Thursday, July 14, 2016

শিবরামের শার্সি!

কী ভয়াবহ, কী ভয়ংকর! “তিন জঙ্গিনেতার বিচারের অনুমতি পাওয়া যাচ্ছে না” (প্রথম আলো, ১২ জুলাই, ২০১৬)। আমি আমার সমস্ত জীবনে যেসব হতবাক হওয়ার মত কথা শুনেছি এটা এর মধ্যে শীর্ষে থাকবে এতে অন্তত আমার কোনও সন্দেহ নেই। এই জঙ্গিনেতাদের মধ্যে আছে জেএমবি শীর্ষ নেতা মহতরম জনাবে-আলা মাওলানা সাইদুর রহমান, আনসারউল্লাহ বাংলা টিমের প্রধান জসিম উদ্দিন রাহমানী আরও আছেন হিযবুল তাহরীরের প্রধান সমন্বয়ক মহিউদ্দিন আহমেদ।
এদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে কিন্তু বছরের-পর-বছর চলে যাচ্ছে কিন্তু মামলা শুরু করার জন্য অনুমোদন পাওয়া যাচ্ছে না। এরমধ্যে একজনের মামলার অনুমোদন ঝুলে আছে তা প্রায় ৬ বছর হলো।

এই বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জান খানের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি তিনি খোঁজ নিয়ে দেখবেন’।
আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এই বিষয়ে বলেন, ‘তিনি শিগগিরই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন’।
এই হচ্ছে আমাদের দেশের খোঁজখবর রাখার নমুনা! আমাদের দেশের মন্ত্রীরা কেমন অকাজে জড়িয়ে থাকেন এর একটা নমুনা দেই। এক মন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকার লোকজনেরা এলাকায় আনন্দ-মিছিল বের করলেন রং ছিটিয়ে ছিটাছিটি খেলা খেললেন। সামনে-পেছনে ১০-১২ জন পুলিশ। ঘটনা হচ্ছে এলাকার কলেজ নাকি মন্ত্রী মহোদয়ের সদয় হস্তক্ষেপে সরকারীকরণ করা হয়েছে। বিষয়টা সত্য হলেও ভাবখানা এমন মন্ত্রী সাহেব তালুক বিক্রি করে এই কর্মটা করেছেন। বাস্তবতা হচ্ছে দেশে কেবল এই কলেজই না প্রায় প্রত্যেক উপজেলায়ই একটা করে কলেজ এই আওতায় পড়েছে। পাবলিকও জানে মন্ত্রী মহোদয় কি পছন্দ করেন।

এদিকে ফ্যানাটিক খুনি নিবরাসকে ধরার জন্য পুলিশের বিশেষ উদ্যোগ ছিল না। যথাসময়ে তাকে ধরা হলে হয়তো গুলশানের ওই নারকীয় খুনগুলো এড়ানো যেত। যাই হোক, একজনকে ধরা হবে, অভিযোগপত্র দেওয়া হবে তার বিরুদ্ধে মামলা শুরু হবে এখানে চিঠি চালাচালির কী আছে সেটা আমাদের মত নির্বোধ ট্যাক্সপেয়ি লোকজনের বোঝা মুশকিল। অবশ্য বিবিসিকে এর একটা ব্যাখ্যা দিয়েছেন আইনমন্ত্রী, ”এটা আইনের একটি রক্ষাকবচ ছিল। সিরিয়াস ক্রাইমে দুটো জিনিস কাজ করে- একটা হচ্ছে অযথা কাউকে হয়রানি করলে…অপরদিকে এটার সিরিয়াসনেস বোঝার জন্য…সে কারণেই অনুমোদন প্রয়োজন”।
অতি উত্তম, না-জানলে আমরা বুঝব কেমন করে অধম!
কিন্তু এমতাবস্থায় এর অপব্যবহার কি হচ্ছে, এটা জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী আরও জানান, “এখন পর্যন্ত সরকার এর অপব্যবহার করেছে এ রকম নজির দেখানো যাবে না”।
এই অমৃতবাণী শুনে হাসব না কাঁদব বুঝে উঠতে পারছি না!

এমনিতে ক্রসফায়ার করে কাউকে মেরে জঙ্গি বলে দিলে হত্যাকারীর জবাবদিহি করা লাগে না। প্রতিপক্ষকে কাবু করারও এ এক অনন্য উপায়। কেবল আইএস আছে এটা স্বীকার করা চলবে না। আরে, আইএস আবার কবে এটা বলল, আমরা আদি-অকৃত্রিম আমাদের কোথায় কোনও শাখা নেই।
ঘুমকাতুরে লোকজনেরা চোখ কচলে সকালে যখন জানতে পারলেন অপারেশন ‘থান্ডার বোল্ডের’ ইতি টানার পর যে জিম্মিদের প্রায় সবাইকে খুন করা হয়েছে [১] অথচ আইএসের বরাতে ‘নিশাচর ড্রাকুলা’ টাইপের লোকজনেরা মধ্য-রাতেই জেনে গেছেন যে জিম্মিদেরকে খুন করা হয়েছে।
আফসোস, কে এদেরকে বোঝাবে আইএস কেবল একটা সংগঠনই না আইএস একটা মতাদর্শ-ভাবাদর্শ। এবং এটা এরা পৃথিবীময় ছড়িয়ে দিচ্ছে। অঝোর বৃষ্টিতে ছাতার খোঁজ না-করে বৃষ্টি যা যা, বলে গান গাইলে অন্তর্বাসও যে বৃষ্টিতে চুপচুপে হবে এতে সন্দেহ কী!

তো,‘জঙ্গি আইয়ে রে’,এটা শুনে-শুনে কানের পোকা তো পরের কথা কানের ময়লা পর্যন্ত সাফ। জঙ্গি দমনে সরকার নাকি জিরো টলারেন্স। যেখানে জঙ্গি শীর্ষ নেতাদের বিচারের অনুমোদন ৬ বছর লাগিয়ে পাওয়া যাচ্ছে না সেখানে মন্ত্রী মহোদয় বলছেন এর অপব্যবহার হচ্ছে না। তা জিরো টলারেন্সের পর কী ‘মাইনাস টলারেন্স’ যোগ হবে?
আমাদের এই বিচিত্র দেশের ড্রাইভার সাহেবরাও বড়ো বিচিত্র। অর্থমন্ত্রীর কাছে কোনও সমস্যাই সমস্যা না তাই তিনি যথারীতি মন্তব্য করেছেন, জঙ্গি হামলা এটা কোনও বিষয় না।
আর আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী বলেছেন, "জঙ্গি হামলায় দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়নি"। মন্ত্রী মহোদয় যেহেতু পাল্লা দিয়ে মেপে এটা বের করেছেন তাই এতে সন্দেহ পোষণ করা সমীচীন হবে না। আমরা আনন্দের সঙ্গে এটা বলতে পারি এতে করে দেশের মুখ ফকফকা হয়েছে। এই গ্রহে আমাদের মাথা এমন উঁচু হয়েছে যে তা ভাষায় প্রকাশ করে কে!  

এই প্রসঙ্গের এখানেই ইতি টানি। ভারী-ভারী বিষয় নাহয় থাকুক। শিবরাম চক্রবর্তীর ওই লেখাটা সবাই জানেন তবুও বলি। দুজন ট্রেনযাত্রী বেজায় ক্ষেপে গেলেন। সমস্যাটা মারাত্মক! একজনের ঠান্ডা লাগছে তাই তিনি চলন্ত ট্রেনের শার্সি নামিয়ে দিচ্ছেন। এদিকে অন্যজনের গরম লাগছে বিধায় তিনি শার্সিটা উঠিয়ে দিচ্ছেন। দুজনের ‘মুন্ডফাঁক’ হয়-হয়। ট্রেন থামলে গার্ড সাহেব পান চিবুতে চিবুতে হেলেদুলে এগিয়ে এসে বিস্ময় প্রকাশ করলেন, ট্রেনের বগির এই জানালার তো কাঁচই নেই! কোন-এক বখাটে ঢিল মেরে আস্ত কাঁচই হাপিস করে দিয়েছে। এখন বেচারা জানালাকে উঠবস করাবার অর্থ কী!

আসলে কাঁচবিহীন একটা জানালার আমাদের খুব প্রয়োজন তাহলে ‘গুছলেংটি’ দিয়ে 'হুদাহুদি' ঝগড়া করতে খুব সুবিধে হয়…।

১. শিরোনামহীন: http://www.ali-mahmed.com/2016/07/blog-post_8.html