Search

Showing posts with label স্যালুট. Show all posts
Showing posts with label স্যালুট. Show all posts

Wednesday, August 12, 2026

আমাদের একজন সিদ্দিক মাহমুদুর রহমান!

"আমার নাম সিদ্দিক মাহমুদুর রহমান। আমার বয়স ৮১ বছর এবং আমি রাজধানী ঢাকার একটি ছোট অ্যাপার্টমেন্টে একা থাকি।

আমি অনেকগুলো চাকুরী করেছি, ওষুধ কোম্পানী, হাসপাতাল, সংবাদপত্র, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট  কোম্পানী, বাইশ বছর আগে অবসর নেওয়ার পর থেকে আমার জীবন ক্রমশ নীরব হয়ে উঠতে লাগলো শুরু। ২০০৯ সালে আমাদের একমাত্র সন্তান ক্যান্সারে মারা গেল। সারা বাড়িতে আমি আর আমার স্ত্রী! স্ত্রী এমনিতেই শান্ত-চুপচাপ, সমস্ত জীবনে কথা বলতো কম! সন্তান চলে যাওয়ার পর ও আরও চুপ হয়ে গেল। নামাজ-রোজা করতো, কোরআন পড়তো আর নিঃশব্দে কাঁদতো। দু'জনে সকালে নিয়ম মতো নাস্তা করতাম, দুপুরে আর রাতে নিয়ম মেনে খাবার খেতাম। পরের দিন একই নিয়ম!  আমার স্ত্রী এক সময় অসুস্থ হয়য়ে পড়লো। ওষুধ খেতো না, নিয়ম মানতো না। অবশেষে সে নিঃশব্দেই চলে গেল!

প্রথমে আমি ভেবেছিলাম: 'অবশেষে, নিজের জন্য কিছু সময়...'।

আমি কল্পনা করেছিলাম যে আমি শান্তভাবে বাজার করবো, রাঁধবো, খাবো! কিছু কাজ করবো যা আমি সবসময় করতে চেয়েছিলাম।

কিন্তু দিন-দিন, এই নীরবতা আমার পরিচিত সব ক্লান্তিকেও ছাপিয়ে যেতে লাগল।

গোটা শহরে আমার অনেক আত্মীয়-স্বজন, কিন্তু কেউ  আমার খোঁজ নেয় না! ওদের নিজেদের পরিবার, নিজেদের দায়িত্ব, নিজেদের জীবন নিয়ে ব্যস্ত। আমি সেটা বুঝি।

মাঝে-মাঝে আমার মনে হয় ওরা সবাই আমাকে ভুলে গেছে। একবার আমি আমার এক বন্ধুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম:

তোমরা কেন চাও না আমি তোমাদের আড্ডায় আসি …'?

ও শান্ত ঠান্ডা ভাবে উত্তর দিয়েছিল:

'তুমি সবসময়ই ঝামেলা করো, তীর্যক কথা বলো, সবার ভুলগুলো ধরিয়ে দাও! তোমার স্বভাবটাই এমন…'!

আমি চুপ করে গেলাম। বার্তাটা স্পষ্ট ছিল: এখানে তোমার আর কোনো জায়গা নেই।

আমার সব দিনই একরকম: আমি সকালে উঠে বাথরুম সারি, নামাজ পড়ি, নাস্তা বানাই, বাজার করতে যাই, শুধু নিজের জন্যই রান্না করি। বাড়িতে মানুষের কণ্ঠস্বর শুনতে ইচ্ছে করলে টিভি চালু রেখে দিই।

প্রথমে আমি ভেবেছিলাম এটা হয়তো সাময়িক। তারপর অদ্ভুত কিছু উপসর্গ দেখা দিল: মাথা ঘোরা, গ্যাস্ট্রিক, অস্থিরতা, নির্ঘুম রাত।

আমি ডাক্তার দেখিয়েছি। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলেন। শরীরের সব ঠিক আছে।

তারপর ওদের একজন আমাকে বললেন: 'সিদ্দিক সাহেব! আপনার কোন বড় অসুস্থতা নেই। আপনি নিঃসঙ্গতায় ভুগছেন'।

আর এই বাক্যটাই যে কোনো রোগ নির্ণয়ের চেয়ে আমাকে বেশি ব্যথিত করল। কারণ নিঃসঙ্গতার কোনো ওষুধ নেই।

আমি বাইরে কোথাও যাই না! পার্কে না, সভায় না, গানের, নাটকের অনুষ্ঠানে না।  বাইরে সবাই যার যার কাজে-অকাজে ব্যাস্ত! সবাই তাড়াহুড়ো করছে। সবাই ছুটছে যাচ্ছে। আর আমি... আমি এখানেই থেকে যাই।

আমি প্রায়ই নিজেকে জিজ্ঞেস করি: আমি কি কিছু ভুল করেছি? আমি আমার সমস্ত জীবন সকলের জন্য সময় দিয়েছি, সকলের কাজ করে দিয়েছি, আমার জীবনের অনেক দিন, মাস, বছর উৎসর্গ করেছি। অথচ আজ আমি একা!

