শোনেন, ফারাবি গং, ভুলেও কিন্তু আমার মত দুর্বল মানুষকে মৃত্যুর ভয় দেখাবেন না। কেউ থুত্থুড়ে বুড়া হয়ে গু-মুতে মাখামাখি হয়ে মারা যায়, কেউ যুদ্ধক্ষেত্রে, কেউবা আপনাদের মত কাপুরুষদের হাতে। আমার মত কাউকে-কাউকে মেরে ফেলা যায় এ সত্য কিন্তু তার আদর্শ, তাঁর ভাবনাকে মেরে ফেলা যায় না।সেই ভাবনার রেশ ধরে আমার গলিত শব থেকে জন্ম নেবে, নেবেই অন্য একজন। সেই মানুষটা হাতে থাকবে জ্ঞানের এমন এক তরবারি যেটা দিয়ে সে ছিন্নভিন্ন করে ফেলবে সমস্ত অন্ধকার এবং যথারীতি আপনাদের মত, পেছন থেকে চাপাতির কোপ-দেয়া, গুয়ে-ভাসা পোকার মত কাপুরুষদেরকেও...।
সম্ভবত ৫/৭ বছর পূর্বে সাদিক আলম অভিজিৎ রায়ের ‘আলোর পথে চলিয়াছে অন্ধকারের যাত্রী’ বইটা আমাকে দিয়েছিলেন। প্রচুর তথ্য-উপাত্ত নিয়ে লেখা বইটা তখন পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম। আজ একটা প্রয়োজনে বইটার প্রয়োজন হলে অনেক খুঁজেও যখন পেলাম না তখন নিশ্চিত হলাম এটা কোনও মহান(!) বইচোরের কাজ!
আমার ঢাকা যাওয়া হয় কালেভদ্রে তার উপর বইমেলায় যাওয়া হয় না বেশ ক-বছর। আমার নিজের সাইটেই ‘রকমারি ডট কমের’ হাইপার লিংক ছিল কিন্তু মাথায় আসে অনেক পরে। আরে, এদের মাধ্যমেই তো বই কেনা সম্ভব। এরপর আমার জন্য বিষয়টা সহজ হয়ে গেল। আমি আমার প্রয়োজনীয় বই পাঠাতে বলে দিলেই ওরা কুরিয়ারের মাধ্যমে পাঠিয়ে দেয়, বই বুঝে পেয়ে টাকা পরিশোধ করে দিলেই হয়। 'ওয়েটিং ফর গডো- ওয়েটিং ফর বাংলার বেকেট’ [১] যে লেখাটা লিখেছিলাম সেই লেখাটার উৎসও রকমারির মাধ্যমেই সংগ্রহ করা বই।
আজ আমি রকমারিকে ফোন করে বললাম ‘আলোর পথে চলিয়াছে অন্ধকারের যাত্রী’ এবং অভিজিৎ রায়ের আরেকটা বই পাঠিয়ে দিতে। এরা আমাকে জানালেন, অভিজিৎ রায়ের বই তাদের লিস্টে নেই এবং কোনও প্রকারেই তাঁর বইগুলো পাঠানো সম্ভব না। কয়েক দফা কথা বলেও আমি এদের কাছ থেকে কোনও সদুত্তর পেলাম না কেন এরা অভিজিৎ রায়ের বই সরিয়ে ফেলেছে বা পাঠানো সম্ভব না।
আমিও এটাও অনুরোধ করেছিলাম, আপনাদের সাইটের লিস্টে নাই, বেশ, আমাকে অন্তত যোগাড় করে পাঠিয়ে দেন। উত্তর নেগেটিভ!
এবার আমি দুর্দান্ত রাগ চেপে বললাম, ‘কী আশ্চর্য, আপনারা একটা ব্যাখ্যা পর্যন্ত দেবেন না! এ তো ঘোর অন্যায়! বেশ তাহলে, এই অন্যায়ের প্রতিবাদ স্বরুপ আপনাদের এখানে তালিকায় আমার যে বইগুলো দেওয়া আছে তা-ও সরিয়ে ফেলুন’।তারা আমাকে বললেন: ‘আপনি মৌখিক ভাবে বললে তো হবে না, মেইল করে জানান’।
আমি বললাম, মৌখিক ভাবে বললে সমস্যা কোথায়! আমি নিজে আপনাদের ওখান থেকে বই কিনেছি। ওখানে আমার ফোন নাম্বার বিস্তারিত সবই দেওয়া আছে তাহলে?
তাদের উত্তর, ‘তর্ক বাড়িয়ে লাভ নাই। আপনি মেইল করুন’।
তাদের উত্তর, ‘তর্ক বাড়িয়ে লাভ নাই। আপনি মেইল করুন’।
এরপর আমি তাদেরকে মেইল করলাম। মেইলের লেখাটা এখানে হুবহু তুলে দিচ্ছি। নিজের ঢোল নিজেই পেটানো হয়ে যাবে বলে কেবল আমার বইয়ের নামগুলো উহ্য রাখলাম। অন্য কোনও কারণে না কেমন একটা বিজ্ঞাপন-বিজ্ঞাপন গন্ধ চলে আসছে বিধায়। মেইলটা ছিল এমন:
“এডমিন, রকমারি ডট কম।
সুপ্রিয়,
আমি আপনাদের এখান থেকে প্রয়োজনে বই ক্রয় করে থাকি। কিন্তু আজ লেখক অভিজিৎ রায়ের বই পাঠাবার জন্য অনুরোধ করা হলে আপনাদের ওখান থেকে আমাকে জানানো হয়, এই লেখককের সমস্ত বই আপনারা আপনাদের ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে ফেলেছেন এবং কোনও প্রকারেই অভিজিৎ রায়ের বই পাঠানো সম্ভব হবে না।
বেশ ক-বার আপনাদের লোকজনের সঙ্গে কথা বলেও এর সুরাহা হয়নি এবং কেন আপনারা উক্ত লেখকের বই সরিয়ে ফেলেছেন বা বিক্রয় করতে আগ্রহী নন তারও কোনও সদুত্তর মেলেনি।
আমি যতটুকু জানি অভিজিত রায়ের বই বিক্রয় করা বাংলাদেশে আইনত নিষিদ্ধ না তাহলে কেন আপনারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এটা আমার মোটেও বোধগম্য হচ্ছে না। যদিও, আপনাদের করা উক্ত আচরণ একজন লেখকের প্রতি চরম অপমানের, অশ্রদ্ধার।
আমি যতটুকু জানি অভিজিত রায়ের বই বিক্রয় করা বাংলাদেশে আইনত নিষিদ্ধ না তাহলে কেন আপনারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এটা আমার মোটেও বোধগম্য হচ্ছে না। যদিও, আপনাদের করা উক্ত আচরণ একজন লেখকের প্রতি চরম অপমানের, অশ্রদ্ধার।
আপনাদের এই ঘৃণ্য, অন্যায় আচরণের তীব্র প্রতিবাদ জানাই এবং আপনাদের সাইটে আমার যে বইগুলো (১. ..., ২. ..., ৩. ..., ৪. ..., ৫. ..., ৬. ..., ৭. ..., ৮. ..., ৯. ..., ১০. ..., ১১. ...) বিক্রি করার জন্য যে তালিকায় রেখেছেন তা সরিয়ে ফেলার জন্য অনুরোধ করি।
ধন্যবাদান্তে- আলী মাহমেদ”
ধন্যবাদান্তে- আলী মাহমেদ”
এরা কেন বইগুলো সরিয়ে ফেলেছিলেন বা বিক্রয় করতে চাচ্ছিলেন না তা আমি বুঝতে পারছিলাম না। এফবিতে আমার বন্ধুদের সহায়তা চাওয়ার পর দেখা গেল ‘ফারাবী’ নামের একজন নাকি রকমারি ডট কমের কর্তৃপক্ষকে হুমকি দিয়েছিল এরপর এরা বইগুলো সরিয়ে ফেলে বা বিক্রয় করা থেকে বিরত থাকে।
এবং এটা নিয়ে গতবছর বইমেলার সময়ও নাকি খুব হইচইও হয়েছিল, এমনকি মানববন্ধনও। কোনও বিচিত্র কারণে বিষয়টা আমারা চোখ এড়িয়ে গেছে বলে বিব্রত, লজ্জিত বোধ করছি। পাঠকের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনাও করছি।
বাহ, ফারাবীর মত মানুষরা অতি শক্তিশালী তো! এতো শক্তিশালী মানুষদেরকে গুরুত্ব না-দেওয়ার তো কোনও কারণ দেখি না। একটু আগে শুনলাম, ফারাবীকে নাকি ধরা হয়েছে। এখন উপায়? অন্তত ফারাবীর ঠ্যাং দুইটা যেন শিকের বাইরে রাখা হয় যাতে করে আমার মত দুর্বল মানুষেরা গিয়ে ঠ্যাং ধরে কদমবুসি করতে পারে।
অভিজিৎ রায়ের উপর ফারাবী গং ক্ষেপে গেল কেন? তিনি কি এমন কোনও লেখা লিখেছিলেন যা আজগুবি, যার কোনও তথ্য-প্রমাণ নেই? যদি এমনটা হয়ে থাকে তাহলে সেই লেখাটা নিয়ে প্রতিবাদ করলে সমস্যা কোথায় ছিল? লেখার উত্তর কী চাপাতি দিয়ে?
অভিজিৎ রায়ের উপর ফারাবী গং ক্ষেপে গেল কেন? তিনি কি এমন কোনও লেখা লিখেছিলেন যা আজগুবি, যার কোনও তথ্য-প্রমাণ নেই? যদি এমনটা হয়ে থাকে তাহলে সেই লেখাটা নিয়ে প্রতিবাদ করলে সমস্যা কোথায় ছিল? লেখার উত্তর কী চাপাতি দিয়ে?
(যদিও আমরা এটা এখনও জানি না অভিজিৎ রায়ের মৃত্যুর জন্য কে বা কারা দায়ী। যেহেতু ফারাবী অভিজিৎ রায়কে হুমকি দিয়ে এসেছে তাই আপাতত আলোচনায় ফারাবীই চলে আসছে।
এবং এরপর চাপাতির কোপে মারা গেলেন ফয়সল আরেফিন দীপন—একে-একে বেশ কিছু ব্লগার...!)
নাকি এরা চাচ্ছে এই গ্রহের সবাই ফারাবী গংদের মত হয়ে যাবে? মোটাদাগে বলতে হয়, তাহলে তো এই গ্রহে সবই আপেল গাছ থাকত কলাগাছ থাকত না। কথাটা সম্ভবত রবিদাদার:
নাকি এরা চাচ্ছে এই গ্রহের সবাই ফারাবী গংদের মত হয়ে যাবে? মোটাদাগে বলতে হয়, তাহলে তো এই গ্রহে সবই আপেল গাছ থাকত কলাগাছ থাকত না। কথাটা সম্ভবত রবিদাদার:
“I love my God because he gives me the freedom to deny him.”বাপুরে, এই ক্ষমতাটাও তো তাঁরই দেওয়া নইলে তো এই গ্রহে অবিশ্বাসী বা অন্য ধর্মের কেউ থাকত না।!
এই তো সেদিন সবচেয়ে চালু এক দৈনিকে পড়লাম একজন ধর্মীয় শিক্ষক একজন ধর্মীয় ব্যক্তিত্বকে নিয়ে লিখেছেন, “...তাঁর পায়খানা, প্রস্রাবেও সুগন্ধ হতো”।
এখন এই লেখা নিয়ে কি কেউ কোনও সংশয় প্রকাশ করতে পারবে না, কোনও রেফারেন্স চাইবে না? চাইলেই কী চাপাতি চলবে?
অন্য একটা লেখাও চোখে পড়েছিল। একটা রক্তাক্ত কুকুরের ছবি এবং অভিজিৎ রায়ের ছবি পাশাপাশি দিয়ে বলা হয়েছে লোকটা কুকুরের মত মরেছে। তা লোকটার কি দোষ? তারও ব্যাখ্যা করা হয়েছে ওই লেখায়। তিনি নাকি ঈশ্বরকে নিয়ে মন্দ কথা লিখেছিলেন। ওখানে উল্লেখ-করা অভিজিতের লেখার রেফারেন্সটাও পড়লাম।
তিনি যেটা লিখেছিলেন, ‘ভগ’ মানে যোনি এবং কোত্থেকে কেমন করে এটা এসেছে তারও ব্যাখ্যা দিয়েছেন। অভিজিতের নিজের কোনও মনগড়া ব্যাখ্যা না কিন্তু। তাহলে? বাংলা অভিধানেই তো আছে ‘ভগ’ মানে যোনি, গুহ্যদেশ। বাছা, অভিধানকেও কী চাপাতি দিয়ে কোপানো হবে?
আপডেট, ৪ মার্চ, ২০১৫:
‘রকমারি ডট কম’ আমার পাঠানো মেইলের উত্তর দিয়েছে। হুবহু এখানে দেওয়াটা সমীচীন মনে
করছি না, কেবল মূল বক্তব্যটা বলি। তারা এটা নিশ্চিত করেছেন ভবিষ্যতে আমার কোনও বই
বিক্রি করবেন না যতক্ষণ পর্যন্ত-না আমার মনোভাবের ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটে।
ওয়েল, তারা বারবার এটা আমাকে বোঝাবার চেষ্টা করেছেন, তাদের সমস্যাটা বোঝার
জন্য। আমি যে খানিকটা বুঝতে পারছি না এমন না কিন্তু আমার সমস্যাটার কি হবে? একটা মানুষের প্রতি, লেখকের প্রতি অন্যায় করা হচ্ছে এটা জেনেও আমি
তো ‘জম্বি’ হয়ে যেতে পারি না।
এই বিষয়ে আমি আমার মনোভাব আগাম বলে রাখি। আমার মনোভাবের পরিবর্তন ঘটার
কোনও কারণ নাই যতক্ষণ পর্যন্ত-না অভিজিৎ রায়ের বই বিক্রির উপর থেকে এরা নিষেধাজ্ঞা
তুলে নেবেন।
এই বিষয়ে আমার মনোভাব স্পষ্ট। অভিজিৎ রায়ের বই বিক্রি করার উপর আমাদের প্রচলিত আইনে কোনও
প্রকার নিষেধাজ্ঞা নাই বিধায় রকমারি'র এই আচরণ ঘোর অন্যায়। আজ এরা অভিজিতের
বেলায় এটা করছেন কাল
কোনও উটকো লোক এসে অন্য লেখকের বই সরাতে বললে এরা আনন্দের সঙ্গে সেই কাজটাই করবেন।
মার্টিন সাহেবকে এখানে দাওয়াত করে আনলে খুব একটা দোষ হবে না বলেই মনে করি:
“First they came for the Socialists, and I did not speak out—
Because I was not a Socialist.
Then they came for the Trade Unionists, and I did not speak out—
Because I was not a Trade Unionist.
Then they came for the Jews, and I did not speak out—
Because I was not a Jew.
Then they came for me—and there was no one left to speak for me.”
-(Martin niemoller)সহায়ক সূত্র:
১. ওয়েটিং ফর গডো...: http://www.ali-mahmed.com/2015/01/blog-post.html
4 comments:
মৌলবাদী-কাঠমোল্লার কুৎসিত হস্তক্ষেপের প্রেক্ষিতে বই প্রকাশক-লেখকদের মাথা নুইয়ের চলার মনোভাব আর এদের ব্যবসায়ী থেকে মেরুদণ্ডহীন সরীসৃপে পরিণত হওয়ার চমৎকার একটা উদহারণ এটি। একজন লেখক হিসেবে আরেকজন লেখকের প্রতি সম্মান দেখানোটা স্বাভাবিক, কিন্তু বিরল হিসাবে নিলাম। ধন্যবাদ আপনাকে আলী মাহমেদ। আরো তীব্র হোক আপনার কণ্ঠ।
স্যার, আপনাকে ভাই বলতে খুব ইচ্ছা করে।দেশ এবং দেশের মানুষ নিয়ে যখন অনেক হতাশ হয়ে পড়ি তখন আপনার মত মানুষকে মশাল হাতে দেখি।খালি বুকটাই ভরে ওঠে না ঘুরে দাড়াবার পূর্ন জোর পাই।আমার ছেলেমেয়েকে গর্বের সঙ্গে বলতে পারি তোমরা এই মানুষটার মত হবে।বিসমিল্লা বলে আপনারর সমস্ত লেখা পড়া শুরু করলাম। দোয়া করবেন
“…একজন লেখক হিসেবে আরেকজন লেখকের প্রতি সম্মান দেখানোটা স্বাভাবিক, কিন্তু বিরল হিসাবে নিলাম।…”
আমার ভালোবাসা-মমতা-ঘৃণার প্রকাশ অতি তীব্র। সেই প্রকাশ ভঙ্গি যদি কোনও প্রকারে ‘বিরল’ পর্যায়ে চলে যায়... কী আর করা, কপাল। :) @Anonymous
সর্বনাশ, ভুলেও এ কাজ করবেন না- অন্তত আপনার সন্তানের মাথা চিবিয়ে খাবেন না, প্লিজ। আমার মত মানুষের যন্ত্রণার শেষ নেই। স্বর্গ-নরকের মাঝামাঝি একটা জায়গা আছে সেখানে আমার মত অভাগাদের স্থান- না ঘারকা, না ঘাটকা। @সাবেত
Post a Comment