Saturday, January 6, 2018

তাঁদের না-বলা কথা...।

লেখাটি লিখেছেন মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর [১] সন্তান Tanvir Haider Chaudhury:
"না, তাঁরা 'হাসিমুখে' মৃত্যুকে বরণ করেননি। কয়েকদিন ধরে দেখছি ছোট ছোট ভিডিও ক্লিপ ছাড়া হচ্ছে ইন্টারনেটে। তার একটায় দেখানো হচ্ছে একজন মধ্যবয়সী ব্যক্তিকে অপহরণের দৃশ্য। ভদ্রলোকের চোখ বেঁধে, তাঁকে টেনে হিঁচড়ে গাড়িতে তুললো কিছু উর্দিপরা সৈনিক, এক বৃষ্টিস্নাত সন্ধ্যায়। প্রথমে হকচকিয়ে গেলেন ভদ্রলোক, কিন্তু গাড়িতে বসে একসময়ে তাঁর মুখে ফুটে উঠলো হাসির রেখা।
আরেকটাতে দেখানো হয় এলোমেলো চুলের, অবিন্যস্ত কাপড়ের এক যুবককে। বোঝাই যাচ্ছে তাকে নির্যাতন করা হয়েছে। তার সামনের টেবিলে একটা পিস্তল রাখে এক মিলিটারি অফিসার। সে চোখ তুলে তাকায়, আর তার মুখ জুড়ে ফুটে ওঠে তাচ্ছিল্যের হাসি।

এক টেলিকম অপারেটরের উদ্যোগে নির্মিত এই ভিডিও ক্লিপগুলো। বারবার করে এগুলোয় যা বলা হয়েছে তার সারমর্ম হলো এই: একাত্তরের শহীদ মুক্তিযোদ্ধা এবং বুদ্ধিজীবীরা হাসিমুখে প্রাণ দিয়েছেন, যাতে আমরা একটা সুন্দর দেশ পাই। যাতে বাংলাদেশ ভালো থাকে।
প্রশংসনীয় উদ্যোগ। কিন্তু 'হাসিমুখে' মৃত্যু বরণের কথা কেন বলা হলো? এই অতিকথনে কি তাঁদের আত্মত্যাগের মর্যাদা কিছু বাড়িয়ে দেওয়া হয়? আমার বাবার নাম, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী। তাঁকে উনিশশো একাত্তর সনের চোদ্দই ডিসেম্বর ঠিক যেমন দেখানো হয়েছে ভিডিওতে, তেমনিভাবে চোখ বেঁধে অপহরণ করা হয়েছিল। এরপর আর তাঁর কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। অমিল শুধু এক জায়গায়: আমাদের জানা মতে এই শেষ যাত্রার পথে তাঁর মুখে হাসি ছিল না। আমাদের এই সুপ্রিয় স্বাধীন দেশের বয়স এ বছর ছেচল্লিশ হলো। একই সাথে আমরা যারা একাত্তরের শহীদদের সন্তান, তাদের বয়স পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই, কোনক্ষেত্রে পেরিয়েছে। আমরা ভুলে যাই যে যখন আমাদের মা-বাবাদের নির্মমভাবে নির্যাতন করে হত্যা করা করা হয়, তখন তাঁদের বয়স ছিলো আমাদের চাইতে কম।

মৃত্যু কী খুব সহজ ব্যাপার? এইরকম বীভৎস মৃত্যু? সারাজীবন কঠোর পরিশ্রম করে আমার বাবা মাত্র সুখের মুখ দেখতে শুরু করেছিলেন। একাত্তরে তিনি পঁয়তাল্লিশে বছর বয়সে পা রেখেছিলেন; তাঁর দুই শিশুপুত্রের বয়স ছিলো সাড়ে সাত এবং চার। তাদেরকে ছেড়ে, তাঁর প্রিয় সহধর্মিণীকে রেখে, কতটা অতৃপ্তি, ক্ষোভ আর কষ্ট নিয়ে তিনি চলে গেলেন? তাঁর সতীর্থদের বেলায়ও পরিস্থিতি তো একই রকম ছিল। প্রায় সবারই শিশুসন্তান ছিল, সবার বয়স চল্লিশের কোঠায়- তাঁরা কেউ কি মৃত্যুর মুখে যেতে পেরেছেন প্রশান্তির অনুভূতি নিয়ে?
অথচ তাঁদের মুখেই আমরা ওই শেষ যাত্রায় হাসি জুড়ে দিচ্ছি? এ এক অন্যায়, গুরুতর অন্যায়। চিরদিন তাঁরা স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন। এক উদার, অসাম্প্রদায়িক, সংস্কৃতিমনা দেশের। শেষ মুহূর্তে এটাও বুঝেছিলেন যে সেই দেশের দর্শন তাঁদের কোনদিন মিলবে না। কতটা হাহাকার বুকে নিয়ে তাঁরা জীবনের মায়া ছেড়ে গেছেন?

আমার আপনার মতো রক্ত মাংসের মানুষ ছিলেন তাঁরা। আকাঙ্খা ছিল তাঁদের, অনুরাগ ছিল, এই পৃথিবীর প্রতি মায়া ছিল। সব মোহ-মমতার উর্ধ্বে স্থান দেওয়া হলে তাঁদের প্রতি অসম্মানই করা হবে। মহামানবের আসনে বসিয়ে এই অসামান্য মানুষদের অবদানকে ছোট করার কোন প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না।"

* উপরে উল্লেখিত লেখাটা লিখেছেন মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর সন্তান Tanvir Haider Chaudhury। তাঁর অনুমতিক্রমে লেখাটি হুবহু ছাপা হলো। মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীকে [১] নিয়ে লিখেছিলাম ২০১০ সালে। ওই লেখার অংশবিশেষ, "...স্বজনদের চোখে চোখ রাখার সময়ও কী তিনি ভাবতে পেরেছিলেন এটা তাঁর শেষ যাত্রা- ওয়ান ওয়ে জার্নি, যেখান থেকে মানুষ আর ফিরে আসে না! পেছনে পড়ে থাকে সন্তানদের গায়ের গন্ধ-থেকে যায় কেবল কিছু স্মৃতি! মানুষটার  অন্য ভুবনের কষ্টের কথা আমাদের আর জানা হবে না। তাঁর মৃত্যুর পূর্বে মস্তিষ্ক খানিকটাও সচল থাকলে তাঁর সন্তানদের গায়ের গন্ধ তাঁর মৃত্যুযন্ত্রণা কী অনেকখানি লাঘব করেছিল? জানা হবে না, জানা হবে না আর..."!

আমরা এখন বড় চেতনাবাজ হয়ে গেছি!  এই তো সেদিন মাইকিং শুনছিলাম মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানে হাউজির (জুয়া) আয়োজন। কেকা ফেরদৌসি 'মুক্তিযোদ্ধাদের খিচুড়ি' রান্নার অনুষ্ঠানে ভাইয়ের ইলেকট্রনিক মিডিয়া খিচুড়ি লেপে ফাটিয়ে ফেলেন। অশ্লীলতার সংজ্ঞা ব্যাপক। কে বলে কেবল নগ্ন গাত্রই অশ্লীল? আমার চোখে এইসবই অশ্লীলতা। কালে-কালে আমরা আমাদের খুব আবেগের জায়গাটাকে বানিয়ে ফেলছি একটা পণ্য রূপে। আমাদের অনেকের কাছে মুক্তিযুদ্ধের আবেগ (!) এখন একটা বিক্রয়যোগ্য পণ্য [২]

সহায়ক সূত্র:
১. নিধন, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী: http://1971-bangladesh.blogspot.com/search?q=%E0%A6%AE%E0%A7%8B%E0%A6%AB%E0%A6%BE%E0%A6%9C%E0%A7%8D%E0%A6%9C%E0%A6%B2+%E0%A6%B9%E0%A6%BE%E0%A7%9F%E0%A6%A6%E0%A6%BE%E0%A6%B0+%E0%A6%9A%E0%A7%8C%E0%A6%A7%E0%A7%81%E0%A6%B0%E0%A7%80
২. বিক্রয়যোগ্য পণ্য: http://www.ali-mahmed.com/2009/10/blog-post_07.html

No comments: