Search

Friday, June 29, 2007

অপারেশন জ্যাকপট

…আমার ক্যাম্পে আগত অফিসার বললেন, আমি কয়েকজন নিপুন সাতারু বাছাই করতে চাই, তাদেরকে তরুণ এবং ভাল স্বাস্থ্যের অধিকারী হতে হবে। (পাক সৈন্যদের) নৌ পথে সৈন্য অন্যান্য সমর সরঞ্জাম পরিবহনের ব্যবস্থা বানচাল করা এবং নৌযানগুলে কে ধ্বংস করা।

অভিযানের সাংকেতিক নাম দেয়া হয় অপারেশন জ্যাকপট!

…২৮ জুলাই আমি ডেল্টা সেক্টরের কমান্ডিং অফিসার ভারতীয় সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার সাবেগ সিং এর সঙ্গে বসে চুড়ান্ত পরিকল্পনা তৈরী করছিলাম।

…চট্টগ্রাম বন্দর ও কর্নফুলি নদীর ম্যাপ ও চার্ট পর্যালোচনা করি। চন্দ্রতিথি, আবহাওয়ার অবস্থা, জোয়ার ভাটার সময় বাতাসের গতি প্রকৃতি, স্রোতের গতি এবং আরো অসংখ্য তথ্য আমাদের আলোচনায় প্রাধান্য লাভ করে।

…অপারেশনে আমাদের নৌ মুক্তিযোদ্ধারা কোথায় কোন ধরনের সমস্যার মোকাবেলা করবে অখবা পাক আর্মীদের অবস্থান ইত্যাদি। ১০ আগস্ট অপারেশন জ্যাকপট শুরু হয়। চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য ৬০ জন তরুণকে তিন ভাগে ভাগ করি। তিনটি গ্রুপেই সার্বিক কমান্ডে থাকবেন একজন কমান্ডার। তাদের সকলের কাছে থাকবে লিমপেট মাইন, এক জোড়া ফিন (সাতারের সময় পায়ে লাগানো হয়) এবং শুকনো খাবার। প্রতি তিনজনের কাছে থাকবে একটা করে স্টেনগান। গ্রুপ কমান্ডারকে দেয়া হলো হালকা অথচ শক্তিশালী ট্রানজিস্টার।

…তার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে, অল ইন্ডিয়া রেডিও কলকাতা কেন্দ্র থেকে প্রতিটি সঙ্গীত অনুষ্ঠান শুনতে হবে খুব মন দিয়ে। ওই সঙ্গীত অনুষ্ঠানের মাধ্যমেই জানানো হবে কখন অপারেশন শুরু করতে হবে!

…১৩ আগস্ট কলকাতা রেডিও থেকে প্রচারিত হলো বাংলা গান আমার পুতুর আজকে প্রথম যাবে শ্বশুরবাড়ী। এই গানটির মাধ্যমেই কমান্ডার প্রথম সংকেত লাভ করেন। তিনি জানেন ২৪ ঘন্টার মধ্যে দ্বিতীয় গান প্রচারিত হবে, ওই গান শোনার সঙ্গে সঙ্গে ট্রানজিস্টার ফেলে দিতে হবে, শুরু হয়ে যাবে অপারেশন জ্যাকপট!

…১৪ আগস্ট প্রচারিত হলো, দ্বিতীয় গান, আমি তোমায় যতো শুনিয়েছিলাম গান, তার বদলে চাইনি কোন দান। শুরু হয়ে গেল অপারেশন জ্যাকপট! গেঁয়ো পোশাক পরা একদল লোক ফলমুল মাছ, শব্জীর ঝুড়ি নিয়ে ফেরী নৌকায় উঠলো। পাক আর্মিও সন্দেহও করতে পারেনি, ওইসব ঝুড়ির নীচে আছে লিমপেট মাইন, ফিন, স্টেনগান!
…কিন্তু দূর্ভাগ্য, এই দলের অভিযান একদিন পিছিয়ে গেল- ৩ নং গ্রুপ ছাড়া সকলেই রাতের মধ্যেই চরলায় পৌঁছে গিয়েছিল। জেটিতে নোংগর করা পাক আর্মিদের এমভি আব্বাসে আছে ১০৪১০ টন সামরিক সরঞ্জাম। এমভি হরমুজ এ আছে ৯৯১০ টন সামরিক সরজ্ঞাম।
…মাথাটা পানির উপর রেখে আমাদের ছেলেরা পৌঁছে গেছে। তারা পাক আর্মির জাহাজগুলোতে লিমপেট মাইন লাগিয়ে দিয়েই নিঃশব্দে নদীর ভাটিতে ভেসে যায়।

…রাত ১টা ৪০ মিনিট। কান ফাটানো আওযাজে বন্দর নগরী কেঁপে ওঠে।

…১টা ৪৫। আরেকটি বিস্ফোরণ। তারপর তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম। একটির পর একটি বিস্ফোরনে চট্টগ্রাম তখন থরথর করে কাঁপছে।

…পাক আর্মির আল আব্বাস, হরমুজ দ্রুত ডুবতে থাকে! আশেপাশের জাহাজগুলো প্রচন্ড রকম তিগ্রস্থ হয়। একদিকে যেমন শত্রুর বিপুল সম্পত্তির, সমরাস্ত্রের ক্ষতি হয় তেমনি পাক আর্মিদের মিথ্যা দম্ভ এবং অহংকার, অহমিকা হয় চুর্ণ!

(একাত্তরের মার্চে রফিক-উল-ইসলাম সাবেক ইপিআর সেক্টর হেডকোয়ার্র্টার, চট্টগ্রামে ক্যাপ্টেন পদে সেক্টর এ্যাডজুটেন্টের দায়িত্ব পালন করেন।)
সূত্র: বাংলাদেশ স্বাধীনতা যুদ্ধ (১০ম খন্ড)। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে-মেজর (অবঃ)রফিক-উল ইসলাম, বীর উত্তম।
*আফসোস, এইসব দুর্ধর্ষ নৌকমান্ডোদের প্রতি সুবিচার, যথার্থ সম্মান দেয়া হয়নি।

অটোগ্রাফ কড়চা

বইমেলায় অটোগ্রাফ দেয়ার ভয়ে স্টলে বসি না, এটা শুনে লেখালেখি ভুবনের মানুষদের কী হাসাহাসি! থু-থু, নিজের লেখা নিজেই পড়ে, হুহ, আবার কী একটা বা... হইছে!
অটোগ্রাফ জিনিসটার প্রতি আমার এলার্জি আছে, অন্য কারণে।
তবুও আমার যে দু-চারজন পাঠক আছেন, তাঁরা যখন দুম করে অটোগ্রাফ চেয়ে বসেন, তখন আমার মাথায় সব কেমন জট পাকিয়ে যায়! কি লিখব ভেবে পাই না।
 

দূর-দূর, দু-কলম লেখার চেষ্টা করলেই বুঝি লেখক হওয়া যায়! আগেও লিখেছিলাম: আমি নিজেকে বলি লেখার রাজমিস্ত্রি। একজন রাজমিস্ত্রি যেমন একের পর এক ইট সাজিয়ে একটা কাঠামো গড়ে তোলেন; তেমনি আমিও একের পর এক শব্দের ইট বসিয়ে একটা কাঠামো দাঁড় করাবার চেষ্টা করি। ওই নিষ্প্রাণ কাঠামো নামের বাড়িটার সবগুলো আলো জ্বলে উঠে যখন কোন পাঠক লেখাটা পড়েন, প্রকারান্তরে ছুঁয়ে দেন। 
তো, বললেই বুঝি অটোগ্রাফে কিছু লিখে দেয়া যায়! নিরুপায় আমি, পালাতে না-পারলে লজ্জায় লাল-নীল হয়ে হাবিজাবি কিছু একটা লিখে দেই।
একবার একজনকে কিছুই লিখে দিলাম না। উপরে কেবল একটা গোঁফ নীচে একটা চশমা। এই মানুষটার ছিল পেল্লাই গোঁফ আর আমার চশমা। তবে এও সত্য, যিনি একবার আমার অটোগ্রাফ নিয়েছেন তিনি দ্বিতীয়বার ভুলেও অটোগ্রাফের নাম নেননি। তিনিও হাঁপ ছেড়ে বাঁচেন, আমিও।
কী আর করা, কপালের ফের!

আসলে সত্যি সত্যি লেখক যারা, তাঁরা ওড়নার মত গলায় একটা চাদর ঝুলিয়ে অটোগ্রাফে করকমলেষু, শ্রদ্ধাস্পদেষু টাইপের কঠিন কঠিন কিছু বাতচিত লেখেন। গালে হাত দিয়ে ফটো খিঁচান, ভাবুক যে। এঁরা আকাশ পানে তাকিয়ে হাঁটাহাঁটি করেন- আকাশলোকের বাসিন্দা যে!

যাই হোক, এবারের বইমেলায় সহ-ব্লগার একজন, আমাকে পাকড়াও করলেন অটোগ্রাফ দেয়ার জন্য। আমি বললাম, অটোগ্রাফ যে দেব, ২ টাকা দেন, ক্যাশ। তিনি ভাবলেন, আমি রসিকতা করছি, সম্ভবত ২ টাকা নেব না। আমি নির্বিকার ভঙ্গিতে ২ টাকা পকেটস্থ করলাম। আমি নিশ্চিত, বেচারা ভাবছিলেন, আরে, এমন লালচি মানুষ তো আর দেখি নাই!


হা হা হা, হলামই না-হয় লালচওয়ালা! আমাদের জীবনে গল্প করার মতো গল্পের বড় অভাব, তাঁর জন্য থাকুক না
একটা গল্প কে জানে, এই মানুষটা একদা তার নাতি-পুতির কাছে তিতিবিরক্ত ভাব নিয়ে গল্প করবেন: জানিস রে বেটা, 'মিথ্যা মিথ্যি' এক লেখক এক লাইন লেইখা ২ টাকা নিয়া নিল, চিন্তা কর! কী ডাকাতি!

আমি শুভ নামে প্রায় ১ বছর একটা ওয়েবসাইটে বেশ কিছু লেখা লিখেছিলাম, যার চালু নাম ব্লগিং। ওইসব ছাতাফাতা নিয়ে 'শুভ-র ব্লগিং' নামের একটা বই বের হয়েছিল। প্রথমে প্রকাশকের ঘোর আপত্তি ছিল। তিনি চাচ্ছিলেন, প্রেমের উপন্যাস। বই বের হওয়ার পর দেখি মানুষটা হড়বড় করে ফোনে একগাদা কথা বলেই যাচ্ছেন, আরে শোনেন, একটা না বিরাট ঘটনা হয়ে গেল।
আমি ভয়ে ভয়ে জানতে চাই, কি ঘটনা?
তিনি বিমলানন্দে বলে চলেন, এই দেশে বাংলা ব্লগিং-এর উপর এটাই হচ্ছে প্রথম বই।
আমি বললাম, আচ্ছা। 

আমার উচ্ছ্বসিত হওয়ার কোন কারণ ছিল না। কারণ বইমেলা শেষ হলে এই মানুষটাই মুখ কালো করে বলবেন, মেলায় যে একটা মাত্রই বই বিক্রি হলো এটা কি আপনি নিজেই কাউকে দিয়ে খরিদ করিয়া ছিলেন।

ওই ওয়েবসাইটের বিখ্যাত প্রাপ্তির পু, সারিয়া তাসনিম, সহ-ব্লগারের একটা মন্তব্য ছিল এমন: "শুভ, একটা কথা দিতে হবে। আজ এখুনি। আপনি ঢাকায় আসবেন, আমরা মেলায় যাবো এবং 'শুভর ব্লগিং' নামের একটা বই আমি আপনাকে উপহার দিবো। এর আগে খবরদার বইয়ে হাত দিবেন না"।
কী সর্বনাশ! এ দেখি মার্শাল ল আইন!

আমি আমার কথা রেখেছিলাম। তিনি
'শুভর ব্লগিং' বইটা কিনে দিলেন। আমি বললাম, এটায় একটা অটোগ্রাফ দেন। তিনি অটোগ্রাফ দিলেন কিন্তু মজা হচ্ছে, অটোগ্রাফটা ছিল বইয়ের উল্টা দিকে। তিনি চাচ্ছিলেন, ঠিক করে দিতে। আহা, তাহলে যে মজাটাই নষ্ট হয়ে যায়, কি দরকার থাকুক না এমনই।

প্রাপ্তির জন্য আমি আমার একটা প্রেমের উপন্যাস দিলাম, 'তিতলি তুমিও '। লিখে দিলাম: "প্রাপ্তি, প্রবল আশা, একদিন তুমি এই বইটা পড়বে"।
সারিয়া তাসনিম আমার লেখার উদ্দেশ্যটা সম্ভবত ধরতে পারেননি। আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম তাঁর ভাবনা, এই মানুষটা বেকুব নাকি, এইটা দিল কি মনে কইরা, এইটা কী বাচ্চার বই!

পুরনো যারা তাদের জানা আছে, প্রাপ্তি দুরারোগ্য রোগে ভুগছিল। অন্তত এই প্রেমের উপন্যাসটা পড়ার জন্য এবং তার ভালবাসা-বাসি মানুষের সঙ্গে হাত ধরে ঘুরে বেড়াবার জন্য, প্রকারান্তরে তার আয়ু প্রার্থনা করলাম; মন থেকে।
...
আমার মনে আছে, আমার বইয়ের প্রকাশকের কাছ থেকেও আমি একটা অটোগ্রাফ চেয়ে তাঁকে বিভ্রান্ত করে দিয়েছিলাম। বিষয়টা এমন। একজন পাঠক একটা বই ফেরত নিয়ে এলেন, ভেতরের ম্যাটার হচ্ছে আমার একটা উপন্যাস 'তিতলি তুমিও'-এর কিন্ত প্রচ্ছদ আমারই অন্য একটা উপন্যাস 'নিষিদ্ধ জ্যোৎস্না'র।

আমি গম্ভীর মুখ করে প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপনকে বললাম, এই বইটায় একটা অটোগ্রাফ দেন।
তিনি ভাল করেই জানেন, আমার মাথায় খানিকটা সমস্যা আছে। মনে মনে নিশ্চয়ই ভাবছিলেন, আজ তো আমবস্যা পূর্ণিমা না, ঘটনা কী, কোন কারণে পাগলটা আজ খেপেছে!
তিনি মুখ শুকিয়ে বললেন, বিষয় কী, কি হয়েছে?

আমি বইটা দেখালে তিনি বললেন, উপস, বড়ো ভুল হয়ে গেছে। বাইন্ডিং ব্যাটা...।
আমি গম্ভীর, বেটা-মেটা বুঝি না।
ছাড়াছাড়ি নাই, অটোগ্রাফ। বইটা আমি হাতছাড়া করছি না। রেখে দেব।
তিনি হাসি গোপন করে বললেন, আমি লিখতে চাই,
ম্যান ইজ মর্টাল!
আমি বললাম, যা খুশি লেখেন, মর্টাল লেখেন, মর্টার লেখেন।
তিনি আটকে রাখা শ্বাস ছেড়ে খসখস করে লিখে দিলেন, ম্যান ইজ মর্টাল!


ওই বইটা যেমন আজও আছে আমার কাছে, সারিয়া তাসনিমের বইটাও যত্মে থাকবে এবং ২ টাকার নোটটাও।

কফিনের শক্ত পেরেকটা


আমি আগেও বলেছিলাম, আবারও বলি, ভাংচুরের নামে এরা সবচেয়ে মোটা পেরেকটা ঠুকছে এদের কফিনে। এ নিয়ে আমার একটা পোস্ট আছে, গণতন্ত্র- বড্ডো গুরুপাক।

৪ দিন আগে আমার অফিসটা গুড়িয়ে দেয়া হয়েছে বুলডজার দিয়ে। যদিও এটা আমার নিজস্ব সম্পদ না, কিন্ত আমার বুক ভেঙ্গে আসছিল। পিতা যেমন তাঁর সন্তানের লাশ কবরে নামাবার সময় অস্ফুটে বলতে থাকেন, আহা, আস্তে নামাও না, ও বুঝি দুকখু পায় না। তেমনি আমারও গলা ফাটিয়ে বলতে ইচ্ছা করছিল, আহারে আহারে! হায়রে নির্বোধ মানুষ- জড় পদার্থের জন্য কী মায়া!

আমার নিজের না, ভাড়ার অফিস ছিল। কিন্ত পৈত্রিকসূত্রে আমরা প্রায় ৪৫ বছর ধরে ভাড়া ছিলাম। এখানে আমি আমার অফিসের পাশাপাশি লেখালেখি করেছি, কত লেখা লিখতে গিয়ে চোখের জলে ভেসেছি। কত স্মৃতি- এক লহমায় সব হারিয়ে গেল! অনেক প্রয়োজনীয় উপাত্ত হারিয়ে গেল। বিশেষ করে আমি খুব কষ্ট পাচ্ছি, মুক্তিযুদ্ধের অনেক অমূল্য উপাত্ত আমি হারিয়েছি। বুলডজারের সামনে আমার মতো ৩ টাকা দামের কলমবাজের দাঁড়াবার শক্তি কই! নপুংসক আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম।

বেচারা বাড়িওয়ালার তো দোষ আমি খুঁজে পাই না। তিনি প্রায় ৫০ বছর ধরে নিয়মিত খাজনা দিয়েছেন। এটা তাঁর কেনা জমি। ওদিন দুম করে বাংলাদেশ রেলওয়ে, ব্রিটিশ আমলের আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের একটা ম্যাপ নিয়ে এসে বলল, এটা তাদের জায়গা।

কাহিনীটা হচ্ছে, মহারাজা থেকে আসাম বেঙ্গল রেলরাস্তা করার জন্য জায়গা চেয়ে নিয়েছিল। রেলরাস্তা বানাবার পর এরা যখন দেখল, তাদের আর জমির প্রয়োজন নেই- মহারাজার কাছে উদ্বৃত্ত জমি ফেরত দিয়ে দেয়। মহারাজা তাঁর এই জমিগুলো বিভিন্ন লোকজনকে দান করেন, বিক্রি করেন।


বেশ, তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম, এই জায়গা রেলের। তাইলে ভূমি মন্ত্রানালয় ৫০ বছর ধরে নিয়ম করে খাজনা নিল কেন? এটা ভেঙ্গে ফেলার পেছনে যুক্তি কি? সরকার নিজের দখলে নিয়ে নিলেও তো পারত। বা বলত, ১ মাসের মধ্যে সিদ্ধান্ত হবে এটা নিয়ে কি করা হবে। এটা রেলের, না ভূমির- এটা এরা নিজারা ঠিক করে নিয়ে বললেই তো পারত, এখন থেকে এটা অমুক মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রনে। আপনি অমুক মন্ত্রণালয়কে রেভিনিউ দেবেন। এইসব সম্পদ ধ্বংস করে লাভটা কার হচ্ছে? কী পার্থক্য- আগে গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে সম্পদ বিনস্ট হতো, এখন কার নামে সম্পদগুলো বিনস্ট করা হচ্ছে।

লোকজন যে বলাবলি করে, ...ফকির বানায়া দিব। এটা কী সত্যি হবে?

এর পরিণাম কি সুদুরপ্রসারী এটা কি এঁরা বুঝতে পারছেন? এঁরা যে অসাধারণ কাজগুলো করছেন সব ঢাকা পড়ে যাচ্ছে জনগণকে কষ্ট দিয়ে। আজ যে সব অধিকাংশ সরকারী কর্মকর্তারা সাধু সাজছেন- জেলে, মজুর, পতিতা কার কাছ থেকে এরা ঘুস খাননি?

অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ শুনতে বড়োই ভালো লাগে। তিনি অবৈধ দখলদার হয়ে থাকলে কেন সরকার ৫০ বছর ধরে তাঁকে স্বীকার করল? তাইলে কি ধরে নেব ভূমি মন্ত্রণালয় এক সরকারের এবং রেল মন্ত্রণালয় অন্য সরকারের। আরেকটা বিষয়, যদি ব্রিটিশ আমলের ম্যাপ দিয়ে অবৈধ স্থাপনা নিশ্চিত করা হয়, বেশ তো, ভালই। তাইলে আমরা ব্রিটিশ আমলে ফিরে যাই! ওয়েল, ওই সময় লোকসংখ্যা কত ছিল? ব্রিটিশ আমলে বাংলাদেশের এই পরিধিতে লোকসংখ্যা কত হবে- বড় জোর ৫০ লাখ।

রেল তার জায়গা সমস্ত খালি করে ফেলল- এখন এই আনুমানিক বাড়তি সাড়ে ১৩ কোটি মানুষের কি হবে? উপায় একটা আছে। এই বাড়তি সাড়ে ১৩ কোটি মানুষকে বঙ্গোপসাগরে ফেলে দেয়া হোক। সব সমস্যার সমাধান।

হরতাল নাকি গণতন্ত্রের ঢাল!

 
হরতাল নিয়ে আমি আরও লিখব, ক্লান্ত না হওয়া পর্যন্ত- নাথিং গনা স্টপ মী! হরতালে আমার নিজেকে মানুষ বলে মনে হয় না। আমার কাছে মনে হয়- একটি পাখির কাছ থেকে গোটা আকাশটা ছিনিয়ে, ছোট্ট একটা খাঁচায় আটকে ফেলা! তার কানের কাছে অশুভ মন্ত্র অনবরত পড়তে থাকা। তুমি স্বাধীন, তুমি মুক্ত- উড়ে বেড়াও ডানা মেলে; ডানা তোমার ছিড়তে থাকুক একেক করে!

হরতাল প্রসঙ্গে এ দেশের সেরা সন্তান বা শক্তিশালী মানুষদের প্রতি আমার সীমাহীন রাগ আছে। এঁরা কী তুচ্ছ বিষয় নিয়েই না হইচই করেন অথচ হরতাল নিয়ে গা করেননি! কয়েকটা উদাহরণ দেই:
১. হুমায়ূন আহমেদ, এমন খুব কম বিষয় আছে, যেটা নিয়ে লেখেননি কিন্তু হরতাল নিয়ে তার কোন উপন্যাস নাই, বই নাই, নাটক নাই। অথচ মানুষটার কী বিপুল শক্তি! তাঁর লেখালেখির গভীরতা নিয়ে সংশয় আছে কি নাই, সেই বিতর্কে
আমি যাব না । কিন্ত তাঁর আছে লক্ষ-লক্ষ মানুষকে প্রভাবিত করার যাদু কিন্ত তিনি এ নিয়ে টুঁ-শব্দও করেননি!
অথচ হরতাল নিয়ে গোটা একটা বই লিখল কিনা আমার মত 'তেলিবেলি' একজন মানুষ! লাভ কী, তেলিবেলি কলমচির বই ক-জন পড়ে?

২. শফিক রেহমান। যুবকদের প্রভাবিত করার যাদুদন্ড ছিল একদা তার হাতে। তার দিনের পর দিন কলামে লিখলেন, ‘হরতাল তো আইন করে বন্ধ করা যাবে না’।

কী বালখিল্য কথা- যেন ওহী নাজিল হয়েছে, এটা পরিবর্তন করা যাবে না! হায় দল, হায় দলবাজি! কেমন করে একজন মানুষের গ্রে-মেটার 'হলুদ-মেটার' বানিয়ে দেয়! অথচ তিনি চিঠি লিখে বলেছিলেন, আমরা হরতালের বিপক্ষে ছিলাম, আছি।

৩. আমার খুব প্রিয় একজন মানুষ, ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল। যিনি নির্ভীক, স্পষ্টবাদী হিসাবে সুপরিচিত। তিনি একটা কলামে লিখলেন, 'শিক্ষা বিভাগকে হরতালের আওতার বাইরে রাখা হউক'।
উত্তম-উত্তম, তা ছাত্ররা কি গাধার পিঠে চড়ে চলাফেরা করবে? শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে ঢাকা থেকে একজন ছাত্রী যখন
সিলেট যাবে, সে কি এম্বুলেন্স নিয়ে যাবে, নাকি পালকিতে চড়ে?
প্রকারান্তরে জাফর ইকবাল স্বীকার করে নিলেন, হরতাল হউক অসুবিধা নাই কিন্ত শিক্ষা বিভাগকে ছাড় দেয়া হউক। তিনি শিক্ষক বলেই সম্ভবত এমনটা চিন্তা করেছেন।  
এমন বড় মাপের মানুষ যখন ছোট্ট একটা গন্ডিতে আবদ্ধ হয়ে পড়েন, তখন আমাদের দীর্ঘশ্বাস ফেলা ব্যতীত কিছুই করার থাকে না! আফসোস, এঁরা তাঁদের বিপুল শক্তির কী অপচয়ই করছেন! লেজার গান দিয়ে চড়ুই পাখি শিকার...!

*ছবিঋণ: সানাউল হক, জনকন্ঠ

আর কতটা রক্ত দিলে শেষ হবে হরতাল?


আগেও বলেছিলাম, আমাদের দেশে এখন, হরতালের নামের এই কুৎসিত, গা ঘিনঘিনে প্রাণীটার জন্ম পৃথিবীর সবচেয়ে জঘণ্য বেশ্যার গর্ভে। 

এটা একটা দানব! এমন দানব যে তার মাকে খেয়ে ফেলে, আমরা তো কোন ছার!

গণতন্ত্রের নামে হরতাল নামের এই অসভ্য কান্ডটির আমাদের খুব প্রয়োজন, না? এই যে দেশ অচল করে দেয়া হয়, ক্ষতিটা কার হবে, আমাদের! যে সব সম্পদ বিনস্ট হবে, এটা কাদের, আমাদের! যারা মারা যাবেন, তারা কারা, আমাদেরই কেউ! তাহলে কাদের জন্য হরতাল?

এই যে এতগুলো হরতাল দেয়া হয়েছিল; এতো প্রাণ, সম্পদের অপচয় হলো, লাভ কী হলো? বিএপি তো তার পাঁচ বছরের টার্ম প্রায় শেষ করে ফেলল! নেতাদের কোন সমস্যা নাই, এদের সন্তানরা থাকে দেশের বাইরে, হরতাল ডাক দিয়ে বিদেশ চলে গেলেই হয়! শেখ হাসিনা ঠিক এই কাজটিই করেছেন!

একটা ছবি আছে, হরতালে কিছু নেতা নেত্রী রাজপথে বসে শশা খাচ্ছেন, দেখলেই মনটা অন্য রকম হয়ে যায়- আহা, আমাদের নেতাদের কী ত্যাগ! এদের মধ্যে শুধু একজন তালু ছোলার কথা বলি, তিনি ৫০০০ ডলার দামের স্যুট গায়ে দেন!

হরতালের নামে ১৪ কোটি মানুষকে একটা বিশাল কারাগারে আটকে ফেলা হয়। এ গ্রহের সবচেয়ে বড়ো কারাগার!
যারা প্রবাসে থাকেন- তাদের নিশ্চয়ই কিঞ্চিত অভিজ্ঞতা হয়েছে। তারপরও কল্পনা করুন, আপনি দীর্ঘদিন পর দেশে ফিরছেন, লম্বা জার্নি- এয়ারপোর্টে আটকা পড়ে আছেন। বাড়িতে আপনার সব প্রিয়মানুষরা অপেক্ষা করছে কবে তারা আপনাকে স্পর্শ করবে! আপনার তখনকার অনুভূতি কেমন হবে?

এবার কিছু তথ্য আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করা যাক:
১. গত ১৮ মে ০৫ বুধবার আওয়ামী লীগ হরতাল আহ্বান করেন, দলের সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল। কিন্তু জলিলের প্রতিষ্ঠান মার্কেন্টাইল ব্যাংকের বার্ষিক সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে শেরাটনে। আবদুল জলিল সেদিন হরতাল ভেঙ্গে গাড়িতে চড়ে হোটেল শেরাটনে এসে সেই সভায় যোগদান করেন। এবং ব্যাংকটির অন্যতম ডিরেক্টর সাবের হোসেন চৌও যোগ দেন। তারা সেদিন হরতালের সমর্থনে বের হওয়া কোন মিছিল বা সমাবেশে অংশগ্রহন করেননি।
(দৈনিক সংবাদ/ ২. ১৮ মে ০৫ )

২. আওয়ামী লীগের সকাল সন্ধা হরতাল পালিত হয়। এই হরতালের সময় এইচ এস সি , ফাজিল, আলিম, কামিল পরীক্ষা চলছিল। পরে নেতারা বলেন, দেশে যে পরীক্ষা চলছে এটা নাকি তারা জানতেন না! 

ন্যাতা বটে!

৩. 'আমরা ভালোবাসা দিবস ও ভালোবাসার প্রকাশকে পরিপূর্ণভাবে উপভোগের জন্যই আন্দোলন করছি। ১৪ ফেব্রুয়ারী ভালোবাসা দিবসে হরতাল হয়ে তো সুবিধাই হলো'।
(মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, যা যা দিন)

*এই পোস্টের সঙ্গে যে ছবিটা এটা স্কুটার চালক আমির হোসেনের। যাকে হরতালে গাড়ি নিয়ে বের হওয়ার অপরাধে গায়ে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়েছিল, তাঁর সমস্ত গা ঝলসে যায়। তিনি মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে এক সময় হাল ছেড়ে মারা যান!

ড. ইউনূস এবং ছদুমদুর মধ্যে পার্থক্য কি?


ছবিটা আমাদের ড. ইউনূস সাহেবের। ক-দিন আগে বিএসইসি ভবনে ভয়াবহ আগুন লেগেছিল, পুড়ে যাওয়া ওই ভবনের তারতুরের(!) সামনে বিমর্ষ ভঙ্গিতে জটিল একটা পোজ দিয়েছেন। মনটা অন্য রকম হয়। আহারে, মানুষটার মনে কী মায়া গো! এমন বড়মাপের মানুষ জড় পদার্থ ভবনের পাশে দাঁড়িয়েছেন- এই ভবনের মধ্যে প্রাণ সঞ্চার না হয়ে উপায় আছে! ভাবখানা দেখে মনে হচ্ছে, ভবনটায় কেন আগুন ধরল এর একটা হেস্তনেস্ত না করে ছাড়বেন না।

বস্তি ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে। আমরা বড়ই উল্লসিত, একটা কাজের কাজ হচ্ছে যা হোক। মাত্র ক-দিন আগে ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে সাততলা বস্তি। হাজার হাজার মানুষ এক নিমিষেই চলে এসেছে রাস্তায়। শত শত গার্মেন্টসের মেয়ে কর্মীরা খোলা আকাশের নীচে বাস করছে, নিরুপায় তাঁরা সম্ভবত দেহ বিক্রির জন্য।

আমাদের নোবেলধারী ড. ইউনূস সাহেব এটা নিয়ে কাতর বা সোচ্চার বলে তো প্রতিয়মান হয় না। তিনি পুড়ে যাওয়া ভবনের পাশে হাঁ করে তাকিয়ে না থেকে এদের পাশে এসে দাঁড়ালে ওনার নোবেলটা কেউ ছিনিয়ে নয়ে যেত বলে তো মনে হয় না।

এলোমেলো কথা: ১

আমার লেখালেখি বন্ধ ছিল লম্বা একটা সময়। অনেকদিন হলো সব ছেড়েছুড়ে চলে এসেছিলাম। কারণ তুচ্ছসব, প্রদীপের চকচকে আলোয় বনিবনা হচ্ছিল না, আমি ঠিক ওই জগতটার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারছিলাম না। এটা লেখা যাবে না, ওটা লেখা যাবে না- ফরমায়েশী লেখা লেখো। ফরমায়েশী লেখা হয়তো বিখ্যাত মানুষরা লিখতে পারেন- আমার দ্বারা ও কম্ম হয় না।
এখনই যদি আমাকে বলা হয়, নির্দিষ্ট একটা বিষয়ে লিখতে- এক লাইনও লিখতে পারব না। তাছাড়া আমার এক সময় মনে হলো, ধুর, লেখালেখি করে কী হবে- শুধু শুধু আবর্জনা বাড়িয়ে লাভ কী!

আজ আর ওই সোনালী, ধুসর ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবি না, অবলীলায় সব ছেড়ে আসতে পেরেছিলাম। কারণ, আমার বড় মানুষ হওয়ার তেমন কোন উচ্চাশা ছিল না- ইস রে, এখন পর্যন্ত মানুষই হতে পারলাম না! আমার স্বপ্ন, চাওয়া খুব অল্প- সিম্পল খাবার, সিম্পল পোশাক- চলে যায়, সমস্যা হয় না।
এমনিতে গড়িয়ে যাওয়া পানিকে কে আটকাতে পেরেছে? পাখি ওড়ে যায় রেখে যায় পালক, মানুষ চলে যায় থেকে যায় স্মৃতি!

অনেকের কাছে বড্ড বাড়াবাড়ি হবে এটা শুনে, আমাকে যদি কেউ পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দেশের নাগরিত্ব দেয়া হয়, নিশ্চিন্ত জীবন দেয়া হয় তবুও আমি দেশ ছেড়ে যাব না, কচ্ছপের মতো শেষ সময় পর্যন্ত মাটি কামড়ে পড়ে থাকব! দেশের প্রতি ভালোবাসা-টাসা এসব জটিল কথা বুঝি না; আমি কুয়ার ব্যাঙ, কুয়াটাই আমার বড়ো প্রিয়। কে জানে, হয়তো আমার জেনেটিক কোডে কিছু সমস্যা আছে, সৃষ্টিকর্তা যখন বানাচ্ছিলেন তখন কোন বিচিত্র কারণে তাঁর তাড়া ছিল, নইলে তিনি ভেকেশনে ছিলেন ! জইতুনের তেল নাকে দিয়ে ঘুমাচ্ছিলেন না এই দিব্যিই বা কে দিয়েছে!

আরেকটা মজার কথা শেয়ার করি। আমি একটা ওয়েবসাইটে শুভ নামে দীর্ঘ ১ বছর লিখেছিলাম। ওখানে আমার প্রোফাইলে বয়স দেই নাই কিন্ত কিভাবে কিভাবে জানি ওই সাইটের অনেকের ধারণা হয়ে গিয়েছিল- শুভ নামের যে ব্ল­গার, এর বয়স খুব অল্প, পুতুপুত-আলাভোলা টাইপের একটা বালক। কী জানি, হয়তো আমার আচরণে বালকসুলভ কিছু ঝামেলা ছিল! এঁরা বিভিন্ন পরামর্শ দিতেন, আমি খুব এনজয় করতাম। কারণ এর সঙ্গে মিশে ছিল নিখাদ ভালোবাসা। ভালবাসা তো পাগলও বোঝে! আমি হাসতাম। ভাগ্যিস, এরা আমার হাসিটা দেখতে পেতেন না।

আমি যখন ছাপার অক্ষরে লেখালেখি করতাম, অন্য জায়গায়, তখন পাঠকদের প্রতিক্রিয়া জানতে পারতাম না। কেউ হয়তো দয়া করে বলতেন, আরে তোমার তো একটা চিঠি আসছিল। দাঁড়াও খুঁজে দেখি; বলে তিনি ট্রাশ ক্যান হাতানো শুরু করতেন। আবধারিতভাবে, ওই চিঠি আর খুঁজে পাওয়া যেত না। একটা চিঠি, একটা মন্তব্য যে কী অমূল্য এইসব ছাগলমানবরা কি করে বুঝবে। কিন্ত ওই ওয়েবসাইটে; ওখানে যেটা হত, লেখা পোস্ট করলেই একজন সঙ্গে সঙ্গে তার ভালোলাগা মন্দলাগা জানাতে পারতেন- অনেকটা টিভি নাটক আর মঞ্চ নাটকের মধ্যে পার্থক্যর মতো!

ওই সময় আমার বাংলা টাইপ খুব স্লো ছিল, এক আঙ্গুলে টাইপ করতাম! কিন্ত অনেকদিন এমন গেছে টাইপ করতে করতে ভোর হয়ে গেছে। ক্লান্তি আমায় ছুঁতে পারেনি, অনাবিল ভালোলাগা নিয়ে শুতে গেছি। ওখানে কেটেছে আমার সোনালী সময়- একেকটা মন্তব্য আমার কাছে মনে হতো একটা স্পর্শ ! 

আমার চেষ্টা থাকত, লেখার সূত্রগুলো নির্ভূল দেয়ার জন্যে। তারপরও একবার ভয়াবহ একটা ভুল হয়ে গেল- মুক্তিযুদ্ধের একটা ছবির জায়গায় অন্য একটা ছবি চলে গেল। আমি ভুল স্বীকার করে পোস্ট লিখেছিলাম। কিন্ত আমি লজ্জায় মরে যাচ্ছিলাম, বুড়া শিয়াল যখন ফাঁদে পড়ে তখন মৃত্যু ভয়ের থেকে বেশী থাকে ফাঁদে পড়ার লজ্জা!

লিখতাম হাবিজাবি অনেক কিছু- লেখার কোন আগামাথা ছিল না! আমার পড়ার যেমন কোন ঠিক-ঠিকানা নাই, তেমনি নাই লেখারও। নাই গান শোনারও- রকওয়েলের নাইফ যেমন আলোড়িত করে, তেমনি মনটা অন্য রকম হয়ে যায় মমতাজের বুকটা ফাইটা যায় শুনে। যার কাছেই এটা বলেছি, তিনি ছি-ছি ছাড়া আর কোন শব্দ উচ্চারন করেননি। কী করব? ভালোলাগা, এটা তো আর আমার হাতে নাই! আগেও এবং ওই ব্লগেও কিছু লেখা যখন টাইপ করেছি, আমার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। হয়তো আমার মধ্যে আবেগ বেশী, যেটা থাকে কেবল কুকুরমানবের মধ্যে! হোক, কুকুরমানবই সই! আমি কুকুরমানব, কোন অসুবিধা?

ওই সাইটে আমি আরেকটা জিনিস লক্ষ করেছিলাম, অধিকাংশদের মধ্যেই সহিষ্ণুতা বড়ো অভাব- অন্যকে সহ্য করার প্রবণতা অল্প। কেউ ধর্ম নিয়ে লিখলেন তো সঙ্গে সঙ্গে কেউ ঝাপিয়ে পড়লেন। কেউ ধর্মের বিরুদ্ধে লিখলেন, ব্যস, ফালাফালা করে ফেলা হলো! যেন ধর্ম একটা কাঁচের বাসন- হাত থেকে পড়ল আর খানখান হয়ে গেল!

ওই সাইটে এসে আমি অনেক কিছুই শিখেছিলাম। অনেকের মনন-প্রতিভা দেখে আমি বিস্মিত হতাম। অনেকের লেখার হাত আমি ঈর্ষা করতাম! কিন্তু অনেকেই তাঁদের মনন অনায়াসে অপচয় করতেন। তখন মনে হয়, তিনি আমাদের প্রতি কী অবিচারই না করছেন-
কেউ আত্মহত্যা করলে কার কি বলার আছে! এদের হাতে আছে লেজার গান অথচ গুলতি দিয়ে মারামারি করছেন।! আফসোস, বড়ই আফসোস!