আমি কারও কোন সহানুভূতি চাইছি না কিন্তু আমি কি সত্যিই একজন খারাপ মানুষ ছিলাম? নাকি এটাই আধুনিক জীবনের ছন্দ, যেখানে একজন বৃদ্ধের কোনো জায়গা নেই?

কেউ কেউ আমাকে বলে, 'একজন সঙ্গী খুঁজে নাও, ইন্টারনেট ব্যবহার করে দেখো'।

কিন্তু আমি পারি না। আমি বিশ্বাস করি না। এত বছর একা থাকার পর, আমার নতুন করে শুরু করার শক্তি নেই। আর আমার স্বাস্থ্যও আর আগের মতো নেই।

আমি আর কাজ করতে পারি না। ক্রমে শক্তিহীন হয়ে পড়ছি! এখন শুধু নীরবতা। আমি কখনো কোনো বড় কিছু আশা করি না।... " 

...

মাত্র ৬ মাস আগে এই লেখার লেখক সিদ্দিক মাহমুদুর রহমান পরশুদিন মারা গেছেন আহসানিয়া মিশন ক্যান্সার হাসপাতালে। 

ডাক ব্যবস্থা নিয়ে তাঁর লেখালেখির শুরু ১৯৮৭ সালে। কয়েকজন বিদেশি বন্ধুর অনুরোধে তিনি মুক্তিযুদ্ধকালীন ডাকব্যবস্থা নিয়ে ইংরেজিতে একটি প্রবন্ধ লিখেন। এরপর ১৯৯১ সালে বাংলা একাডেমি থেকে তার একটি অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়।


এক সময় শখ ছিল ডাকটিকিট সংগ্রহ করার। মুক্তিযুদ্ধের পর বিদেশের গবেষকরা বাংলাদেশের ডাকব্যবস্থা সর্ম্পকে জানতে চায়। তখন সিদ্দিক তাদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতেন। এভাবে উত্তর দিতে গিয়ে তিনি অনেক কিছু জানতে পারেন। এদিকে সমানে বই প্রকাশ হতে থাকে। এক এক করে বাংলাদেশের ডাকব্যবস্থা, ডাকটিকিট, ধাতব ও কাগজি মুদ্রাব্যবস্থার ইতিহাস নিয়ে তার ৩০টি বই প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ ব্রিটেনের রয়েল এশিয়াটিক সোসাইটি তাকে উক্ত প্রতিষ্ঠানের ফেলো নির্বাচিত করে।

গেল ৩৭ বছরে বাংলাদেশের ডাকব্যবস্থা, ডাকটিকিট, ধাতব ও কাগজি মুদ্রা নিয়ে ৩০টি গবেষণা করেছেন। তার আগে দেশের ডাক ব্যবস্থা, ডাকটিকিট, আধুনিক ধাতব ও কাগজ মুদ্রার ইতিহাস নিয়ে এত বেশি গবেষণা আর কেউ করেছেন বলে জানা যায় না। 

তিন হাজারের বেশি বাংলাদেশি ডাকটিকিট সংগ্রহ করেছিলেন সিদ্দিক। তার কাছে ভারত, জার্মানির টিকিটও ছিল। কিন্তু যখন মাত্র ২৫ বছর বয়সে একমাত্র ছেলে ক্যানসারে মৃত্যুবরণ করে, সিদ্দিক এই শোকে এতটাই ভেঙে পড়েন যে জমানো শত শত ডাকটিবিকটের সংগ্রহ, খাম, চিঠি আগুনে পুড়িয়ে ফেলেন। এর আগে কিছু ডাক টিকিট বিক্রি করেছিলেন। ভাগনীর বিয়েতে গহনা ও বরের স্যুট ও ঘড়ি কেনার জন্য।

অসংখ্য গবেষণা করলেও ডাক, মুদ্রা ব্যবস্থা নিয়ে সিদ্দিকের সংবাদপত্রে প্রকাশিত লেখা তেমন নেই। না থাকার পেছনে তার এক বুক অভিমান রয়েছে। নব্বই দশকে যখন ডাকটিকিট নিয়ে লেখা দিতেন। সংবাদপত্রগুলো সেভাবে তা ছাপতো না। এ কারণে মন খারাপ করে আর কখনো কোনো সংবাদপত্রে তিনি লেখা পাঠাননি। ডাকব্যবস্থা ও ডাকটিকিট নিয়ে লেখা ছেপে তা মানুষদের মধ্যে বিলি করতেন। যাতে তারা এর গুরুত্ব বুঝতে পারে। 

তাঁর মৃত্যুর পরে তাঁকে নিয়ে কিছু লেখা দেখে ভদ্রলোকের ওয়ালে কিছু লেখা দেখলাম। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ডাকব্যবস্থা নিয়ে লেখালেখি শুরু করলেও চেতনা শিবিরের মানুষ ছিলেন না। বরং ইন্ডিয়ান আধিপত্যবাদের প্রবল বিরোধী ছিলেন। হয়তোবা সেজন্যই কি যথেষ্ট মনোযোগ পাননি?

* তথ্য সহায়তা: Imran Abdulla (https://www.facebook.com/share/18SfzdRw4u/ ) 

WhatsApp