লেখক: M Rayhan Kabir
(https://www.facebook.com/share/1DwYxzGJuq/)
"(সৌদি থেকে ফিরে) এক আপা সন্তান কোলে দেশে ফিরে আমাকে বললেন:
ভাই, সন্তান আমার গর্ভে হয়েছে, কিন্তু আমি জানিই না এই সন্তান আসলে কার। মালিকের, মালিকের ছেলের, মালিকের বন্ধুদের, নাকি তার ড্রাইভারের?
এর চেয়ে দুঃখের কিছু হতে পারে, ভাই! বলেন? আমি শুনে বিস্মিত হইনি, কারণ এমন কেস প্রতিনিয়তই শুনছি। কিন্তু প্রতিবারের ঘটনাগুলো মনে দাগ কেটে যায়।
![]() |
| বাবুটার সাথে লেখক। |
ভিয়েনা কনভেনশন আর কূটনীতির কোনো তোয়াক্কা না-করে আমাদের দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে সেই সৌদি আরবই। মন দিয়ে পড়বেন, প্রতিটা নাগরিকের এটা জানা উচিত।
এটা কোনো গল্প নয়। একদম মাঠ থেকে, নিজের হাতে কাজ করা অভিজ্ঞতা থেকে বাস্তব ঘটনা লিখছি। পড়তে পড়তে ছবি মনে আঁকতে পারেন, নিশ্চিত বলছি আঁতকে উঠবেন, ভাববেন এ কেমন বর্বরতা, এটা কি আসলেই সম্ভব? সৌদি আরবের এই শেখদের কাছে নারী, পুরুষ, শিশু সবাই এক টুকরো মাংসের মতো, কাউকেই তারা ছাড় দেয় না।
গৃহকর্মীর কাজে সৌদি আরবে গিয়ে যত নারী গর্ভবতী হয়ে বা কোলে ছোট্ট শিশু নিয়ে দেশে ফিরেছেন, আমি যাঁদের পেয়েছি তাঁদের প্রত্যেকের ঘটনা প্রায় একই রকম। প্রত্যেকের সন্তান জন্ম নিয়েছে সৌদির জেলে। একজন নারী অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় জেলে গেলেন কীভাবে, আর সেখানে সন্তান প্রসবই বা করলেন কীভাবে? চলুন, ঘটনায় নিয়ে যাই।
কাজে যাওয়া নারী, কখনো কুমারী একটা মেয়ে, মালিকের হাতে নির্যাতন আর ধর্ষণের শিকার হন। সেই অত্যাচারের বর্ণনা ফেসবুকের সেন্সরও সম্ভবত নেবে না। গৃহকর্তা, কর্তার ছেলে, কর্তার ভাই, কর্তার বন্ধু, কর্তার ড্রাইভার, পালাক্রমে রুটিন করে ধর্ষণ করে আমার দেশের সেই অসহায় নারীকে, যিনি দুই মুঠো ভাতের পয়সা জোগাড় করতে গিয়েছিলেন।
সারাদিন অমানুষিক খাটিয়ে ঘুমানোর সময় নিয়ম করে চলে অত্যাচার, এমন আচরণে যেন তাকে কেনাই হয়েছে ভোগ করার জন্য। বিচার চাইবেন কোথায়, সে দেশে এমন কোনো আইনই নেই।
তারপর একসময় সেই নারী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন। আর ঠিক তখনই সৌদির সেই শেখ তাঁর নামে চুরির মামলা দিয়ে পুলিশে দেয়। সময়টা বেছে নেওয়া হয় এমনভাবে, যেন সন্তানটা জেলেই প্রসব হয়। চুরির মামলায় আমার দেশের নারীরা গ্রেপ্তার হয়ে জেলে যান, আর দু-এক মাসের মধ্যেই সেখানে বাচ্চার জন্ম দেন।
একবার চোখ বন্ধ করে ভাবুন। দুই বেলা পরিবারে ভাত দেওয়ার আশায় যে নারী বিদেশ গেলেন, তিনি প্রতিদিন গণধর্ষণের শিকার হলেন, বিচার দূরে থাক, কোথাও বলার জায়গাও পেলেন না। তিনি অন্তঃসত্ত্বা হলেন, আর তাঁকেই মিথ্যা চুরির অপবাদে জেলে পাঠানো হলো। অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় আমরা মায়ের কত যত্ন নিই, কত বাছবিচার, কত ডাক্তার, কত চিকিৎসা।
অথচ ওই নারী ধর্ষিতা হয়ে গর্ভবতী অবস্থায় পড়ে থাকলেন জেলে। জেলেই জন্ম হলো বাচ্চার, সেই বাচ্চা কোলে নিয়েই তিনি নামলেন ঢাকা বিমানবন্দরে। মেয়েটি কুমারী, বিয়ে হয়নি, এই বাচ্চা নিয়ে গ্রামে যাবেন কীভাবে? অনেকে বাচ্চাটাকে বিমানবন্দরেই রেখে চলে যান। কখনো বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ বাচ্চাকে নিয়ে আসে ব্র্যাকের কাছে, আমরা আমাদের আওতার মধ্যে মা ও শিশুর জন্য যতটুকু মঙ্গল করা সম্ভব, চেষ্টা করি।
শুনলে অবাক হবেন, আমার রাষ্ট্রের ডাটাবেজে, মন্ত্রণালয়ে, দূতাবাসে কোথাও একটা কাগজেও লেখা নেই এমন নির্যাতনের শিকার হয়ে কতজন নারী ফিরলেন। কতজন গর্ভবতী হয়ে ফিরলেন, কতজন নির্যাতন সইতে না পেরে আত্মহত্যা করলেন, তার কোনো হিসাব নেই। বিচার তো অনেক দূরের কথা, রাষ্ট্রীয় ক্ষতিপূরণও দূরের বিষয়, এঁদের তথ্যটুকুও কোথাও নেই। আমার কাছে যে তথ্য আছে, তা আমার রাষ্ট্রের কাছে নেই, চ্যালেঞ্জ করে বললাম। এই হলো আমাদের পররাষ্ট্রনীতি আর শ্রমিক সুরক্ষার অবস্থা।
এ তো গেল নারীদের কথা। পুরুষও রেহাই পায় না। আমি নিজে একটা কেস সামলেছি, এক তরুণ ছেলে, বয়স বিশের বেশি হবে না। কাজ করতে গিয়েছিল সেই দেশে। প্রতিদিন আমাকে ফোন করে চিৎকার করে কাঁদত, ভাই, আমাকে বাঁচান। মালিক আর তার বন্ধুরা আমারে ছাগল চড়াইতে এক মরুভূমিতে এনে রাখছে, এখানে রোজ মালিক আর তার বন্ধুরা আসে, আমারে বলাৎকার করে। ছেলেটা বলছিল আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে, কিন্তু সাহসে কুলায় উঠছে না। শেষ পর্যন্ত সেই ছেলেটাকেও উদ্ধার করে এনেছিলাম।
আরও শুনুন। বিনা বিচারে, বৈধ ভিসা থাকা সত্ত্বেও সৌদি পুলিশ প্রতিদিন গড়ে ৩০০ বাংলাদেশি শ্রমিককে গ্রেপ্তার করে। এর মধ্যে বিশাল একটা অংশের ভিসা বৈধ থাকে, তবু গ্রেপ্তার করে দেশে পাঠিয়ে দেয়। কোনো জবাবদিহি নেই, কোনো বিচার নেই। কিসের দূতাবাস, কিসের কূটনীতি, এসব শুনলে এখন হাসি পায়।
আর সেই দেশই নাকি আমার দেশের নাগরিকদের অনৈতিক কাজের অপরাধে বিচার করে [১]। আমি এমন কেস পেয়েছি, যেখানে ধর্ষণ থেকে বাঁচতে একজন নারী নামাজ দীর্ঘ করতেন, আর দেরি হলে সৌদির এক নাগরিক তাঁকে নামাজ থেকে টেনে তুলে আনত। সেই দেশ নাকি ব্যভিচারের দায়ে আমার দেশের নাগরিককে হত্যা করে!
আজব ব্যাপার হলো, আমার দেশের মানুষই সেই মৃত্যুদণ্ডের খবরের নিচে গিয়ে কমেন্টে লিখছে, আলহামদুলিল্লাহ। এক রাজনৈতিক ব্যক্তির বক্তব্য দেখলাম, তিনি বলছেন এই পাপের লাশ তিনি দেশে চান না। অথচ ওই পাপ বয়ে দেশে ফেরা কোনো ধর্ষিতার পাশে এঁদের কেউ কোনোদিন এসে দাঁড়ায় না।
শুনুন, গুগল করে দেখুন। ২০১১ সালে সৌদি আরব রুয়াতি বিনতে সাতুবি নামের এক ইন্দোনেশীয় নারীকর্মীর শিরশ্ছেদ করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে, আর ইন্দোনেশিয়া সরকারকে আগে একটা কথাও জানায়নি। ঠিক আমাদের দুই নাগরিকের মতো। কিন্তু ইন্দোনেশিয়া চুপ করে বসে থাকেনি। তারা সৌদি আরবে গৃহকর্মী পাঠানোই বন্ধ করে দেয়, আর কূটনৈতিক সম্পর্কে ধাক্কা লাগে।
অথচ দিনের-পর-দিন আমাদের নারীরা এভাবে অত্যাচারিত হচ্ছেন, আর একটা শব্দ করার সাহসও আমাদের রাষ্ট্রের নেই।
* ছবি: মধ্যপ্রাচ্য থেকে অত্যচারের শিকার হয়ে সন্তান নিয়ে দেশে ফিরে আসার পর ২০২২ সালে ছোট্ট শিশুটির সাথে এই ছবিটা রেখেছিলাম।"
—লেখক: M Rayhan Kabir
(https://www.facebook.com/share/1DwYxzGJuq/)

No comments:
Post a Comment
আপনার যে কোন মত জানাতে পারেন নিঃসঙ্কোচে, আপনি প্রাসঙ্গিক মনে করলে।