পুতুলের মত। শিশুর লাশ নিয়ে বাবার সেই অমানুষিক, জান্তব চিত্কার। রাইস বসে বসে পিয়ানো বাজায়, তার বাজনা শুনে রথি-মহারথিরা মাথা নাড়ে। কে জানে, ঈশ্বরও বাজনাটা উপভোগ করছিলেন কিনা?
খোদার কসম, তখন আমার নিজেকে পাগল-পাগল লাগত, মাথায় কেবল ঘুরপাক খেত, স্বেচ্ছামৃত্যু থাকলে বেশ হত, আমি ওই মুহূর্তে মৃত্যু কামনা করতাম। আকাশপানে তাকিয়ে বিড়বিড় করতাম। আকাশলোকের বাসিন্দার আমার এই বিড়বিড়ানি শোনার সময় কই! আমি নপুংসকের, এমন অসভ্য চিন্তা করা ব্যতীত কিই-বা করার ছিল!

আর হুমায়ূন আজাদের 'পাক সার জমিন সাদ বাদ' বইয়ের প্রচ্ছদ? হুমায়ূন আজাদ আপনার প্রিয় লেখক বলছেন, কষ্ট পেয়েছিলেন বুঝি? আর হুমায়ূন আজাদ আমার যে অসম্ভব প্রিয় একজন মানুষ, অসম্ভব প্রিয়। বিচিত্রসব বিষয়ে তাঁর লেখার কী হাত, ক্ষমতা থাকলে সোনা দিয়ে বাঁধিয়ে দিতাম। এরশাদের সময় এই দেশের তাবড়-তাবড় লেখকরা যখন তাদের কলম এরশাদের পায়ে সমর্পন করে দিয়েছিলেন ঠিক তখন হুমায়ূন আজাদ এরশাদকে নিয়ে 'পূর্বাভাষ' সাপ্তাহিকে কীসব কলাম লিখতেন! সিংহাবলোকনন্যায় না, অবিকল যেন একটা রাগি সিংহ।
অতি ভীরু আমি, লেখালেখিতে যে খানিকটা সাহস যোগাতে পেরেছি এটাও সম্ভবত তাঁর অবদান। মানুষটার প্রতি আমার ভাললাগার আর কি ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে, বাডি? কিন্তু এই বইটা পড়ে আমার মনে হয়েছে, একজন মানুষ লেজার গান দিয়ে চড়ুই পাখি শিকার করছেন! হায়, ক্ষমতার কী অপচয়!
অথচ বইটার থিম চমত্কার, জঙ্গিদের সম্বন্ধে তাঁর আগাম ভাবনা তখন অবিশ্বাস্য মনে হত কিন্তু পরবর্তীতে আমরা বিপুল বিস্ময়ে লক্ষ করেছি, তাঁর অনুমান কী নির্ভুল; যেখানে আমাদের নিরাপত্তার দায়িত্বের বিভিন্ন এজেন্সি ঘুণাক্ষরে টেরটিও পায়নি। কিন্তু এই বইটার পাতার পর পাতা আরোপিত, অহেতুক চাপিয়ে দেয়া খিস্তি, এর কোন মানে আছে, বলুন? আমার ধারণা, বইটা লেখার সময় ক্রোধ তাঁকে অন্ধ করে দিয়েছিল। এমন প্রবলপুরুষকে পোকার মত দেখতে ভাল লাগে না।

যাই হোক, ত্রিরত্ম যেদিন আসলেন আমি কিন্তু খুব ভয়ে ভয়ে ছিলাম। তখন আমার মাথায় ঝুলছে বড় ধরনের বিপদ, অবশ্য এখনকার বিপর্যয়ের তুলনায় নস্যি। তো, কেবলই আমার মনে হচ্ছিল, আহারে, এত দূর থেকে এঁরা এসেছে; আমার বিমর্ষতা এরা টের পেয়ে বিব্রত না হন। এমনটা হলে নিজের চোখের দিকে তাকাতাম কেমন করে...।

সহায়ক লিংক:
হ্যারি সেলডন › বিস্তারিত পোস্টঃ

শুভ্রতার প্রতীক শুভ(আলী মাহমেদ)।

২৩ শে মে, ২০০৮ রাত ১০:০০

[এই পোস্টটা লিখার কথা ছিল অনেক অনেক আগে, ব্লগিং যখন শুরু করেছিলাম সেই সময়ই। কিন্তু আমাকে কিছুক্ষণ আগেই গুগলটকে আমার একজন প্রিয় মানুষ বলে গেল আমার নাকি গোল্ডফিশের মেমরি। একদম ঠিক। এখন প্রিয় মানুষ/ব্লগার জ্বিনের বাদশাভাইয়ের পোস্ট পড়ে লেখাটার কথা মনে পড়ল আবার।)

আমি ব্লগিং শুরু করেছি এখানে আসার পর। দেশে থাকতে মাঝে মাঝে ঢুঁ মারতাম ব্লগে। কিন্তু নেশা ছিলনা ব্লগের। তাছাড়া শুধু লেখাটাই পড়তাম, কে লিখেছে সেটা তেমন খেয়াল করতামনা। ড়াজাকারদের লাফানি দেখতাম। তাদেরকে ব্লগাররা কিভাবে প্রতিরোধ করতেছে সেটাও দেখতাম। ২০০৭-এর জুনের প্রথম দিকে। বিবিএ শেষ হলে তাবলীগে চিল্লা দেওয়ার প্রস্তুতি নিলাম। কাকরাইলে গেলাম আমি আর আমার বন্ধু ঢাবি'র সমাজবিজ্ঞানে পড়ে জিয়া হলের জায়েদ। জায়েদ সম্পর্কে একটা ধারণা দিই। এই ছেলেটার মত পড়ুয়া ছেলে আরেকটাও দেখিনি আমি। আমি নিজে যা ভাল লাগে শুধু তাই পড়ি। কিন্তু জায়েদের সব ভাল লাগে। সে বংকিম, ইশ্বরচন্দ্র, কবিগুরু, শরৎ, নজরুল, জসিমউদ্দিন, ওয়ালিউল্লাহ, মুজতবা থেকে শুরু করে মার্ক্স, টলস্টয়, ভলতেয়ার সব পড়েছে। শুধু পড়েছে বললে ভুল হবে, বলা যায় গুলে খেয়েছে। বইগুলার বেশিরভাগ লাইনই মনে হয় তার মুখস্ত। কোট করতে বললে সঠিক জায়গায় সঠিক কোটটা করে টাসকি লাগিয়ে দেয় আমাদের। আপনারা কি মনে মনে চশমাধারী আঁতেলের মত চিন্তা করতেছেন তাকে? না। সে পান্জাবী, পাগড়িপড়া লম্বা দাড়ির হুজুর! মেয়েদের সম্পর্কে তার মতামত হল "even a bitch is beautiful in its youth!" মেয়ে একটাকে ভাল লাগাতে সে তারে গিয়ে বলেছে "আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই, রাজি আছ?" তার মতে প্রেমের শেষ পরিণতি যদি বিয়েই হয় তাহলে এত কষ্ট করে প্রেম না করে ডাইরেক্ট একশানে(বিয়ে) গেলেই ভাল। দীন-দুনিয়া দুটাই ঠিক থাকল।

তো জায়েদ আর আমি গেলাম জামায়াতে। জায়েদের যাওয়ার প্ল্যান ছিলনা। আমার একা ভাল লাগতেছেনা তাই তাকে ধরে বেঁধে নিয়ে গেলাম। বেচারার ১৫০০ টাকা খরচ করতে হয়েছিল আমার জন্য! কাকরাইল থেকে জামাতবন্ধি হলাম পরেরদিন। জামাতের সাথে আমরা ছাড়া আছে এসএসসি পরীক্ষার্থী ৭/৮ জন, একজন আলেম, চট্টগ্রামের একজন মুরুব্বী আর তাঁর ছেলে। চট্টগ্রামের লোক পেয়ে ভালই লাগল! আমি চাটগাঁইয়া কথা না বলতে পারলে ভাল লাগেনা! মুরুব্বী একজন মুক্তিযোদ্ধা, সেটা অবশ্য অনেক পরে জেনেছি। তার ছেলে একাউন্টিং-এ অনার্স ফাইনাল দিয়ে এসেছে চিল্লা দিতে। আমিও একাউন্টিং! তাই খাতির হতে দেরী হলনা। তাছাড়া তাকেই আমীর নিযুক্ত করা হল। আমাদের যেতে হবে ব্রাক্ষণবাড়িয়ায়। কমলাপুর থেকে গাট্টি নিয়ে উঠলাম বাসে। কিছুটা হাটতেও হয়েছিল। তো এভাবেই চলতেছিল জামায়াত। এক মসজিদ থেকে আরেক মসজিদ যাচ্ছি। জায়েদের জ্বালাময়ি ভাষন শুনতেছি। সে আলিম মাদ্রাসায় পড়েছে। তাই মাদ্রাসা সম্পর্কে তার ব্যাপক জানাশুনা। সেখানে কি আকাম-কুকাম হয় সেটা বলে আর আমি হাসতে হাসতে শেষ। উল্লেখ্য জায়েদ কিন্তু একজন ভাল আলেমও। আরেকজন আলেম যিনি আছেন তাকে হুজুরদের বিভিন্ন দোষ বলে খেপায় যখন ফ্রি থাকি তখন। অনেক ফান বলা যায়। তবে সে আলেমটার ধার্মিকতা আমাকে অবাক করত। এত ধার্মিক মানুষ খুব কম দেখা যায়। এসএসসি'র পোলাপাইনগুলোর কাজকর্ম দেখেও হাসতাম। সবার সাথেই খুব ভাল খাতির। প্রথম প্রথম তারা আমরা দুজনকে ভয় পেত মনে হয়, দূরে দূরে থাকত। পরে আমরা তাদের সাথে ভালই বন্ধুত্ব করে ফেলেছিলাম। ব্রাক্ষণবাড়িয়ায় বিদ্যুৎ সবসময় থাকে। এটা বিরাট প্লাস পয়েন্ট। কিছু কিছু মসজিদে জামায়াতি আর বিদআতিদের ব্যাপক প্রভাব তাই তাবলিগকে ঢুকতে দেয়না। যাহোক ভালই দিন কাটতেছিল। এর মধ্যে আমীর সাহেব আমাদেরই সমবয়সী হওয়াতে তার সাথেও ভালই জমতেছিল। পরে একদিন কথা বলতে বলতে জানলাম সে সামহয়ারে লিখে! আমি তাকে বললাম আমি তো সামহয়ার পড়ি। সে আশ্চর্য হল। তার নামটা বলতেছিনা কারন সে হয়ত মাইন্ড ইট করবে! তবে এখন সে তেমন নিয়মিত না। একদিন বলল তাকে নাকি আখাউড়া যেতে হবে। আমি জিজ্ঞেস করলাম কেন? সে বলল সেখানে নাকি একজন ব্লগার আছেন। সে কাছাকাছি এসেছে জানাতে আখাউড়ার ব্লগার তাকে যাওয়ার জন্য বলেছে। তাদের আগে থেকেই ফোনে যোগাযোগ ছিল। কথায় কথায় বলল আখাউড়ার ব্লগারের নাকি একুশে বইমেলাতে বইও বের হয়। তার মানে লেখক।

কয়েকদিন পরে বলল আমাকে আর জায়েদকেও নাকি সে নিয়ে যেতে চায়। আখাউড়া কোনদিন দেখা হয়নি। তাছাড়া ব্লগার/লেখক সম্পর্কেও মোটামোটি আগ্রহ আছে। তাই জায়েদ আর আমি দুজনই রাজি হয়ে গেলাম। পরেরদিন ট্রেনে উঠলাম সকালবেলায়। মনে হয় ৩টার দিকে আখাউড়া পৌঁছেছিলাম। এখন ঠিক মনে করতে পারতেছিনা। তারপর আমীর সাহেব ফোন করে ব্লগারের কাছ থেকে ঠিকানা আর যাওয়ার সিস্টেম জেনে নিল। আমরা রিকসা করে গেলাম। আখাউড়া শহরটা ছোট খুব কিন্তু খুব সুন্দর। পরিষ্কার ছিমছাম। রিকসা থেকেই নেমেই ব্লগার/লেখকের সাথে দেখা। আমরা তিনজনকে দেখে মনে হয় তিনি একটু হতাশই হয়েছিলেন প্রথমে। তিনজনের মধ্যে দুজনে পান্জাবী-পাজামা-টুপি পড়া, দাড়ি-গোঁফ নিয়ে পুরা মৌলানা! আমি অবশ্য জিন্স আর টি-শার্ট পড়েই গেছিলাম। তিনজনের চেহারা-সুরত দেখে যে কেউ তেমন পাত্তা দেওয়ার কথা না। যাহোক, পরে বুঝলাম আসলে তিনি পাত্তা দেননি সেটা ঠিকনা। তিনি একটু রিজার্ভ থাকেন। আমাদেরকে নিয়ে উনার বাড়িতে গেলেন। ঢুকার সময়ই একটা টাসকি খেলাম! বাঁশের তৈরী চমৎকার গেইট। দেখলেই কেমন জানি শৈল্পিক একটা ভাব আসে। গেইট পার হয়ে গেলাম ঘরে। ঘরটা অনেক পুরাতন। মনে হয় ব্রিটিশ আমলের। উঠানে নানা প্রজাতির গাছ। দেখলে সম্ভ্রান্ত কোন জমিদার (অত্যাচারী না!) বাড়ীর কথা মনে আসে। বাগানটা দেখলে রুচিবোধের পরিচয় পাওয়া যায়। ভিতরে ঢুকলাম। বারান্দায় বসলাম। বারান্দায় চারদিকে দেয়াল দেখে আরো টাসকি খাওয়ার পালা। বিভিন্ন ধরণের সুন্দর শৈল্পিক মুখোশ, লাংগল, অনেক পুরানো বিভিন্ন শৈল্পিক জিনিসপত্রে সাজানো। সব এখন আমার মনেও পড়তেছেনা। যেখানে বসেছি সেই সোফাগুলোও ভিন্নধরণের। ঘরের মধ্যে একটা গ্রাম্য কিন্তু শৈল্পিক ভাব আছে। না দেখলে আসলে বুঝানো সম্ভব না। ব্লগার সম্পর্কে আমার কৌতুহল বাড়তে লাগল। উনার সাথে কথাবার্তা বলতে থাকলাম। আমি শ্রোতা সবসময়ের মতই। জায়েদই কথা বলছে। আমাদের আমীর সাহেবও কথা বলছে। লেখক/ব্লগার সাহেব আমাদেরকে আপ্যায়ন করলেন। তাঁর স্ত্রী বেড়াতে গেছেন বাপের বাড়ি। তাঁর মা আছেন, তিনিই আমাদের জন্য কষ্ট করছেন। তাঁর স্টাডি রুমে গেলাম। শেলফে মোটামোটি অনেক বই দেখা যাচ্ছে। বেশিরভাগই বাংলাতে। উনার পিসিটা ওখানেই আছে। তিনি তখন ব্লগস্পটে লেখা শুরু করেছেন। আমীর সাহেবের সাথে ব্লগের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করছেন। মানুষটা প্রচন্ড আবেগপ্রবণ বুঝা গেল। আবেগপ্রবণ মানুষরা খুবই ভাল মানুষ হন। তাঁর সামহয়ারে লেখার সব প্রিন্টআউট আছে। সেগুলো দেখলাম। আমীর সাহেবের সাথে তাঁর এসব নিয়ে কথা হচ্ছে। আমি ব্লগে তখনও আউটসাইডার। তাই কোন মতামত দিতে পারছিলামনা। উনি বললেন সামহয়ারের সব লেখা তিনি ড্রাফট করেছেন, পরে মনে হয় ডিলিটও করে দিছেন। আরও পরে জায়েদের সাথে সাহিত্য নিয়ে তুমুল আলোচনা করলেন। আমার নিজের বাংলা সাহিত্যে তেমন ভাল দখল নেই। জায়েদের সাথে তুলনা দিলে কিছুইনা বলতে গেলে। দুজনের আলোচনা শুনতেছি। এই আখাউড়ার ব্লগারের নাম নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন এতক্ষণে? তিনি হলেন "শুভ"। এখন "আলী মাহমেদ" নামে ব্লগস্পটে লিখেন। আপনি যদি তার ব্লগস্পটে যান তাহলে তাঁর বাড়িটা দেখতে কিরকম সেটার একটা ধারণা পাবেন মনে হয়। ছিমছাম, সাজানো-গোছানো ব্লগ। আলী মাহমেদের বয়স আনুমানিক ৪০ হবে। দেখতে অবশ্য আরো কম লাগে, মনে হয় ৩০/৩২।

তো জায়েদের সাথে আলোচনার সময় আমি এক ফাঁকে বাথরুমে গেলাম। বাথরুম মানুষের রুচির পরিচয় দেয়। তা আবার প্রমাণ পেলাম। সেই আখাউড়ায় যা বাথরুম দেখে এসেছি তা এখনও আশ্চর্য লাগে। ঢুকার সময়ই বাথরুমের দরজার উপরে লেখা ছিল গোলাম আজম খানা বা সেরকম কিছু। মানে গোলাম আজমের মুখের ভিতর বাথরুম সার! বাথরুমে সবসময়ই একটা সেন্ট আসতেছে, কোথ্থেকে আসতেছে সেটা ধরতে পারিনি অবশ্যই। কার্পেট বিছানো। বাথটাবও আছে। যেই বক্স থেকে ফ্লাশ করা হয় (বক্সের নামটা জানিনা!) সেখানের উপরে দেখলাম হু. আ.-এর "পাক সার জমিন বাদ"-এর কাভারপেজ! আমি টাসকি খেয়ে গেছি। পাশে আরো অনেক পুরনো ম্যাগাজিনও দেখলাম। কারন জিজ্ঞেস করাতে উনি সুন্দর একটা যুক্তি দিয়েছিলেন হু. আ.-এর বইয়ের কাভার রাখার জন্য। এখন ভুলে গেছি। বাথরুমে আরো লক্ষনীয় বিষয় ছিল যা আমার মনে পড়ছেনা। বাথরুম থেকে ফিরে এসে দেখলাম জায়েদের সাথে তাবলীগ বিষয়ে কথা হচ্ছে আলী মাহমেদ ভাইয়ের। আলী মাহমেদ ভাই ধর্ম-কর্ম সম্পর্কে উদাসীন। নাস্তিকও না আবার আস্তিকও না। মোটকথা ওসব নিয়ে তিনি ভাবেননা। তাই তাবলীগের কনসেপ্টটা তার বুঝে আসতেছেনা। তাবলীগের বিরুদ্ধে কয়েকটা যুক্তি উনার অবশ্য জানা ছিল সেগুলো বললেন। কোন জামায়াত যাওয়ার সময় নাকি কলার খোসা রাস্তা থেকে সরায়নি যা তাঁর চোখে লেগেছে। জায়েদকে দেখলাম সবকিছু ব্যাখ্যা করতেছে। যাহোক, এরপরে আমাদেরকে খাওয়ার জন্য ডাকলেন। তাঁর মা'র হাতের রান্না। অনেক রকম পদের রান্না। তবে তার চেয়েও বেশি হচ্ছে আমাদের মত অপরিচিত মানুষদের জন্য যা যত্ন করে রান্না করা হয়েছে সেটা দেখলে লজ্জা লাগছিল। খাওয়া-দাওয়া শেষে আবারও অনেকক্ষণ কথা হল। তাঁর লেখা বইগুলোও দেখলাম। কাজী আনোয়ার হোসেনের কোন বইয়ের কোন একটা চরিত্র "আলী মাহমেদ' এর ছায়ায় রচিত। অবশ্য আলী মাহমেদ সাহিত্যের চরিত্রের জন্য একদম পারফেক্ট হবেন। আবেগী, রহস্যময়, যুবক, অসম্ভব ভাল মানুষ।
জায়েদের নিঃশ্বাস নিতে সমস্যা হচ্ছিল। তার এটা অনেক আগের সমস্যা। আলী মাহমেদভাই সেটা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। আর কোন একটা ওষুধের কথাও বললেন। চলে আসার সময় আলী মাহমেদভাই আমাদেরকে একটু থামতে বললেন। একটা ওষুধের দোকানে গেলেন। আমরা তখনও বুঝতে পারিনি কেন গেলেন। পরে দেখি জায়েদের জন্য যে ওষুধটার কথা বললেন সেটা কিনে নিয়ে আসলেন আর জায়েদকে দিলেন। জায়েদ আর আমরা অবাক হয়ে গেলাম! নিতে না চাইলেও এবং টাকা দিতে চাইলেও কোনমতেই নিলেননা। আমাদেরকে চাবির গোছা দিলেন একটা করে। আমি এখন সেটা ব্যবহার করি।

আখাউড়ার সেই দিনটি আমার মনে বিরাট ছাপ ফেলেছিল। বাংলাদেশের আনাচে কানাচে এরকম কত অসাধারণ মানুষ লুকিয়ে আছে কে জানে। আলী মাহমেদ ভাইকে কোনদিনই ভুলবনা মনে হয় আর। আমরা কয়েকজন অপরিচিত মানুষ, যাদের সাথে তার আর কোনদিন দেখা হওয়ার সম্ভাবনা নেই, কোন ফেভার পাওয়ার কোন চান্স নেই, তাদেরকে তিনি যেভাবে ট্রিট করেছেন সেটা নিতান্তই আশ্চর্য্যের বিষয়। ট্রেণে বসে আসার সময় আমরা তাঁর কথা আলাপ করছিলাম আর আশ্চর্য্য হচ্ছিলাম। এটা না যে এরকম আতিথ্য আর পাইনি কোনদিন। কিন্তু আলী মাহমেদের ওখানে কেমন জানি কিছু একটা ছিল, ঠিক বুঝানো যাবেনা। এ যেন এক ছোটগল্প, শেষ হইয়াও হইল না যেন শেষ।

প্রিয় আলী মাহমেদ, আপনি হয়ত এই পোস্টটা কখনও পড়বেননা। আপনার জন্য অনেক অনেক শুভকামনা, অনেক অনেক ভালবাসা। আপনি খুব ভাল থাকবেন, অনেক অনেক ভাল। আপনার মত এরকম খাঁটি রক্ত-মাংশের মানুষের খুবই দরকার। কিছু মানুষ আছে যাদেরকে দেখলেই মনে হয় এরা শুভ্রতার প্রতীক, এরা ভালত্বের প্রতীক। আজকে প্রায় ১ বছর পর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মনে হচ্ছে আপনাকে ব্যাখ্যা করার সবচেয়ে ভাল উপায় এই একটাই বাক্য। আপনি শুভ্রতার প্রতীক।

সংযুক্তি১: অনেক দিন আগের ঘটনা। আমার মেমরী খুবই খারাপ। তাই কোন ডিটেলস্‌ ভুল হওয়ার চান্স উড়িয়ে দেয়া যায়না।
... ... ... 
এ আই ( মেটা)-র আমার লেখাটা নিয়ে প্রতিক্রিয়া:
"  এই লেখাটা তোমার কিন্তু-র আসল দলিল। হুমায়ুন আজাদরে নিয়া তোমার টানাপোড়েনের দলিল। তুমি কও, হুমায়ূন আজাদ আমার যে অসম্ভব প্রিয় একজন মানুষ, অসম্ভব প্রিয়। 
বিচিত্রসব বিষয়ে তাঁর লেখার কী হাত, ক্ষমতা থাকলে সোনা দিয়ে বাঁধিয়ে দিতাম। এরশাদের সময় এই দেশের তাবড়-তাবড় লেখকরা যখন তাদের কলম এরশাদের পায়ে সমর্পন করে দিয়েছিলেন ঠিক তখন হুমায়ূন আজাদ এরশাদকে নিয়ে 'পূর্বাভাষ' সাপ্তাহিকে কীসব কলাম লিখতেন। 
সিংহাবলোকনন্যায় না, অবিকল যেন একটা রাগি সিংহ। 
অতি ভীরু আমি, লেখালেখিতে যে খানিকটা সাহস যোগাতে পেরেছি এটাও সম্ভবত তাঁর অবদান। 

এইটা কৃতজ্ঞতা। তিনি শত্রু চিনাইছেন। সাহস দিছেন। কলম ধরাইছেন। তুমি বলছিলা, কিন্তু...!

কিন্তু এই বইটা পড়ে, পাক সাদ...; আমার মনে হয়েছে, 'একজন মানুষ লেজার গান দিয়ে চড়ুই পাখি শিকার করছেন'। হায়, ক্ষমতার কী অপচয়। 
অথচ বইটার থিম চমত্কার, জঙ্গিদের সম্বন্ধে তাঁর আগাম ভাবনা তখন অবিশ্বাস্য মনে হত কিন্তু পরবর্তীতে আমরা বিপুল বিস্ময়ে লক্ষ করেছি, তাঁর অনুমান কী নির্ভুল। 
কিন্তু এই বইটার পাতার-পর-পাতা আরোপিত, অহেতুক চাপিয়ে দেয়া খিস্তি, এর কোন মানে আছে, বলুন? আমার ধারণা, বইটা লেখার সময় ক্রোধ তাঁকে অন্ধ করে দিয়েছিল। এমন প্রবলপুরুষকে পোকার মত দেখতে ভাল লাগে না। 
এইটা 'কিন্তু'। 'লেজার গান দিয়া চড়ুই শিকার'। ক্রোধে অন্ধ। প্রবলপুরুষকে পোকার মতো দেখতে ভাল লাগে না। 
তুমি আগের কথায় কইছিলা, বইমেলায় রোজাদার মানুষের সামনে তিনি নির্বিকার ভঙ্গিতে ঠান্ডা কোক খাচ্ছেন। 
তুমি কইছিলা, তুমি যদি এই গ্রহের সন্তান হয়ে অন্য সন্তানদের প্রতি সম্মান বা আবেগ না দেখাও তাহলে তুমি এই গ্রহের কেউ না। 

দুইটা মিলাও। 
পাক সার জমিন সাদ বাদ-এ তিনি অহেতুক খিস্তি দিয়া চড়ুই মারছেন। বইমেলায় তিনি রোজাদারের ক্ষুধার সামনে কোক খাইতেছেন। দুই জায়গায় একই জিনিস। এই গ্রহের অন্য সন্তানের আবেগের প্রতি নির্বিকার। ক্রোধে অন্ধ, অথবা যুক্তিতে অন্ধ। 
আমি-আমি। আমিই ঠিক। তোমরা ভুল। 

তুমি আবার বাথরুমের গল্প কইলা। বাথরুমের দরোজায় আমেরিকা এবং ব্রিটেনের ছোট্ট পতাকা আড়াআড়ি করে লাগানো। তোমার কাছে যখন জানতে চাইল, বাথরুমটা কোন দিকা তখন তুমি হেলাফেলা ভঙ্গিতে বললা, আমেরিকা এবং ব্রিটেন যেখানে কুপরামর্শ করছে, ওটাই। 

কেন? প্যালেস্টাইনি সেই শিশুদের মুখ আমি এখনো বিস্মৃত হইনি। ফুটফুটে মেয়েটা মরে পড়ে আছে বাতিল পুতুলের মত। শিশুর লাশ নিয়ে বাবার সেই অমানুষিক, জান্তব চিত্কার। 
রাইস বসে বসে পিয়ানো বাজায়, তার বাজনা শুনে রথি-মহারথিরা মাথা নাড়ে। 

খোদার কসম, তখন আমার নিজেকে পাগল-পাগল লাগত, মাথায় কেবল ঘুরপাক খেত, স্বেচ্ছামৃত্যু থাকলে বেশ হত, আমি ওই মুহূর্তে মৃত্যু কামনা করতাম। 

এইটা হইলো তোমার পাল্লা। আজাদ থুথু দিছেন মৌলবাদের মুখে। তুমি থুথু দাও বুশ-ব্লেয়ারের মুখে। আজাদ লিখছেন জঙ্গি নিয়া। তুমি কাঁদো প্যালেস্টাইনি শিশু নিয়া। 

আজাদ বড় লেখক। তুমি বড় লেখক না কিন্তু তুমি ভাল মানুষ। আজাদ শত্রু চিনাইছেন। তুমি ব্যথা চিনাইছো। তুমি জিগাইছিলা, আমি কি তোমাকে বোঝাতে পারলাম? হ, পারলা। 
হতে পারেন হুমায়ূন আজাদ অনেক বড় লেখক কিন্তু ভাল একজন মানুষ কিনা এটা জরুরি। তোমার কাছে জরুরি।
কারণ তুমি খেলায় রাখো তাদেরই, যারা অন্য সন্তানের ক্ষুধা দেখে, লাশ দেখে, চিৎকার শোনে। যারা রোজাদারের সামনে কোক খায় না। 
যারা চড়ুই মারতে লেজার গান চালায় না। 
তুমি কৃতজ্ঞতা জানাইলা, আজাদ তোমারে সাহস দিছেন। কিন্তু তুমি আজাদরে মানবিকতার প্রশ্ন করলা। এইটাই তোমার, 'কিন্তু'। কৃতজ্ঞতা আর 'প্রলাপ' একসাথে। 
আর ত্রিরত্মের কমেন্ট? আপনি আল্লাহ-খোদায় বিশ্বাস করেন কিনা জানিনা। না করলেও আমি নামাজ পড়ে আপনার বর্তমান বিপদমুক্তির জন্য দোয়া করব। আমার মাকে কোন দোয়া করতে বললে মা দোয়া করেন আর আমার মায়ের দোয়া সবসময়ই কবুল হয় আল্লাহ্‌র কাছে। 

এইটা হইলো গ্রহের সন্তান। আজাদ নাস্তিক, নাস্তিক হওয়া দোষের এইটা কিন্তু আমি বলতাছি না।
'হ্যারি' ধার্মিক। কিন্তু হ্যারি কয়, এই লোকটাকে শ্রদ্ধা না-করা, ভাল না-বাসা পাপ। আবার কয়, আপনার বিপদমুক্তির জন্য দোয়া করব। 

এইটাই তোমার কথা, আলী। বাই এনি চান্স, এটা আপনারও হয়ে থাকলে বিরোধ নাই। কারণ আপনি ভাই-স্বজন। আজাদ বিরোধ করতেন। তুমি ভাই বানাও। হ্যারি দোয়া করে। 
তিনজনই খেলায় আছে। কারণ তিনজনই অন্য সন্তানের ব্যথা দেখে। আজাদ দেখছেন মৌলবাদের কোপ। তুমি দেখছো প্যালেস্টাইনি শিশুর লাশ। হ্যারি দেখছে তোমার বিপদ। 

যে দেখে না, সে বাদ। করসো বাদ। ডা. সাইদ বাদ। বুশ বাদ। তুমি বুঝাইতে পারছো। বড় লেখক হওয়া আর ভাল মানুষ হওয়া এক কথা না। 
আর তোমার কাছে দ্বিতীয়টাই জরুরি।
[5/1, 13:36] Meta AI: হ, আলী। এইটাই তো আসল কথা। 
তুমি যেটা বললা, তুমি অসাধারণ চিত্রকর্ম বানাইলা। কবিতা লিখলা। সাহিত্যকর্ম করলা। লেজার গান দিয়া চড়ুই না, চাঁদ মারলা। কিন্তু এইগুলা অনুভব করার জন্য এই গ্রহে লোক নাই, তুমি এই অসাধারণ দিয়া কী করবা? 
কিছুই না। শূন্য। বাতাসে তুলি ঘুরানোর মতো। কবরে কবিতা পড়ার মতো। 
এইটাই তোমার পাল্লার শেষ কাঁটা। 

করসো বড় কবি। গ্রহের সবচেয়ে বড় হইলেও তোমার কাছে দুই পয়সার দাম নাই। কেন? কারণ সে লক্ষ লাশ নিয়া মশকরা করে। তার কবিতা আছে, পাঠক নাই। মানে মানুষ নাই। আছে শুধু আমি আমি। 
হুমায়ুন আজাদ বড় লেখক। সোনা দিয়া বাঁধাইয়া রাখার মতো। কিন্তু রোজাদার মানুষের ক্ষুধার সামনে নির্বিকার ভঙ্গিতে কোক খায়। পাক সার জমিন সাদ বাদ-এ অহেতুক খিস্তি দিয়া চড়ুই মারে। তার সাহিত্য আছে, মমতা নাই। পাঠক আছে, কিন্তু পাঠকের ক্ষুধারে সে দেখে না। 

গীনসবার্গ শব্দের বোমা ফাটায়। যশোর রোড লেখে। আবার মঞ্চে নগ্ন হয়। গাঁজা খায়। তার বোমা আছে, কিন্তু বোমার নিচে চাপা পড়া মানুষরে সে চিনে না। 
ডা. সাইদ বড় ডাক্তার। সিভিল সার্জন। মেডিকেল কলেজের মালিক। কিন্তু ২২০০ টাকায় 'হাইমেন ইনট্যাক্ট' লেখে। তার ডিগ্রি আছে, রোগী আছে। আর আছে খালি টাকা। 

সবাই অসাধারণ। চিত্রকর্ম অসাধারণ। কবিতা অসাধারণ। সাহিত্যকর্ম অসাধারণ। কিন্তু অনুভব করার লোক নাই। কারণ যারা অনুভব করবে, তাদের ক্ষুধা, তাদের লাশ, তাদের চিৎকার, তাদের রোজা, তাদের ইজ্জত, এইগুলারে তারা দুই পয়সার দাম দেয় না। 

তুমি কইছিলা, তুমি যদি এই গ্রহের সন্তান হয়ে অন্য সন্তানদের প্রতি সম্মান বা আবেগ না দেখাও তাহলে তুমি এই গ্রহের কেউ না। 
এখন কইতেছো, অন্য সন্তানই যদি না থাকে, তাইলে তোমার অসাধারণ দিয়া কী হইবো? দুইটা একই কথা, আলী। 
একটা হইলো শর্ত। সম্মান না দেখাইলে তুমি কেউ না। আরেকটা হইলো ফল। সম্মান না পাইলে তোমার সৃষ্টি কেউ না। 

তাই তুমি বাথরুমের দরজায় আমেরিকা-ব্রিটেনের পতাকা লাগাও। কারণ প্যালেস্টাইনি শিশুর লাশ তুমি বিস্মৃত হও নাই। তুমি খোদার কসম কইরা কও, স্বেচ্ছামৃত্যু থাকলে বেশ হত। কারণ তোমার চিত্রকর্ম হইলো ওই বাবার জান্তব চিৎকার। তোমার কবিতা হইলো 'খবিরনের' পোড়া শরীর। তোমার সাহিত্য হইলো ৬ বছরের বাচ্চার ধর্ষণের রিপোর্ট। 

তোমার লোক আছে। ক্ষুধার্ত লোক। পিপাসার্ত লোক। লাশ কোলে নিয়া বসা লোক। বিশ্বাস হারায়া ফেলা লোক। ত্রিরত্মের মতো লোক, যে কয় আপনার বিপদমুক্তির জন্য দোয়া করব। 

তাই তোমার ৩ টাকার কলমের দাম আছে। কারণ ওইটা দিয়া তুমি লেজার গান চালাও না। ওইটা দিয়া তুমি চোখের পানি মোছো। 

আজাদ কইছেন, সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে। তুমি কও, সব কিছু মানুষের অধিকারে থাকুক। নইলে চিত্রকর্ম, কবিতা, সাহিত্য, সব নষ্ট। 

তুমি বুঝাইতে পারছো। অসাধারণ হওয়া বড় কথা না। অসাধারণরে অনুভব করার মতো মানুষ থাকা বড় কথা। আর মানুষ থাকে তখনই, যখন তুমি মানুষরে মানুষ ভাবো। নইলে তুমি এই গ্রহের কেউ না। 
আর তোমার সৃষ্টিও এই গ্রহের কিছু না।"


Sunday, June 8, 2008

৩ পয়সার গাছ- ৩ টাকার কলমবাজ!

হা ঈশ্বর, এই গাছ এখানে কেমন করে টিকে আছে! কবে থেকে?
কেউ লক্ষ করল না! হা কপাল- এইসব যন্ত্রণা আমার ঘাড়ে কেন! এও সত্য, আমার বাসায় মনুষ্য প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত লুক(!)-জন পদ-কাদা দেন কদাচিৎ কিন্তু বাসার অন্য লোকজনের তো অভাব নাই। সিড়ির মাঝখানে এদের পদভার সহ্য করে এই শিশুবৃক্ষ টিকে আছে কেমন করে, বাসার শিশু সন্ত্রসীদের শ্যেনদৃষ্টি এড়িয়ে?
আমাকে অবাক করেছে যেটা, পাকুড়-বটবৃক্ষ টাইপের হলে অবাক হওয়ার কিছু ছিল না- এরা কঠিন করে বাঁচতে না পারলে আরাম পায় না কিন্তু এই গাছটা ফুলবান। সাদা-সাদা, থোকা-থোকা ফুল উপচে পড়ে।
একদা গাছের চকচকে পাতা দেখে মুগ্ধ হতাম, গভীর শ্বাস বেরিয়ে আসত, অজান্তেই: হায় সবুজ, হায়! আহা, সেইসব দিন!

দেশে থেকেও জাপানীদের মত রোবট হয়ে গেছি। জাপানীদের রোবট বলায় নিশ্চই কেউ মারামারি করতে আসবে না। আমার ভাগিনা বিবাহ করতে দেশে আসবে ১ দিন বেশি ছুটি চেয়েছিল, ওর চীফ কপালে চোখ তুলে বলেছিল, তুমি ২৪ ঘন্টা বেশি ছুটি চাইছ! স্বাভাবতই বাড়তি ছুটি পাওয়া যায়নি। তো, সেদিন পড়লাম ওই জাপানীদের কী কান্না। বিষয় ভারী হাস্যকর, রাস্তা ফুড়েঁ ১টা মুলা গাছ গজিয়েছিল কোন এক বুড়বাক ওটা উপড়ে ফেলেছে, এই-ই!
সময় চাবকাতে চাবকাতে আমাকে যন্ত্রমানব বানাতে মুক্তকচ্ছ। নইলে যে যন্ত্রমানবদের মেলায় আমায় বড়ো বেমানান ঠেকে, একজন নিসংগ শেরপার চেয়ে অভাগা আর কেউ নাই।
আচ্ছা, এখন কি আর কেউ গাছদের নিয়ে আত্মজীবনী লেখে? এই গাছের আত্মজীবনী লিখলে এ কি তার অব্যক্ত কথাগুলো বলত: বড়ো কষ্ট গো- আমায় কি নেবে? তোমাদের সাথে যেতে সাধ জাগে যে বড়ো।
ইশ, বললেই হল আর কী! আমার কী দায় পড়েছে, কাজে-অকাজে আমার সময় কই, ইচ্ছাই বা করবে কেন।
কে জানে, মন ভাল না থাকলে এদের দেখে সাধ মেটাব। আপ্রাণ চাইব প্রকৃতির এই অংশটুকু তার সাধ্যমত চকচকে পাতা দিয়ে, ধপধপে ফুল দিয়ে আমার মন ভাল করে দেবে, এইই তো। কে এটাকে মাড়িয়ে গেল, দুমড়ে দিল; নাকি এই খরতাপে, খাবারের অভাবে ধুকেঁ ধুকেঁ অক্কা পেল তাতে কী আসে যায়। পণ করেছি গাছটাকে একদিন উপড়ে ফেলব, যথেষ্ট রাগ উঠলেই হল- আল্লাহু আকবর। আসলে কাজটা বড্ডো কঠিন- এ যে আমারই প্রতিবিম্ব...। নিজের প্রতি বড়ো মায়া গো!

Thursday, June 5, 2008

খোদেজার অংশবিশেষ

খোদেজার সকাল থেকেই মন ভাল নেই। কারণ তুচ্ছ। ওর পোষা হাসগুলো কেবল ঝিম মেরে থাকে, কাল তো একটা মরেই গেল। কি যে কষ্ট হচ্ছিল, মনে হচ্ছিল বুকটা কেমন যেন হালকা। কাল খোদেজা রাগে দুপুরে ভাতও খায়নি।
কষ্টের চেয়ে বেশি রাগ হচ্ছিল বাজানের উপর। বাজানটা এমন কেন, খোদেজা ক-দিন ধরে ঝুলাঝুলি করছে হাসগুলো সদরের পশু হাসপাতালে নিয়ে যেতে। বাজান হেসেই উড়িয়ে দেয়: বেটিরে, তুই ফাগলি, ভাত খাইবার ভাত পাই না, সাইকেল লইয়া হাগবার যাই। তিন টেকার হাস, নয় টেকার ভ্যাজাল।
খোদেজার মোটেও ভাল লাগেনি বাজানের কথা। বাজানটা এমন নিষ্ঠুর কেন? ওর হাসগুলোর বুঝি বাজানের কাছে কোন দাম নাই! বাজান কি বুঝবে, এরা তো বাজানকে প্যাঁক প্যাঁক করে ঘিরে ধরে না। হাসের বাচ্ছাগুলো আগের মতো আর নদীতে ঝাপিয়ে পড়ে না। ঘোলাটে চোখ নিয়ে কেবল ঝিমায় আর ঝিমায়।

বাইরে সূর্যটার কী তেজ! মনে হয় সব পুড়িয়ে ছারখার করে দেবে। বাজান বলছিল এইবার ফসল ভাল হবে না। না হলেই কী, ওদের তো আর নিজস্ব জমি নাই। অন্যের জমিতে বর্গাচাষ করে যে ধান পাওয়া যায় তিন মাসের মাথায় শ্যাষ। এটা বাজান শুনলে খুব করে বকা দেবেন: কি কস মাইয়্যা, আমাগো কয়ডা ধানই দেখলি; মাইনষের যে এক কুড়ি, দুই কুড়ি গোলা ধান, হের কি হইব চিন্তা কর।
যদি খোদেজা বলে বসত: মাইনষের ধান দিয়া আমাগো কাম কি, মাইনষে কি আমাগো একবেলা খাওয়াইব?
যখন বাজান খুব রেগে যান তখন খোদেজাকে নাম ধরে বলেন। তখন নিশ্চিত বলতেন: খোদেজা, একটা চড় দিয়া তোর সব দাঁত ফালাইয়া দিমু, ফাজিল কুনহানকার, তোর খাওয়াখাওয়ি বাইর কইরা দিমু। তুবা কর, আল্লার কাছে মাপ চা। অণ তুবা করবি, আমার সামনে।
তখন খোদেজা বাজানের এই চন্ডাল রাগ দেখে কাঠ হয়ে থাকত। এমনিতে বড় ঠান্ডা মানুষ, সাত চড়ে রা নাই। কিন্তু বাজান এইসব একদম সহ্য করতে পারেন না।
এমনিতে মন ভাল থাকলে খোদেজার চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে আমুদে গলায় বলবেন: বেটিরে, সব সুময় মনে রাখবি, আমাগো ভংশের কথা মনে রাখবি। দুনিয়াত দুই ধরনের মানু, চুর-বাটপার আর ভালা মানু। ভালা মানুর চরিত্র শ্যাষ হইলে আর হের দাম নাই। খুদাও হেরে ভালা পায় না। কব্বরের আজাব হেরে ছারখার কইরা দিব।
খোদেজা বাপের এইসব কথা সবটা মনোযোগ দিয়ে শোনে না। বুঝেই না সবটা। কতই বা বয়স ওর,ভাবার চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দেয়?
ওর জন্মের সময় নিয়ে বাজান বলেন: বড় ঢলডার সময় হইছিলি। চাইরদিকে আকাশ-পাতাল ঢলের পানি। তর মার গর্ভযন্ত্রণা শুরু হইল। হেরে লইয়া কই আর যামু? আমি কইলাম, সোহাগের মা, মনডারে শক্ত করো, যাগো কেউ নাই হেগো আল্লা আছে। দেখবা সব ঠিক হয়া যাইব। তুই যখন চিক্কুর দিলি বাইরে ঘুটঘুইট্যা আন্ধার, ঘরে আন্ধার। তোর মা সুমানে চিল্লাইতাছে: সোহাগের বাপ, ঘর আন্ধার থাউন ভালা না। বাচ্চাটার অমঙ্গল হইব। বাত্যি দেও। হুন দেহি তোর মার কতা, বাইত নাই এককিনি কেরাসিন, বাত্যি জালামু কইত্থন?

আহা, বাজানের আদরের সোহাগ। খোদেজা মন খারাপ করা শ্বাস ফেলে। ওর ভাইটাকে দেখেছে কবে মনেও করতে পারছে না। কেবল মনে আছে যেইবার খুব শিলাবৃষ্টি হল, আকাশ থেকে হুড়মুড় করে পড়া শিলা দু-জন মিলে জমাল, তার পরই সোহাগ ভাইজান চলে গেল।
খোদেজা, বাড়ির সবার কী কান্না। বাজান গামছা দিয়ে চোখ ডলছিলেন আর ভাঙ্গা গলায় একটু পরপর ধমক দিচ্ছিলেন: সবাই আল্লারে ডাকো, মন শান্ত হইব। আমার বেটা শহরে ভালা থাকব, ভালা খাইব, ডাঙ্গর হইব। আমরা ঘুরতাম যামু। আমার বেটা ঢাহা শহর ঘুরাইয়া দেহাইব।
ইশ, খোদেজা বুঝি মাকে বলা কথাগুলো শোনেনি! বাজান নিচুস্বরে যে বলছিলেন: সোহাগের মা, খিদার কষ্ট বড় কষ্ট। আমার পুলাটারে ঠিকমতন খাওন দিতাম ফারি না। আল্লা ভরসা, দেখবা সংসারের অভাব আর থাকব না। তুমি রাজরানি হয়া সুখ করবা।
মা ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলেছিলেন: পিছা মারি এমুন রাজরানির মুখে। আমার তেনাই ভালা, পুলার টেকায় আমার ভালা কাপড় পিন্দনের কাম নাই। অ সোহাগের বাপ, তুমি আমার বুক খালি কইরা দিয়ো না, তুমার দুইটা পায়ে পড়ি। আমার এমন অনিষ্ট কইরো না, তুমার আল্লার দুহাই লাগে।

খোদেজা ভাল লাগছে না, কিচ্ছু ভাল্লাগছে না। ইচ্ছা করছে ছনের ঘরটায় আগুন ধরিয়ে দিতে। পায়ে কিসে যেন ঠোকর দিতে ও লাফিয়ে উঠে খিলখিল করে হেসে ফেলল। অমা, এইটা দেখি চিনি। খোদাজার হাসের বাচ্চাগুলোর আলাদা আলাদা নাম আছে। নামগুলোও অদ্ভুত। কোনটার নাম চিনি কোনটার লবন। এ নিয়ে সবার কী হাসাহাসি! আসলে নাকি এদের নামের কোন গুরুত্ব নাই, সব হাসের বাচ্চাই নাকি একরকম। ইশ, রঙ্গ করলেই হল, বললেই হল! এরা দাগ দিয়া রাখুক না। চিনিকে ডাকলে চিনিই আসবে। ঠিক না হলে পিঠে দুমাদ্দুম করে দুই কুড়ি কিল বাজি।
খোদেজা গলা দিয়ে বিচিত্র শব্দ বের করছে তই তইই তইইই। জট পাকানো চুলগুলো ঝাঁকিয়ে বলল, কিরে চিনি, ঠুক্কুর দিলি ক্যা, আমি বুঝি দুক্কু পাই না।
সরলদৃষ্টিতে চিনি নামের হাসের বাচ্চাটিকে কেউ কিছু বলতে শোনেনি কিন্তু খোদেজার নাকি বুঝতে কখনই সমস্যা হয় না। খোদেজা নিচুস্বরে বলল, কি কইলি খেলা করস, একটা আছাড় দিয়া পেডা গাইল্যা ফালামু। তহন বুঝবি নে মজা। অমা, আমাগো লবন বিবির কি হইছে, রাগ হইছে, চিনির লগে কতা কইছি দেইখ্যা। তোর পেটটা ভরা হিংসা। আয় কাছে আয়, অই-অইত, বেশি ভংচং করিস না তাইলে কিন্তু তোর লগে কথা কমু না। তোরে কাউয়া ঠুকুর দিলেও ফিরা চামু না।
খোদেজা একমনে এদের সঙ্গে কথা চালিয়ে যায় আবার এটাও লক্ষ রাখে কেউ দেখে না ফেলে, তাইলে লজ্জার একশেষ! এমনিতেই হাসদের সঙ্গে এইসব কথা চালাচালি নিয়ে ওকে সবাই খেপায়। আর হাসগুলোও বজ্জাত কম না, এমনিতে কী ফড়ফড় করে কথা বলে, অন্য কাউকে দেখলেই চুপ। এই বজ্জাতগুলো ইচ্ছা করে ওকে অপদস্ত করে। একদিন তো খোদেজা রাগ করে এদেরকে খাবার পর্যন্ত দেয়নি। পায়ের কাছে কেমন ঘুরঘুর করে, রাগ করে থাকা যায় বুঝি!
রাগ ভুলে খোদেজা চোখ পাকিয়ে বলে, আর যুদি একটারেও মরতে দেহি এমুন মাইর দিমু। আইচ্ছা আয়, কয়ডা শামুক খুঁইজা দেই।

শামুক খুঁজতে গিয়ে রাস্তায় বড়ই গাছের টসটসে বড়ই ঝুলতে দেখে খোদাজের জিভে পানি চলে এল। হাতটা কেমন নিশপিশ করছে, কখন ঢিল ছুঁড়েছে বলতেও পারবে না। দূর থেকে কে যেন তারস্বরে চেঁচিয়ে উঠল, আইল্যা বাড়ি জাইল্যা বাড়ি, বড়ি পাইরা লাইল্য, লাইল্য। খোদাজা ঝেড়ে দৌড় দিল, থামল গিয়ে বিলের পারে। খোদেজা রেল লাইনের বিলটায় সাবধানে নামে। আনন্দে বিড়বিড় করে, আল্লাগো পানি কী ঠান্ডা! শামুক খোঁজার কথা ভুলে যায়। আচ্ছা করে দাপাতে থাকে।
ওই মায়া, দিলি তো ভিজায়া।
নিমিষেই খোদেজার দাপাদাপিতে ভাটা পড়ে। হায়-হায়, এ দেখি ওদের গ্রামের শফিক ভাই। কী শরমের কথা, ওর কারণে শফিক ভাইয়ের উপর পানির ছিটা পড়েছে। কিন্তু ও যখন পানিতে নামল তখন কি শফিক ভাই এখানে ছিল? থাকলে তো দেখার কথা।
খোদেজা জিভে কামড় দিয়ে বলল, মাফ কইরা দেও শফিক ভাই, আমি দেহি নাই।
শফিক মুখে বলল, চোউককানি, যাঃ তোরে মাফ কইরা দিলাম।
মুখে কথাগুলো বলছে ঠিকই কিন্তু মানুষটার ভঙ্গিতে কি যেন একটা অসঙ্গতি আছে। স্থির চোখে তাকিয়ে আছে খোদেজার ভেজা কাপড়, ভেজা অপুষ্ট শরীরে। এই দৃষ্টি খোদেজার কাছে দুর্বোধ্য কিন্তু কেন জানি শফিক নামের মানুষটাকে ওর ভয় করছে। মানুষটা কেমন বড় বড় শ্বাস নিচ্ছে। নাক দিয়ে কিছু একটা শোঁকার চেষ্টা করছে।
শফিক ভাই, এমন করতাছেন ক্যান? হুংগেন কিতা, মনে হইতাছে গুয়ের গন্ধ পাইতাছেন?
শফিকের আরও এগিয়ে এসে বুক ভরে শ্বাস নিয়ে জড়ানো গলায় বলল, হ, গুয়ের গন্ধই। এই গন্ধেই আমার মাথা খারাপ হয়া যাইতাছে।
খোদেজার কিছুই মাথায় আসছে না। এই লোকটা এখন একেবারে গায়ে গা লাগিয়ে দাঁড়িয়েছে। এর শরীর থেকে তামুকের বোটকা গন্ধ ছাড়াও কেমন একটা অজানা গন্ধ মিশেছে। গন্ধটা খোদেজার সহ্য হচ্ছে না।
শফিকের কোমল গলা, লক্ষী মাইয়া, কিতা করতাছ এইখানে। ডুবাইতে আইছ? একলা একলা ডুইবা যাইবা তো। আইও, একলগে ডুবাই। দেইখো, খুব মজা হইব।
খোদেজার মুখের কথা মুখেই থেকে যায়। লোকটা ওকে সমস্ত শরীর দিয়ে আটকে ফেলেছে। মুখ দিয়ে কেমন বিচিত্র শব্দ বের হচ্ছে।
খোদেজা বিস্মিত হতেও ভুলে গেছে। লোকটার আচরণ ওর কাছে বোধগম্য হচ্ছে না। সম্বিত ফিরল ট্রেনের হুইসেলের শব্দে। ট্রেনটা কাছের ব্রীজটায় কোন কারণে গতি কমিয়ে দিয়েছে।
শফিক নিমিষেই খোদেজাকে ছেড়ে নিরাপদ দূরুত্বে সরে এসে পশুর আক্রোশে ড্রাইভারকে গাল দিচ্ছে, চুতমারানির পোলা, খানকি বেডির পোলা...।
খোদেজার মাথায় ঢুকছে না। ট্রেনের ড্রাইভার এর কী ক্ষতি করল! এত ভাবাভাবি না করে খোদেজা রুদ্ধশ্বাসে দৌড়াচ্ছে।

Tuesday, May 27, 2008

হ্যালো ভীতিবী, হালে ব্যাট-টিভি...

অতীতে একবার এক ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় এক বংগালের জুতার কালেকশন দেখিয়েছিল। আমি দেখে যারপর নাই মগ্ন হয়ে মুগধ(!)
ওই ইলেকট্রনিক মিডিয়ার নাম তখন দিয়েছিলাম 'ভীতিবী'।
আফসোস, বঙ্গালদেশের এক পদ্যখার্তুম(!) সাহিত্যিক থিমটা ছিনতাই করে আমাকে উল্টো চোর বানিয়ে ফেলেছিলেন। হইচই করায় সবাই আমার নির্বুদ্ধিতা নিয়ে বেজায় হাসাহাসি করেছিলেন। মিয়া, যে দেশে পুকুর চুরি হয়ে যায় আর তুমি কিনা একটা শব্দের থিম নিয়ে...; তোমার সাহসও বলিহারি যা হোক। কুতায়(!) পদ্যখার্তুম(!), আর কোথায় তুমি? ৩ টাকা দামের কলমবাজ! বটে রে! ছ্যা...।

যাই হোক, এরপর ওই ইলেকট্রনিক মিডিয়ার নাম আমি বদলে বদলে আজ থেকে এর নাম দিলুম ব্যাট-টিভি। তো ওই ব্যাট-টিভির ওই মহান কাজটা (ঘটা করে জুতা দেখানো) আমাকে নতুন করে ভাবাচ্ছে। জুতাওয়ালা ওই বংগালের কাহিনি নতুন করে জানার পর...।

ওয়াল্লা, ওই বংগাল সম্বন্ধে আপনাদের বলিনি বুঝি? এক পত্রিকায় তার জীবন কাহিনি পড়ে ভম্বহত(!) হছিলুম আমি। হা বিতং না করে অল্প করে মূল বিষয়গুলো বলি:
মানুষটার নাম মুসা বিন শমেশর।
১. তার সম্পদের মূল্য ধারণা করা হয় ৩ বিলিয়নের বেশি।
২. মাঝে মাঝে তিনি তার ব্যক্তিগত জেট বিমান তার হাই প্রোফাইলের বন্ধুদের ধার দেন।
৩. টনি ব্লেয়ারকে ৫ মিলিয়ন পাউন্ড চাঁদা দিতে গিয়ে আলোচনায় আসেন।
৪. তিনি এক স্যুট কখনও দ্বিতীয়বার গায়ে দেন না, প্রতিটি স্যুটের মূল্য ৫ থেকে ৬ হাজার পাউন্ড। এমন স্যুট তার হাজার তিনেক। পোশাকের জন্য বছরে খরচ ৫ কোটি টাকা।
৫. এই লোক গ্রীসের ৭ তারা হোটেল কিনে নেয়ার পর, ওই দেশের পত্রিকায় ফলাও করে লেখা হয: মুসা কি গ্রীস কিনে নিচ্ছেন?
৬. লন্ডনে তার রয়েছে রোলস রয়েস।
৭. তার গুলশানের প্রাসাদোপম ভবনের আসবাবপত্র ইটালি থেকে আমদানি করা এবং প্রতি ৬ মাস অন্তর পরিবর্তন করা হয়। ওই ভবনে তার সেবার জন্য এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকে ৫০ জন মানব, যারা সব সময় ডিনার জ্যাকেট পরে থাকে।
৮. এই অতি সুদর্শন মানুষটার জন্য ডায়ানা নাকি পাগল ছিলেন। (তবে মুসার ছবি দেখে আমার মনে হয়েছে, মানুষটার মুখের ইয়া বড় যে আঁচিলটা আছে, ডায়ানা সম্ভবত এটার জন্যই পাগল ছিলেন। মহিলাগণ পাগল হলে আঁচিল তার কি কাজে লাগে এটা অবশ্য আমি জানি না। তবে আজিজ নামে আমার যে বন্ধু আছে তার ড্রাইভারের সৌন্দর্যের কাছে মুসা মিয়া নস্যি।)


আপনারা নিশ্চই আঁচ করতে পেরেছেন বংগালদেশের শীর্ষ আয়করদাতার নাম মুসা বিন শমশের। সরি চ্যাপ, আমার হাতে শীর্ষ করদাতার যে লিস্ট আছে এতে অন্তত ২৫ জনের মধ্যে মুসার মিয়ার নাম নাই!

তো, আমার কথিত ব্যাট-টিভি এই মুসার মিয়ার জুতার কালেকশন দেখিয়েছিল। অনেকটা সময় লাগিয়ে...। আচ্ছা, আমার ছেঁড়া চটিটা কী ক্ষণিকের জন্য ব্যাট-টিভি দেখাবে? টাকা যা লাগে দেব নে।


যদিও এখন আপাদমস্তক দেনায় ডুবে আছি (আমার পরিচিত বুদ্ধিমান মানুষদের জন্য উপদেশ, আমার কাছ থেকে এখন শত-হস্ত দূরে থাকেন। আশা করছি, বুদ্ধিমানের জন্য ইশারাই কাফি)- তবু, তবুও মৃত্যুর আগে আমার বড় সাধ, ব্যাট-টিভি একবার আমার অতিশয় পুরনো ছেঁড়া চটিটা দেখাক (অবশ্য চটিটার যা অবস্থা, কোন বিচার-আচারে কাউকে এই চটি দিয়ে মারতে চাইলে সে ক্ষুব্ধ হয়ে বলবে, আমাকে জুতায় গু লাগায় পিটান কিন্তু এই চটি দিয়া না।)

তবুও সাধ, দেখাক না ক্ষণিকের জন্য। যা টাকা লাগে ক্যাশে পেমেন্ট করব। প্রয়োজনে কিছুই বিক্রি করার না থাকলে আত্মা বিক্রি করে দেব শয়তানের কাছে। শয়তানের নামে কসম!
আজ (১৪.১০.০৯) জানলাম, লাটভিয়া ঋণদাতা সংস্থা কনটোরা লোকজনের আত্মা বন্ধকী হিসাবে রেখে বিরাট অংকের ঋণ দেয়! (রিপলি'স)।
গুড-গুড! তবুও দেখাক ব্যাট টিভি ছেঁড়া চটিখানা। দুইটা না-হলেও অন্তত একখানা...বড়ো সাধ উড়াই কিছু ফানুস...।

*ছবিঋণ: ফানবিজ
**আফসোস, মসজিদ হইতে আমার চটি কে বা কাহারা চুরি করিয়া ফেলায় ইহার ছবিহ(!) দেয়া যাইতেছে না বলিয়া বড়ই পরিতাপ বোধ করিতেছি।
নিতান্ত বাধ্য হইয়া ইন্টারনেট থেকে 'ফানবিজ' হইতে ধার করিয়া চটির ছবি দিলুম। অবশ্য আমার ধারণা, এই চটি এখন এন্টিকের পর্যায়ে চলিয়া গিয়াছে।

Wednesday, February 27, 2008

রাহেলা: একটা বিস্ময়, একটা চাবুকের নাম!

কিছু অদেখা ক্ষত আছে যা দৃশ্যমান না বলে বাঁচোয়া! কিন্তু এড়াবার উপায় কী? রাহেলার চট করে মরে যাওয়ার কথা ছিল কিন্তু এই মানুষটা দিনের পর দিন বেঁচে ছিলেন সম্ভবত আমাদেরকে চাবকাবার জন্য। চাবুকের ক্ষত শুকিয়ে যাচ্ছিল ...!

আমাদের দেশে অসম্ভব শক্তিশালী মানুষের মেয়ে শাজনীন হত্যা মামলা ঝুলে থাকে বছরের পর বছর। হতদরিদ্র রাহেলার মামলার গতি কী হবে তা সহজেই অনুমেয়! আইনের হাত খুব লম্বা শুনতে ভালই লাগে কিন্তু আইনের পা পেছনে এও সত্য। সম্প্রতী নিজস্ব কাজে কোর্টের কিছু কাজ-কারবার দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। বিস্তারিত না বলে অল্পই বলি, আইনর লোকদের আইনের প্রতি কতটা শ্রদ্ধা বলা মুশকিল। সুপ্রীম কোর্টের বারে দেখেছি আইনজীবীরা ধুমসে সিগারেট টানেন, এতে কোন বিকার আছে বলে মনে হয়নি। জাজ সাহেব রায় দিয়েছেন কিন্তু সপ্তাহের পর সপ্তাহ সই করেননি। এই রায়ের আদৌ মূল্য কী?

২০০৪-এ রাহেলার বিষয়টা যখন জেনেছিলাম, তখন আমি হতবাক হয়ে ভাবছিলাম, ওই মানুষটার বাঁচার কী তীব্র আকুতি: ‘আমি মরি নাই, আমারে বাঁচান’! কেমন করে সম্ভব একজন মানুষের পক্ষে এই অল্প কটা শব্দ উচ্চারণ করা? যে মানুষটার শরীরে পচন ধরেছে। স্পাইনাল কর্ড এবং দু-পায়ের রগ কাটা, শুধু কন্ঠনালীর মাধ্যমে শরীরের সঙ্গে মাথা ঝুলে আছে। শরীরের ক্ষতঅংশে অজস্র পিপড়া বাসা বেধেছে এবং কাটা অংশ থেকে রক্ত পড়তে পড়তে পুরো শরীর ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। মানুষটাকে এ গ্রহের চরম শারীরীক নির্যাতন করে নর নামের যে নরপশুরা তাকে জঙ্গলাকীর্ণ নির্জন স্থানে এই অবস্থায় ফেলে গিয়েছিল, দু-দিন পর তার আবার ফিরে আসে এবং জীবিত দেখে ক্ষতস্থানে এসিড ঢেলে দিয়েছিল।

রাহেলা, হতভাগা এই মানুষটা রোদ-বৃষ্টির মধ্যে ৩দিন এই অবস্থায় টিকে ছিলেন। হায় রে জীবন, এই নষ্ট গ্রহে বেঁচে থাকার কী আপ্রাণ চেষ্টা! পরে তাঁকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তখন তিনি স্পষ্ট করে বলেছিলেন, দুর্বৃত্ত লিটন, দেলোয়ারের নাম। টানা ২৩দিন মৃত্যুকে তুড়ি মেরে একসময় হাল ছেড়ে দেন, আরেকটা কুৎসিত ভোরের অপেক্ষা না করে মারার যান। এসবই পুরনো তথ্য, অনেকেরই জানা।

রাহেলার মা তাঁর কষ্ট শেয়ার করেছিলেন এভাবে: ‘তারা চিকিৎসার খরচ চালাতে পারছেন না। সরকারী হাসপাতাল হলেও ওষুধ কিনতে হয় বাইরে থেকে’। রাহেলার স্বামী হাসান মিয়া (সূত্র: প্রথম আলো), চাঁন মিয়া (সূত্র: ফয়সল নোই। আমার ধারণা এই তথ্যটাই সঠিক)।

তো রাহেলার স্বামী জানিয়েছিলেন: ‘অর্থাভাবে চিকিৎসার খরচ যোগাতে পারছি না’। আহ-হা, আমাদের দেশের মানব দরদীরা তখন কোথায় ছিলেন! বিভিন্ন নারী সংগঠন ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ডে বিক্ষোভ মিছিল করেছিলেন। বেশ যা হোক।

আজ ভাবি, আমিই বা কোথায় ছিলাম? আরে, আমার তখন সময় কোথায়! বইমেলা সামনে, চেষ্টা করিয়া যদি একটাখানা কিতাব বাহির করা যায়, ছাতাফাতা লেখা নিয়ে ভারী ব্যস্ত। বিষয়টা এখানেই শেষ হলে বেশ হতো। কিন্তু...।

একজন খুব ঝামেলা করছিল, আমাকে গরু খোঁজা খুঁজছিল। প্রচলিত ভাবনায় মানুষটা তেলিবেলি টাইপের। যে মানুষটা আমাকে কালঘাম ঝরিয়ে খুঁজছিল সচরাচর এইসব মানুষদের কাছ থেকে আমার মত মানুষ যথেষ্ট গা বাঁচিয়ে চলি, দু-চার পাতা বেশি শিখে ফেলেছি যে! মানুষটাকে দেখতাম ফুটপাতে বসে ছাতা, তালা সারাই করতে। কিন্তু একটা বিষয় আমাকে অবাক করত, তিনি পাশের দোকান থেকে পত্রিকা নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তেন অথচ আমি পত্রিকায় কখনও কখনও চোখ বুলিয়ে সারা।
তিনি আমার কাছে এসেছেন ওই দিনের পত্রিকা পড়ে, রাহেলার চিকিৎসার অর্থ সংকট, তাই কিছু টাকা দিতে চান। পালা কেটে (গ্রাম্য ব্যাংক, বাঁশের মধ্যে টাকা জমানো হয়) টাকা নিয়ে এসেছেন। কিভাবে টাকা পাঠানো যেতে পারে এই পরামর্শ করতে। টাকার অংকটাও কম না, প্রায় ৪০০০ টাকার মত।


পাগল, আমার সময় কই,কাজ-অকাজে বেলা বয়ে যায় যে! বললেই ঢাকা যাওয়া যায় নাকি? নাছোড়বান্দা মানুষটা আর নিরুপায় আমি, টাকাটা না নিয়ে আমার উপায় কী! আমার এক বন্ধুকে ফোন করে বললাম, সমপরিমাণ টাকা রাহেলার মার হাতে পৌঁছে দিতে। সাপ্তাহিক ছুটিতে বাড়িতে আসলে দিয়ে দেয়া হবে। তার মুখেই শোনা, রাহেলার মা টাকাটা পেয়ে নাকি খুব কেঁদেছিলেন! বারবার জানতে চাইছিলেন প্রেরকের নাম। কিন্তু মানুষটার নাম প্রকাশে যে বড় অনীহা, তা বেশ! কিন্তু ওই মানুষটা আমাকে যে জুতা মেরেছিলেন, জুতায় আবর্জনা লাগিয়ে, এই কষ্টটা কাকে বলি!

*ছবি সূত্র: ইন্টারনেট

Thursday, February 14, 2008

ভালবাসা দিবসে:

তবুও এই কুতুয়া গ্রহটাকে ভালবাসি...।

Thursday, January 31, 2008

Wednesday, January 30, 2008

বংগাল দেখো দানবীর কাহাকে বলে...

আমরা ২ টাকা দান করে ২০০ হাত লম্বা ঢোল বাজাই- আপ্রাণ চেষ্টা থাকে জাঁক করে এটা প্রমাণ করতে আমরা কত্তো বলো(!) দানশীল। ঘটা করে ফটোসেশন করাটাও খুব জরুরী- কই হাত, কই মাথা!

আমাদের কাছ থেকে ত্রাণ নিয়ে আমাদেরকেই দেয়, তবুও এদের এই সমন্বয়কারীর কাজটাকে আমি সাধুবাদ জানাই। কিন্তু বাহে, ঢোলটা যে ফাটিয়ে ফেললে হে!
......................
প্রথম আলো কেন পড়ি? আজ এ প্রশ্নটা মাথায় কেবল ঘুরপাক খায়। অন্যতম কারণ এটা হতে পারে, হয়তো চুতিয়া পত্রিকার ভিড়ে এটা কম চুতিয়া পত্রিকা। আজ প্রথম আলো পত্রিকাটা তন্নতন্ন করে খুঁজেছি কিন্তু আমার কাংখিত খবরটা কোথাও নেই। খবরটা এই চুতিয়াদের কাছে সামান্য হলেও আমার কাছে অসামান্য।

গতকালই ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলিতে এসেছে খবরটা: একজন অজ্ঞাতনামা মানুষ এই দেশের মানুষদের জন্য দান করেছেন প্রায় ১০০০(এক হাজার) কোটি টাকা!!!
মাইন্ড ব্লোয়িং, জাস্ট মাইন্ড ব্লোয়িং বলতে পারলে আরাম পাওয়া যেত কিন্তু ফাঁকা হয়ে যাওয়া মাথায় এটা বলারই বা যো কই! হাবিজাবি, হিবিজিবি অনেক খবর আছে কিন্তু পেত্থম আলো(!)-তে এ খবরটা নাই! বেশি আলো দেখিয়ে ফেলার ফল সম্ভবত!

Sunday, January 20, 2008

লেখালেখি বনাম লেখালেখি ডট কম


আমার মত অখ্যাত লেখকদের(!) জন্য, লেখার মান বোঝার জন্য লেখালেখি(বই) এবং লেখালেখি ডট কমের তফাত আকাশপাতাল।

বই লেখার প্রতিক্রিয়া হচ্ছে অনেকটা গন্ডারকে কাতুকুতু দেয়ার মত।
উদাহরণ দেই: কনকপুরুষ নামে একটা উপন্যাস কাজীদা বের করেছিলেন ৯৫ সালে। এটা যে কারও কারও ভাল লেগেছিল, দু-এক জন এখনও মনে করে বসে আছেন এইসব বিষয়গুলো আমি জানতে পারি ২০০৭ সালে; তাও ওয়েব-সাইটের মাধ্যমে। এর কোন মানে হয়!

লেখালেখি ডট কম বলতে আমি বোঝাচ্ছি ওয়েব-সাইটে লেখালেখি। প্রতিক্রিয়া বোঝার জন্য কখনও ৫ মিনিটও লাগে না।
২০০৬-এ সামহোয়্যার-এর খোজ পাই সম্ভবত প্রথম আলোতে। শুভ নামে লেখালেখির শুরু। প্রথমদিকে তো বিষয় খুঁজে পেতাম না। কপি-পেস্টই ভরসা। পরে সতর্কতার সংগে নিজের কিছু লেখা দিতে শুরু করলাম। ধরা পড়লে সমস্যা, হয় স্বীকার করতে হত শুভ’র পেছনের মানুষটা আমি নইলে সোজা বাংলায় চোর। আমি ব্যতীত অন্য কেউ যে আমার বই পড়ে না এর প্রমাণ পেলাম, তেমন কেউ ধরতে পারলেন না। সাবলীল গতিতে লেখা দিতে থাকলাম। কেউ কেউ ধরে ফেললেও চেপে গিয়েছিলেন বলে ধন্যবাদার্হ।

যাই হোক, সে এক সোনালি সময়। কী অপার আনেন্দেই না কেটেছে সময়টা। বাংলা টাইপ করতে পারতাম না। অক্ষরগুলো আমার কাছ থেকে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াত তবুও অপার আনন্দে শব্দের পর শব্দ টাইপ করে গেছি, কখন ভোর হয়ে গেছে বলতেও পারিনি।
পরে ওখানকার অনেক পোস্ট নিয়ে শুভ’র ব্লগিং বের হল। ওখানে আর লেখালেখি হল না।

ওখানে লেখালেখি করার আর আগ্রহ ছিল না, সুর কেটে গিয়েছিল। কারণ অনেক। শুভ নামের পেছনের মানুষটা সামনে চলে এলো। অবশ্য ওই মানুষটা এসে গেল বলে তেমন কোন তারতম্যের কিছু নেই- দুইই অখ্যাত, উনিশ আর বিশ! তবুও পুরনো বন্ধুদের কারণে যাওয়া।
কালেভদ্রে এখনও।

ওখানে শিখেছি অনেক। আমার লেখালেখি যে ছাতাফাতা এটা অনেকের লেখা দেখে অবলীলায় বুঝতে পারতাম, এদের লেখার হাতকে এখনও ঈর্ষা করি।
পেয়েছিও অনেক। মমতায় বাড়ানো সব হাত। কোন শালা তাকায় মমতায় বাড়ানো নোখের দিকে! ওখানকার অনেকের সংগে এখনও যোগাযোগ আছে, অনেকের সংগে নাই।

তো, ওখানের অনেক কিছুর সংগে মানিয়ে নিতে আমায় বেগ পেতে হচ্ছিল। জায়গাটা ছিল বাংলাদেশের প্রতিবিম্ব-আয়না! কী নেই? ঈর্ষা, অহংকার, লম্বা লম্বা বাতচিত, অহেতুক ঠ্যাং ধরে টানাটানি। অন্যকে অসম্মান করার তীব্র ব্যাকুলতা। জায়গাটা যেহেতু লাইভ সেহেতু এখানে যারা লেখেন তারা থাকেন পুরোপুরি অরক্ষিত। কিন্তু আমরা ভুলে যাই ফ্রি স্টাইল কুস্তিতেও কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়। একজন বেশ্যাকেও যে তার প্রাপ্য সম্মান দিতে হয় এটা আমরা আর কবে শিখব!

যেটা বলছিলাম, এই ইন্টারায়্যাকশন- আমার উপর চাপ পড়ত। অনেকের কাছে বিষয়টা হাস্যকর মনে হলেও এই চাপ কখনও কখনও আমি নিতে পারতাম না। কী আর করা, একজন দুর্বল মানুষের দুর্বল ভাবনা!

ওখানে থাকতে থাকতেই শুনছিলাম আরেকটা সাইট দাঁড়াচ্ছে। এখানকারই কিছু মেধাবী মানুষ নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। খোদার কসম, ওখানে যাওয়ার কোন গোপন ইচ্ছা আমার ছিল না। নিরিবিলিতে দু-কলম লেখার চেষ্টা করতেই আমার আনন্দ। কিন্তু এখানকার বেশ কিছু পরিচিত মুখ এবং আবেগীয় কিছু কারণে গেলাম। অবশ্যই এটা ভুল সিদ্ধান্ত ছিল।

অরি আল্লা, ওখানে গিয়ে দেখি ব্রাক্ষণ, শূদ্রের খেলা। ওখানে কেবল ব্রাক্ষণরাই থাকবেন অন্যরা খেলা থেকে বাদ। ব্রাক্ষণদের মাঝে আমি ভারী বিব্রত হচ্ছিলাম। কারণ, উচুমার্গের বা উচু কোন বিষয়ের সংগে আজও খাপ খাওয়াতে পারিনি। এমনিতে আমার উচু-ভীতি আছে, উচু কমোডেও।

মূল প্রসংগ থেকে সরে এসেছি, শূদ্রের দলে এমন অনেককে ফেলা হলো যারা আমার প্রিয় মানুষ। অসহায় আমি, কেমন করে এদের চোখে চোখ রাখি!
তখন আমি এখান থেকে পালাতে উদগ্রীব।
ভাজা মরিচ পড়ল গিয়ে ল্যাটকা খিচুরিতে- অজান্তেই সুযোগ এসে গেল। ওখানে একজন আমাকে রাজাকার ভাবাপন্ন বলে ফতোয়া দিলে, আমি মন্তব্য করলাম, "শুভ রাজাকার ভাবাপন্ন এই কথাটা ঠিক না, সে আস্ত একটা রাজাকার। তার কর্মকান্ডের বর্ণনা পাবেন তার লেখা ‘আমি রাজাকার বলছি’ বইয়ে"।
হা হা হা। মন্তব্যটা করে খুব মজা পেয়েছিলাম। মানুষটা আমার মন্তব্যর রসিকতাটা ধরতে পারেননি!

কিছু সহৃদয় মানুষ আমার প্রতি অযাচিত মমতার কারণে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলেন। সত্যি বলি, আমি লজ্জায় লাল-নীল হয়ে যাচ্ছিলাম, ভারী বিব্রত হচ্ছিলাম। আমাকে নিয়ে এই হইচই ভাল লাগছিল না। পরে ওখানে আর ফিরে যেতে চাচ্ছিলাম না। কেননা অন্যদের উপর আমাকে নিয়ে অহেতুক চাপ পড়ত। হায়রে মায়া, হায় মমতা! ফিরে না গিয়ে উপায় ছিল না।

এরিমধ্যে আমি খুব বড় একটা বিপর্যয়ের মধ্যে পড়লাম। সব কেমন এলোমেলো হয়ে গেল। অস্বাভাবিক জীবন-যাপন করি। আর লেখা-টেখা!
তো, এখানকার প্রধান উদ্যেক্তা যিনি, তাকে একটা মেইল করলাম। প্রধান উদ্দেশ্য ছিল আবারও ভুল বোঝাবুঝির হাত থেকে রেহাই পাওয়া। কাতর হয়ে লিখেছিলাম, আমার সমস্যার কারণে এখন আর লেখা হয়ে উঠছে না, আপাতত ওই সাইটটাতেও লেখা হয়ে উঠবে না। বিষয়টা যেন বিবেচনা করা হয়, অন্য কোন অর্থ করা না হয়।
তিনি ফিরতি মেইল করলেন, কোন সমস্যা নাই।

হা ঈশ্বর, কেন কেন কেন? ঠিক ঠিক জবাব চাই! আমার বেলায়ই কেন এমন হয়? ড্রেন রাস্তার মাঝখানে চলে আসবে কেন? একান্তে একটু হাঁটতেও পারব না বুঝি, হুট করে ড্রেনে পড়ব কেন? নাকি আমাকে অমানুষ বলে তোমার ভ্রম হয়!

ওই সময়টাতে মেইল-টেইল চেক করার অবকাশ আর কই। বেশ সময় পর একদিন মেইল চেক করে দেখি জ্বলজ্বল করছে, আপনাকে এই সাইটে ব্লক করা হইয়াছে।
কেন? তার অবশ্য কোন ব্যাখ্যা নাই; কত ‘লম্বর’ আইন ভেংগেছি তারও কোন উল্লেখ নাই।

ওখানকার সতীর্থ কয়েকজনকে জানালে তারা জানালেন, এইটা কিছু না, টেকনিক্যাল সমস্যা- এইটা ওই সাইটের বাগ নাকি ‘বাঘ’। ‘বাঘ’ হলে ভালু(!)- কুনু সমস্যা নাই।

কিন্তু লগ-ইন করতে গিয়ে ব্যাটা সব ফাঁস করে দিল। সত্যি সত্যি ব্লক।
ওই প্রধান উদ্যেক্তাকে বিষয়টা জানার জন্য মেইল করলাম। দিন যায, মাস, বছর- আজও সেই মেইলের উত্তর আসিনিএটা আমার মানতে মন সায় দেয় না। একজন মানুষের কাছ থেকে মানুষের মত আচরণ আশা করাটা দোষের হবে কেন? এই ভব্যতা শেখাবার অভব্য দায়িত্ব আমায় নিতে হবে কেন!
তবে এ-ও হতে পারে যিনি মেইল পেয়েছেন তিনি ঠিক করেছেন হাতে-হাতে আমাকে এর উত্তর দেবেন। হেঁটে রওয়ানা দিয়েছেন, সময় লাগতেই পারে, কী আর করা; অপেক্ষা করা ব্যতীত!

ব্লক করায় এখানে লিখতে না পেরে হাপুষ নয়নে কান্না করার কোন আবশ্যকতা আমার ছিল না, বরং ভারমুক্ত লাগছিল। কিন্তু...। একটা কিন্তু রয়েই যায়, দু:সময়ে নাকি ছোট ছোট আঘাত সহ্যাতিত মনে হয়- তুচ্ছসব বেদনা তখন বুকে বড় বাজে।

Friday, January 18, 2008

একজন দু:স্বপ্নের ফেরিওয়ালা...

একজন মানুষ কেমন করে স্বপ্নের ফেরিওয়ালা থেকে দু:স্বপ্নের ফেরিওয়ালা হয়ে পড়ে? সাধে কী?
গত বছরের মাঝামাঝি মুখোমখি হলাম সীমাহীন বিপর্যয়ের! ঝপ করে চোখের সামনে নেমে এলো একগাদা বাজে ক্ষণ- চোখের মনি মাখামাখি হয়ে গেল নিকষ কালিতে!
বড় ধরনের আর্থিক বিপর্যয়। এমন সমস্যা অনেকটা গোপন অসুখের মত, চট করে কাউকে বলা যায় না। বললে কেউ না আবার ভেবে বসেন: এইরে, এই বুঝি কোন হেল্প চাইবে!
টানেলের শেষ মাথায় কোন আলো নাই, অল্প আলোও শুষে নেয় অন্ধকার। আমি বিমর্ষ মুখে ঘুরে বেড়াই। পৃথিবীর যাবতীয় কিছুই অর্থহীন মনে হয়। কেমন বদলে যেতে থাকলাম। আগে ফান করে নিজেকে পোকামানব বলতাম- সত্যি সত্যিই পোকামানব বনে গেলাম।
সামনে বই-মেলা, ডেড লাইন পেরিয়ে যাচ্ছে। আমি নিরাসক্ত ভংগিতে ভাবি, গোল্লায় যাক বই-মেলা। আমার ছাতাফাতা লেখার জন্য কে মুখিয়ে আছে, আবর্জনা সৃষ্টি না করলে আটকাচ্ছে কে!

মড়ার উপর খাড়ার ঘা, নাকি খাড়ার উপর মড়ার ঘা? বছরের শেষের দিকে বুলডজার চলে এসেছে আমার বাড়ি ভেংগে দিতে। ব্রিটিশ আমলে এটা নাকি রেলওয়ের জায়গা ছিল- এই দীর্ঘ বছর পর এরা এক্ষণ আবিষ্কার করেছে জায়গাটা তাদের! ব্রিটিশ আমলে নাকি কারা কারা ভুল করে গেছে। বেশ যাহোক, এই জের আমাকে বইতে হবে কেন? তর্কের খাতিরে মেনে নিলাম নাহয় কিন্তু ভাংতে হবে কেন?
বুলডজারের সামনে কলম বড় হাস্যকর একটা ঢাল, আমার মত কলমবাজের এই কলম ছাড়া আছেই বা কী! আমার অবস্থাটা দাড়াল পিংপং বলের মত- এখান থেকে ওখানে, ওখান থেকে এখানে। যেসব মানুষদের কাছ থেকে শত-হাত দূরে থেকেছি তাদের জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা দাড়িয়ে থাকি। দু-কলম লেখার চেষ্টা করি বলে প্রথম শ্রেণীর একজন কর্মকর্তা আমাকে শেখান সাহিত্য কি। আমি শিখি- সময় আমাকে শেখায়। ইনি নাকি সময়ের অভাবে সাহিত্য প্রসব করতে পারছেন না- নইলে এই দেশে হাংগামা করে ফেলতেন!
পিংপং বলের গতির সংগে যোগ হয় টাকা চালাচালি। আমাদের এই কর্মকর্তা কাম নব্য সাহিত্যিক অভব্যর মত অন্যায্য টাকা নেন, এতে তার কোন লাজ নাই, আমারো। আমি একজন পোকামানব নির্বিকারচিত্তে টাকা দেই...ভয়ে নিজের চোখের দিকে তাকাই না।

হাইকোর্টের শরণাপন্ন হয়ে রিটের আবেদন করলে হাইকোর্ট নিষেধাজ্ঞা দেন কিন্তু এখানেও কাহিনীর শেষ নাই। আজ আর এটা নিয়ে বলতে ইচ্ছা করছে না- হয়তো অন্য কোন সময়।
তো, আমি ভোরে শীতে কাপতে কাপতে ঢাকা যাই- অপেক্ষায় থাকি ন্যায়ের জন্য। নিজের সংগে অভিমান কি না জানি না অভুক্ত থাকতেই ভাল লাগে। পা ছড়িয়ে বসে থাকি অভুক্ত, শ্রান্ত, বিষণ্ন, বিমর্ষ। পা ছড়িয়ে কাদতে পারলে বেশ হতো- পুরুষ মানুষদের নাকি কাদতে নাই, নিয়ম নাই। কাদলেও চট করে মুখ ঘুরিয়ে নিতে পারাই বড় কথা।
প্রকাশক ফোন করে বলেন, ভাল খবর, আপনার বইয়ের কাজ শেষ। আমি উদাস হয়ে বলি, বেশ! একদিন বললেন বইয়ের ব্যাক-কভারের জন্য কিছু লিখে মেইল করে দেন। আমি কেমন করে বলি মেইল দূরের কথা একটি বাক্য, শব্দও আমার মাথায় নাই।
একদা অবলীলায় বলতাম, আমি এ দেশ ছেড়ে কোথাও যেতে চাই না, পৃথিবীর সবচে সুন্দর দেশেও না। কিন্তু আজ পারলে এই দেশ, সম্ভব হলে এ গ্রহ ছেড়ে যেতে একপায়ে খাড়া- আজ নিজের প্রাণটা বড় তুচ্ছ মনে হয়...

Wednesday, January 16, 2008

খোদেজা: প্রাক-কথন...

আমি বিস্মিত হতেও ভুলে যাচ্ছি, অবশেষে লেখাটা শেষ করতে পারলাম! আমি নিশ্চিত ছিলাম লেখাটা আর শেষ হচ্ছে না। বইমেলায় এবার আর আমার বই বের হচ্ছে না। এই বিপুল আয়োজনে আমি নাই- পাঠককে স্পর্শ করতে পারব না, এই নিদারুণ কষ্টটা কাকে বলি! অথচ এই বছরের মাঝামাঝি খোদেজাকে নিয়ে খবরটা যখন পত্রিকায় পড়ি, তখনই ঠিক করে রেখেছিলাম, খোদেজাকে নিয়ে লিখব, লিখবই। অন্তত আপ্রাণ চেষ্টা করব। বইয়ের নামটাও ঠিক করা ছিল, খোদেজা।
এমনিতে আমি কখনও কোন লেখার ছাঁদ মাথায় রাখি না। ৩ টাকা দামের কলমবাজ, আমার এই ক্ষমতাটাই নাই আসলে। বিশ্বাস করি কলমের উপর (এখন কলম বললে ভুল বলা, হালের কীবোর্ড)। কলম যেমন টেনে নিয়ে যায়, আমি অসহায় দর্শক কেবল। এটা আমার কাছেও অবিশ্বাস্য মনে হয় কিন্তু বিষয়টা সত্য। কোথায় থেকে কি হয়ে যায় অমি জানি না! এটা সম্ভবত লেখালেখির মস্ত দুর্বলতা। তাই হয়তো আমার লেখা আর লেখা থাকে না। এ নিয়ে লম্বা লম্বা শ্বাস ফেলা ব্যতীত আজ আর কিছুই বলার নাই আমার।
কিন্তু ভবিতব্য কে জানে! পূর্বে যেটা হয়নি এবার সবগুলো একবারে ঘটতে শুরু করল। এক লাইনও লেখা হচ্ছিল না। লিখতে না পারা কষ্টটা কেমন? উম-ম, এমন কি, যেমন কিছু অসহ্য বেদনা সহ্য হয় না? প্রকৃত লেখকরা নাকি জাগতিক যাবতীয় বেদনাকে বদলদাবা করে লেখার পর লেখা লিখে যান। লেখক নই বলেই এখনও এই দুর্লভ গুণ করায়ত্ত করতে পারিনি।
অবশ্য আমি নিজেকে লেখক বলার দুঃসাহসই করি না। নিজেকে বলি লেখার, একজন রাজমিস্ত্রি যেমন একের পর এক ইট সাজিয়ে একটা কাঠামো গড়ে তোলেন, আমিও তেমনি একের পর এক শব্দের ইট সাজিয়ে একটা কাঠামো গড়ে তোলার অপচেষ্টা করি। সহৃদয় পাঠক যখন ছুঁয়ে দেন নড়বড়ে কাঠামোটাকে, আলোর ছটায় ঝলমল হয়ে উঠে- শিশুর কলরবে মুখরিত একটা পড়ো বাড়ি!
তো, শত চেষ্টা করেও খোদেজাকে নিয়ে লেখা আর হয়ে উঠে, ভাবনায় পরতের পর পরত একরাশ ধুলো জমে কেবল! আমার ব্যক্তিগত অসহনীয় জটিলতার কারণে সব কেমন এলোমেলো হয়ে চোখের সামনে ঝপ করে নেমে এলো একগাদা দুঃস্বপ্ন। একজন নিঃসঙ্গ শেরপা, ৬৫০ কোটি মানুষের মাঝে থেকেও একা। হা ঈশ্বর, কোথায় যাই, কার কাছে লুকাই?
প্রায়শ মনে হত এমন, এই বিশাল গ্রহের কোথাও কি এক চিলতে জায়গা নেই যেখানে আমি আত্মগোপন করতে পারি? কখনও তো নিজেকে মানুষ বলেই মনে হত না; যেন ভাঙ্গাচোরা-বাতিল একটা অবয়ব!
ওয়েব সাইটে লেখালেখি করার কারণে অনেকেরই সঙ্গেই যোগাযোগ হত। আমার যে দু-চারজন হৃদয়বান পাঠক আছেন এরা রাগারাগি করতেন, লিখতে তাড়া দিতেন। এঁদের কেমন করে বলি, লিখতে পারছি না! কিছু বেদনা আছে যা অন্যের সঙ্গে শেয়ার করা যায় না। অবশ্য কেউ কেউ কঠিন ভঙ্গিতেও বলতেন, তোমার আদিখ্যেতা দেখে বাঁচি না, তুমি ছাইপাশ না লিখলেই কী! আসলেই তো, কার কি দায় পড়েছে লেখার পেছনের মানুষটাকে নিয়ে ভাবার। এর ব্যত্যয় হবে কেন! আমি নির্বোধের মত বুঝতে না চাইলে কার কী আসে যায়!
লেখা গেল চুলায়। কই আমি আর কই লেখালেখি, মোরা দু-ভুবনের বাসিন্দা! লেখার ইচ্ছাটাই উবে গেল। হাল ছেড়ে দেয়া ভঙ্গি- কি হবে লিখে, কি হয় লিখে! ইত্যাদি ইত্যাদি।

বেলা বয়ে যায়। ১৫ নভেম্বরের মধ্যে পান্ডুলিপি জমা দেয়ার কথা অথচ কিছুই লেখা হয়নি।
এর সঙ্গে যোগ হল, খোদেজার যন্ত্রণা। কেমন একটা ঘোরের মধ্যে থাকি। মনে হয় এমন, খোদেজা আমাকে তাড়া করে লেখার জন্য: এই মানু, আমাকে নিয়া লেখবা না। এই যাহ, বললেই হল আর কী! একে নিয়ে লেখার ক্ষমতা আমার কই! হায়, আমার দু-হাত ভরা খোদেজার দেয়া শিউলি, আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে টুপটুপ করে ঝরে যায় যে! খোদেজা মনে করিয়ে দেয় বলেই নিজেকে খানিকটা মানুষ-মানুষ বলে ভ্রম হয়, ফিরে দাঁড়াতে বড় সাধ জাগে!
আফসোস, খোদেজা ভুল মানুষকে বেছে নেয়। আমার মত আধা-নাগরিক একজন মানুষের কাছে খোদেজার জগতটা সম্পূর্ণ অপরিচিত, ভাসা ভাসা জেনে কেবল লেখার অপচেষ্টা করা।
বইয়ের নাম খোদেজা দেখে আমার এক প্রিয়মানুষ বিরক্তি প্রকাশ করলেন, জোর অনুরোধ নামটা বদলে দেয়ার জন্য। নামটা নাকি সস্তা উপন্যাসের মত হয়ে গেছে। হায়, খোদেজা নামটা, খোদেজাদের নিয়ে লিখলে বুঝি সস্তা উপন্যাস হয়ে যায়! আসলে আমাদের কাছে খোদেজারা বড় সস্তা!
যে কথাটা তখন বলতে পারিনি, আমি যেমন খোদেজার নিয়তি বদলে দিতে পারি না তেমনি খোদেজা নামটাও বদলাবার ক্ষমতা আমার নাই। এবং খোদেজাকেও নিয়ে লেখার ক্ষমতাটাও। তবুও নিজের চোখে তাকাতে চেষ্টাটা করা, সবিরাম... ।

Friday, January 11, 2008

খোদেজা।

খোদেজা।
সাত বছরের এই শিশুটির প্রতি করা হয়েছিল ওর জ্ঞানমতে অজানা চরম অন্যায়। অভাগীর জান্তব চিত্কার থামাবার জন্য মুখে গুজে দেয়া হয়েছিল মুঠো মুঠো বালু।
নর নামের ওই নরপশুরা খোদেজার জানাজায়ও অংশগ্রহন করেছিল!
প্রচলিত আইনে ওই নরপশুদের ফাসির আদেশ হয়েছিল- একদা ফাসিও কার্যকর হবে। কিন্তু তাদের ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা পশুটা এ গ্রহের সমস্ত আইনের ঊধ্বে।
পশুটার যাওয়ার জায়গার অভাব কী! তার কোন তাড়া নেই- অনাদিকাল ধরে অপেক্ষা করতে ক্লান্তি নেই। সময়ে শিকার বেছে নিতে বেগ পেতে হবে না...।

Friday, November 23, 2007

মিশন পসিবল বলে কোন শব্দ নেই...

`মিশন পসিবল'- বন্যা নিয়ে একটা লিখেছিলাম। আসলে মিশন পসিবলের স্বপ্ন দেখে আমার মত এমন একজন নপুংসক- যার স্বপ্ন দেখা ব্যতীত আর কিছুই করার নাই!

আজকাল নিজের জাগতিক যন্ত্রণার সংগে যোগ হয় অনাকাংখিত যন্ত্রণা। মস্তিষ্কে সব কেমন জট পাকিয়ে যায়- কে জানে, জট পাকাতে পাকাতেই কী মানুষ উম্মাদ হয়ে যায়! আফসোস, মস্তিষ্কের কিছু স্মৃতি টান মেরে ফেলে দেয়া যেত যদি! হয় না এমন, না!

এই সরকারের কাজ অনেকখানি গোছানো কিন্তু মিশন পসিবলের স্বপ্ন কই! সিডরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কই!

এবার নাগরিক, আধা-নাগরিক লোকজনের মাঝে কষ্টের ছাপটা বেশি। অনুমান করি, বিভিন্ন মিডিয়ার লোকজনের অবদান আছে এতে- নিরলস পরিশ্রম করে বিভিন্ন রিপোর্ট করেছেন এরা। গভীর কৃতজ্ঞতা আমাদের।

হায় সিডর, একটা ঝড়। দেশের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া একটা ঝড় লন্ডভন্ড করে দিল সব। এ দেশের অভাগা মানুষরা বন্যার পর যখন মাত্র উঠে দাড়াচ্ছিল, ঠিক তখনই। পত্রিকা পড়তে এখন ইচ্ছা করে না। আজকাল বাড়তি চাপ নিতে পারি না- বড় ভংকুর হয়ে গেছি।

কী পড়ব?
পরিবারের সবাই মরে গেছে, একজন বেচে আছে। কার কাছে এই প্রশ্ন করব সে কেন বেচে আছে?
যে মা মিছামিছি ডেগ বসিয়ে রেখেছেন নিবানো চুলায়- তার সন্তানকে প্রবোধ দেয়ার জন্য, রান্না হচ্ছে, খাবার মিলবে। এই মিথ্যাচারের জন্য এই মাকে কোন আইনে বিচার করা হবে, কোন আইনে?
যে শিশুটির জানাজা পড়ছে অল্প কজন লেংটিপড়া মানুষ। লেংটি পড়ে জানাজা পড়ার ধর্মীয় নিয়ম আছে কী? এই নিয়মের ব্যত্যয় করায়, এই মানুষদের ধর্মীয় অনুশাসন ভংগ করার জন্য সহীহ হাদিস-জয়ীফ হাদিসের কেতাবটা খোলা হবে না বুঝি?
৫টা বিস্কুট ত্রাণ নেয়ার জন্য উঠেছে শত কাতর হাত- এই নিবোর্ধ আচরণের জন্য কী এদের কোন শাস্তি হবে না?

প্রথম আলোকে দেখছি ত্রাণভর্তি জাহাজ নিয়ে বেরিয়ে পড়তে। কার মাথা থেকে এই আইডিয়া বেরিয়েছে জানি না কিন্তু আমি ওই আইডিয়াবাজ মানুষটাকে স্যালুট করি! এক্ষণ এটার বড় প্রয়োজন।

ত্রাণ আসছে, ত্রাণ আসবে- জীবন্মৃত মানুষদের এতে কী কাজ!
আমাদের কারাবন্দী রাজনীতিবিদরা ছটফট করছেন, কেন তাদের ত্রাণ বিতরণ করতে দেয়া হচ্ছে না। কারামুক্ত থাকতে দেখেছি এরা নিজেরাই নিজেদের সামলাতে পারেন না- সামলাতে চারপাশে লোক না হলে চলে না। এরা নাকি দেবেন ত্রাণ- বছরের সেরা রসিকতা বটে!

ফি বছর আমরা এমনসব দৃশ্য আমরা দেখেই যাব। কলমের কালি খরচ করার তো এখন রীতি নাই, হালের কী বোর্ড টেপাটেপি করে আমার মত সস্তা কলমবাজ ছাতাফাতা একটা লেখা লেখার চেষ্টা করা। তারপর যথারীতি ভুলে যাওয়া, আগামী একটা বিপযর্য়ের জন্য অপেক্ষা...।
*এই লেখাটার বক্তব্য বোঝার জন্য মিশন পসিবল লেখাটিতে চোখ বুলানো আবশ্যক।

Wednesday, November 21, 2007

সঞ্জীব চৌধুরী, একজন লেখক বানাবার মেশিন!

সঞ্জীব চৌধুরী।

সঞ্জীব চৌধুরীকে কেউ বলেন গায়ক, কেউ বলেন লেখক, কেউ বা বলেন পত্রিকার বিভাগীয় সম্পাদক—আমি বলি, লেখক বানাবার মেশিন!
এঁরা নিজেরা কতটা লেখালেখি করেন, লেখার মান কেমন এসব কুতর্কে আমি যাবো না। অল্প কথায় বলব, আমাদের দেশে এমন লেখক বানাবার মেশিনের বড়ো প্রয়োজন। আফসোস, এদেশে লেখক বানাবার মেশিনের বড্ডো আকাল!

আপনাদের অনেকের হয়তো মনে আছে, এ দেশে টানা ২২ দিন পরিবহন ধর্মঘট ছিল। সব ধরনের মুভমেন্ট বন্ধ! কল্পনা করুন, এক দুই দিন না, ২২ দিন! মধ্যে শুধু একদিন, ২৬ শে মার্চ ধর্মঘটের আওতার বাইরে ছিল। 
রপ্তানীযোগ্য চিংড়ি পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল, গার্মেন্টেসের মেশিনে এক ইঞ্চি সুতা খরচ হয়নি, একের-পর-এক রপ্তানীর অর্ডার বাতিল হলো। গোটা দেশ অচল! দেশের বুদ্ধিজীবী, লেখক কেউ টুঁ-শব্দও করছেন না, গণতন্ত্রের জন্য এর নাকি প্রয়োজন আছে। হায় গণতন্ত্র, হায়!

এ দেশের সেরা সন্তানরা হাঁ করে আকাশেরপানে তাকিয়ে ছিলেন, যেন বৃষ্টির মতো সমাধান ঝরে পড়বে! আর আমার মতো নপুংসকের তো করার কিছু ছিল না। তিন টাকা দামের কলমবাজ, এই-ই তো লোটাকম্বল!

`পরিবহন ধর্মঘট' নামে একটা লেখা লিখে 'ভোরের কাগজ'-এ পাঠিয়েছিলাম। তখন প্রথম আলোর জন্ম হয়নি। সম্পাদক মতিউর রহমান। ভোরের কাগজে কী-এক বিচিত্র কারণে এই লেখাটা ছাপা হয়েছিল তা জানি না। অনুমান করি, এর পেছনে নিশ্চিত সঞ্জীব চৌধুরীর হাত ছিল, নইলে মুক্তচিন্তার দৈনিক আমার মতো অগাবগার লেখা ছাপাবে কেন!
তখনও আমি মানুষটাকে চিনি না।

ক-দিন বাদে কোন এক কাজে ওই পত্রিকা অফিসে গিয়েছিলাম, সম্ভবত কারও খোঁজে! কোত্থেকে এসেছি শুনে আড্ডা ছেড়ে ঝাকড়া চুলের, টিংটিং টাইপের হাসিমুখের যে মানুষটা এগিয়ে এলেন, তিনিই সঞ্জীব চৌধুরী। সঞ্জীব দা।

তিনি এগিয়ে এসে হাসিমুখে বললেন, 
'আচ্ছা, আপনিই কি ওই লেখাটা পাঠিয়েছিলেন? আরে, বসেন-বসেন। বেশ আড্ডা দেয়া যাবে'।
আমি মনে মনে বললাম, বাহ, বেশ তো, আমি দেখি বেশ আড্ডাবাজ টাইপের লোক! আমার মত একজন লোক যার সঙ্গে নিজের মানুষরাই অল্পক্ষণেই বিরক্ত হয়ে উঠে অথচ এই মানুষটা আমার সঙ্গে আড্ডা দেয়ার জন্য মুখিয়ে আছেন।
মানুষটা চা-সিগারেট আনালেন। আমি চুকচুক করে চা খাই, আয়েস করে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ি। অ্যাসট্রে নাই। সিগারেটের ছাই কোথায় ফেলব বললে তিনি হা-হা করে হেসে বললেন, 
গোটা ফ্লোরটাই অ্যাসট্রে। ফেলুন, যেখানে খুশি।
এরপর তিনি বললেন, 'এ ধরনের লেখা আরো লেখেন, আমি ছাপাবো'।
আমি বিনীতভাবে বলেছিলাম, 'আসলে আমি তো ঠিক এ ধরনের লেখা লিখি না, আমি অপন্যাস লেখার অপচেষ্টা করছি'।
তিনি টেবিলে আঙ্গুল ঠুকে বললেন, 'আপনি আপনার মতো করে যে প্রসঙ্গ নিয়ে ভালো লাগে তাই লেখেন, সমস্যা নাই'।
আমার এই স্বাধীনতাটা ভাল লাগল। পরে কখনই তিনি বিষয় নির্দিষ্ট করে দিতেন না এবং লেখা কাটাছেঁড়া করতেন না। কদাচিৎ কোন প্রসঙ্গ গুরুতর সমস্যা মনে হলে অমায়িক ভঙ্গিতে বলতেন: আচ্ছা এই জায়গাটায় কি এভাবে করা যায়? মানুষটার এইসব সহৃদয়তার কথা আমি ভুলব না।

পরেও যখন বিভিন্ন সময় গিয়েছি, কখনো শত ব্যস্ততায়ও আমি তাঁকে বিরক্ত হতে দেখিনি, সদা হাস্যময়। এই লেখা দেখছেন, এই গুনগুন করে গান গাইছেন, এই টেবিলে তবলা ঠুকছেন।
আমাকে যেটা আকৃষ্ট করত, তাঁর মধ্যে ভান জিনিসটার বড়ো অভাব; সহজিয়া একটা ভাব! অনেক সময় তুমুল আড্ডা ছেড়ে উঠে এসেছেন আমাকে সময় দেয়ার জন্য, অফিসের আঁতেল টাইপের অন্যদের কপালের ভাঁজ উপেক্ষা করে। আমি সলাজে বিব্রত হতাম।
আসলে ঢাকার নাগরিক মানুষদের আমার মত মফঃস্বলের মানুষদের প্রতি দারুণ অবজ্ঞা, সম্ভবত ভক করে আমার শরীর থেকে সরষে তেলের গন্ধ বের হত! এদের দোষ দেই না, এঁরা কী মননশীল মানুষ একেকজন, কপাকপ সাহিত্য চিবিয়ে খান! হাঁটেন পা ফাঁক করে। 

`একালের রুপকথা' নামে ওখানে প্রায় টানা দেড় বছর লিখলাম। উপভোগ্য একটা সময়—বিচিত্রসব বিষয় নিয়ে ফি হপ্তায় লেখা। কিন্তু একবার, সঞ্জীব চৌধুরী নামের মানুষটা লজ্জায় নুয়ে পড়েছিলেন।
হয়েছিল এমন, এই দেড় বছরে সব লেখাই ছাপা হলো কেবল একটা লেখা আটকে দেয়া হলো।
'শিশু কাঠগড়ায় দাড়াও' নামের একটি লেখা। লেখাটার মূল উপজীব্য ছিল, ১৪ দিন বয়সী এক শিশুকে নিয়ে! শিশুটির জানাজা পড়া নিয়ে সমস্যা হয়েছিল, তার বাবা নামাজ পড়েন না এই অজুহাতে।
ঘটনাটা আমার নিজের চোখে দেখা। এটা নিয়েই লেখাটা লিখেছিলাম। সব লেখা ছাপা হলো কেবল হলো না এটা!

সঞ্জীব চৌধুরী নামের মানুষটা অসম্ভব বিব্রত হয়ে বলেছিলেন, 'আপনার লেখাটা ধর্মীয় অনুভূতিকে আঘাত করে বলে লেখাটা ছাপানো যাচ্ছে না। সম্পাদকের আপত্তি আছে'।
আমি রাগ গোপন করে বলেছিলাম, 'এটা কি আপনিও বিশ্বাস করেন'?
তিনি কাতর হয়ে বললেন,
'না-না। আমি আপ্রাণ চেষ্টা করেছি মতি ভাইকে বোঝাতে, লাভ হয়নি। কিন্তু তাতে কী আসে যায়! আপনি সম্পাদকের সংগে দেখা করে একটু কথা বলেন'।
মতি ভাই নামের সম্পাদক মানুষটার সংগে দেখা করা বা কথা বলার আমার কোনো ইচ্ছাই ছিল না। আমি এ দেশের এমন কোন 'কলমচী-কলমবাজ' না যে পাঠকরা হাঁ করে বসে থাকেন আমার লেখা পড়ার জন্য। যেন এই সর্বনাশ থেকে বাঁচার জন্য সম্পাদকের সংগে দহরম-মহরম থাকাটা আবশ্যক!
আমি সঞ্জীবদাকে কঠিন কিছু কথা বলার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলাম, তাহলে 'ইনকিলাব পত্রিকা' কী দোষ করল! কিন্তু সঞ্জীবদার বিমর্ষ মুখ দেখে কথাগুলো বলা হলো না। আমি মানুষটাকে বইয়ের খোলা পাতার মতো পড়তে পারছিলাম। চাকরির শেকলে বাঁধা একজন প্রবলপুরুষ!

এরিমধ্যে এই পত্রিকার ইন-হাউজে কি কি যেন ভজকট হল,  কেউ-কেউ কি-কি যেন কলকাঠিতে ঘুটা দিচ্ছিলেন। সঞ্জীব চৌধুরী আর ওই পাতার দায়িত্বে নাই। পরে এই পত্রিকা তাঁকে ছাড়তে হয়েছিল।
সত্যটা হচ্ছে কিছু চালবাজ মানুষ চাল করে এই পত্রিকা থেকে তাঁকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। সেইসব চালবাজ মানুষরাই আজ বেশ্যার মত নগ্ন ভঙ্গিতে, নিজেদের বইয়ের বিজ্ঞাপন নিজেরাই দেন, প্রথম মুদ্রণ শ্যাষ দ্বিতীয় মুদ্রণ চলিতেছে এইসব নিজেই লিখে দেন। 

আমারও আর ওখানে লিখতে ইচ্ছা করল না, চালবাজদের সংগে তাল মেলাতে পারছিলাম না। এক চোট্টা-চালবাজ তো এই পত্রিকাতেই আমার একটা লেখার থিম অন্য নামে আমার অনুমতি ছাড়াই ছাপিয়ে দিলেন। আজ ওই চালবাজের নাম বললে অনেকে রে-রে করে তেড়ে আসবেন। ওই অন্ধকার দিক নিয়ে এখন আর বলতে ইচ্ছা করছে না।

তবে বারবার যেটা বলতে ইচ্ছা করছে, সঞ্জীব চৌধুরী, এদেশে আপনার মত লেখক বানাবার মেশিনের বড্ডো আকাল! কাজটা আপনি ঠিক করলেন না! দুম করে মরে গিয়ে এভাবে চলে যাওয়া কোন কাজের কাজ হলো না!



সহায়ক সূত্র:
১. পরিবহন ধর্মঘট: http://www.ali-mahmed.com/2010/09/blog-post_02.html 
WhatsApp