মুক্তিযুদ্ধে: সুইপার

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নির্দিষ্ট বিশেষ কোন মাসে লিখতে ইচ্ছা করে না। কারণ ডিসেম্বরে, সবাই ঝাপিয়ে পড়ে লিখবে। এ বিষয়ে আমার নিজস্ব অভিমত হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, আবেগ থাকা প্রয়োজন সর্বক্ষণ। কিন্ত নির্দিষ্ট একটা সময়ে আমরা প্রবলভাবে আবেগক্রান্ত হয়ে পড়ি।
মুক্তিযুদ্ধ হচ্ছে আমাদের শেকড়। একটা গাছের শেকড়কে বাঁচিয়ে রাখতে যেমন প্রয়োজন নিবিড় পরিচর্যা- হৃদপিন্ড যেমন ধুকধুক করে চলে অবিরাম, তেমনি মুক্তিযুদ্ধের আবেগ থাকবে বুকের ঠিক মাঝখানটায়, নিরবচ্ছিন্নভাবে! অনবধানবশত হঠাৎ মনে পড়ল আর কিছুটা সময় খুব আলোচনা হলো, এরপর আমরা ভুলে গেলাম, এর আসলে কোন অর্থ হয় না!

অবশ্য এটা আমাদের বৈশিষ্টও বটে। সমস্তটা জীবন আমরা চলি এলোমেলোভাবে, অন্যায় অত্যাচার করে- খানিকটা বয়স হয়ে গেলেই দাড়ি-টাড়ি ছেড়ে একেবারে সাধু হয়ে যাই। ইশ-শ, গড় আয়ুর সমান আমরা প্রত্যেকে বাঁচব এমন গ্যারান্টি কার্ড যেন আছে আমাদের কাছে! সেল ফোনে যেন সৃষ্টিকর্তা ফোন করে কনফার্ম করেছেন আর কী!

মুক্তিযুদ্ধের মজার ব্যাপারটা হচ্ছে, ঘুরেফিরে চলে আসে অল্প কয়েক জন মানুষের অবদানের কথা- এদের কথা বলে বলে আমরা মুখে ফেনা তুলে ফেলি। যেন এরাই দেশটা স্বাধীন করে ফেলেছেন- আর কারো অবদান ছিল না! আমরা বিস্মৃত হই, ‘ভাগিরথী নামের হিন্দু সেই বালিকাটির কথা! আমরা অবলীলায় ভুলে যাই ‘লালু নামের ১০/১২ বছর বয়সী সেই বালকটির কথা। যে অসমসাহসী বালকটি গ্রেনেড মেরে পাকিস্তানী আর্মীর বাংকার উড়িয়ে দিয়েছিল!
... ... ...
"মিসেস রাবেয়া খাতুন। সুইপার। রাজারবাগ পুলিশ লাইনের এস, এফ কেন্টিনের তখন কর্মরত ছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ। পাক বাহিনী অতর্কিতে হামলা করে রাজারবাগ পুলিশ লাইনে। ২৬শে মার্চ সকাল পর্যন্ত বাঙ্গালী পুলিশ বাহিনী প্রাণপণ যুদ্ধ চালিয়ে যান কিন্ত পাক বাহিনীকে ঠেকিয়ে রাখতে পারেননি। নিরুপায় তাঁদের প্রাণ ব্যতীত দেয়ার মতো আর কিছুই ছিল না!

বাঙ্গালী পুলিশদের নৃশংস ভাবে হত্যা করে পাক বাহিনীর শুরু করে তাদের তান্ডবলীলা। অনেকের সঙ্গে মিসেস রাবেয়া খাতুনকেও বের করে নিয়ে আসে। রাবেয়া খাতুনসহ সবাইকে শারীরিক চরম অত্যাচার করে একে একে মেরে ফেলা শুরু করে।
মিসেস রাবেয়া খাতুন এই বলে নিজের প্রাণ রক্ষা করেন: আমি সুইপার, আমাকে তোমরা মেরে ফেললে তোমাদের ময়লা আবর্জনা পরিষ্কার করার মতো কেউ থাকবে না। নিজেদের সুবিধার কারণে পাক বাহিনী তাঁকে বাঁচিয়ে রাখে এই শর্তে, তিনি এখানে সুইপারের কাজ চালিয়ে যাবেন। মিসেস রাবেয়া খাতুন, এখানে থাকার সূত্রে জানতে পারেন, না-জানা অনেক কথা। পাক সেনারা সাময়িক ক্যাম্প বানায় রাজারবাগ ব্যারাককে।

পাক সেনারা তাদের দালালদের সহায়তায় রাজধানীর স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, অভিজাত এলাকা থেকে অসংখ্য বাঙ্গালী বালিকা, যুবতীদের এখানে ধরে নিয়ে আসে। এদের উপর শুধু চরম শারীরিক অত্যাচারই করেই এরা থেমে থাকেনি- অবলীলায় কেটে ফেলেছে, ছিড়ে ফেলেছে শরীরের স্পর্শকাতর অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো। এমন কোন অন্যায় নেই যা ওই সময় এরা করেনি। মেয়েদের রোমহর্ষক চিত্কার, ঢাকা পড়ে গেছে মদ খাওয়া এইসব পশুদের হ্যা-হ্যা হাসির তোড়ে।

মিসেস রাবেয়া খাতুন তাঁর কাজ করার ছল করে যে অবর্ণনীয় দৃশ্য দেখেছেন, পরে বর্ণনা দিয়েছেন, একজন মানুষকে অসুস্থ করে দেয়ার জন্য, মাথায় সমস্যা করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট! এই বর্ণনাগুলো পড়তে কষ্ট হয়- বড় কষ্ট হয়, বুক ভেঙ্গে আসে।
এই অভাগা মেয়েদের বাহ্যজ্ঞান লোপ পেত- তখন তাঁদের ময়লা পরিস্কার করার জন্য ডাক পড়তো মিসেস রাবেয়া খাতুনের। অসহায় তিনি, নির্বাকদৃষ্টিতে দেখা ছাড়া তাঁর কোন উপায় ছিল না। তারপরও তিনি সময়ে সময়ে সুযোগ পেলেই এখান থেকে কিছু মেয়েদেরকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিতেন।" 
( তথ্যসূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ, অষ্টম খন্ড, পৃষ্টা: ৫৩-৫৬)
... ... ...
'মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাংলাদেশের একেকটি সুইপার কলোনি ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের একেকটি আশ্রয়স্থল। চট্টগ্রাম, সিরাজগঞ্জ, ঈশ্বরদি, কুষ্টিয়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে জাত সুইপাররা মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছেন, খবর এনে দিয়েছেন, আর্মস লুকিয়ে রেখেছেন, এমনকি সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহনও করেছেন। কিন্তু দলিত মুক্তিযোদ্ধাদের কথা সাধারণত কোথাও উল্লেখ করা হয় না।'
কথাগুলো ক্ষোভের সঙ্গে বলেন সুইপারদের নেতা বিজি মূর্তি। আর মিরনজল্লা কলোনির হরিজন সেবক বাবুর চন্দ্র দাস বলেন:
'মিরনজল্লা সুইপার কলোনিতে মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দেয়ার খবর ঠিকই গিয়েছিল পাকিস্থানি বাহিনীর কাছে। তাই হানাদার বাহিনি ১৯৭১ সালের ২২ নবেম্বর কলোনি ঘেরাও করে কলোনির প্রধান সরদার মহাবীর সামুন্দসহ ১০ নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিকে ধরে রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে হত্যা করে।'
সুইপাররা দুঃখের সঙ্গে জানান, মুক্তিযুদ্ধে তারা অবদান রাখলেও মুক্তিযোদ্ধাদের নাম তালিকায় তাদের নাম নাই, কোন স্বীকৃতি দেয়া হয় না।
(বিজি মূর্তি এবং বাবুর চন্দ্র দাসের সাক্ষাৎকার: দৈনিক যায়যায়দিন ১৮.১০.০৬)

রীচ ফুড আমাদের জন্যে বড়ো গুরুপাক

যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী সে দেশের প্রত্যেক নাগরিককে প্রতিবছর ১৫ এপ্রিলের মধ্যেই তাদের আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে হয়। সে অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট বুশ ও তার স্ত্রী লরা বুশ ২০০৫ সালের জন্য ১ লাখ ৮৭ হাজার ৭৬৮ ডলার আয়কর দিয়েছেন। গত শুক্রবার হোয়াইট হাউস থেকে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়।

আমাদের দেশের শীর্ষ আয়করদাতারা হচ্ছেন:
১.চট্টগ্রামের অসিত কুমার সাহা, তিনি ট্যাক্স দিয়েছেন ৮৪ লাখ টাকা।
২.আদিত্য মজুমদার ভাই।
৩. অশোক কুমার সাহা। অসিত এবং অশোক এঁরা আপন দুই ভাই।

আমাদের সৌভাগ্য আমরা চট করে জেনে যাই যুক্তরাষ্ট্রের খবর- ওই দেশের প্রেসিডেন্ট কতো টাকা ট্যাক্স দেন সেই খবর। কিন্তু আমরা জানতে পারি না আমাদের প্রধানমন্ত্রী, আমাদের বিরোধী দলের নেত্রী, মতিউর রহমান নিজামী, হোমো এরশাদ কত টাকা ট্যাক্স দেন! আসলে বেচারাদের কোন আয়ই নাই, টেক্স দেবেন কোথা থেকে!

জানি-জানি, অনেকেই বলবেন- পার্টি সদস্যদের চাঁদা দিয়েই সব কিছু চলছে। তা হবে হয়তো- আমার জানা মতে বি এন পি’র শেষ চাঁদা নির্ধারণ করা হয়েছিল বছরে ১ টাকা করে! অন্য দলগুলোর কত করে চাঁদা আমার জানা নাই!

আমাদের দেশে সাংসদরা যে সব গাড়ি আমদানী করেছেন, সে গুলোর মধ্যে আছে- পোরশে, হামার, বিএমডব্লি­ও, মার্সিডিজ বেঞ্জ, ক্যাডিলাক, ইনফিনিটি ইত্যাদি! পোরশের দাম প্রায় ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত, হামার প্রায় ১ কোটি টাকা …।

লিস্টটা বিরাট- আমি কয়েকজনের নাম উল্লেখ করছি- পোরশে: আমদানী করেছেন সাংসদ মোসাদ্দেক আলী ফালু, বেগম রওশন এরশাদ! হামার: ড, আবদুর রাজ্জাক, মার্সিডিজ বেঞ্জ: শেখ হাসিনা। টয়োটা ল্যান্ড ক্রুজার: মতিউর রহমান নিজামী, দেলওয়ার হোসেন সাইদী। লেক্সাস: শেখ ফজলুল হক সেলিম, সাদেক হোসের খোকা। (সুত্র: প্রথম আলো, ০৫.০৪.০৬)

প্রধানমন্ত্রী গাড়ি আমদানী করেননি- আদৌ তার কোন প্রয়োজন পড়ে না! হোমো এরশাদের নাম পাওয়া যায় নি- তিনি সম্ভবত পায়ে হেঁটে চলাফেরা করেন অথবা রওশন এরশাদের কাছে লিফট চান, কাতর হয়ে, আমাকে নেবে? (অন্য অর্থ করবেন না) বলা হয়ে থাকে, আমাদের দেশে সব কিছুর মধ্যে বিষ ঢুকিয়ে দেয়ার পেছনে হোমো এরশাদের হাত ছিল- এই যে শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানী করার ফাজিল কান্ডটা এরশাদই চালু করেছেন!

আমাদের দেশে গণতন্ত্র নামের সুগার কোটেড ট্যাবলেটটার বড়ো প্রয়োজন- এই আফিম ট্যাবলেটটা আমাদের খাইয়ে যা খুশী তা করা যায়! আমরা কেয়ামতের আগ পর্যন্ত ঘুরেফিরে এই মুখগুলোই দেখব, এ থেকে আমাদের মুক্তি নেই! পাঁচ বছরের জন্য এরাই কেউ না কেউ শাসক।

বিরোধীদল অনবরত হরতাল দেবেন, বেছে বেছে ২ দিন ছুটির আগের দিন- গণতন্ত্রের জন্য এটা বড়ো প্রয়োজন! আমাদেরকে আফিম খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখবে, আমরা ঘুম থেকে জেগে চেঁচিয়ে ওঠবো- পেয়েছি-পেয়েছি আমরা, গণতন্ত্র!

অতীতে কেয়ারটেকার সরকার মাত্র কয়েকজনকে নিয়ে অনায়াসে দেশ চালিয়েছেন। এই বিশাল মন্ত্রী সভার চেয়ে অনেক অনেক ভালো ভাবে!

আসলে আমরা পান্তাভাত, আলুভর্তা খাওয়া ছা পোষা মানুষ- রীচ ফুড আমাদের জন্যে বড়ো গুরুপাক

সম্পাদক সাহেব, থাকা- খাওয়া ফ্রি!

২৪.১২.০১ প্রথম আলো একটি বিশেষ ক্রোড়পত্র বের করে। বিশ্বঅলি শাহানশাহ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভান্ডারীর (ক.) ৭৩তম জন্মবার্ষিকী উপলে ১ পৃষ্টাব্যাপী বিজ্ঞাপন।

এতে বাণী দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরী, বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা, মন্ত্রী এম মোরশেদ খান, মন্ত্রী আবদুল্লাহ-আল-নোমান, মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, প্রতিমন্ত্রী আলহাজ্ব জাফরুল ইসলাম চৌধুরী, হুইপ সৈয়দ ওয়াহিদুল আলম এবং সংসদ সদস্য আলহাজ্ব রফিকুল আনোয়ার।

ড. আশরাফ সিদ্দিকী এবং ড. মুহম্মদ আবদুল মান্নান চৌধুরী, এই দুইজন পন্ডিত মিলে মাইজভান্ডারীর জীবন ইতিহাস লিখেছেন বিতং করে।
এই পন্ডিতদের কল্যাণেই আমরা জানলাম, ইঞ্জিনে পানি ভরে তেল ছাড়াই মাইজভান্ডারীর গাড়ি চলত। তেল ছাড়া ১৯২ মাইল কক্সবাজার পর্যন্ত গাড়ি চলেছে! …এমন কেরামতি নাকি হাজার পৃষ্ঠা লিখেও বর্ণনা করা সম্ভব না।

বুশ, ব্যাটা ভারী বেকুব! খামাখা তেলের জন্যে ইরাকের এতগুলো লোককে মারল! আমার এমন একটা গাড়ির খুব প্রয়োজন, আমি এই গাড়িটা কিনতে চাই; প্রয়োজনে ভিক্ষা করে হলেও। একবার কিনে ফেললেই তো কেল্ল­াফতে। পানি ভরব আর চালাব, কাউকে নিয়ে লং ড্রাইভে বেরিয়ে পড়ব। পানির অভাব হলে…। কী মজা-কী মজা!

আর প্রথম আলো, প্রথম শ্রেণীর দৈনিক! মুক্ত-শক্ত চিন্তার দৈনিক, এদের প্রতিদ্বন্দ্বী নাকি এরা নিজেরাই! টাকা পেলে প্রথম আলো যখন সব ধরনের বিজ্ঞাপনই ছাপায় তাহলে আমি একটা বিজ্ঞাপন দিতে চাই:
আমার বাংলা টাইপ খুব স্লো। একজন বাংলা টাইপ জানা লোক প্রয়োজন। প্রথম শ্রেণীর দৈনিকের সম্পাদক সাহেব ইচ্ছা করলে এ পদে যোগ দিতে পারেন, থাকা-খাওয়া ফ্রি...।

বঙ্গাল ব্লগ!

বাড়িতে মুখ খারাপ করতে পারি না, মন ভাল না, কারো সঙ্গে ঝগড়া করেছি, তো চলো শালার গালি দিয়ে সবাইকে একহাত নেই! যেন ভারী একটা কাজ হলো! এই কাজটা আমরা অবলীলায় করি কোন একটা ব্লগ-সাইটে এসে!

ফ্লাডিং একটা সমস্যা! কেউ কেউ ইচ্ছা করে এ ন্যাক্কারজনক কাজটা করেন সবার আপত্তি উপেক্ষা করে। সবাই তিতিবিরক্ত। কে শোনে কার কথা! এরা সগর্বে ঘোষণা দিয়ে এই কাজটা করেন। অনেকে আবার এদেরকে প্রতিরোধ করতে গিয়ে নিজেরাও এ কাজে নেমে পড়েন। সব মিলিয়ে একটা যা তা, যাচ্ছেতাই অবস্থা। এটলিস্ট একটা লেখা পোস্ট করে অন্য ব্লগারদের পড়ার জন্য অন্তত সময়টুকু তো দিতে হবে। আমি আগেও বলেছি আমাদের মধ্যে সহনশীলতার বড়ো অভাব- এর সঙ্গে যোগ হয় অন্যের প্রতি অসম্মান করার প্রবণতা।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ডিগবাজী। এটা এখন একটা ফ্যাশনের পর্য়ায়ে চলে গেছে। মুক্তিযুদ্ধে একজন দুর্ধর্ষ কমান্ডো ঠেলাগাড়ি চালান, সুরুয মিয়ার মত মুক্তিযোদ্ধা ১৬ ডিসেম্বরে আত্মহত্যা করেন, একজন মুক্তিযোদ্দাকে ১০০ টাকা দিয়ে জুতা মারি। আর আমরা লম্বা লম্বা বাতচিত করি। কবে কর্নেল তাহেরের মৃত্যুদিবস গেল এটা আমরা কোন ছার প্রথম শ্রেণীর দৈনিকেরই বা এতো সময় কই!
অল্প কিছু নেতা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে স্বপ্ন দেখতে দেখতে স্বপ্ন দো...রোগ বাধিয়ে বসে আছেন। হায়রে, ভার্চুয়াল শিশুরা- এদের জন্য করুণা করতেও করুণা হয়! মুক্তিযুদ্ধ মানেই বিশেষ একটা দলের নিজস্ব তালুক বানিয়ে ফেলবেন, এমন চুতিয়া অধিকার কে তাকে দিয়েছে! বিচিত্র দেশ- গোলাম আযম এই দেশের নাগরিক হতে পারবেন কিন্তু ফাদার রিগন পারবেন না!

আহ ধর্ম! আহ ধার্মিক! এটা নিয়ে অনেকে এমন আচরণ করেন, তাঁর ধর্মটা যেন একটা কাঁচের বাসন- হাত থেকে পড়ামাত্র খানখান হয়ে যাবে। ধর্মকে এহেন তুচ্ছ পর্যায়ে নামিয়ে এনে প্রকারন্তরে ধর্মকে হেয় করা হয়! অথচ ধর্ম নিয়ে আলোচনাটা খুব জরুরী।
ছোট্ট একটা উদাহরণ দেই- ওই দিন পড়লাম, একজন দায়িত্বশীল মানুষ বলছেন, বাংলায় ‘আল্লাহ মহান’ এটা লিখে লাভ নাই কারণ আল্লাহ তো আর বাংলা পড়তে পারেন না । এইসব মূর্খ মন্তব্যকারী, এরা ধর্মকে কোন পর্যায়ে নিয়ে গেছে! সৌদি আরবের লোকজনরা গালি কি ভাষায় লেখে, বাংলায়?

আর কারো যদি কোন ধর্মের প্রতি আবেগ না থাকে তো অহেতুক অন্যকে খোঁচাখুঁচি করার সার্থকতা কোথায়? পাশাপাশি কারো কোন ধর্মের প্রতি দ্বিমত থাকলে যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে দিলেই তো হয়। কলমের উত্তর কলম দিয়ে, এটা আমরা প্রায়শ ভুলে যাই। হুমায়ুন আজাদকে কেন হত্যা করার চেষ্টা করা হবে, তিনি তো কাউকে হত্যা করেননি! একজন মানুষ যেখানে প্রাণ সৃষ্টি করতে পারে না তার কি অধিকার আছে একজন সৃষ্টির সেরা জীবের প্রাণ নষ্ট করার! তাঁর কোন লেখায় কারো অমত থাকতেই পারে, তা কলমের মাধ্যমে উত্তর দিলে তো সমস্যা নাই।

ইনকিলাব জাতীয় পত্রিকা পড়লে সাবান দিয়ে আমার হাত ধুতে ইচ্ছা করে, কিন্ত এদের একটা ব্যাপার আমার মনে এখনো দাগ কেটে আছে। হুমায়ুন আজাদ ‘পাক সার জমিন…’ লেখার পর ওখানে একজন কলাম লিখেছিলেন, 'হুমায়ুন আজাদ কি তাঁর মেয়েদেরকে এ বইটা পড়তে দিতে পারবেন'? ইনকিলাবের মতো পত্রিকার এই সহনশীলতা ভালো লেগেছিল কারণ এদের উত্তরটা ছিল কলম দিয়ে এবং ওই কলামে মি. আজাদের প্রতি একটা খারাপ শব্দ ব্যবহার করা হয়নি, অন্তত ওই সময়টাতে।

শ্লীল-অশ্লীল, এটা অসম্ভব একটা জটিল বিষয়। এ নিয়ে কঠিন কঠিনসব মতবাদ আছ্। ব্লগে অনেকেই বলেন এটা ওপেন ফোরাম- এখানে যা কিছু আলোচনা হতে পারে, পারে যে কোন শব্দের প্রয়োগ। আমি আমার স্বল্প বুদ্ধিতে যা বুঝি, আসলে এটা বিচারের ভারটা ছেড়ে দিতে হবে আমাদের হাতেই। কিন্ত অবস্থান এবং সময় একটা বিচার্য বিষয়। আমেরিকার একজন ব্ল­গারের কাছে যেটা অতি শ্লীল মনে হবে আমদের দেশে এটা হয়তো অশ্লীলতার পর্যায়ে পড়ে। অনেক দেশেই অনেক আগে থেকেই বাথরুমের দরোজা বলে কোন জিনিসই থাকে না- এটা আমাদের দেশে অকল্পনীয়! এখন প্রবাসের ঢং এদেশে চালু করার চেষ্টা করে তো লাভ নেই!

বাক স্বাধনীতা, খুব প্রিয় একটা শব্দ কিন্ত এর নামে তো যা খুশী লেখা যায় না, কারণ একজন লেখকের পায়ে অসংখ্য শেকল থাকে। কঠিন শেকলটা হচ্ছে তার নিজের। একজন লেখককে দাঁড়াতে হয় তার নিজের কাঠগড়ায়, তেমনি একজন ব্ল­গারকেও! কলম একটা ভয়াবহ অস্ত্র- এর প্রয়োগ কিভাবে হবে এটা নির্ভর করে কলমটা কার হাতে, তার উপর!

হায় ইংরাজি ভাই!

স্বর্গ এবং নরকের দেয়াল প্রায়ই নানা কারণে ভেঙ্গে যায় (ভেতরের খবর হচ্ছে ভেঙ্গে ফেলা হয়)। স্বর্গবাসীরা বিরক্ত, নরকবাসীরা হুটহাট করে ঢুকে পড়ে। নরকের কীটদের গায়ে কী বদবু- ছি!

স্বর্গ এবং নরকবাসীদের জরুরী সভা বসল।
নরকের সভাপতি আমাদের জঙ্গল বা বুশ ভাই! সভায় সিদ্ধান্ত হলো, দু-দলই পর্যায়ক্রমে ভাঙ্গা দেয়াল ঠিক করবে।

স্বর্গবাসীরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যথাসম্ভব দ্রুত ভাঙ্গা দেয়াল ঠিক করে ফেলল। যথারীতি আবারও দেয়াল ভেঙ্গে গেল! এইবার নরকবাসীদের পালা কিন্তু নরকবাসীরা গড়িমসি শুরু করল। দেয়াল ভাঙ্গা থাকলেই তো মজা। হুট করে স্বর্গে ঢুকে নাচাগানা করা যায়, কী মজা!

আবার সভা ডাকা হলো। এইবার নরকবাসীদের পাত্তা নাই, একজনও সভায় আসেনি। যা হওয়ার তাই হলো, গডের কাছে বিচার গেল। নরকবাসীরা এইবার চোখে অন্ধকার দেখল, গডের কাছে যাবে কে? দলের নেতা তো আবার ইংরাজী জানেন না, গড আবার ইংরাজী ছাড়া বুঝেন না! মহা সমুস্যা(!)।

রব উঠলো, হায় ইংরাজী ভাই- হায় ইংরাজী ভাই! শেষ পর্যন্ত একজন বুদ্ধি দিল, বাংলা কোন সাইট থেকে কোন ইংরাজি ভাইকে ধরে আনো (বাংলা সাইটে যিনি ইংরাজিতে পোস্ট দেন), রিমেমবার, জীবিত না, মৃত!

সম্পাদক সাহেবদের জন্য ইশকুল!

২৮ ফ্রেব্রুয়ারী প্রথম আলোর একটা নিউজ ছিল এ রকম: সাততলা বস্তি ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। রিপোর্টটির কিছু অংশ আমি এখানে তুলে দিচ্ছি:
১. এই বস্তিটা না ভেঙ্গে ফেলার জন্য হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা ছিল।
২. ৫০০ ঘর ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে।
৩. আনুমানিক ৫ হাজার মানুষ গৃহহারা হয়েছেন।
৪. সকালে শিশু মনিরুলকে রেখে তাঁর বাবা মা গার্মেন্টসে গিয়েছিলেন কাজে।
৫. উচ্ছেদের সময় শিশু মনিরুল গুরুতর আহত হয়।
৬. গার্মেন্টসের শত শত নারী কর্মী এ বস্তিতে থাকতেন। উচ্ছেদের পর, রাতে খোলা আকাশের নিচে তাঁদের থাকা এবং নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কে আছেন তাঁরা।
৭. উচ্ছেদের পর শত শত শিশুসন্তানকে নিয়ে খোলা মাঠে তরুণী মারা রাত কাটাচ্ছেন।
৮. হাইকোর্টের রায়ের কপি ম্যাজিষ্ট্রেটের হাতে তুলে দেয়ার পরও তিনি উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত রাখেন।
৯. নারী এবং শিশুদের মারধর করা হয়। ইত্যাদি ইত্যাদি।

প্রথম আলো ২রা মার্চ এ ঘটনা নিয়ে সম্পাদকীয় মন্তব্য ছাপে। বেশ! কিন্ত সম্পাদকীয়তে এই খবরটার চেয়ে অনেক অনেক বেশি গুরুত্ব পায় অন্য একটা সংবাদ এবং প্রচুর স্পেস নিয়ে। ওই সংবাদটা ছিল, 'লুটপাটের সেতু- সেতু আছে রাস্তা নেই'। কোন এক প্রভাবশালীর জমি বাঁচাতে রাস্তার কাজ আটকে আছে। বেশ বেশ! বস্তি উচ্ছেদের চাইতে এই নিউজটার গুরুত্ব তাইলে অনেক গুরুত্ব বহন করে?

কে জানে, হবে হয়তো বা- সম্পাদক বলে কথা। কে জানে, সম্পাদক সাহেবরা সর্বজ্ঞ হন নিশ্চয়ই। তারা যা বলেন তা আমাদের মেনে না নিয়ে উপায় কী! কিন্ত আমি এতে অমত পোষণ করি। আমি মনে করি, আমাদের সর্বজ্ঞ সম্পাদক সাহেবদের জন্য ইশকুল খোলা আবশ্যক। নইলে এসি রুমে বসে কলমবাজি করলে এই জিনিস প্রসব না করে উপায় কি!

‘কয়েদি’ থেকে অংশবিশেষ

"কাঁটায় কাঁটায় বারোটা।
থাই এয়ারওয়েজের একটি যাত্রীবাহী বিমান যথাসময়ে জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করল।

যাত্রীদের মধ্যে একজন রিউনোসুকে আকুতাগাওয়া, জাপানী ব্যবসায়ী। লম্বা জার্নি ওঁকে অনেকখানি কাবু করে ফেলেছে। প্রচন্ড মাথা ব্যথা হচ্ছে। থেকে থেকে গা কেমন গুলাচ্ছে। হোটেলের বরফ-ঠান্ডা বাথটাবের পানিতে গা ডুবিয়ে চিল্ড বিয়ারে চুমুক দিতেই অবসাদ অনেকখানি কেটে যাবে এটা ভাবতেই শরীরে ঝিরঝিরে একটা স্বস্তির একটা পরশ বয়ে গেল।

ঘোষণা দেয়ার মতো কিছু নেই বলেই গ্রিনচ্যানেল দিয়ে গুটিগুটি পায়ে পেরিয়ে আসতেই পেটমোটা একজন কাষ্টমস অফিসার হড়বড় করে ইংরাজীতে কি সব বলতে লাগল। আকুতাগাওয়া ভাঙা ভাঙা ইংরেজীতে বিনীত ভাবে বললেন, ‘মাফ করবে, তোমার কথা বুঝতে পারছি না, দয়া করে একটু বুঝিয়ে বলবে?’
কাষ্টমস অফিসার ঝড়ের গতিতে একগাদা কথা বললেন, আকুতাগাওয়া এবারও বিন্দুবিসর্গ বুঝতে পারলেন না। ভারী লজ্জিত হয়ে বিনয়ে গলে গিয়ে বললেন, 'মার্জনা করো, আমার ইংরাজী জ্ঞান খুব সীমিত তবে শব্দগুলো আলাদা-আলাদাভাবে বললে আমি বুঝতে পারব।'
কাষ্টমস অফিসার এবার থেমে থেমে চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, ‘আয়্যাম নট আ ব্লাডি টিচার, ইউ নো, কাষ্টমস অফিসার আয়্যাম।’

আকুতাগাওয়া হকচকিয়ে গেলেন। এমনিতেই ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে পড়েতে চাইছে, এই ভদ্রলোক এমন অভব্য আচরণ করছেন কেন? অলক্ষ্যে গালে হাত বুলালেন তার কি দাড়ি বড়, তাকে কি ড্রাগ স্মাগলারদের মতো দেখাচ্ছে।

আকুতাগাওয়া নিচুস্বরে বললেন, ‘আমি বড় ক্লান্ত, কি জানতে চাইছ দয়া করে বলো?’
‘তুমি যে বড় গটগট করে গ্রিন চ্যানেল পেরিয়ে এলে!’
আকুতাগাওয়া গটগট শব্দটার মানে বুঝতে পারলেন না তবে মূল বক্তব্য বোধগম্য হল। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন, ‘কেন চ্যানেল ব্যবহার করা নিষেধ নাকি, অফিসার?’

‘অবশ্যই নিষেধ, যদি তুমি ঘোষণা না দিয়ে এবং যথার্থ ট্যাক্স না দিয়ে কোন দ্রব্য নিয়ে আসো,’ কাষ্টমস অফিসারের গলা একধাপ চড়ে গেল।
আকুতাগাওয়া এতক্ষণে হাসলেন, ‘তেমন কিছুই আমার কাছে নেই।’
কাস্টমস অফিসারের কথা এবার হুমকির মতো শোনাল, ‘বেশ, সেটা দেখা যাবে। তোমার সঙ্গের জিনিসপত্র আমি দেখব।’
‘অবশ্যই, আনন্দের সঙ্গে।’
কাস্টমস অফিসার আকুতাগাওয়ার নামিয়ে রাখা একটি মাত্র হাত ব্যাগ দু-মিনিটেই তছনছ করে রাগী গলায় বললেন, ‘তোমার আর লাগেজ কোথায়?’
‘এই-ই।’
‘এই-ই’, কাস্টমস অফিসার গভীর সন্দেহ পোষণ করলেন!
‘বিশ্বাস না হলে দয়া করে খোঁজ নিয়ে দেখো।’

এতক্ষণে কাস্টমস অফিসারের মুখের কঠিন রেখাগুলো নরোম হয়ে এল। একদৃষ্টে পাসপোর্টের দিকে তাকিয়ে আছেন। আসলে অন্য কিছু দেখছেন না ঠোঁট না নাড়িয়ে নাম মুখস্ত করছেন। কী কঠিন নাম রে বাবা!
‘সো, আকুতাগাওয়া, এ দেশে আগমনের উদ্দেশ্য কি?’
আকুতাগাওয়া এবার অসহ্য রাগে ফেটে পড়লেন, ‘লিসেন অফিসার, তুমি ভব্যতার সমস্ত সীমা অতিক্রম করেছ এ দেশে কেন এসেছি এটা তোমার কাছে বলতে আমি বাধ্য নই। উপযুক্ত কারণ দেখিয়ে যথার্থ কাগজপত্র ভিসা নিয়ে আমি এসেছি। ভাল কথা, আবার যখন আমার নাম ধরে সম্বোধন করবে তখন নামের পূর্বে জনাব যোগ করবে। আমাদের দেশে তো আমরা যে কাউকে যা-তা লোককেও জনাব ছাড়া সম্বোধন করার কথা ভাবতেই পারি না।’

হইচই-এ লোক জমে গেল। একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নম্রভঙ্গিতে বললেন, ‘সার, দয়া করে বলো সমস্যাটা কি?’
আকুতাগাওয়া আদ্যোপান্ত সব খুলে বললেন, ওই ভদ্রলোক গভীর মনোযোগ নিয়ে শুনলেন, শুনতে শুনতে ওঁর চোখ মুখ কেমন শক্ত হয়ে গেল।

যে কাস্টমস অফিসারের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হচ্ছিল তাকে পরিস্কার ইংরাজিতে বললেন, ‘তুমি যখন গায়ের এই পোষাকটা পরে এখানে দাঁড়াও তখন একটা দেশ, গোটা জাতির প্রতিনিধিত্ব করো। বাইরের গেষ্টদের সামনে তোমার একটা অসভ্য আচরণে তোমার পোশাক গায়ে থাকে ঠিকই কিন্তু আমরা তেরো কোটি মানুষ নগ্ন হয়ে পড়ি। তোমার বিরুদ্ধে অফিসিয়াল পদক্ষেপ অবশ্যই নেয়া হবে। আমি আপ্রাণ চেষ্টা করব তোমার যেন কঠিন শাস্তি হয়,’ এবার আকুতাগাওয়ার দিকে ফিরে বললেন, ‘সার, সব কিছুর জন্য আমি ওর হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করি প্লিজ সার, প্লিজ।’

আকুতাগাওয়া এই বাঙালী কর্মকর্তার আচরণে অভিভূত হয়ে পড়লেন। সামনে অনেকখানি মাথা ঝুকিয়ে সশ্রদ্ধ বো করলেন।

কাস্টমস ব্যারিয়ারের বাইরে জটলার মধ্যে একজন বাঙালীকে দেখে হাত নাড়লেন। ইংরাজি ক্যাপিটাল লেটারে বড় বড় করে তার নাম লেখা প্লাকার্ড উঁচিয়ে রেখেছে। আকুতাগাওয়া লম্বা-লম্বা পা ফেলে এগিয়ে গেলেন।
তিনি লোকটার দিকে সহাস্যে হাত বাড়িয়ে বললেন, ‘আমি কি জনাব আহমেদের সঙ্গে কথা বলছি?’

পরিচিতি এবং সৌজন্য বিনিময় চলাকালে তিনি খানিকটা অস্বস্তি বোধ করছিলেন আহমেদ ভদ্রলোকের ভাবভঙ্গি কেমন যেন একটু অন্যরকম। কেমন ভীত সন্ত্রস্ত দেখাচ্ছে।

কোথায় যেন ভারি একটা অসঙ্গতি আছে। এমন তো হওয়ার কথা না, তিনি মূলত বাংলাদেশে এসেছেন কাপড় কেনার জন, দু-একটা কাপড় না লক্ষ লক্ষ কাপড়। চলতি ভাষায় তিনি একজন বায়ার। জামিল আহদের জোর আমন্ত্রণে এই দেশে এসেছেন।
জামিল আহমেদের ঢাউস কটা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি। বাংলাদেশ থেকে পাঠানো কাপড়ের নমুনা দেখে তিনি চমত্কৃত- এমন কাপড় এই দেশে তৈরী হয় বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল। স্বচক্ষে দেখাই আসার মূল উদ্দেশ্য। তিনি যথাসম্ভব প্রস্তুতি নিয়েই এসেছেন কথাবার্তা চুড়ান্ত হলে এগ্রিমেন্ট সই করে ফিরে যাবেন।

কিন্তু সমস্যটা কী! আসার পূর্বে যথারীতি ফ্যাক্স চালাচালি হয়েছে। কোথায় উঠবেন তাও ঠিক করা হয়েছে। জামিল আহমেদ চাচ্ছিলেন সোনারগাঁয়ে রিজার্ভেশন করার জন্য। এই পাঁচতারা হোটেলটার ব্যাপারে আকুতাগাওয়ার প্রবল আপত্তি জানিয়েছিলেন। ক-দিন আগে হোটেলের লোকজনরা নিজেরাই ভাংচুর করেছে। এই হোটেল তাকে কতটুকু নিরাপত্তা দিতে পারবে এতে ঘোর সন্দেহ আছে। যদিও এ হোটেলে ওঁর দেশের স্বার্থ আছে তবু যে কান্ড কদিন আগে হয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত আই টি টির শেরাটনকে বেছে নেয়া হল।


আকুতাগাওয়া লজ্জিত হয়ে বললেন, ‘কিছু মনে করো না বড় ক্লান্ত লাগছে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হোটেলে যেতে চাচ্ছি।’
কথাটা বলেই তিনি ভারি কুন্ঠিত হলেন। ভদ্রলোক আহমেদ এমন হাঁ করে তাকিয়ে আছে কেন- তিনি কী কোনো বাড়াবাড়ি করে ফেলেছেন? তার আচরণে কী কোনো অসৌজন্য আচরণ প্রকাশ পেয়েছে? নাকি এই ভদ্রলোক তার ভাঙা ভাঙা ইংরাজি বুঝতে পারছেন না। অবশ্য তিনি প্রথমেই বলে রেখেছিলেন তাঁর ইংরাজি বুঝতে খানিকটা জটিলতা দেখা দিতে পারে, পাশাপাশি এ অনুরোধও করেছিলেন দ্রুত কথা না বলার জন্য। এই কথাটাই গুছিয়ে আবারও বললেন।

জামিল আহমেদ ইতস্তত করে বললেন, ‘ইয়ে, ব্যাপারটা হলো গিয়ে তোমার-।’
‘তুমি প্লিজ আমার নাম ধরে বলো বন্ধুরা আমাকে আকু বলে, প্লিজ আহমেদ। আর তোমার নামটা কি আমি ঠিকভাবে বলতে পারছি?’
জামিল আহমেদের মধ্যে এতক্ষণে সহজভাব ফিরে এসেছে। ‘ধন্যবাদ আকু, ভালই বলেছ। বিদেশিরা আমাদের নাম সঠিকভাবে বলে না সম্ভবত ইচ্ছা করেই।’

আকুতাগাওয়া লাজুক হাসলেন, তার ঝুলিতে আরও কটা চমক আছে। জাপানে জামিল আহমেদের যেসব ফ্যাক্স পেতেন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তেন, নাম-ধাম, এমন কি ফ্যাক্টরী ম্যানেজারের নাম পর্যন্ত। যে দেশের সঙ্গে ব্যবসা করবেন সে দেশ, মানুষ, এদের সম্বদ্ধে না জানলে চলবে কেন?
‘তোমাকেও ধন্যবাদ আহমেদ, আকু উচ্চারণটাও তোমার চমত্কার হয়েছে।’

জামিল আহমেদের নাম ভুলে যাওয়ার সমস্যা আছে কিন্তু এ নাম ভুল হওয়ার সম্ভাবনা নেই। চুলের পেছনে ঝুঁটি বাধে এমন একজনের নাম প্রায়শ খবরের কাগজে চোখে পরে অবশ্য ওই লোকের নাম আকু না আক্কু। একটা বাড়তি ক আছে।
‘ওয়েল, আহমেদ, চলো যাওয়া যাক।’
জামিল আহমেদ অসম্ভব বিব্রত গলায় বললেন, ‘আকু, একটা সমস্যা হয়ে গেছে, বিরাট সমস্যা। আমাদের দেশে এখন অসহযোগ আন্দোলন চলছে, অনির্দিষ্টকালের জন্য।’
আকুতাগাওয়া নির্বিকারভঙ্গিতে কাধ ঝাঁকালেন, ‘এত টেনস হচ্ছ কেন! ব্যাপারটা কি একটু বুঝিয়ে বলো তো।’
'সমগ্রদেশে সমস্ত ধরনের কাজকর্ম বন্ধ কিছুই চলবে না। তুমি নিশ্চই লক্ষ করোনি টার্মিনাল ফাঁকা একটা গাড়িও নেই।'
আকুতাগাওয়ার মুখ ঝুলে পড়ল, ‘তুমি এসব কী প্রলাপ বকছ। সব কিছু বন্ধ?’
জামিল আহমেদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘হ্যাঁ, কেবল মাত্র আকাশ পথ খোলা আছে; এটা খোলা থাকা না-থাকা সমান। কারণ আকাশপথ ব্যবহার করতে হলে রাজপথ ব্যবহার করতে হবে।'
‘হোটেল এখান থেকে কত দূর?’
‘হেঁটে-হেঁটে গেলে বহু দূর।’
‘আশে-পাশে কোনো হোটেল নেই,’ আকুতাগাওয়ার মুখ ক্রমশ অন্ধকার হচ্ছে।
‘দুঃখিত, আমি খোঁজ নিয়ে এসেছি, গেষ্ট উপচে পড়ছে, কোনো সম্ভাবনাই নেই।’
‘তোমার গাড়ি থাকলে ফোন করিয়ে আনিয়ে নাও।’
‘আকু, পরিস্থিতি বুঝতে পারছ না, কোন অবস্থাতেই গাড়ি এয়ারপোর্ট পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে না, অলৌকিক কোন উপায়ে যদি পৌঁছেও আমরা গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে পারব না। গাড়ি ভেঙেচুরে আগুন তো ধরাবেই আমাদেরকেও প্রাণে মেরে ফেলবে।’

আকুতাগাওয়ার থমথমে মুখ। এবার ক্ষুব্ধ গলায় বললেন, ‘এবার তুমি বলো কোন বুদ্ধিতে এমন নরকে আমাকে আসতে বললে। বলো, চুপ করে থেকো না।’
জামিল আহমেদ ম্লান গলায় বললেন, ‘আমার বক্তব্য শুনে যা ইচ্ছা তা বলো। তোমাকে আমি যখন আসতে ফ্যাক্স করেছিলাম তখন অবস্থা এমন ছিল না। সব স্বাভাবিক হয়ে যাবে মনে করা হচ্ছিল। যখন নিশ্চিত হলাম অসংখ্যবার তোমাকে ফ্যা করার চেষ্টা করেছি, ফোন করেছি তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারিনি। অবশেষে তোমার এমব্যাসীকে অনুরোধ করেছি তোমার আসা পিছিয়ে দেয়ার জন্য। আমার দুর্ভাগ্য কোনভাবেই তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারিনি।’

আকুতাগাওয়ার চুল ছিড়তে ইচ্ছা করছে। এই কদিন ছুটি কাটাতে গ্রামের বাড়ি চলে গিয়েছিলেন। ওখানে মাত্র দুদিন ছিলেন, কী শখ চাপল, ফুজি মাউন্টেন দেখতে চলে গেলেন। এরপর ডমেষ্টিক ফ্লাইট ধরে নারিতা, নারিতা থেকে সরাসরি এখানে। ভারি লজ্জিত হলেন, ছি-ছি, কী লজ্জা-কী লজ্জা!
লজ্জিত দু-হাতে জামিল আহমেদকে ধরে বললেন, ‘তোমার প্রিয় মানুষের দোহাই আমাকে ক্ষমা করো, ভুলটা আমারই। তুমি এলে কিভাবে?’
‘হেঁটে-হেঁটে কিছুদুর তারপর রিকশায়,’ জামিল আহমেদ ভাবছিলেন অসহযোগ আন্দোলনে রিকশাকে এবার ছাড় দেয়া হয়েছে এটাই ভরসা। যে রিকশা নিয়ে এয়ারপোর্ট এসেছিলেন মোটা টাকার লোভ দেখিয়েও ওই লোককে রাখা সম্ভব হয়নি।

আকুতাগাওয়া এখন বুঝতে পারছেন কেন বোয়িংটা ছিল ফাঁকা-ফাঁকা। হাত-পা ছড়িয়ে শুতে ইচ্ছা করছিল বলে এয়ার হোস্টেসকে জিজ্ঞেস করেছিলেন আসন পরিবর্তন করা যাবে কিনা? এয়ার হোস্টেস মুচকি হেসে বলেছিলঃ যেখানে তোমার পছন্দ হয়, ভাল করে বিশ্রাম নাও আমি নিশ্চিত আগামী সময়টা তোমার জন্য হবে কষ্টকর।

প্রচন্ড মাথাব্যথা হচ্ছিল বলে কথা বাড়াননি। নয়তো তখই জেনে যেতেন, অবশ্য আগাম জেনেও অবস্থার খুব একটা হেরফের হত না।

জামিল আহমেদ ছুটাছুটি করায় গা থেকে দরদর করে ঘাম ঝরছে। কিচ্ছু নেই, একটা রিকশাও না! রাস্তার পাশে ঠেলাগাড়ি জাতীয় একটা ভ্যানে গাছের ছায়ায় একজন মহা আরামে ঘুমাচ্ছে।

জামিল আহমেদ নিচু গলায় ডাকলেন, ‘এই-এই।’
কাজ হচ্ছে না দেখে গা ধরে ঝাঁকুনি দিলেন। লোকটা ধড়মড় করে উঠে বসল। ট্রাফিক পুলিশ না দেখে বিকট হাই তুলে উপুড় হল।

জামিল আহমেদ নাছোড়বান্দার মতো বললেন, ‘এই-এই।’
‘এই-এই, হেই মিয়া বিষয়ডা কী।
‘যাবে?’
‘জ্বে না, এইবার যান গিয়া ঘুমাইতে দেন।'
‘চলো না, ভাল টাকা পাবে।’
লোকটা এবার উঠে বসল, কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, ‘এই মিয়া হুনেন নাই, একবার যে কইলাম যামু না আবার টেকার গরম দেখায়। আপনার টেকায় আমি হাগি।’

জামিল আহমেদ হতভম্ব। দেশের অস্থির-অসুস্থ পরিবেশ সবাইকে কেমন বদলে দিচ্ছে। মাথা গরম করলে হবে না। মুহুর্তে ভোল পাল্টে ফেললেন, ‘ভাই, সঙ্গে বিদেশি মেহমান আছে, বিপদে পড়েছি, একটু কষ্ট করে পৌছে দাও না।’
‘কোন জায়গায় যাইবেন?’
হোটেলের নাম বললে চিনতে পারল না, লোকেশন বলা মাত্রই হাত উঠিয়ে থামিয়ে দিল, ‘হ-হ চিনছি, ওই বড় বড় ঢুলাওয়ালা হঢলডা তো। তয় হেইডা তো বিআইবি রোড যাইতে দিব না।’
জামিল আহমেদ চকচকে চোখে বললেন, ‘আচ্ছা সে দেখা যাবে।’
‘ওরি আল্লা, ম্যালা দূর পাঁচশো টেকা লাগব। দরদাম নাই। এইডা মাছ বাজার না।’
জামিল আহমেদ থ মেরে গেলেন। এ বলে কী, পাঁচশো টাকা!

সমস্যা দেখা দিল বসা নিয়ে। আকুতাগাওয়া উবু হয়ে বসেছিল বলে কেমন হাস্যকর দেখাচ্ছিল। জামিল আহমেদ দেখিয়ে দিলেন পা ঝুলিয়ে কেমন করে ভ্যানে বসতে হয়।
‘সরি, আকু, তোমার কষ্ট হচ্ছে, রিকশা পেলে আরাম করে বসতে পারতে। ও দুঃখিত, তুমি তো আর আমাদের রিকশা দেখো নি।
‘দেখি নি তবে এ সম্বন্ধে পত্রপত্রিকায় ছবি ছাপা হয়েছিল প্রচুর লেখালেখি হয়েছিল। আমাদের জাপানে ১৯৯৪ সালে ‘ফুফুওকা’ শহরে Rickshaw Painting- Traffic Art in Bangladesh আর্ট শো হওয়ার কথা ছিল।

ঠেলাওয়ালা ঝড়ের গতিতে দৌড়াতে দৌড়াতে গলা ছেড়ে গান ধরেছে। জামিল সাহেবের গা কাঁপছে, রাগ হচ্ছে, ভয়াবহ রাগ। রাগ সামলাতে বেগ পেতে হচ্ছে। এখন পর্যন্ত যত বদ দেখেছেন এদের মধ্যে এই ঠেলাওয়ালা হারামজাদা হচ্ছে বদের হাড্ডি। হারামজাদা ওদের নিয়ে রসিকতা করছে।
ঘুরে ফিরে একটাই গান গাইছে ‘ফান্দে পরিয়া বগা কান্দে রে-এ-এ।’

রাস্তায় যে দু-চারজনকে দেখা যাচ্ছে এরা দাঁত বের করে হাসছে। জামিল আহমেদ মনে মনে বললেন, ‘ধরণী ····’ ।

আকুতাগাওয়া আনন্দিত। গানের তালে তালে মাথা দোলাচ্ছেন। এক পর্যায়ে বললেন, ‘আহমেদ, ভাষা না বুঝলেও ওর গান শুনে আমি মুগ্ধ, তুমি কি গানের কথাগুলো ইংরেজীতে অনুবাদ করতে পারো?’ জামিল আহমদে উদাস হলে বললেন, ‘এই আকাশ বাতাস দেখে আমাদের ড্রাইভার সাহেবের মাথা আউলা-ঝাউলা হয়ে গেছে। এরই বর্ণনা এ গানের মূল ভাবার্থ। আমি সম্ভবত তোমাকে ঠিক বোঝাতে পারলাম না। আসলে অনুবাদ কাজটা খুব জটিল কিনা।’

আকুতাগাওয়া খানিকক্ষণ ইতস্তত করে বললেন, ‘আহমেদ, প্রথমেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি ব্যাপারটা তোমাদের নেহায়েত ব্যক্তিগত তাই তোমার ইচ্ছা না করলে এই উত্তর দিয়ো না। এই যে তোমরা দেশ অচল করে দিচ্ছ, এটা কেন?’
‘সরকার দেশ ঠিকভাবে চালাতে পারছে না এই বিষয়ে বিরোধীদলের প্রবল আপত্তি আছে, এর ফলাফল এই।’
‘দেখো, হুজ রাইট হুজ রং আ ডোন্ট নো, আমার ভাসাভাসা জ্ঞান নিয়ে কোনও মন্তব্যও করতে চাচ্ছি না। কিন্তু এভাবে গোটা দেশ অচল থাকলে ক-বছরের জন্য পিছিয়ে যাচ্ছ সেটা নিশ্চয়ই জানো? জাপানের চেয়েও ধনী, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশ লুক্সেমবার্গ যাদের মাথাপিছু আয় প্রায় চল্লিশ হাজার ডলার, ওরাও তো এভাবে একদিনের জন্যও দেশ অচল করে দেয়ার কথা কল্পনাও করবে না। তেমাদের মাথাপিছু আয় কত এখন?’
জামিল আহমেদ ক্ষীণ গলায় বললেন ‘আমি ঠিক জানি না। কিন্তু এক পর্যায়ে হরতাল না করে উপায় থাকে না। ক্ষমতাবান কেউ যখন কোন কথাই শুনবে না তখন তো জনগণের শেষ অস্ত্র হরতাল।’
‘প্লিজ আহমেদ, দয়া করে ভুল তথ্য দেবে না। আজই প্রথম এ দেশে হরতাল হচ্ছে না, পূর্বেও বহুবার হয়েছে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে। আমাদের পত্র-পত্রিকায়ও কিছু লেখালেখি হয়েছে। তুমি বললে জনগনের ইচ্ছায় এ হরতাল, এই দেশের বেশিরভাগ জনগণ কি এটা চাচ্ছে? তোমরা মাঝে মধ্যে সমীক্ষা করো হরতালের পক্ষে-বিপক্ষে । সেখানে তো হরতালের বিপক্ষের পাল্লাই ভারী। আর যে-সব সমীক্ষা করা হয় এদের মধ্যে কারা থাকে? একজন কৃষক, একজন মজুর, নিম্ন আয়ের এইসব মানুষ কি চাচ্ছে হরতাল হোক? এরাই তো এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ, নাকি ভুল বললাম? আহমেদ তুমিই কি চাও?
জামিল আহমেদ মুখ নিচু করে বললেন, ‘না।’

‘আহমেদ একটা অন্যায় হলে প্রতিবাদ হবে অবশ্যই কিন্তু প্রতিবাদের ভাষা কি এই-ই! একটা ক্রাইমকে থামানোর জন্য ক্ষমার অযোগ্য আরেকটা ক্রাইম করা কি সমর্থনযোগ্য? যখন খুশি, যে- কারোর একটা মুখের কথায় কোটি-কোটি শ্রম ঘন্টা নষ্ট করবে আমরা এটা স্বপ্নেও ভাবি না। সাম্প্রতিক একটা ঘটনা তুমি নিশ্চয়ই পড়েছ, ফ্রান্সে পরমাণু বিরোধী কর্মীরা পরমাণু চুল্লি সুপার ফিনিক্স বন্ধের দাবিতে চুল্লিটির বাইরে প্রায় দশ হাজার জোড়া পুরনো জুতা জড়ো করে রাখে। প্রতি জোড়া জুতার ভেতর একটি করে কাগজ। ওই কাগজে লেখা সুপার ফিনিক্স বন্ধ কর। এ নিয়ে সমগ্র বিশ্বে তোলপাড় পড়ে গেছে। যুগোশ্লাভিয়া একবার কি হল শোনো, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা প্রতিবাদ জানালেন এভাবে এঁরা ওইদিন পড়াবেন ঠিকই কিন্তু একদিনের বেতন নেবেন না, এ নিয়ে হই হই পড়ে গেল।’
‘আকু, আমি বিস্মিত হচ্ছি এটা ভেবে তুমি কোন যুক্তিতে ওইসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনা করছ?’
‘কেন তোমরাই তো বলো তোমরা পৃথিবীর সেরা জাতি। তোমাদের রয়েছে মহান মুক্তিযুদ্ধের অতুলনীয় ইতিহাস। ওয়েল, তোমরা খোঁজ হরতালের বিকল্প তোমাদের দেশের সেরা সন্তানরা কোথায়? তোমাদের দেশেও তো অসম্ভব প্রতিভাবান সন্তান আছে যারা বিশ্বকে চমকে দিয়েছেন, এই মুহুর্তে আমার মনে পড়ছে একজনকে মি. ইউনুস, ওঁরা আজ কোথায়?’

জামিল আহমেদ চুপ করে রইলেন। কথা বাড়াতে ইচ্ছা করছে না। প্রখর রৌদ্র চামড়া পুড়িয়ে দেবে মনে হচ্ছে। এই জাপানি ভদ্রলোক কি উপায়ে নির্বিকার আছেন এর রহস্য বুঝতে পারছেন না।
এবার আকুতাগাওয়া বললেন, ‘তুমি সম্ভবত আমার কথায় আহত হয়েছ, এ জন্য ক্ষমা চাচ্ছি। কী আশ্চর্য, আমার ঘড়ির সময় এখন ছটা, তোমার ঘড়িতে এখন সময় কত?’
‘তিনটা।’
জামিল আহমেদ এইবার ঠেলাভ্যান থামাতে বললেন। ঠেলাওয়ালা অবাক হয়ে বলল, ‘হোডল তো এইহানো না।’
‘চুপ থাক ব্যাটা,’ রাগ চেপে রাখতে পারছেন না। ভাড়া মিটিয়ে বললেন,‘সরি, আকু, কিছু দূর হাঁটতে হবে।’
‘কেন, এটা কি শেরাটন পর্যন্ত যাবে না?’
‘দুঃখিত, না, এটা ভি আই পি রোড, ধীরগতির যানবাহন চলা নিষেধ।’

এই কপটতা জামিল আহমেদ ইচ্ছা করেই করলেন। এমনিতেই সমস্তটা রাস্তায় নিজেকে কেমন বাঁদর-বাঁদর মনে হচ্ছিল। সবই কেমন হাঁ করে তাকাচ্ছিল। একটা ঠেলাভ্যান শেরাটনে পার্ক করল এর চেয়ে হাস্যকর আর কী হতে পারে!

ভাগ্য ভাল রিকশা পেয়ে গেলেন। টিমেতালে রিকশা এগুচ্ছে।
‘আহমেদ তুমি কি দয়া করে এই ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করবে ইনি আসলেই হরতাল চাচ্ছেন কি না?’ এই ভদ্রলোক মানে রিকশাওয়ালা। জামিল আহমেদ এইবার অসন্তুষ্ট হলেন, এই জাপানি ভদ্রলোকের এই দেশ নিয়ে এত কৌতুহল কেন? তিনি মুখের ভাব অপরিবর্তিত রেখে জিজ্ঞেস করলেন, কি-ও, কি বুঝতেছেন দেশের অবস্থা এই হরতাল···’
রিকশাওয়ালা মুখ না ফিরিয়েই বলল, ‘আমারে কন?’
‘জ্বী’ ।
‘দুই টেকার আকিজ বিড়ি অখন হইল গিয়া দশ টেকা, কি বুঝবার পারলেন? এইবার আল্লার কুদরতে হরতালের সময় রিকশা চালাইবার পারতাছি অন্যবার তো রিকশা ভাইঙা ফালাইত। হেছা কই, এইবার হরতালে আল্লার রহমতে রুজি রুজগার ভালা খুব ভালা, তয় মনে শান্তি নাই, জীবনের কুনু গিরান্টি নাই এই দেখছেন বাইচা আছি এই দেখছেন নাই, মইরা গেছি। অহন জেবনডা হইল কচু পাতার পানি। চামার কি করে জানেননি যতজন মরা গরু দেখব ততজনের ভাগ। এই দেশডা হইল গিয়া আপনের মরা গরু।’
বলতে গিয়ে জামিল আহমেদের চোখের পাতা কেঁপে গেল, ‘আকু, এ বলছে গণতন্ত্রের জন্য এইসব হরতাল-টরতালের প্রয়োজন আছে।’

আকুতাগাওয়া তাঁর পাসপোর্টের সঙ্গে ক্রেডিট কার্ড দিয়ে রিসেপশনিষ্টকে বললেন, ‘আমার যাবতীয় বিল এই ক্রেডিট কার্ডে চার্জ হবে। আশা করি ভিসা ক্রেডিট কার্ডে আপনাদের সমস্যা হবে না?’

জামিল আহমেদের শত-অনুরোধেও কান দিলেন না, বিনীত ভাবে তার অনুরোধ ফিরিয়ে দিলেন। জামিল আহমেদ ক্রমাগত বোঝাবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলেনঃ তুমি আমার গেষ্ট, তোমার সেবা করার সুযোগ দিলে আমার আনন্দের শেষ থাকবে না। এ জাতীয় বাক্য আকুতাগাওয়াকে বিন্দুমাত্র টলাতে পারল না।

জামিল আহমেদের একগাদা টাকা বেঁচে যাচ্ছে তাতে আনন্দিত হওয়ার কথা কিন্তু তাকে ভারি হতাশ দেখাল। ব্যবসায়ীদের মধ্যে অলিখিত একটা নিয়ম প্রচলিত আছে যাকে আমন্ত্রণ করে নিয়ে আসা হবে তাঁর যাবতীয় ব্যয়ভার আমন্ত্রণকারী বহন করবে। জামিল আহমেদ পরবর্তীতে জাপান গেলে তাঁরও সমস্ত খরচাপাতি বহন করতেন আকুতাগাওয়া। জামিল আহমেদের মনে হল এই জাপানি ভদ্রলোক আগ বাড়িয়ে ক্রেডিট কার্ড দিয়ে তাঁকে একটা ইঙ্গিত দেয়ার চেষ্ট করছেন।
হা ইশ্বর, এ ডিলটার উপর তাঁর ভবিষ্যত নির্ভর করছে। দয়া করো ইশ্বর, দয়া করো। গার্মেন্টস শ্রমিকদের ছাটাই করতে হবে অন্তত এদের কথা ভেবে দয়া করো।

আকুতাগাওয়া এরি মধ্যে কোথায় কোথায় যেন ফোন করছে।
চেক-ইন পর্ব সমাপ্ত হলে আকুতাগাওয়া গাঢ় গলায় বললেন, ‘আহমেদ, আমার প্রিয় বন্ধু তোমার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাবার ভাষা আমার নেই। তুমি যেভাবে কষ্ট করে আমাকে এয়ারপোর্ট থেকে নিয়ে এসেছ তোমার এ আতিথেয়তার কথা আমি ভুলব না। ওয়েল, এমব্যাসীকে ফোন করেছি হরতাল চলাকালীন এরা আমাকে হোটেল থেকে বের হতে নিষেধ করেছে। এয়ারপোর্ট থেকে ওদের ফোন করলে ওরা নাকি কোনও একটা ব্যবস্থা করত। যাই হোক হরতাল শেষ হলে তুমি এখানে যোগাযোগ কোরো। প্লিজ আহমেদ, প্রাণের ঝুকি নিয়ে হরতালের মধ্যে তুমি কিন্তু আসবে না এমন হলে আমি কিন্তু খুব রাগ করব।’

বিদেশিরা যে কাজ সচরাচর করে না আকুতাগাওয়া তাই করলেন। জামিল আহমেদকে গভীর আবেগে জড়িয়ে ধরে বিদায় দিলেন, হোটেলের টেরেস পর্যন্ত এগিয়ে এলেন। তাঁকে ভারি বিমর্ষ দেখাচ্ছিল। বারবার জানতে চাইছিলেন, জামিল আহমেদ ফিরতে পারবেন তো বাসায় ফিরতে কোনো সমস্যা হবে না তো?

.................
আজ ২৬ শে মার্চ। স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী আজ। চারদিকে উত্সব উত্সব ভাব। জামিল আহমেদেরও দু-চোখে আনন্দ উপচে পড়ছে। ৯ মার্চ থেকে যে টানা অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়েছিল আজ এবং আগামীকাল দু-দিনের জন্য শিথিল করা হয়েছে। এই ক-দিন তাঁর সমস্ত ফ্যাক্টরীতে তালা ঝুলেছে। মেশিনের সুতা থেকে এক ইঞ্চি সুতাও খরচ হয় নি, একটা কাপড়ও তৈরি হয়নি।

জামিল আহমেদ এই ক-দিন বাসা থেকে বের হননি, সম্পূর্ণ বন্দি জীবন যাপন করেছেন। কিছুটা নিরাপত্তার অভাব, কিছুটা স্বেচ্ছায়। এক ধরনের অভিমানও কার উপর তিনি জানেন না। সন্ধ্যায় অবশ্য নিয়মিত তার ফ্যাক্টরির ম্যানেজাররা আসতেন তারা গোল হয়ে বি,বি,সি শুনতেন।
এই দেশ যখন ইংরেজদের কাছে পরাধীন ছিল তখন ইংরেজদের সব কথাই অবিশ্বাসের চোখে দেখা হত আজ এদের কথাই বেদবাক্য মনে হয়। একটা স্বাধীন দেশের নাগরিকেরকে নির্ভর করতে হয় অন্য দেশের তথ্য মাধ্যমের উপর। এ যে কি নিদারুন অপমান।

প্রতিদিন তারা তীব্র উৎকন্ঠায় খবর শুনতেন এই বুঝি বিবিসি থেকে বলা হবে আগামীকাল থেকে অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করা হল। আগামীকাল থেকে তাঁরা পূর্ণ উদ্যমে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েবেন। কিন্তু সে আশায় গুড়ে বালি।

একদিন তার এক ব্যবসায়ী বন্ধুকে অসম্ভব মন খারাপ করে ফোন করেছিলেনঃ রশিদ, আমি সহ্য করতে পারছি না। আমার লোকসান না-হয় মেনে নিলাম, কিন্তু হাজার হাজার শ্রমিক বেতন পাচ্ছে না, এদের যে কিভাবে দিন চলছে?
রশিদ সাহেব বলেছিলেন: তোর ইচ্ছা হলে এদের বেতন দিলেই তো পারিস।
কোত্থেকে দিব বল, হাজার হাজার পিস তৈরি কাপড় বিক্রির অপেক্ষায় পড়ে আছে। ভেবেছিলাম বিক্রি হলে এদের বোনাস দেব জাপানি একজন বায়ার এসে শেরাটনে বসে আছে। কিছুই হচ্ছে না।
রশিদ হাসতে হাসতে বলেছিলেন: তোর শ্রমিক মানে তো মেয়ে?
তো!
আরে, এরা বসে আছে নাকি দেহ ব্যবসায় নেমে পড়েছে না!
জামিল আহমেদ প্রচন্ড ক্রোধে থরথর করে কাঁপছিলেন: রশিদ, তুই যদি কুত্তার বাচ্চা না হোস আমার সঙ্গে কোন দিন কথা বলবি না।
টেলিফোন আছড়ে ফেলেছিলেন। তাতেও স্বস্তি পাননি। ফোনের প্লাগ খুলে ফেলেছিলেন।

জামিল আহমেদ নিজেই গাড়ি চালাচ্ছেন। পাথ ফাইন্ডারটা ইচ্ছা করেই বের করেননি। অসহযোগ আন্দোলন শিথিল করা হয়েছে ঠিকই কিন্তু ঝামেলা বাঁধতে কতক্ষণ। গাড়ি ভেঙে ফেলা আগুন লাগিয়ে দেয়া একটা নিয়ম হয়ে দাড়িয়েছে। একটা গন্ডগোল হলেই সরকারী-বেসরকারী সম্পদ নষ্ট করা এখনকার নষ্ট রাজীতির ফসল। দেশের অস্থির অবস্থা সব কিছু এলোমেলো করে দিচ্ছে। অসংখ্য ফ্রাঙ্কেষ্টাইন তৈরি হচ্ছে। এখন চোখের সামনে একজন মানুষকে মরে যেতে দেখলে গা গুলায় না।
জনসমুদ্রের মাঝে ইচ্ছা করলেই একজন মানুষকে উলঙ্গ করে ফেলা যায়। সেই উলঙ্গ মানুষটার ছবি আবার ঘটা করে পত্রিকায় ছাপানো হয়। সেই মানুষটার অপরাধ এটুকুই ছিল হরতালের দিনে তিনি অফিস করতে যাচ্ছিলেন। জনগণ স্বতস্ফুর্ত হরতাল পালন করেছে এর নমুনা এই!
একটা সভ্য দেশের অসভ্য এমন কান্ডের জন্য মরে যেতে ইচ্ছা করে।

জামিল আহমেদের প্রচন্ড ঝাঁকুনিতে দম বন্ধ হয়ে এল। রিসেপশনে দাঁড়ানো লোকটা পাগলের মত কী সব বলছে। আকুতাগাওয়া প্রথম সুযোগেই বাংলাদেশ ত্যাগ করেছেন, তার জন্য মেসেজ ছেড়ে গেছেন। জামিল আহমেদ অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে অনেকক্ষণ ম্যানিলা এনভেলাপ নাড়াচাড়া করলেন খোলার কথা মনেই রইল না। এক সময় খাম ছিঁড়ে ফেললেন। গোটা গোটা অক্ষরে লেখা:
“প্রিয় বন্ধু আহমেদ,
তুমি আমাকে ক্ষমা করতে পারবে না তবুও ক্ষমা চাই তোমার সঙ্গে দেখা না করে, না জানিয়েই দেশে ফিরে যাচ্ছি। প্লিজ, চিঠি সবটা না পড়ে ফেলে দিয়ো না। আমরা বিদেশীরা চট করে মুগ্ধ হই না। তোমাকে আজ আমার খুশি করার প্রয়োজন নেই তাই বলি অল্প সময়ে তোমাকে আমার অসম্ভব পছন্দ হয়েছিল- কেন, এটা ঠিক আমি বলত পারব না। তুমি ঠিকভাবে বাসায় পৌছলে কিনা এ নিয়ে আমি খুব দুঃশ্চিন্তায় ছিলাম। তুমি হোটেল থেকে রওয়ানা হওয়ার একঘন্টা পর থেকে প্রতি দশ মিনিট অন্তর তোমার বাসায় ফোন করেছি। যেই মাত্র তুমি বললে জামিল আহমেদ স্পিকিং তখন আমি টেলিফোন রেখে দিলাম। কেন, বলছি। ওই অল্প সময়েই তুমি আমাকে যথেষ্ঠ মায়ায় জড়িয়ে ফেলেছিলে আমি মায়া বাড়াতে চাচ্ছিলাম না।

আহমেদ, আমরা ব্যবসায়ী, আবেগ এবং ব্যবসা গুলিয়ে ফেলা ঠিক না। যে জন্য তোমার সঙ্গে দেখা করে আসিনি, এমন করলে হয়তো আমি দুর্বল হয়ে যেতাম। এ দেশে আসার উদ্দেশ্য ব্যবসা সেখানে আবেগপ্রবণ হওয়ার স্থান কোথায় বলো? এক নাগাড়ে যে হরতাল চলছিল পনের দিন পর্যন্ত আমি বাংলাদেশেই ছিলাম। বাংলাদেশ ত্যাগ করার আগ মুহুর্ত পর্যন্ত হরতাল চলছিল। কখন এ দুঃসহ অবস্থার অবসান হবে কেউ জানে না।

এই পনের দিন মূলত আমি নিজেকে একজন প্রিজনার ছাড়া কিছুই ভাবতে পারিনি। অতিথিদের জন্য জুয়া খেলা ছাড়া হোটেলে সমস্ত সুবিধাই ছিল। তাতে কী। আমার সমস্ত জীবনে কখনোই এত শ্রমঘন্টা নষ্ট করিনি!
আহমেদ, বন্ধু আমার, জীবনটা একটা লম্বা দৌড় এখানে থমকে দাঁড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। পনের দিন কাজের মানুষ কোনো কাজ করবে না এ-ও কী সম্ভব! যেখানে প্রতিটি সেকেন্ড মূল্যবান সেখানে প্রায় তেরো লক্ষ সেকেন্ড একজন মানুষ ঝিম মেরে বসে থাকবে!

এটা লিখতে ভীষণ মন খারাপ হচ্ছে, আমি নিরুপায় আহমেদ, সব কিছু মিলিয়ে দেখলাম তোমার সঙ্গে ব্যবসা করা সম্ভব না। তোমাকে বলিনি, এ কপটতার জন্য ক্ষমা করো, বাংলাদেশে আসার আগে বাংলার ভাষার উপর একটা শর্ট কোর্স করেছিলাম। এই দেশের উপর যথাসম্ভব পড়াশুনা করেছি। তুমি একজন ব্যবসায়ী বলেই বুঝতে পারবে যে দেশে আমি মিলিয়ন-মিলিয়ন ইয়েন ইনভেষ্ট করব সেই দেশ সম্বন্ধে কিছুই জানব না তা তো হয় না।
তোমাদের দেশের অবস্থা খারাপ এটা জানতাম কিন্তু এমন শোচনীয় অবস্থা আমি কল্পনাও করতে পারিনি।

রিকশাওয়ালার সঙ্গে তোমার যখন বাংলায় কথা হচ্ছিল কিছু কিছু বুঝতে পারছিলাম যে তোমাদের অবস্থা কতটা শোচনীয়। তুমি কিন্তু আমাকে মিথ্যা বললে।
আমি অবাক হয়ে ভালছিলাম তোমরা দেশকে এত ভালবাসো। তুমি আমি আমরা এশীয়ান এ টান তো আছেই এছাড়াও তোমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার বাবা তোমাদের দেশে জাপানি দুতাবাসে কিছুদিন চাকরি করেছেন। ফিরে এসে বাবা তোমাদের কত গল্পই না করেছেন। সব মিলিয়ে তোমাদের দেশের প্রতি একটা টান অনুভব করতাম। তোমাদের দেশের প্রতি ভালবাসার ছোট্ট একটা নমুনা দেবো। জাপানের কোবো ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ইয়োশিতাকা মাসুদা তোমাদের জাতীয় সঙ্গীত অনুবাদ করেন। গোটা জাতীয় সঙ্গীত আমার মুখস্ত। তুমি নিশ্চয়ই বিশ্বাস করছ না? বেশ ভুলচুক হলে ক্ষমা করো-

‘ওয়াগা ওউগুন নো বেংগাল ইয়ো,
আই সরু ওয়াগা সোকোকু ।
আতাকামো ফুরুতো নো নেইরো নো ইয়োনা
সোরা ইয়া কুকি ইয়ো এইএননি।
আ ওয়াগা সোকোকু কিয়ো,
হারু নিওয়া, ম্যাংগো নো কাওরিগা ওতাশি ও
ইয়োরোকোবি দে ওয়াইল দো নি সাসেতে কুরেরু ।
আ নান তো ইউ কানগোকি দা।'
বিদায় বন্ধু, বিদায়।”

জামিল আহমেদের চশমার কাঁচ ঝাপসা হয়ে গেছে তিনি আর পড়তে পারছিলেন না। তিনি কাঁদতে কাঁদতে নিজের অজান্তেই গাইতে শুরু করলেন “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি।”
হোটেলের সিকিউরিটির লোকজন ছুটে এসেছে। লবিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা লোকজন হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে।

সিকিউরিটির একজন চেষ্টাকৃত কঠোর হয়ে বলল, আপনি এরকম করছেন কেন আপনার সমস্যাটা কী?’
জামিল আহমেদ ভেজা চোখে হা হা করে হাসতে হাসতে বললেন, ‘নাথিং, কেন তোমাদের হোটেলে কি জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া নিষেধ আছে?’

*কয়েদী: ২

কয়েদীর জনৈক সমালোচক নিজেই যখন লেখক!

জনৈক সমালোচক কয়েদী নিয়ে কঠিন একটা সমালোচনা করেছেন। অবশ্য এটাকে আমি সমালোচনা বলে স্বীকার করি না। এটা হচ্ছে একজন মানুষকে কলম নামের চাপাতি দিয়ে ঠান্ডা মাথায় কুপিয়ে আহত করা। 'কয়েদী' নামে একটা বই আছে আমার। গোটা বইটাই হরতাল নিয়ে।

আমাদের দেশে হরতালের মতো দানবকে নিয়ে অন্য কোন লেখক কেন বই লেখেননি এটা আমার কাছে অষ্টম আশ্চর্যের একটি। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর ধরে চলে আসা হরতালকে তাইলে এঁরা সমস্যা মনে করছেন না- প্রকারান্তরে সমর্থন দিচ্ছেন! ভাল ভাল- জয় হোক মহান কলমবাজদের!

তো, সমালোচক সাহেবের বক্তব্য হলো, এটাকে কেন উপন্যাস বলে প্রকাশক বিজ্ঞাপন দিলেন। বিজ্ঞাপনটা ছিল এই রকম: 'হরতাল নিয়ে এই দেশের একমাত্র উপন্যাস'!
বিজ্ঞাপনটা হরতাল নিয়ে এ দেশের একমাত্র বই এমনটা গেলে আর দোষ হতো না। এটা না হয় মেনে নেয়া গেল।

সমালোচক সাহেব লিখেছেন, "৪২ পাতার কয়েদী পড়তে ৪০ মিনিট লাগল। যারা দ্রুত পড়তে পারেন তাদের ৩০ মিনিট লাগবে।" বেশ যা হোক, এখন থেকে একটা বই পড়তে কতোটা সময় লাগবে, এটাও ট্যাগ হিসাবে সংযোজন করা আবশ্যক।

আসলে বইটা ৪২ পাতার না, ৪৮ পৃষ্ঠার। এ নিয়ে আমার তীব্র বেদনা আছে। প্রকাশক সাহেবের আপত্তি ছিল, অন্তত ৪ ফর্মা বা ৬৪ পৃষ্ঠার ম্যাটার দেয়ার জন্য। কিন্ত আমার উপায় ছিল না। সে অন্য কাহিনি।

একটি বই বের হওয়ার পেছনের বেদনার কথা পাঠক জানেন না- তাঁর জানার প্রয়োজনও নেই।
আমার স্পষ্ট মনে আছে, যে বছর এই বইটা বের হয়। গভীর রাতেই আমার মেয়েটা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল- কারণ, পরদিন ছিল হরতাল। আমি ১৫০ কিলোমিটার দূরে। সকালে আমাকে যখন ফোন করে এ খবরটা দেয়া হয়, আমি ফোনে আমার মেয়ের কান্না শুনতে পাচ্ছিলাম অথচ আমি যেতে পারছিলাম না। কী কষ্ট-কী কষ্ট! এ গ্রহের সবচেয়ে বড়ো কারাগারে আটকে পড়া একজন বাবা-কয়েদী! এর নাম নাকি গণতন্ত্র!
তো, পরদিন যাওয়া ব্যতীত আমার কোন উপায় ছিল না। আমার মেয়ে হাসপাতালে আর আমি প্রকাশকের এখানে বসে কয়েদী বইটা প্রুফ দেখছি- চোখের জলে ভাসতে ভাসতে। ৬৪ পৃষ্টা লেখব কি, প্রুফ দেখেই শেষ করতে পারিনা এমন অবস্থা। গোপন ইচ্ছা ছিল, পরবর্তী সংস্করণে আরও কিছু পৃষ্ঠা যোগ করে দেব কিন্তু আমাদের মতো অগাবগা লেখকদের তো আর আবার প্রথম সংস্করণই কখনও শেষ হয় না!

সমালোচক সাহেব আলী মাহমেদ নাম নিয়ে তার আপত্তি বোঝাতে গিয়ে শিশ্ন শব্দটা ব্যবহার করেছেন। আমি সমালোচক সাহেবের লেখার ধাঁচের সঙ্গে পরিচিত- খেয়াল করেছি, গদ্য হোক আর পদ্য, প্রায় লেখায় শিশ্ন শব্দটা না থাকলে যেন লজ্জায় ওনার মাথা কাটা যায়। আমার কাছে মনে হয় এমন, কেউ যেন অনবরত বকেই যাচ্ছে, জানিস, আমার না একটা ইয়ে আছে। জানিস আমার না একটা। ওরে, তোরা জানিস আমার…।
ওনার মূল বক্তব্য হচ্ছে, কয়েদীর নামের বইটা একটা যাচ্ছেতাই । বেশ, নিরানন্দ ভঙ্গিতে না হয় মেনে নিলাম। একজনের লেখা সবার ভাল লাগতে হবে এমন মাথার দিব্যি কে দিয়েছে!

কিন্ত, টুইস্ট হচ্ছে এই, তিনি শেষে বলেন, "আমি যদি এই বইটা লিখতাম তাহলে চরিত্রগুলোর একটার সঙ্গে অন্যটার..." (এরপর তার কেরামতির বিস্তারিত কাহিনী, লম্বা ফিরিস্তি)। মুশকিলটা হয়েছে এখানেই, গ্যালারীর দর্শক যখন খেলতে নেমে পড়ার জন্য লাফিয়ে পড়েন তাইলে খেলা দেখবে কে?

ওঁকে কে বোঝাবে, এটা একটা নতুন ধরনের কাজ করার চেষ্টা। বাপের সঙ্গে চাচার সম্পর্ক, চাচার সঙ্গে নানার এইটা চাচ্ছিলাম না। বইটায় তথাকথিত কোন নায়ক নেই। এই বইটায় একটা চরিত্রের সঙ্গে অন্য একটা চরিত্রের কোন সংযোগ না থাকার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করা হয়েছিল। যেন একটা কারাগারের বিভিন্ন সেল। একটা সেলের কয়েদীর সঙ্গে অন্য কয়েদীর কোন যোগ নাই, একেকটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপ! কাছ থেকে কিছুই বোঝা যাবে না কিন্ত দূর থেকে তাকালে ক্রমশ গোটা কারাগারের একটা অবয়ব ফুটে উঠবে।

মানুষ চেনার ইশকুল

ভাবছি...।
আবার ইশকুলে ভর্তি হবো। মানুষদের চেনার জন্য পড়ায় যে ইশকুলে- প্রথম বেঞ্চিতে গ্যাট হয়ে বসে থাকব, হররোজ। ফুল কোর্স কমপ্লিট না করে ছাড়াছাড়ি নাই।
নইলে যে বড্ডো সমস্যা হয়ে যাচ্ছে!

বিচিত্রসব মানুষদের কতটুকুই বা আমরা চিনি? প্রকৃতির কাছ থেকে প্রকৃতিরসন্তানদের চেনার কথা- প্রকৃতি বেচারা নিজেই আছে বড়ো বেকায়দায়। বুড়া হয়ে গেছে প্রকৃতি, তাই তার সন্তানদের এখন দবদবার শেষ নাই। বেয়াদব সন্তানেরা তার জন্মদাতাকেও মানতে গররাজী- নিজেদের শেকড় উপড়ে ফেলে জাঁক করে বলছে: শেকড়, য়্যু মীন লেজ- সে তো কবেই খসে পড়েছে!

বেশ-বেশ!


একটা ওয়েবসাইটে প্রায় ১ বছর লেখালেখি করেছি। ওখানে অনেকের সঙ্গে হৃদ্যতা হয়েছে, ঝগড়া হয়েছে কিন্ত আমার ওই সময়টা ছিল সোনালি।
ওখানের একজন ব্লগারের অনেক দিক আমি ভারী অপছন্দ করতাম কিন্ত তার কিছু দিক আমাকে খুব টানত। দেশে আসলে তার সঙ্গে আমার দেখা করার খুব ইচ্ছা হল। একদিন দেখা হলো- আমার ইচ্ছাটাই ছিল প্রবল।
অ আল্লা, আমি পুরাপুরি হতভম্ব। যে ছেলেটা অবলীলায় কঠিন কঠিন সব কথা বলে যায়- এমন লাজুক, চোখ তুলে তাকাতেই পারে না। আমার আরও ২জন সুহৃদসহ, আমরা দুপুরে একসঙ্গে ভাত খেলাম। খুব মাস্তি(!) হলো। ওই সময়টা কেটেছিল আমার গভীর আনন্দে। ওই মানুষটাকে আমি আমার একটা বই গিফট করলাম।

বেশ কিছুদিন পর আমার এক সুহৃদ ফোন করলেন, আচ্ছা, আপনার কি অমুকের সঙ্গে কোন সমস্যা হয়েছে। (অমুক মানে ওই মানুষটা-সুবিধার জন্য অমুককে আমরা এক্স নামে ধরি)।
আমি আকাশ থেকে পড়লাম, কই না তো!আমার সুহৃদ বললেন, কিন্ত এক্স তো আপনার ওই বই নিয়ে কঠিন সমালোচনা লিখেছে।এবার আমি আটকে রাখা শ্বাস ছাড়লাম, ওহ, এই কথা। তা পাঠক হিসাবে এক্স এটা লিখলে দোষ কি- একজনের লেখা সবার ভালো লাগবে এটা কেমনে হয়!আমার সুহৃদ থেমে থেমে বললেন, সেটা কথা না। এক্স আপনাকে নিয়ে কুৎসিতসব কথা লিখেছে। এবার তিনি হাহাকার করা গলায় বললেন, প্লিজ, ওটা পড়বেন না, আপনার মন খারাপ হবে।

আমাকে নিয়ে লেখাটা আমি পড়লাম। না পড়লেই সম্ভবত ভালো হতো- অন্তত মানুষের গভীর অন্ধকার দিক আমাকে তাড়া করত না। আমি গভীর ভাবনায় তলিয়ে গেলাম। আমি ভেবে আকুল হচ্ছি, একটা মানুষ কেন এমন করবে? আমার লেখা ভালো লাগেনি, বেশ- এটা নিয়ে লিখলে তো কোন সমস্যা নাই। আমাকে নিয়ে অহেতুক কুৎসিত কথা কেন লেখবে- কি লাভ, কার লাভ। এসব করে একজন মানুষ নিজের চোখে চোখ রাখে কি করে? এখনও আমার মস্তিষ্কে তার সঙ্গে কাটানো সেই সোনালি সন্ধ্যার স্মৃতি অম্লান। আমার মনে আছে, ওই সময় আমি একটু পরপর ঘড়ি দেখছিলাম- সময়টাকে আটকাতে পারছিলাম না…।

হায়রে রহস্যময় মানুষ!

মানুষ চেনার ইশকুল: ২

তীব্র সমালোচনায় যখন আমাকে কটু ভাষায় ব্যক্তিগত আক্রমণ করা হচ্ছিল, ওখানে একজন মন্তব্য করলেন, পড়লাম।

আমার বুকের অনেকখানি জায়গা নিমিষেই ফাঁকা হয়ে গেল। অন্য কেউ এই মন্তব্যটা করলে আমি এ নিয়ে মাথা ঘামাতামই না। কিন্ত এ আমার পছন্দের মানুষ। মানুষটা কি করে পারলো এমন একটা মন্তব্য করতে। আমার মনে হচ্ছিল এমনটা, কেউ আমাকে নগ্ন করছে আর আমার পছন্দের মানুষ বলছে, দেখলাম।

কেউ সীমাবদ্ধতার কারণে আমার পাশে এসে না দাঁড়াতে পারলে সরে গেলেই হয়- এতে আমার বেদনাহত হওয়ার কোন কারণ নাই । তা না করে আমার চোখে চোখ রাখার প্রয়োজন কী!

তো, আমি যখন আমার সীমিত শক্তি নিয়ে যখন ঘুরে দাঁড়ালাম, ওইখানে এই মানুষটার প্রয়োজন কি আবারও বলার, পড়লাম।

হায়রে মানুষ- হায়রে দুগ্ধপোষ্য শিশু!

বাকের ভাই যখন বাকরখানি হয়ে যান!

আমাদের বাকের ভাই। একসময় কী উম্মাদনাই না সৃষ্টি হয়েছিল এই মানুষটাকে নিয়ে। আপনাদের হয়তো অনেকেরই এটা মনে আছে।
ওই সময় এই উম্মাদনয় কী কেবলই নাট্যকারেরই অবদান ছিল- অবশ্যই না। নূরের অসাধারণ অভিনয়! আমার এখনও চোখে ভাসে- নূরের কী দুর্ধর্ষ অভিনয়!

আমার সেই দৃশ্যটার কথা মনে পড়লেই বুকটা হাহাকার করে উঠে, জেল গেটে বাকের ভাইয়ের লাশটা নিতে এসেছে মুনা (সুবর্ণা মুস্তাফা)। ভোর হয় হয়, চারদিকের মসজিদ থেকে আজান ভেসে আসছে- মুনার সেই পান্ডুর, বিবর্ণ মুখ। কী হাহাকার করা মুখ- বুকটা ফাঁকা হয়ে যাচ্ছিল- জাগতিক অনেক কিছু তখন তুচ্ছ মনে হচ্ছিল!

কিন্ত অধুনা নূর সাহেব নামের মানুষটা, সামাজিক অর্থ-বিত্ত-মর্যাদা সব কিছু থাকার পরও ক্রমশ পরিণত হন জনসেবকের খোলসে এমন একজন অতি সাধারণ মানুষ- ওই মানুষের বাকের ভাইয়ের মতো মানুষকে স্পর্শ করার তিলমাত্র যোগ্যতা নাই। সেইসব জনসেবক, যাদের মহান বাণী আমরা ব্ল­াডার খালি করতে করতে শুনি, ফ্লাশ করে চলে আসি।

সাবেক সাংসদ মি. আসাদুজ্জাম নূর পত্রিকায় বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রীর ছেলে খালেদা জিয়ার সিন্ডিকেট চিনি আমদানী করে, সমুদ্রে জাহাজ আটকে রেখে দেশে কৃত্রিম চিনির সংকট তৈরী করে ফায়দা লুটছেন...।

আমাদের মতো সামান্য মানুষরা যারা লেখালেখি করার চেষ্টা করি, আমরাও তো কোন উদ্ধৃতি ব্যবহার করলে, উপাত্তের সোর্স ব্যবহার করি অথচ একজন সাংসদ মি. আসাদুজ্জাম নূর যে গুরুতর অভিযোগ এনেছেন তারেক জিয়ার প্রতি। যথার্থ প্রমাণ তো দূরের কথা মিনিমাম প্রমাণ দেয়ার অপচেষ্টাও করেন নাই।

সর্বোচ্চ চিনি দাম কত ছিল, সম্ভবত ৬৫ টাকা? তারেক জিয়া মধ্য সমুদ্রে জাহাজটা কি ভাবে আটকে রেখেছেন ? ব্যাটন দিয়ে পানিতে আঘাত করে বলেছেন পানি তুমি দুভাগ হউ। নাকি জাহাজের ক্যাপ্টেনসহ সবাইকে ৬৫, ৬৪, ৬৩, ৬২, ৬১, ৬০…০- এইসব কান্ড করে সম্মোহিত করে রেখছেন, চিনির দাম একশ টাকা কেজী হলেই তাদের জাগিয়ে তুলবেন আবার। ৯৬, ৯৫…০। ডিং!

মি আসাদুজ্জাম নূর, এভাবে আপনি নওগার গাঁজার ব্যাপারীর মতো বলতে থাকলে- ওই যে বললাম ব্ল­াডার খালি…!

থানায় খানিকটা সময়।

আমাদের দেশের পুলিশ, থানা নিয়ে আমার ভীতির শেষ নাই। পারলে আমি শত-সহস্র হাত দূরে থাকি। কিন্ত আল্লা চাইলে উপায় কী!

ক-দিন আগে একটা ঝামেলা হয়ে গেল। গভীর রাতে একটা ফোন কল আসল। এই সময় আমি সচরাচর ফোন-রিং অফ রাখি। কিন্ত বাংলা একটা ওয়েব সাইটে লেখালেখির সুবাদে আমার কিছু প্রিয় মানুষ আছেন যারা আমি অন লাইনে থাকলে ফোন করেন বলে কখনও কখনও রিং অফ থাকে না।

তো, একটা ফোন কল আসল। কথা নাই বার্তা নাই, প্রাণনাশের হুমকী, অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি, প্রিয় মানুষকে জড়িয়ে কুৎসিত সব কথা। হুমকির ভয়ে আমি খুব একটা কাতর নই কিন্ত প্রিয় মানুষকে জড়িয়ে কেউ কিছু বললে আমার মাথা খারাপের মতো হয়ে যায়। ভাবছিলাম, কে করতে পারে এমন ফোন। ওই ওয়েব সাইটে লেখালেখির সূত্র ধরে কি কেউ আমায় এভাবে অপদস্ত করার চেষ্টা করেছে? তখন আমি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একের পর এক পোস্ট দিচ্ছি। অনেকে এটা পছন্দ করছিলেন না। এই কারণেও ওখানে অনেকে আমাকে তীব্র অপছন্দ করেন। ওখানে এমনিতে আমি কিছু বিষয়ে আমি আপোষহীন ছিলাম।
এক: মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রসিকতা
দুই: গালিবাজী।

ওই ওয়েব সাইটের কেউ কেউ ওপেন ফোরামে গালি দেয়ার অধিকার নিয়ে বহু দিন ধরেই লড়ছেন। এদের সাফ কথা, প্রকাশ্য স্থানে দিগম্বর হয়ে বসে থাকা আমার অধিকারের পর্যায়ে পড়ে, বা স্যুট টাই (সম্ভব হলে না খুলে) লাগিয়ে বাথরুম সারা। এবং যা তা গালি না, প্রিয় মানুষদের জড়িয়ে কুৎসিত সব গালি দেয়ার মহান অধিকার অর্জন।
তো, আমি ভাবছিলাম, ওই ওয়েব সাইটের কেউ কি? যিনি ওখানে বলার সাহস না করে ফোনে একচোট নিলেন।

কিছু ঘটনা আমাকে চট করে কাবু করে ফেলে। রাতে ঘুম হলো ছাড়াছাড়া। নিজেকে কোন ভাবেই প্রবোধ দিতে পারছিলাম না। প্রাণনাশের হুমকির চেয়ে প্রিয় মানুষকে গালি দেয়াটা আমার সহ্য হচ্ছিল না। কেবল মনে হচ্ছিল, অথর্ব আমি, আমার প্রিয় মানুষকে আগলে রাখার শক্তি নাই!

পরদিন। একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এটা জানার পর আমাকে নিয়ে পড়লেন। ইনি বিচিত্র কোন কারণে আমাকে, আমার লেখালেখি নিয়ে অহেতুক উচ্ছ্বাস বোধ করেন। কেন, কে জানে!
যাই হোক, ওঁর বক্তব্য হচ্ছে আমার লেখা পড়ে তিনি… ইত্যাদি ইত্যাদি। আর আমি কিনা এটা নিয়ে ভয়ে কাবু। আমার আইনের সহায়তা নেয়া প্রয়োজন।
তিনি আমাকে বললেন, আপনি লোকাল থানায় যান| আমি ফোনে ওসিকে পাইনি, এস আই অমুক আছেন, ফোন করে দিয়েছি, আপনি যান, আমি পরে দেখছি।

সত্যি বলতে কি আমার মোটেও ইচ্ছা করছিল না। থানা তো দূরের কথা, আমি কোন পুলিশ ম্যানের ১০০ হাতের ধারেকাছেও থাকতে চাই না! তবুও গেলাম। কখনও প্রিয়জনদের কথা না শুনে উপায় কী! ওসি ছিলেন না, ছিলেন একজন এস আই। তার সঙ্গে আমার কথোপকথন।

এস আই: হুম। আপনি কিছু না করলে কেন আপনাকে কেউ হুমকি দেবে, অশ্রাব্য কথা বলবে?
আমি: তা তো জানি না।

এস আই: যে কল দিয়েছে সে কি আপনার পরিচিত?
আমি: জ্বী না।

এস আই: অপরিচিত নাম্বার ধরেন কেন?
আমি: জরুরী কিছু কলও তো আসে অপরিচিত নাম্বার থেকে।

এস আই: আপনার ফোনে কি রেকর্ডার আছে? যে নাম্বার থেকে ফোন আসে কথা রেকর্ড করেছেন?
আমি: না নাই।

এস আই: রেকর্ড করেন নাই, আগে রেকর্ড করেন। তারপর আমরা দেখব কি করা যায়। আপনার মুখের কথায় তো আর কিছু করা যায় না। এই যে আপনার জন্য যে কর্মকর্তা আমার সঙ্গে কথা বলেছেন আমি বুঝব কেমন করে, ওই লোক জেনুইন।
আমি বললাম: ওনাকে লাগিয়ে দেই। আপনি নিশ্চিত হয়ে নেন।
এস আই: কোন প্রয়োজন নাই। আপনাকে যে নাম্বার থেকে হুমকি দেয়া হয়েছ, এটা কোন কোম্পানীর?

আমি খানিকটা থমাকালাম। কোম্পানী মানেটা কি! আঁচ করতে পারলাম, অপারেটরের কথা বলছে। বললাম, সিটিসেল।

এস আই: সিটিসেল তো এখন রিকশাওয়ালারা ব্যবহার করে। আপনারটা কোন কোম্পানীর?
আমি নির্বিকার ভঙ্গিতে বললাম: সিটিসেল।

আমার খুব অস্থির লাগছিল। আমার ওই সুহৃদকে থানা থেকেই ফোন করলাম। এস আই সাহেবের আচরণের সবটা আর বলিনি। আমি জানি এ একটা অনর্থ করবে। প্রথমেই যে গালিটা দেবে এটা শুরু হবে 'বা' দিয়ে। এস আইকে বললাম, আপনি কি ওনার সঙ্গে কাইন্ডলি কথা বলবেন একটু। এস আই এবার ওই কর্মকর্তাকে প্রতি নিঃশ্বাসে স্যার বলা শুরু করলেন।

ফোনে কি কথা হলো জানি না কিন্ত আমাকে ওই সুহৃদ বললেন, আপনি এই মুহূর্তে থানা থেকে চেক আউট করেন। ওসি আসলে আমি তার সঙ্গে কথা বলে 'বা'…কে ঠিক করছি। আমি ওই সুহৃদকে বললাম, আমি এটা নিয়ে আর বাড়াবড়ি করতে চাচ্ছি না। কারণ আপনি একটা অহেতুক জটিলতা সৃষ্টি করবেন। এখানে আপনি তো আর সর্বদা থাকবেন না, থাকতে হবে আমাকে। পুলিশের বিশ্বাস কী, এরা পারে না এমন কোন কাজ আছে এই দেশে!

আমাদের দেশের পুলিশ বলে কথা …যম যা না পারে এরা তাও পারে!

নাস্তিক- আস্তিক!

আমার এক সুহৃদকে কথা প্রসঙ্গে বলেছিলাম, যারা নাস্তিক এদের মতো অভাগা আর কেউ নাই।
তিনি নির্বিকার ভঙ্গিতে বললেছিলেন, ভুল। এরা মোটেও অসহায় নন। এরা জেনেশুনেই নাস্তিক হচ্ছেন। অফুরন্ত জ্ঞান নিয়ে।

সাদামাটা দৃষ্টিতে এতে কোন ভ্রান্তি থাকার কথা না। কোন নাস্তিকের চোদ্দপুরূষ নাস্তিক হলে বিষয়টা যত সহজ, অন্যদের বেলায় ততটা না- উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া মস্তিস্কের গাদাগাদি করে থাকা বিপুল তথ্যভান্ডার, জেনেটিক কোডের সারি সারি অদেখা উপাত্ত।
আসলে আমার এই বক্তব্যে খানিকটা ভুল ছিল। আমার এই মন্তব্য করার পূর্বে এটা নির্দিষ্ট করা উচিৎ ছিল, কে অসহায়? যে মানুষটা বৃত্তের ভেতর (জন্মসূত্রে পাওয়া প্রচলিত কোন এক ধর্ম), না বাইরে? অবস্থানটা খুব বড়ো একটা ফ্যাক্টর- আদৌ তার অবস্থানটা কোথায়?

বৃত্তের ভেতর থাকাটা বড়োই সুখের, পরিচিত গা ছাড়া ভাব- চিরাচরিত গাদাগাদি ভাবনা। সব ব্যাটা ঈশ্বরের কাঁধে চাপিয়ে দাও। এটা সম্ভবত প্রকৃতিরও বড্ডো পছন্দ। এমনিতে প্রকৃতির প্রচলিত নিয়মে ভারী আমোদ- ব্যতয় তার খুব পছন্দের বিষয় না!
আসলে এঁদের (নাস্তিকদের) অভাগা আমি বলতে চেয়েছিলাম এই অর্থে- এমন একজন, যে বৃত্তের বাইরে এক পা ফেলে রেখেছে, অথচ যার বৃত্তের বাইরের যথেষ্ট জ্ঞান নাই।
জ্ঞান?
বেশ, ধরে নিলাম, একজন মুক্তি পেল অজ্ঞানতাপ্রসূত এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে যে প্রত্যেকটা ধর্মই পক্ষপাতদুষ্ট এবং এই ইগো তার ধর্মই সেরা!
এই অমোঘ নিয়মে সেই ধর্মানুসারীদের যথারীতি জন্ম নেয় অন্য ধর্মের প্রতি তাচ্ছিল্য। ক্রমশ আটকা পড়া একটা বৃত্তে অনবরত ঘুরপাক খাওয়া। যেন গডরা ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েন, কার সন্তান সেরা এটা প্রমাণে। কেবল তাঁর সন্তানরাই থাকুক দুধে ভাতে, অন্যরা যাক নরকে।
যেমন এক মানুষ বহু মানুষে বিভক্ত হয়েছে। যেমনটা মানুষের হাতকে বিভক্ত করা হয়েছে আঙ্গুলে, কাজের সুবিধার জন্য। মে বী, এত ধর্ম নিশ্চয়ই মানুষের সুবিধার জন্যই হবে। কে জানে, গডকেও ছোট ছোট অংশে বিভক্ত করা হয়েছে এ কারণে হয়তো বা!

এমনিতে পৃথিবীর সমস্ত ধর্ম এবং মহাপুরুষদের কাজ তো একটাই, পিস। এই পৃথিবীটা চমৎকার থাকুক। যে যেই ট্র্যাকে আছে সেই ট্র্যাকেই থাকুক, এটাই মঙ্গল। একজন মানুষের ভেতর লুকিয়ে থাকে একটা শিশু এবং পশু। আপ্রাণ চেষ্টা করা হয় পশুটাকে বার না করার, তবুও কখনো কখনো বেরিয়ে আসে পশুটা। অবিরাম চেষ্টা ধর্মীয় কিছু বিধি নিষেধ প্রয়োগ করে অন্ধকার জগতে আলোর প্রলোভন দেখানো।

কিন্ত একজন নাস্তিকের এই বাড়তি সুবিধাটুকু নেই। তাঁর ভরসা হচ্ছে অর্জিত জ্ঞান। এটুকুই তাঁর পুঁজি- লোটা কম্বল। এখন তাঁর এই ধারণা যদি এমন থাকে সর্বশেষ জ্ঞানটুকু তাঁর কাছে আছে, বেচারা বেঁচে গেল।

হায়রে জ্ঞান! কবেকার জ্ঞান, কোথাকার জ্ঞান, কোন কালের জ্ঞান! একটু যদি এভাবে দেখি, বিষুব রেখার সমতলে পৃথিবীর ব্যাস ৭৯২৭ মাইল, পৃথিবী থেকে সূর্য ১৩ লাখ গুণ বড়। সূর্যের মতো ১ লাখ নক্ষত্র আমাদের গ্যালাক্সি মিল্কিওয়েতে আছে। সাধারণ হিসাবে আমাদের গ্যালাক্সিতে প্রায় দশ হাজার কোটি নক্ষত্রের অস্তিত্ব আছে। আর ইউনিভার্সে আছে বহু মিলিয়ন গ্যালাক্সি- গ্যালাক্সিগুলোর ব্যাস ৫ লাখ আলোকবর্ষ পর্যন্ত।

আপাততদৃষ্টিতে আমাদের জ্ঞান এসে দাঁড়িয়েছে এ পর্যন্ত:
অনেকটা এমন, অসীম একটা ক্যানভাসে পৃথিবীটা হচ্ছে একটা ডট মাত্র। এই ডটকে ন্যানো ভাগে ভাগ করলে আমাদের দেশ, আমাদের শহর, এই রূমটা, আরও ছোট্ট আমরা একজন।

তো, এই ক্যানভাসে অসীম একটা ছবি আঁকতে হবে অদেখা ভুবনের!

বুদ্ধিমানরা কি বলেন আমি জানি না, আমার বুকের গহীন থেকে হাহাকার করে উঠে- আমি জানি না, আমি কিচ্ছু জানি না!

মস্তিষ্ক বেচারার ঘুম নাই!

মানুষের শরীর আমার কাছে মনে হয় অসীম আশ্চর্য, একজন মানুষের বেঁচে থাকাটাই মহা আশ্চর্য! মস্তিষ্ক হচ্ছে সবচেয়ে জটিল এবং চিন্তার অতীত এক সম্পদ!
ড. স্মীথের স্পষ্ট বক্তব্য, মানুষকে বুঝতে হলে মস্তিষ্ককে বুঝতে হবে।

মস্তিষ্ক নিয়ে আমি আমার অল্প জ্ঞানে যা বুঝি, আমি কি দেখতে চাই এবং মস্তিষ্ক আমাকে কি দেখাতে চায়? এ এক রহস্য।
এখানে প্রাসঙ্গিক একটা উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। উইলিয়াম জেমস এক লোকের বর্ণনা দিয়েছেন।
বিশেষ ড্রাগ বা ইচ্ছা শক্তির মাধ্যমে মস্তিষ্ককে অনেকখানি বিভ্রান্ত বা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। একজন লাফিং গ্যাসের ঘোরে যখন থাকতেন, তখন তিনি দাবী করতেন, তিনি মহাবিশ্বের রহস্য জেনে যেতেন। কিন্ত এই ঘোর কেটে গেলে তিনি মনে রাখতে পারতেন না। তাকে বলা হলো যে কোন রকমে এই রহস্যটা কোন একটা উপায়ে লিপিবদ্ধ করার জন্য। একদা তিনি সমর্থ হলেন কাগজে ওই রহস্য লিখে ফেলতে।

পরে কাগজটা খুলে দেখা গেল, তিনি লিখেছেন, 'চারদিকে পেট্রলিয়ামের গন্ধ'!

সমার্থক একটা কথা আছে হেরাক্লিটাসের, "আমরা একই নদীতে পা দেই এবং দেই না; আমরা আছি এবং নেই।"
 

প্লেটোর ইউটোপিয়ার এই উপমাটা আমার কাছে দুর্ধর্ষ মনে হয়। একটা গুহায়, কেবলমাত্র একদিকে তাকাতে পারে (বেঁধে রাখার কারণে) কিছু কয়েদিকে আটকে রাখা হলো। তাদের পেছনে আগুন, সামনে দেয়াল- মাঝামাঝি আর কিছু নাই। ছায়াগুলোকে এরা অবধারিতভাবে বাস্তব মনে করবে।
কারণ পেছনের আগুনের উৎস সম্পর্কে এদের কোন ধারণা নাই, মস্তিষ্ককে এর প্রয়োজনীয় উপাত্ত দেয়া হয়নি। অবশেষে একদিন, কেউ, এই গুহা থেকে পালিয়ে সূর্যের আলোতে এসে দাঁড়ালে প্রকৃত বাস্তবের মুখোমুখি হবে এবং নিশ্চিত হবে, এতে দিন যে যেটাকে বাস্তব জেনে এসেছে তা ভ্রান্ত!
ফিরে এলেও, পালিয়ে যাওয়া মানুষটির কথা ওই কয়েদিরা বিশ্বাস করবে না, যে পর্যন্ত না এরা নিজেরা মুক্ত হয়। পালিয়ে যাওয়া মানুষটি এই গুহায় ফিরে এলেও পূর্বের বাস্তবকে এলোমেলো মনে হলেও, অন্যরা এটাই সত্য মেনে প্রকৃত বাস্তবের মুখোমুখি হওয়া বোকামী মনে করবে।

এই যে আমরা একটা দ্রুতগতির গাড়ির নিচে পড়া থেকে বাঁচার জন্য চোখের নিমিষে সরে পড়ি। খুব সাধারণ একটা ঘটনা। অহরহই হয়।
অথচ মানুষের মস্তিষ্কের কোন কোন ক্যামিকেল রিঅ্যাকশন হতে সময় লাগে সেকেন্ডের ১০ লাখ ভাগের এক ভাগ। এই যে চট করে সরে পড়লাম এ জন্য মস্তিষ্কের ১ লাখ নিউরোনের মধ্যে যোগাযোগ এবং সমন্বয়ের প্রয়োজন হয়েছে এবং পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে ১ সেকেন্ডেরও অনেক অনেক কম সময়ে।
এরি মধ্যে মস্তিষ্ক তার প্রয়েজনীয় সমস্ত উপাত্ত নিয়ে, এ পর্যন্ত তার অর্জিত তথ্য নিয়ে পারিপার্শ্বিক অবস্থা, কার্যকারিতা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছে, সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এরপর এ মুহূর্তে শরীরের প্রয়োজনীয় অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলোকে একের পর এক নির্দেশ প্রেরণ করেছে।

অন্য রকম করে দেখা যাক। একজন গাড়ি চালক ঝড়ের গতিতে যাচ্ছেন। সামনে আরেকটা গাড়ি তিনি অতিক্রম করবেন। উল্টো দিক থেকে আরেকটা গাড়িও আসছে। খুব কঠিন কোন কাজ না- প্রায়শ এটা হয়েই থাকে।
এখন অতিক্রম করবেন, কি করবেন না, এ বিষয়ে তিনি একটা সিদ্ধান্ত নেবেন। সিদ্ধান্তটা আসলে তিনি নিচ্ছেন, নাকি মস্তিষ্ক?
মস্তিষ্ক প্রথমেই যাচাই করবে তার গাড়ির গতি, এরপর সামনের গাড়ির গতি, অবশেষে উল্টো দিক থেকে ছুটে আসা গাড়ির গতি, মাঝখানের দূরত্ব। সব কিছু মিলিয়ে মস্তিষ্ক সিদ্ধান্ত নেবে আদৌ অতিক্রম করা সম্ভব, কি সম্ভব না।
এবং যথারীতি এই নির্দেশ প্রেরণ করবে শরীরের সমস্ত কল-কব্জায়। এরপর এক্সিলেটর, ক্লাচ, গিয়ারের কারুকাজ। এত কিছুর জন্য মস্তিষ্ক বেচরাকে কি ১ সেকেন্ড সময়ও আদৌ দেয়া হয়!
একজন কৃষকের মস্তিষ্ককে এই হ্যাপা পোহাতে হয় না। গাড়ি সংক্রান্ত কমান্ডের সঙ্গে ওই মস্তিষ্ককে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়নি।


আরেকটু মোটা দাগে দেখা যাক। একটা চলনসই কম্পিউটারে আনুমানিক হাজার ত্রিশেক ফাইল থাকে, ছোট বড় মিলিয়ে। মজার বিষয় হচ্ছে, প্রচুর ফাইল নিস্ক্রিয় থাকে বছরের পর বছর ধরে অথচ একটা কমান্ড দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে এ্যাকটিভেট হয়ে তার কাজ শুরু হয়ে দেয় নিমিষেই।

মস্তিষ্ক হচ্ছে, ছুঁরির মতো- যত শান দেয়া হবে, হয়ে উঠবে ততই ক্ষুরধার, ওজনে কিঞ্চিৎ কম, তাতে কী! মস্তিষ্ক বেচারার বড়ো কষ্ট, ঘুমাবার কোন উপায় নাই, মারা যাওয়ার আগ অবধি! বেচারা!!

একাত্তরের দিনগুলি/ জাহানারা ইমাম

(২১ এপ্রিল, বুধবার, ১৯৭১)
"...আম্মা, দেশের এ অবস্তায় তুমি যদি আমাকে (রুমী) জোর করে আমেরিকায় পাঠিয়ে দাও, আমি হয়তো যাব শেষ পর্যন্ত। কিন্তু তাহলে আমার বিবেক চিরকালের মতো অপরাধী করে রাখবে আমাকে। আমেরিকা থেকে হয়ত বড় ডিগ্রি নিয়ে এসে বড় ইন্জিনিয়ার হবো; কিন্তু বিবেকের ভ্রুকুটির সামনে কোনদিনও মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারব না। তুমি কি তাই চাও আম্মা?
…আমি (জাহানারা ইমাম) জোরে দুই চোখ বন্ধ করে বললাম, …ঠিক আছে, তোর কথাই মেনে নিলাম। দিলাম তোকে দেশের জন্য কোরবানি করে। যা, তুই যুদ্ধে যা।..."


(১লা মে, শনিবার, ১৯৭১)
…পাকিস্তান আর্মি যুবা ও বয়স্ক লোকদের ধরে এনে এখন আর গুলি করে মেরে ফেলছে না, তাদের শরীর থেকে শেষ বিন্দু পর্যন্ত রক্ত বের করে তারপর লাশ ফেলে দিচ্ছে। এত রক্ত কেন দরকার হচ্ছে? দেশের বিভিন্ন জায়গায় তাদের যে যুদ্ধ হচ্ছে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে, তাতে প্রচুর সংখ্যায় পাকিস্তানী সৈন্য জখম হচ্ছে। তাদের চিকিত্সার জন্য প্রচুর রক্ত দরকার। এত রক্ত ব্লাড ব্যাঙ্কে নেই। তাই এভাবে রক্ত সংগ্রহ করছে। 

(৮ আগস্ট, রবিবার, ১৯৭১)
(মুক্তিযুদ্ধ চলা কালে, রুমী একদিন আমার সঙ্গে দেখা করতে আসে)
"…আমার (জাহানারা ইমাম) চোখ পানিতে ভরে গেল। এখন ধরা গলায় বললাম, না, আমার সামনেই খা (সিগারেট)। অল্প ক-দিনের জন্য এসেছিস। সিগারেট খাওয়ার সময়টুকুও তোকে আড়াল করতে চাই নে।..."


(২৪ আগস্ট, মঙ্গলবার, ১৯৭১)
"...চেনা হয়ে উঠেছে ডা: জাফরুল্লা চৌধুরী, ডা: এম এ মোবিন। এরা দু’জনে ইংল্যান্ডে এফ. আর. সি. এস পড়ছিল। …বিলেতে চার বছর হাড়ভাঙ্গা খাটুনির পর যখন এফ. আর. সি. এস পরিক্ষা মাত্র এক সপ্তাহ পরে, তখনই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু। ছেলে দুটি পরীক্ষা বাদ দিয়ে বাংলাদেশ আন্দোলনে অংশ নিল, পাকিস্তানী নাগরিকত্ব বর্জন করল…।"


(২৮ আগস্ট, শনিবার, ১৯৭১)
"…আমি বললাম, চুপ কর রুমী, চুপ কর…আমার চোখে পানি টলমল করে এল। হাত বাড়িযে রুমির মাথাটা বুকে টেনে বললাম, রুমী। রুমী এত কম বয়স তোর, পৃথিবীর কিছুই তো জানলি না।
রুমী মুখ তুলে কি রকম যেন হাসল। মনে হল অনেক বেদনা সেই হাসিতে। একটু চুপ থেকে বলল, …যদি চলেও যাই কোন আক্ষেপ নিয়ে যাব না।..."

(২৯ আগস্ট, রবিবার, ১৯৭১)

ক্যাপ্টেন কাইয়ুমের নেতৃত্বে পাক আর্মি রুমী, জামী, জাহানারা ইমামের স্বামী শরীফকে ধরে নিয়ে যায়। সবাই ফেরত আসেন, আসেন না কেবল রুমী। শরীফ সাহেবের উপর চালানো হয় দৈহিক নির্যাতন।

(২০ নভেম্বর, শনিবার, ১৯৭১)
"...আজ ঈদ। রুমি নাই …আমি ভোরে উঠে সেমাই জর্দা রেঁধেছি।
…যদি রুমীর সহযোদ্ধা কেউ আসে এ বাড়ীতে। …তারা কেউ এলে আমি চুপিচুপি নিজের হাতে বেড়ে খাওযাবো। তাদের জামায় লাগিয়ে দেবার জন্য একশিশি আতরও কিনে লুকিয়ে রেখেছি।..."

(১৩ ডিসেম্বর, মঙ্গলবার, ১৯৭১)

জাহানারা ইমামের স্বামী শরীফ সাহেব হার্ট অ্যাটাকে হাসপাতালে কিন্ত ব্লাক আউট থাকায়, লাইফসেভিং মেশিন সময়মতো চালানো যায়নি। ১৮ ডিসেম্বর শরীফ সাহেবের মৃতদেহ বাসায় আনা হয়।)

(১৭ ডিসেম্বর, শুক্রবার, ১৯৭১)
"...আমি মেজর হায়দারকে বললাম, জামী পারিবারিক অসুবিধার কারণে মুক্তিযুদ্ধে যেতে পারেনি। ও একেবারে পাগলা হয়ে আছে। ওকে কাজে লাগাও।
মেজর হায়দার জামীকে বললেন, …ভেবে দেখ, পারবে কি না। এটা খুব টাফ জব। চব্বিশ ঘন্টা ডিউটি।
..."


*কেবল বিশেষ বিশেষ অংশ উল্লেখ করা হল।
** মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অন্যান্য লেখা: http://tinyurl.com/37wksnh

ধর্ম যাদের বুক পকেটে!

একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার। নামের পরে অনেকগুলো বিজাতীয় ডিগ্রি। এ বি সি ডি এক্স ওয়াই জেড।
ওনার ইস্তারি(!) সাহেবাও ডাক্তার দু-জনে মিলে একটা ক্লিনিক চালান। মুলত এরা গর্ভবতী মহিলাদের পেট কাটতে খুব আগ্রহ দেখান। কারণটা... পরে আসছি।

একজন রোগী দেখার কারণে এখানে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। রিসেপশন বলতে কোন জিনিসের অস্তিত্ব এখানে নাই। কার কাছে খোঁজ করবো এটাই বুঝতে পারছিলাম না। অল্প কারণেই আমার কপালে ভাঁজ পড়ে এখানের তার ব্যতয় হলো না।
আমি উষ্মা গোপন করতে খুব ভাল করে শিখিনি। আমার উষ্মা দেখে একজন রোগীর আত্মীয় আমায় বললেন, ভাইজান, তবুও এই কিনিকটা ভাল। ডাক্তার সাব ভাল।

আমি রাগ চেপে বললাম, কি রকম?
তিনি বললেন, এই ডাক্তার সাব ক-দিন আগে হজ করেছেন।
আমি বিস্ময় চেপে গেলাম। এখানে হাজী বা আলহাজের সঙ্গে ডাক্তার ভাল, এ তর্ক করা করা বাতুলতা।

পরিচিত একজন ওষুধ কোম্পানীর রিপ্রেজেন্টিভকে পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। তাঁর সহায়তায় নির্দিষ্ট কেবিন খুঁজে পেলাম। বিচিত্র, ভয়াবহ কিছু তথ্যও পেলাম। উক্ত রিপ্রেজেন্টিভ এই ডাক্তার সাহেবকে মাসে ৫ হাজার টাকা করে দেন। তার কোম্পানীর এলেবেলে ওষুধ চালিয়ে দেয়ার জন্য।
ভয়াবহ তথ্যটা হচ্ছে মফস্বলের হাসপাতাল থেকে অকারণেই গর্ভবতী মহিলাদের পেট কাটার জন্য এখানে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এই কষ্ট স্বীকার করার জন্য মফস্বলের ডাক্তার সাহেবরা রোগী পিছু ২ হাজার টাকা করে পান। এই ক্লিনিকে চার্জ নেন ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা।

এই পুরুষ ডাক্তার সাহেব খুবই পরহেজগার মানুষ হজের পাশাপাশি ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন। পর্দাও করেন। বাড়তি নমুনা পেলাম তার চেম্বারের বাইরে টাঙ্গানো নির্দেশ থেকে।

আমাদের মতো নাদান বান্দারা এদের দেখে মন খারাপ করা নিঃশ্বাস ফেলি, ধর্ম এদের বুক পকেটে আমাদের কি হবে রে!