Saturday, April 14, 2018

রঙিন চশমা!

কোটা সংস্কার নিয়ে দেশ যখন উত্তাল তখন আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে অনেক কিছুই লক্ষ করলাম। ‘বাংলা ট্রিবিউন’ নামের একটা ওয়েব পোর্টাল আছে। এদের যন্ত্রপাতি এতোটাই অত্যাধুনিক যে এরা তারেক রহমানের ফোনালাপও ফাঁস করে দিতে পারে। বিমল আনন্দে আমাদের চোখ ছোট হয়ে আসছে বলে আমাদের কারও এটা জানার আগ্রহ নেই যে কোন নিতল থেকে উঠে আসে এমন যন্ত্রপাতি যা যে-কারও ফোনের আদ্যপান্ত জেনে যেতে পারে। বালকবেলায় পড়া কবিতার প্রথম ছত্র মাথায় কেবল ঘুরপাক খায়, ‘পুত্র, আমি তোমার জন্য একটি বিষবৃক্ষ রোপণ করেছি…’।

তো, এই বাংলা ট্রিবিউনে মুহম্মদ জাফর ইকবাল মহোদয়ের একটা লেখা পড়ার সৌভাগ্য হল। “দাবি, আন্দোলন ও আন্দোলন প্রক্রিয়া” নামের এই লেখায় তিনি তাঁর ভাবনা নিয়ে লিখেছেন। তিনি কোটা সংস্কার সম্বন্ধে ভাল ধারণা রাখেন না লোকজন তাঁকে বুঝিয়ে দিয়েছে যে, সরকারি মূল চাকরির ৫৬ শতাংশ নানা ধরনের কোটা।

আমরা সোজা ভাষায় যেটা বলি 'দা থেকে আছাড় বড়' এটার সংস্কার হতেই পারে এটা দোষের কিছু না। কোটা সংস্কারের পক্ষে-বিপক্ষে কেউ তাঁর ভাবনা প্রকাশ করবেন সেটা এখানে এই আলোচনার বিষয় না। কিন্তু তিনি প্রচন্ড ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন যে বিষয়টি নিয়ে সেটা হচ্ছে, তিনি লিখেছেন, 'বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েদের সাত খুন মাপ, তারা যখন খুশি পুরো শহর, পুরো দেশের মানুষকে জিম্মি করে ফেলতে পারে, তাদের কারও কাছে জবাবদিহি করতে হবে না। ঢাকা শহরকে ছেলেমেয়েরা অচল করে দিয়েছে। …তাদের এই কর্মকান্ডে যে শিশুটি স্কুলে যেতে পারেনি, যে রোগীটি হাসপাতালে যেতে পারেনি, গার্মেন্টসের যে মেয়েটি কাজে যেতে পারেনি, যে রিকশাওয়ালা তার পরিবারের খাবার যোগাড় করতে পারেনি।…'। ব্লা-ব্লা-ব্লা।

স্যারের লেখাটা পড়ে আমার এক চোখে পানি এক চোখে জল চলে এলো। আহারে-আহারে, কী মায়া গো মানুষটার! ও ভালমানুষ গো, আপনি রঙিন চশমার কারণে তো জানেনই না যে এটাই হচ্ছে আমাদের খাসলত! আমরা রাস্তা ব্যতীত কোনও কাজ করতে পারি না। আমরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে গফ করি, রাস্তায় বাজার বসাই, রাস্তা আটকে এটা-সেটা ফেলে রাখি এমনকি আমরা সমস্ত আবর্জনা রাস্তায় ছুড়ে ফেলি- টিব্যাগ, ছেঁড়া স্যান্ডেল, ফলের খোসা (আগেও আমরা অসভ্য ছিলাম। ময়লা ফেলতাম রাস্তার পাশে। এই দু-চার বছর হল এখনকার 'কলচর' হচ্ছে রাস্তার মাঝখানে ফেলা )। যখন পথচারি থাকি তখন যান্ত্রিক বাহনকে গালি দেই যান্ত্রিক বাহনে থাকলে পথচারিকে। রাস্তা বলতে কোনও জিনিস আমাদের অভিধানে নাই- টাট্টিখানার পেছন, এর-ওর বাড়ির পাশ দিয়ে হাঁটতে পারলেই আমরা সুখি। ফায়ার ফাইটিংয়ের গাড়ি বা অ্যামবুলেন্স নিয়ে মাথা ঘামাবার সময় কোথায় আমাদের।

এরপর বুঝলেন স্যার, খাসলত ছাড়িয়ে যায় ‘রাসলতে’। এই রাস্তা নিয়ে ‘রাস্তামি’ করতে আমাদেরকে শিখিয়েছেন আমাদের রাজনীতিবিদ মহোদয়গণ। কেউ বৈদেশ গমণ করবেন দাও রাস্তা আটকে তো কেউ কোর্টে হাজিরা দিতে যাবেন দাও রাস্তা বন্ধ করে। আর গণতন্ত্র রক্ষা দাবী-দাওয়া আদায়ের জন্য রাস্তা ব্যতীত জায়গা কোথায় আমাদের, বলুন! আহা, তাহলে আন্দোলন জমে না যে। বুঝলেন, কালে-কালে আমরা হয়ে গেলাম ‘রাস্তার লোক’!

