Saturday, February 13, 2016

নায়কোচিত।

এঁরা নায়ক নন। ‘নায়ক’ মারাত্মত জিনিস! নায়কদের অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে যথাসময়ে ভিলেনের হাত থেকে নায়িকাকে বাঁচানো- এখানে ‘দিরং’ করার কোনও প্রকারের সুযোগ নাই তাহলে যে নায়িকার সর্বনাশ হয়ে যায়। কি সর্বনাশ হবে? আহা, সেটা বুদ্ধিমান পাঠকের কাছে বলে বোকামী করার আদৌ কোনও প্রয়োজন নাই।
এঁদেরকে বড় জোর নায়কোচিত বা চালু কথায় নায়কের মত মত বলা চলে।

এমনই একজন পুলিশম্যান যার সঙ্গে পূর্বেও কাজ করার সুযোগ হয়েছে আমার। ষ্টেশনে হরদম বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখিন হতে হয় আমাকে। তখন এর-ওর সহায়তার প্রয়োজন দেখা দেয়। স্টেশনের দায়িত্বে থাকা এই পুলিশম্যানকে আমি বললাম, ‘আমাকে একজন মেথরের খোঁজ দিতে পারেন’?
ভাগ্যিস, তিনি এটা শোনার পর পিস্তল নাচিয়ে আমাকে এটা বলে বসেননি, আমি কী মেথরের ‘বিজিনিস’ করি!
এই মানুষটা স্টেশনে পড়ে ছিলেন দুদিন ধরে। প্রথম-প্রথম অল্পস্বল্প খাবার খেলেও পরে আর খেতে পারতেন না। সম্ভবত বার্ধক্যজনিত সমস্যা। চলনশক্তিহীন এই মানুষটার পরিচ্ছন্ন হওয়ার সুযোগ নাই বিধায় কাপড়চোপড় নষ্ট করে ফেলেন। আমার অভ্যস্ত নাকও সইতে পারে না, সামনে গিয়ে দাঁড়ালে মনে হয় পেটের ভেতরের সব বেরিয়ে আসবে। কিন্তু পরিচ্ছন্নকর্মী পাব কোথায়! পরিচ্ছন্নকর্মীর এমন আকাল হলো কেমন করে, খুঁজে খুঁজে হয়রান‍!
যাই হোক, শেষপর্যন্ত একজনকে রাজি করানো গেল। রাজি করাতে গিয়ে ওই মানুষটার সঙ্গে কেমনতরো 'বাতচিত' করতে হয়েছিল সেটার উল্লেখ এখানে অপ্রয়োজনীয়। ওই মানুষটার কাছে আমি কৃতজ্ঞ কারণ বড়ো দরদ দিয়ে তিনি সাফসুতরো করেছিলেন। সত্য বলতে কি এই সমস্ত মানুষের সামনে নিজেকে বড়ো তুচ্ছ মনে হয়!
এবেলা চুপিচুপি এটাও বলে রাখি। এখন আমার নিজেরই সমস্যার অন্ত নেই এই সমস্ত জটিলতা এড়াতে পারলে বেঁচে যাই। লম্বা-লম্বা পা ফেলে এই সব স্থান থেকে সরে পড়তে পারলে বেশ হয়, কিন্তু…! একটা কিন্তু রয়ে যায়। হায়, পায়ের গতি যে স্লথ হয়ে আসে। পা চলে না কেন, এর হয়তো উঁচু দরের ব্যাখ্যা রয়েছে সেটা জেনে আমার কাজ নেই। নিচু স্তরের আলাপটা হচ্ছে এই রকম আমার পায়ের জুতো বেঢপ, ভারী। তাই চট করে সরে পড়াটা মুশকিল হয়ে যায়।

পরদিন গিয়ে দেখি স্থানটা শূন্য, মানুষটা নেই। আমি ধারণা করলাম স্টেশনের দায়িত্বে থাকা কেউ মানুষটাকে কোনও-একটা ট্রেনে তুলে দিয়েছে। ট্রেন এই সমস্ত অসহায় মানুষকে যেখানে খুশি নিয়ে চলে যাক, এখানকার পর্ব তো চুকে গেল। আপাতত এই স্টেশন সমস্যামুক্ত! আমরা এমনটাই করে অভ্যস্থ। যেমন আশেপাশের দুনিয়ার আবর্জনা আমরা রাস্তায় ফেলি নিজের দোকান-বাসা পরিচ্ছন্ন রেখে; এটাই আমাদের সুখ!
তখন আবার সেই রাস্তা পরিষ্কার করার জন্য বিখ্যাত ঝাড়ুদার [১] কারিনা কাপুর, অনন্ত জলিলদের তকলিফ দেওয়া লাগে। বেচারাদের কী কষ্ট-কী কষ্ট!

কিন্তু এখনকার ঘটনাটা এমন ছিল না। এই পুলিশম্যান অন্যদের সহায়তা নিয়ে কাতর এই মানুষটাকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দিয়েছেন। এমন অজ্ঞাত পরিচয়ের মানুষকে হাসপাতালে ভর্তি করার হুজ্জতও কিন্তু কম না। হাসপাতালে স্টেশন মাস্টারের আনুষ্ঠানিক অনুমতিপত্র জমা দেওয়াটা বাধ্যতামূলক।
মানুষটার চিকিৎসা চলছে…।
আমি পূর্বেও কোনও-এক লেখায় বলেছিলাম, ম্যান হোক বা পুলিশম্যান আমরা আসলে ভাল হতে চাই কেবল ‘ভালগাড়িটাকে’ রেললাইনে তুলে দিতে হয়। এরপর, এরপর থামাথামি নাই গাড়ি আপনাআপনিই চলে…।

সূত্র: ১. বিশিষ্ট ঝাড়ুদার: http://www.ali-mahmed.com/2016/02/blog-post_11.html