যাই হোক, অন্য কেউ হলে আমি এই ‘রাস্তালাপে’ যেতাম না কিন্তু জাফর ইকবাল ভাজনেষু, এই বেলা ছেলেমেয়েদের রাস্তা আটকে রাখায় আপনার চটাচটি দেখে অনেকখানি বিভ্রান্তির মধ্যে আছি কারণ অন্য সময় রাস্তা নিয়ে ‘রাস্তামি’ কালে আপনাকে তো চটতে দেখিনি যে বড়! প্রধান দুটি রাজনীতিক দল বছরের-পর-বছর ধরে হরতালের নামে কেবল ঢাকা না গোটা দেশ অচল করে দিয়েছিল কিন্তু অমায়িক পরিহাস কেউই কিন্তু এক সেকেন্ড পূর্বেও ক্ষমতা ছাড়েনি।
আহ, সেই সময়কার রাস্তা! তখন হয়তো আপনি আপনার লম্বা-লম্বা পা ফেলে আকাশপানে তাকিয়ে রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করতে পেরেছেন কিন্তু আমরা সাধারণ মানুষ পারিনি, বুঝলেন। আমাদেরই কারও স্বজনের গা থেকে কাপড় খুলে বিবস্ত্র করে ফেলা হয়েছে তো কারও গায়ে পেট্রল বোমা, গানপাউডার দিয়ে ঝলসে ফেলা হয়েছে। চড়চড় করে যখন গায়ের চামড়া পোড়ে তখনকার অনুভূতিটার এক শতাংশও কী আমাদের পক্ষে অনুমান করা সম্ভব, ডিয়ার স্যার?
চুতিয়া মিডিয়া চালু করল 'ঢিলেঢালা হরতাল' [১]। সিম্পল, যে হরতালে একটাও লাশ পড়বে না সেই হরতাল তাদের ভাষায় বেজায় পানশে!

আপনি তো আবার আলাভোলা একজন মানুষ দেশ-দশের কোনও খবর রাখেন না তবুও একটু মনে করিয়ে দেই। আপনি যখন প্রথম আলো দৈনিকে ‘সাদাসিধে কথা’ নামে নিয়মিত কলাম লিখতেন সেই দৈনিকেই ১০ এপ্রিল ২০১৩ সালে শশী আক্তারের এই আহাজারিটা ছাপা হয়েছিল, ‘হরতালে মা মইরা গেল রে’। ঘটনা সামান্য। কিসসু না, রাস্তামির কারণে অ্যাম্বুলেন্স আসতে পারেনি!
হরতালের প্রসঙ্গ কেন এলো? এই আপনিই সাদাসিধে কলামে লিখেছিলেন, "তোমাদের কাছে ক্ষমা চাই" শিরোনামে, 'শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে হরতালের আওতামুক্ত রাখা যায় না? হরতালের দিনেও ছেলেমেয়েরা স্কুলে যাবে…'।

হোয়াড আ আইডিয়া, ম্যান! হরতালে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আওতামুক্ত অতি চমৎকার-উপাদেয় বটে। প্রকারান্তরে আপনি হরতাল মেনে নিলেন কিন্তু চিঁ চিঁ করে যেটা বললেন, শিক্ষা জাতির মেরু-‘দন্ড’। ভাগ্যিস, আপনি এই দন্ডটার কথা বিস্মৃত হননি। আচ্ছা স্যার, বিশ্বশিক্ষক, সেই সময়ে একটা মেয়ে ঢাকা বা অন্য জেলা থেকে আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ে আসবে ভর্তি পরীক্ষা দিতে। সে কি আপনার বিদ্যালয়ের পালকি দিয়ে আসবে নাকি তৎকালীন রাষ্ট্রপতির হেলিকপ্টারে করে? আচ্ছা, আপনি এটা কেন বললেন, নিজে একজন শিক্ষক বলে? একজন শিক্ষক কি জন্ম নেয় শিক্ষক হয়ে মারাও যায় শিক্ষক হয়ে! শিক্ষার দবদবায় তার মানুষ হওয়ার প্রয়োজন নাই, নাকি…!

সহায়ক সূত্র:
১. ঢিলেঢালা হরতাল...http://www.ali-mahmed.com/2015/01/blog-post_30.html

No comments: